Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

যে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে ওঠে বসে…

প্রকৃতির সঙ্গে...

সোমেন বসু

 

অভিজ্ঞতার দাম কত? সামান্য একটা গান গেয়ে মানুষ অভিজ্ঞতা কেনে বুঝি?
জ্ঞানলাভ বুঝি খুব সহজ? বুঝি একটু নাচনকোঁদন করে দিলেই সব পাওয়া যায়?
না, জ্ঞানের মূল্য মানুষের সর্বস্ব — তার গৃহ, তার স্ত্রী, তার সন্তান
জ্ঞান বিক্রি হয় সেই জনহীন বাজারে যেখানে খরিদ্দার নেই কেউ
সেই শুষ্ক প্রান্তরে যেখানে চাষি শুধুই রুটির জন্য লাঙল চালায়

উইলিয়াম ব্লেক

অনেকের কথাই মনে পড়ছে। লালগড়ের বাঘটা, বুবুর গরুটা…

লালগড়ের বাঘটা মরার পর আমরা, মানে এই শহরের বিষাক্ত বাতাসে ফুসফুস ভরা সেই মানুষজনেরা যারা মুক্ত বায়ু সেবনের জন্য প্রকৃতির কোলে যাই বচ্ছরে অন্তত একবার, আকাশজঙ্গলপাহাড়সমুদ্দুর দেখে বাক্যিহারা হই আর ডিএসএলআর বাগিয়ে খচাখচ নেচার ফটোগ্রাফি তুলি এবং ফেসবুকে পোস্টাই, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে ওয়াইল্ড লাইফ দেখে বিজ্ঞ এবং মুগ্ধ হই আর নিজেদের বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ির একখণ্ড শূন্যের নিশ্চিন্ত ঠেকে যদি রান্নাঘরের পাইপ বেয়ে কোনও ধেড়ে ছুঁচো ঢুকে পড়ে তো দেখে ভিরমি খাই, সেই তারা উপলব্ধি করেছি যে সাঁওতালদের শিকার উৎসব কত খারাপ। ঠিক এইটাই সেই একমাত্র বেড়ে শালা যার জন্য আমাদের বন্যপ্রাণী, বন, প্রকৃতি, পরিবেশ সব আজ বিপন্ন, মুমূর্ষু। এরকম করে বছর বছর শিকার করে চলে যদি ওসব জংলিরা, বাঁচব কী করে রে ভাই? ছাপোষা আমরা ছেলেপিলেগুলোকে কি আর চিড়িয়াখানায় পপকর্ন খেতে খেতে দুটো বাঘও দেখাতে পারব না? এসব সাতপাঁচ শাপশাপান্ত করতে করতেই বাচ্চাকে করবেটের শিকারের গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছি!

এমত হিপোক্রিসি আমাদের রক্তে। আজকের ফ্ল্যাটবাড়িগুলো খুব সুন্দর। মধ্যবিত্তের মাটিছাড়া অবস্থানের সার্থক অভিজ্ঞান।

শুধু হিপোক্রিট হলে তাও বা হত। আমরা, একই সঙ্গে, অত্যন্ত শ্রেণিসচেতন।

বুবুর গরুর কথা বলছিলাম। ২০০০-এর বন্যায় মুর্শিদাবাদ গেছিলাম ত্রাণ দেওয়ার জন্য। কুঁয়ে নদীর বাঁধের ওপরে একটা গ্রাম, সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। বাড়ি ঘর গরু ছাগল, সব। যখন ঢুকেছি কিছু চিড়ে ওষুধপত্র এসব নিয়ে, দেখলাম এক মহিলা, মুসলিম, গ্রামটাই তাই, হাউহাউ করে কাঁদছে। একে আর কিছু পরে আমরা বুবু, অর্থাৎ দিদি বলে ডাকতে শুরু করব, সেও ভ্রাতৃজ্ঞানেই আমাদের কাছে তার সুখদুঃখ উজাড় করে দেবে। তারপর চলে আসার সময় মিষ্টি মুর্শিদাবাদী টানে বলে উঠবে, “হায় আল্লা আল্লা গো! এমন দিনে ভাইগুলো আসল কিছু খেতে দিতেও পারলাম না আল্লা…!” সে যাই হোক, শুনলাম তার কান্নার কারণ। একটা গরু ভেসে গেছে জলের তোড়ে। একটাই গরু ছিল তার। ঘরবাড়ি গেছে, আবার তুলতে হবে, যদ্দিন না হয় এই বাঁধের ওপর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ত্রিপলের তলায় গুজরান। এমনিতেই হতদরিদ্র অবস্থা। অন্যের জমিতে জন খেটে চলে, বাড়ির ছেলেরা দলে দলে চলে আসে এই কলকাতা শহরে রাজমিস্ত্রির কাজ করতে। সেই প্রতিটা বাক্যে দুটো করে আল্লা বলা মুসলিম মহিলা গরুর শোকে হাপুস নয়নে কাঁদছে। হ্যাঁ, এরা গরু খায়। যেমন হিন্দুরা ছাগল পোষে এবং খায়। সেও সত্য, আবার এই কান্নাটাও। অর্থনীতি, বাস্তববাদ এবং হৃদয়বৃত্তি মিলেমিশে যায় একটা রেখায় এসে। এইটুকু যদি বুঝতাম আমরা, হায়, তাহলে কি আর বিজেপি এসব শয়তানি চালিয়ে যেতে পারত নির্দ্বিধায়!

অথচ বোঝাটা খুব কঠিন নয় কিন্তু। জলবৎ বরং। মানুষ ছাড়া পরিবেশ ভাবনা হয় না। সেই মানুষ, যারা পরিবেশ এবং প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। তাদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরেই তারা রক্ষা করে পরিবেশকে। যেমন, কৃষক তার জমিকে, আদিবাসীরা জঙ্গলকে, বুবু তার গরুকে…

এই জলের মতো সত্যটা এমনকি রাষ্ট্রপুঞ্জও বোঝে না! ২০১৭ সালে পরিবেশ দিবস উপলক্ষে তাদের আহ্বান ছিল, ‘কানেক্টিং পিপল টু নেচার’। প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করুন। শুনতে চমৎকার। ভেবে দেখতে হোঁচট। কারণ রাষ্ট্রপুঞ্জের নিজেরই স্বীকৃতি গ্রামাঞ্চলের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত হয়েই থাকেন। ফলে এ আহ্বান শহুরে ৩০ শতাংশকে। তারা যাবেন, অভয়ারণ্যে, পাহাড়ে, সমুদ্রে। ডিএসএলআর তো সাথে থাকবেই। হল না পরিবেশ রক্ষা?

কানেক্টিকাট ইউনিভার্সিটির পলিটিকাল সায়েন্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর প্রকাশ কাশওয়ান তার Democracy in the Woods : Environmental Conservation and Social Justice in India, Tanzania and Mexico বইতে এই কথাটাই খুব স্পষ্ট করে বলেছেন : কৃষকদের এবং জঙ্গলের অধিবাসীদের জমির অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে পরিবেশ রক্ষার কথা বলা বাতুলতা মাত্র।

প্রকাশ ভারত, তানজানিয়া এবং মেক্সিকো এই তিনটি দেশে গবেষণা করে দেখিয়েছেন কীভাবে ঔপনিবেশিক শাসকরা, ভারত এবং তানজানিয়ায় ব্রিটিশরা এবং মেক্সিকোয় স্পেনীয়রা, জঙ্গলের অধিকার থেকে সেখানকার প্রকৃত অধিবাসী অর্থাৎ আদিবাসীদের উৎখাত করা শুরু করেছিল, এবং আজ এই উপনিবেশ-পরবর্তী যুগেও দেশীয় শাসকরা কীভাবে সেই ধারা অক্ষুণ্ণ রেখেছে। যদিও ব্রিটিশদের সঙ্গে স্পেনীয়দের তফাত ছিল। স্পেনীয়রা ছিল পর্তুগিজদের মতো প্রথম যুগের সাম্রাজ্যবাদী। সামন্তবাদের প্রভূত প্রভাব তাদের মধ্যে রয়ে গিয়েছিল। তারা রাজত্ব বিস্তার, উপনিবেশের লোকেদের খ্রিস্টান করা আর ট্যাক্স তোলাতেই সন্তুষ্ট ছিল, ব্রিটিশদের মতো সমস্ত কিছু নিজেদের দখলে এনে চিবিয়ে চুষে ছিবড়ে করে ফেলার সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষা তারা পুরো আয়ত্ত করে উঠতে পারেনি। সেই কারণেই তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যেত না, কিন্তু এদের চলে গেছিল। এই চরিত্রগত তফাত পরিস্ফুট হয় জঙ্গলের অধিকার সংক্রান্ত আইনকানুনের দিক থেকে ভারত-তানজানিয়ার সঙ্গে মেক্সিকোর মধ্যে ফারাকগুলি দেখলে। ভারতে আদিবাসীরা এবং তানজানিয়ার মাসাই আদিবাসীরা জঙ্গলের কিছু অংশ পরিষ্কার করে এবং শুকনো পাতা জ্বালিয়ে অস্থায়ীভাবে যে চাষ-আবাদ করতেন সেই প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করা হল জঙ্গল এবং পরিবেশের জন্য খুবই বিপজ্জনক হিসেবে। এবং সেই অজুহাতে তাদের দলে দলে উৎখাত করা হল সাবেকি ভূমি থেকে। ভারতে লাগু হল ১৯২৭ ইন্ডিয়ান ফরেস্ট অ্যাক্ট, যে আইন এখনও কার্যকরী। পাশাপাশি, মেক্সিকোয় কিন্তু স্পেনীয়রা জঙ্গল এলাকায় নিজেদের অনেক সম্পত্তি বানালেও এরকম উচ্ছেদ কখনও করেনি।

বইটি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ওমেইর আহমদ বলছেন, “ভারত এবং তানজানিয়া দুই জায়গাতেই ঔপনিবেশিক শাসকরা বিশ্বের কঠিনতম কিছু ফরেস্ট্রি আইন লাগু করেছিল এই ছুতো দেখিয়ে যে ‘নেটিভ’রা এই সুন্দর জঙ্গল এবং বন্যপ্রাণী ধ্বংস করে ফেলবে। অথচ পাশাপাশিই এই ব্রিটিশরা জঙ্গল কে জঙ্গল সাফ করে খামার বানাচ্ছিল, তাদের সম্মানীয় অতিথিরা এসে মনের আনন্দে বাঘ, গণ্ডার ইত্যাদি শিকার করছিল, সেসব নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা ছিল না। উপনিবেশ-পরবর্তী জমানাতেও ছবিটা কিছুই পাল্টায়নি। ভারতে আদিবাসীরা তাদের সাবেকি ভূমি ফেরত পায়নি। এবং জনসংখ্যার ৮ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও বাঁধ ইত্যাদি তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বাস্তুচ্যুত হওয়া আদিবাসী জনগণের সংখ্যা দেশের মোট উচ্ছিন্ন মানুষের ৪০ শতাংশ। নেহেরু বলেছিলেন, আদিবাসীরা দেশের স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করছে।” আহা রে! দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেই তো কিছুদিন আগে তুতিকোরিনে গুলি খেল দশ-বারোটা লোক!

আর এই সব কাজে শাসককে মদত জুগিয়ে গেছি আমরা, এই মধ্যবিত্ত আলোকপ্রাপ্ত মানুষজন। আমরা কিন্তু প্রকৃতির মধ্যে থাকবও না, প্রকৃতির থেকে প্রত্যক্ষ কোনও ফায়দাও নেব না। খালি সৌন্দর্য দেখব। বলছিলাম না, আমরা খুবই শ্রেণিসচেতন কর্তাভজা জাত।

আগেরটার মতো আরেকটা জলবৎ সত্যি কথাও এবার বলে ফেলা যাক। প্রকৃতি তথা পরিবেশের মূল শত্রু পুঁজিবাদ। সে ফুল্লকুসুমিত হবে আর আমরা পরিবেশ রক্ষার্থে বড় বড় শপথ নেব, এও বাতুলতা।

বিশ্বের প্রথম দশটা কর্পোরেটের তালিকাটা দেখাই:

বললাম না, জলের মতো সহজ কথা। দশটা কোম্পানির মধ্যে সাতটা তেল, বিদ্যুৎ বা গাড়ির কারবার করে। আর তাদের দেশনেতারা কার্বন এমিশন নিয়ে জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দেয়!

যুদ্ধাস্ত্রের কথা? থাক…

তবে এ পুঁজিবাদের দোষ নয়। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মাত্র। বাঘ যেমন হরিণ খায়, আমরা যেমন গরু-শুয়োর-ছাগল-মুরগি খাই, তেমনই। মুনাফার খোঁজে হন্যে না হলে পুঁজিবাদ আর পুঁজিবাদ থাকবে না। এবং পুঁজিবাদের উৎপাদন না সমাজের কথা ভেবে, না পরিবেশের কথা ভেবে। তার একটাই লক্ষ্য — মুনাফা। বেদান্তা-আদানিরা ব্যতিক্রমী কেউ না।

আর আমাদের দেশগুলির গণতান্ত্রিক, কল্যাণকামী রাষ্ট্র পরিচালকরা আইন বলবৎ করে, পুলিশ-মিলিটারি লেলিয়ে তাদের যাবতীয় সহায়তা দেবে। মধ্যভারতের পাহাড় কে পাহাড় ধরে মাইনিং শুরু হওয়ার আগে তৈরি হচ্ছে ফৌজি ক্যাম্প। যাই হোক, এদের দোষ দেওয়া যায় বটে, তবে সে অক্ষমের অভিসম্পাতের বেশি গুরুত্ববহ কিছু হয় না।

অতএব, মোদ্দা কথাটা হল, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ভাবনাও একেবারেই দোষের নয়। পরিবেশ, বিপন্ন ধরিত্রীর দোহাই!

আর সেই লড়াইয়ে সর্বাগ্রে রাখতে হবে মানুষকে। যে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে ওঠে বসে…