Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

মন্দিরচিত্রে বাঙালির বেশভূষা

ইন্দ্রনীল মজুমদার

 

ইংরাজি শিক্ষা ও তথাকথিত নবজাগরণ বাঙালির নিজস্ব কিছু জিনিস — ভাষা, গান, আঁকা ছবি, এমনকি বহুকালের অপরিবর্তিত বাঙালি বসন ভূষণও পাল্টে দিল সমূলে। আমরা শুধু বাঙালির বেশভূষার কথাই এখন ভাবছি। সহস্র বছর ধরে উত্তর ভারতীয় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব কিন্তু বাঙালি জীবনে এত গভীর পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি বা চায়ওনি। অভিজাত পরিবার, রাজন্য সম্প্রদায় অন্তত বহিরঙ্গে মেনে নিয়েছিলেন উত্তর ভারতীয় ও মুসলমানি বেশবাস (মাথার পাগড়ি সমেত)। তাঁদের প্রভাবই পড়েছিল ঠিক নীচের স্তরের কর্মচারী ও অনুগ্রহপ্রার্থী বণিক সমাজে। নবজাগরণের নেতাদের পোষাকও প্রথম দিকে সেরকমই। এতে তাঁদের মহিমা খর্ব হয় না। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ব্যতিক্রমীদের একজন তাঁর বেশবাসে। নিম্নবর্গের কামকাজে ব্যস্ত সাধারণ বাঙালি কিন্তু তার আগে তার গার্হস্থ্য জীবনে, বেশবাসে উচ্চবর্গীয় প্রভাবে খুব একটা প্রভাবিত হয়নি যুগ যুগ ধরে। ইংরাজ রাজত্বের পরেই সেটা জোর ধাক্কা খেল। টেরাকোটা মন্দিরের দুশো বছরের (সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতক) গাত্রচিত্রণ কিন্তু অকৃত্রিম বাঙালিত্বের  শেষ সাক্ষ্য রেখে গেল। মন্দির টেরাকোটার অন্ত্যজ শিল্পী কারিগরেরা তাদের দেখা সাধারণ মানুষের, বাঙালি জীবনের নিত্যকর্মের আর তার প্রাণের ঠাকুর শিব, চণ্ডী, কালীর ফলকেই রেখে গেল বাঙালিত্বের নিশানা। সংখ্যায় ও ঐশ্বর্যে উচ্চবিত্ত নরনারী, তাদের জমকালো অবাঙালি পোষাকে, স্বাভাবিকভাবেই ধনী প্রতিষ্ঠাতার মান অনুযায়ী, মন্দিরগাত্রে অনেক বেশি জায়গা পেলেও লৌকিক জীবনের অলৌকিকতাও সেখানে কিছু কম নেই। বাবুদের অজান্তেই হয়তো এসে গেল সেই কুমোর ছুতোরদের আপনমনের মাধুরী। সেখানে তাঁদের প্রকাশ শিব ঠাকুরের নেহাত অভব্য অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গে, শিব ঠাকুরের বিয়েতে যে এয়োরা কনে পার্বতীকে পিঁড়িতে বসিয়ে নিয়ে আসছেন তাঁদের শাড়িতে, কৃষ্ণজন্মের সময় যে দাই বাচ্চা পালটাচ্ছেন তাঁর কাপড়ে বা কৃষ্ণের সঙ্গে রাধার অভিভাবিকার কোমর বেঁধে ঝগড়ায়। শ্রী অমিয় কুমার বন্দোপাধ্যায়, শ্রী তারাপদ সাঁতরা প্রমুখ দিশারীরা মন্দিরগাত্রে সমাজচিত্র নিয়ে সবিশেষ আলোচনা করেছেন। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই অভিজাত পোষাক ও তার উৎসনির্দেশটুকু ছাড়া বিচিত্র কর্ম, লৌকিক ও বৈদিক দেবদেবীর রূপারোপই প্রধান জায়গা নিয়েছে। বাঁকুড়া জেলায় সোনামুখীর পঁচিশরত্ন শ্রীধর মন্দির বাঙালি উচ্চবর্ণের বেশভূষার প্রায় এক পিকচার গ্যালারি। হতেই পারে, কারণ এই গ্রাম ছিল ধনী তাঁতী আর সোনার বেনেদের গ্রাম। তাই কাপড়ে, কামিজে, ওড়নায়, জাঙ্গিয়ায় মনকাড়া ডিজাইনের ছড়াছড়ি। ওড়নির ঢেউ আর পাজামার ললিতবিস্তার মোহমুগ্ধতা জাগাতে পারে। তবু এখানেই আছে শিবের বিয়ের প্যানেল আর জটাধারী সন্ন্যাসীও। এই অভিজাত ও সাধারণী বেশভূষার ছবি আর গত দুশো বছরের অকৃত্রিম বাঙালি জীবনচিত্র বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাঙলার অগণিত টেরাকোটা মন্দির।

পাহাড়ী অনুচিত্রে রাজা ও নায়িকারা

শ্রী অমিয়কুমার লিখছেন “বিস্তৃত সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, সম্ভ্রান্ত মহলে পুরুষের বেশ ছিল মুসলমানি কেতার কুর্তা-পিরান-ইজের, প্রয়োজনে কখনও বা চোগা চাপকান নয়তো জোব্বা, আর মাথায় পাগড়ি বা ফেজ এবং পায়ে জুতো। নারীর পরিধান সাধারণত ঘাগড়া-ব্লাউজ-ওড়না, সেখানেও মোসলেম প্রভাব লক্ষণীয়। প্রাচীনতর ভাস্কর্যে মহিলাদের অঙ্গাবরণ ব্লাউজের বদলে বহু অলংকৃত কাঁচুলি এবং শাড়ি। খুব আধুনিক নিদর্শনে (প্রতাপেশ্বর শিবমন্দির, কালনা ১৮৪৯) উৎকীর্ণ রমণীরা স্পষ্টতই শাড়ির নীচে সায়া পরিহিতা যা ফিরিঙ্গি প্রভাবিত হওয়াই সম্ভব। এসব অর্বাচীন ভাস্কর্যে বিধৃত শাড়ি পরার ধরন কিন্তু হবহু একালের বাঙালি মেয়েদের মতো। সেজন্য এই বিশেষ ধরনটি ঠাকুর পরিবারের প্রবর্তিত বলে যে বিশ্বাস তা হয়তো সত্য নয়। …নারীমূর্তির রূপায়ণে — সম্ভ্রান্ত মহিলা হলে তো কথাই নেই — উৎকীর্ণ গহনাগাঁটির প্রাচুর্য ও বৈচিত্র বিস্ময়কর।” গয়নাগাটির বিবরণে পাঠকের আগ্রহ থাকলে শ্রী সুকুমার সেনের অনিঃশেষ খাজানা খুলতে বলব।

তদানীন্তন বাংলা সাহিত্যেও এই বেশবাসের, নারীসজ্জার ছবি ধরা আছে।

মহিলা বিক্রেতা; গণপুর

নারীবেশ: ঘাগড়া শাড়ি ব্লাউজ; ভায়োলিনবাদিকা, সোনামুখী

“জয়দেবের সময় থেকে “নিচোল” শব্দ বৈষ্ণব পদাবলীতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অর্থ আঁটসাট জামা। হয়ত সেই সঙ্গে আঁটসাট ইজেরও। ইজের শব্দ ফারসি থেকে এসেছে। এই অর্থে একটি দেশী অর্থাৎ খাঁটি বাংলা শব্দও আছে — জাঙ্গিয়া ও জাঙ্ঘিয়া — যথাক্রমে টাইট জামা ও ইজের। মেয়েরা চাদর (ফার্সি শব্দ)-ও ব্যবহার করত। প্রয়োজনমত তা ঘোমটার কাজ করত। পুরুযেরা ও কাজের মেয়েরা অনেক সময় চুল মাথার ওপরে চূড়ার মতো করে বাঁধত। বিলাসিনী মেয়েরা দুপাশে কান ঢেকে চুল বাঁধত। তাকে বলত “কানোড়ি” বা কানের খোঁপা। আর ঘাড়ের কাছে বাঁধা হলে বলত “কবরী”। মাথার উপর চূড়া করে বাঁধাকে সংস্কৃতে বলত “শিখণ্ড”। গোপাল কৃষ্ণের এইভাবে চুল বাঁধা হত। ছেলেরা ঘাড় পর্যন্ত চুল রাখত। তাকে বলে “ঘোড়া চুল”। সেকালে রাজারাজড়া ও খুব ধনী ব্যক্তিরা চুল রাখতেন। তাঁদের পার্শ্বচর বিশ্বস্ত ভৃত্যেরা কিন্তু সর্বদা মাথা নেড়া রাখত। …দাড়ি গোঁফ চুল সবই রাখতেন যোগী ও তান্ত্রিক সাধকেরা।” (সুকুমার সেন — বাঙালির ভাষা) এই সব ছবিই ছড়িয়ে আছে টেরাকোটা মন্দিরের গায়ে।

অভিজাত শাড়ি, আঁট জামা আর ঘাগড়া; সোনামুখী

এবার বাঙালি পল্লীবধুর ছবি। “কপালে কাজলের টিপ। হাতে ইন্দুকিরণস্পর্শী সাদা পদ্মডাঁটার বালা ও তাগা, কানে কচি রিঠাফলের দুল, কেশ স্নানস্নিগ্ধ এবং কবরীতে তিলপল্লব”। (সংস্কৃত কাব্য) লক্ষ করুন সোনার গয়নাগাটি নেই।

এবার নির্ধনের কথা। “আগে সরু ফালি কাপড় সেলাই করে জোড় দিয়ে পরনের কাপড় তৈরি হত মেয়ে পুরুষ সকলের জন্য। কাপড় হাঁটুর নীচে নামত না। কোমর থেকে হাঁটু অবধি আঁট করে পরা কাপড় বোঝাতে ধটি বা ধড়া শব্দ পাওয়া যায়। যেমন পীতধরা (কৃষ্ণ)। সেকালে জামার চল ছিল না। তাই জামার প্রতিশব্দ বাংলায় ঠিকঠাক নেই।” (সুকুমার সেন)

শিবঠাকুর আর ভক্তেরা

এই সব ছবিই ধরা আছে বাংলার অগণিত টেরাকোটা মন্দিরের গায়ে। সেই সব অভিজাত ও সাধারণ বাঙালির বিগত দিনের বেশভূষার কিছু ছবি দেওয়া হল মিশ্রিতভাবে বিভিন্ন মন্দির থেকে। সেগুলি লেখকের নিজের তোলা। আর পাহাড়ী অনুচিত্রে একটি সমকালীন উত্তরভারতীয় নারীবেশের ছবি দেওয়া হল অভিজাত আদর্শের প্রতিরূপ হিসাবে।

বাঙালির যা হারিয়েছে তা না ফিরে এলেও এগুলি এখনও বেঁচে আছে কোনওমতে।