Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

২৫-এ পঁচিশ

আমাদের তরুণ কবিরা

 

“আধুনিক বাঙালি কবিতা লইয়া তেমন বিস্তারিত আলোচনা করা বড় সহজ ব্যাপার নহে। সাধারণ কথায় বলিতে হইলে বলা যায়, কবির সংখ্যা যথেষ্ট বৃদ্ধি পাইয়াছে; সজনী, প্রিয়তমা, প্রণয়, বিরহ, মিলন লইয়া অনেক কবিতা রচিত হইয়া থাকে, তাহাতে নূতন খুব কম থাকে এবং গাঢ়তা আরও অল্প। আধুনিক বঙ্গ কবিতায় মনুষ্যের নানাবিধ মনোবৃত্তির ক্রীড়া দেখা যায় না। বিরোধী মনোবৃত্তির সংগ্রাম দেখা যায় না। মহান ভাব তো নাইই। হৃদয়ের কতকগুলি ভাসা-ভাসা ভাব লইয়া কবিতা। সামান্য নাড়া পাইলেই যে জল-বুদ্‌বুদগুলি হৃদয়ের উপরিভাগে ভাসিয়া উঠে তাহা লইয়াই তাঁহাদের কারবার। যে-সকল ভাব হৃদয়ের তলদেশে দিবানিশি গুপ্ত থাকে, নিদারুণ ঝটিকা উঠিলেই তবে যাহা উৎক্ষিপ্ত হইতে থাকে, সহস্র ফেনিল মস্তক লইয়া তীরের পর্বত চূর্ণ করিতে ছুটিয়া আসে সে-সকল আধুনিক বঙ্গকবিদের কবিতার বিষয় নহে। তথাপি কী করিয়া বলি বাঙালি কবি? হইতে পারে বাংলায় দুই-একটা ভালো কবিতা আছে, দুই-একটি মিষ্ট গান আছে, কিন্তু সেইগুলি লইয়াই কি বাঙালি জাতি অন্যান্য জাতির মুখের কাছে হাত নাড়িয়া বলিতে পারে যে, বাঙালি কবি?”

এই রচনাংশ তাঁরই, যে বিখ্যাত মানুষটির আজ জন্মদিন। অবশ্য শুধু বিখ্যাত বললে তাঁর কিছুই বোঝানো হয় না। আজ এই একশো সাতান্ন বছর বয়সেও তিনি বঙ্গসংস্কৃতির গুরুভার স্কন্ধে নিয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। উপর্যুক্ত অংশে আধুনিক ‘বাঙালি’ কবিতা নিয়ে তাঁর মন্তব্য তুলে ধরার পিছনে মূল ইচ্ছাটা হালকা বিতর্ক উসকে দেওয়া হলেও আপনাদের জানিয়ে রাখা ভালো যে এই বিতর্কে আমরা মোটেও নিজেদের জড়াচ্ছি না। তর্ক-বিতর্কের ভার ছেড়ে দিচ্ছি আপনার ওপরেই, হে করুণাময় কবিতাপাঠক!

তবে তর্কের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি সাজানোর জন্য আপনাদের সামনে রাখলাম এই সময়ের তরুণতম পঁচিশজন কবির পঁচিশটি কবিতা, আজ এই পঁচিশে বৈশাখে। এঁরা সকলেই এই সময়ের। সকলেই কবি। এবং সকলেই তরুণ। আজকের বাংলা কবিতা ভাষা পায় এঁদেরই কলমে। কবিতার অবয়বে নিঃসীম প্রলাপের মধ্যে এই হোক বাংলা কবিতার এক ধরনের পুণ্যবাণী।

 

বয়স্ক শ্যাওলার যাপন

অভিষেক চক্রবর্তী

 

বারান্দা থেকে বেরিয়ে আসছে ডান পা, বাঁ পা
হাতে লম্বা হুইল ছিপ
হুইলের সুতোয় বাঁধা কিশোর কিশোরী
মুখে রোখ, দাঁতে সুতো কামড়ানো
গভীর ভালোবেসে তারা
সকালকে বিকেল বানাতে চায়

পায়ের মালিক যে
সে তাদের চেনা এক নিঃসঙ্গ মানুষ
তাকে ওরা
ভীষণ কাছে আসতে দেয়
আর ছিপ হাতে মানুষটা
তাদের শবদেহ নিয়ে
বারবার ছবি তোলে
ছবিতে লেখা থাকে
এই দেখো মাছ
এই দেখো — মিলিয়ে যাওয়া রোদ্দুর
শেষটুকু দেখে নাও
বঁড়শিতে আটকানো শ্যাওলা

লম্বা পায়ের মানুষটা
রোজ সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে
ক্লান্ত হুইলছিপ নিয়ে
স্নায়ুগুলো সুতোর মতো গুটিয়ে
সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায়
মৃত্যুর মতোই চুপিচুপি

আজ অবধি মাছ ধরা হয়নি তার
আজ অবধি ছুটি পাওয়া হয়নি তার

 

এখানে মদ্যপান মানা (২)

আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়

 

হোগলা গ্রামের চাঁদ
কাজুবন, ঝাউবন হেঁটে
সমুদ্রে নুন ঢালে পাহাড়ে জোনাক ঋতুস্রাব
প্রবল মোরাম ছুঁয়ে ডুবে যাচ্ছে জলের খোরাকি
ইতি লিখছি। চিঠি শেষ। সুড়ঙ্গ স্মৃতি ফিরে পাক

বিস্মৃত অঞ্চলসঙ্গ পুজো শেষে ফিরে আসছে পিঁদা
যে ডালিতে ফুল নেই, বিষম ঘোড়ার নাল নেই
পাঁজরে মজ্জা নেই আর আছে ঘোলাটে সোপান
উন্মাদেয় স্নান
সদ্য মুখাগ্নি সেরে উঠে এলে কিছু না-র ঘাটে
মৃতের নাভির ফুল, সহস্র বরাহ হয়ে হাঁটে

‘ডান হাতটা মুঠো করে পেতে দিন গলার উপর’
নবীন উত্তরসূরি গণ্ডূষের মুদ্রা জানে না
ছোঁয়াচ বসন্ত থেকে হ্রস্ব-ই মুছে তার
আঁড়বাঁশি ছুঁয়ে ফেলে, দেখে,
ক্রমশ কঠিনতর
যেন লোহা যেন ইস্পাত
বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ সেজে চিতা লগ্নে পুড়ে যায়, কবে!
দেয়া ডাকে অঘোরি-পরবে

শখের বেদানা বন ঝরে যাচ্ছে
প্রেমের দাপটে
নখ, দাঁত, প্রিয়স্পর্শ দু-ফালা জিভের
বাকল ছাড়িয়ে রেখে গর্ত হয়ে শীতঘুমে যাবে

হিমোসায়ানিন থেকে সবুজ রক্তস্রোত ছোবল স্বভাবে…

 

একটি কবিতা

আন্তন

 

আমাদের সকল দুঃখ বাচ্চা মেয়ের আকার নিয়েছে
খঞ্জনী বাজিয়ে ভোররাতে দূরে বেতালের ঘন বনে
প্রার্থনার চাতাল জুড়ে বৃন্দাবনী সারঙে মাখামাখি
রক্তকনকে ধুয়ে নিজের দু’খানি হাত, পায়ের পাতা

হাঁটাপথে ময়ান দেওয়া রোদের দশ মাত্রার ফুল
দাঁতে ছিঁড়ে ফিরে এসে ঘাঘরানীল কৃতদার ভাষায়
(আমাদের পাঁজরে তখন মোটরগাড়ির কালো মেঘ)
দেখি কেমন আছড়ে মারো মাটিতে — বলেছে অল্প হেসে।।

 

যেখানে পৌঁছে দিতে চাও

ঋপণ আর্য

 

খানিকটা তোমাকে পায়
দু’দণ্ড বাঁশি
মেধার মাধাই আমি
জগাইয়ের ভাই
দু’দণ্ড হাঁদারাম পায় তোমায় তাই
কপালে আঘাত হানি
তাও তো সোহাগ হও
হে চৈতন্য তোমার

এত বেশি আলগা রাখো
ছেড়ে রাখো
চলে যেতে ওসকাও তার কাছে
যার কাছে আমি কেবল খানিকটা নই
আরও বেশি কিছু
যতখানি স্বর্গ
আরও বেশি কিছু
তুমি কী ভাবলে
যন্ত্রণা তো বইতেই হবে
তাতে অশান্তিও কম হবে
এমনটি ঘটলে!

 

আত্মীয়তা

গৌরাঙ্গ মণ্ডল

 

উধাও হওয়ার আগে সচেতন-গাছ
যোনির গহীনে এসে পেখম ছড়ায়
তলপেট ছিন্ন হয়, ভ্রূণের ঠিকুজি
মেলাতে পারে না বীজ, মুখের আদলে

শেকড় তোলার পর যেটুকু সবুজ
মাছের আড়ত, শেষে আঁশ-কোলাহল
আলোহীন, ঘ্রাণ তার অবনিঃশ্বাসের
অহমিকা চুর, বোঝে আগাছা-সহায়

বুনো ঝোপ, গাছেদের কাছের কুটুম

 

অমলতাস

জগন্নাথদেব মণ্ডল

 

কোপাই জল ছিটিয়ে নিয়েছি।
আমের মুকুল রেখেছি হাতে।

পলাশ গাছ ঘিরে আছে দিঘি।
জলে টলটল করে আলো।

রাঙাপথ গোয়ালপাড়ার দিকে।
শালজঙ্গল এখানে শেষ হল।

ধোঁয়া ওঠে দাহকাঠ থেকে।
একটু এগোলেই দেখা যায় শ্মশান।

তবু চুপচাপ শব শুয়ে আছি বহুদিন।
সাতমাস তো হবেই।

কঙ্কালদেহে বোলপুরের হাওয়া বয়।
গোপন আছি হাড়বিক্রেতার কাছে।

এসে উদ্ধার করো নিজস্ব প্রেমিক দেহ।
কবর দাও বকুলগাছের নীচে।

আমি সোনাঝুরি হয়ে ফুটে উঠি।
তোমার শরীরে জন্মাক অমলতাসের বন।

 

বোধন

জয়াশিস ঘোষ

 

এপারে সমুদ্রমন্থন, ওপারে অমৃত উঠে আসে
চোখের জল ছিটিয়ে দেয় ভাতের গরাসে
দেবতারা। সুরাপাত্রে সুরা উপচিয়ে যায়
কাঠামো পুড়িয়ে কালো তাপের আশায়
বাঁচে মানুষের দল, ক্যাম্পের দিকে চলে
দলে দলে। টানাটানি পশু ও ফসলে
ওদিকে ডিজে, গান। এল.ই.ডি-তে চোখ বোজে
শহর। মা শাড়ির খুঁট খুলে খোঁজে
কিছু আলো এদিকেও আছে কিনা
“এবার ঈদে আমরা বাড়ি ফিরবই, আমিনা”–
এই বলে মা ঘরবাড়ি নিয়ে নৌকো ভাসায়
এদিকে পদ্মফুল, ওপারে দুর্গা ভেসে যায়

 

ত্রিমাত্রিক

তন্ময় ভট্টাচার্য

 

(১)
যে স্টেশন সাইকেল দিয়ে ঘিরে নেয় চারপাশ, যে গাছ নিজের সঙ্গে ছুটিয়ে মারে কারও ফেলে-যাওয়া মূর্তি, যে মেয়ে না-বলেই চলে আসে আর অপেক্ষা করানোর জন্য দোষ দেয় – তাদের আমি ভালোবাসি। এর ফলে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে মেয়েটিকে ট্রেনে উঠে যেতে দেখা একধরনের বিষাদইঙ্গিত। আমি গাছে চেপে ছুটতে থাকি, এই আকাশ থেকে ওই আকাশে বায়ু হতে হতে পিছু নিই তার। পৌঁছে অবাক হয়। ভাবে, একই মূর্তি দু-জায়গায় এল কেমন করে। আমি ফেলে যাওয়ার দিকে ইশারা করি। আমি ফুলের প্রভাব সরিয়ে সাইকেলে বসার জায়গা করে দিই মেয়েটির।

(২)
ট্রেন যে কী দ্রুত ছুটতে পারে, আকাশ থেকে দেখেছিলাম একদিন। হাঁপিয়ে যাচ্ছি, প্রাণ ধরে ঝুলতে ঝুলতে হাত ফসকে যাচ্ছে আমার। মেয়েটি জানলা দিয়ে ‘এসেছিল’ গোছের খই ছড়াচ্ছে মন দিয়ে। ফিরিয়ে দিয়েছি। চেপে ধরতে গিয়ে খুন করে ফেলেছি তৎক্ষণাৎ। আকাশের মাথায় লাশ ভেঙে পড়ছে। অথচ শব্দ শুনে চমকে উঠল না। মাঝখান থেকে আমার রং সেই গাছের মতো, সাইকেল হাঁটিয়ে নেওয়ার সময় মাঝেমধ্যে যে নিমন্ত্রণ করে। মেয়েটিকে মুকুট পরিয়ে গাছের হাতে তুলে দিয়েছি। আমি নতুন কোনও মেয়েকে মূর্তি করে দেব না শিগগিরি।

 

ব্রহ্মাণ্ড

দেবর্ষি সরকার

 

সমুদ্রসফেন সেঁকো বিষ
নিহিতার্থে জেগে ওঠো
মুখে নাও কচি ধানশীষ
ঠোঁটে নাও দরিদ্র বাতাস
হাতে নাও বাসনাসঙ্কেত
দিবারাত্র উড়ে চলে
গত কৃচ্ছ্রসাধনের প্রেত

হে ক্ষণভঙ্গুর
তুমি তো আমারই ইচ্ছা
তুমি প্রিয় মহামান্যপুর

আর আমি দিনান্তে রাখি ক্লেশ
নিজস্ব গ্রহাণুপুঞ্জ খুঁটে খাই

ব্রহ্মাণ্ড বিশেষ

 

ডুয়ার্স

পৃথ্বী বসু

 

এতদূরে শুধু শুধু ছুটে আসা, বোকাবুদ্ধু মায়া…
কিছুই পাওয়ার নেই, খালি হাতে ফিরে যাব। তবু,
অনুনয়-বিনয়ের ঝুড়ি পিঠে বেঁধে—
তোমার ভিতরে ফাঁকা চায়ের বাগানে

শ্রমিকের মতো বেঁচে থাকা…

 

পতঙ্গযান ১

প্রলয় মুখার্জী

 

সকল প্রাণী পাকস্থলীর ভিতর নিজেরই মাংস ভক্ষণের কৌশল গোপন রাখে।

শীর্ণ হিরামন, লুপ্তপ্রায় ভোঁদর, মসলিন যুবতী, তরুণ কীট স্ব-জাতির মাংসই ভক্ষণ করে।

জীবিত অবস্থায় খাদ্যের অভাবে ঘাসের অভাবে উপবাসে শরীরে জমানো মাংস ও চর্বি তুমি না চাইলেও তিলে তিলে গলে।

গলে খাদ্যে ও চুম্বনে সংশ্লেষ হয়।

একুশদিন বাইরের অন্ন ছাড়া উড়ন্ত মোরগ ছাড়া মানুষ নিজের মাংস খেয়েই বাঁচতে চায়

বাঁচতেই তো চায়।

এই কৌশলে পতঙ্গ আজীবন পতঙ্গের মাংস খায় আর মানুষ মানুষের।

সঙ্গমের উদ্দেশ্যে এই রীতি রেওয়াজ আদিকাল থেকে ভালোবাসা পূর্ণ।

 

সন্ধে

প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী মুখোপাধ্যায়

 

সন্ধে নেমে আসে।
ডোবার সবুজে নামে, কচুরিপানায়…
আমার শরীরে নামে মজ্জায় মজ্জায়
ধীর নামে চারিদিক স্তব্ধ হয়ে এলে,
কয়েকটা পাথর শুধু শূন্যে চেয়ে থাকে
এমনই নিস্তব্ধ সন্ধে কানে কানে ডাকে।
এরই মাঝে ভ্রম হয় চোখের পাতায়
জোনাকির আলো আর কে নেভাতে চায়!
ভ্রম হয়, দিনগত পাপক্ষয় হলে
নিজের ভেতর থেকে অন্তরাত্মা বলে–
কী কারণে কাঁপে ঠোঁট, কীসে এত ভয়!
এমনই নির্জন হোক একান্ত সঞ্চয়।

 

রাজনীতি

বেবী সাউ

 

সমস্ত সুপারি বন চাঁদের আলোয় হেঁটে যায়

ইতিউতি শেয়ালের চোখ, গন্ধ শুঁকে শুঁকে আসে

পা-ছাপে সিঁদুর দাগ, খানা-খন্দ, ডহরি জঙ্গল

অপেক্ষা করুণ হলে, পাড়াপ্রতিবেশী সব বোঝে

কবেকার আলপনা! কতটা পিঁপড়ে জমছে এই
শাকে ভাতে

 

তখন রাত ছিল

রনক জামান

 

চাঁদ—
রাত্রির যে কোনও রাস্তায়
যেন ফুটেছে কেমন ফুল, পৃথিবীর বাইরে কোথাও
আর হাঁটছি এদিকময়
পিতার চপ্পল পা’য়
জ্যোতিকার প্রিয় সুর গুনগুন করছি একা
আলো বা আঁধারে যাই
উচ্ছন্নে চলে যাই
তবু চাঁদ
রাত্রির যে কোনও রাস্তায়
যেন পুলিশ পুলিশ ভাব,
কিছুতে এড়ানো যায় না

 

ঘুম ভাঙার শব্দ

রোহণ ভট্টাচার্য

 

তবুও তোমার দিকে এগোব

যতদূর গেলে
ছায়া দিয়ে ছায়াকে আদর করা যায়
ততদূর যাব

এই গোপন অভিসন্ধি
আর কেউ জানে না,
সকলে জানে
তোমার সাথে দেখা হলে
আমি কথা বলি হেসে

সোজাসুজি বলার সাহস নেই আমার
ভয় পেতে পেতে যারা বোবা হয়ে যায়
আমি তাদেরই একজন।
লুকিয়ে গুলি খাওয়া অভ্যাস করেছি
রপ্ত করেছি
গুলি হজম করার শিল্প
এখনও যেমন কৌশলে কাছে আসছি
দূরে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করছি
ছায়াতে ছায়া ঘষে দেওয়ার
এতে মনে মনে ওম পাওয়া যায়

বরং আরেকটা সিগারেট ধরাও।
দুজনের মাঝে ধোঁয়ার কাঁটাতার
মুখোমুখি দাঁড়াও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মতো
বর্ডারে গোলাগুলি চলুক
মাথার ভেতর ছুটে যাক হল্লাগাড়ি
আবহাওয়া শান্ত হলে
একে অপরের বেড়া ডিঙিয়ে
মেপে আসা যাবে
কোথায় কার কতখানি লাশ
কতটা মাটির নীচে পোঁতা হল

তুমি পাশ কাটিয়ে গেলে
আমি ফুটো হয়ে যাব
আমি পাশ কাটিয়ে গেলে
তুমি রাস্তা হয়ে যাবে

তবুও তোমারই দিকে এগোব
কাউন্টার চাইব সিগারেটের
আঙুলে আঙুল ঠেকে যাবে
এইভাবে পুড়ে গেলে
কোনও চিহ্ন থাকে না
ছাই উড়ে যায় না হাওয়াতে

 

ডোম্বিনী

শাশ্বতী সান্যাল

 

মৃত্যু একলা এসে বসে আছে ভাতের থালায়
কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি পেতে দেব তাকে?
সযতনে বেছে দেব দু’একটা আধমরা চাল?

অবহেলা, খিদে নিয়ে বসে আছে নিজেরই শিয়রে
তবে কি আদরে ডাকব : মাথা খাও, শোনো
এমন রোদের দিনে একাকী ফিরো না

সংসার রয়েছে তারও। জানি নারী আছে, দ্রৌপদী
ভাত ও আগুন দেয় একইসাথে বেড়ে
পাশাপাশি শুয়ে থাকে রাহু আর চাঁদ
তবু অসিধারাব্রত, গ্রহণ লাগে না।

বারোয়ারি ছাদ জুড়ে শামিয়ানা, এ ভরা শ্রাবণে
ফুটন্ত ভাতের শব্দ, তার প্রিয় ঘ্রাণ
প্রেম এর বেশি নয়। গরীবের ঘরে
চাল থাকলে স্বর্গ, আর, না থাকলে শ্মশান

মৃত্যু একলা এসে বসে আছে শ্মশান-চিতায়
কী করে বোঝাব তাকে, এ পোড়া শহরে
সহমরণের প্রথা উঠে গেছে — ঘরে ফিরে যাও।

 

গোড়াপি হেঁসেলনয়

শিমুল জাবালি

 

চতুষ্কোণ। যে অবহেলিত নদীর ধারণাসম্বলিত দারগা। আমরা উৎসব ঘোষণা করি একের পর এক। সম্ভু উৎসব। মরু উৎসব। এসকল গোড়াপি কখনও চুকে দেখেনি উৎসবের ইতিহাস। চলো ঘণ্টা বাজাই। বেহুলার হিকমত চতুষ্কোণের নাচানুচি দেখবে। আহত করবে অসহায় নদীকে। মাঝে মাঝে নদীকে হুর মনে হত হুরকে মনে হত তালুবন্দি সতীনের সতীন।

আহ্,
ঘোড়াগুলোর নখের টুকরো নেই!

দোজখে বঁড়শি বাইতে গেলে উঠে আসে পুরুষ। পুরুষের রক্ত, বীর্যের বিষাদ পা। তমিস্র কাতর হলে অন্ধতমিস্র দৃষ্টি হারায়। আমাদের হাততালি দেখে মরা বাদুড়ও হাততালি শিখে নেয়। আমরা বিলাতি ঘোড়াদের সংরক্ষণ করি বনপাড়ায়। টুকে রাখি কারসাজি মামলায়।

মামলাতে উঠে আসে চুমকির আলগা কান।

গোড়াপি!

 

কিশোর

শুভম চক্রবর্তী

 

ছড়ানো পথের পাশে
নেমে এল আলোছায়াগাছ
দিনের হিসেব লেখা
চঞ্চল কিশোরী বয়স
যে পুকুরে ডুব দেয়
মুহূর্ত নিংড়ে তাতে
বুনোপানা প্রেমিকের
হাবাগোবা মুখ ভেসে ওঠে
রেখায় রেখায় খেলে
আশ্চর্য বিদ্যুৎ
আমি তার কাছে শিখি
নিজেকে আয়ত করে
সহজ জলজ কোনও
ইশারায় ডুবে যেতে যেতে
মুহূর্ত নিংড়ে তাতে
খাবি খায় কিশোরী বয়স
আকাট কিশোর আমি
শূন্যতা খুঁজেছি জলে
কোনওদিন জীবন খুঁজিনি

 

গুজারিশ

শে সাদ্দাম হোসেন

 

১।

আমরা যখন কেউ বাড়িতে ছিলাম না
ফাঁকা টেবিলের সাথে চারটি চেয়ারের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলেছে।

এখন স্থির, চুপচাপ– তোমার মতোই ঢুকে পড়ল আমাদের সংসারে

২।

দুচোখ ভর্তি শূন্যস্থানে যে কোনও সমুদ্র ডুবে যেতে পারে।
স্মৃতি কামড়ানোর শব্দে তুমি একটি খসে যাওয়া পাতা তুলে নিলে

তার সমস্ত ক্লোরোফিল তখন ক্রমশ মাটি শিখতে চাইছে। দুঃখিত
মানুষ তার পুনর্বিবাহ শুনতে পেল না! এমনকি তুমিও জানলে না—

পুরনো জুতোজোড়ায় এখনও কীভাবে ফিরে আসা যায়।

 

ছাতিম

শ্রাবণী খাঁ

 

তোমার পাড়ায় হাঁটতে যাই মাঝে মাঝে।
তোমার বাড়ির দিকে ভুলেও তাকাই না, মনে হয় চুরি করে দেখছি।
সোজা রাস্তাটা ধরে হাঁটি, আবার চলে আসি।

ভাবতেই রোমাঞ্চ হয়, এই রাস্তা দিয়ে দুবেলা তুমি হেঁটে যাও, অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফেরো, কখনও থমকে গিয়ে ফোন ক্যামেরায় ছবি তোলো,
এই রাস্তা থেকেই তুমি চলে যাও
কফিশপের দিকে, রিইউনিয়নের দিকে, ইয়ারলি ট্যুরের দিকে
এই রাস্তা দিয়েই তুমি ফিরে আসো ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের কাছে।

আমার মাঝে মাঝে সেই রাস্তাটাই হেঁটে আসার বড্ড লোভ হয়।

সেদিন হঠাৎ মানসীর সঙ্গে দেখা, তোমার পাড়াতেই

বলল– কী রে, তুই এখানে?
বললাম– গন্ধের লোভে লোভে এসেছি
খবর পেলাম, এ পাড়ায় প্রচুর ছাতিম ফুটেছে….

মানসী চলে গেল…

আমার মনে হল…
সম্ভবত হাজার বছর তোমার গন্ধ পাইনি।

 

গুহাচিত্র

শ্রীজাতা গুপ্ত

 

জিপিএস ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগিয়েছে ঋতু। গন্তব্য: বসন্ত সকাল। দুরূহ সংকেত ভুলে পথে পথে খুঁজেছিল তপ্ত আদর; শূন্য থেকে নেমে আসা বিপজ্জনক গলি। ম্যাপ-নক্সা সেখানেই স্ক্রিনের শেষ আলো। প্রেমিকের বাসা ছিল, ফুটেছিল এখানেই ভ্রান্ত পলাশ বাসনা। আবর্জনাস্তুপ, রক্ত ভাসে

হলদে কমলা: গাড়ি থেকে দুই পা এগোলেই করতলে শহুরে প্রেমোৎসব।

—-

শরীর জুড়ে বেঁচে উঠছে পাখি। শরীরে আজ ঘুরছে এরোপ্লেন। পরনে তার নীল ডুরে ধান শাড়ি। একটি হাতে ড্যাগার ঝলমল, অন্য মুঠি অশান্ত রঙ বেলুন। রুক্ষচুল অপেক্ষাতে বদমেজাজি উড়ন্ত বন্দর।

 

যাপন

সমিধ বরণ জানা

 

মশাল জ্বালিয়ে তাকে দেখি
সেও হাঁটে খোঁড়া দুই পা-এ,
এপথেই জলাধার আছে
এমনই তো বলেছে সবাই।

দুজনের হাতে একই ছবি
ছায়া কায়া, কায়া ছায়া হয়;
দেখি তাই মোদের শিয়রে
পাখি দেয় ডানার ঝাপট।

দুজনেই এই পথে যাব’
তবু কোনও কথা ক’ব নাকো,
যদিও মশাল নিভে যায়
শব্দহীন, ফিরে চলে যাব’।

ফের যদি নাম ধরে ডাকো
গুহামুখ শুধু হাতড়াব’
স্মৃতিগুলি আঁকা হয়ে যাবে
গুহার ও’ পাথরের গায়ে।

তারপর, বহুদিন পরে
আবার সে যাদুকর যবে,
যাদুর থলেটি ঘাড়ে নিয়ে
ধীর পায়ে একা হেঁটে যাবে…
সেদিনে-ও তুমি এই জেনো
গুহামুখ ফুলে ঢেকে দেব’।

 

ভিতরে যুদ্ধ

সুপ্রিয় মিত্র

 

কতদূর যাবে? একাকীহীন এই একা হেঁটে বেড়ানো,
যুদ্ধ ব্যতীত শান্তির পায়রা যেমন তুচ্ছ;
শাদা পালকের ভেতর ওই মাংস আমার ব্যথা।
ব্যথা উঠোনে আসে… সারা সন্ধে কথা হয়।
কপালে তাকায়; চোখে চোখ রাখতে পারে না।
সে উড়ে যায়। আমি বেরিয়ে পড়ি।

কিছুদূর গিয়ে ট্রেন অচেনা স্টেশনে হল্ট করে।
সিগন্যাল দেখতে নামি আর সে ছেড়ে দেয়…

শিখি। এভাবেই শেখা হয় অবহেলার বিভিন্ন ভাষা।
এত শিখে লাভ হয় কি কিছু? শরীরে অশরীরে
ভিতরে যুদ্ধ বাধে কোনও…
বারুদ আর পায়রা পাশাপাশি হাওয়া ভেঙে ওড়ে।
কে কাকে পথ দেখায়?
মাথা ঘোরে পৃথিবীর। আমার দিন রাত্রি কাটে।

 

তরমুজের কবিতা

সেলিম মণ্ডল

 

আমাদের তুলোক্ষেতে কে যেন লাগিয়েছে তরমুজ
শীত চলে গেছে
আমিও খাব। এতটাই খাব
দু-ঠোঁটে যেন আমার রাষ্ট্র লেগে থাকে

তুমি হতে পারো তরমুজ
আধফালি তুমি বাজারে দাঁড়িয়ে নজর কাড়তে পারো
মানুষের জিভ এখনও সেই একইরকম লকলক করে

গোটা তরমুজের প্রতি লোভ কম
তাই তো নিজেকে চেরাই করে বোঝাই
এখনও বেঁচে আছি, টকটকে আছি

 

অরণ্যের দিনরাত্রি

সোমদত্তা মৈত্র

 

আমি ছায়া মাড়িয়ে ফেলেছিলাম আমার নিজের। তারপর থেকেই মায়াতে পেয়ে বসেছে। আজন্মকাল থাকবে, আমার কোলের কাছে। বাসে ফেরার সময়, একটি রোগী মেয়েকে দেখছিলাম, বাবার শার্ট আঁকড়ে ধরে আছে। চোখগুলো ভাসা ভাসা। স্ট্যাটিস্টিক্যালের স্টপ এসে গেছে, মন ঘোরাতে গিয়ে দেখলাম, এড়িয়ে যেতে পারছি না। আর বুঝলাম যে আমি জড়িয়ে যাই। আমাদের বরানগরের বাড়ি, পোস্ট আপিস, দিদার হাতে লাগানো গাছ। মার অফিস যাওয়ার সময়, আমি পুবদিকের জানলা দিয়ে হাত নাড়তাম, মা এগিয়ে যেত সামনে, আমি ছুট্টে চলে যেতাম উত্তরদিকের জানলায়। এসব আমার সাথেই থেকে যায়। ভালোবেসে দেওয়া নামগুলো, পুরনো বইয়ের দোকানে বিক্রি হয়। খুঁজে কিনতে হবে।