Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আলোর পথযাত্রী শ্যামলী খাস্তগীর (২৩ জুন ১৯৪০-১৫ আগস্ট ২০১১)

আলোর পথযাত্রী শ্যামলী খাস্তগীর (২৩ জুন ১৯৪০-১৫ আগস্ট ২০১১) | প্রদীপ দত্ত

প্রদীপ দত্ত

 

১৯৮২ সালের ৬ আগস্ট বেশ কিছু বিজ্ঞানকর্মী, অধ্যাপক ও সমাজকর্মীর উদ্যোগে কলকাতায় এক বড়সড় পরমাণু অস্ত্রবিরোধী মিছিল ও সমাবেশ হয়েছিল। বৃষ্টি মাথায় করে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ভবন থেকে সকলে মিলে গিয়েছিলাম শহিদ মিনারে। ঠিক ছিল সেখানে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানের দল (তিনি ছাড়া বাকিরা) গান গাইবে। মাঝপথে সবাই অঝোর বৃষ্টিতে ভিজে মিছিল শেষ হল শহিদ মিনারে। শিল্পীরা এলেও বৃষ্টির জন্য খোলা আকাশের নিচে গানের অনুষ্ঠান পণ্ড হল। কীভাবে যেন খবর পেয়ে শান্তিনিকেতন থেকে শ্যামলীদি এসেছিলেন, সঙ্গে আনা ইংরেজিতে লেখা লিফলেট ও পুস্তিকা বিলিয়েছিলেন।

সে বছর থেকেই কলকাতায় আমাদের ‘হিরোশিমা দিবস’ উদযাপন শুরু হয়। শ্যামলীদি আসতেন, নানা জায়গায় এ বিষয়ে বলতে যেতেন। পরে তাঁর উদ্যোগে শান্তিনিকেতনে ওই দিবস পালন শুরু হয়। আদতে তিনি যে চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর সে কথা পরে জেনেছি। ১৯৫০ সালে এলাহাবাদে বাবার (প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর সুধীর খাস্তগীর[1]) আঁকা ছবির সঙ্গে তাঁর ন-দশ বছর বয়সে আঁকা সাত-আটটি ছবিরও প্রদর্শনী হয়েছিল। উত্তর আমেরিকায় ও এদেশে পরমাণু-বিরোধী আন্দোলন এবং অন্য সামাজিক আন্দোলন ও অন্যের সেবার কাজে বেশি বেশি জড়িয়ে পড়ে শিল্পচর্চা অবহেলিত হয়েছে। তবে একসময় কলকাতার অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস ও বিড়লা অ্যাকাডেমি ফর আর্ট অ্যান্ড কালচারেও তাঁর শিল্পকর্মের প্রদর্শনী হয়েছে।

শান্তিনিকেতনে লেখাপড়া শিল্পশিক্ষা শেষে ১৯৬২ সালে ভালবেসে বিয়ে করেন প্রযুক্তিবিদ তান লি-কে। বিয়ের পর স্বামীর চাকরিসূত্রে তাঁর সঙ্গে চলে গিয়েছিলেন উত্তর আমেরিকায়। তখন নিজের নাম লিখতেন তান শ্যামলী খাস্তগীর। এদেশে ফিরে এসে আমার সঙ্গে পরিচয়ের পরও দু-এক বছর সেই নামেই জানতাম।

১৯৭৪ সালে অসুস্থ বাবাকে দেখতে কানাডা থেকে শান্তিনিকেতনে আসার কয়েকদিন পর বাবা মারা যান। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি ছেলেকে নিয়ে তাঁকে কানাডা থেকে শান্তিনিকেতনে ফিরে আসতে বলেছিলেন। তাঁদের বৈভবপূর্ণ জীবনে নাতির শিক্ষাদীক্ষা নিয়েও বাবা চিন্তিত ছিলেন। তাঁর কথাবার্তা, সাজপোশাক দেখে তিনি বুঝেছিলেন মেয়ে গড্ডলিকাপ্রবাহে ভেসে চলেছে। অবশ্য ততদিনে শ্যামলীদি বুঝতে শুরু করেছেন গলফ খেলা, ক্রেডিট কার্ডে জিনিসপত্র কেনার ভোগবিলাসী জীবন তাঁকে গ্রাস করেছে। কিছুদিন পর নিজের সংসারকে মনে হল সোনার খাঁচা। ঠিক করলেন তার বাইরে বেরোতে হবে, জীবনের সেই বিভ্রান্তির কালকে ছেড়ে এসে মানুষের মতো বাঁচতে হবে।

বাবার মৃত্যুর পর সে বছরই (১৯৭৪ সাল) ঘটেছিল ভারতের প্রথম পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ। জেঠামশাই ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক। তাঁর কাছে শুনেছিলেন, এক প্রিয় ছাত্রের শিশুপুত্রের জন্ম থেকেই মেরুদণ্ড ছিল না, সে বসতেও পারত না। তার মা পারমাণবিক গবেষণার কাজে যুক্ত ছিলেন। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ চোখে দেখা যায় না, স্বাদ গন্ধ কিছুই নেই, তাই বিকিরণ পরিমাপের ব্যাপারে ঢিলেমি ছিল, সাবধানতা সতর্কতা সেখানে যথেষ্ট ছিল না। জেঠামশাইয়ের সেই ছাত্রের ধারণা, তাঁর স্ত্রী গর্ভাবস্থায় তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার হয়েছিলেন। ভারতের পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর সেই কথা মনে পড়ায় ওই বিষ্ফোরণের ফল কত বিষময় হতে পারে ভেবে আকুল হলেন।

আমেরিকার পারমাণবিক যুদ্ধসজ্জার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নিয়ে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে  কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে হাজতবাস করেছেন, একবার কয়েক মাসের জন্য। একবার ছেলে শিশু আনন্দ-সহ। মার্কিন প্রশাসন তাকে কয়েকবার ডিপোর্ট করেছে। পরে আনন্দের মুখে শুনেছি, কানাডার ভ্যাঙ্কুভার থেকে উত্তর আমেরিকায় আসতেন পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নিতে। গ্রেফতার বরণে কেউ কেউ অনিচ্ছুক থাকলেও শ্যামলীদি থাকতেন একেবারে সামনে। সেইরকম এক সমাবেশে সংগঠকরা বুঝে নিতে চাইছিলেন কজন প্রতিবাদী গ্রেপ্তার বরণে রাজি আছেন। শ্যামলীদি প্রথমেই আনন্দের হাত ধরে এগিয়ে গেলেন। তাই দেখে আর এক মার্কিন মহিলাও এগিয়ে এসেছিলেন।

১৯৮২ সালে তাঁর ডাকে শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায় গেলাম, আমি আর জ্যোতি (ডাক্তার জ্যোতির্ময় সমাজদার)। তাঁর আঁকা যুদ্ধবিরোধী ছবি ও পোস্টার দিয়ে সাজানো স্টলে আমরা বিলি করার জন্য লিফলেট নিয়ে বসেছিলাম। সেবার তাঁর বাড়িতে (বাড়ির নাম ‘পলাশ’) পোড়ামাটির লালচে পাত্রে খিচুড়ি আর লাবরা খেয়ে আমরা তো মুগ্ধ, যেমন রান্না তেমনি পাত্র। তারপর এমনই ভাব হল যে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় পৌঁছে তিনি যে কলকাতায় এসেছেন সে কথা জানাতে স্টেশন থেকে সরাসরি আমার অফিসে চলে আসতেন। পরনে ঘিয়ে কিংবা খয়েরি রঙা ইস্ত্রি না করা খাদির মোটা কাপড়ের শাড়ি, চুলও পরিপাটি নয়। কাঁধে থাকত জামাকাপড় ও বইপত্রের একাধিক ব্যাগ এবং একটি ছোট স্লাইড প্রজেক্টর। তিনি নানা জায়গায় এ বিষয়ে বলতে যেতেন। সুযোগ পেলেই হিরোশিমায় ধ্বংস, মৃত্যু ও তেজস্ক্রিয়তার ভয়াবহতা বোঝাতে স্লাইড দেখাতেন। পরে যোগ হয়েছিল পরমাণু বিদ্যুতের উজ্জ্বল ছবির আড়ালে তেজস্ক্রিয় বিকিরণে মানুষের কী ভয়াবহ পরিণতি ঘটে তার স্লাইড, ভারতের রাওয়াতভাতা পরমাণু চুল্লির পাশের গ্রাম বারদুনিতে তেজস্ক্রিয়তার শিকার অসুস্থ মানুষের ছবির স্লাইড। আরও পরে জাদুগোড়ায় ইউরেনিয়াম খননের প্রভাবে আক্রান্ত অসহায় মানুষের ছবি ও ভিডিও।

আশির দশকের গোড়ায় তাঁর এবং অন্য দুই ডাক্তারবন্ধুর প্রভাবে আমার মনে পরমাণু অস্ত্র ও শক্তিবিরোধী মনোভাব গেড়ে বসেছিল। ১৯৮২ সাল থেকে বেশ কয়েক বছর কলকাতায় আমরা হিরোশিমা দিবস পালন শুরু করি। পরে তাঁর উদ্যোগে শান্তিনিকেতনে ওই দিবস পালনও শুরু হয়।

তখন ফোনের এত চল ছিল না। তাঁর বা আমাদের বাড়িতে ফোনও ছিল না। যোগাযোগের উপায় ছিল চিঠি লেখা, নয়তো সশরীরে হাজির হওয়া। বিদেশে গেলে সেখান থেকে পোস্টকার্ড পাঠাতেন, এক পিঠে ছবি, অন্য পিঠের অর্ধাংশে হাতে লেখা কিছু কথা। চিঠি পেয়ে বুঝতাম তিনি শান্তিনিকেতনে নেই। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে আচমকা বাড়িতে হানা দিতেন। খুশি হলেও অবাক হয়ে ভাবতাম, কী করে পৌঁছলেন! কারণ, যেখানেই ছিলাম— কি কেষ্টপুর, কি যাদবপুর, যিনি আগে কখনও আসেননি তাঁর পক্ষে আমার বাসায় পৌঁছনো সোজা কথা ছিল না।

বিরাশি-তিরাশি সালে আমি ‘উৎস মানুষ’-এ আছি জেনে তিনি একটি লেখা দিলেন ছাপার জন্য। মুশকিল হল তাঁর লেখা ভাল এবং মনের কথা হলেও বিষয় ওই পত্রিকায় ছাপার মতো নয়। পরে সে কথা তাঁকে বলাতে তিনি অন্য কোথাও ছাপার জন্য দিয়ে দিতে বললেন। কিছুদিন পর ভাবলাম তা তুষার কাঞ্জিলাল সম্পাদিত ‘কম্পাস’ পত্রিকায় ছাপতে দিই। কিন্তু লেখাটি আর খুঁজে পেলাম না। তখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নানা সাংগঠনিক কাজে ছুটে বেড়াতাম। প্রতিদিন ঘরে কাগজপত্র ডাঁই হয়ে জমা হত, পড়া বা কাগজপত্র বাছাই করার সময়ই হত না। কিছুতেই লেখাটি খুঁজে পেলাম না। অপরাধবোধ হল, কিন্তু লজ্জায় তা নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করিনি, তিনিও জিজ্ঞেস করেননি।

১৯৮৮ সালে তামিলনাড়ুর ডিন্ডিগুলে মেডিকো ফ্রেন্ড সার্কেলের মিটিং-এ ঠিক হল, রাওয়াতভাতা পরমাণু চুল্লিসংলগ্ন এলাকায় মানুষের বিচিত্র অসুখ এবং ক্যান্সার নিয়ে সমীক্ষা চালানো হবে। মিটিংয়ে শ্যামলীদি উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু খবর পেয়ে সমীক্ষার সময় তিনি গেলেন, সেখান থেকে অসুস্থ মানুষের ছবি ও স্লাইড তুলে আনলেন।

১৯৮৯ সালে কলকাতার গোখেল রোডে ইনস্টিটিউশন অফ ইঞ্জিনিয়ার্স-এর হলে পরমাণু শক্তির গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে সারাদিনের কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের পরমাণু শক্তি সংস্থার (ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যাটমিক এনার্জি বা ডিএই) তিনজন কর্তাব্যক্তি বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে পরমাণু বিদ্যুতের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বিকাশ সিংহ ভবিষ্যতে পরমাণু বিদ্যুৎ উপায় কোল্ড ফিউশন নিয়ে বক্তব্য রাখার পর সভা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, শ্যামলীদি ও আরতিদি (ডাক্তার আরতী বসু সেনগুপ্ত) তাঁর পিছু ধাওয়া করলেন। এ কী কথা, আমাদের বক্তব্য শুনুন, প্রশ্নের উত্তর দিন! বিকাশবাবু কোনওক্রমে পালিয়ে বেঁচেছিলেন। কনভেনশনের কয়েক মাস পর থেকে প্রকাশ শুরু হয় ‘সেফ এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ ত্রৈমাসিক, ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তা চলেছিল। শ্যামলীদি বেশ কয়েক কপি নিয়ে বিক্রি করতেন, পত্রিকার সদস্যও করতেন।

একদিন সন্ধ্যায় বাড়িতে এসে বললেন, জাদুগোড়া যাবে নাকি, আমি যাচ্ছি। গুজরাটের ভেদচি থেকে প্রকাশিত ‘অনুমুক্তি’ পত্রিকার ডঃ সুরেন্দ্র আর তাঁর স্ত্রী ডাক্তার সংঘমিত্রা গাদেকার সহ কয়েকজন সেই সময় ইউরেনিয়াম খননের জন্য আশপাশের গ্রামগুলিতে মানুষের স্বাস্থ্যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কুপ্রভাব নিয়ে সমীক্ষার করার জন্য জাদুগোড়ায় এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে দিন পনেরো সেখানে থেকে শ্যামলীদি আক্রান্ত মানুষের ছবি তুলে এনেছিলেন।

কয়েক বছর পর হিরোশিমা দিবস উপলক্ষে জাদুগোড়া ও সংলগ্ন এলাকার ইউরেনিয়াম খননের প্রভাবে গুরুতর অসুস্থ ও বিকলাঙ্গ ছেলেমেয়েকে একত্রিত করে খননের বিরুদ্ধে প্রতিবাদসভার আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি সেই ছেলেমেয়েদের ছবি তুলে আনেন। সেখানকার মানুষের দুর্দশার কথা অন্যকে বলার সময় সেই ছবি দেখাতেন। সেই ছেলেমেয়েদের স্বস্তি ও আনন্দ দিতে পারে এমন কিছু ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য  নানা মহলে আবেদন করেছেন, কিছু যদি করা যায়। কেউ এগিয়ে আসেননি।

বিশ্বভারতীর এক ভাল ছাত্র, যিনি আজ সেখানকার অধ্যাপক, লাগাতার অসুখে ভুগছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন জিওলজিস্ট। তাঁদের বাড়িতে কিছু কালচে পাথর রাখা ছিল। শ্যামলীদির সন্দেহ হল পাথরগুলো ইউরেনিয়ামের আকর নয়তো? ছেলেটি তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয়নি তো? তিনি চাইছিলেন গাইগার মূলার যন্ত্র দিয়ে পাথরগুলোকে যাচাই করে দেখা হোক। আমার বন্ধু সঞ্জয় বিশ্বাস সেই যন্ত্র নিয়ে সেখানে গিয়ে মেপে নিশ্চিন্ত করলেন তা তেজস্ক্রিয় নয়। কলকাতায় ফিরে সে তাঁর এমনই বন্দনা করল যা বলার নয়। আতিথেয়তা, রান্নাবান্না, বোলপুরের রিক্সাওয়ালাদের তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা-ভালবাসা— সব মিলিয়ে সে অভিভূত।

তাঁর ‘পলাশ’ বাড়িতে দেখার জিনিসের অভাব ছিল না। একতলা স্টুডিওবাড়ির বারান্দা পেরিয়ে ঘরে ঢোকার দরজার মুখোমুখি ছিল বাবার আঁকা বিরাট উঁচু ও চওড়া ফ্রেমে বাঁধানো গান্ধিজির ছবি। পঞ্চাশ-ষাট ফুট লম্বা স্টুডিও ঘরের বাঙ্কের উপর হেলায় রাখা অজস্র ভাস্কর্য, ছবি, নানা ধরনের বই। ১৯৬১ সালে লখনৌর বন্যায় বহু ছবি ও ভাস্কর্য নষ্ট হওয়ার পরও পরে তৈরি সংলগ্ন দোতলা বাড়িতে না-বাঁধানো ছবির পাহাড় রেখে গিয়েছিলেন।

সেই পাহাড় আমি দেখেছি। একবার তাঁর বাড়িতে কারা যেন এসেছিলেন, আমরা সেই বাড়ির দোতলায় ঘুমোতে যেতাম। সেখানে টাল দিয়ে রাখা ছিল বড় বড় ছবির পাহাড়, ফ্রেমে বাঁধানো ছিল না। শিল্পবোদ্ধা নই, ঘেঁটে দেখা ঠিক হবে না ভেবে ছবির টালের দিকে অবাক চোখে চেয়ে বসেছিলাম। একতলা আর দোতলায় আঁকা ও গড়া ছবি ও মূর্তিতে ঠাসা। অনেক পরে শুনেছিলাম বেশ কিছু ছবি চুরি গিয়েছে, তবে পুলিশে অভিযোগ করেননি। চোর বলে যাকে সন্দেহ করতেন বোলপুরের সেই মধ্যবয়সি পুরুষ তাঁর পরম বন্ধু ও হিতাকাঙ্ক্ষী সেজে এসেছিলেন। আমার সঙ্গেও তাঁর ভালই পরিচয় ছিল, কারণ আমি সেখানে কয়েকবার গেলে তিনিও কথা বলতে এসেছিলেন।

বাড়ি ঘিরে ছিল অজস্র গাছপালা আর গোখরো সাপ মারা দেশি কুকুর ‘মহারাজ’। শ্যামলীদি বলতেন, ‘একটু বেরিয়েছিলাম, ঢুকে দেখি বারান্দায় একটা বড় গোখরো সাপ মরে পড়ে আছে, কাছেই বসে রয়েছে মহারাজ।’ এছাড়া ছিল তাঁর প্রাইভেট রিকশা আর তার চালক শ্যামসুন্দর। শ্যামলীদির উৎসাহেই তিনি বাগানবাড়ির গেটের কাছে এক বড় গাছের গোড়ায় মাটির চওড়া বেদী বানিয়ে মাটি দিয়ে নকশা এঁকেছিলেন।

শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে তিনি মিতব্যয়ী ও মাটির কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। সহজ সাদামাটা জীবন ছিল তাঁর। সংলগ্ন বাড়ির একতলায় দীর্ঘদিন বাস করেছেন বিশ্বভারতীর জাপানি ভাষার অধ্যাপক মাকিনো, তাঁর মেয়ে-বউ সহ। ভাড়া নয়, নিখরচায় তাঁদের থাকতে দিয়েছেন। অতিরিক্ত থাকার জায়গা রয়েছে, ভাল মানুষেরা থাকবেন, ভাড়া কীসের! সকাল পেরোলে মাকিনো সাইকেলে চেপে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস নিতে বেরোতেন। পান্নালাল দাশগুপ্ত ও শ্যামলীদির উৎসাহে এবং তাঁর ব্যাবস্থাপনাতে এদেশে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে নিয়ে এসেছিলেন প্রাকৃতিক চাষে জগৎখ্যাত এবং দার্শনিক মাসানোবু ফুকুওকাকে।

আমার দুই স্কুলে পড়া ভাগ্নি কখনও শান্তিনিকেতনে যায়নি, তাদের শখ হল শ্যামলীমাসির কাছে যাবে।  বিশ্বভারতীর গেস্টহাউসে থাকার ব্যবস্থা হল। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত থাকি পলাশবাড়িতে, রাতে ঘুমোতে যাই গেস্ট হাউসে। কোনওদিন তাঁর বাড়িতে মাছ-মাংস রান্না হতে দেখিনি, এবার ছোটদের কথা ভেবে মুরগির মাংস রান্না হল। সবাই মিলে দুবেলা গান-গল্প হত। মিসেস মাকিনো ও তাঁর মেয়েও আসতেন। শ্যামলীদি সবেতেই অংশ নিতেন, আবার একা হাতেই যাবতীয় রান্নার কাজ করতেন। সব্জি কাটতেও কাউকে হাত লাগাতে দিতেন না, চা বানাতেও না। রাতে শ্যামলীদির কথা আলোচনা করতে করতে গেস্ট হাউসে ফিরতাম।

যাঁরা তাঁর হাতের রান্না খেয়েছেন তাঁরা সাক্ষী, রান্নার হাত ছিল অসাধারণ ও অভিনব। একদিন দুপুরে ভাত দিয়ে শাক মেখে খেতে খুবই ভাল লেগেছে, বুঝলাম না কী শাক। বললেন, সকালে কুলেখারার রস খেলাম, শাকটা ফেলে না দিয়ে রেঁধে ফেললাম, খারাপ হয়েছে? আমি তো অবাক। নানা সব্জির চোকলা বেটে নুন, কারিপাতা, গন্ধলেবুর রস সহযোগে যখন চাটনির মতো পরিবেশন করতেন, স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। কে বলবে সব্জির চোকলা আবর্জনার বাক্সে ফেলে না দিয়ে তা দিয়ে তৈরি! লেমনগ্রাসের চা-ও তাঁর হাতেই প্রথম খেয়েছি।

একবার তাঁর বাড়িতে যাওয়া উপলক্ষে পরমাণু শক্তি নিয়ে প্রশ্ন ও আলোচনার জন্য চায়ের আসরে বিশ্বভারতীর কয়েকজন অধ্যাপক এবং আরও কয়েকজনকে ডেকে বসলেন। একদিন কথাপ্রসঙ্গে বললেন, তোমাকে উমাদির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে হবে। কে এবং কেন উমাদি জানতাম না, আলাপের সুযোগ হয়নি। পরে জেনেছি উমাদি হলেন শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী, কলকাতায় ‘পাঠভবন’ স্কুল গড়ে তোলার কারিগর, চিন্মোহন সেহানবিশের স্ত্রী। মনে হত যাকেই পছন্দ করতেন ভাবতেন তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ হওয়া প্রয়োজন। কাউকে বাড়িতে খেতে ডেকে আলাপ করিয়েছেন, বাড়ি নিয়ে গিয়েও বিশিষ্ট মানুষের সঙ্গে আলাপ করিয়েছেন! সব সময় তার কারণ বুঝতাম না। মাঝেমধ্যে গাড়ি ভাড়া করে নানা জায়গায় নিয়ে যেতেন। কখনও পান্নাবাবুর প্রেরণায় বন্যার হাত থেকে বাঁচতে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে গড়ে তোলা মাটির পাহাড় দেখাতে, গায়ত্রী স্পিভাক ও মহাশ্বেতা দেবীর উদ্যোগে আদিবাসী অঞ্চলে পরিচালিত ছোটদের স্কুল কেমন চলছে তার খোঁজ নিতে এবং দেখাতে, দারোন্দার ‘বনলক্ষী’তে খাওয়াতে।

একদিন দুপুরে বললেন তোমরা অরণিদের সঙ্গে আলাপ করে এসো, ভাল লাগবে। শ্যামসুন্দরবাবুর রিক্সায় চড়ে গেলাম বনেরপুকুরডাঙ্গার উল্টোদিকে কলাপুকুরডাঙ্গায়। দুটোই আদিবাসী গ্রাম। বনেরপুকুরডাঙ্গায় দুই যুবক শিল্পী মাটির বাড়ি বানিয়ে থাকেন, আগে শ্যামলীদির সঙ্গে গিয়েছি, সেখানে। কলাপুকুরডাঙ্গায় কিছুটা জমি কিনে বাড়ি বানিয়ে থাকেন অরণিরা। রাস্তার কাছেই বাড়ি, বাগান পেরিয়ে ঘরে ঢুকতে হয়। দু-তিনটে পাঁচ-সাত বছরের গাছের একটিতে পাখি বাসা বেঁধেছে। দেখলাম গাছের কাণ্ড ও বড় দুই ডালে রুপোলী টিন কেটে এমনভাবে লাগানো যেন কাঠবিড়ালিও গাছে চড়তে না পারে।

আরও অবাক হলাম, প্রায় দু ফুট উঁচু বাড়ির বারান্দায় ওঠার কোনও সিঁড়ি নেই। মাটি থেকে দু ফুট প্লাস্টার করা হয়নি এবং তার শেপ কনকেভ। এমন বাড়ি আগে দেখিনি, মাটি থেকে পা উঁচু করে তুলে সরাসরি বাড়িতে উঠতে হয়, সিঁড়ি নেই। তবে বাড়ির বাকি শৈলী স্বাভাবিক। প্রশ্ন করলাম এমন ব্যবস্থা কেন? হেসে বলল, আমাদের এখানে নিয়মিত দুজন অতিথি আসে। একজন ‘কালাসোনা’, অন্যজন ‘সাদামানিক’। একটি কেউটে, অন্যটি গোখরো। তারা যেন দেয়াল বেয়ে বাড়িতে ঢুকে না পড়ে তাই ওই ব্যবস্থা। পাখির ডিমের প্রতি ওদের নাকি খুব লোভ। পাখির বাসায় তারা যেন পৌঁছতে না পারে তাই গাছে ওই ব্যবস্থা করতে হয়েছে। শুনে খুব অবাক হলাম। পৃথিবীতে এমন মানুষও আছেন! এমন তো কখনও শুনিনি বা পড়িনি যে কোথাও কেউটে, গোখরো সাপ না মেরে তাদের সঙ্গে কোনও মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ব্যবস্থা করেছে! বললেন, তবে রাতে সব সময় টর্চ নিয়ে চলাফেরা করতে হয়।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে, ঘরের কোণে অন্ধকার জমছে। বললেন, ইলেক্ট্রিসিটির কানেকশন নিইনি, যেটুকু বিদ্যুৎ লাগে নিজেরাই উৎপাদন করে নিই। কথা বলতে বলতে সেই ব্যবস্থা কেমন দেখালেন। একটা পুলির সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা এক লাঠির উঁচু দিকটা ধরে বার কয়েক টানলেন, অমনি গুড়ি গুড়ি একগুচ্ছ চার্জেবল এলইডি জ্বলে উঠল। বাইশ-পঁচিশ বছর আগের ঘটনা, তখন কিন্তু এলইডি আলোর প্রসারই হয়নি। বললেন, পেশিশক্তির সাহায্যে মোটর ঘুরিয়ে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন করি। শুনলে মনে হবে কঠিন কাজ, তবে দেখলেন তো ওইটুকু হাত নেড়েই মিনিট দশেক বই পড়ার মতো আলো থাকবে। যেটুকু আলোর প্রয়োজন হয় তা ওইভাবে তৈরি করে নিই। রাতে বেশিক্ষণ জাগি না, তাড়াতাড়ি ঘুমোই, ভোরে উঠি। ইলেক্ট্রিকের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করি না, আমাদের জীবনযাপন প্রায় এখানকার মানুষদের মতোই সাধারণ, তবে রান্নার জন্য গ্যাস ব্যবহার করি।

ভাবলাম, নিজে না হয় এইরকমভাবে থাকবে ঠিক করেছে, কিন্তু তাঁর স্ত্রীও কি এসব কাণ্ড অবলীলায় মেনে নিলেন! বললেন, আমরা ছাত্রাবস্থায় বন্ধু হয়ে পরে বিয়ে করেছি। আমি বিশ্বভারতীতে পদার্থবিদ্যা পড়াই, ও একই বিষয়ে কলেজে পড়ায়। আমাদের ভাবনা-চিন্তায় বিরোধ নেই। বাগানের একপাশে যে বাহনটি রাখা দেখলেন তা নিজেদের তৈরি করে নেওয়া। বাড়িতে ঢুকতে বাগানের ডানদিকে রাখা খুদে গাড়িটি দেখলাম। বললেন, গাড়ির মতো ঢেকে নিয়েছি, তবে হাতে বা পায়ে প্যাডেল করা যায়। এই বাহনটি নিয়েই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে যাই।

ফিরে আসার সময় অনেক টাকা খরচ করে বাগানের এক পাশে তৈরি গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জিঙের ব্যবস্থা দেখালেন। বললেন গরমকালে এই গ্রামে জলের সঙ্কট হয়। টিউবওয়েল বা কুয়োতে জল থাকে না। এই গ্রামের জমির ঢাল আমাদের বাড়ির দিকে। কিছুটা কারিকুরি করতে হয়েছে, এখন বর্ষাকালে এখানকার মাটিতে গড়ানো সব জলই এখানে আসে। গ্রাউন্ডওয়াটার রিচার্জিঙের ফলে গরমের সময় গ্রামে জলকষ্ট কমেছে।

বুঝলাম শ্যামলীদি তাঁদের সঙ্গে কেন আলাপ করতে বলেছিলেন। জানি না আজ তাঁরা কেমন আছেন, কীভাবে আছেন। নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয় ভাগে যখন কার্বন নিঃসরণ, উষ্ণায়ন বা জলবায়ু বদলের কথা আলোচনায় আসত না, সেই সময় থেকেই তিনি নিজেদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট শূন্য করতে চেয়েছেন। লোকে বলবে ওইরকম যাপন বাস্তবোচিত নয়। কিন্তু তাঁদের ভাবনাচিন্তা ও সততা, দৃষ্টান্ত সৃষ্টির কথা ভেবে একবার প্রণাম তো করবেন! তাঁরা বসুন্ধরাকে শোষণ নয়, তৃপ্তি দেওয়ার কথা ভাবেন, যা আমরা কেউ করি না।

শ্যামলীদি বলতেন, গ্রামের মানুষের হাতে টাকাপয়সা নেই বলেই কিন্তু তারা অনেকটা স্বাবলম্বী। কোকাকোলা, চিপস না খেয়ে মুড়ি-গুড়, শাক-ভাত খায় বলে অনেক শহুরে লোকের তুলনায় কিছুটা বেশি পুষ্টিও পায়। তিনি শান্তিনিকেতনের অনুপ্রেরণায় দেশের নানা প্রান্তে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানে ঘুরে বেড়িয়ে আনন্দ পেতেন। বলতেন, প্রকৃতি, গ্রামসমাজ, স্বাবলম্বনের মাধ্যমে কী করে বাহুল্যহীন সহজ-সরল জীবন গড়ে তোলা যায় সে কথা ভেবেই রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু আজ এখানে খুব কম বাড়িতে গেলে বোঝা যাবে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে রয়েছি। প্রকৃতি ও মাটির সঙ্গে মানুষের যে যোগ এখানে ছিল তা যেন হারিয়ে গেছে, গাছপালাহীন ইট আর কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। পৌষমেলা আজ গ্রামের শিল্পসামগ্রী পিছনে ঠেলে গাড়ি-টিভির বিজ্ঞাপন, প্রদর্শনে ভরা। পৌষমেলার ক্রমবর্ধমান আকৃতি ও দূষণ নিয়েও তিনি চিন্তিত ছিলেন।

একবার বাড়িতে গিয়ে জানলাম, তিনি দিন কয়েক হল আমেরিকা থেকে ফিরেছেন। কতগুলো বই নিয়ে এসেছেন, দেখালেন। যতদূর মনে পড়ে সবই ছিল পরিবেশ ও পরমাণু শক্তিবিরোধী বই। বললেন, অর্জুন মাকিজানির সঙ্গে আলাপ হল। আমেরিকা থেকে তাঁর লেখা বই হাতে দিয়ে বললেন, নিয়ে যাও, পড়ে ফেরত দিও। ফেরার সময়ে সেদিন একটা সুদৃশ্য মোটা বই হাতে দিয়ে বললেন, এটা দেখবে নাকি? বিদেশি লেখকের বই হাতে নিয়ে দেখলাম, সামাজিক কাজে অনন্য ছয় ভারতীয় রমণীকে নিয়ে, গোটা পাতা জুড়ে ছবিতে সাজানো বইটির একটি চরিত্র শ্যামলীদি। বললেন, ভদ্রলোক যে এমন কাণ্ড করবেন বুঝিনি। এখানে এসে অনেকক্ষণ কথা বললেন, ছবি তুললেন। বুঝিনি এরকম সুন্দর একটা বই লিখে ফেলবেন! একটু লাজুক লাজুক মুখ করে বললেন, কোথা থেকে যে আমার সম্বন্ধে এত তথ্য পেলেন জানি না।

কয়েক বছর পর থেকে শান্তিনিকেতনে গেলে শ্যামলীদির বাড়িতে আর উঠতাম না। মনে হত তাঁর বয়স হয়েছে, সারাদিন ধরে আমাদের খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা করতে যে পরিশ্রম হয় তাতে খুবই কুণ্ঠিত লাগত। কিন্তু তাতে কী! সকালে গেলে সারাদিন সেখানে থাকা-খাওয়া, এদিকওদিক যাওয়া, ছাড়া পেতাম সন্ধ্যায়। একদিন বিদায়ের সময় বললেন, কোথায় তোমরা ওঠো, চলো দেখে আসি। আমরা শান্তিনিকেতনে যে পুরনো একতলা হলিডে হোমে উঠতাম সেই জমিতেই পাশে ছিল হলুদ রঙের দোতলা বাড়ি। বললেন, “ওমা, এটাই তো মীরাদেবীর বাড়ি (রবীন্দ্রনাথের মেয়ে)! এ বাড়ির নাম ‘মালঞ্চ’। বাবা প্রথম যখন দেরাদুন থেকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে এলেন, ঠাকুমার সঙ্গে এই বাড়ির দোতলায় থাকতাম। মীরাদেবীর কাছেই বাগান করা শিখেছি। নিজের হাতে গাছপালা, বাগানের পরিচর্যা করতেন। সবদিকে তাঁর নজর ছিল, নানা নতুন নতুন পদও রান্না করতেন।”

আমার বন্ধু দারোন্দায় পাঁচ কাঠা জমি কিনেছিল। বারবার বলছিল, খুব ভাল জায়গায় পাঁচ কাঠা জমি পাওয়া যাচ্ছে পঁচিশ হাজার টাকায়, চলো পাশাপাশি থাকব। আমার সে মুরোদ ছিল না, তাও ভাবলাম দেখে আসি। শুনে শ্যামলীদি বললেন, কোথায় জমি কিনবে দেখি চলো। যিনি বেচবেন তাঁকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে জমি দেখতে গেলাম। সত্যিই ভাল জায়গা, ফিরে এলাম। বললেন, জমি কিনে কী করবে, বাড়ি বানাবে? ভাবলাম, জমি কেনার টাকা জোটানোই মুশকিল, মাটির বাড়ির টাকাই বা কোথায় পাব! বললেন, এদিকে এলে তো আমার বাড়িতেই থাকবে, জমি দিয়ে কী হবে? সত্যি কথা, হেসে ফেললাম। জমি কেনার সাধ্য আমার নেই, তাও ঘুরে এলাম, আর ওদিকে যাব না।

যথার্থ রাবীন্দ্রিক এবং গান্ধিবাদী বলতে একমাত্র শ্যামলীদিকেই দীর্ঘদিন কাছ থেকে দেখেছি। ক্রেডিট কার্ডহীন, অল্পে তুষ্ট, সামাজিক ন্যায়ে অভ্যস্ত পৃথিবীর স্বপ্ন বুকে ধরে রেখে স্বার্থপর, দেখানেপনায় তৃপ্ত অমিতব্যয়ী, ভোগবাদী বাস্তব পৃথিবীতে একা হতে হতে কখনও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়তে দেখেছি। ২০০১ সালে একদিন অনেক রাত পর্যন্ত সেই অবসাদের কথা বলছিলেন। কথা প্রায় একতরফাই চলছিল। অসহায়ভাবে তা শুনতে শুনতে, অশোভন হলেও, চোখ ভরে ঘুম এল। আমার স্ত্রী বারদুয়েক কফি খেয়ে অনেক রাত পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে জেগে রইলেন। খোলামেলা বড় বাগানবাড়িতে একা থাকেন। শান্তিনিকেতনের দু-তিন প্রিয়জন অমিতাদি, বাণীদিরা থাকেন কিছুটা দূরে। নিজের পথে চলতে গিয়ে জীবনের নানা কটূ স্মৃতিও যে তাঁর মনে বেদনা, অবসাদ তৈরি করতে পারে তা অস্বাভাবিক নয়। অথচ আগে তা ভাবিনি, সেদিন টের পেয়ে ভয় পেয়েছিলাম। অন্যায়ের প্রতিবাদে ভয়ডরহীন, নানা ভাল কাজে ছুটে বেড়ানো এই বড় মাপের মানুষটিকে দেখতে দেখতে তারও যে দুঃখ-বেদনা রয়েছে ভুলে গিয়েছিলাম। চারপাশে প্রতিদিনের ঘটনা ও খবরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল না। খবরের কাগজ রাখতেন না, টিভিও ছিল না। কারণ, চুরি লোভ হিংসা অত্যাচার আর দুর্নীতির খবরে তাঁর মন খারাপ হয়। গান শোনারও সুযোগ ছিল না। আমার স্ত্রী বললেন, ওঁকে একটা রেডিও কিনে দিলে হয়, তাতে হয়তো ঘুম থেকে উঠে ভোরবেলা রেডিও শুনে মন ভাল হবে। একদিন সকালে রেডিও শুনতে শুনতে  ফোন করলেন— সকালে রেডিও চালিয়েছি, তাই ফোন করলাম।

নব্বইয়ের দশক থেকে বিপ্লবী, স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সমাজসেবী পান্নালাল দাশগুপ্ত জীবনের শেষ কয়েক বছর তাঁর কাছেই ছিলেন। শ্যামলীদি তাঁর দেখভালে ব্যাস্ত ছিলেন। তাঁর মধ্যস্থতায় পান্নাবাবু পাঠভবনের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের নিয়ে বার বার গ্রামে গিয়েছেন, ‘মীনমঙ্গল উৎসব’ উপলক্ষ্যে কোপাই নদীতে মাছ ছেড়েছেন। দু হাজার সাল নাগাদ একদিন পান্নাবাবুকে নিয়ে তাঁর হাতিবাগানের বাড়িতে উঠে আমায় খবর পাঠালেন, পান্নাবাবু এসেছেন, আলাপ করবে এসো। আলাপ করে তাঁর সাক্ষাৎকার নিলাম। শ্যামলীদির তৈরি খিচুড়ি, পাপড়ভাজা সহযোগে তিনজনের মধ্যাহ্নভোজ হল। দিন দুয়েক পর পান্নালালবাবু মারা গেলেন, তখন দেখে অতটা অসুস্থ্ মনে হয়নি। পরে তাঁর এক আত্মীয় অভিযোগে করেছিলেন যে শ্যামলীদি পান্নাবাবুর পুরনো ক্যামেরা আত্মসাৎ করেছেন। তা জেনে খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কী? সারা জীবনই তো তিনি অন্যের সেবা করে এসেছেন। লেখাপড়ায় বিঘ্ন হত, তা নিয়ে অনুযোগও করেছেন। কিন্তু সে কাজ থেকে সরে আসতে পারেননি।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৮৭, ২০০০ এবং ২০০৬ সালে তিন দফায় যথাক্রমে দাঁতন, সুন্দরবন ও হরিপুরে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল। বিশেষ করে ২০০০ ও ২০০৬-০৭ সালে সরকার সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। আমরাও তেড়ে-ফুঁড়ে সভা-সমিতি-মিছিল ও লেখালেখি শুরু করি। দু দফাতেই পরমাণু চুল্লি স্থাপনের উদ্যোগ শুরু করেও রাজ্য সরকারকে পিছু হঠতে হয়েছিল। বিরোধিতায় শ্যামলীদি ছিলেন একেবারে সামনের সারিতে, দূরের সভা-সমিতিতেও ছুটতেন। অবশেষে ২০১১ সালে মমতা সরকারের বিদ্যুৎমন্ত্রী ঘোষণা করে হরিপুরে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে না।

১৯৯৯ সাল নাগাদ ক্যানিং না মন্দিরপাড়ায় দিনেরবেলা সভার পর কলকাতায় ফেরার জন্য আমি আর সুজাত ছুটছিলাম, বিকেলে কলকাতায় সভা, প্ল্যাটফর্মে ট্রেন আসতে দেরি নেই। তাড়াহুড়োয় লাইন টপকে প্ল্যাটফর্মে উঠছি। তিনিও সমানে পাল্লা দিচ্ছেন। শেষে কাঁধের বড় ঝোলা সহ হাত পা শরীর কাজে লাগিয়ে, কারও হাত না ধরেই প্ল্যাটফর্মে উঠলেন। তিনি নির্বিকার, আমরা হতবাক-লজ্জিত। ট্রেন ধরার তাড়ায় তাঁকে ছেড়েই এগিয়েছিলাম। এখনও চোখ বুজলে দৃশ্যটা চোখে ভাসে, অনুশোচনা হয়। নাই বা ধরতাম সেই ট্রেন! পরের ট্রেন ধরলে কতটুকু ক্ষতি হত?

আরেকবার, ২০০০ সালে দেশের নানা প্রান্তের পরমাণু অস্ত্র ও শক্তিবিরোধী আন্দোলনকারীদের নিয়ে দিল্লিতে দুদিনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০০০ সালের নভেম্বর মাসে সেখানেই জন্ম হয়েছিল সিএনডিপি (কোয়ালিশন ফর নিউক্লিয়ার ডিসআর্মামেন্ট অ্যান্ড পিস)-র। আমার মেয়ে তখন বছর খানেকের। শীতের দুপুরে মাঠে বসে কথা বলছি, শ্যামলীদি খুশি খুশি চোখে ঘাসে চড়ে বেড়ানো ছোট্ট মেয়ের গুণ্ডামি দেখছেন। কথা প্রসঙ্গে জানালেন, আর এক মহিলার সঙ্গে তিনি সংগঠকদের ঠিক করে দেওয়া যে আস্তানায় উঠেছেন তার বাথরুম ব্যাবহারযোগ্য নয় অথচ সংগঠকদের সঙ্গে ওই অব্যবস্থা নিয়ে কথা বলা যাচ্ছে না, এমনই ব্যাস্ত তাঁরা। আমার থাকার সুখের ব্যাবস্থা ছিল এক আত্মীয়ের বাড়িতে। নানা কারণে তাঁকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। হয়তো অন্যজনকে ছেড়ে তিনি যেতেনও না। শ্যামলীদির বক্তব্য, ওই আস্তানা বদলাতে পারলে ভাল, না হলেও চালিয়ে নেবেন। তাঁর পক্ষে একরাত হোটেলে থাকা আর্থিক দিক থেকেও অকুলান ছিল না, কিন্তু সেখানেই থেকে গেলেন।

বিশ্বভারতী কর্ত্তৃপক্ষের নানা বেঠিক কাজ ও পাঁচিল তোলার বিরুদ্ধে আপ্রাণ লড়েছেন। শান্তিনিকেতনের গাছতলায় বসে ছেলেমেয়েদের ক্লাস করার মুক্ত ভাবনা এখন পাঁচিলের ঘেরাটোপে বদ্ধ। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি সরব ও সক্রিয় ছিলেন তিনি। বারবার তা নিয়ে নানাজনকে বলেছেন, আটকাতে পারেননি। পূর্বপল্লী মেলাপ্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হতে চলা ‘কবিগুরু কার র‍্যালি’-র কথা হঠাৎই কানে এলে ছুটে গিয়ে প্রতিবাদ করেন। উপাচার্যকে চিঠি দেন, র‍্যালির কর্তাব্যক্তিদের কাছে প্রতিবাদ করেন। পরে একা গাড়ির সামনে মাটিতে শুয়ে পড়ে র‍্যালি আটকে দিয়েছিলেন। বলেন ‘আমার উপর দিয়ে গাড়ি চালান’। শেষে বিশ্বভারতীর নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে জোর করে সরিয়ে দেন। কাগজে সেই ঘটনার কথা ছাপা হয়। তাঁর বক্তব্য ছিল, রবীন্দ্রনাথ সভ্যতার সঙ্কটের কথা ভেবে প্রবন্ধ লেখার আগেই বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন বলেই সেই অনুর্বর প্রান্তরে তাঁর স্বপ্নের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে ওই কার র‍্যালির আয়োজন তাঁর প্রতি চুড়ান্ত অশ্রদ্ধা প্রদর্শন। শান্তিনিকেতনের এখনও যেটুকু অবশিষ্ট আছে তা রক্ষা করার দায়িত্ব সবার। তাছাড়া যে দেশের অসংখ্য মানুষ খেতে পায় না, চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, সেখানে গাড়ি নিয়ে ফুর্তি করা শোভা পায় না। সেই বিশ্বাস থেকেই ওই প্রতিবাদ। রবীন্দ্রনাথের ভাবনা অনুযায়ী শান্তিনিকেতনের পরিবেশ রক্ষায় যারা নানা ধরনের প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন তিনি ছিলেন তাঁদের নেত্রী। এসব কারণেই নিরঞ্জনদা (হালদার) তাকে বলতেন শান্তিনিকেতনের বিবেক, সমরদা (বাগচি) বলতেন সেখানকার হৃদয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাটা যেন তাঁর রক্তে মিশে ছিল। কিন্তু আশ্চর্য, তাতে উগ্রতার ঝাঁঝ ছিল না।

তিনি জানতেন যেসব ফুল পূজায় ব্যবহৃত হয় তার বীজ নেই এবং দু-এক দিনেই ঝরে পড়ে। তবে পলাশফুল অনেকদিন গাছে থাকে, তাঁর বাড়িতেই ছিল এক বিরাট পুরনো পলাশগাছ। দোলের সময় শান্তিনিকেতনে মেয়েদের পলাশমালায় সজ্জিত হওয়ার জন্য গাছের ডাল ভেঙে ফুল ছেঁড়া নিয়েও প্রতিবাদ করেছেন, জনমত গড়ার চেষ্টা করেছেন। পলাশ ধংসের বিরুদ্ধে পোস্টার এঁকে, গাছের পাতা, আকন্দ, বুগেনভিলিয়া ইত্যাদি দিয়ে নানারকমের মালা গেঁথে দেখিয়েছেন যে সেসব বিকল্প হতে পারে। অবশ্য তারপরও পলাশধবংস বন্ধ হয়নি।

২০০৭ সালের শেষার্ধে এক ছুটির দিনের দুপুরে কম্পিউটারের পাশে বসে রয়েছি, বাংলা কম্পোজ হচ্ছে। হঠাৎ ফোনে খবর এল, শ্যামলীদি অসুস্থ, তাঁকে উডল্যান্ডস হসপিটালে নিয়ে আসা হচ্ছে। আসার পথে গাড়ি থেকে বিশ্বভারতীর এক শিক্ষক ফোন করেছেন। তখনই আমাকে উডল্যান্ডসে চলে যেতে হবে, আমি হব তাঁর জিম্মাদার। ওই সময় ‘পরমাণু চুক্তি নয় — নবীকরণযোগ্য শক্তিই ভরসা’ বইটির কাজে তুমুল ব্যস্ত ছিলাম। ১২৩ চুক্তি শেষ হতে চলেছে অথচ বইটির কাজ তেমন এগোয়নি। নির্দয়ভাবে বললাম, এখনই যেতে পারছি না, ভর্তি করে দিন, কাল যাব।

পরের দিন সেখানে যেতে বিকেল হল। রাস্তায় সুমিতার ফোন পেলাম। আপনি কোথায়? কখন আসছেন? অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছলাম। দেখি শাঁওলি মিত্র হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করছেন। জানলাম, কয়েকদিন আগে শ্যামলীদি তাঁকে ফোন করে এলোমেলো কথাবার্তা বলেছেন। জানতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে কিনা (তখন এ রাজ্যে হরিপুর, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম আন্দোলন শুরু হয়েছে। তিনি ছিলেন আন্দোলনের সমর্থক)। শাঁওলিদির তখনই মনে হয়েছে কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে। সেইসব কথা বলার জন্য তিনি অপেক্ষা করছিলেন।

সেখানে আকস্মিকভাবে ডাক্তার অমিতাভ চক্রবর্তীর দেখা পেয়ে শ্যামলীদির কথা বললাম, সে ওখানকার বিশেষজ্ঞ। খোঁজ নিয়ে এসে শ্যামলীদির শারীরিক অবস্থার কথা বিস্তারিতভাবে জানাল। পরের দিন সকালে বিদেশ থেকে ছেলে আনন্দ হাসপাতালে এল। সে যাত্রায় দু-চারদিন ভর্তি থেকেই তিনি মুক্তি পেলেন।

২০১১ সালের এপ্রিল মাসে চেরনোবিল দিবসে কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে পরমাণুবিদ্যুতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদসভায় এলেন। অল্প সময়ে সুন্দর বক্তব্য রাখলেন। ততদিনে লাঠি ধরেছেন, বড়সড় বাঁকানো শক্ত গাছের ডালই তাঁর যোগ্য লাঠি। একটা পা বিচ্ছিরিভাবে ফুলেছে। বললেন, পোকা কামড়েছে। সভা শেষে লেক গার্ডেন্সে সুমিত্রাদির বাড়ি যাবেন। তাঁকে নিয়ে মেট্রো রেলে চড়ব, সবাই রে রে করে উঠল, ট্যাক্সি করে যাও। শ্যামলীদি আমায় বললেন, কষ্ট হলেও একটু হাঁটা বোধহয় দরকার। কতটা কষ্ট চেয়ে চেয়ে দেখলাম। কিন্তু তখনও বুঝিনি শাড়িতে ঢাকা একটি পা ফুলে ঢোল হয়ে রয়েছে। যেন সিঁড়ি ভাঙতে না হয় তাই রবীন্দ্র সরোবর স্টেশনের বদলে টালিগঞ্জে নেমে ট্যাক্সি নিলাম। সুমিত্রাদির (নারায়ণ) বাড়িতে রাতে থাকবেন, আমিও সঙ্গে গেলাম। অবশ্য আগেও সে বাড়িতে গিয়েছি। কলকাতার ‘পাঠভবন’-এ তিনি সুমিত্রাদির সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন। তারও আগে শান্তিনিকেতনের ছাত্রী হিসেবেই তাঁর গুণগ্রাহী ছিলেন।

পরের দিন আমাদের ঘরে এলেন। আলোচনা গল্পগুজবের ফাঁকে আমার মেয়েকে রঙিন কাগজ কেটে ভারী সুন্দর পাখি, ফুল, নকশা বানিয়ে দিলেন। সে তো অবাক, আমারাও মুগ্ধ। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই  খালি মেঝেতে শুয়ে-বসে গল্প করলাম। এটাই শ্যামলীদিকে নিয়ে আমার শেষ সুখের স্মৃতি।

৪ জুন শিয়ালদার লরেটো ডে স্কুলে নাট্যকার বাদল সরকারের স্মরণসভায় এলেন। সঙ্গী ছিল সেই লাঠি। পরের দিন ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ওই স্কুলে পরমাণু শক্তির বিপদ নিয়ে সারা দিনের কর্মশালা। শুরুতে গান্ধিজিকে নিয়ে পান্নালাল দাশগুপ্তের বই প্রকাশ করলেন। অনেকক্ষণ ধরে নানাজনের বক্তব্য শুনলেন এবং বললেন। পরপর দুদিনের অনুষ্ঠানের পর তাঁকে মানসিকভাবে বেশ চাঙ্গা মনে হল। শেষবার অসুস্থ হওয়ার আগে সেই শেষ দেখা।

জুলাই মাসে চূড়ান্ত অসুস্থ হলে তাঁকে দুর্গাপুরের মিশন হাসপাতালে ভর্তি করা হল। দিন দুয়েক পরে দেখতে গেলাম। হাত ধরে অনেক কথা বলার চেষ্টা করলেন, কথা জড়ানো, তেমন বোঝা গেল না। সেখান থেকে জেনেছিলাম পোকার কামড়ে তাঁর পা ফোলেনি, ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস হয়েছে (তবে সে কারণেই হাসপাতালে ভর্তি হননি, তাঁর সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছিল)। এখন ভাবি কতটা মনের জোর থাকলে কেউ সেই পা নিয়েও স্বভাবসিদ্ধ ছুটে বেড়ানো জারি রাখতে পারেন! জুলাইয়ের শেষে হাসপাতালের বিছানায় অত্যন্ত সঙ্গীন অবস্থাতেও যতক্ষণ জ্ঞানে ছিলেন বারবার বলেছেন, ভাল আছি। ভর্তি হওয়ার দিন কয়েক পর থেকেই তাঁর কথা বলা কমে আসছিল। তখনও মনে হয়নি এই অকুতোভয় স্বাধীনচেতা মানুষটি আর থাকবেন না। কয়েকদিন পর, ছেলে আনন্দ এলে, তাঁকে কলকাতার নাইটিঙ্গলে এনে ভর্তি করা হল।

দুদিনের জন্য বাইরে গিয়েছিলাম। ১৫ আগস্ট ফিরে ফোন পেলাম তিনি আর নেই। রাতে হাসপাতালে পৌঁছে আনন্দর ক্যালিফোর্নিয়ার যুবক গেরুয়া পাঞ্জাবি, সাদা পাজামা পরা নাইজেলকে (বিদেশিদের এই পোশাকে দেখলে মনে হয় ঘরের মানুষ) দেখলাম। রাত বাড়তে আশি বছর ছুঁতে চলা নিরঞ্জনদাকে গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার শত অনুরোধেও কিছুতেই বাড়ি গেলেন না। বললেন, ওঁকে নিয়ে যাওয়ার পরেই যাব। সারা রাত অসংখ্য ছারপোকার কামড় খেয়ে তিনি ও আমি পড়ে রইলাম। রাতের অন্ধকার পুরোপুরি না কাটতেই শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমরদা পৌঁছে গেলেন। একটু পরে আনন্দ, নাইজেল আর জ্যোতির্ময়ের সঙ্গে আমি শ্যামলীদির দেহ নিয়ে শান্তিনিকেতন রওনা হলাম। নিরঞ্জনদা বাড়ির পথ ধরলেন।

ড্রাইভারের পাশে বসেছে আনন্দ আর জ্যোতির্ময়। পিছনে শোয়ানো শ্যামলীদির দেহের পাশে রয়েছি নাইজেল আর আমি। নাইজেল গান ধরল, জয় তব বিচিত্র…। ওরা তিনজন অবিরাম একসঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছিল। শেষে নাইজেল একা একটা গান ধরল, অবাক হয়ে দেখলাম আমি তো নইই, আনন্দ বা জ্যোতির্ময়ও সেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর জানে না। পরে জেনেছিলাম নাইজেল ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ত্বের অধ্যাপক। বাংলায় বলেছিল, ‘ওদ্যাপক’। গাছপাথর (ফসিল) নিয়ে গবেষণা করছে। গাছপাথর কথাটাও তার মুখেই প্রথম শুনলাম। সে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া শ্যামলীদিরও বিশেষ অনুরাগী। ওকে দেখলে আমেরিকাকে ভাল মানুষের দেশ বলে মনে হবে। পথে একবার চা খেয়ে আমরা শান্তিনিকেতনে পৌঁছে গেলাম। এক ফাঁকে আনন্দ বলেছিল, বাবা ফোনে কথা বলার সময় শ্যামলীদির অন্যায়ের প্রতি আপসহীন কঠিন মানসিকতা এবং মানুষকে ভালবাসার কথা বলছিলেন।

জীবনের শেষদিকে শ্যামলীদি ঘনঘন পাঠভবনে যেতেন, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলতেন। তাই পাঠভবনের সারিবদ্ধ ছেলে-মেয়ে ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সামনে তার দেহ নামিয়ে রাখা হল। দুটি সমবেত রবীন্দ্রসঙ্গীতের পর শিক্ষক উদয়নারায়ণ সিংহ জানালেন, প্রকৃতি সেবিকা শ্যামলীকে তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী মাটিতে কবর দিয়ে উপরে একটি কুলগাছ পুঁতে দেওয়া হবে। তিনি নাকি সাধ করে বলতেন, গাছ বড় হলে বাচ্চারা হুটোপাটি করে কুল খাবে (তখনও জানতাম না কবরে মরদেহ এবং উপরের মাটির স্তরের মধ্যে প্রায় দুই ফুট শূন্য অংশ থাকে, তাই উপরের মাটিতে গাছ পুঁতলে কিছুকাল পর শিকর নিচে মাটি না পাওয়ায় গাছ মরে যায়)।

পাঠভবন থেকে তাঁর মরদেহ এল পলাশবাড়িতে। প্রবেশমাত্র সুললিত সমবেত মহিলা কণ্ঠে গান শুরু হল, চলল শেষ পর্যন্ত। ‘দুই হাতে কালের মন্দিরা যে সদাই বাজে’ গানটা শুনে মনটা কোথায় শান্ত হবে তা না হু হু করে উঠল। জিতেনের সঙ্গে (‘মন্থন’ পত্রিকার সম্পাদক জিতেন চক্রবর্তী) বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। তাঁর দেহ বহন করে গাড়িতে তোলার সময় শ্যামলীদি যাকে বাবার ছবিচোর বলে মনে করতেন তিনি বাড়ির বাইরে এসে হই হই করে বললেন, প্রদীপদা আপনি বাইরে কেন, শ্যামলীদিকে কাঁধে তুললেন না! আমি সাড়া দিলাম না।

পলাশবাড়ি থেকে সবাই মিলে মিছিল করে রাস্তার মোড় পর্যন্ত এলাম। তারপর কঙ্কালীতলা শ্মশানে না গিয়ে তাঁর দেহ নিয়ে যাওয়া হল বীরভূমের কুরুম্বা পোস্ট অফিসের অধীনে তিলুটির উদয়ন কল্যাণ কেন্দ্র আশ্রম[2]-এর উদ্দেশে।

একটি বড় গাছকে গোল করে ঘিরে তৈরি করা বড় চাতালের উপর রাখা হল শ্যামলীদির দেহ। বেদ ও কোরান থেকে সংক্ষিপ্ত পাঠ হল, পাঠ শেষে শ্যামলীদির থেকে বয়সে বেশ কয়েক বছরের বড় আব্দুল হালিম বললেন, শ্যামলী এখানে আসত, আমাদের পাশে বসত। তারপর অশ্রুসজল কণ্ঠে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার লাইন আবৃত্তি  করলেন— এ কি উঠেছে হাওয়া, পরে এসে আগে চলে যাওয়া….।

সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় তিলুটিয়া গ্রামের দিকে মরদেহবাহী গাড়িসহ কয়েকটি গাড়ি চলে যেতে দেখে কৌতূহলী বাউল দিবাকর দাস জানতে পারেন শ্যামলী খাস্তগীরের মৃতদেহ সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তা জেনে বাড়ি থেকে দোতারা নিয়ে প্রিয় দিদির দেহের পাশে হাজির হলেন। যতক্ষণ ওপাশে মাটি খুঁড়ে কবর তৈরির কাজ চলল, দিবাকর দফায় দফায় নেচে নেচে গান গাইলেন।

বিদেশি নাইজেল ছাড়াও অন্তত চার দেশের চার যুবতী খবর পেয়ে নানা জায়গা থেকে পড়িমরি করে ছুটে এসেছে, এখানে ওখানে শান্ত হয়ে বসে আছে। তাঁদের কাছে ভারত মানে যেমন রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর শান্তিনিকেতন, ভারত মানে শ্যামলী খাস্তগীর ও তাঁর পলাশবাড়ি।

উদয়ন কল্যাণ সংঘের রীতি হল সেখানে মৃতদেহ নিয়ে গেলে প্রয়াত এনামুল হকের ছেলে শ্রীবিশ্বজিতের ঘরে দুপুরে ভাত খেতে হবে। দেহ রেখে অনীহাসত্ত্বেও আমরা বিউলির ডাল আর আলুপোস্তর ঝোল সহযোগে ভাত খেলাম। আনন্দ আর নাইজেল ফের কবর প্রস্তুত করা এবং শেষে তাঁকে কবরস্থ করার কাজে হাত লাগাল।

অল্প কিছু মানুষ আছেন যারা পৃথিবীর কাছ থেকে যতটুকু নেন, ফিরিয়ে দেন অনেক বেশি। অনেক পাওয়ার সুযোগ থাকতেও তাঁরা এত অল্পে জীবন কাটান, যা দেখে আমরা শিখি সুস্থ ও সুন্দরভাবে বাঁচতে অনেক কিছু লাগে না, দৃষ্টি বড় করাটাই আসল কথা। অনেক সুযোগ সম্মান এঁরা এড়িয়ে চলেন। শ্যামলীদির ক্ষেত্রে সঙ্গে যোগ হয়েছিল আরও কয়েকটি বৈশিষ্ট্য— পৃথিবীকে পরমাণু-শক্তি মুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা, পরিবেশ আন্দোলনে সামিল হওয়া, অল্পকথা সুন্দর করে বলা, অন্যের যত্ন নেওয়া, অতিথির সেবা করা। এইভাবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমাদের অন্তরের শ্যামলীদি।

একবার তাঁর আঁকা একটি ছবি উপহার দিয়েছিলেন। ছবিতে উদাস বাউল উদাত্ত কণ্ঠে গান গাইছে। ভালই হয়েছে, ঘরে টাঙানো ছবিটার দিকে তাকালে এক মানুষের মতো মানুষের জীবনের খাতা চোখের সামনে খুলে যায়। উপায় কী! এখন তিনি এভাবেই বেঁচে থাকবেন আমাদের স্মৃতিতে।


[1] শ্যামলী খাস্তগীরের বাবা বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর সুধীর খাস্তগীর ছিলেন চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসুর প্রিয় ছাত্র। নন্দলালবাবু মুক্তকণ্ঠে তাঁর ছাত্রের আঁকা ছবির প্রশংসা করতেন। ১৯০৭ সালে তাঁর জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। ছিলেন বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট বা ইন্ডিয়ান স্টাইল অফ পেইন্টিং-এর বিশিষ্ট ধারক ও বাহক। গান্ধিজির অসংখ্য ছবি ও মূর্তি ছাড়া তিনি সামনে বসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জওহরলাল নেহেরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, পদ্মজা নাইডু সহ বহু প্রখ্যাত মানুষের মূর্তি গড়েছিলেন, ছবি এঁকেছিলেন। ১৯৫৮ সালে পদ্মশ্রী খেতাব লাভ করেন।

তিনি শুধু বড় শিল্পীই ছিলেন না, তাঁর শিল্পকর্মের বিক্রিও ছিল ভাল। দিল্লি, মুম্বাই, লখনৌ, এলাহাবাদ, সিমলা, দেরাদুন, মুসৌরিতে বারে বারে এবং দুবার কলকাতায়, দুবার লন্ডনে, একবার লাহোরে একক প্রদর্শনী করেছেন। সারা দেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাঁর আঁকা বহু চিত্র ও ভাস্কর্য ছড়িয়ে রয়েছে। তাঁর সৃষ্টির মুখ্য সময়ে তিনি এ-রাজ্যে ছিলেন না, তাই বাঙালির কাছে কম পরিচিত। কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়াই রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে সমাদৃত হয়েছেন, এমনকি অল ইন্ডিয়া রেডিওর লাহোর স্টেশনে গানও গেয়েছেন।

কর্মজীবনের শুরুতে প্রায় দু বছর গোয়ালিয়র সিন্ধিয়া স্কুলের শিল্পশিক্ষক ছিলেন। তারপর চালু হওয়ার (সেপ্টেম্বর ১৯৩৫) কয়েক মাস পর, ১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কুড়ি বছর ছিলেন দুন স্কুলে। সেখানে গড়ে তুলেছিলেন আর্ট স্কুল। কর্মজীবনের শেষ সাত বছর লখনৌ গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের প্রিন্সিপ্যাল হিসেবে ওই কলেজের উন্নতির জন্য প্রচুর কাজ করেন। শেষে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের অনুরোধে কলাভবনের প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব নেবেন বলে ঠিক হলেও শরীর ভেঙে গেছে বুঝে শেষে রাজি হননি। ১৯৬২ সাল থেকে আমৃত্যু (৬ জুন, ১৯৭৪) শান্তিনিকেতনের ‘পলাশ’ বাড়িতে কমবেশি সৃষ্টিশীলতার মধ্যেই তাঁর দিন কেটেছে।

[2] ১৯৬০ সালে উদয়ন কল্যাণ কেন্দ্র আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এনামুল হক। আশ্রম মানে, খোলামেলা একতলা ছোট মাটির বাড়ি। তার একপাশে রয়েছে এনামুল হকের কবর, ১৯৯৩ সালে তিনি মারা যান। এনামুল বলতেন, সমস্ত মানুষের একটাই জাত– মানুষ। মানবতাই হল ধর্ম। বলতেন এই পৃথিবী ভালবাসার কাঙাল, তাই আমাদের ভালবাসার পৃথিবীকে আপন করে নেওয়ার দরকার। সে কাজ যে করে সেই মানুষই হলেন ‘দেবতা’। উদয়ন কল্যাণ সংঘে পুজো নেই, যাগযজ্ঞ নেই। যারা এনামুলের কথা সঠিক বলে মনে করলেন তাঁদের নাম পাল্টে উপাধিহীন নতুন নামে পরিচয়ের পালা শুরু হয়েছিল, ফলে হিন্দু-মুসলিম একাকার হয়ে যায়। তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৪০ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত সেই গ্রামে আঠারোটি পরিবারের যৌথখামার ও কমিউন চালু হয়েছিল। তাঁদের পারিবারিক জমিতে পাশাপাশি শায়িত রয়েছেন না-ধর্মে দীক্ষিত গোয়ালডির ইসলাম শেখ, কুরুম্বার শান্তিরাম সর এবং শ্যামলীদি।