Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

যুদ্ধখেলায় বিরতি ও একটি নগ্ন নির্জন হাত

ব্রতীন্দ্র ভট্টাচার্য

 

ট্রুম্যানসায়েব কাজটা ভালো করেননি! জেনারেল ম্যাকআর্থারের কথা শুনলে আণবিক শেল হেনে সেই পঞ্চাশের দশকেই উড়িয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া যেত যে দেশটাকে, জেনারেলসায়েবের কথা না-শুনে অ্যাদ্দিন ধরে তার তুর্কিনাচন সইতে হল! ওই কথা শুনলে না থাকত বাঁশ, আর না বাজত বাঁশি! ডগলাসসায়েবের দূরদৃষ্টি ছিল এ-কথা মানতেই হবে। জাপান — মানে হিরোশিমা আর নাগাসাকি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার — পরবর্তী সময়ে তিনি আরও দুই দেশের আকাশে সাদা-গোলাপি মেঘ এঁকে দিতে চেয়েছিলেন। তার একটি ছিল উত্তর কোরিয়া, অন্যটি চিন। এই দুই দেশের জ্বালায় শ্যামকাকার সাদা চামড়ায় আজ যে ফোস্কা পড়ছে, তার কিছুই হত না, যদি ওই সময়ে ট্রুম্যানসায়েব পিছিয়ে না যেতেন। ওঁর ছাতি যে ছাপ্পান্ন ইঞ্চির ছিল না সেটা পোড়-খাওয়া পাঠিকা সহজেই অনুমান করতে পারছেন।

এ-নিয়ে লিখতে বসে যে ফিলিমের কথা বারবার মনে পড়ছে, তার থেকে দুটো কথা তুলে দেওয়া যাক —

General Jack D. Ripper: Mandrake, do you recall what Clemenceau once said about war?

Group Capt. Lionel Mandrake: No, I don’t think I do, sir, no.

General Jack D. Ripper: He said war was too important to be left to the generals. When he said that, 50 years ago, he might have been right. But today, war is too important to be left to politicians. They have neither the time, the training, nor the inclination for strategic thought. I can no longer sit back and allow Communist infiltration, Communist indoctrination, Communist subversion and the international Communist conspiracy to sap and impurify all of our precious bodily fluids.

এই জ্যাক ‘ডি’ রিপারের সঙ্গে ডগলাসসায়েবের মিল কেউ খুঁজে পেলে পান গে!

তো যাই হোক, নানাবিধ গ্রহশান্তি কবচধারণ ইত্যাকার সুকার্যের ফল ফলেছে, এবং অ্যামেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট (যিনি উত্তর কোরিয়ার ‘রোগ রেজিম’-এর কোনও চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করলেন) হিসেবে ট্রাম্পবাবু এবং কিমবাবু রাজি হয়েছেন মুখোমুখি বসতে। অনেক টালবাহানা, যাব-কি-যাব-না-র পর গেল বারো তারিখে সে শুভদৃষ্টি সুসম্পন্নও হয়েছে। সগ্‌গো থেকে দেবতাগণ পুষ্পবৃষ্টি করেছেন। দেশবিদেশের তাবড় নেতাগণ ধন্য ধন্য করেছেন। কেউ কেউ ট্রাম্পবাবুকে একজন পাক্কা ‘শান্তির ছেলে’ হিসেবে ‘নবেল’ দেবার দাবিও জানিয়েছেন। তবে এরই মধ্যে একটু বেসুরে বাজছে চিন।

চিনের কথা ব্যাখ্যান করার আগে দু’কথা বলে নেওয়া দরকার।

খুব সহজ করে বলতে গেলে চিন বিগত কয়েক বছর ধরে প্রফেসর ক্যালকুলাসের মতন ‘আরও দক্ষিণে! আরও দক্ষিণে!’ বলে নিজের দক্ষিণহস্তের দাক্ষিণ্য দান করে চলেছে। সেই দানের লক্ষ্য হল দক্ষিণের ছোটখাট দেশগুলো। এমনিতে ব্যবসা ও লগ্নির বিচারে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে চিনের আধিপত্য প্রা‘চিন’। তার ওপর গত বছরের আসিয়ান সামিটে প্রায় সব দেশই দক্ষিণ চিন সাগরে ঝগড়াঝাঁটির প্রশ্নে Middle Kingdom-এর সঙ্গে সঙ্ঘাতে না-যাবার নীতি ঘোষণা করেছে। যে ফিলিপিন্স কিছুকাল আগেই এ-বিষয়ে প্রবল প্রতিবাদ জানিয়েছিল, তার প্রেসিডেন্ট দুতার্তে আসিয়ানের মাথা হয়ে এই সঙ্ঘাতের পথ পরিহার করেছেন, তারপর চিনদেশে ভ্রমণে গিয়েছেন, এবং প্রা‘চিন’ দ্বন্দ্ব ভুলে এখন প্রো-চিন হয়েছেন। এর ফলও ফলেছে হাতেনাতে। চিনদেশে ফিলিপিন্সের রপ্তানি এখন হুড়মুড় করে বেড়ে চলেছে।

ওই ছোট দেশগুলোর কথায় আসি। এরা কারা? নেপাল, ভুটান আর মায়ানমার। এইসব দেশে ব্যবসা তেমন হয় না বলে চিন তৈরি করছে লম্বা লম্বা রাস্তা। পাকিস্তানের C-PEC, বা চিন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর একদিকে, আর নেপাল (পরবর্তীতে ভুটান ও মায়ানমার)-এর সঙ্গে Belt and Road Initiative বা BRI দিয়ে অন্যদিকে ভারতকে ঘিরে ফেলেছে চিন।

হঠাত ভারতকে ঘিরে ফেলা কেন?

কারণ রাজকন্যে আগেই গুলিসুতো খেয়ে ফেলেছে! মানে ২০০৯ সালে ইউ.পি.এ সরকার ক্ষমতায় এসেই অ্যামেরিকার সঙ্গে ভাব-ভালোবাসার সম্পক্কো তৈরিতে বিশেষ যত্নবান হয়েছে। মধ্যে মধ্যে আমাদের টাকায় পেলেন চড়ে যতই ‘বিয়ার হাগ’ হোক না কেন, কথামৃতের গরুর মতন মুখটা আমাদের ঘাসেই রয়েছে যদিও দড়িটা খুঁটে-বাঁধা। বা, বাংলা ছবির ধর্ষণোন্মুখ কামোন্মত্ত ভিলেনের সামনে আর কিছু না-পেয়ে নায়িকার সেই চক্ষে-জল-আনা চিৎকার — ‘তুই আমার শরীর পাবি, শয়তান, কিন্তু মন পাবি না!’ তো সেই মন, বা খুঁট আমরা যে পরমেশ্বর পক্ষীরাজের কাছে গচ্ছিত রেখেছি, তিনি এখন পাগলের মতন নিজের ন্যাজ খুঁজছেন। এসবের মধ্যে পড়ে আমাদের অবস্থা যদিও সঙ্গীন! পাকিস্তানের সঙ্গে তো আগে থেকেই আকচা-আকচি। এখন তার সঙ্গে শুরু হয়েছে ইরান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ প্রমুখ এককালীন বন্ধু দেশের সঙ্গে বিবাদ। সবের ওপর মাঝে মাঝে ফোঁস করে যাচ্ছে চিন। তবু আমাদের ভক্তি এখনও বেশ অচলাই রয়েছে। যত হোক ভক্তিবাদের দেশ!

তো চিনের এই দক্ষিণপন্থাকে আটকাতে ট্রাম্পের হাতে আর কোনও অস্ত্র ছিল কি, উত্তর কোরিয়াকে নিজের তাঁবে আনার চেষ্টা করা ছাড়া? ভারত আর যাই হোক পুরোপুরি কদলীসাম্রাজ্য হয়ে যায়নি। ফলে সেখানে একচ্ছত্র হতে লেগে যাবে আরও বেশ কিছুটা সময়। দক্ষিণপূর্ব এশিয়া তো হাতের বাইরে গেছেই, এখন পূর্বে জাপান ছাড়া দুই কোরিয়াকে হাতে পাবার চেষ্টা ট্রাম্প যে করবেন, সে আর নতুন কী! তার ওপর এই সামিটের কয়দিন আগেই কিম দেখা করে এসেছেন শি জিনপিং-এর সঙ্গে।

এদিকে চিন এখন যতই পুষ্পবৃষ্টি করুক না কেন, কিম যখন একের পর এক হুঙ্কার এবং মিসাইল ছাড়ছিলেন, উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে সন্তর্পণে ঢিলে করেছে উত্তর কোরিয়ার ওপর স্যাঙ্কশনের ফাঁস, রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করেই। সম্প্রতি এক সাংবাদিক সম্মেলনে শি জিনপিং-এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ট্রাম্পকে যখন এই নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, এ-কথা বলা ছাড়া তাঁর বোধ করি উপায় থাকে না — “He really closed up that border… but maybe not in the last couple of months but that’s OK.”

বিলেতের গার্ডিয়ান কাগজের কথায় — এই সামিটের পর দুজনের যে যৌথঘোষণা খবরে এসেছে, তা পড়ে নাকি দক্ষিণ কোরিয়াবাসী, এবং উত্তর কোরিয়ার উদ্বাস্তুরা মনে করছেন — আদতে তাঁদের ঠকানো হল! কিমবিরোধী প্রত্যেকেই নাকি মনে করছেন — ট্রাম্পকে কিম বোকা বানিয়ে দিয়েছেন, এবং যা হয়েছে, তাতে কিমের ভালো বৈ মন্দ হয়নি।

কী ছিল সেই যৌথঘোষণায়?

ছোট করে লেখা যাক —

  1. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া তাদের নিজের-নিজের দেশের মানুষের ইচ্ছা অনুযায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকে নতুন যাত্রা শুরু করবে।
  2. এই দুই দেশ কোরীয় উপদ্বীপে দৃঢ় ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তিস্থাপনার উদ্দেশ্যে কাজ করে যাবে।
  3. এই বছরের সাতাশে এপ্রিলে অনুষ্ঠিত পানমুঞ্জম ঘোষণা-অনুযায়ী কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিকাস্ত্রমুক্ত করা হবে।
  4. যে-যার দেশে পরস্পরের বন্দিদের মুক্তি দেবে।

এই চারটে কথা ছাড়াও এই ঘোষণা ছাড়াও ট্রাম্প কিমকে নিরাপত্তার জামিন দিতে রাজি হয়েছেন, এবং যুদ্ধখেলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছেন। এই খেলার কথাটা, বলে রাখা ভালো, আমার নয়। ট্রাম্পের নিজেরই ভাষায় — wargames।

নিন্দুকেরা বলছেন, এমন নির্বিষ চুক্তিপত্র তাঁরা আগে দেখেননি। এতে না-আছে পারমাণবিকাস্ত্রমুক্তি-বিষয়ক কোনো নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে নির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা, না-আছে উত্তর কোরিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোনও নামগন্ধ।

 

আপাতত যা ভাবা হচ্ছে, তা হল রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পর্ষদে আলোচনার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে স্যাঙ্কশন বা বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া হবে। ফলে, বিশ্বে শান্তি ততটাই নেমে আসবে যতটা শ্যামকাকারা চান।

তবে এ-ক্ষেত্রে ইরানের কথা  সর্বজ্ঞা পাঠিকা নিশ্চয় মনে রাখবেন। ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাগিদে ইরানের সঙ্গেও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের চুক্তি হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী ইরান নাকি এগিয়েও চলছিল ভালোই। তবু ট্রাম্প মনে করেন সেই চুক্তি ছিল খুবই জোলো, এবং সেই ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি এখন নানান কৌশলে ইরানকে গলাধঃকরণ করতে উদ্যত হয়েছেন। শুধু ইরানই বা কেন? ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিন্টনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার এই মর্মে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তাতে জর্জ বুশ এসে জল ঢালেন ২০০২ সালে, যখন শয়তানের অক্ষের অন্যতম হিসাবে চিহ্নিত করা হয় উত্তর কোরিয়াকে। ঘটনাচক্রে তখন আন্ডারসেক্রেটারি অফ স্টেট ফর আর্মস কন্ট্রোল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিওরিটি অ্যাফেয়ার্সে ছিলেন জন বল্টন, যিনি কী না এখনকার ন্যাশনাল সিকিওরিটি অ্যাডভাইজার। বল্টনসায়েবের খুব ইচ্ছে ছিল উত্তর কোরিয়াকে প্রথমেই আক্রমণ করা হোক। এ-নিয়ে বিগত ফেব্রুয়ারিতে তিনি ওঅল স্ট্রিট জার্নালে বিস্তারে লিখেছিলেন।

সত্যি পুব-পশ্চিমের ব্যবধান দুস্তর! এ-প্রসঙ্গে বিরিঞ্চিবাবা গপ্পের সেই বাজারের ব্যাগের কথা মনে পড়ে, স্থানবিশেষে যার ওজনের তারতম্য হত।