Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ছায়াপাখি, এক আকাশের নিচে— পর্ব ২ (তৃতীয়াংশ)

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

The Duck and the Kangaroo

পাঁচ.

এই উইকেন্ডে বিজু আর তিয়াস মিলে ঘর গোছাচ্ছে। ওরা দুজন যখন একা থাকে তখন যেমন তেমন। সারা সপ্তাহের দৌড়াদৌড়ি, কাজের জীবন আর তিয়াসকে সামলাবার মধ্যে নিজের সময়কে ভাগ করে নেওয়ার পর ঘড়ির কাঁটা আর কিছু বাকি রাখে না। তাই শনি-রবিবার বিজু নিজেকে ছেড়ে দেয়। যেটুকু পারে তিয়াসকে কাছে বসিয়ে গল্প করে, ওর সঙ্গে আউটিং-এ যায়। ঘর গোছানোর সময় কোথায়? একজন মেইড এসে বাড়ি পুরো সাফসুতরো করে দিয়ে যায়। কিন্তু তাতে তো আর গৃহিনীর হাতের ছাপ থাকে না, শুধু পরিষ্কার হয়। আজ একটু সাজানো গোছানোর চেষ্টা করছে। দু-তিনটে ছবি কিনে এনেছে। দেওয়ালে টাঙাচ্ছে। এবার মা এসে থাকবে। খুব ভাল করে গোছাতে চায় বিজু। মার জন্য দোতলার বেডরুমটা ভাল করে গুছিয়েছে। বিছানার ঠিক পাশে একটা বইয়ের র‍্যাক বসিয়ে মায়ের পছন্দের মতো অনেক বই কিনে এনে রেখেছে। একটা সাউন্ডসিস্টেম, যাতে মা নিজের মত গান শুনতে পারে। লিভিংরুমের সিস্টেমটায় তিয়াস আজকাল নিজের গান শুনতে শুরু করেছে। এ দেশে মেয়েগুলো একটু তাড়াতাড়িই পাকা হয়ে যায়। ভেবে হাসি পেল বিজুর। ক্লাস নাইন অব্দি তার হিন্দি গান শোনার পারমিশান ছিল না।

একটা ফুলদানি রাখল জানালার মাথায়। মা আসবে আসছে সপ্তাহের শনিবার। শুক্রবারে তাজা ফুল এনে সাজিয়ে দেবে। বিছানার সাদা চাদরে বড় বড় ফুলের কাজ। তিয়াসের পছন্দ। মা-মেয়েতে টেনেটুনে লাগাল। তিয়াসটা খুব ভাল বিছানা করতে শিখেছে। এই বয়সে বিজু এসব কিছু করতেই পারত না। মা কিছু করতে দিলে তো! শুধু বলত পড়াশোনাটা ভাল করে কর।

তিয়াসকে কাছে টেনে মাথার চুলে বিলি কাটল বিজু। তুই কত তাড়তাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছিস তিয়াস। আসলে তোর মা-টা কিছু পারে না, তাই বোধহয় তুই এত ওস্তাদ তৈরি হচ্ছিস।

তিয়াস আদর পেয়ে মার গলা জড়িয়ে ধরল। মামমাম, তুমি যেটা পারো সেটা কজন পারে বলো। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বেথ ওর বাড়ির ঘাস কাটে লন মোয়ার দিয়ে, তুমি তো আমাকে সেসব কিছু করতেই দাও না।

নিজের মেয়েকে দেখে মুগ্ধ হওয়ার মত আনন্দ কিছুতে যেন নেই। বিজুর মনে হল মেয়েটা অনেকটা তার মায়ের ধাত পেয়েছে। বেশ গোছানো। সাজিয়েগুছিয়ে থাকতে ভালবাসে। কাজের মেইড চলে যাওয়ার পরে, এদিক-ওদিক ঘর গোছানোর কাজ এই মেয়েই তো করে। এমনকি বই পড়তে পড়তে বিজু উল্টে রেখে দেয়, ল্যাপটপ কার্পেটের উপর ছড়ানো থাকে। সব ঘুরে ঘুরে জায়গা মত তুলে রাখার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে এইটুকু মেয়ে। মমতায় তিয়াসকে জাপটে ধরল বিজু। মা এলে তারা তিন জেনারেশান একসঙ্গে কত মজাই করবে। দিম্মা এলে খুব মজা হবে, না রে তিয়াস?

—এবার এসে দিম্মা অনেকদিন থাকবে তাই না মামমাম?
—এক্কেবারে চলে আসছে তো। এবার দিম্মা আর কোথাও যাবে না। রিটায়ার করেছে কলেজ থেকে, এখন দিম্মা পুরোপুরি আমাদের।
—দিম্মা কি তাহলে ওল্ড এজ হয়ে গেল মামমাম?

ধুর, এমন কী বয়স দিম্মার। এখানে আসুক, কদিন বাদেই ঠিক আবার কোনও চাকরিতে ঢুকে যাবে। সেই কথাই বুঝিয়েছে বিজু মাকে। কলেজে এক্সটেনশান পাচ্ছিল। নিতে দেয়নি। এদেশে চাকরি পাওয়া যায় না নাকি? এখানে ঘরে বসে থাকে না মানুষ। অনেক বয়স অবধি চাকরি করা যায়। মা ঘরে একা থাকলে পাগল হয়ে যাবে একদম। আর থাকবেই বা কেন? মার যা কোয়ালিফিকেশান, চাকরি জোগাড় করা তেমন কিছু কঠিন হবে না। মা বলেছিল তুই সারাদিন অফিসে থাকিস, ওদেশে কাজের লোক পাওয়া যায় না। আমার আর চাকরি করে কাজ নেই, তোকে হেল্প করব আর বই পড়ব। বিজু না করেছে। ঠিক জানে কদিন ঘরে আটকা থাকলেই মার মন পালাই পালাই করবে। দেশে ফেলে আসা বন্ধুদের জন্য মন কেমন হবে। এখানে নিজের একটা জীবন তৈরি হলে নিজস্ব বন্ধুর জগৎ গড়ে উঠবে। কে জানে তেমন বন্ধু জুটে গেলে বিয়েই করে নিল না হয়। এদেশে এর চাইতেও বেশি বয়সে লোকে বিয়ে করছে না? মার তো মোটে ষাট। একবার সেই কথা বলেছিল। মা রেগেমেগে একসা। আচ্ছা সে না হয় না করলে মা। বিজু বুঝিয়েছে, আমি আর তুমি দুজনে চুটিয়ে সংসার করব। আর এতদিনকার না বলা গল্পগুলো করব।

রোজ বাড়ি ফিরে মেয়ের সঙ্গে ছাড়া কথা বলার কেউ নেই। মনের কথা বলার লোক লাগে। প্রাপ্তবয়স্ক একজন, যার সঙ্গে নিজের কষ্ট, চিন্তা একটু হলেও শেয়ার করা যায়। মণীশ চলে যাওয়ার পর সেই জায়গাটা ধু ধু করছে একদম। বিজু সত্যিই মায়ের আসার পথ চেয়ে আছে।

রাতের ডিনারের পরে ফোনটা এল। সান্টুদা, বিজুর মামাতো দাদা। দেশে তখন সকাল হবে। সান্টুদার গলা খুব উদ্বিগ্ন শোনাল। বিজু, পিসির শরীর খুব খারাপ।

খারাপ? বিজু খুব অবাক হয়েছিল। কালকেই তো কথা বললাম। কিছু শুনিনি তো। যদিও বুকটা দুরদুর করছিল। সাধারণ কিছু হলে নিশ্চয় সান্টুদা এমনভাবে ফোন করবে না।

—হ্যাঁ, হ্যাঁ হঠাৎই। আমাদের বাড়িতে এসেছিল। রাতের খাবার খেয়ে বাড়ি ফিরবে। আচমকা ওখানেই ঘুরে পড়ে গেল। আমরা সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ভাগ্যিস আমাদের এখানে হল। বাড়িতে হলে কে দেখত বল।
—কী হয়েছিল?
—সেরিব্রাল।
—এখন? গলায় কান্না চাপতে চাপতে বলল বিজু। সাজানো পৃথিবীটায় চিড় ধরছে কোথাও। কেমন আছে এখন?
—ভাল, ভাল। জ্ঞান ফিরবে, ডাক্তার বলেছে।
—জ্ঞান ফেরেনি? নিজের গলার স্বর অচেনা ঠেকল বিজুর।
—আইসিইউতে আছে। বেলভিউ। Just a matter of time, she will be back. কিন্তু ভাবলাম তোকে একটু খবরটা দিয়ে রাখি। তুই ছাড়া পিসির তো আর কেঊ নেই।
—আসছে সপ্তাহেই তো আমার এখানে চলে আসছিল সান্টুদা। তাহলে কি মা আর আসতে পারবে না?
—না, না পারবে না কেন। তবে একা কি আর পারবে। যদি পারিস তুই চলে আয়।
—কোনও রিস্ক আছে নাকি সান্টুদা?

এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর আবার সান্টুদার গলা। না না সেরকম কিছু না। তবে দ্যাখ সবই তো ডিপেন্ড করে কে কীভাবে ওষুধে রিয়্যাক্ট করে।

সান্টুদার এক মুহূর্তের চুপ করে থাকাতেই বিজু ডিসাইড করল কলকাতা যাবে। ওকে সান্টুদা আমি আসছি।

সান্টুদার গলায় একটা স্বস্তির ছাপ। খুব ভাল ভেবেছিস বিজু, এই মুহূর্তে তোর পিসির পাশে থাকা দরকার।

বিজু বসকে ফোনে জানাল। আপাতত পনেরো দিন। পরদিন দুপুরে টিকিট ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে। বিজু আর তিয়াস। তিয়াসের স্কুল পনেরো দিন অফ হবে। কিন্তু কিছু করার নেই। এই অবস্থায় মার পাশে গিয়ে না দাঁড়ালে চলবে না।

এত তাড়াতাড়ি সবকিছু ঘটে গেল যে বিজু ভাল করে মার জন্যে ভাবতেও পারছিল না। তিয়াস খুব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। এই ওরা বাড়ি গোছাচ্ছিল দিম্মা  আসবে, আর এখন ওরাই যাচ্ছে দিম্মার কাছে! প্লেনে বসে একটু ভাবার সময় পেল বিজু। সঙ্গে সঙ্গে মার সঙ্গে কাটানো কত টুকরো মুহূর্ত ঝাঁক বেঁধে ঘিরে ধরল বিজুকে। চোখে কালো ফেট্টি বেঁধে ঘুমানোর চেষ্টা করছিল। এক মুহূর্তে এই ফেট্টি ভিজে জবজব। এয়ারহোস্টেস এসে জিজ্ঞেস করে গেল, ম্যাম আর ইউ ওকে? কিন্তু কী করে ওকে হবে বিজু। মা আর তিয়াস ছাড়া তার সত্যিই আর কে আছে। ওদের একজন না থাকলেই তো জীবন অন্ধকার।

মা থেকেও তার জীবনের সব আলো যেন কেউ শুষে নিল।

বিজু যতক্ষণে কলকাতায় ল্যান্ড করল মার জ্ঞান ফিরেছিল। কিন্তু কথা ফেরেনি। চোখেও কোনও ভাষা নেই। বিজুকে দেখে চিনতেও পারল না। মুখটা একদিকে একটু বেঁকে গেছে। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা বেলভিউ চলে আসবে ভেবেছিল। কিন্তু তখন রাত আড়াইটা। এয়ারপোর্ট থেকে সান্টুদার সঙ্গে মামার বাড়িতেই এল। সান্টুদার কথায়। এত রাতে গিয়ে কী করবি। তাছাড়া তুই পারলেও মেয়েটাকে দ্যাখ, ও কি পারছে? মামিকে জড়িয়ে কেঁদে একটু আরাম হল। বিজুর জন্যে জেগে বসেছিল। সান্টুদার বউ সুমিতাও। দুঃখ ভাগ করে নিলে হয়তো কমে। কিন্তু এখন এটা একটা বিশাল পাথরের মত বুকে চেপে বসে আছে।

তিয়াস একদম ভেজড কন্ডিশানে। পরপর কি সব ঘটে যাচ্ছে, তারপর জেট ল্যাগ। মামার বাড়িতে আসতে আসতেই ঢলে পড়েছে। শুধু বারবার বলছিল, দিম্মা ভাল হয়ে যাবে, না মাম্মাম?

—হ্যাঁ, হ্যাঁ সব ঠিক হয়ে যাবে।
—পিঙ্কি প্রমিস?
—পিঙ্কি প্রমিস, তিউসি বিউসি। তুমি ঘুমাও। ভাঙা গলায় বলল বিজু।

সকালে বিজু যখন সান্টুদার সঙ্গে বেরোল ওকে আর ডাকেনি। ঘুমোক। ভালই করেছে। মাকে সামনাসামনি দেখে বিজুর যা অবস্থা হল, তিয়াস থাকলে অসুবিধা হত।

—তুমি তো একবারও বলোনি সান্টুদা, মার এমন অবস্থা! ফোঁপাতে ফোঁপাতে কোনওমতে বলেছিল বিজু।
—কী করে বলতাম বিজু। এত দূরে থাকিস, এইসব কি খুলে বলা যায়? ম্যাসিভ অ্যাটাক হয়েছিল, বেঁচে গেছে এই ভাগ্যি।

কিন্তু বেঁচে গেলেও বিশেষ কিছুই বাকি ছিল না মায়ের। অন্তত এই মুহূর্তে। বাঁদিকটা পড়ে গেছে, মুখটা বাঁকা। সবচেয়ে বড় কথা পুরো মেমরি লস।

—কী হবে ডাক্তারবাবু? ডক্টর বসাকের কেবিনে বসে এটাই বারবার জিজ্ঞেস করছিল বিজু।
—কিছু বলা যায় না। আমি এরকম রোগী দেখেছি, অনেকসময় বেশ ভালভাবে রিকভার করে যায়। আপনার মায়ের বেলাতেও না হওয়ার কোনও কারণ নেই। ধৈর্য ধরতে হবে। কেয়ার নিতে হবে। ফিজিওথেরাপি।
—কিন্তু মা তো কাউকে চিনতেই পারছে না। কথা বলছে না।
—সময় লাগবে, এইটুকুই বলতে পারি। তারপর সব ভগবানের হাতে।

ডাক্তার যখন ভগবানের দোহাই দেয় তাহলে আর কিসের ভরসা করবে বিজু? বাড়ির মধ্যে ভূতের মত ঘুরতে ঘুরতে এই কথাই ভাবছিল। মামার বাড়িতে থাকেনি। পরদিনই লেক রোডে নিজেদের বাড়িতে চলে এসেছে। কিন্তু এরপর? ডাক্তার তো সময়ের কথা বলেছে। কিন্তু বিজুর কাছে এত সময় কোথায়? তাকে তো আর সাত দিনের মধ্যে ফিরতে হবে। তার অফিস, তিয়াসের স্কুল। দুটো গোটা জীবন যে ফেলে রেখে এসেছে। সেখান থেকে পনেরো দিনের ছুটি মেলে, তার বেশি নয়। কী করবে বিজু?

লেক রোডের বাড়িটা ভূতের মত পড়ে আছে। এর আগে যখনই এসেছে কেবল ছুটে বেড়ানো। লোকের বাড়ি যাওয়া, মার সঙ্গে শপিং, ক্রমাগত বদলে যাওয়া কলকাতাকে খুঁটে খুঁটে দেখা। এতটা সময় টানা বাড়ির ভিতরে থাকা হয়নি। থাকলেও মার সঙ্গে আড্ডা। সেটাও রান্নাঘরের পাশে ডাইনিং স্পেসেই বেশি। এখন বাড়ির আনাচেকানাচে সেই সব পুরনো কথা খুঁজে বেড়াচ্ছিল বিজু। প্রায় পনেরো বছর বাড়ি ছেড়েছে। বাড়ির মধ্যে অনেক কিছুই কত বদলে গেছে। বিজুর ঘরটা মা একদম হাত দেয়নি। ঠিক যেমন কে তেমন, পরিপাটি করে গুছিয়ে রেখেছে। এমন কি দেওয়ালে ছোট্ট বিজুর হাতের ছাপ, নিব আটকে যাওয়া কলম ঝাঁকানো কালির ছররা সযত্নে গচ্ছিত আছে আজও। এই স্মৃতি নিয়েই মা বেঁচেছে এতদিন। সেই স্মৃতির মন্দিরে এখন তিয়াস। একটু বাদে বাদে একেকটা জিনিস নিয়ে মার কাছে ছুটে আসছে। মাম্মাম এটা তোমার ছিল? একটা স্কার্ট। বিজুর দশ বছর বয়সের। নীল রং, ভায়োলেট কালারের ববি প্রিন্ট। তার সময়ের তুলনায় বেশ ছোট, হাঁটুর অনেক উপরে। মা নিউ মার্কেট থেকে কিনে এনেছিল। সেটা দেখে একঝাঁক কথা বিনবিন করে ধেয়ে এল। পড়ব মাম্মাম?

তিয়াস যেমন বিজুর ঘর থেকে তার মাম্মামের ছোটবেলা ঘাঁটছিল, বিজু ঘুরে ঘুরে অন্তরাকে। মার ঘরটা অনেকভাবে বদলে গেছে। খাটটা সেরকমই আছে। কিন্তু আগে দেওয়াল ছিল সবুজ, এখন ফ্যাকাশে নীল। দেওয়ালে বিশাল একটা তেলরং। অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট। বিজু অত বোঝে না। অন্তরার সঙ্গে এইসব জায়গায় তার অনেক অমিল। মার বই পড়ার টেস্ট তার থেকে আলাদা। বিজু অত পড়ার সময়ই বা কোথায় পায়। হয়তো পড়বে পরে। মার খাটের পাশে ছোট বইয়ের স্ট্যান্ড। অন্তরা একসঙ্গে অনেক বই পড়ত। সেইগুলো হাতের কাছে এনে রাখার ব্যবস্থা। বাংলা, ইংরেজি। সমরেশ বসু, কবিতা সিংহ, মারগারেট আটাউড, অরুন্ধতি রায়, বিল গেটস। বুকটা কেঁপে উঠল বিজুর। মা আবার বই পড়তে পারবে তো?

মার দেরাজটা খুলল বিজু। মার শাড়ির চয়েস খুব ভাল। শাড়ি খুব ভালবাসে মা। থরে থরে হ্যাঙ্গারে ঝুলছে। মার এটাই দুঃখ, বিজু সেরকমভাবে শাড়ি পরে না মোটেই। পরবে কোথায়? আমি গেলে কী হবে বল তো এগুলোর? বিজুকে বলেছে অনেকবার। আমেরিকায় আসবে বলে আরও অনেক শাড়ি কিনছিল। ওখানে গেলে পাব কোথায়? বিজু বলেছে, এখানে এসে জিনস পরবে মা। আর টি শার্ট। পরেনি মা তা নয়। আগেও তো বিজুর কাছে এসেছে। বেড়াতে গেলে পরেছে। কিন্তু শাড়িই প্রথম পছন্দ। শাড়িগুলোর উপর দিয়ে আঙুল বোলাল বিজু পিয়ানোর চাবি টেপার মত। ঢেউ খেলছিল শাড়িগুলোতে, এক শাড়ি থেকে অন্য শাড়ি। ডমিনো এফেক্ট। শাড়িতে নাক ডুবিয়ে মার শরীরের কাছাকাছি এসে যাচ্ছিল বিজু। এবার এসে আইসিইউতে মার কাছে দাঁড়িয়ে সেই গন্ধ পায়নি। ওষুধের তলায় চাপা পড়ে গেছে। এইখানে শাড়ির মাঝখানে মাকে খুঁজে পেল বিজু। দুহাতে শাড়ি মুঠো করে মুখ গুঁজে দিল ঠিক মার কোলে মুখ লুকানোর মত। জামদানি শাড়িটা ভিজে যাচ্ছিল চোখের জলে। যাক। বিজু যেন নিজেকে ছেড়ে দিয়েছে। মনের কষ্টদের বাস আঙুলে আঙুল জড়িয়ে। মার জন্যে হওয়া কষ্টগুলোর হাত ধরে আরও কত কষ্ট যে বেরিয়ে এল। কান্নাটা ছড়িয়ে যাচ্ছিল শরীরে। হাঁটু ভেঙে যাচ্ছিল। বিজুর সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু শাড়ি হ্যাঙ্গার থেকে আলমারির মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল। না হলে মার এই লুকোনো ভাণ্ডার বিজুর চোখেই পড়ত না। শাড়ির ঢালের পিছনে বেশ কিছু ডায়েরি, অসংখ্য চিঠি গোছা করে গার্ডার দিয়ে বেঁধে রাখা। সব মার? কান্না ভুলে হাত বাড়িয়ে তুলে নিল বিজু। অন্তত গোটা দশেক ডায়েরি হবে। কম করেও শ চারেক চিঠি চারটে গোছায়। সব এনে খাটের উপর রাখল বিজু। যে মানুষটা স্মৃতি হারিয়ে আইসিইউতে পড়ে আছে, তার সব স্মৃতি বোঝাই ডায়েরি আর চিঠি বিজুর দিকে তাকিয়েছিল। পুরো একটা জীবন।

তার কি এগুলো পড়া উচিত? সেকি মার প্রাইভেট স্পেসে ঢুকে পড়ছে না? মা তো তাকে কোনওদিন ডায়েরি দেখায়নি। মা যে লিখত সেটাও কীভাবে বিজুর আড়ালে রেখেছে এতগুলো বছর। উল্টেপাল্টে তারিখ দেখে বুঝল এটা বিজু আমেরিকা চলে যাওয়ার পর শুরু। বুকটা কেমন চলকে উঠল বিজুর। তাকে কাছে না পেয়ে ডায়েরিই হয়ে উঠেছিল মার কথা বলার জায়গা। প্রথম পাতাতেই তার আমেরিকা যাওয়ার দিনের তারিখ।

২৭শে আগস্ট, ১৯৮৭

বাড়ি ফিরে বড় অদ্ভুত লাগছে আজ। একটু বাদে বাদে মনে হচ্ছে এই বুঝি বিজুটা মা বলে ডেকে উঠবে। মেয়েটার সারাটা দিন আজ চোখের সামনে বারবার ভেসে ভেসে উঠছে। ঘরে ঘরে ঘুরে ওর গন্ধ, স্পর্শ আহরণ করছি, তবু মন ভরছে না। অথচ আমিই তো ওকে বিদেশে যাওয়ার জন্য ঠেলেছি এতদিন। জোর করে জিআরই দেওয়ালাম। কলেজে অ্যাপ্লিকেশন করালাম। যেন নিজের হাতে নিজের শমন জারি করা। জানি এতেই ওর ভাল।

ওর নিশ্চয় এসব মনে হচ্ছে না। কেনই বা হবে। সামনে মস্ত জীবন। আমি যা পারিনি, সব ওর হোক। সেটাই তো আমার স্বপ্ন ছিল। বেঁচে থাকার রসদ। ও যেখানেই থাক, সেটা ফুরাতে দেব না।

পর পর পাতা উল্টে যাচ্ছিল বিজু। চোখ আটকে গেল নব্বই সালের একটা এন্ট্রিতে।

২৫শে অক্টোবর ১৯৯০

সুশোভনের সঙ্গে দেখা হল হঠাৎ। কানাডায় থাকে জানতাম। সায়েন্স কলেজে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উপর লেকচার ছিল ওর। আমাকে খুঁজে বের করে হঠাৎ ফ্যাকাল্টি অফিসে হাজির।

ভাল লাগে। কেউ খোঁজ করলে। সুশোভন ভাল আছে। পুরনো কথা কিছু তুলল না। ও ভাল আছে শুনে আমার কেন খারাপ লাগবে? আমিই তো ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম একদিন। বিজু আমেরিকায় আছে শুনে যোগাযোগ করতে চেয়েছিল। আমি ফোন নাম্বার দিইনি। মানুষের জীবনের আলাদা আলাদা ধারাগুলোকে মেলাবার চেষ্টা করে লাভ নেই।

বিজুর একটু ইতস্তত লাগছিল। সে কি ঠিক করছে? এই সুশোভন কে বিজু জানে না। কিন্তু তার খবর মা বিজুর কাছ থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিল। এখন মার অজান্তে মায়ের ডায়েরি পড়ে সে বোধহয় এনক্রোচ করছে। কালকে যখন মা চোখ মেলে চাইবে, কথা বলবে সে কি স্বাভাবিক হতে পারবে? মাকে মুখ ফুটে বলতে পারবে, মা আমি তোমার বুকের ভিতরটা পড়ে ফেলেছি?

ডায়েরিগুলো পাশে সরিয়ে রাখল বিজু। যদি পড়তে হয় মার সঙ্গে একসঙ্গে বসে পড়বে। কোনওদিন। আছে সেটা তো জানা রইল। ডায়েরি, চিঠি সব গুছিয়ে তুলে রাখতে গিয়ে আবার কী মনে হল বিজু চিঠির গোছাটা খুলল। এত চিঠি কার? এর মধ্যে কি ওই সুশোভনের চিঠি আছে? বিজু খুব অবাক হল যখন তার মধ্যে অসংখ্য চিঠি পেল সমরেশ বসুর। মা বই পড়তে ভালবাসত, কিন্তু চিঠিতে সাহিত্যিকদের সঙ্গে কোনও আলোচনায় জড়াত সেটা জানা ছিল না। খুলে পড়ার লোভ হলেও নিজেকে সামালাল বিজু। শুধু সুশোভনের চিঠি পড়বে। ওই একটা ছাড়।

এই চমকের জন্য তৈরি ছিল না বিজু। সুশোভনের অনেক চিঠি। অ্যারোগ্রাম। কিন্তু সব পরিপাটি করে বন্ধ। খোলাই হয়নি, না কি খুলেও আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে? তারিখগুলো চিঠির স্ট্যাম্প দেখে বোঝার চেষ্টা করল বিজু। ঊনসত্তর, সত্তর। বছর ছয়েকের তখন বিজু। বাবা ছেড়ে গেছে। তাহলে?

সকাল হয়ে এসেছিল। বাইরে পাখি ডাকছে। চোখ জ্বলছে বিজুর। দরজা খুলে দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়াল। একটু একটু আলো ফুটেছে। কে জানে কী লেখা আছে সেই চিঠিতে। হয়তো মার জন্যে ভালবাসার ডাক। যেটা জেনেই মা এই চিঠিগুলো খোলেনি পর্যন্ত। নিজের উপর ভরসা পায়নি। কিন্তু কেন? মার তো তখনও একটা গোটা জীবন পড়েছিল সামনে। বিজুর জন্যে? এই সুশোভন কি বিজুর দায়িত্ব নিতে চায়নি? অথবা মা নিজেই সাহস পায়নি। শুধু মেয়ের জন্যে নিজের ভালবাসার ডাক ফিরিয়ে দিল মা? এর উত্তর মার সঙ্গে কথা বলে বা চিঠিগুলো পড়েই শুধু জানা যাবে।

কিন্তু মনের ভিতর যে প্রশ্নটা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল গত কদিন তার উত্তর বিজুর জানা হয়ে গেছে। আজকেই অফিসে ফোন করবে। সাবাতিকাল নেবে এক বছরের। মাকে ছেড়ে সে কোথাও যাবে না। ফিরতে হবে মাকে নিয়েই। তাকে ছাড়া মার জীবন গোটা ছিল না। আজ মাকে ছাড়া তার আর তিয়াসের জীবন গোটা থাকতে পারে না। দৌড়ের লেন থেকে ছিটকে যাবে বিজু। কিন্তু সেখানেই তার জীবন দাঁড়িয়ে আছে।

 

[আবার আগামী সংখ্যায়]