Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ওয়েব পত্রিকা : নতুন দিগন্ত, নতুন আশা

ওয়েব পত্রিকা

দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম

 

সাহিত্যচর্চায় প্রতিষ্ঠানবিরোধী কোনও প্রচেষ্টার কথা এলে লিটলম্যাগের কথাই আসে সর্বাগ্রে। লিটলম্যাগ তো নিছক কোনও উদ্যোগ নয়, একটা আন্দোলনও। প্রচলিত সাহিত্য মূল্যবোধ আর মিডিয়া হাউজ কর্তৃক চিন্তাভাবনা বেঁধে দেয়ার বিপরীতে মুক্তচর্চার এ সুযোগটি যে শুরু থেকেই সাড়া ফেলেছিল পাঠকের কাছে তা বলবার অপেক্ষা রাখে না। বাংলায় এ আন্দোলনের ব্যাপকতা অন্তত শতবর্ষ পেরিয়েছে যখন, তখন এটি প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে আরও অভিনব এবং আরও ব্যাপক আকারে পাঠকের কাছে পৌঁছোবার প্রচেষ্টা করছে, ই-সংস্করণে। সীমিত সামর্থ্যের লিটলম্যাগ চর্চায় এ নতুন মাধ্যম, ওয়েব সাহিত্য যাকে ওয়েবজিন বলা হচ্ছে তা একটা দিগন্ত খুলে দিয়েছে নিঃসন্দেহে।

এই ওয়েব সাহিত্যের প্রসঙ্গ যখন এল তখন এর প্রথম কৃতিত্বটা বোধহয় দিতে হবে ব্লগ চর্চাকে। তৃতীয় বিশ্বের এ অঞ্চলে ব্লগ শুধুমাত্র ব্যক্তির অনলাইন ডায়েরি হয়ে আসেনি। সিটিজেন জার্নালিজমের স্বরূপ হয়েই এর যাত্রা এ অঞ্চলে, এবং পরবর্তীতে দেখা গেল যে সেটা সাহিত্যচর্চার মাধ্যম হিসেবে লুফে নিচ্ছে লোকে। শুধু সংবাদ, ঘটনাপ্রবাহের প্রতিক্রিয়ায় থেমে না থেকে লোকে কবিতা লিখতে শুরু করল, গল্প লিখতে শুরু করল। বাংলা ব্লগের এ শুরু সামহোয়ারইন থেকে হলেও এর ব্যবহারকারী পর্যায়ে বিভক্ত হয়ে আরও অনেক ব্লগ দেখা গিয়েছিল। কিছু এখনও টিকে আছে, কিছু ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। এবং এই যে বিভক্তি তা আসলে সাহিত্যচর্চার আরও দিকপ্রসারী চিন্তার দিকেই গেল। আমরা দেখলাম সচলায়তন, আমার বন্ধু ব্লগের মতো ব্লগ যারা মূলত সাহিত্যচর্চাই করছিল। মোটকথা বাংলা অঞ্চলের পাঠকেরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে সাহিত্য করার একটা পথ যেন পেয়ে গেল।

এবং আমরা দেখলাম মিলনসাগর-এর মতো ওয়েব যারা কবিতার আর্কাইভের ভূমিকা নিল। এবং সেটা শুধুমাত্র পুরনো এবং হারিয়ে যাওয়া কবিদের কবিতা নয়, দেখা গেল সমকালীন অনেকের লেখা সংরক্ষিত হচ্ছে। এরকম আরও কিছু ব্লগ, অবশ্য এর অধিকাংশ লিটলম্যাগের (কাগজে) অনলাইন আর্কাইভ হয়ে উঠছিল। কিন্তু এগুলোকে আমি ওয়েবজিন চর্চার একটা দিক বলতে চাই। সম্ভবত এই সংরক্ষণ সম্ভাবনার থেকেই একটা যাত্রা যা ছাপা কাগজে সাহিত্যের একটা বিকল্প মাধ্যমও হতে পারে তা ভেবে নিয়েছিল কেউ কেউ।

আজ দু বাংলায় আমরা অনেকগুলো ওয়েবজিন দেখতে পাই, এবং এর চরিত্রটাও যেন ছাপা কাগজে লিটলম্যাগের মতো কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নিয়ে এগোতে চাচ্ছে। যদিও স্বীকার করছি, ওয়েব ম্যাগাজিনের ব্যাপ্তি গোষ্ঠী ছাড়িয়ে বড় পরিসর চায়। যেহেতু পৌঁছে দেবার দায় নেই, বরং মাউসের একটা ক্লিক পাঠকের চোখের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে আয়োজনটিকে, তবুও সামাজিক মাধ্যমগুলোর ব্যাপকতা এর ভেতরই গোষ্ঠী গড়ে নেবার একটা উপায় করে দিচ্ছে। এবং এমনও তো হচ্ছে ওয়েব সাহিত্যের সেই সব গোষ্ঠী ছাপা কাগজেও এসব সংরক্ষণ করছে, মানে আন্দোলনটিকে দুটো মাধ্যমেই রাখছে। গোষ্ঠী ধারণার পরও আমি একে আন্দোলন বলব, যেহেতু এই জড়ো হওয়া অনেকখানি বঞ্চনার বিরুদ্ধেও, মানে বড় হাউজগুলোর, মিডিয়া পরিবারগুলোর সুনির্দিষ্ট রুচি আর বাঁধাধরা লেখক তালিকার বিরুদ্ধে আত্মবিশ্বাসী কিছু লোকেরই প্রচেষ্টা এ ওয়েবজিনগুলো।

***

আজ যখন ওয়েব সাহিত্যের কথা বলছি, তখন মনে হচ্ছে, এই ওয়েব প্ল্যাটফর্মের চর্চার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হল বাংলাদেশ এবং ভারত এ দুটো রাষ্ট্রের সীমারেখার দূরত্ব ঘুচিয়ে বাঙ্গালীদের, এবং এমনকি ভারতেরই ভিন্ন রাজ্যের বাঙ্গালীদের একত্রে সাহিত্যচর্চার একটা বড় উপায় হয়ে ওঠা। যোগাযোগ সহজ হয়ে এসেছে এবং প্রকাশিত সাহিত্য পৌঁছে দেয়ার বাড়তি ভারও আজ নেই। আজ ছাপা কাগজের সাহিত্যেও যখন দেখি ত্রিপুরা-পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশ, ভিন্ন ভিন্ন জায়গার কবি সাহিত্যিকদের নাম একই সূচিতে, তখন মনে হয় এটা ওয়েব সাহিত্যেরই অবদান।

একই কথা বলা যেতে পারে কয়েক দশক আগে লেখালেখি শুরু করা এবং সদ্যই লিখতে আসা, এবং এমনকি অনেকেই সম্ভবত প্রথম প্রকাশটিও এর মাধ্যমে করছেন এরকম লেখকদের একত্রিত দেখা। এটি ইতিবাচক এবং প্রকাশের প্রতিবন্ধকতার বিপরীত এক ধারণা। কাগজে লিটলম্যাগেতেও আমরা দেখেছি প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়েও নিজেদের ভেতর প্রতিষ্ঠান গড়ে নিতে, অথবা নিজেদের একটা অভিজাত গোষ্ঠীতে জাহির করবার প্রবণতায় নির্দিষ্ট লেখকদের লেখাতেই মগ্ন থাকতে। আজ সব কিছুতে একটা উদার অবস্থা, এর কৃতিত্বটিও বোধহয় ওয়েব ম্যাগাজিনের প্রাপ্য।

কিভাবে এই সহজ হয়ে আসা? সংখ্যায় ক্রমশ বেড়ে যাওয়াই কি উদার মানসিকতার প্রতিফলন? এখানেই আরও কিছু বলা যেতে পারে। এই যে ক্রমশ বেড়ে যাওয়া ওয়েব সাহিত্য, এর সুযোগে সম্পাদকের টেবিল উত্তীর্ণ না হওয়া, যাচাই-বাছাই না হওয়া সাহিত্য আজ উন্মোচন দেখছে। এ শুধু সাহস না ভয়েরও কারণ। বিশুদ্ধতার প্রশ্ন উঠতেই পারে এক্ষেত্রে। আর ঘুরে ফিরে আসা গোষ্ঠী, ক্রমশ গোষ্ঠী বড় করবার চিন্তা থেকেই অনেকে উঠতি লেখকদের জড়ো করছে এরকমও কান পাতলেই শোনা যায়। সেখানে সাহিত্যমান বিবেচনায় রাখার দায় থাকে না।

***

ওয়েব সাহিত্যে গোষ্ঠীর কথা এখন এতটাই দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাসঙ্গিক যে, আজ সচেতন পাঠক ওয়েব সাহিত্যের নাম ধরেই বলতে পারেন, কোন ওয়েব সাহিত্যে কার লেখা আসবে, কোন ওয়েব সাহিত্যে কার কার বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া হবে। এর প্রতিক্রিয়াটা দেখা যাচ্ছে এইসব ওয়েব সাহিত্যের লেখকদের প্রকাশিত বইতে। এর ফলে এসব লেখকদের ছাপা বইয়ে পাঠক আগ্রহ স্থায়ী হচ্ছে না। গ্রন্থমেলা জুড়ে প্রিভিউ রিভিউ আর বিজ্ঞাপনের ঝনঝনানি ওয়েব পেইজে থাকলেও বাড়তি পাঠক বই কিনতে আসছেন না। পাঠক তো ওয়েবের কল্যাণেই লেখককে পড়ে নিয়েছেন এবং এমনকি ইতিবাচক রিভিউর পরও জানেন প্রকৃত অর্থে রিভিউটা কী হতে পারত। এই রিভিউকেন্দ্রিক বন্ধু আয়োজনের ওয়েব সাহিত্যের এখন রমরমা বেড়ে গিয়েছে। এতটাই বেড়েছে যে ওয়েব সাহিত্যের ওই সংঘবদ্ধ লেখকেরা পাঠচক্র করছেন, প্রকাশনা ব্যবসায়ের উদ্যোগ নিচ্ছেন, সবই আসলে ওই গোষ্ঠীর একটা কাঙ্ক্ষিত সদস্য সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলার পর। এটা সামগ্রিকভাবে সাহিত্যের কতটা উপকারে আসবে তা হয়তো মহাকাল বলবে। তবে এর ভেতরও কিছু ইতিবাচক ব্যতিক্রম আছে, সত্যিই ভালো লিখেন কিন্তু ছাপা মাধ্যমে পাঠকের কাছে পৌঁছতে পারেননি, তাদের জানবার সুযোগটাও এই সব ওয়েবজিন দিচ্ছে। ছাপা কাগজ প্রকাশন ও পরিবেশনের যে সীমাবদ্ধতা, তা অনেকটাই এখানে নেই।

ইদানিং ছাপা কাগজ সাহিত্যের মতোই ওয়েবভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে। লেখালেখিতে মান নির্ধারণ এমনিতেই এক বড় সমস্যা, সেখানে বন্ধুকরণ এমনকি ঘুরেফিরে নিজেদের ভেতর কাউকে পুরস্কৃত করে আলোচনায় রাখার যে প্রয়াস হচ্ছে, সে বিষয়গুলো প্রকারান্তরে এ মাধ্যমটির দিকে স্থায়ী পাঠক তৈরিতে বাধা হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কা অমূলক না। আর কিছু ওয়েব যেমন নাম করা যেতে পারে গল্প কবিতা ডট কম-এর, এরা সাপ্তাহিক মান্থলি সেরা লেখক বাছাই করার যে হিটভিত্তিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, তার সাথে বাংলাদেশে ফেসবুক পেজ আর গ্রুপভিত্তিক বিভিন্ন সাহিত্য প্রচেষ্টার সার্টিফিকেট বিলানোর হাস্যকর প্রয়াসের সাথেই তুলনা চলে। এগুলো সাহিত্যের জন্য প্রকৃতপক্ষে কতটা উপকারী তা ভাবারও সময় হয়েছে বোধ করি।

ওয়েব সাহিত্য কি রাজনৈতিক সমমনাদের সংগঠিত হবারও প্ল্যাটফর্ম? এ প্রশ্নও আজ ফিসফিসানি তোলে কান পাতলেই। পশ্চিমবাংলায় যেমন ঘোষণা দিয়ে একই মতাদর্শের জন্য গড়ে ওঠা ওয়েব সাহিত্য (যেমন: পাশে আছি) আছে তেমনটা বাংলাদেশে হয়নি সত্যি, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট ওয়েব প্ল্যাটফর্মের লোক/লেখকদের রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার কিছু প্রকাশ তো তাদের চিনে নিতে সহায়তা করেই। বাংলাদেশে ওয়েব জোয়ার আসার পর সরকার অপরিবর্তিত, এ অবস্থায় রাজনৈতিক পালাবদলে এসব ওয়েব সাহিত্যের প্রকাশ যে ভিন্নরকম হবে না তার নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না। কারণ ইতোমধ্যে কিছু ওয়েবকে আড়ালে আবডালে বিরোধী রাজনৈতিক চেতনার লোকদের সম্মিলিত হবার ক্ষেত্র ভাবা হচ্ছে। এবং রাজনৈতিক ভাষ্যের মতোই ট্যাগ ছুঁড়ে দেওয়ার অপসংস্কৃতিও আমরা লক্ষ করেছি, যা ওই সব ওয়েবে যতটা না এসেছে তার বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে ফেসবুকে। এবং এসব মন্দভাষ্য থেকে বিরত থাকেননি আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ আর জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকেরাও। আবার একই সঙ্গে এও সত্য যে, এই যে মন্দভাষ্য আর বিপরীত ভাবনার প্ল্যাটফর্ম, এসবে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, এ মাধ্যম আজ কোনওভাবে হেলা করবার বস্তু নয়।

***

নিরপেক্ষ এবং প্রাথমিক পাঠে কিছু ওয়েবজিন সত্যিকার অর্থেই নান্দনিক। নব্বই দশকের কবিদের নিয়ে আয়োজন আমরা দেখেছি নাইন্টিজ নামক এক ওয়েবে। গল্পপাঠ নামক এক ওয়েব কাজ করছে গল্পের বিস্তারে, এবং সেখানে বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন মেধা ও চিন্তার লেখকদের গল্প শুধুই পড়বার সুযোগ হচ্ছে না, পাঠপরিক্রমার সুতোও কিছু পাওয়া যাচ্ছে। নতুন এবং সীমিত সামর্থ্যের পাঠকদের জন্য এসব নিঃসন্দেহে দারুণ ব্যাপার। দেশের আগামীকাল, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম, পরস্পর, দুনিয়াদারি, সৃষ্টি এরকম অনেক ই-ম্যাগাজিনই আশা দেখাচ্ছে।

***

সামাজিক জবাবিদিহিতার প্রশ্নে এই ক্রমশ বিশাল সংখ্যার ওয়েব সাহিত্যের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। সারা বিশ্ব আজ অস্থির এক সময় অতিক্রান্ত করছে। এবং আমরা তৃতীয় বিশ্বের নাগরিকরা এই অস্থিরতার স্বাভাবিক শিকার। সাহিত্যিকদের এক্ষেত্রে কী ভূমিকা? আমরা বরাবরই দেখেছি উচ্চকণ্ঠ লেখকেরা সাধারণ মানুষের পক্ষে লড়ছেন, কথা বলছেন। এখানে কলম সমস্ত অন্যায় অত্যাচার অন্যায্যের বিপক্ষে মাথা তুলে দাঁড়ায়। আমাদের কাগজ সাহিত্য, এমনকি লিটলম্যাগ চর্চায় এ সবের উদাহরণ তো ভুরিভুরি। নকশাল আন্দোলন নিয়ে চারু মজুমদার সংখ্যা তো আজ ইতিহাস। কিন্তু ওয়েব সাহিত্য? এক্ষেত্রে নীরবতা ধর্ম পালন করা ওয়েবই প্রায় সব। অধিকাংশ ওয়েব ঘুরলে মনে হয় পৃথিবীর সার্বিক অবস্থা থেকে বহু দূরে এদের অবস্থান। যেন কোনও দায় নেই (কিছু ব্যতিক্রম আছে অবশ্য, যেমন চার নম্বর প্লাটফর্ম)। বাংলাদেশের কিছু ওয়েবকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রায় প্রতিযোগিতামূলক ধরনে কবিতা প্রকাশ করতে দেখেছি, খুবই ইতিবাচক চিন্তা থেকে দেখলেও তাদের আর কোনও ইস্যুতে পাওয়া যায়নি। অথচ রামপাল ইস্যু, সংখ্যালঘুদের নিপীড়ন ইস্যু, বিশ্ব সন্ত্রাস ইস্যু, মৌলবাদ ও গোড়ামি ইস্যু এরকম হাজারটা ইস্যু আসছে যাচ্ছে সেসবে সকলেই যেন নির্বিকার। যেহেতু সাহিত্য চর্চার একটি বড় মাধ্যম আজ ওয়েব সাহিত্য, সেখানে এই প্রতিবাদ, অন্যায় অসাম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ হতে পারে নির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা। যে ওয়েব সাহিত্যগুলো তাদের লেখকদের কবিতা পাঠের আসর করতে পারেন, গল্প নিয়ে আলোচনার আসর করতে পারেন, তারা এইসব সামাজিক ইস্যুতেও ব্যানার নিয়ে দাঁড়াবেন, এরকম আশা করাটা বাড়াবাড়ি মনে হয় না।

***

প্রত্যাশা আর আপাত বাস্তবতার একটা সূক্ষ্ম ব্যবধানে দাঁড়িয়েও আজ ওয়েবজিন স্বপ্ন দেখাচ্ছে, এটা স্বীকার করতেই হবে। আর এটাও স্বীকার করতে হবে এ বাংলায় ওয়েবজিনের বয়স সাকূল্যে বিশ, এবং যে জোয়ার পরিলক্ষিত হচ্ছে তার বয়স আরও কম। ইতোমধ্যে ওয়েবজিন দৈনিক পত্রিকাগুলোর সাহিত্য পাতাগুলোর আবেদন ধূসর করে দিয়েছে, এটা সম্ভব হয়েছে পাঠকের ইচ্ছেমতো পড়ে নেবার সুযোগ থেকে। এইযে ধূসরতা, এটা পাঠকের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ হিসেবেই দেখছি। আগামীতে সাহিত্য পাতা কিছু বন্ধ হয়ে গেলেও অবাক হব না। কিন্তু এই ওয়েবজিনের জোয়ার ক্রমশ বাড়বেই। সহজলভ্য আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট এ মাধ্যমটিকে আরও বড় করে তুলবে শীঘ্রই। এবং সেখানে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। ওয়েবজিন হবে বাংলা সাহিত্যের দর্পণ এবং বিশ্ব সাহিত্যের জানালা, এবং সেখানে মেধার স্ফূরণ ঘটবে। ওয়েবজিনগুলো হবে হারিয়ে যাওয়া সাহিত্য খুঁজে পাওয়ার সহজ ঘর। স্থায়িত্বের প্রশ্নেও পথচলা হবে দীর্ঘ। লিটল ম্যাগচর্চায় যেমন কোনও উদ্যোগ আশা জাগিয়েও পরে ব্যক্তিক পর্যায়ে ব্যস্ততা আর আনুকূল্যের অভাবে হারিয়ে যাওয়ার অসংখ্য উদাহরণ আছে, তা থেকে শিখবে ওয়েবজিনগুলি। এবং এই ওয়েবজিনচর্চা আমাদের মনোবৃত্তির সুষ্ঠু চর্চা নিশ্চিত করবে, সাহিত্যচর্চাকে আরও বেশি মানুষের ঘনিষ্ঠ করে তুলবে। এই সব আশার কিছু বাস্তবতা এখুনি দেখা যাচ্ছে, লিটল ম্যাগ ছাপা হত যেখানে সাকূল্যে তিন চারশো, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, সেখানে একেকটা ওয়েবজিনের ভিউ যখন লাখও ছুঁয়ে দিচ্ছে তখন এটা অমূলক না যে নতুন পাঠক জড়ো হচ্ছেন, মনোবৃত্তির খোরাক খুঁজে নিচ্ছেন এখান থেকে।