Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

প্রশান্তচন্দ্র কেন রবীন্দ্রনাথকে চাইলেন?

অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

 


প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের জন্মদিনে ইতিহাস ফিরে দেখা

 

 

 

 

কথাটা সহজ কিন্তু সহজ কথাই তো সহজভাবে বলা যায় না। ইতিহাস মতামত তৈরি করে, না কি মতামত ইতিহাস! অর্থাৎ, ইতিহাস মতামতের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজের বাঁক বদলে নেয় না কি যে-মতামত আজকে আনকোরা বলে মনে হচ্ছে সেটা আসলে কোনও এক ইতিহাসেরই দ্বন্দ্বময়তার ফসল। আমার মনে হয় ইতিহাসই রচনা করে মতামত, মানুষ কেবল সেটাকে প্রকাশ করে, কিছুটা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মতোই ইতিহাসও নিজের কার্যসিদ্ধির জন্য মানুষকে বেছে নেয়। সে-কারণেই মতামতেরও একটা ইতিহাস থাকে, ইতিহাসের নিজস্ব কোনও মতামত থাকে না, ঐতিহাসিকের অবশ্য থাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ দুজনেই বিশ্ববন্দিত কিংবদন্তি। দুজনেই ব্রাহ্ম, দুজনেই কিছু নিগড় ভাঙতে চেয়েছিলেন। দুজনের সম্পর্ক প্রায় চল্লিশ বছরের, সুতরাং সুগভীর। তাঁদের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কি মৌলিকভাবে সমাজের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছিল, না কি, ইতিহাসই নিজের রাস্তা তৈরির আয়ুধ হিসাবে তাঁদের নির্বাচন করেছিল, এই প্রশ্নটা নিয়েই আজকের আলোচনা।

সালটা ১৯২০। রবীন্দ্রনাথকে কিছুতেই সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সম্মানিত সভ্য করা যাবে না— বঙ্গদেশ নবীন-প্রবীণের বিতর্কে তোলপাড়। গণভোট অব্দি গড়িয়েছে এর মীমাংসা। এমন সময়ে ‘১৫ই মার্চ্চ, ১৯২১’ প্রশান্তচন্দ্র সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সদস্য হিসাবে ‘কেন রবীন্দ্রনাথকে চাই’ লিখলেন। এই প্রচারপত্রে প্রশান্তচন্দ্র একনিষ্ঠ যুক্তি ও তথ্য সাজিয়ে জবাব দিয়েছেন তাঁদের প্রশ্নের যাঁরা রবীন্দ্রনাথকে চাইতেন না। মনে রাখা দরকার যে, ততদিনে রবীন্দ্রনাথ নোবেল সম্মানে ভূষিত। সালটা ১৯১৩, প্রশান্তচন্দ্র সেই বছরেই পড়াশুনার জন্য রওনা দিয়েছিলেন বিলাতে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হল একক-ব্যক্তি প্রশান্তচন্দ্রের রবীন্দ্রনাথকে চাওয়ার কারণ কী ছিল, তিনিই তো প্রচারপুস্তিকার শেষভাগে লিখেছেন, “তথাপি বলিব না যে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে কোনো দোষ ত্রুটি নাই। কারণ আমাদের মাপকাঠির বিচারে তিনি নির্দ্দোষ কি না ইহাই বড় কথা নহে। তাঁহার দোষ ত্রুটি আছে স্বীকার করিয়া লইতেছি। কিন্তু তাঁহার সমস্ত দোষ ত্রুটি অপেক্ষা তিনি বড় বলিয়াই তাঁহাকে চাই।” লক্ষ করুন ‘তাঁহার দোষ ত্রুটি আছে’ লেখা হয়েছে, ‘তাঁহারও’ লেখা হয়নি। ‘তাঁহারও’ লেখা হলে বোঝা যেত কথাটা সাধারণভাবে প্রযুক্ত হয়েছে, যেমন আমাদের অনেকেই বলে থাকি যে, মানুষমাত্রই ত্রুটিপূর্ণ, ওঁরও/তাঁরও আছে। এখানে সেই অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে না, বিশেষভাবে ‘তাঁহার’ লেখা হয়েছে, একবার নয়, দু-বার। তারপরেও কোন-কোন দোষত্রুটি প্রশান্তচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দেখেছিলেন, সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু কেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে এতটা জরুরি হলেন, যে-কারণে তাঁকে সদস্যপদ দেওয়ার জন্য প্রশান্তচন্দ্র উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাসে, সেটাই তাঁকে এই পথে চালিত করেছিল।

সালটা ১৮৩৩। ওই বছর দুটি ঘটনা ঘটেছিল। রাজা রামমোহন রায়ের প্রয়াণ ও গুরুচরণ মহলানবিশের জন্ম। গুরুচরণ ছিলেন প্রশান্তচন্দ্রের পিতামহ। বাংলার নবজাগরণে এই দুজন গভীরভাবে যুক্ত। রামমোহন এদেশে প্রথম ইউরোপীয় মানবতাবাদের চিন্তা বহন করে এনেছিলেন ঠিকই কিন্তু তিনি অধ্যাত্মবাদের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেননি। উপরন্তু তখন ছিল খ্রিস্টধর্মের চাপ যে, বাঙালি-হিন্দুদের ইতিহাস বলে কিছুই নেই। ফলে খ্রিস্টধর্মকে প্রতিরোধ করারও একটা আবশ্যকতা এসে পড়েছিল। কিন্তু হিন্দু ধর্মে প্রচলিত রীতি-নীতি (পড়ুন ধর্মান্ধতা, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা) যা ছিল তা কিছুতেই খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারত না। সুতরাং, ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা আইনত রদ করাই আগেই ১৮২৮ সালে একেশ্বরবাদকে ভিত্তি করে ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলন শুরু করতে হয়েছিল। কিন্তু রামমোহনের মৃত্যু ওই আন্দোলনকে ততটা শক্তিশালী করে যেতে পারেনি। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ধর্মকে সংস্কার করার মধ্য দিয়েই বাংলার নবজাগরণের শুরু হয়েছিল। এই ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়াতেই পরবর্তীকালে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দকে আমরা পেয়েছিলাম, তাঁরা হিন্দুত্বকেই আবার খাড়া করেছিলেন। অর্থাৎ বাংলার নবজাগরণ হল ধর্ম-সংস্কারের দ্বন্দ্বময় ইতিহাসের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াজনিত অমৃতফল। ব্রাহ্মদের মধ্যে কে ছিলেন না, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয় দত্ত, শিবনাথ শাস্ত্রী, কেশবচন্দ্র সেন, রাজনারায়ণ বসু, জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, সুকুমার রায়, অমল হোম, কালিদাস নাগ, সুশোভন চন্দ্র সরকার এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ। রামমোহনের পরে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরই ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ গঠন করে ব্রাহ্মসমাজকে পুনরুজ্জীবন দিয়েছিলেন। সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বছর, ১৮৩৯, সেই বছরেই ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি অর্জন করেছিলেন। যদিও এই দুই ধারা— ব্রাহ্ম ও হিন্দু— কোনওটাই বিদ্যাসাগরকে খুব একটা প্রভাবিত করেনি। কিন্তু উল্টোদিকে বিদ্যাসাগরের প্রভাব ব্রাহ্মরা এড়িয়ে যেতে পারেনি। অক্ষয় দত্তের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের যোগাযোগ, বিদ্যাসাগরের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা সংশোধন করা, পরবর্তীকালে তত্ত্ববোধিনী ত্যাগ করে অক্ষয় দত্তের বিদ্যাসাগরের স্কুলে অধ্যক্ষ হিসাবে যুক্ত হওয়া ইত্যাদি ঘটনা ছাড়া আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এখানে ঘটেছিল যা পরবর্তীকালে প্রশান্তচন্দ্রের রবীন্দ্রনাথকে চাওয়ার ঐতিহাসিক কারণ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।

১৮৬১ সাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম। ওই বছরেই গুরুচরণ মহলানবিশকে আদি ব্রাহ্মসমাজের সদস্য হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কেশবচন্দ্র সেন। এর ঠিক ছয় বছর আগে ১৮৫৫ সালে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’য় অক্ষয় দত্ত বিধবাবিবাহ হওয়া উচিত কি না এ-বিষয়ে লেখা প্রকাশ করলেন। এই ঘটনাকে ব্রাহ্মসমাজের উচ্চতম কর্তৃপক্ষ মেনে নিতে পারেননি, তাঁরা বলেছিলেন, “পত্রিকার মধ্যে কতকগুলো নাস্তিক এসে জুটেছে। এরা থাকলে ব্রাহ্ম আদর্শ প্রচার কিছুতেই সম্ভব নয়।” আর ঠিক তিন বছর পরে, ১৮৬৪ সালে, গুরুচরণ বিয়ে করে বসলেন রুক্মিণী দেবীকে, বিক্রমপুর-নিবাসী এক হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের অকাল বিধবা যুবতী। সম্ভবত ব্রাহ্মদের মধ্যে এটাই প্রথম বিধবা বিবাহ। শুধু ধর্ম-সংস্কার নয়, প্রগতিশীলতার মাধ্যমে সমাজ-সংস্কারও যে ব্রাহ্মদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ, গুরুচরণের ছিল এমনটাই বিশ্বাস। সুতরাং, আদি ও নব্যে সংঘাত বাধল। আদি ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করে তৈরি করতে হল ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ (পরবর্তীকালে নববিধান ব্রাহ্মসমাজ)। এখন থেকেই ব্রাহ্মদের মধ্যে অবাঙালি ও অভারতীয়দের বিবাহ করার রীতি ও উত্তরাধিকার বিষয়ে চিন্তা শুরু হয়। কেশবচন্দ্র সেনের গুরুত্ব এখানে অনস্বীকার্য, সেজন্যই তিনি নীরদচন্দ্রের ছ-জন শ্রেষ্ঠ বাঙালির চতুর্থ-স্থানাধিকারী। অথচ, কে-জানত এখানেও ঘটতে চলেছে বিচ্ছেদ। গুরুচরণ মহলানবিশ ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ ও কেশবচন্দ্রকে ত্যাগ করে তৈরি করলেন সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ, যার প্রথম কোষাধ্যক্ষ হয়েছিলেন তিনিই। ২৫ বছর পরে ১৯০২ সালে যখন গুরুচরণের পুত্র ও প্রশান্তচন্দ্রের জ্যাঠা সুবোধচন্দ্র মহলানবিশ বিয়ে করলেন কেশবচন্দ্রের কন্যা মণিকাদেবীকে, তখন পুনর্বার নববিধান ও সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। বলে রাখা জরুরি যে, প্রশান্তচন্দ্রের মা ছিলেন নীরদবাসিনী দেবী, স্যার নীলরতন সরকারের বোন। স্যার নীলরতন সরকারের সঙ্গেই অংশীদারত্বে প্রশান্তচন্দ্রের বাবা প্রবোধচন্দ্র খাড়া করেছিলেন কার ও মহলানবিশ কোম্পানি। ১৯২৪ সালে এই কোম্পানির দৌলতেই প্রথমবার একদিনে রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে ২৮টি গান ও কবিতা রেকর্ড করা হয়েছিল।

অর্থাৎ গুরুচরণের প্রতিষ্ঠিত এই সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সদস্য হিসাবেই প্রশান্তচন্দ্র চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। অবশ্য উদ্যোগটা ছিল প্রথমত সুকুমার রায়ের। আর প্রশান্তচন্দ্র ছিলেন তাঁর তাতাদাদার (সুকুমার রায়ের ডাকনাম) ডানহাত। ১৯১২ ও ১৯১৩ সালে যথাক্রমে সুকুমার ও প্রশান্তচন্দ্র বিলাতে পড়তে গিয়েছিলেন। তাঁরা সেখান থেকে বিশ্বমানবতার বোধে দীক্ষিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে, ১৮৭৮ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এক-বছর পরেই ১৮৭৯ সালে শিবনাথ শাস্ত্রী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ছাত্র সমাজ’। এর সদস্য হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট ছিল তিনটি শর্ত— এক, ধূমপান চলবে না; দুই, মদ্যপান চলবে না; ও তিন, থিয়েটার দেখা যাবে না। সুকুমার ও প্রশান্তচন্দ্র চেয়েছিলেন এটাকে নতুন-করে-সাজাতে। এই তিন নেতিবাচক শর্তকে তুলে ফেলতে চেয়েছিলেন। সমাজের ‘সর্বপাপমোহমুক্ত’ অনড় দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কেননা পিতামহের উত্তরাধিকারেই তো তিনি পেয়েছিলেন অচলায়তনকে নাড়া দেওয়ার প্রেরণা। ১৯১৭ সালে তাঁরা এ-কারণে সভার আয়োজনও করেছিলেন। সুতরাং, গুরুচরণের পরে আবার স্বাভাবিকভাবেই বেধেছিল প্রাচীন বনাম নব্য সংঘাত। অপিচ ১৯১০ সাল থেকে প্রশান্তচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক। রামমোহন ও রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে হিরো। প্রশান্তচন্দ্রের কিশোর বয়সেই রবীন্দ্রনাথের প্রভাব এসে পড়েছিল। সে-সব সভায় তাই রবীন্দ্রনাথও আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রতিবাদে ‘নাইট’ ত্যাগের চিঠি যখন লেখা হচ্ছে প্রশান্তচন্দ্র স্বচক্ষে তা দেখছেন, পোস্টও করছেন।

আর এইখানেই আরও একটা ঘটনা জড়িয়ে পড়ে, তা হল নির্মলকুমারী মৈত্রের সঙ্গে প্রশান্তচন্দ্রের প্রেমের সম্পর্ক। ছাত্রসমাজকে যখন গণতান্ত্রিকতার ভিত্তিতে গোষ্ঠীমুক্ত করার প্রয়াস চলছে তখন সমাজের আরও একটা দিক নিয়ে প্রশান্তচন্দ্রের ছিল আপত্তি— তা হল সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্ট। ১৮৬৮ সালে কেশবচন্দ্রের নেতৃত্বে বিবাহ নীতি তৈরির প্রয়াস করা হয়েছিল। তিনি নিজে সিমলা গিয়ে এই আপিল করেছিলেন। স্যার মেইনি বিলের একটি খসড়াও প্রস্তুত করেছিলেন। ১৮৭১ সালে স্যার স্টিফেন সেখানে কিছু সংশোধন করেছিলেন। তারপরেও আদি ব্রাহ্মসমাজের কিছু আপত্তি সেখানে ছিল। তাঁরা এর বিরুদ্ধে পিটিশন দাখিল করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল— এক, এই বিল ধর্মকে অগ্রাহ্য করছে; দুই, সামাজিক রীতির ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োজনই নেই; ও তিন, হিন্দুত্ব থেকে ব্রাহ্মকে আলাদা করে দেবে এই বিল যা হিন্দু ধর্মের সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সব মিলিয়ে ১৮৭২ সালে স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট ৩ পাশ হয়। এতে ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ খুশি হয়নি। এইখানেই (ততদিনে ভারতবর্ষীয় ও সাধারণ সুসম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে) প্রশান্তচন্দ্রের আপত্তিটাকে মিলিয়ে দেখতে হবে। তাঁর আপত্তি— এক, এই আইনে ব্রাহ্মকে ‘হিন্দু নই’ বলতে হবে কেন; দুই, ব্রাহ্মমতে বিয়েই যখন আইনসিদ্ধ তখন তাকে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে কেন? প্রশান্তচন্দ্র তাই রেজিস্ট্রি না-করেই বিয়ে করার পক্ষে ছিলেন। পরে তিনি ‘ব্রাহ্মবিবাহবিধি’ লিখেছিলেন।

প্রশান্তচন্দ্র ও নির্মলকুমারী। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নির্মলকুমারী

কিন্তু নির্মলকুমারীর বাবা হেরম্বচন্দ্র মৈত্রের পক্ষে প্রশান্তচন্দ্রদের এইসব উদ্যোগ মেনে নেওয়া ছিল কঠিন। তাঁর প্রাচীন-ব্রাহ্মত্ব ছিল মূল বাধা। কিন্তু এক, রবীন্দ্রনাথ তো ততদিনে ঘোষণা করেছেন যে, ‘আমি ব্রাহ্ম হইলেও যেমন আমি বাঙ্গালি একথা সত্য, তেমনি আমি ব্রাহ্ম হইয়াও আমি হিন্দু এ কথা সমান সত্য।’ দুই, সম্ভবত বিয়ের রেজিস্টারির বিপক্ষেই রবীন্দ্রনাথ দাঁড়িয়েছিলেন যেমনটা রাজনারায়ণ বসু ও বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ছিলেন। তিন, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতা ও জীবনদেবতার ধারণাও প্রশান্তচন্দ্রদের পক্ষে গিয়েছিল। চার, রবীন্দ্রনাথ নাটক বিষয়ে খোলামেলা ছিলেন। অর্থাৎ, প্রশান্তচন্দ্রদের যা-যা দরকার ছিল সবটাই জুগিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে না-চেয়ে আর উপায় কী? পক্ষান্তরে, রবীন্দ্রনাথ ১৯২১ সালেই বিশ্বভারতীর যুগ্ম সম্পাদক করেছিলেন প্রশান্তচন্দ্রকে। ইত্যবসরে, ১৯১৯-২০ সালে নির্মলকুমারী গুরুতর অসুস্থ হয়েছিলেন। তখন একরাত্রে ‘লিপিকা’ কপি করে এনে প্রশান্তচন্দ্র দারোয়ানের পরোয়া না-করে সটান হেরম্বচন্দ্রের গৃহে প্রবেশ করে নির্মলকুমারীকে সেটা পাঠ করে শোনাতে শুরু করেছিলেন। এ-সব দেখে পরে হেরম্বচন্দ্র বিয়ের পক্ষে মত দিলেও, সস্ত্রীক নিজে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাননি। দিনেন্দ্রনাথ, সুপ্রভা দেবী ও সাহানা দেবীর উপস্থিতিতে ১৯২৩ সালে সেই বিয়ে হয়েছিল। রাত্রি দশটার পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অডিটোরিয়াম থেকে ‘বসন্ত’ উপস্থাপন শেষ করে সদলে রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত হয়েছিলেন বিয়েতে ও পাণ্ডুলিপিটি উপহার দিয়েছিলেন।

সুকুমার রায় ততদিনে গুরুতর অসুস্থ। ১৯২৩-এ ঘটবে তাঁর মৃত্যু। প্রশান্তচন্দ্র কেমব্রিজে গবেষণার কথা ভুলে ‘বায়োমেট্রিকা’ সঙ্গে করে এনে ভারতে স্ট্যাটিসটিক্সকে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা সবে শুরু করেছেন। এইখানে প্রশান্তচন্দ্রের দিক থেকে অবস্থাটা ভেবে দেখা প্রয়োজনীয়। অর্থাৎ, তাঁর তাতাদাদা অসুস্থ, সাধারণ ব্রাহ্ম ও ছাত্রসমাজের আমূল সংস্কারের স্বপ্ন অধরা, এমনকি নির্মলকুমারী ভয়াবহ-অসুস্থ ও তাঁর সঙ্গে বিয়ে প্রায় অনিশ্চিত, নিজের কেরিয়ার নিয়েও তিনি সংশয়াবদ্ধ। সব মিলিয়ে, চারপাশের যুদ্ধে তিনি প্রায় একা। প্রশান্তচন্দ্রের উপর রবীন্দ্রনাথের প্রভাবের কথা বাদ দিলেও, এমতাবস্থায় রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া প্রশান্তচন্দ্র আর কাকেই বা পাশে পেতে পারতেন, আর কাকেই বা চাইতে পারতেন! নিজের কাছে তিনি অনন্যোপায় ছিলেন। ফলে ১৯২১ সালেই তাঁকে লিখতে হয়েছিল ‘কেন রবীন্দ্রনাথকে চাই’।

এইখানে বলা জরুরি যে, মনে হয়, এটা লিখে জাস্টিফিকেশন দেওয়া ছাড়া তাঁর উপায়ও ছিল না। কেননা ‘কেন রবীন্দ্রনাথকে চাই না’-র পক্ষে যাঁরা (প্রায় ২৫০-এর উপর ভোট পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষে, সংখ্যাটা নেহাত মন্দ কি!) ছিলেন তাঁদের দাবি একশো শতাংশ নস্যাৎ করার মতো ছিল না। অতীতে রবীন্দ্রনাথের এমন অনেক অবস্থান ছিল যাকে সত্যই খুব একটা উঁচু চোখে দেখা সম্ভব ছিল না। একটা উদাহরণ দেওয়া যেতেই পারে। এ-কথা তো অস্বীকার করা যায় না যে, রবীন্দ্রনাথ বাল্যবিবাহ দিয়েছিলেন এবং পণও দিয়েছিলেন। সাধারণদের পক্ষে এটা মেনে নেওয়া একপ্রকার অসম্ভব ছিল। যদিও প্রশান্তচন্দ্র লিখেছিলেন যে, “বাল্যবিবাহ সম্বন্ধে তিনি (রবীন্দ্রনাথ) যে প্রবন্ধটি পড়িয়াছিলেন তাহা ৩৫ বৎসর পূর্ব্বে। বর্ত্তমান রবীন্দ্রনাথকেই অনারারি সভ্য নির্ব্বাচন করিবার প্রস্তাব হইয়াছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁহার কোন কন্যার বিবাহ বাল্যাবস্থায় দিয়াছিলেন— সেও আজ ২২ বৎসরের কথা। তখন মহর্ষি জীবিত ছিলেন, বিবাহ প্রভৃতি পারিবারিক ঘটনায় তাঁহার কতখানি হাত ছিল, তাহা সকলেই জানেন, সে সময়কার পারিবারিক কথা লইয়া আলোচনায় প্রবৃত্ত হইব না।” কিন্তু কেন ‘হইবেন না’, সেগুলি অস্বস্তিদায়ক সত্য কথা বলেই কি!

এ-কথা সত্য যে মহর্ষির মৃত্যুর আগে ও পরে রবীন্দ্রনাথের দুই রূপ দেখতে পাওয়া যায়। মহর্ষির মৃত্যু যেন রবীন্দ্রনাথকে কিছুটা স্বাধীনতা দিয়েছিল। মহর্ষির চলে যাওয়ার পরে পুত্রের বিধবাবিবাহও দেওয়া তো তারই একটি দৃষ্টান্ত। কিন্তু কেন রবীন্দ্রনাথের মতো মানুষ তখন পিতাকে (নজরটান, দ্বারকানাথের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ কি আদৌ এতটাই গোঁড়া ছিলেন, ভেবে দেখা জরুরি) অগ্রাহ্য করতে পারলেন না? তাঁর নিজস্ব রোজগার ছিল না বলেই কি, সাহিত্যিক হিসাবে অপ্রতিষ্ঠা কি, বাড়ির সবচেয়ে দুর্বল সদস্য হওয়ার হীনমন্যতা কি, কাদম্বরীর মৃত্যুর আঘাতে কিছুটা একলা হয়ে পড়া কি, না কি নিজের সংস্কারের বাধাও এখানে কাজ করেছিল? রবীন্দ্রনাথের হিরো রামমোহন তো পিতাকে অগ্রাহ্য করতে পেরেছিলেন, কেশবচন্দ্র সেন, শিবনাথ শাস্ত্রী পেরেছিলেন, এমনকি বহু সাধারণ হিন্দু যারা ব্রাহ্ম হয়েছিল তারাও অনেকক্ষেত্রেই পিতাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের মতো পথিকৃৎ পারলেন না কেন? উল্টোদিকে তিনি তো আবার ১৯১১ সালে তত্ত্ববোধিনী সভার পুনরুজ্জীবনও ঘটাতে চেয়েছিলেন। তাহলে কি নোবেলপ্রাপ্তির পরেই রবীন্দ্রনাথের যে আরও এক নতুন রূপ (যেখানে তিনি সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের অন্তর্গত হয়ে তার সংস্কার ঘটাতে চেয়েছিলেন, যে-কারণে প্রশান্তচন্দ্ররা যখন সভা-প্রচারপত্র ইত্যাদি করছেন আর অন্যদিকে অনেক সভ্য আপত্তিও জানাচ্ছেন, তখনও রবীন্দ্রনাথ নিজের তরফে সাম্মানিক সদস্যপদ না-চাওয়া নিয়ে কিছুই বলছেন না। নীরবে পদটির প্রার্থী হচ্ছেন ও পরে গ্রহণও করছেন)। দেখা গিয়েছিল তারই প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ অনেকখানি প্রগতিশীল (না কি বেপরোয়া!) হতে পেরেছিলেন যেটা প্রশান্তচন্দ্রকে আকৃষ্ট করেছিল, অতীতকে উপেক্ষা করতে শিখিয়েছিল। ‘অনেকখানি’ বললাম এই কারণে যে, পঞ্চাশ বছর যে-জীবন তিনি যাপন করেছিলেন, সম্ভবত এক-লহমায় তাকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে পারেননি, সেটা যে-কোনও রক্ত-মাংসের মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভবও বটে, রবীন্দ্রনাথ হলেও তাইই প্রযোজ্য। সে-কারণেই বন্দেমাতরমসহ নানা ক্ষেত্রে ১৯৩৮ অব্দি প্রায় রবীন্দ্রনাথের নানান সংস্কারবদ্ধতার পরিচয় ইতস্তত মেলে। আর তাইই বোধহয় প্রশান্তচন্দ্র বাধ্য হয়ে রবীন্দ্রনাথের দোষত্রুটি যে ছিল তাকে স্বীকারও করেই, নিজের জীবনযুদ্ধে যাঁকে বটবৃক্ষের মতো পেয়েছিলেন তাঁর পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথকেই তাই তিনি চেয়েছিলেন ও বাকিদেরও সম্মতি আদায় করেছিলেন।

তাছাড়া রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া কি আজও আমাদেরও চলবে? আমি নিজে রাশিবিজ্ঞানের ছাত্র। স্ট্যাটিস্টিক্সের পারিভাষিক শব্দ যে রাশিবিদ্যা বা রাশিবিজ্ঞান এও তো রবীন্দ্রনাথেরই সৃষ্টি। এমনকি ১৯৩০-এর শুরুর দিকে যখন প্রশান্তচন্দ্রের চাকরিতে বদলির অর্ডার আসে, যা তাঁকে কলকাতা ত্যাগ করতে বাধ্য করছিল। কিন্তু তিনি কিছুতেই কলকাতা ছাড়ার পক্ষপাতি ছিলেন না। তখনও তো রবীন্দ্রনাথই ছিলেন তাঁর পাশে। সে-দিন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রশান্তচন্দ্রের বাগানবাড়িতে। প্রশান্তচন্দ্র এসে জানালেন যে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে রাশিবিদ্যা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে চান। তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন। শুভেন্দু শেখর বসু ও সুধীর কুমার ব্যানার্জিও প্রশান্তচন্দ্রকে সমর্থন করেছিলেন। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইন্সটিটিউট। তারপরে বাকি ইতিহাস তো সকলেরই জানা।

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসকাল ইন্সটিটিউটে পণ্ডিত নেহেরু ও ডা. বিধান চন্দ্র রায়ের সঙ্গে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ

পুনশ্চ ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘সংখ্যা’। ১৯৩৫ সালের ‘সংখ্যা’তে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন,

“সঙ্গীতে স্বাভাবিকভাবেই ছন্দের জাদু অনুভূত হয়, এই ছন্দ নোট ও গ্রুপের মধ্যে সহজাত। আর এটাই হল গণিতের জাদু, যার ছন্দ সমস্ত সৃষ্টির হৃদয়ে নিহিত আছে। পরমাণুর মধ্যে যেমন তা ছড়িয়ে আছে, তেমনই স্বর্ণ-সীসায়, গোলাপে ও তার কণ্টকে, সূর্যে ও তার গ্রহাদিতে, মানবেতিহাসের স্থবিরতা ও জঙ্গমতায়ও এটা আছে। স্থান ও কালের রঙ্গভূমিতে সংখ্যার নৃত্যকলা হল এটাই যা মায়ার জাল বুনন করেছে, পরিবর্তনের অবিরাম ধারায় যা ছিল ও যা ছিল না। আমরা যাকে মননগত সত্য বলে জানি, সেটাও কি সেই বাস্তবিকতার ছন্দ নয় যা মানুষের প্রত্যয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তাকে এই আশ্বাস প্রদান করেছে যে সে যেটা জানে তাইই সত্য? আমরা যে-কোনো বাস্তবিকতাকেই এই সঙ্গতির কারণে সত্য বলে মনে করে থাকি, এটাই হল যুক্তির ছন্দ, এমন একটা প্রক্রিয়া যা গণিতের তর্কের সাহায্যে সহজেই বিশ্লেষিত হয়ে থাকে।”

প্রশান্তচন্দ্রের জন্মদিন কি তাই রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া পালন করা যায়?

 

গ্রন্থঋণ:

ব্যক্তিঋণ:


*মতামত ব্যক্তিগত