Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বাড়ি

মোহাম্মদ ইরফান

 

“পা-রুল, পা-রুল, এই পারুনী।”

মালিহার হাই পিচ আওয়াজ এক চিলতে বারান্দা আর ছোট্ট ড্রইং-ডাইনিং পেরিয়ে রান্নাঘরে পৌঁছে যায় সহজেই। হাতের কাজ ফেলে নিমেষে উঠে দাঁড়ায় পারুল — কিছুটা অভ্যাসে, বাকিটা আতঙ্কে — মুহূর্তে উড়ে আসে মালিহার বারান্দা কাম উঠোনে।

“ওটা কার?” মেজাজের সমান তালে গলা চড়ায় মালিহা। কর্ত্রীর তর্জনে ত্রস্ত হয় পারুল। নিজের অজান্তেই আশ্রয় চায় বড়কর্তার কাছে, অস্ফুটে, “ওরে মোর আল্লা।”

“কী বললি? তোকে না বলেছি আমাকে খালা বলবি না — আপা বলবি। এ্যাই পারুনী, আমাকে কি খালাম্মাদের মতো দেখায়?”

“আমি আমনেরে খালা কইমু কিয়েরতে? আমি আমার আল্লারে ডাকছি। কোনও অসুবিদা আছে আমনের? নিজে তো ভুলেও আল্লার কতা মুহে লয় না, আমরা লইলেও দোষ। আজরাইলে যেদিন আইবে, হেইদিন বোজবে আনে।” সুযোগ পেয়ে মালকিনের উপর মুড মারে পারুল। আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে ঘুরে তাকায় “ওটা”র দিকে।

পারুলের আত্মপ্রাসাদ অবশ্য নজরে আসে না মালিহার। আসেনি কখনও।

“আমার উঠোনটা কি কারও কাপড় শুকোনর জায়গা?” বিকেলের হাওয়া ভারী হয়ে ওঠে মালিহার ভদ্রোচিত ভর্ৎসনায়।

যাকে উদ্দেশ করে বলা সেই “কারও” কানের পর্দায় ঠিকঠিক আঘাত করে মালিহার তিরষ্কার। তিনি মালিহারই ভূতপূর্ব বান্ধবী বর্তমান ননদ পুতুল। ননদ-ভাবীর নিত্যকার টানাপোড়েনে কলেজ কলিজুদের দোস্তি দূর অস্ত এরই মধ্যে। পুতুলের বাবার রেখে যাওয়া ছোট্ট দোতলা বাড়িটা যত নষ্টের গোড়া। চাকুরি জীবনের শেষে পেনশন বিক্রির টাকায় শহরের প্রান্তে আড়াই কাঠা জমি কিনে নিজের প্ল্যানে নিজে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড খাটুনি আর পরম মমতায় বাড়ি শেষ করার ঠিক পরের বছর বকরি ঈদের দিন পরপারে পাড়ি জমান সফদর সাহেব। নিজের সিঁড়িতলায় চাটাই পেতে নিজ হাতে কুরবানি দেয়া মাংস কাটাকুটি করে ক্লান্ত স্বামীর জন্য সেদিন নানান আয়োজন করেছিলেন পুতুলের মা। পরিশ্রান্ত পরিতৃপ্ত সফদর সাহেব গভীর রাতে বুকের ব্যথায় ঘুম ছেড়ে উঠে বসেন। কিছুটা বাড়ি বানানোর ঝুটঝামেলায় কিছুটা ব্যয়বহুল কোনও জরাজনিত জটিলতা উদঘাটিত হওয়ার আশঙ্কায় বুকের টুকটাক ব্যথা অবহেলা করেছিলেন ভদ্রলোক। উৎসবে স্থবির ঈদের সন্ধ্যায় বাহন যোগাড় করে চিকিৎসকের ঠিকানায় পৌঁছানোর আগেই কল চলে আসে তাঁর, কুরবানি দেয়া ছাগলের পিছুপিছু তিনিও রওয়ানা দেন চূড়ান্ত ঠিকানায়।

নিচতলার ভাড়া, সফদর সাহেবের পেনশনের অবশিষ্টাংশ আর আত্মীয়-পরিচিতদের কাছে ধার দেনা করে পুতুল-পুলকের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনো শেষ করান পুতুলের মা। পড়াশুনোয় বরাবর ভালো করে আসা পুলক ক্লাসের আর সব সেরা ছাত্রদের মতো বিদেশ যাওয়ার চেষ্টাচরিত্র না করে চাকুরি নেয় সাততাড়াতাড়ি, উদ্দেশ্য পরিবারের ধারদেনা শোধ করে পুতুলের বিয়ের খরচের প্রস্তুতি নেয়া। মায়ের কষ্ট লাঘবে বিয়েও করে ফেলে একটি। পাকা দালান আর পাকা চাকুরির জোরে পুতুলের বান্ধবী মালিহাকে ঘরে তুলে আনতে বেগ পেতে হয়নি মোটেই। প্রাণের সখীর সাথে দিনে-রাতে সবসময় মন ভরে গল্প করা যাবে ভেবে পুতুলই সোৎসাহে সম্মতি আদায় করে মালিহার পরিবারের। তবে বিয়ের পরদিন থেকেই উৎসাহে ভাটা পড়তে থাকে পুতুলের। যে বড়ভাইকে সারাজীবন সে আর তার সব বান্ধবী মিলে ভাইয়া আর আপনি বলে সম্মান দেখিয়ে এসেছে, মালিহার এক রাতের ভেতর তাঁকে তুমিতে নামিয়ে নিয়ে আসা পছন্দ হয়নি পুতুলের। সেই যে শুরু এরপর থেকে দুই বান্ধবীর দূরত্ব কেবল বাড়তেই থাকে। পুতুলের নিজের সংসার হবার পর ঝামেলা আরও বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ আর পানির বিল কে কতটা দেবে? তহশীলদারের ডিসিআরে কার নাম থাকবে? সীমানা দেয়াল কবছর পরপর চুনকাম করতে হবে? এসব খুঁটিনাটি ঘিরে খিটিমিটি বেধেই আছে। শরৎবাবুর ‘বৃন্দাবন সামন্তের’ পুত্রযুগলের মতো পুতুল আর পুলকও যে এতদিনে পৃথক হয়ে যায়নি তার পিছে একটা বড় কারণ তাদের মা। মায়ের কাছে থাকবে বলে পুলক তার লাভজনক পদায়ন, এমনকি পদোন্নতিসহ বদলি ঠেকিয়েছে কয়েকবার। পুতুল তার স্বামীকে ভাই-বেরাদরসমেত এনে তুলেছে নিজেদের বাসায়।

তবে ইদানীং যে সমস্যা দেখা দিয়েছ তাতে প্রাপ্তিযোগের পাল্লা মাতৃভক্তির চেয়ে অনেকই ভারি। আজ বিকেলের ঘটনাটিও এই নূতন সমস্যাজাত।

নিজেদের থাকার জন্য একটু বড় করে ফ্ল্যাট বানাতে গিয়ে দোতলায় সামনের বারান্দা বাদ দিতে হয়েছে সফদর সাহেবকে। ফ্ল্যাটের পেছন দিকে দু’ফুট চওড়া বারান্দা নামক একটি বস্তু থাকলেও বড় বড় দালান ওঠার পর কাপড় শুকোনোর রোদটুকুও পায় না আজকাল আর তা। মাকে নিজের কাছে রাখার সুবাদে দোতলার বড় ফ্ল্যাটের দখল পেলেও অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস সময়ে-অসময়ে ঝরে পড়ে তাই পুতুলের গলায়, “উফ, দম বন্ধ হয়ে আসে এই বদ্ধ ঘরে।” এদিকে মশার কামড় আর নর্দমার গন্ধ নিয়ে শত অভিযোগ নিচতলার বাসিন্দা মালিহার। তবে বাড়ির সীমানা প্রাচীর আর নিচের ফ্ল্যাটের মাঝের ছোট্ট জায়গাটিকে সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে বৈঠকখানা থেকে একটি ছোট্ট দরজা কেটে নিজের রাজত্ব বাড়িয়েছে সে ইতঃমধ্যে। এক চিলতে এই উঠোনকে বারান্দা বলতেই বেশি পছন্দ করে মালিহা। অনেকটা বারান্দাবঞ্চিত বান্ধবীর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতেই যেন।

মালিহার সেই বারন্দা কাম উঠোনের ঠিক ওপরেই দোতলায় পুতুলের শোবার ঘর। গোলমাল শুনে দোতলায় শোবার ঘরের জানালায় এসে দাঁড়ায় পুতুল। ঊঁকি দিয়ে নিচের দিকে তাকাতেই পরিষ্কার হয় মালিহার রাগের কারণ। জানালার শিকে দড়ি টানিয়ে কাপড় শুকোনোর ব্যবস্থা করেছে পুতুল। শুকোতে দেয়া কাপড়ের দু-একটা বাতাসের ঝটকায় কখনও কখনও নিচে গিয়ে পড়ে — মালিহার আঙিনায়। মালিহা দেখে ফেলার আগেই অবশ্য উড়ে পড়া কাপড়গুলো কুড়িয়ে আনার চেষ্টা করে পুতুলের বুয়া। যদি কখনও ব্যত্যয় ঘটে তবেই শুরু হয় কুরুক্ষেত্র — যেমন আজ। তবে মালিহার আওয়াজটা আজ বেশ চড়া, ঝাঁজও বেশ কড়া। তবে কি ডেভেলপারের লোক মালিহার দিকেই গেল?

“পারুল, এক্ষুণি এই শার্ট নিয়ে যেতে বল? আর কোনওদিন যদি আমার বারান্দায় অন্যের শার্ট দেখি তবে…” মালিহার চিৎকারে সম্বিৎ ফিরে পুতুলের।

“তয় শার্টের মালিকেরে এহেনে ডাইকা, শার্ড্ডা গায়ের মইদ্যে হান্দাইয়া হের পরে হাত-পা ভাইঙ্গা ছাইর‍্যা দিমু। ঘরের মইদ্যে ঘোরবে আর ঘোরবে। মগর জামা খোলতে পারবে না।” পারুল আবারও এক ধাপ এগিয়ে থাকতে চায় মালিহার থেকে।

পারুলের বাচালতায় কিছুটা লজ্জাই পায় মালিহা। মধ্যবিত্ত শালীনতার ঘেরাটোপে বাঁধা মুখে খিস্তিখেউড় আসে না সহজে। তবে পুতুলের সাথে স্বার্থের দ্বন্দ্বে জেতার জন্য কঠিন কিংবা কর্দমাক্ত কোনও ভাষা ব্যবহারেই দ্বিধা নেই তার, “ঠিক তাই, শার্ট পরিয়ে তা-র-প-র হাত ভেঙ্গে দেব। বুঝবে মজা।”

“এ যে দেখি, বাজনদারের গলায় শিল্পীর সংগত”, মনে মনে ভাবে পুতুল। পুরো জলসাকে আরও বেসুরো করে তুলতে ঝংকার দিয়ে ওঠে সেও, “কি যা তা বলছ? এ বাড়ির লোকদের সব ধরে ধরে লুলা-ল্যংড়া করে দেবে? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?”

“দেব বৈকি, অন্যের জায়গায় কাপড় শুকোতে দিতে লজ্জা করে না?”

“অন্যের জায়গা মানে? বাড়িটা তো আমার বাবার, নাকি? তুমিই তো অন্য বাড়ির মেয়ে?”

“বাড়ি এখন আর বাবার নয়, তার ছেলের। আর এই বারান্দা তো একান্তই আমার, আমার প্ল্যানে বানানো, আমার মায়ের দেয়া টাকায় এর প্রতিটি ইট কেনা। কই তোমাদের বাবা-ভাইবোনের কারও মাথায় তো এটা আসেনি?”

“এই চাতালটুকু তোমার বা পুলক ভাইয়ার নয় শুধু, বাড়ির সবার। এজমালি জায়গায় তোমাকে কিছু বানাতে দেয়াই ঠিক হয়নি। আর একবার যদি তুমি এ জায়গার মালিকানা দাবি করো তো তোমার খবর আছে।”

পুতুলের প্রচ্ছন্ন হুমকির যুৎসই জবাব খুঁজে না পেয়ে ক্ষোভে-দুঃখে কান্না পেয়ে যায় মালিহার। এমনি সময় বাড়ির গেটে বেল বেজে ওঠায় নিজেকে সামলে নেয় সে দ্রুত। কর্তৃত্বের সুর ফিরিয়ে আনে গলায়, “পারুল, দেখ তো কে?”

পারুল পৌঁছুনোর আগেই নিজহাতে গেট খুলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে মফিজ মাতবর। ঝগড়া থেমে যায় ননদ-ভাবীর।

“কোনও খবর হল, মফিজ ভাই?” প্রায় একই সাথে বলে ওঠে দুজনেই। সরাসরি উত্তর দেয় না মাতবর। ননদ-ভাবীর যৌথ মনোযোগ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে চায় সে। মুখে ঝুলিয়ে রাখা হাসিটাকে একটু ছড়িয়ে হাতে ধরে রাখা রং ওঠা ছাতাটা সযত্নে বন্ধ করে। ধীর নরম স্বরে কুশল প্রশ্ন দিয়ে শুরু করে আলাপ, “ভালো? আপারা?”

মফিজ মাতবরের সাথে খাজুরি আলাপ করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই, পুতুল কিংবা মালিহা কারওই। তাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু সিলিকন ডেভেলপার, মফিজ যাদের বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে এই দুপুরের রোদ মাথায় করে।

পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি নামানো ঘাড় আর পনেরো ডিগ্রি উঠানো কাঁধের মাঝে আটকানো ছাতা আর বগলের নিচে চেপে ধরা লাল-নীল চেকের ফাইল নিয়ে দু-হাতে গেট খুলে প্রথম যেদিন এ বাড়িতে ঢুকে পড়ে মফিজ সেদিন কিছুটা বিরক্তই হয়েছিল বাড়ির লোকজন। বিনা অনুমতিতে ঢুকে পড়া ছাড়াও বিরক্তির অন্যান্য যে সমস্ত কারণ মফিজের সুবিস্তৃত সযত্ন লালিত সদা পালিত হাসিতেও পুরোপুরি দূরীভূত হয়নি তার প্রধানতমটি ছিল তার বেশ। অনেকদিন ধরে নলকূপের আয়রনযুক্ত পানি দিয়ে ধোয়ার কারণে সাদা পাঞ্জাবিতে বসে যাওয়া লালচে দাগ, নবিশ দর্জির দেয়া পাজামার ঢোলা ছাঁট আর পাজামার সাথে সম্পূর্ণ বেমানান বাদামী-খয়েরী কেডস সহজেই জানান দিচ্ছিল মফিজের বাস। দ্বিতীয় প্রজন্মের নগরবাসীর কাছে গাঁও-গেরামের লোকজন মানেই উটকো ঝামেলা, বাবা-মায়ের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখাতে গিয়ে এদের ঠিক ফেলেও দেয়া যায় না, আবার এদের অপ্রাসঙ্গিক বকবক, অযাচিত উপদেশ আর (প্রায়ই) অন্যায় আবদার খুব বেশিক্ষণ ধরে নেয়াও যায় না। মফস্বলি মফিজকে তাই মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল পুতুল। মফিজ অবশ্য খুব একটা অখুশি হয়নি তাতে। নাগরিক উত্তরণের এক পর্যায়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষমতার ভারসাম্যে যে লৈঙ্গিক অদলবদল ঘটে তা ভালোই জানা হয়ে গিয়েছিল তার। তাই সে প্রথমেই পুলকের অফিসে না গিয়ে সরাসরি হাজির হয় পুতুলদের বাড়িতে।

ভূষণের গ্রাম্যতা ঝেড়ে ফেলে মফিজ অল্প সময়েই, বাকপটুতার চাতুর্যে। সফদার সাহেবের দোতলা বাড়ি ভেঙে দশতলা করার প্রস্তাব দিয়েছে সিলিকন। উন্নতি উন্মুখ ঝামেলা বিমুখ সুশীল মধ্যবিত্তের জন্য যথেষ্ট আকর্ষণীয় করে প্রস্তাবটিকে হাজির করে মফিজ। ঝকঝকে নূতন ফ্লাট হবে, সুদৃশ্য নকশা, আধুনিক সংযুক্তি, ঢোকার মুখে অভ্যর্থনা কেন্দ্র, আর পুরো নিচতলা জুড়ে গাড়ি রাখার জায়গা। দশতলায় দশটি ফ্ল্যাট, পুতুল আর পুলক দুজনেই দুটো করে ফ্ল্যাট পাবে, মফিজের সদ্যপাতানো খালা অর্থাৎ বেগম সফদর পাবেন আরও একটি। তিনজনেই পাবে নগদ টাকা, যার এক অংশ সাইন-ইন মানি, মফিজের ভাষায় শাইতের টাকা, আর এক অংশ ব্যয় হবে নির্মাণকালীন সময়ের অস্থায়ী আবাসের ভাড়া পরিশোধে। কিছুই করতে হবে না পুতুল-পুলককে। খাজনা নিয়মিতকরণ, ভাগাভাগি, মিউটেশন সবকিছুরই বন্দোবস্ত করবে মফিজ, তহশীল অফিসের প্রতিটি ইট যার অতিচেনা।

মফিজের কথার মাঝে নিচতলা থেকে ছেলের বউকে ডেকে আনান পুতুলের মা। সব কথা শেষ করে মফিজ তাকায় পুতুল আর মালিহার দিকে, “আপারা যদি রাজি হন গরীবেরও একটা উপকার হয়। আমি সিলিকন থেকে সামান্য একটা কমিশন পাব আপনাদের রাজি করাতে পারলে।”

সেদিন কোনও কথা না দিলেও এমন লোভনীয় প্রস্তাবে রাজি হতে বেশি সময় নেয়নি পুতুল আর মালিহা। শুরুতে বাধ সেধেছিলেন মিসেস সফদার, স্বামীর স্মৃতি রক্ষার ওজর তুলেছিলেন, ক্ষীণ কণ্ঠে। মায়ের মৃদু আপত্তি ভেসে যায় মেয়ের জোরালো আবদারে। ছেলে মেয়ের মুখ চেয়ে রাজি হয়ে যান মিসেস সফদার। সিলিকনের ড্রাফট করা নকশা সবাইকে দেখিয়ে নেয় মফিজ। মালিহার দাবিমতো ড্রইংরুমের দেড়ফুট জায়গা কেটে বাড়ানো হয় সামনের বারান্দা। পরিবর্তিত নকশায় সানন্দ সম্মতি দেয় পুতুল।

চুক্তিপত্র স্বাক্ষরের জন্য সবাইকে সিলিকনের অফিসে নিয়ে আসে মফিজ। দু-দুটো ট্যাক্সিক্যাবের ভাড়া দিয়ে দেয় নিজেই। মৃদু আপত্তি করে পুলক, তার তো আর জানা নেই খরচের পাইপয়সা সিলিকন থেকে তুলে নেবে মফিজ, চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিনই। তবে চুক্তি আর স্বাক্ষর হয় না সেদিন। পঞ্চাশ টাকার রাজস্ব টিকিটের এপাশ-ওপাশ ভর্তি করে লিখা চুক্তিনামায় নিজের অটোগ্রাফটি এঁকে দেয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে বেঁকে বসে পুলক।

পুলকের দাবি ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে তার মাকে। ছেলে মেয়ে প্রত্যেকে দুটো করে ফ্ল্যাট পেলে পিছিয়ে থাকবে কেন মা। আগের রাতে পুলককে যথেষ্ট শিখিয়ে পড়িয়ে এনেছিল মালিহা। তবে তার খুব একটা দরকার হয় না।

পুতুলের মনে কোনও সন্দেহ নেই চালটি বেরিয়েছে তার প্রিয় বান্ধবীর মাথা থেকে। তার ভাই তো বিয়ের পরদিন থেকেই কেবল বার্তাবাহক। এমনকি মায়ের দিকেও ফিরে তাকানোর সময় পায় না সে আজকাল। বাবা মারা যাবার পর থেকে মায়ের দেখাশোনা করেছে সে। মায়ের ডাক্তার-বদ্যি, ওষুধ-পথ্যি, পানের বাটা কোনও কিছুর জন্যই কখনও পুলক-মালিহার কাছে হাত পাতেনি সে। শুধু আশা করেছে, মায়ের রেখে যাওয়া জিনিষপত্র বিলিবণ্টনের সময় তার এই উপরি খরচটুকু গুনা-গুন্তিতে ধরা হবে, মায়ের নূতন ফ্ল্যাটটিও শেষ পর্যন্ত মা তাকেই হয়তো দিয়ে যাবে। ঠিক বুঝে উঠতে পারে না পুতুল কী করা উচিৎ তার। পুলকের প্রস্তাবের বিরোধিতা করার মানে তো নিজের মায়ের বিরোধিতা করা। আবার মায়ের দুটো ফ্ল্যাট ভাগ হলে তো সেই আবার মালিহার সাথে সমান সমান। একটার জায়গায় দুটো ফ্ল্যাটের ভাগাভাগি হলে হয়তো আইন মেনে ভাগাভাগির প্রশ্ন উঠবে, তাতে তো পুতুল মায়ের দুটোর একটিও পাবে না।

শেষবেলায় এসে ছেলের মাতৃভক্তিতে কিছুটা বিরক্ত হলেও মুখে প্রশংসা করে সিলিকনের এম, ডি, “আপনার কাছে তো স্যার বায়জিদ বোস্তামীও ফেল।” তবে যতই সময় গড়ায় গ্রাহকবান্ধব উষ্ণতা মোড় নেয় মুনাফা ফস্কানোর উষ্মায়। এদিকে মফিজের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। পার্টিকে ডেভেলপারের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার পর থেকে সচরাচর তার আর ভূমিকা থাকে না, ডেভেলপার সরাসরি লেনদেন শুরু করে জমির মালিকের সাথে। অনেক কষ্টে সিলিকনের এম, ডি-কে রাজী করিয়েছিল সে চুক্তি স্বাক্ষরের দিনই পাওনা মিটিয়ে দিতে। সেই টাকায় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ছেলের টিউশনের শেষ কিস্তির টাকাটা মেটানোর কথা মফিজের। সে প্লান তো মাঠে মারা, পুরো দানই না এখন মারা যায়।

অবস্থা বেগতিক দেখে মফিজের দিকে ইশারা করে সিলিকনের এম, ডি। অনেকটা যেন শেষ বাঁশি বাজার আগে রিজার্ভ স্ট্রাইকারকে মাঠে নামানো। মনে মনে আল্লা, বিসমিল্লা বলে মাঠে নামে মফিজ মাতব্বর। মালিহা আর পুতুলের মাথার উপর দিয়ে খুব সোজা একটা শট ছুঁড়ে দেয় সরাসরি পুলকের দিকে, “পুলক ভাইয়ের কথা তো খুবই সোন্দর। আর খালাম্মার কপালও বহুৎ লম্বা। আইজকালকার জমানায় মায়ের কথা এমুন কইরা ভাবে কেউ? তয় এম, ডি সাহেবের কথাডাও তো একটু ভাবন দরকার। লোসকান দিয়া বিল্ডিং করলে কি আর ব্যবসা থাকব? চলেন একটা কাজ করি। আইজকার মতো আপনাদের বাড়ি দিয়ে আসি। আর সকলে মিলে চিন্তাভাবনা করি কেমনে কী করা যায়।”

পুরো সময়টাই চুপ করে ছিলেন মিসেস সফদার। বাড়ি ফেরার কথা শুনে খুশি হয়ে ওঠেন তিনি। তার অতি সাম্প্রতিককালে পাতানো বোনপোর কথায় মাথা নাড়িয়ে সায় দেন। অনড় মালিহা, বিমূঢ় পুতুল আর রূঢ় এম, ডি সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।

পুলকের কিছু বুঝে ওঠার আগেই গোল হয়ে যেতে দেখে মফিজের ওপর আস্থা বেড়ে যায় এম, ডি-র। পুতুল-মালিহাদের যাওয়া আসার পুরো ভাড়া তৎক্ষণাৎ মিটিয়ে দেন মফিজকে।

সেদিনের পর আরও দুবার পুতুলদের বাড়িতে এসেছিল মফিজ, সিলিকনের সংশোধিত প্রস্তাব নিয়ে। সিলিকন রাজি হয়নি আরও একটি ফ্ল্যাট দিতে। “মারা পড়ব আমরা,” মফিজকে জানিয়েছে সিলিকনের এম, ডি। এম, ডি-র প্রাণভোমরা কোথায় লুকোনো ঠিকই জানা ছিল মফিজের। ফ্লাট বাড়ানো সম্ভব নয় বুঝে নেয় সে। এম, ডি-কে রাজি করায় সে সাইন ইন মানি কিছুটা বাড়াতে। দুই দফায় তিন লাখ করে ছলাখ পর্যন্ত টাকা বাড়ানোর প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি মালিহা আর পুতুল।

মালিহার মাথায় গেঁথে গেছে, ২:১। সিলিকন শেষ পর্যন্ত সবাইকে মিলে ছটি ফ্ল্যাট দিলে তার চারটিই পাবে মিসেস সফদারের পুত্রসন্তান পুলক। দুই এক গোলে পুতুলের বিরুদ্ধে জয়ী হবে মালিহা।

ইতঃমধ্যে পুতুলের দেবর পুতুলকে বুঝিয়েছে কোনওমতে একটা বড়সড় লোন পাওয়া গেলে নিজেরাই তোলা যাবে বাড়ি। বাড়ির নকশা আজকাল গুগল স্কেচাপেই শুরু করা যায়। কিছু পয়সা দিলে স্কেচাপের নকশা দেখে টেখে পাস করিয়ে দেবে ছোটখাটো কোনও আর্কিটেক্ট। একবার নকশা পাস হয়ে গেলে যে কোনও ঠিকাদারই রাজি হবে সাব-কন্ট্রাক্টে বাড়ি তুলে দিতে। এরপর খালি ফ্লাট বেচ, আর পয়সা গোন। ফ্লাটের বদলে টাকা নিতে মোটামুটি রাজি থাকলেও ঠিক একটা ফ্ল্যাটের সমান টাকা দাবি করে পুতুল। সিলিকন প্রকল্প ভেস্তে যাওয়া নিয়ে খুব একটা উৎকন্ঠিত নয় আর সে।

হাল ছাড়ার পাত্র নয় মফিজও। আজ বিকেলে তৃতীয়বারের মতো হাজির হয়েছে সে। কুশল বিনিময়ের পর সিলিকনের নূতন প্রস্তাব তুলে ধরে সে। টাকার অঙ্ক আরও এক দফা বাড়িয়েছে সিলিকন। ফ্ল্যাটের বদলে মিসেস সফদারকে দশ লাখ নগদ টাকা দিতে রাজি সিলিকন। আর পুতুল আর পুলকের সাইন ইন মানি বাড়ানো হবে দুলাখ করে।

“পুরোপুরি বিশ লাখ-ই দিয়ে দেন, মফিজ ভাই। মাকে দশ আর আমাদের দু ভাই-বোনকে পাঁচ পাঁচ করে দশ,” পাল্টা প্রস্তাব দেয় পুতুল। মায়ের দশ আর নিজের পাঁচে পনেরোর হিসেব করে নেয় সে সহজেই।

“মোটেও না। ভেবেছ কী? মায়ের হাতে টাকা ধরিয়ে দিলেই ফ্ল্যাটের কথা ভুলে থাকব আমরা,” মফিজ নয় পুতুলের দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝিয়ে ওঠে মালিহা।

থমকে যায় মফিজও। মুখ ঘুরিয়ে তাকায় একবার পুতুলের দিকে আর একবার মালিহার দিকে।

“কোন ফ্ল্যাটের কথা বলছ তুমি? ভাইয়া, আমি, আমাদের ফ্ল্যাট নিয়ে তো কথা হচ্ছে না। ঝামেলা বেঁধেছে তো মায়ের ফ্ল্যাট নিয়ে। আর তোমরাই তো কথা তুলেছ?” অবাক বিস্ময় পুতুলের গলায়।

স্বতঃফুর্ত সত্যভাষণে নিজেই চমকে যায় মালিহা। সামলে নিয়ে এবারে ধমকে ওঠে মফিজকে, “কী পেয়েছেন আপনারা? ভেবেছেন আমরা কোনওই খবর রাখি না। ষাট লাখ টাকার ফ্ল্যাটের বদলে দিতে চান কেবল পনেরো লাখ। এ কি মগের মুল্লুক? যান, গিয়ে আপনার এম, ডি,-কে বলে দেন ফ্লাটের দরকার নেই আমাদের। আমাদের এই পুরনো বাসাই ভাল। আমাদের বাসায় আমরা থাকব, যেমন খুশি তেমন থাকব। তবুও কাউকে ঠকাতে দেব না আমাদের। কী বলিস পুতলি?”

অনেকদিন পর বান্ধবীর মুখে প্রিয় ডাক শুনে বিস্মিত আনন্দিত হয় পুতুল। সিলিকন প্রকল্প থেকে দেবর প্রকল্পে পরিবর্তনের প্রত্যাশায় আনন্দ উত্তেজনা বাড়ে তার। মিষ্টি হাসি হেসে ঘাড় নাড়ে বান্ধবীর মুখের দিকে তাকিয়ে।

মাথা নিচু করে ধীর পায়ে সিঁড়ির দিকে এগোয় মফিজ। মনে মনে হিসেব কষে আর কদিন বাকি রইল ছেলের টুশনের টাকা জমা দেয়ার।

মিসেস সফদারের চোখের কোণা দিয়ে গড়িয়ে পড়ে জল। এ অশ্রু আনন্দ, বেদনা না বিরক্তির বুঝে উঠতে পারে না পুতুল বা মালিহা কেউই।