Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

সমকাম ও আমাদের অমূলক ভয়

ডা. অভিষেক দে

 

দণ্ডবিধি ৩৭৭ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সংবাদমাধ্যমে ইদানিং প্রচুর লেখালেখি চলছে৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংবাদমাধ্যমগুলি প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করেছে ও এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু গত সপ্তাহে হঠাৎই এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন চোখ পড়ে গেল, আমারই এক ডাক্তার বন্ধু পড়ার জন্য লেখাটি আমাকে পাঠিয়েছিলেন। প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছে বাংলাভাষার প্রথম সারির দৈনিক সংবাদ প্রতিদিন-এ৷ প্রতিবেদনটি পড়তে চাইলে আগ্রহীরা নিচে তা পড়ে নিতে পারেন।

প্রতিবেদনটি পড়ে বেশ অবাকই হলাম। প্রতিবেদনের কিছু অংশে নানা তথ্য এমন কনটেক্সট বহির্ভূতভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা পড়লে সমকামিতা সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে৷ কেন, সে কথায় আসছি। তার আগে বলা দরকার আমাদের প্রত্যেকের দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়কে মুক্তকণ্ঠে স্বাগত জানানো দরকার৷ এই রায়ের ফলে দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে চলে আসা এক প্রকট লিঙ্গ-অসাম্য অবশেষে দূর হল। প্রথমত, যেকোনও প্রথম বিশ্বের দেশের মতোই, ভারতেরও এই নির্দেশকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে ব্যক্তির যৌন পছন্দের ক্ষেত্রে প্রচলিত সমস্তরকম সামাজিক বৈষম্য ও বাধানিষেধ অবিলম্বে বিলোপ করা জরুরি।

আলোচ্য প্রতিবেদনটিও এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে, খুঁটিয়ে পড়লে তা বোঝা যায়। কিন্তু প্রতিবেদনটির কিছু অংশ এবং এর শিরোনাম সমকামিতা নিয়ে কিছু আশঙ্কার জন্ম দিতে পারে। এখানে কোনও তথ্যের সাহায্য ছাড়াই বলার চেষ্টা হয়েছে যে সমকামীদের এইডস রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অধিক৷ কিন্তু যেসমস্ত দেশে সমকামিতা সম্পূর্ণ সামাজিক স্বীকৃতি পেয়েছে, সেইসব দেশ থেকেও আমরা এমন কোনও তথ্যভিত্তি পাচ্ছি না যা বলে দেবে যে সমকামী ও উভকামীদের মধ্যে  HIV সংক্রমণের হার বিষমকামীদের তুলনায় বেশি৷ HIV সংক্রমণের মূল কারণ হল একাধিক যৌনসঙ্গী, যথেচ্ছ যৌনাচার ও অসুরক্ষিত মিলন। এবং এর সঙ্গে একজন মানুষ সমলিঙ্গের সঙ্গী পছন্দ করেছেন কি বিষমলিঙ্গের সঙ্গী নির্বাচন করছেন, তার কোনও সম্পর্ক নেই৷ পাশাপাশি এটা ভাবারও কোনও ভিত্তি নেই যে যেসব মানুষ সমলিঙ্গের সঙ্গী নির্বাচন করছেন, তারা প্রত্যেকে একাধিক পার্টনারের সঙ্গে মিলিত হন বা অবাধ যৌনাচার করেন। তাহলে সারা পৃথিবীতে বিষমকামী মানুষদের জন্য যৌনব্যবসা এত রমরম করে চলত না।

প্রতিবেদনটি জানাচ্ছে, সঙ্গমের ক্ষেত্রে পায়ুমিলন যোনিমিলনের চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। হ্যাঁ, পায়ুপথে সঙ্গমে কিছুটা ঝুঁকি আছে, একথা সত্য। কিন্তু সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কারণ পায়ুমিলন শুধুমাত্র সমকামী পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাছাড়া, সমস্ত সমকামীরা এইভাবে সঙ্গম করেন, তাও নয়।

অতএব, এই প্রতিবেদনে তথ্যগুলিকে প্রসঙ্গের বাইরে এনে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যে তা জনমনে একধরনের সামাজিক ফোবিয়া তৈরি করতে পারে। আমি আরেকবার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই, সমকামিতার আলাদাভাবে HIV সংক্রমণের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই এবং এই নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। সমস্ত চিকিৎসকরা এই সত্যকে স্বীকার করেছেন এবং সেই কারণে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে উচ্চকণ্ঠে সাধুবাদ জানিয়েছেন।

একইসঙ্গে HIV আক্রান্ত রোগী সম্বন্ধেও আমাদের অহেতুক ভীতিকে দূরে সরিয়ে দেওয়া দরকার। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা খুব দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিতে HIV-র শিকার হয়েছেন। তবে HIV এখন চিকিৎসাযোগ্য৷ বহু প্রাণদায়ী ওষুধ বেরিয়ে গেছে, বিশেষত multidrug combination বাজারে আসার পর HIV-তে জীবনহানির হারকে উন্নত দেশগুলিতে এতটাই কমিয়ে দেওয়া গেছে যে তা ডায়াবেটিস বা অন্যান্য ক্রনিক রোগের সমপর্যায়ে নেমে এসেছে। একজন HIV আক্রান্ত মানুষের জন্য আমাদের সহানুভূতি দরকার, ভীতি নয়। আমাদের দেশে AIDS আমরা তখনই কমিয়ে আনতে পারব, যদি একাধিক যৌনসঙ্গী ও অসুরক্ষিত যৌন সঙ্গমকে বন্ধ করা যায়, সমকামের সঙ্গে এর কোনও যোগ নেই।

৩৭৭ ধারা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ঐতিহাসিক হলেও, সবেমাত্র প্রথম পদক্ষেপ। দেশের সংবাদমাধ্যমগুলির জনমানসে সমকাম নিয়ে যে অমূলক ভীতি রয়েছে তা মুছে দিতে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

(লেখক ক্যালকাটা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর)