Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

নির্বাচনী ইশতেহারে আর্থিক প্রতিশ্রুতি: ব্যক্তি বনাম দল

দেবাশিস মিথিয়া

 


অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির বিচারে গত ৫ বছরে বিজেপি সরকার ইশতেহারী প্রতিশ্রুতির ধার দিয়েও যায়নি— পরিসংখ্যান তেমনই বলছে। তবে ১৮তম নির্বাচনের আগে ইশতেহার প্রকাশ করতে গিয়ে বিজেপি বলেছে গত ১০ বছরে তাদের দেওয়া সমস্ত প্রতিশ্রুতিই তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে! অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা বলছে, ২০০৪-২০১৪— এই ১০ বছর ইউপিএ সরকার অনেকটাই ইশতেহারমুখী ছিল, বিশেষ করে অর্থনীতির বিষয়গুলিতে

 

ভারতজুড়ে লোকসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে ১৯ এপ্রিল থেকে। তার আগে রাজনৈতিক প্রচারে, মিছিলে, জনসভায় রীতিমতো সরগরম গোটা দেশ। একসময় নির্বাচনী প্রচারের প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘নির্বাচনী ইশতেহার’ বা ‘ইলেকশন ম্যানিফেস্টো’। দেশের সাধারণ নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক দলগুলি ইশতেহার প্রকাশ করবে— এটাই রীতি। বিশেষ করে জাতীয় দলগুলি। নির্বাচনী ইশতেহার আসলে রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিশ্রুতিপত্র। কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে দেশের মানুষের জন্য আগামী দিনে তারা কী কী করবে সেটাই বলা থাকে ইশতেহারে। দারিদ্র্য দূরীকরণ, বেকার-সমস্যার সমাধান, কৃষি ও কৃষকের উন্নতি, স্বনির্ভরতার মধ্যে দিয়ে মহিলাদের ক্ষমতায়ন, শিল্প উন্নয়ন ও জিডিপি-র বৃদ্ধি— কমবেশি এইসব প্রতিশ্রুতিই থাকে নির্বাচনী ইশতেহারে। এছাড়াও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা থাকে। উল্লেখ থাকে বৈদেশিক নীতি কী হবে, দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দল ক্ষমতায় আসীন হলে কী পদক্ষেপ নেবে। তবে বর্তমানে আঞ্চলিক দলগুলির বাড়বাড়ন্ত ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কিছুটা এলোমেলো করে দিয়েছে। এই দলগুলি জাতীয় ইস্যু নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নয়, যেন-তেন প্রকারে নিজের রাজ্যে ক্ষমতা দখল করতে পারলেই দায়িত্ব শেষ। ফলে দেশের সমস্যা সমাধানে জাতীয় দলগুলির বাতলে দেওয়া উপায় অনেক সময়েই আঞ্চলিক স্তরে গিয়ে থমকে যাচ্ছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে পাওয়া ১০০০ টাকার অনুদানকেই মহিলারা নিজেদের স্বনির্ভর হওয়ার মাপকাঠি বলে ধরে নিয়েছেন। তাঁদের বোঝানো কঠিন— এটা জীবনের চরম সত্যি নয়। তাই মহিলাদের ক্ষমতায়নে জাতীয় দলগুলি যে-প্রতিশ্রুতিই দিক না কেন পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের তা কোনওভাবেই প্রভাবিত করবে না।

আর একটি বিষয় যা ভারতীয় রাজনীতিতে সগৌরবে ফিরে এসেছে তা হল ব্যক্তিপুজো। দক্ষিণভারতের রাজ্যগুলিতে একসময় বিধানসভা নির্বাচনে জনপ্রিয় চিত্রতারকাদের মুখ ব্যবহার করা হত রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে। ভারতীয় রাজনীতিতে সেই ব্যক্তিপুজো নতুন করে ফিরে এল যেদিন থেকে রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচনী কাজে ‘পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস্ট’দের সাহায্য নিতে শুরু করল। ব্যক্তিনির্ভর এই নির্বাচনী প্রচারে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি সাধারণ মানুষকে রাজনীতিবিমুখ করে তুলেছে। আর এই ‘রাজনৈতিক কমিক’ দেখতে গিয়ে সাধারণ মানুষ ভুলে যাচ্ছেন সরকারের কাছ থেকে তাঁদের কী পাওয়ার ছিল আর প্রকৃতপক্ষে তাঁরা কী পেলেন। মানুষের চিন্তাভাবনাকে তালগোল পাকিয়ে দিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকদলকে সাহায্য করছে মেইনস্ট্রিম মিডিয়া।

বর্তমানের এই ব্যক্তিপুজো ও পারস্পরিক কুৎসার আবহে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে নির্বাচনী ইশতেহার। তবে ঐতিহ্য মেনে সমস্ত জাতীয় দলগুলি এখনও তা প্রকাশ করছে। নির্বাচনী ইশতেহারের গুরুত্ব তখনই বোঝা যায় যখন কোনও রাজনৈতিক দল সরকার গঠনের পরে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করে বা করার চেষ্টা করে। ভারতবর্ষ এই মুহূর্তে ১৮তম লোকসভা নির্বাচনের দোরগোড়ায়। একদিকে বিজেপির নেতৃত্বে ৩৮টি দলের ‘এনডিএ’ জোট ক্ষমতা পুনর্দখলের লড়াইয়ে নেমেছে, অন্যদিকে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ২৬টি দলের ‘ইন্ডিয়া’ জোট বিজেপিকে দিল্লির মসনদ থেকে গদিচ্যুত করতে চাইছে।

ফেরা যাক নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গে। দেখে নেওয়া যাক, ১৮তম লোকসভা নির্বাচনে (২০২৪) বিজেপি অথবা তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস সরকারে এলে জনগণকে আগামী দিনে কী কী সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বৈদেশিক নীতি ও দেশের নিরাপত্তার বিষয়েও বলা থাকে। তবে স্বল্প পরিসরে সবটা ধরা কঠিন। তাই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করছি মূলত অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে।

 

কংগ্রেসের ইশতেহারে আর্থিক প্রতিশ্রুতি: ২০২৪

৭ এপ্রিল নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ক্ষমতায় এলে তারা কোন কোন ক্ষেত্রে কী কী সংস্কার করবে। জাতীয় কংগ্রেসের অভিমত ১০ বছরের বিজেপি শাসনকালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের ন্যায়-ব্যবস্থা৷ তাই কংগ্রেস তাদের ইশতেহারের নাম দিয়েছে ‘ন্যায়পত্র’। এখানে গুরুত্ব পেয়েছে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধির ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রার ৫টি মূল স্তম্ভ— যুবসমাজ, কৃষক, মহিলা, শ্রমিক ও প্রান্তিক মানুষদের কথা। এই দলের ইশতেহারের মূল ভিত্তি— ‘কাজ’, ‘স্বাস্থ্য’ ও ‘জনকল্যাণ’। ইশতেহারে অর্থনীতি সংক্রান্ত যা বলা আছে:

 

বিজেপি-র ইশতেহারে আর্থিক প্রতিশ্রুতি: ২০২৪

ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচনী ইশতেহারের নাম ‘মোদির গ্যারান্টি’। মূলত সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করে বিজেপি-র এবারের সঙ্কল্পপত্র। ১৪টি বিষয়ে তারা জোর দিয়েছে। বিকশিত ভারতের চারটি স্তম্ভ— নারীশক্তি, যুবশক্তি, কৃষক ও দরিদ্রদের উন্নতির লক্ষ্যে বিজেপি আগামীতে কাজ করবে বলে ঘোষণা করেছে। মানুষের আত্মমর্যাদা ও জীবনযাত্রার গুণগত মান বাড়াতে সরকার সব বাড়িতে পাইপযুক্ত গ্যাস এবং সৌরবিদ্যুৎ বিনামূল্যে পৌঁছে দেবে। ইশতেহারে আর্থিক সুবিধার যে বিষয়গুলি গুরুত্ব পেয়েছে তা হল:

এ তো গেল আর্থিক প্রতিশ্রুতির দীর্ঘ তালিকা। আগামী দিনে দেশের জনগণ কোন সুযোগসুবিধাগুলি পেতে পারেন তা নির্ভর করছে কোন দল ক্ষমতায় আসবে তার উপর— যে-প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে ৪ জুনের পর। কিন্তু প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে কিনা তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলির সদিচ্ছার উপর। এই প্রশ্নের উত্তর জানতে অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘ ৫ বছর।

 

পড়ুন, ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০২৪

 

২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশের সরকার চালাচ্ছে বিজেপি। অভিজ্ঞতা বলছে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির গুরুত্ব বিজেপির কাছে কখনওই তেমনভাবে ছিল না, যা স্পষ্ট হয়েছিল গত নির্বাচনের আগে। ২০১৯ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি তাদের ইশতেহার প্রকাশ করেছিল প্রথম পর্বের নির্বাচনের মাত্র ৩ দিন আগে। এবারেও তারা নির্বাচন শুরুর ঠিক ৫ দিন আগে ইশতেহার প্রকাশ করল। বিজেপির কাছে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির গুরুত্ব ঠিক কতখানি তা খুঁজতে ফিরে যেতে হবে ২০১৯ সালে। এবার দেখা যাক ১৭তম লোকসভা নির্বাচনের আগে তারা কী কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং তার কতটুকু রাখতে পেরেছে। এখানেও আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে শুধুমাত্র আর্থিক প্রতিশ্রুতি।

 

বিজেপি-র ইশতেহারে আর্থিক প্রতিশ্রুতি: ২০১৯

২০১৯ সালে বিজেপির ইশতেহারের নাম ছিল ‘সঙ্কল্পিত ভারত সশক্ত ভারত’। স্বাধীনতার ৭৫ বছরে (২০২২ সাল) বিশেষ ৭৫টি মাইলফলক ছোঁয়ার প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে আলাদা করে বলা থাকলেও বিজেপি প্রধানত জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। তাদের ইশতেহারে অর্থনীতির যে-বিষয়গুলি গুরুত্ব পেয়েছিল:

 

বিজেপির ২০১৯-এর প্রতিশ্রুতি: বাস্তবে কী হল

এখন দেখা যাক ২০১৯ সালের বিজেপির এই প্রতিশ্রুতি কতটা পূর্ণ হল।

 

পড়ুন, গুজরাত গণহত্যার বিচার হয়নি

 

অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির বিচারে গত ৫ বছরে বিজেপি সরকার ইশতেহারী প্রতিশ্রুতির ধার দিয়েও যায়নি— পরিসংখ্যান তেমনই বলছে। তবে ১৮তম নির্বাচনের আগে ইশতেহার প্রকাশ করতে গিয়ে বিজেপি বলেছে গত ১০ বছরে তাদের দেওয়া সমস্ত প্রতিশ্রুতিই তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে!

 

ইশতেহার: কংগ্রেসের অতীত সাফল্য

প্রশ্ন হল, কংগ্রেসের দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির গ্রহণযোগ্যতা কতখানি? ২০০৪ ও ২০০৯-এ কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আমজনতার স্মরণে থাকার কথা নয়। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা বলছে, ২০০৪-২০১৪— এই ১০ বছর ইউপিএ সরকার অনেকটাই ইশতেহারমুখী ছিল, বিশেষ করে অর্থনীতির বিষয়গুলিতে।

এখন অপেক্ষা মানুষ কার প্রতিশ্রুতিতে ভরসা করেন। বিজেপি-র ‘মোদির গ্যারান্টি’তে না কংগ্রেসের ‘ন্যায়পত্রে’। মোদির গ্যারান্টি আসলে ব্যক্তিপূজন। অন্যদিকে ন্যায়পত্র অনেকটাই দলীয় প্রতিশ্রুতি। আগামী ৪ জুন যদি দেখা যায় মানুষ ব্যক্তিপুজোয় রায় দিয়েছেন তাহলে বুঝতে হবে ইশতেহারের মৃত্যুঘন্টা বাজল। আর দলীয় প্রতিশ্রুতির জয় হলে ভারতীয় রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাবে নির্বাচনী ইশতেহার বা ম্যানিফেস্টো।


*মতামত ব্যক্তিগত