ছায়াপাখি, নীল হ্রদের তীরে — পর্ব ৪ (শেষাংশ)

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

Wren House

৪.

বিজুর ফিরতে সন্ধ্যা। দেরি হয় এমন, আজ একটু বেশি। দুপুর বারোটার পর অফিস থেকে বেরিয়ে তিয়াসকে ওর প্রিস্কুল থেকে তুলেছিল। তারপর জুলিয়ার ওখানে দিয়ে আবার অফিসে ফিরে গেছিল রোজকার মত। জুলিয়া তিয়াসের বেবি সিটার। দুপুর থেকে বিজুর ফেরা অবধি তিয়াস ওর কাছেই থাকে। আরও দু-তিনটে বাচ্চাও থাকে। কিন্তু এতক্ষণে ওরা সবাই বাড়ি চলে গেছে। নার্সারিতে ঢুকে বিজু দেখল তিয়াস কার্পেটের উপর এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। মাথার চুল কপালে লেপ্টে। ছোট দুটো হাত মুঠিবদ্ধ। বিজু নিচু হয়ে ওকে টপ করে কোলে তুলে নিল। তবু ঘুম ভাঙেনি মেয়ের। দিনের এই সময়টা বিজুর জন্য সবচেয়ে কঠিন। মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে মনে হয় ইজ ইট ওয়ার্থ? এই ছোট্ট শিশুটাকে সে কি অযথা কষ্ট দিচ্ছে? ঠিক আর ভুলের হিসেব করতে করতে রোজ তার দোষের বোঝা যেন বড় আকার নিচ্ছে।

আজ কেমন ছিল তিয়াস? রোজকার মত এই প্রশ্নের উত্তরে জুলিয়ার কিছু গতবাঁধা উত্তর আছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে। যেমন আজ বলল, তিয়াস ইজ অ্যান এঞ্জেল। শি হ্যাড সো মাচ ফান টুডে। বিজু এই বাঁধাধরা উত্তর থেকে শাঁস খুজে নিয়ে নিজেকে প্রবোধ দিতে চায়। দিতে হয়। মেয়েকে বেবি সিটারের কাছে রাখা ছাড়া আর কি কোনও উপায় আছে?

গাড়ি ছাড়ার পর ঝাঁকুনিতে তিয়াসের ঘুম ভেঙে গেল। পিছনের সিটে বেঁধে রাখা বেবি সিটে নাড়াচাড়া দিয়ে উঠে বসল তিয়াস। মাম্মা!

রাস্তায় চোখ রেখে স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে বিজু আয়না দিয়ে তিয়াসকে দেখার চেষ্টা করল। হাউ ওয়াজ ওর ডে সুইট হার্ট?

–আই মিসড ইউ।

রাস্তা এখানে বাঁক নিয়েছে অনেকটা। কিছুক্ষণ নীরবতায় রাস্তা পেরোল বিজু। আই মিসড ইউ টু। আজকে নতুন কিছু করেছ জুলিয়া আন্টির কাছে?

–নোপ!
–তাহলে কী করেছ?
–লিসা আর টবির সঙ্গে খেলেছি।
–আর?
–জুলিয়া আন্টির সঙ্গে আমরা গান গেয়েছি।
–তাহলে যে বললে নতুন কিছু করোনি?
–গান রোজ করি, নতুন কেন হবে?
–কী গান?
–তুমি জানো না।
–আমাকে শিখিয়ে দাও।

তিয়াস একটু চুপ করে থেকে বলল, এটা তো ইংলিশ গান।

–আমি ইংরাজি গান গাইতে পারব না? হাসতে হাসতে বলল বিজু।
–তুমি আমার সঙ্গে বেঙ্গলিতে কথা বলো। বেঙ্গলিতে গান শোনো। আমাকেও বেঙ্গলি গান শেখাও। তিয়াস আঙুল গুনে গুনে হিসাব করল মাম্মা তার সঙ্গে কী কী জিনিস বেঙ্গলিতে করে।
–তাহলে আজকে তুমি আমায় ইংরাজি গান শেখাবে। আমি তোমাকে বাংলায় শেখাব আর তুমি আমাকে ইংলিশে শেখাবে। সেটা কেমন হবে?

তিয়াস একটু বিবেচনা করে দেখল। মুখের ভাব পরিবর্তন থেকে বোঝা গেল মজা পাচ্ছে। মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বিজুর মাথাটা একটু হালকা হচ্ছিল। থেরাপিউটিক। শুরু করো তিয়াস।

তিয়াস একটু গুনগুন করে সুর ভেঁজে গাইতে শুরু করল।

–The wheels on the bus go round and round
Round and round
Round and round

দু লাইন গেয়েই থেমে গেল। তুমি আমার সঙ্গে গাইছ না মাম্মা।
–আগে একবার শুনে নিই। তারপর তোমার সঙ্গে গাইব?
–The wheels on the bus go round and round
All ‘round the town.

দুজনে গলা ছেড়ে এই একটা স্ট্যাঞ্জা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাইল। তিয়াস এখনও এর বেশি জানে না। জুলিয়া কালকে আবার পরেরটা শেখাবে। মাম্মার প্রগ্রেসে খুশি হয়ে তিয়াস প্রমিস করল পরদিন ও আবার বাকিটা শেখাবে।

হাসি চেপে বিজু বলল, লিসা আর টবি চলে যাওয়ার পর? তারপর কী করলে?

–ছবি আঁকলাম। পার্কের ছবি।
–পার্কে কে ছিল তিয়াস।
–মাম্মা আর ড্যাডির হাত ধরে তিয়াস পার্কে ঘুরছিল।

মণীশ কি ফিরেছে আজ? ট্যুরে গেছিল ভার্জিনিয়ায়। আজকে ফেরার কথা। অনেকগুলো দরকারি কথা বিজুর মাথায় বিনবিন করে উঠল। যেমন লাস্ট সানডে গেছিলাম?

একটু ভাবল তিয়াস। নো। এই পার্কে বিচ ছিল, জলের ছবি করলাম ব্লু কালার দিয়ে।

বাড়ি এসে গেছিল। গ্যারাজে গাড়ি ঢোকাতে গিয়ে দেখল মণীশের শেভরলেটা রাখা আছে। তাহলে তো ফিরে এসেছে। বিজু আলো জ্বলতে দেখেনি তো?

–মণীশ! মণীশ! লিভিংরুমে ঢুকতে ঢুকতে গলা তুলল বিজু।

দুবারের পর বেডরুম থেকে মণীশের গলাখাঁকারি ভেসে এল।

–কখন এসেছিস? ঘুমাচ্ছিলি নাকি? বিরক্ত লাগল বিজুর। যদি আগে চলে এসে থাকে বাড়িতে কয়েকটা কাজ এগিয়ে রাখতে পারত না!

সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙল মণীশ। বিজুর দিকে এক ঝাঁক হাসি উপহার দিয়ে তিয়াসকে ফ্লাইং কিস করল। হাই তিয়াস! ড্যাডি ইজ হিয়ার! মণীশ সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই তিয়াস ছুট্টে গিয়ে মণীশের কোলে। তিয়াসকে একটা ছোট্ট কিস করে মণীশ আবার বিজুর দিকে ফিরল, তিনটের সময় এসে গেছিলাম। এত টায়ার্ড লাগছিল। জাস্ট বিছানায় ডাইভ।

বিজু তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। কীরকম অবাক লাগে তার। আচ্ছা তুই কী বল তো? তিনটের সময় যখন ফিরে এসেছিস, তাহলে তিয়াসকে তুলে নিতে পারিসনি? নাহয় দুজনে পাশাপাশি শুয়ে ঘুমিয়েই পড়তিস, অন্তত মেয়েটা ড্যাডিকে একটু পেত।

–আরে এই যে ঘুমালাম, এখন আমিও ফ্রেশ। তিয়াসকে দেখেও মনে হচ্ছে এখুনি ঘুম থেকে উঠেছে। তাহলে? আমরা দুজনে খেলব তো এখন। তাই না রে তিয়াস?

মেয়েটাও ঘাড় ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বলতেই বিজুর চোখ ফেটে জল এল। দুইদিন বাড়ি ছিলি না, আমি একা সামলালাম সব কিছু। বাড়ি এসে এখন মেয়ের সঙ্গে খেলবি। সারাদিন পরে রোজ রোজ আমাকেই কেন সব কিছু করতে হবে বল তো?

–আহা এত স্ট্রেস নিচ্ছিস কেন? কিছু করার কী দরকার? রিল্যাক্স! পিজা ডেলিভারি করিয়ে নিচ্ছি, আর কী চাই?
–সেটা তো হয় না, তাই না? এই যে সিঙ্কে ব্রেকফাস্টের বাসনগুলো পড়ে আছে, ডিশ ওয়াশারে দিতে হবে। বাসি জামাকাপড় আমি ওয়াশিং মেশিনে না দিলে এই বাড়িতে আর কেউ নেই সেটা করতে পারে। তাছাড়া ডিনারে রোজ রোজ পিজা তিয়াসের জন্য হেলদি না। পিজা আর বার্গার রোজ খেতে থাকলে ওর চেহারা হবে ওই অ্যামেরিকান মেয়েগুলোর মত, ওভারওয়েট।
–কোথায়, আমি তো অফিসে সেরকম ওভারওয়েট অ্যামেরিকান মেয়ে দেখি না রে। বেশ ভালো তাদের ফিগার, ইন ফ্যাক্ট ডিস্ট্র্যাক্টিংলি বিউটিফুল।
–অফিসে বসে এইসবই দেখিস বুঝি?
–আচ্ছা চোখ বন্ধ করে তো থাকি না। বিজুকে উসকাতে পেলে মণীশ সেই সুযোগ ছাড়ে না। উফ বিজু, কী বলব তোকে, জেলাস ফিল করবি। ফিগার কী একেকজনের, তেমনি সেক্সি। সামারে একেকজন যা ক্লিভাজ-শোইং ড্রেস পরে না, একটু ঝুঁকে দাঁড়ালে একেবারে নাভি পর্যন্ত ঝলকায়— এতটুকু বলা হয়েছে কী হয়নি, বিজু হাতের পার্সটা ছুঁড়ে মারল সোজা মণীশের মুখে। সময়মত মাথা সরিয়ে নিয়েছিল না হলে চোট পাওয়া অসম্ভব ছিল না। মণীশ বিজুকে রাগাবার জন্য বলছিল, কিন্তু বিজু যে এরকম রিয়াক্ট করবে ভাবতেই পারেনি।

বিজু ততক্ষণে সোফায় ধপ করে বসে চোখে হাত চাপা দিয়ে ফুলে ফুলে কাঁদছে। এ কী রে! তুই তো একেবারে খেপচুরিয়াস হয়ে গেলি। মণীশ দ্রুত পায়ে এসে বিজুর পাশে এসে কাঁধে হাত রাখতেই সে মেয়ে ছিটকে সরে গেল। ডোন্ট টাচ মি। গো, গ্র্যাব ইওর অ্যামেরিকান বিউটিজ।

মণীশের কোনও চাপানউতোর নেই। সোফায় বিজুর পাশে বসে বলল, ওরে খেপী, আমি যদি অফিসের কোনও কলিগকে গ্র্যাব করি না সঙ্গে সঙ্গে আমার চাকরিটা নট হয়ে যাবে।

–জানি, সেইজন্যেই তো তোর মত ওম্যানাইজার এখানে এসে খাপ খুলতে পারছে না। কলেজে থাকতে কম ফস্টিনস্টি তো দেখিনি চোখের সামনে।

এতক্ষণে তিয়াস ছুট্টে এসে মায়ের কোলে বসে পড়েছে। মাম্মা, ড্যাডি কী তোমাকে স্কোল্ড করল?

–বাহ মেয়ে, তোকে কোলে তুলে নিলাম, তোর মাম্মা আমাকে ব্যাগ ছুড়ে মারল যেন বডিলাইন সিরিজে লারউড বল করছে। আর তুমি এসে বলছ ড্যাডি মাম্মাকে স্কোল্ড করেছে?

তিয়াস এখন মাম্মাকে মাথায় হাত বুলিয়ে ষাট ষাট করছে, যেমনভাবে তার দিম্মাকে করতে দেখেছে। স্কোল্ড করলে কাঁদতে নেই মাম্মা, বি আ ব্রেভ গার্ল। আমাকে স্কোল্ড করলে আমি কি কাঁদি?

বিজু তার গোঁসাঘর পোজ থেকে লাফ দিয়ে উঠল যেন। কে তোকে স্কোল্ড করে তিয়াস। আমি? না ড্যাডি?

এবার মেয়েটা থতমত খেয়ে গেল একদম। মুখে কিছু বলল, বাইরে শব্দ হয়ে প্রকাশ পেল না।

–বলো আমাকে? হু স্কোল্ডস ইউ?
–জুলিয়া।
–জুলিয়া? খুব অবাক হয়ে গেল বিজু? কবে? আজকে?
–রোজ। বলেই আরও ভয় পেয়ে গেল তিয়াস। জুলিয়াকে বলবে না তো মাম্মা, তাহলে ও মারবে।

এবার বিজু যেন পাগলের মত হয়ে গেল। মণীশও একটু নড়েচড়ে বসেছে। তোমাকে মারে? কীভাবে?

–রুলার দিয়ে। যদি কথা না শুনি।

বিজুর এখনকার কান্নাটা হল অন্যরকম। যে কান্নায় গলায় শব্দ হয় না, হিক্কা ওঠে না, শুধু চোখ বেয়ে জল বেরোয়। আমাকে বলিসনি কেন? হোয়াই?

তিয়াসও এখন ফোঁস ফোঁস করে কাঁদছিল আর হাতের উল্টো দিক দিয়ে চোখ মুছছিল। জুলিয়া বলে তুমি তো চাকরি করো, তাই জুলিয়াকে তোমার লাগবেই। সেইজন্য আমি তোমাকে যতই নালিশ করি, তবুও তুমি শুনবে না আমার কথা।

–ও মাই গড! তিয়াসকে সজোরে বুকে চেপে ধরল বিজু। আমার সুইটহার্টের কথা আমি শুনব না, তাই কি কক্ষনও হয়? অনেকক্ষণ বুকে চেপে রাখার পর বিজু জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা তিয়াস, ও কী শুধু তোমাকে বকে মারে না লিসা আর টবিকেও।
–ওরা যখন থাকে আমরা একসঙ্গে খেলি, তখন কিছু বলে না। ওরা চলে গেলে আমি যদি ঘুমিয়ে না পড়ি আমাকে মারবে।

বিজু কী করবে বুঝতে পারছিল না। মণীশও ভাবছিল। কিন্তু বিজু যদি আশা করে থাকে মণীশের মাথা থেকে কোনও উপায় বেরোবে, সেটা হল না। বিজু জিজ্ঞেস করল, কী করব এবার মণীশ?

–যা ভালো বুঝবি কর, আমি কী বলব?
–তুই বাবা, তুই কিছু বলবি না? বিরক্তিটা বিজুর গলায় দানা বাঁধছিল।
–এসব ব্যাপারে মায়েরাই ভালো বোঝে।
–জুলিয়ার কাছে পাঠাব কী পাঠাব না? তুই আর আমি একই কথা শুনলাম। তাহলে তুই কেন বলতে পারছিস না। বিজু বুঝতে পারল তার গলাটা আবার চড়ছে। কিন্তু কীভাবে সেটা নীচে রাখবে ওর জানা ছিল না।
–সেটা তো একটু রিস্কি হয়ে যাবে।
–তার মানে পাঠাব না। তবে কার কাছে থাকবে?

ব্যাপারটা অনেকটা কবাডি খেলার মত হচ্ছিল। একজন চু বলে ছোঁবে বলে ছুটে বেরাচ্ছে, আর একজন ধরাছোঁয়ার বাইরে পাকাল মাছের মত পিছলে যাচ্ছে। কিন্তু বিজু নাছোড়বান্দা, বল মণীশ। তিয়াস কার কাছে থাকবে সারাদিন?

মণীশ উঠে দাঁড়াল। গলাখাঁকারি দিল একবার তিয়াসের দিকে চোখ রাখল। মেয়েটা একবার মাম্মা, আর একবার ড্যাডির দিকে তাকাচ্ছে। দ্যাখ বিজু, শুনলে তোর ভালো লাগবে না, কিন্তু এইটুকু মেয়েকে সারাদিন রাখতে হলে মায়ের সঙ্গে থাকা দরকার।

–বাহ, কোনও শাস্ত্রে লিখেছে এটা?
–এটা কোন বইতে লেখা আছে সেটা বড় কথা নয়। তোর মাকে ফোন করে জিজ্ঞেস কর, কী বলে। তাছাড়া আমি কী করে বাড়িতে বসে থাকব বল? চাকরিটার কী হবে?
–ও আচ্ছা, তোর চাকরির দরকার আছে, আমারটার দরকার নেই তাই না?
–বিজু ব্যাপারটা ওইভাবে দেখলে খারাপ লাগবে। তুই তো জানিস আমি ক্যারিয়ার নিয়ে নিজে অত অ্যাংশাস নই তোর মত। কিন্তু ঘটনা হল আমি এই মুহূর্তে তোর থেকে বেশি রোজগার করি। আমি বসে গেলে শুধু তোর টাকায় সংসার চলবে না। মর্টগেজ দেওয়া মুশকিল হয়ে যাবে।

বিজু মণীশের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। এটা ঠিক ওর কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু বিজু জানে না, যদি আজ বিজুর স্যালারি বেশি হত তাহলেও কি মণীশ এই ভাবে ভাবত? হয়তো। মণীশকে বেনিফিট অব ডাউট দিল এখনকার মত। শক্ত হয়ে আসা শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একটু আলগা হল তাতে। বিজুর চোখ পড়ল তিয়াসের দিকে। মেয়েটার চোখে কেমন দিশেহারা ভাব। মোটে তো চার বছর বয়স। কতটা বোঝে? কিন্তু এইটুকু বুঝতে পারছে যে ওকে নিয়ে একটা সমস্যা হচ্ছে। সেটা বুঝে গিয়ে মেয়েটা কীরকম কুঁকড়ে গেছে একেবারে। বিজু নিজের কথা ভুলে তিয়াসকে কোলে তুলে নিল। তিয়াস বিজুর গালে শুকিয়ে আসা চোখের জল মুছিয়ে দিল। মাম্মা, আমি জুলিয়ার কাছেই যাব। ওকে, ওকে?

মণীশ এবার মুখ খুলল। এমনটাও তো করতে পারো বিজু, জুলিয়ার কাছে দিলে না। কিন্তু অন্য কোনও বেবি সিটারের কাছে তো দিতে পারো।

–সেও যে ঠিক এরকমটাই করবে না, সেটা কী করে বুঝব?
–কিছু হলে তিয়াস আমাদের বলবে। বলবে না তিয়াস সোনা?

বিজু নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়েছিল। এইরকম একটা ঘটনার পর, আবার কোনও বেবি সিটারের কাছে রাখা খুব মুশকিল। ভরসা পাব না মণীশ। সত্যিই এরকম রিস্ক নিতে পারবে না বিজু। জানে এই যে একবার বাড়িতে বসে যাবে, আবার নতুন করে কয়েক বছর বাদে ক্যারিয়ার শুরু করা কঠিন হবে। এমনিতেই তিয়াস হওয়ার সময় এক বছর গ্যাপ পড়েছে। তার তো একটা এফেক্ট আছেই। কিন্তু আর কোনও উপায় নেই বিজুর। সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার চেয়ে তিয়াসের কথা ভাবা বেশি জরুরি। এই মূল্যগুলো চুকাতেই হবে তাকে, অন্য কোনও পথ নেই। তিয়াসকে কোলে নিয়ে আবার সোফায় বসে পড়ল বিজু। কালকে সকালে বসের সঙ্গে কথা বলে নেবে, তারপর রেজিগনেশান পাঠিয়ে দেবে। সেটাই বলল মণীশকে। রিজাইন করব কাল, থাকব আমি বাড়িতেই।

–আমি কিন্তু তোকে রিজাইন করতে বলিনি বিজু।
–আচ্ছা চাকরি করতে করতে কী করে বাড়িতে থাকব সেটা তো বুঝতে পারছি না। বিজু অবাক হচ্ছিল না, কিন্তু এরকম লিপ সার্ভিস পছন্দ হয় না একদম।
–ছুটি নে, উইদাউট পে যা কয়েক মাস।
–একই ব্যাপার। কয়েক মাস বাদে তো আর তিয়াস দশ বছর বয়সের হয়ে যাবে না। তাহলে ফারাকটা কী হবে?

মণীশ বিজুর পাশে সোফায় বসল। কিছু একটা উপায় ভাবার চেষ্টা করছে। বিজুর মত কাজপাগল মেয়ে বাড়িতে বসে গেলে, ঘরেও একটা ধিকিধিকি আগুন জ্বলবে। খুব একটা সহনীয় ব্যাপার হবে না সেটা। তাছাড়া বিজুর দিকটা তো সত্যিই ভাবা দরকার। আচ্ছা বিজু, আমরা দুজনেই ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাপারটা ইমোশনালি না নিয়ে লজিক্যালি কেন ভাবছি না?

–কোন লজিক?
–এই মনে কর জুলিয়ার ওপর তোর বিশ্বাস উঠে গেছে…
–কেন, তোর আছে বিশ্বাস?
–আচ্ছা আচ্ছা, আমাদের দুজনের বিশ্বাস উঠে গেছে। কিন্তু তাই বলে অন্য সব বেবি সিটারের উপর কেন বিশ্বাস করা যাবে না?
–আমি আবার কারও বাড়িতে তিয়াসকে রেখে যাব, সে তার বাড়ির কাজ করতে করতে তিয়াসকে নেগলেক্ট করবে, হবেই। আমি জানি।
–এগজ্যাক্টলি। তাহলে অন্যের বাড়িতে না রেখে, নিজের বাড়িতে রাখলেই হয়।
–তার মানে?
–মানে আর কী, বাড়িতে কোনও গভর্নেস রাখলে হয় না? তাহলে তার একমাত্র কাজ হবে তিয়াসকে দেখা। আমাদের বাড়িতে বসে সে কক্ষনও আমার মেয়েকে কিছু করতে পারবে না।
–সেটাতে অনেক খরচ।
–আরে তুই কি টিউবলাইট? তোর স্যালারির থেকে তো অনেক কম। উই ক্যান অ্যাফোর্ড।
–কোথায় থাকবে?
–কেন, গেস্ট রুম তো আছে। নার্সারির পাশেই।
–ওকে, ইওর আইডিয়া হ্যাজ মেরিট। কিন্তু কোথায় পাব?
–সেটা আবার কী কথা। চেনাশোনা লোকের কাছে খোঁজ নিয়ে দ্যাখ, পেপারে অ্যাড দেওয়া যেতে পারে, দেয়ার আর মেনি ওয়েজ।

বিজুর মাথায় অনেকগুলো ভাবনা খেলছিল। হয়তো এটাই একটা উপায়। সাত দিনের জন্য ছুটি নেবে না হয়। যদি তার মধ্যে কোনও সুবিধা করতে না পারে, তখন না হয় চাকরি ছাড়ার কথা ভাবা যাবে। অনেকক্ষণ বাদে বিজুর কপালের রেখাগুলো একটু একটু আলগা হল। সেটা দেখে মণীশ বলল, আবহাওয়া দপ্তর থেকে বলছে ঝড় কেটে গেছে, তাহলে কি এবার দু একটা চুমু খাওয়া যেতে পারে?

–একদম না, তোর মত মেল শভিনিস্ট পিগকে চুমু খেতে আমার বয়ে গেছে। আমি অফিস থেকে ফিরে এখনও জামাকাপড় কিছু ছাড়িনি। একগাদা কাজ পড়ে আছে। তিয়াসের সঙ্গে খেল, আর পারলে চেনা লোকেদের কাছে ফোন লাগিয়ে দ্যাখ কারও এরকম কোনও চেনা বিশ্বাসযোগ্য গভর্নেস বা হাউজকিপার জানা আছে কিনা।

শেষ অবধি মণীশই খোঁজ নিয়ে এল। ওর অফিসের কলিগ ক্রিস্টিন তার বাচ্চা যখন ছোট ছিল ক্যাথি বলে একজনকে রেখেছিল। খুব প্রশংসা করল ক্যাথির। একবার ওর হাতে ছেড়ে দিলে নাকি বাচ্চাদের নিয়ে আর ভাবতে হয় না। ক্রিস্টিনের তিনটে বাচ্চা ছিল, একা হাতে সামলেছে ক্যাথি। এখন একটু বয়েস হয়েছে, কিন্তু একটা বাচ্চা সামলানো এমন কিছু ব্যাপার হবে না।

বিজু শুনে খুব খুশি। হ্যাঁ এবার একটা চুমু পাওয়ার মত কাজ করেছ। কিন্তু ক্যাথি কি ফ্রি আছে? যদি এত ভালো হয় তাহলে বাড়িতে বসে থাকবে না নিশ্চয়।

কিন্তু দেখা গেল ক্যাথি বাড়িতে বসেছিল। ষাট পেরিয়েছে ক্যাথির। অসুস্থ হয়ে পড়ে ছয়মাস কোনও কাজে ছিল না। এখন আবার কাজ খুঁজছিল। ক্রিস্টিনের কথার ভরসায় ক্যাথির সঙ্গে শুধু ফোনে কথা বলেই হ্যাঁ করে দিয়েছিল মণীশ। বিজুও তাড়া দিচ্ছিল। কিন্তু কেমন লোক সেটা নিয়ে তো একটু চিন্তা থাকেই। ক্যাথি যখন একটা ছোট সুটকেস হাতে বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়াল, দেখেই বিজুর যেন সব সংশয় দুর হয়ে গেল। হয় না একেকজন লোক, মুখে এমন একটা প্রশান্তি নিয়ে ঘোরে, ভরসা না করে পারা যায় না। ছোটখাট চেহারার ভদ্রমহিলা, কিন্তু শক্তসমর্থ। প্রথমেই জানতে চাইল তিয়াস কোথায়? যেন কতদিনের চেনা বাড়ি, এরকম ভাব করে তড়তড় করে সিঁড়ি বেয়ে নার্সারিতে চলে গেল। কীরকম একটা ভয় লাগল বিজুর। বড্ড বেশি সহজ হাবভাব মনে সন্দেহ জাগায়। বিজু তাই একটু ভেবে নিজেও পিছন পিছন চলে এলো। নার্সারিতে উঁকি মেরে দেখে ক্যাথি মাটিতে ধেবরে বসেছে, কোলের কাছে বসে তিয়াস কলকল করে কথা বলছে।

দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছিল বিজু। বুক থেকে একটা ভার কেমন নেমে যাচ্ছে। মনের আকাশে পটাপট বাতি জ্বলতে শুরু করে দিয়েছে। তবু সেই আকাশের এক কোণায় ঝুলে রইল কটা মেঘ। তিয়াস হওয়ার সময় বিজু এক বছরের মত চাকরি করেনি। মণীশ কি বলতে পারত না, থাক বিজু এবার তাহলে আমিই বাড়িতে বসে যাই। তুই কেন বারবার চাকরি ছাড়বি?

মনে যাই থাক, এমন দুটো কথা মুখে বলা যেত না কি?

 

.

–বিশ বছর আগেও এমন ছিল ভেবেছ? এই প্রশ্নটা ছুঁড়ে রনেনবাবু হীরককে ভাববার সুযোগ দিলেন। অথবা মঞ্চের পাকা অভিনেতার মত দর্শকদের হাততালি কুড়োবার জন্য কয়েক মুহূর্তের বিরতি। সুতো আলগা হওয়ার আগেই অবশ্য আবার টান টান। পঁয়ষট্টিতে যখন এলাম বুঝলে, আমি ল্যান্ড করেছিলাম নিউ ইয়র্কে, এত বাঙালি কোথায়? ম্যাগ্নিফায়িং গ্লাস নিয়ে ঘুরতে হত। আমাদের ধরে আর পঁচিশখানা বাঙালি ফ্যামিলি ছিল কিনা সন্দেহ। Think about it! নিউ ইয়র্কে এমন হলে তোমাদের এই ডেট্রয়েটে কজন হতে পারে আন্দাজ করো। তোমরা তো লাকি।

রনেন ব্যানার্জী নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সির বাঙালি মহলে হোমরা চোমরা ব্যাক্তি ছিলেন। কল্লোলের ফাউন্ডার মেম্বার। বিশ বছর নিউ ইয়র্কে কাটিয়ে এখন চাকরিসূত্রে বছর দশেক ডেট্রয়েট। এখনও নিউ ইয়র্কটাই বেশি আপন মনে করেন। দুই জায়গায় দুর্গাপুজো একই উইক এন্ডে হলে দ্বিধায় পড়ে যান কোথায় থাকবেন ভেবে।

–দুর্গাপূজা হত না?

এমনভাবে হীরকের দিকে তাকালেন যেন কোথাকার বোকা রে। চোখে একটা ইনক্রেডুলাস লুক। মেঘের পিছন থেকে রোদ ভাঙার মত হাসি ভেসে উঠল ঠোঁটের কোনায়। ভাবতেই পারতাম না। প্রথমে তো সবার একটা নিজের নিজের জায়গা বানাবার ছিল রে বাবা। দুর্গাপূজা করতে গেলে লোকবল লাগে। অর্থবল। কোথায় অতসব! পুজো হতে হতে সেই সাতাত্তর। বোধহয় সত্তরের পরে আমরা প্রথম বিজয়া সম্মিলনী করি বিজয়দার বেসমেন্টে। বুঝলে, শুধু তার জন্যেই একশো দুশো মাইল গাড়ি ড্রাইভ করে লোক এসে গেছিল কানেক্টিকাট, ডিসি আরও কত দূর দূর থেকে। Can you imagine?

রনেন ব্যানার্জীর কথার মধ্যে একটা চেষ্টার্জিত নাটকীয়তা আছে। পঞ্চাশ পেরিয়েছেন, ব্যাকব্রাশ করা চুলে পাক ধরেছে। কিন্তু টানটান চেহারা। গালে আভিজাত্যের চিকনাই। চোখে পুরু ফ্রেমের চশমা। পূজা উপলক্ষে গরদের পাঞ্জাবি, মোটা পাড়ের ধুতি। নিশ্চয় রোজ স্যুট-কোটেই অফিসে যান। তবু ধুতি বেশ ভালোই সামলাচ্ছেন। বোঝা যায় সব বাঙালি অনুষ্ঠানে পরে পরে চর্চাটা বজায় আছে। ব্যাকগ্রাউন্ডের ফুল, ধুপধুনো, মেয়েদের পারফিউম, বাঙালি খাবারের গন্ধের সঙ্গে একেবারে মানানসই। মৃদু ভলিউমে লাউডস্পিকারে বাংলা গান— আজ এই দিনটাকে মনের খাতায় লিখে রাখো। তার সঙ্গে তালে তালে রনেনদা চেয়ারে হেলান দিয়ে বাঁ পা ডান পায়ের উপর দিয়ে তুলে তিরতির করে নাচাচ্ছেন। একদম রিলাক্সড মুডে। নিউ ইয়র্কে পূজা অর্গানাইজ করতে অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছেন। এখানে শুধু ফিতে কাটাকাটি। আগে পুজোয় নাটক করতেন। আজকাল সময়ই হয় না। তবে আড্ডাবাজ লোক। কথা বলতে খুব ভালোবাসেন। বিদেশে প্রতিটা বাঙালিকে চেনা নিজের কর্তব্যের মধ্যে মনে করেন। নতুন মুখ দেখলে কাছে বসিয়ে খোঁজখবর নেন। রসিয়ে রসিয়ে পুরনো দিনের গল্প শোনান। মুখে বলেন গপ্পো, বঙ্গসন্তানের মার্কিনবিজয়। তবে প্রথমেই হীরকের হালহকিকত জেনে নিয়েছেন। এতদিন এসেছ এই দেশে, তোমার সঙ্গে আলাপ হল না কেন? আচ্ছা, অ্যান আরবারে আছ। এক্স্যাক্টলি কোথায় বলো তো? ওর অ্যাড্রেস জেনে বললেন, বেশ কাছেই তো। আমরা আছি নিউ পোর্ট রোডে, হুরনের ধারে। মিনিট পনেরোর ড্রাইভ হবে তোমার জন্য। চলে এসো একদিন আমাদের বাড়িতে। হীরকের দিক থেকে খুব সাড়া না পেয়ে আবার বললেন, একদম আসা চাই। মুখের কথা বলে বলছি না হে, বাঙালি নতুন কাউকে জানলেই আমার বাড়িতে একবার ডাকি। বুঝলে না, এসব হল ঋণশোধ। যখন এদেশে নতুন এলাম, চালচুলো জুতমতো হয়নি তখনও। নিউ জার্সির বিজয়দা, অমিতাভদা এদের বাড়িতে আমরা কম পার্টি করেছি!

রনেনদার এমন সাদর আমন্ত্রণে অভিভূত বোধ করছিল হীরক। এখনও ভালো করে আলাপ হয়নি, সে কেমন লোক, কী করে ওঁর জানাও নেই। কিচ্ছু না। অথচ এমন দরাজ আমন্ত্রণ। অভিবাসী জীবনের এই অবারিত দ্বার বারবার এসেছে হীরকের কাছে। সমাজের অনেকটা অংশ থেকে সে যে আলাদা, রং, হাবভাব, আচার ব্যবহারে, সংস্কৃতিতে— সেই ফাঁক এইভাবেই ভরাট হতে থাকে যেখানেই থাকুক না কেন। তবু সব ফাঁক কী বোজে! যদিও জানে আজকে সত্যি পূজার দিন না, সপ্তাহান্তে ছুটির ফাঁকে এই পূজোর আয়োজন, তবু দুর্গাপুরের পূজার কথা মনে পড়ে যায় হীরকের। এখানের পুজোর চেহারা, চালচিত্র সবই আলাদা। তবু মন্দ কী। লোকজন গিজগিজ করছে। সবাই যে বাঙালি তাও নয়। তবু চারদিকের গুনগুনের মধ্যে বাংলা শব্দ ছিটকে ছিটকে আসছে। সেসব ছাপিয়ে রনেনদা আবার গমগম করে উঠলেন। আমরা যখন এসেছিলাম, নিউ ইয়র্কে এত বাঙালি আর কোথায় ছিল। প্রথমেই কী করেছি বলো তো? বঙ্গসন্তান অন্বেষণ। কোথাও একটা বাংলা শব্দ ছিটকে এলেই লুফে নিয়ে পিছনে ধাওয়া করেছি। এইভাবেই আলাপ বিজয়দা আর রমলাবৌদির সঙ্গে, এদেশে আসেন চুয়ান্নতে। আমরা বাঙালি খুঁজে বার করতাম। খোঁজ নিতাম কে কোথায় থাকে। বুঝলে, তখন সবাই সবাইকে চিনতাম। দেশি খাবারের জন্যেও অনেক পরিশ্রম করতে হত। এখনকার প্যাটেল ব্রাদার্স তখনও শুরু হয়নি বুঝলে। এমনকি নিউ ইয়র্কেও। কালুস্তিয়ান বলে একটা মেডিটারেনিয়ান দোকান ছিল, অনেক ইন্ডিয়ান আসতে শুরু করেছে দেখে দেশি মশলা, চাল এসব রাখতে শুরু করে। সেটাই বাঁচোয়া। আজকের এই প্যাটেল ব্রাদার্স শুরু হয় আরও দশ বছর বাদে। তখন দেশি দোকান বলতে আমাদের হাতে গোনা— ক্যানাল স্ট্রিটের এবিসি স্টোর ছিল। ওখানে সব ডুয়াল ভোল্টেজ দেশিরা যেত। রনেন ব্যানার্জী তার নিউ ইয়র্কের স্মৃতি রোমন্থনে লেগে গেলেন।

–সেটা আবার কী রনেনদা? বোর লাগতে শুরু করেছিল। তবু হীরক চেষ্টা করছিল রনেনদার সঙ্গে তালে তাল দেওয়ার।

রনেনদা নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে নিলেন। তারপরে জিভ কেটে বললেন, এই রে তুমি আবার ডুয়াল ভোল্টেজ দেশি না তো? মানেটা বুঝলে না? ওই যারা ইলেক্ট্রিকাল অ্যাপ্ল্যায়েন্স কেনে যেটা ১১০ আর ২২০ ভোল্ট দুটোতেই চলে। কেন জানো তো? কারণ তারা ধরেই রেখেছে কদিন বাদেই দেশে ফিরে যাবে, তখন যাতে জিনিসগুলো ফেলে দিতে না হয়।

হীরক কি তাহলে ডুয়াল ভোল্টেজ দেশি? যদিও সে কক্ষনও এমনভাবে জিনিস কেনেনি। অ্যান আরবারে পাওয়া যায় বলে মনে হয় না। একবার তাকিয়ে দেখে নিল, আশেপাশে জিনি নেই তো। না হলে এবার থেকে হীরককেও এমনি নামেই ডাকবে। কথা ঘোরাতে বলল, তাহলে রনেনদা আপনারাই সব এই দেশের শুরুর ব্যাচ। মানে বাঙালিদের।

হা হা করে হাসলেন রনেনদা। অনেকেই তাই ভাবে। আসলে ১৯৬৮র নতুন ইমিগ্রেশন ল হওয়ার পর আমরা আসতে শুরু করেছিলাম তো। এর আগে বিজয়দাদের মত কিছু হাতে গোনা এসেছিল। তারপর টিপটিপ করে ফ্লো বাড়তে শুরু করল। তবে ভেবো না বাঙালি তার আগে আসেনি। বলে একটু রহস্যময় চোখে তাকালেন রনেনদা, মুখে মিটিমিটি হাসি। এটা কি জানো আগের শতাব্দীর শেষ থেকে বাঙালিরা এই দেশে আসছে? গল্প বলছি না, কিন্তু ওটাই সত্যি। হুগলির চুঁচড়ো থেকে চিকনদারি বাঙালি মুসলমানেরা চিকনের শাড়ি, টেবিল ক্লথ এইসব বেচতে জাহাজে করে নিউ ইয়র্কে আসা শুরু করে। তারপর শুধু নিউ ইয়র্কে নয়, অ্যামেরিকার অন্য সব শহরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ধরো এমনি প্রায় তিরিশ বছর ধরে শয়ে শয়ে বাঙালি এই দেশে একদম হুগলি নেটওয়ার্ক বানিয়ে ফেলেছিল।

রনেনদা বেশ গভীরভাবেই বাঙালি চর্চা করেন বলে মনে হল। তবে একটা সময়ের পর কিছুটা একঘেয়ে। এই দেশের বাঙালির ইতিহাস জানবার জন্যে তেমন কিছু ইন্টারেস্টও পাচ্ছিল না হীরক। চুঁচড়ো থেকে প্রথম বাঙালি এই দেশে এসেছিল জানলে জিনি খুব খুশি হবে। হয়তো বলবে, হুঁ হুঁ বাবা চুঁচড়োর বাঙালি দুর্গাপুরের মত কুয়োর ব্যাং নয়। কিন্তু হীরকের আর এইসব শুনতে ভালো লাগছিল না। উনি হয়তো ডেট্রয়েটে এসে এখনও অত জমাতে পারেননি, তাই হীরকের উপর চড়াও হয়েছেন। হীরক উসখুস করছিল ওঠার জন্য। কী অজুহাতে উঠবে বুঝতে পারছিল না। এমন সময় হীরককে অবাক করে দিয়ে স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকে এল অনিকেত।

অনিকেত? নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না হীরক। সেই অনিকেত যার পাল্লায় পড়ে ওর এই দেশে আসার প্রস্তুতি। কিন্তু ও বেচারা নিজেই শেষ পর্যন্ত আসার চেষ্টা ছেড়ে দেয়। অনিকেতের বাবা তখন খুব অসুস্থ, প্রস্টেট ক্যান্সার। বাড়ির বড় ছেলে হয়ে ওর পক্ষে দেশ ছাড়ার কথা ভাবাও সম্ভব ছিল না তখন। সেই যে হীরক চলে এল, আর একদম যোগাযোগ ছিল না। অনিকেতের কথাও মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিল একদম। এতদিন বাদে সেই অনিকেত! বেশ মোটাসোটা হয়েছে তো! গালটা একদম ভরে গেছে। মাথার চুল পাতলা। মাত্র আট বছরেই এত পরিবর্তন! চোখের চশমাটা এখনও মোটা ফ্রেমের। ওর পাওয়ার খুব বেশি ছিল মনে আছে হীরকের। ওর চোখের দিকে তাকালে গোলগোল কন্সেন্ট্রিক সার্কেল দেখা যেত অনেকগুলো। সাইড ভিশনটা একটু উইক ছিল। অনিকেতের সঙ্গে বাচ্চা কোলে মহিলা। নিশ্চয় ওর বউ।

রনেনদা ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন, আগেকার চেনা নাকি?

–কলেজের, আট বছর বাদে দেখছি।
–তাহলে যাও যাও, পাকড়াও গিয়ে। দুর্গাপূজার এটাই মজা, কত লোকের সঙ্গে যে দেখা হয়ে যায়। আমি তো এইখানেই আছি। বাকি গল্পটা বাদে শোনাব ’খন।
–অনিকেত! অনি!

অনিকেত প্রথমে বুঝতে পারেনি। তারপর হাসিটা গাল পেরিয়ে চোখে ছড়াল। হীরু তুই? World is small!

–Getting smaller by the day! পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে একটা সুখের নদী বয়ে যায় শিরায় শিরায়। তাও এত আকস্মিকভাবে।
–তুই কবে এলি এদেশে? আছিস কোথায়?
–আমি নোভাই। প্রায় এক বছর হতে চলল। গতবার পূজার পরেই এলাম, তাই না গো? পাশের ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বলল অনিকেত। আলাপ করিয়ে দিই। আমার একসময়ের প্রাণের বন্ধু, হস্টেলের ইয়ার হীরু। আমার জীবনসঙ্গিনী নিবেদিতা।
–আর বাচ্চার পরিচয় করালে না? কোলের বাচ্চা সামলে নমস্কার করার ভঙ্গিতে বলল নিবেদিতা। আমার ছেলে বুচকু মানে অনিরুদ্ধ।
–একেবারে বাপের সঙ্গে মিলিয়ে নাম।
–না না বাপের অ আর মায়ের নি। দুটোকে রুদ্ধ দ্বারের মধ্যে আটকে ফেলেছি। হা হা করে হাসল অনিকেত। কতদিন বাদে দেখা রে হীরু। কী ভালো যে লাগছে। দেখেছ তুমি কাউকে চেনো না বলে উশখুশ করছিলে, আর এতবড় একটা মোলাকাত হয়ে গেল। তোর পরিবার কোথায় হীরু?
–চল চল তোদের সঙ্গে জিনির আলাপ করিয়ে দিই। পুজোর ওখানে আছে নিশ্চয়। আমার মেয়ে তিস্তা, ওর এখন চার। ওকে যে কোথায় পাব কোনও আইডিয়া নেই।

চারদিকের হাসি-আনন্দগুলো যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল হীরকের জন্য। কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে একটা স্ফুলিঙ্গ খেলে যায় শরীরে। বিশেষত হস্টেলের। সেইসব দিনগুলো যার সাক্ষী অনিকেতও, ওকে পেয়ে কী ভালো যে লাগছে।

–তোর কথা একটু বল অনি। আমাকে উসকে তুই তো শেষ অবধি খসে পড়লি।

ম্লান হাসল অনিকেত। কী করব বল। বাবার এমন হল, বাড়িতে ছোট বোন। আমার কী আসা হয়?

–অনামিকার বিয়ে হয়ে গেছে?
–হ্যাঁ, আমি এবার ঝাড়া হাত পা। এতদিন দেশ ছাড়ার উপায় ছিল না মোটেই।
–কী করছিলি?
–আর কোথায়, টিসিএস। ব্যাঙ্গালোর। ওরাই এবার পাঠিয়ে দিল।
–তোর কী? মানে কোন ভিসা?
–এল ওয়ান।
–তাহলে তো গ্রিন কার্ড হতে খুব সুবিধা। গ্রেট, তুই এই দেশের হয়ে গেলি।
–এখনও জানি না। দেখি কদিন। তোর হয়ে গেছে?
–হ্যাঁ, সবুজ ছাপ্পা পড়ে গেছে। রসিকতা করার চেষ্টা করল হীরক।

কথা বলতে বলতে পুজোর ওখানে পৌঁছে গেছিল। হীরকের চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছিল জিনিকে। পেয়ে গেল তিস্তাকে।

–এই তিসকু, তোর মা কোথায়? খপ করে ধরল হীরক মেয়েকে।

তিস্তা বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়াচ্ছিল। এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে তারপরে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। ওই যে। মাম্মি পোসাদ মেক করছে।

জিনির সবুজ বালুচরীটা তখনই চোখে পড়ল হীরকের। বেশ আলাপ জমিয়ে নেয় জিনি সব জায়গায়। এখানে ঠাকুরের ভোগ সাজাচ্ছে। অনিকেতের আর নিবেদিতার দিকে ফিরে তাকাল। চল, মহারানির খোঁজ পাওয়া গেছে।

–জিনি! জিনি!

হাসিমুখে পাশের দুই ভদ্রমহিলার সঙ্গে আলাপে ব্যাস্ত ছিল জিনি। তিনজনে ঠাকুরের ভোগ সাজাচ্ছে। চোখ তুলে ভুরু নাচাল। কী ব্যাপার? তুমি কি অঞ্জলি দেবে নাকি?

–অঞ্জলি শুরু হবে, তাহলে তুমি কিসের ভোগ সাজাচ্ছ?
–আহা ওটা তো সপ্তমীর। লাঞ্চের পরেই তো অষ্টমীর পূজা শুরু হবে আবার। তার ব্যবস্থা চাই না? অ্যামেরিকা হ্যায় হীরকবাবু, ফাস্টফুড পুজা।

বোঝা গেল খুব ভালো মুডে আছে জিনি আজ।

–দেখো কাকে নিয়ে এসেছি। আমার বন্ধু অনিকেত, যার উস্কানিতে আমার এই দেশে আসা। আর ওর বউ নিবেদিতা। ছেলে বুচকু।

এতক্ষণ হাঁটু গেড়ে বসে ভোগ সাজাচ্ছিল জিনি। এবার তড়বড় করে উঠে দাঁড়াল। ও মা, অনিকেতদা তোমার কথা কত শুনেছি ওর মুখে। আসলে গালি দেয় কিন্তু। বলে অনিকেতের পাল্লায় পরে নিজের দেশ ছেড়ে পরের দেশে গোলাম হয়েছি। নিবেদিতা, তোমার ছেলে তো ঘুমিয়ে গেছে দেখছি। তুমি কেন কোলে করে ঘুরে বেড়াচ্ছ? বেবি সিটিং-এর ব্যবস্থা আছে। তুমি ওখানে বুচকুকে রেখে খালি হাতে এসে আমাদের হেল্প করো না।

জিনির এত আন্তরিকতায় হীরকের খুব ভালো লাগছিল। অনিকেত তার খুব ভালো বন্ধু। জিনির অপছন্দ হলে খুব কষ্ট হত। জিনির দেখানো ডিরেকশনে বাচ্চা নিয়ে চলে গেল অনিকেত। নিবেদিতা খুব খুশি হয়ে উবু হয়ে বসে পড়েছিল।

–এই শোনো, তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। সঙ্ঘমিত্রাদি, ওরা ক্যান্টনে থাকেন। কুড়ি বছর এই দেশে।
–না না আমি কুড়ি বছর নই। সে তোমাদের প্রবুদ্ধদা। আমার পনেরো।
–একই হল মিত্রাদি।

বাব্বা। জিনি একেবারে মিত্রাদিতে পৌঁছে গেছে। মনে মনে হাসল হীরক। জিনি খুব তাড়াতাড়ি জমিয়ে নিতে পারে।

–এই জানো, প্রবুদ্ধদা তোমাদের দুর্গাপুরের ছেলে। আই মিন দাদা। মিত্রাদি, প্রবুদ্ধদা কোথায়? জিনি এমনভাবে বলছে যেন এদের কতদিন চেনে। আসলে এখনও প্রবুদ্ধদার সঙ্গে দেখাও হয়নি।
–ওকে পুজোর ধারেকাছে দেখা যাবে না। এই দেখো না, সবাই সপ্তমীর অঞ্জলি দিতে ভিড় করেছে। এখন তোমার প্রবুদ্ধদাকে ত্রিসীমানায় খুঁজে পাওয়া যাবে না।
–কাকে বলছ মিত্রাদি। আমার ইনিও তো ওই দলেই। বলে বলে অঞ্জলি দেওয়াতে পারিনি কোনওদিন।
–ওমা, এটাও নকশাল নাকি?
–মানে?
–তোমাদের প্রবুদ্ধদা তো একসময়ের পাঁড় নকশাল। আমি ভাবলাম তোর কত্তাও তাই। যাও তাহলে। অঞ্জলি না দিয়ে ওই দেখো দূরে বসে আছে চেয়ার বাগিয়ে। দুই নাস্তিক পাশাপাশি বসে লেনিন-স্টালিন খেলো। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল মিত্রাদি। ওই যে দেখো, প্যান্টশার্ট পরে ওইখানে। পুজোর দিনেও ওর গায়ে একটা পাঞ্জাবি ওঠাতে পারিনি। এক নিঃশ্বাসে অনেকগুলো কথা বলে গেল মিত্রাদি দম দেওয়া পুতুলের মত। জিনি যেরকম সবার সঙ্গে সহজে জমিয়ে নিতে পারে, এরকমভাবে অচেনা লোকেদের সঙ্গে গায়ে পরে আলাপ করা হীরকের হয় না। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, না গিয়ে উপায় নেই। ভেবেছিল অনিকেতের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেবে কোথায়! এখন হয়তো কোনও খেঁকুড়ের সঙ্গে গম্ভীর মুখে বসে থাকতে হবে।
–অনিকেত ফিরে এলে ওকে ওদিকে পাঠিয়ে দিও জিনি। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল।

ভদ্রলোক অবশ্য মোটেই খারাপ নন। মিত্রাদির মতই মিশুকে। সবাই অঞ্জলি দিতে চলে গেছে। কারও সঙ্গে আড্ডা জমাবার জন্যে উসখুস করছিলেন। সাদরে পাশে বসালেন।

–প্রবুদ্ধদা, শুনলাম আপনিও দুর্গাপুরের।
–হ্যাঁ হ্যাঁ ছিলাম তো। আমি এমএমসি কোয়ার্টারে থাকতাম। বাবার চাকরি। পড়েছি দুর্গাপুর আরই কলেজেই। তুমিও ওই শহরের নাকি?
–হ্যাঁ। বেনাচিতি।
–ও, তবে তুমি আমার থেকে অনেক ছোট। আমরা যখন রাজ করেছি তুমি বোধহয় প্রাইমারি স্কুলে দাখিল হওনি।
–হ্যাঁ, সেরকমই হবে। মিত্রাদি বলছিল আপনি নাকি নকশাল করতেন।
–ছিল একটা সময়। আমরা কলেজে তখন সবাই কমবেশি নকশাল। একটু অস্বস্তি মাখানো ছিল প্রবুদ্ধদার গলায়। Very turbulent time.
–আমরাও একটু একটু আঁচ পেয়েছি। খুব ছোট ছিলাম তখন। আমাদের পাড়ার অতীনদা নকশাল করত।
–অতীন? তুমি চিনতে?
–চোখের সামনে খুন হতে দেখেছি। সেই রাতে পুলিশের চক্করে আমিও অনেক রাত অবধি রাস্তায় ছিলাম।
–ও, তাই নাকি? তাহলে একেবারে ছোট ছিলে না। হ্যাঁ হ্যাঁ সে তো হবেই। প্রবুদ্ধদার কথা কীরকম অবিন্যস্ত হয়ে গেল। ঠিক সেই সময়েই হইহই করতে করতে অনিকেত ফিরে এল।
–আমি একটু ওদিকটা দেখে আসি বুঝলে। লাঞ্চের সময় হয়ে গেছে। খিচুরি পরিবেশন করতে হবে। একদিন আমাদের বাড়ি ঘুরে যাও। মিত্রা নিশ্চয় বলবে। প্রবুদ্ধদা উঠে চলে গেলেন। হীরক অনিকেতকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

অষ্টমীর বোল উঠছিল ঢাকে।

 

[ক্রমশ]

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...