অঞ্জলিভাষা

সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়  

 



কবি, চিত্রনাট্যকার, শিক্ষক

 

 

 

 

“আমার অঞ্জলিভাষা— সেও ভেসে যায় ওই স্রোতে…”

এমন একটি লেখার সামনে বসতে গিয়ে কষ্ট আর দ্বিধা একইসঙ্গে বাসা বাঁধছে মনের ভিতর। কষ্টের কারণ আলাদাভাবে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই জানি, দ্বিধার কারণ এই, যে এ লেখা লিখতে গেলে ব্যক্তিগত স্মৃতিই এসে পড়বে, কিন্তু অন্তর থেকে জানি ওঁকে নিয়ে লেখা কোনও ‘ব্যক্তি’র কর্ম নয়। এমনকী আজ এক্ষুণি হয়ত সমষ্টিরও না, ওঁকে নিয়ে লিখবে বহমান আগামী, সময়ের পরতে পরতে নতুন করে পড়া হবে শঙ্খ ঘোষকে। হ্যাঁ, সচেতন হয়েই ‘শঙ্খ ঘোষের লেখা’ না লিখে ‘শঙ্খ ঘোষকে’ লিখলাম, কেননা ওঁর কবিতার থেকে খুব দূরে সরে দাঁড়ায়নি ওঁর জীবন, আবার উল্টোটাও সত্যি, ওঁর জীবনের থেকেও খুব দূরে সরে দাঁড়ায়নি ওঁর কবিতা। তাছাড়া ওঁর জীবনও ওঁর কবিতার চেয়ে কম মূল্যবান পাঠ্য নয়। কোথায় শুরু করব আর কোথায় গিয়ে থামব এই সংশয়ের মাঝে এটুকু মেনে নিয়েই আমার অঞ্জলি অর্পণ করছি, যে এক থালা ফুলের মধ্যে এ কেবল একটিমাত্র বেলপাতা, রঙিন ফুলের মাঝে খানিক বিষণ্ণ ও কুণ্ঠিত।

“পীতল মুখে শূন্যে ঝোলে সূর্য সারা দুপুর“

শঙ্খবাবুকে ‘স্যার’ ডাকতে বড় অসুবিধে হত আমার, ওঁর সঙ্গে এই নামটা একেবারেই যায় না, এমনই ধারণা ছিল আমার, আর তাই মনে মনে ওঁর একটি নাম দিয়েছিলাম আমি, যা উনি জানতেনও। ভরা ঘরে না ডাকলেও, আমার কাছে উনি ছিলেন সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অচলায়তন’-এর দাদাঠাকুর। যাঁর কাছে পঞ্চকরা বারবার যায় প্রশ্রয়ের জন্য। ওঁর লেখা, ওঁর বাড়ির রবিবারের আড্ডা এসব নিয়ে নতুন করে আমার লেখবার কিছু নেই, আমি বরং আমার পুজোর কথাই লিখি। ঈশ্বর নিয়ে সংশয় আছে আমার, কিন্তু শঙ্খ ঘোষ নিয়ে ছিল না কোনওদিনও। নেইও। দশম শ্রেণিতে প্রথম পড়ি শঙ্খ ঘোষের শ্রেষ্ঠ কবিতার সঙ্কলন। মা বাবা কিনে দেন বইমেলা থেকে। আর একাদশ শ্রেণিতে আমার প্রথম দেখা হয় ওঁর সঙ্গে। ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকায় আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল আর সেই পত্রিকা হাতে তুলে দিতে ডেকেছিলেন শঙ্খবাবু, সন্দীপন (চক্রবর্তী) দা-র মারফত। আমি শুধু চুপ করে বসে ভেবেছিলাম ‘ইনিই বুঝি লিখেছেন অন্ধের স্পর্শের মতো’? ততদিনে সেও পড়া হয়ে গিয়েছে আমার। সব কথায় ‘আমি’ না বলে ‘আমরা’ বলতে হয় তা আমি শিখেও ফেলেছি সেই বই থেকে। সেই প্রথম দিন থেকে ওঁর কাছ থেকে এক আশ্চর্য প্রশ্রয় পেয়েছিলাম, যা হয়ত সকলেই পেয়েছেন, আর সকলেরই মনে হয়েছে সে-ই পঞ্চক। আসলে দাদাঠাকুররা তো এমনই। যত সময় গিয়েছে সেই প্রশ্রয়, ভালোবাসা আর স্নেহ বেড়েছে তা আমি টের পেয়েছি, সত্যি বলতে কী, উনি পাইয়েছেন। ওঁর আচরণের মধ্যে এমন এক আন্তরিকতা ছিল, আর চুঁইয়ে পড়া স্নেহ, যে সমস্ত গ্লানি সেইখানে এসে ম্লান হয়ে যেত। সেদিন সেই শ্বেতশুভ্র ধুতি পাঞ্জাবি পরে এসে বসলেন যখন, এক ঘর লোক, আমি চুপ করে বসে আছি বাবা মায়ের সঙ্গে, আমার সত্যিই মনে হয়েছিল্ আমি এমন কাউকে আগে দেখিনি, আর আজ বলতে পারি জোর দিয়ে,  পরেও দেখিনি। ওঁর মুখে, চোখে সমগ্র ব্যক্তিত্বে এক আশ্চর্য জ্যোতি ছিল যা বিরল। সে জ্যোতির ভিতর ছিল জীবনের আশ্চর্য কোনও ছন্দ। যে ছন্দে একইসঙ্গে বেজে উঠত আলো-ছায়া।

“তোমার কোনও ধর্ম নেই, এই/ শূন্যতাকে ভরিয়ে দেওয়া ছাড়া”

খুব ছোট্ট থেকে মৃত্যুকে ঘিরে এক আশ্চর্য ভীতি আমার। মৃত্যুর প্রতি নয়, বরং এক অস্তিত্বহীনতার প্রতি। এই যে এই পৃথিবীতে রাস্তা থেকে যাবে, বাড়ি থেকে যাবে, কিন্তু আমি থাকব না, এ কথা হঠাৎ হঠাৎ আমাকে তাড়া করে নিয়ে বেড়াত। শরীর খারাপ হয়ে যেত, ঘেমে যেতাম খুব। আর সারাদিন মনে হত আমি মৃত্যুকে বয়ে বেড়াচ্ছি নিজের ভিতর। এখনও কি হয় না? হয়, কিন্তু তার রকম আলাদা। তা রকমখানা বদলাল কীভাবে? লিখি…। যে কথা কাউকে বলা যায় না, সে কথা বলা যায় কেবল ঈশ্বরকে। ফলে আমারও মনে হয়েছিল, একবার কি আমার ঈশ্বরকে বলে দেখব? আর বলা মাত্র কী সহজ হয়ে গিয়েছিল আমার সেই ভাবনা। উনি বলেছিলেন ‘তুমি তো সত্য দর্শন করছ সম্রাজ্ঞী, আর সত্য দর্শন করলে ভয় পেতে নেই। আমরা তো মায়ায় জড়িয়ে থাকি, ইলিউশন। তাই মৃত্যুকে উপলব্ধি করতে পারি না। মাঝে মাঝে তোমার মায়ার আস্তরণ সরে যাচ্ছে আর তুমি সত্যকে দেখতে পাচ্ছ, তাকে গ্রহণ করে নাও, ভয় পেও না।’ এমন সহজ করে জীবনকে, মৃত্যুকে উপলব্ধি করা যায়, আর করেও স্বাভাবিক একটা জীবনে বেঁচে থাকা যায়, তা হয়ত ওঁকে ছাড়া আমি আর কাউকে দেখিনি। আমি কি পেরেছি তা গ্রহণ করতে? উঁহু, কিন্তু চেষ্টা করেছি। করছি এবং করব। পারব না জেনেও করব। কারণ ওঁর কথার মধ্যে এমন এক জোর ছিল যা কারও পক্ষে অমান্য করা সম্ভব নয়। মনে আছে, অনেক রাত সেদিন, উনিই সময় দিয়েছিলেন ফোন করার। কথা হচ্ছে, হতে হতে জানিয়ে ফেলেছি অনেক দোলাচলের কথা, মন আর মনের অসামাজিকতার কথা, আর উনি উলটো দিক থেকে শান্ত হয়ে শুনে অনেকক্ষণ ধরে সেদিন বলেছিলেন ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাসটির কথা। বলেছিলেন ‘তোমার কথা শুনে দামিনীর কথা মনে পড়ছে, আর একবার ফিরে চতুরঙ্গটা পড়ো তো। দেখো তো উত্তর পাও কিনা।’ বলাই বাহুল্য, পেয়েছিলাম। পরে অবশ্য পড়েছিলাম ওঁর ‘দামিনীর গান’ বইটিও। আরও ভালো করে বুঝেছিলাম ওঁর দামিনীকে, যার প্রতি রবীন্দ্রনাথের চেয়ে শঙ্খ ঘোষের কিছু কম অধিকার বলে মনে হয় না। তবে আমার প্রাপ্তি সেদিন ব্যক্তিগত দোলাচল, সংশয় আর অন্ধকার ছাপিয়ে আরও একটু বেশি হয়েছিল। তা হল এই, যে ওঁর কাছ থেকে চতুরঙ্গের ভাবনাখানা, ও রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বেশ কিছু কথা শুনতে পেরেছিলাম।

“দুঃসময়ে তখন তুমি জানো/ হলকা নয় জীবন বোনে জরি”

কৃত্তিবাস পত্রিকার সদ্য দায়িত্ব পেয়েছি তখন আমি আর অভিজিৎ (বেরা) দা। তবে শঙ্খবাবুর লেখা আনার দায়িত্ব মূলত আমার উপরই। ওঁর থেকে লেখা পাওয়ার জন্য নিজেরও একটা প্রস্তুতির দরকার। অর্থাৎ মাঝে মাঝে গিয়ে আলতো করে বলা, ‘লেখাটা?’ উনি যথারীতি স্মিত হেসে চুপ করে থাকবেন, মানে ‘এখনও হয়নি’। আমিও ‘আচ্ছা আচ্ছা, সাতদিন পরে নাহয় খোঁজ নিই’ বলে চুপ করে যাব। উনি হয়ত বলবেন দশদিন। এমনই এক রবিবার ওঁকে প্রণাম করে চলে আসছি, হঠাৎ বললেন “পায়ে চাপড়টা কি একটু জোরে মারলে সম্রাজ্ঞী?”, কী বলব বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে আছি, উনি সেই অবিচল স্মিত হাসি হেসে বললেন “না ভাবলাম, লেখা দিচ্ছি না বলে বুঝি প্রণামের ছলে পায়ে একখানা চাপড় মেরে গেলে।” আমি জিভ কেটে তাড়াতাড়ি বলি “আপনার জন্য না একদিন পাপে ডুবে মরব আমি”, উনি বলেন “পায়ে মারলে বুঝি পাপ হয়?” এ তর্কে আমার হার নিশ্চিত জেনেই, আমিও ওঁর অস্ত্র ব্যবহারের চেষ্টা করি অর্থাৎ– স্মিত হাসি। এই গল্প বলা এই কারণেই যে জীবন মৃত্যুকে উপলব্ধি করার পাশাপাশি জীবনের রসবোধকে উপভোগ করা আর চর্চা করায় কোনও ত্রুটি ছিল না ওঁর। এমনকী আমার মতো কেবল বয়সে নয় সমস্তভাবে অনেক ছোট কারও সঙ্গে তা ভাগ করে নিতেও কোনও অস্বস্তি ছিল না ওঁর।

“দুহাত দিয়েই ধরেছিলাম, রইল না তো তবু/ হাতেই কোনও ভুল ছিল কি তবে?”

কৃত্তিবাসের জন্যই একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার আবদার জানাই। রাজিও হন উনি। আর সেই সুবাদেই টানা তিনদিন পরপর বহু বহু ঘণ্টা কাটিয়েছিলাম ওঁর কাছে। তখন গলার স্বর বুঝতে একটু অসুবিধে হত, তাই ওঁর চেয়ারের একদম পাশটাতে গিয়ে বসতাম আমি, উনি বলতেন আর আমি লিখতাম। সেইসময়টা নিয়ে লিখতে গেলে আলাদা একটি লেখাই হয়ত দরকার পড়বে, কিন্তু যেটা লিখতে চাই সেটা হল এই, যে সকলের প্রতি, সকলের মনের প্রতি ওঁর নজর। সাক্ষাৎকারের প্রুফ নিয়ে গিয়েছি সেদিন, উনি পড়ে বললেন “আগে বলো, পুরোটা লেখোনি কেন।” আমি আবারও অবাক। এমন বকুনি জুটছে কেন, এর আগে অবশ্য একটা বানান ভুল করায় বড় চমৎকার ধরনের একটা বকুনি জুটেছিল আমার, বহু বছর আগে। কিন্তু এইবার কী হল? সবই তো লিখেছি আমি। কিন্তু উনি অনড়। বাধ্য হয়ে জানতে চাই যে কী লিখিনি। উনি বলেন “সাক্ষাৎকারের শেষটা। আমি যে উত্তর দিলাম। তার আগে তুমি যে অভিমান করলে। সেইগুলো?” এইবার মনে পড়েছে আমার, এমনকি মনে পড়ায় আর ভালো করে তাকাতেও পারছি না আমি, কেননা সেই অভিমান উনি টের পেয়েছিলেন এমন কোনও ধারণাও ছিল না আমার। আমি কোনওরকমে বলি “সে তো আমাদের কথা, পত্রিকায় তা থাকবে কেন,” উনি বলেন ‘তাহলে তুমি যে সাক্ষাৎকারে লিখলে— এইবার জানলা দুলে উঠল ঝড়ে’, আমি তাড়াতাড়ি বলি ‘জানলা সকলের, তাই বলে আমাদের কথা কি আর সকলের?’ ওঁর সঙ্গেই হয়ত একমাত্র যে আমি এমন করে জোর খাটিয়ে খানিক ঝগড়ার ছল করতে পারতাম। এ কথা লিখতে গিয়ে খানিক দ্বিধা হল ঠিকই, কিন্তু যা সত্য তা তো সত্যই। সেইদিনই, দুপুর হয়ে গিয়েছে তখন, আমি ব্যস্ত হচ্ছি, ওঁর স্নান খাওয়ার সময় হল, কিন্তু উনি আমাকে বসতে বলে ভিতরে উঠে যান। ফিরে আসেন হাতে একটি ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র নতুন সংস্করণ নিয়ে। বলেন ‘এইটা তোমার’। খানিক অবিশ্বাসেই চোখ ভিজে ওঠে আমার। কেননা এ এমন একটি বই, যা আমার মাথার সরে থাকে রোজ, কোথাও ঘুরতে গেলেও নিয়ে যাই আমি। আর সেই বই, উনি নিজের হাতে দিচ্ছেন আমায়? কোনও রকমে বলি ‘সই করে দেবেন একটা?’ উনি বলেন, ‘হাত কাঁপে যে’, আমি সঙ্গে সঙ্গে বলি, ‘তাহলে প্রশ্নই ওঠে না।’ তাও উনি বইখানা হাতে নিয়ে কলম দিয়ে লিখে, কলম নামিয়ে রেখে আমায় বলেন, ‘এটা কাউকে দেখিও না, কাঁপা হাতের লেখা তো’। বলি, ‘একদম দেখাব না’। ভালো করে পড়তে পারিনি তখন, ভেবেছিলাম হয়ত সই। অনেক পরে, কাছে নিয়ে দেখি, লেখা আছে ‘সম্রাজ্ঞীর বই’।

“কিন্তু বলবে কোন ভাষায়?”

আরও সব স্মৃতি ভিড় করছে, সঙ্গে এ আশঙ্কাও যে এ লেখা বড় বেশি ‘আমি’ নির্ভর হয়ে পড়ল কিনা। কিন্তু ‘আমরা’তে উত্তীর্ণ হতে গেলে ওঁকে যেভাবে লিখতে হবে, সে শক্তি এখনও আমার নেই। তবে এ কথা বলতে পারি, ওঁর কবিতা, গদ্য আর সবকিছুর পাশাপাশি ওঁর জীবনটাই একখানা আস্ত টেক্সট। পরিধান থেকে যাপন, আন্তরিকতা থেকে অধ্যবসায় সবকিছু ওঁকে আর পাঁচজনের থেকে আলাদা করে রেখেছে সবসময়। এমনকী প্রায়ই শুনি উনি সমস্ত কিছুর প্রতিবাদ করতেন বলে ওঁকে আলাদা করে চেনা গেছে, কিন্তু এ কথা বারবার বলতে গিয়ে আমরা যেন ভুলে না যাই যে প্রতিবাদ করতে যেমন উনি জানতেন, উনি জানতেন প্রতিবাদ না করতেও। অর্থাৎ প্রতিবাদ করতে হবে বলে প্রতিবাদ করেননি কখনও, যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই কেবল প্রতিবাদ করেছেন। প্রতিবাদের নেশায় মত্ত হননি। ওঁর প্রতিক্রিয়া আসলে বাংলার নয় কেবল, ভারতবর্ষের কাছেও এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এই কারণেই যে উনি নির্বাচন করতে জানতেন। জানতেন যে সকল ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজন নেই। এই নির্বাচন ক্ষমতা আমাদের বর্তমান সময়ে বড় একটা চোখে পড়ে না। লক্ষ করা দরকার, ওঁর প্রতিবাদের ভাষা এবং ওঁর স্বর। উঁচু গলায় বা উচ্চকিত ভাষায় কথা না বলেও যে জোরে কথা বলা যায়, ওঁর কবিতা, ওঁর যাপন এবং ওঁর প্রতিবাদ আমাদের বারবার সেই শিক্ষাই দিয়েছে। আমরা তা গ্রহণ করতে পারলে হয়ত এক অন্য সমাজ গড়ে তুলতে পারতাম। কিন্তু পারলাম কি? পারব কি?

লেখাটার একদম শেষ প্রান্তে এসে আরও কিছু টুকরো মনে পড়ছে কিন্তু ভাবছি, সবটুকুই কি কোনও পৃষ্ঠায় লিখে ফেলার? কিছু কিছু আজ মনের ভিতরও থাক। তবে যে কথা না বললে অন্যায় হবে, বাংলা কবিতা বা সাহিত্যে নয় কেবল, শঙ্খ ঘোষের এক বিশাল অবদান রইল বাংলা ভাষাতেও। আমরা যেন সে কথা ভুলে না যাই। যেন ফিরে পড়ি ‘শব্দ নিয়ে খেলা’র মতো বই যে বই উনি লিখেছিলেন কুন্তক ছদ্মনামে। বাংলা ভাষাকে সহজ করে ছোটদের কাছে পৌছে দেওয়া, বুঝিয়ে দেওয়া, এই কাজটিও উনি করে গেছেন আরও অসংখ্য কাজের মধ্যে।

‘সকালবেলার আলো’ কিংবা ‘সুপুরিবনের সারি’ হাতে নিয়ে পড়তে থাকা দুপুরগুলো মনে পড়ছে আজ, মনে পড়ছে মনখারাপ থাকলে ওঁকে লেখা বহু চিঠি, কিছু পাঠানো, কিছু না পাঠানো। সবসময় ভাবতাম, যেদিন আর একদম পেরে উঠব না, সেদিন আবার ছুট্টে চলে যাব, গিয়ে অবশ্য কোনও কথা বলব না, চুপ করে বসে থাকব ভিড়ে। বেরোনোর সময় প্রণাম করে বলব ‘আসি’, উনি বলবেন ‘কিছু বোধহয় বলতে, না?’ আমি ‘না’ বলে চলে আসব, কিন্তু জানব উনি শুনেছেন, উনি জেনেছেন, আর উনি আলো দেখাচ্ছেন কোথাও, যে আলো লুকিয়ে রয়েছে ওঁর কবিতায়, গদ্যসংগ্রহে। আজও সে আলো আছে বাংলা ভাষার বুকে, সেইটুকুই শান্তি। আমাদেরও এইবার ফেরবার পালা, ওঁর অসংখ্য বইয়ের ভিতরই আমাদের আগামীর ঠিকানা। আমি বাংলা ভাষার ও সাহিত্যের সামান্য পাঠক, তবু এ কথা বলতে পারি, কেবল সাহিত্য নয়, আমাদের ভাষাখানাও ঋণী রইল শঙ্খ ঘোষের কাছে।

ওঁর থেকেই ভাষা ধার করে এ লেখা শেষও করি এইবার…

“মনের মধ্যে ভাবনাগুলো ধুলোর মতো ছোটে
যে কথাটা বলব সেটা কাঁপতে থাকে ঠোঁটে,
বলা হয় না কিছু—
আকাশ যেন নামতে থাকে নিচুর থেকে নিচু
মুখ ঢেকে দেয় মুখ ঢেকে দেয়, বলা হয় না কিছু।”

(অন্যরাত)

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3316 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...