Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

পড়া, না-পড়া, আধপড়া…

পরিমল ভট্টাচার্য

 

আমার পড়ার ঘরে বইয়ের আলমারিগুলোর দিকে তাকালে হঠাৎ কখনও আমার বহুতল আবাসনের কথা মনে হয়। তাকে পরপর সাজানো একেকটি বই যেন একেকটি ফ্ল্যাট, একেকটি পরিবার। বহু বিচিত্র গল্প, ইতিহাস, বিচিত্র সম্পর্কের টানাপোড়েন পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে সহাবস্থান করছে। আবাসনের পুরনো ঠিকে কাজের লোকের মতো আমি এই বেশিরভাগ ফ্ল্যাটের হালহদিশ জানি, অন্তত জানি বলেই মনে করি। তবু এরই মধ্যে কিছু কিছু অগম্য রয়ে যায়। আসা যাওয়ার পথে কখনও তাদের আমি আড়চোখে দেখি, হাওয়ায় জানলার পর্দা সরে যায়। মধ্যরাতে কখনও গান ভেসে আসে, অথবা হাসি, দাম্পত্য কলহ, চাপা কান্নার ধ্বনি। সকালে বারান্দায় একটি ডোরাকাটা শার্ট একটি বেগনি কুর্তির ওপর গিয়ে পড়ে, কুর্তি হাওয়ায় সরে সরে যায়। ফ্ল্যাটবাড়ির জানলা কৌতূহলভরে আমার দিকে চেয়ে থাকে, নাকি আমিই ওর দিকে, ঠিক বলতে পারব না। তবে চার চোখের মিলন পরিপূর্ণ হলে তবেই একদিন আমি দরজায় গিয়ে বেল টিপি।

এমনই একটি ফ্ল্যাট, মানে বই, নির্মল কুমার বসুর বিয়াল্লিশের বাংলা (কারিগর, ২০১২)। বিশিষ্ট নৃতত্ত্ববিদ নির্মল কুমার ১৯৪২ সালে গান্ধীজীর অহিংস আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতার হন। দমদম সেন্ট্রাল জেলে রাজবন্দি হিসেবে থাকাকালীন তিনি বিভিন্ন জেলার কয়েদিদের মুখ থেকে অবিভক্ত গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের জীবনধারা, কৃষিজপণ্য, হস্তশিল্প ইত্যদির এক অনুপুঙ্খ বয়ান ডায়েরিতে টুকে রেখেছিলেন। সেই ডায়েরি থেকেই তৈরি হয়েছে এই বই। অত্যন্ত সুমুদ্রিত বইটি বছর চারেক আগে আমায় উপহার দিয়েছিলেন এক বন্ধু। পড়ার ব্যাপারে আমার রুচি পছন্দের ধরণের সঙ্গে বন্ধু পরিচিত, এই ধরণের একটি আকাঁড়া তথ্যভিত্তিক বই যে আমার ভালো লাগবে সেটা তিনি জানেন। কিন্তু বইটি এতকাল আমি পড়িনি, পরস্পরে আড়ে আড়ে চেয়েছি মাত্র। বার কয়েক হাতে তুলে নিয়েছি। যেকোনও একটি পাতা খুলে চমৎকৃত হয়েছি; যেমন —

আজিম গঞ্জ, ধুলিয়ান, ভাগলপুর প্রভৃতি জায়গার পটল, মাছ, ইত্যাদি চালান আসে। স্থানীয় জিনিসের মধ্যে দই, ঘি, হাতা, খুন্তি, বঁটি, পেরেক, কড়াই, হাঁসকল আসে। দুমকার কাঠ হইতে বিহারী ছুতোরের তৈয়ারি দরজা, জানলা, চেয়ার, টেবিল, কড়িবরগা আমদানি হয়। রামপুরহাট হইতে এক মাইল দূরে ব্রাহ্মনী গ্রামে অনেক তেলির বাস। ইহাদের ঘানি ফুটাযুক্ত, বলদের চোখে ঠুলি। চালানি সরিষা পেড়িয়া তেল বেচে। স্থানীয় তিল হইতেও কিছু তেল মাখিবার ও খাইবার জন্য পেড়িয়া বেচা হয়… (পৃষ্ঠা ২৭৭-৭৮)

এই ধরণের তথ্য, তথ্যের বয়ন, আমাকে টানে। এই টান থেকেই একসময় বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারগুলো পড়তে শুরু করেছিলাম। পরে ড্যাঞ্চিনামা বইতে ফুটে উঠেছে সেই পাঠ। আবহমান কাল ধরে মানুষের জীবনজীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই খুঁটিনাটি নৃতাত্ত্বিক তথ্যগুলো সাহিত্যের উপাদানই শুধু নয়, কোনও কোনও বিশেষ প্রেক্ষিতে সাহিত্যের অঙ্গ হয়ে উঠতে পারে বলেও মনে হয় আমার।

বিয়াল্লিশের বাংলা বইতে অবিভক্ত গ্রামবাংলা যে অনুপুঙ্খতায় ফুটে উঠেছে, তার অনেক কিছুই এখন আর নেই। কালের নিয়মে হারিয়ে গিয়েছে। যেসব জীবিকা, জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন বস্তুগত উপাদান নির্মলবাবু লিপিবদ্ধ করেছেন, তার কিছু কিছু এখন আর কোথাওই খুঁজে পাওয়া যাবে না। হয়তো অনেক জায়গার নামও বদলে গিয়েছে দেশভাগের পর। কিন্তু যখন কল্পনা করি — বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা একদল গ্রাম্য মানুষ, কয়েদি, তারা পরাধীন দেশের ব্রিটিশ জেলে কারাবাস করছে, হয়তো তার মধ্যে যাবজ্জীবন দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্তও আছে, একজন দেশপ্রেমী নৃতাত্ত্বিকের সামনে বসে স্মৃতি হাতড়ে খুঁড়ে আনছে তার গ্রামদেশের অজস্র আপাততুচ্ছ খুঁটিনাটি, নানান ব্যবহারিক বস্তু আর উপাদানের কথা, যা তাদের নিজেদের কাছেই ফুটে উঠছে এক অদ্ভুত বিশিষ্টতায়। আর এইভাবে তারা, একদল সাধারণ নিরক্ষর গ্রাম্য মানুষ, হয়তো সমাজের চোখে অপরাধী, নিজেদের মধ্যে আবিষ্কার করছে স্মৃতির আশ্চর্য সব অঞ্চল, পরিবার পরিজন ছেড়ে তাদের এই কারাবাসের বিচ্ছেদ বিরহের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ছেড়ে-আসা দেশ-গাঁর প্রতি, সেখানকার বিভিন্ন বস্তুগত উপাদানের প্রতি, এক অন্যরকম অনুভূতি, যা তারা আগে কখনও অনুভব করেনি। সেইসব তুচ্ছ কড়াই পেরেক হাঁসকল বলদের ঠুলির ওপর আরোপিত হচ্ছে প্রত্নউপাদানের মূল্য, ঠিক যেভাবে মূল্যবান হয়ে ওঠে মাটি-খুঁড়ে-তুলে-আনা ভাঙা মৃৎপাত্র আর বর্শার ফলা।

ওরহান পামুকের মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স (ফেবার, ২০১০) নামে একটি উপন্যাস আছে। এই একই নামে তাঁর তৈরি করা একটি সত্যিকারের মিউজিয়ামও আছে ইস্তানবুল শহরে। সেখানে আছে বিভিন্ন ধরণের ব্যবহৃত সাধারণ গৃহসামগ্রী — রেডিও, শিশুর সাইকেল, ল্যাম্প শেড, বাঁধানো ছবি, অচল ঘড়ি, ছেঁড়া দস্তানা, পেতলের বাক্স, পুরনো কার্পেট… এসবই তিনি সংগ্রহ করেছেন ইস্তানবুলের বিভিন্ন জাঙ্ক শপ থেকে। আর তারপর সেইসব আপাততুচ্ছ বস্তুগুলোকে জুড়ে জুড়ে লেখা হয়েছে উপন্যাসটি। আগে সংগ্রহ হয়েছে মিউজিয়ামের সামগ্রী, তারপর লেখা হয়েছে কাহিনি। কাহিনির আলোয় দীপ্যমান অবিনশ্বর হয়ে উঠেছে সেইসব বাতিল ব্যবহৃত জিনিসগুলি, যাদের আবর্জনার স্তূপে নিক্ষেপ হবার কথা ছিল, বর্জচুল্লিতে পুড়ে খাক হবার কথা ছিল।

আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় লেখক বাতিল ব্যবহৃত জিনিসের বাজারে ঘুরে ঘুরে তাঁর লেখার উপাদান সংগ্রহ করেছেন, মূলত পুরনো ছবি আর চিঠিপত্র দস্তাবেজ টিকিট চিরকুট ইত্যাদি। তিনি উইনফ্রিড গিয়র্গ সেবাল্ড। তাঁর রচনায় (ভার্টিগো, দ্য রিংস অব স্যাটার্ন, অস্টারলিজ, দ্য এমিগ্রেন্টস ইত্যাদি) সেইসব পুরনো ফটোগ্রাফ আর দস্তাবেজের টুকরো ব্যবহৃত হয়েছে, ছাপা হয়েছে বইয়ের পাতায়। কোনটা আগে ঘটেছে — একটি পূর্বপরিকল্পিত কাহিনি-কাঠামোর দ্বারা চালিত হয়ে উপাদান সংগ্রহ, নাকি বস্তু উপাদান থেকে গড়ে উঠেছে ন্যারেটিভ, যেমনটা পামুকের উপন্যাস মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স — সেটা বলা যায় না। তবে ঠিক ইলাস্ট্রেশানের মতো করে নয়, ছবি আর ন্যারেটিভ অনেকটা যেন পরিপূরকের কাজ করেছে। পুরনো ফোটোগ্রাফ আর দস্তাবেজের টুকরোগুলো কাহিনির বয়নকে একটা অন্যরকম গভীরতা দিয়েছে, অন্যদিকে তুচ্ছ বিস্মরণীয় ছবিগুলোর ওপর এসে পড়েছে অদ্ভুত মেদুর এক আলো, যে আলোয় হয়তো দীপ্যমান হয়েছিল ১৯৪২ সালে দমদম সেন্ট্রাল জেলের সেই কয়েদিদের স্মৃতি-খুঁড়ে-আনা সামগ্রীগুলো।

নৃতত্ত্ববিদ নির্মলকুমার যখন কয়েদিদের জবানি থেকে তথ্য ছেনে লিপিবদ্ধ করছেন তাঁর ডায়েরির পাতায়, সেই সময়কালটা ছিল ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ। এইসব কয়েদিরা এরপর ফিরে যাবে এক বদলে-যাওয়া গাঁ-ঘর দেশকালে, যেখানে এইসব কড়া ছিটকিনি হাঁসকল কলুর বলদের চোখের ঠুলি সরষে মাড়াইয়ের গন্ধ দিয়ে গড়া স্মৃতির বস্তুবিশ্ব হয়ে উঠবে তাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। অন্যদিকে জার্মান লেখক সেবাল্ডের সব রচনাতেই এক তীব্র কানফাটানো নৈঃশব্দের মতো ফিরে ফিরে আসে নাৎসি আমলের ইহুদি নিধন বা হলোকস্ট। টিঁকে-যাওয়া বেঁচে-ফেরা মানুষের টুকরো টুকরো স্মৃতির মধ্যে দিয়ে যেভাবে গড়ে ওঠে রচনার বুনন, সেভাবেই এই বইয়ে ব্যবহৃত ফোটোগ্রাফ আর দস্তাবেজের টুকরোগুলো ভাষার অতীত এক বিভীষিকার গল্প বলে — সেইসব মানুষদের গল্প, যারা ‘রাত্রি আর কুয়াশার’ (Nacht und Nebel)  রেলগাড়িতে চড়ে চলে গিয়েছিল, তারপর জার্মানি আর পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন জাঙ্ক মার্কেটে ফিরে এসেছিল তাদের ব্যবহৃত ঘড়ি, চশমা, বিয়ের আংটি, দাঁত থেকে নিষ্কাশিত সোনা, দেহ-গলানো চর্বি দিয়ে তৈরি সাবান, চুল দিয়ে তৈরি গদি, করোটির চামড়া দিয়ে তৈরি ল্যাম্পশেড… আর এভাবেই মুদ্রিত বই হয়ে ওঠে একাধারে টেক্সট, টেক্সটস, এবং মিউজিয়াম। মিউজিয়াম অব সায়লেন্স।

সেবাল্ডের বইগুলোর প্রসঙ্গে ‘রচনা’ কথাটি আমি ব্যবহার করেছি সচেতনভাবেই। তাঁর প্রতিটি বইয়ের পেছনে লেখা থাকে — ফিকশন, মেমোয়ার, ট্রাভেলগ, হিস্ট্রি… তাঁর বইগুলো এই সবকিছুই, অথবা কোনওটিই নয়। আসলে এগুলি সবই উপন্যাস। গোটা বিশশতক জুড়ে বিশ্বসাহিত্যে উপন্যাসের সংজ্ঞা যেভাবে প্রসারিত হয়ে এসেছে, যেভাবে বিভিন্ন গোত্রের বয়নের ফর্ম আত্মস্থ করেছে উপন্যাস, ফিকশন আর ননফিকশনের মাঝে আলোআঁধারি অঞ্চলগুলোয় যেভাবে অনুসন্ধান হয়েছে, সেবাল্ডের লেখায় (এমনকি বোর্হেসের রচনাতেও) গোত্রনির্ধারণের এই সচেতন প্রত্যাখ্যান সেই কথাই আমাদের মনে পড়িয়ে দেয়। মনে পড়িয়ে দেয় আধুনিক কালের অন্যতম প্রথম উপন্যাস ড্যানিয়েল ডিফোর রবিনসন ক্রুশো (প্রকৃত শিরোনামটি ছিল বেশ দীর্ঘ — The Life and Strange Surprizing Adventures of Robinson Crusoe, Of York, Mariner: Who lived Eight and Twenty Years, all alone in an un-inhabited Island on the Coast of America, near the Mouth of the Great River of Oroonoque; Having been cast on Shore by Shipwreck, wherein all the Men perished but himself. With An Account how he was at last as strangely deliver’d by Pyrates) প্রকাশিত হয়েছিল স্মৃতিকথা হিসেবেই, প্রথম পাঠকেরা সেভাবেই রচনাটিকে নিয়েছিলেন। উপন্যাসের কথন কীভাবে এই বিবিধ ফর্মকে নকল করে, অনেকটা হরবোলার মতো, কীভাবে তার এই ভূমিকা সূচিত হয়েছে আদি থেকেই, কীভাবে একরৈখিক কাহিনির ভেতরে থেকে যায় প্রতিস্পর্ধী চোরা কাহিনি, সেকথা আমাদের ফের মনে করিয়ে দিলেন জন ম্যাক্সওয়েল কট্‌সিয়া, ড্যানিয়েল ডিফো ও তাঁর কল্পিত রবিনসনকে নিয়ে লেখা তাঁর ফো (১৯৮৬, ভাইকিং প্রেস) উপন্যাসে।

নতুন বছরে এইসব পড়া, না-পড়া, আধ-পড়া বইগুলোকেই পড়ব।