অতিমারির আয়নায় এই সময়ের শিক্ষা

সোমনাথ মুখোপাধ্যায়

 


প্রাবন্ধিক, গদ্যকার, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

 

 

 

সেদিন সাতসকালে ঘুমজড়ানো চোখে মাথার কাছে রাখা মুঠোফোনের হোয়াটস-অ্যাপ বাটনে আঙুল ছোঁয়াতেই এক প্রবাসী ছাত্রের পাঠানো মেসেজে নজর আটকে গেল। খবরের কাগজের একটা ক্লিপিংস। তারই ছবি তুলে পাঠিয়েছে আমাকে। ইংরাজিতে লেখা ক্লিপিংসটির শিরোনাম— Kids forgot language and maths in Covid year: Study. বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষকতার সঙ্গে কর্মসূত্রে যুক্ত ছিলাম বেশ কিছু দিন, তাই খবরটা এক নজরে দেখেই একটা অন্যরকম অনুভূতির স্রোত যেন শায়িত শরীরের শিরদাঁড়া বরাবর বয়ে গেল। আঙুল টেনে ফোনের পর্দার ওপর খবরটাকে বড় করে মেলে ধরতেই বিষয়টা স্পষ্টতর হল। খবরটি একটি সমীক্ষা-রিপোর্টের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ে। মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে ইনসেটে ছাপা হয়েছে জনৈক শিক্ষকের আকুল আর্তনাদ— লিখতে ভুলে গেছে— আমাদের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বাচ্চারা, যারা আগে অক্ষর চিনে সঠিকভাবে পড়তে পারত, তারা আর পড়তে পারছে না। মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৫০ শতাংশের এই হাল। লিখন-সামর্থ্যের হাল আরও ভয়াবহ। শিক্ষার্থীরা তাদের ওয়ার্কবুকে দুটি বা তিনটি সরল বাক্যও ঠিকমতো লিখতে পারছে না— এমনটাই অভিমত রাজস্থানের জনৈক শিক্ষকের। এমন খবর দেখার পর আর স্বস্তিতে শুয়ে থাকা যায়! মূল প্রতিবেদনটি পড়ে দেখার আগ্রহে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ি।

কেটে গেছে জীবনের সুর

বিগত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অতিমারির কারণে আমাদের এতদিনের দিনযাপনের চেনা ছন্দ আর ছবিটাই বিলকুল বদলে গিয়েছে। প্যানডেমিক বা অতিমারি পরিস্থিতি কেবল আমাদের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তাকে বিপর্যস্ত করেনি, আমাদের অর্থনৈতিক বাতাবরণ, সামাজিক শৃঙ্খলা, সর্বোপরি আমাদের ভাবী প্রজন্মের নাগরিক শিক্ষার্থীদের পঠনপাঠন তথা শিখন সামর্থ্যকেও গভীর সঙ্কটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

সম্প্রতি বেঙ্গালুরুর আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের সরেজমিন সমীক্ষা ও গবেষণাসূত্রে উঠে এসেছে কোভিডকালের এমনই ভয়াবহ শিক্ষাচিত্র। এমন একটা অবস্থা যে হতে চলেছে তার আগাম আঁচ পাওয়া গিয়েছিল অনেক আগেই, তবে আলোচ্য গবেষণা-প্রতিবেদনটি সমস্যার গহীনতার বিষয়টি সর্বসমক্ষে স্পষ্ট করে দিল। আজিম প্রেমজি ফাউন্ডেশনের তরফে জানানো হয়েছে— “অন্যতর কোনও উদ্দেশ্য নয়, শিক্ষার ভূমিস্তরে সম্পৃক্ত মানুষজন, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষা-গবেষক ও সর্বোপরি শিক্ষাবিষয়ক নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে।” এ-কথা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই যে, কোভিড-১৯ অতিমারি পরিস্থিতির কারণে দেশের প্রচল শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নানা স্তরের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অন্যতর স্তরের শিক্ষার্থীদের তুলনায় প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। এমনটা বলা কখনওই অতিরঞ্জিত বলে মনে হবে না যে, বিপুল সংখ্যক শিশু শিক্ষার্থীর স্বপ্নালু চোখের সামনে থেকে তাদের সোনালি, রঙিন শৈশবটাই বেমালুম লোপাট হয়ে গেল। কীভাবে এই পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে সামলে নেওয়া যাবে সেই বিষয়ে কোনও স্পষ্ট ও সর্বজনীন কার্যকর বিকল্পের কথা না বলেই মোবাইল ফোন-নির্ভর অনলাইন পাঠসঞ্চালন ব্যবস্থাকে বিকল্প হিসেবে প্রতিস্থাপনের প্রয়াস করা হয়েছে। আমাদের শিশু-শিক্ষার্থীদের একান্ত পারিবারিক পরিকাঠামো, অভিভাবকদের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থান সম্পর্কে সামান্যতম ধারণা থাকলে এমন একটা পাঠসঞ্চালন ব্যবস্থা নিয়ে এত হইচই করা কত বিপজ্জনক তা বুঝতে পারি।

অতিমারির আতঙ্কে একটা গোটা শিক্ষাবর্ষ ইতিমধ্যেই নিষ্ফলা অতিক্রান্ত হয়ে গেল। অতিমারির দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ার কারণে বর্তমান শিক্ষাবর্ষও কোনও শুভ ইঙ্গিত বহন করে আনছে না আমাদের শিক্ষার্থীকুল তথা শিক্ষাসঞ্চালন ব্যবস্থার জন্য। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা এরপর আসবে অতিমারির তৃতীয় ঢেউ যা হয়তো আমাদের শিশু ও কিশোর প্রজন্মকে আক্রান্ত করবে। ফলে শিক্ষার্থীদের সামনে এক অতলান্ত আঁধার। এই দেড় বছর সময়কালের মধ্যে সাধারণ পঠনপাঠনের পাশাপাশি বিদ্যালয়-কেন্দ্রিক কোনও সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমের সঙ্গেও শিক্ষার্থীদের কোনওভাবেই যুক্ত করা যায়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশের স্তরেও একটা বড় রকমের শূন্যতা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এই শিক্ষাবিস্মৃতি কেবল ভয়াবহ বা উদ্বেগজনকই নয়, এমন অবস্থা দেশের সার্বিক পঠনপাঠনধারার অধোগমনকেই যেন সূচিত করছে। এই বিষয়ে কোনও মতানৈক্যের অবকাশ নেই যে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা হল একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের বনিয়াদ। ভিতের মজবুতির ওপর যেমন নির্ভর করে ইমারতের স্থায়িত্ব, ঠিক তেমনই একজন মানুষের প্রথাগত শিক্ষাজীবনে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার গুরুত্ব। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত চর্চার অভাবের কারণে পড়া বা ছোটখাট যোগবিয়োগের সমস্যা সমাধানে অসমর্থ হলে পঠনপাঠনের অগ্রগতির ধারাটাই বিপুলভাবে ব্যাহত হয়। মনে রাখতে হবে শিক্ষা একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া, একটি ধাপের অর্জিত সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করেই চলে পরবর্তী ধাপের নির্মাণ। ফলে পূর্ববর্তী বছরে অধীত পূর্বপাঠের সারাৎসার যদি শিক্ষার্থীরা নিয়মিত অনুশীলনের অভাবে বিস্মৃত হয়, তাহলে পাঠের অগ্রগতি হয় কী উপায়ে? বোধশূন্য অবস্থায় জ্ঞানের বিকাশ বা অগ্রগমন আদৌ সম্ভব? অতিমারিজনিত পরিস্থিতির কারণে অর্জিত জ্ঞান-বোধ-ধারণার এই পশ্চাদপসরণের বিষয়টি সত্যিই সকলের পক্ষে চিন্তার।

সন্দেহ নেই যে এই অবস্থার ক্রমযৌগিক প্রভাব গোটা দুনিয়ার তথা আমাদের দেশের চলতি শিক্ষা-প্রক্রিয়াকে এক গোলকধাঁধায় ফেলে দিল। বলতে দ্বিধা নেই, শিশু-শিক্ষার্থীদের এই ক্ষয়ক্ষতি আগামী দিনে তাদের পরিণত নাগরিক জীবনের যাপনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। বিষয়টিকে খুব হালকাভাবে নেওয়া হলে তা যে আগামী দিনে গভীর বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনও দেশের সর্বতোমুখী উন্নতির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের বিষয়টি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি। বুঝতে হবে এই ঘটনাটি নিছক কতগুলি নিয়মানুগ পাঠদিবসের অপচয় নয়, এই ঘটনা এক অভাবিত স্তব্ধতা এনে দিল গোটা শিক্ষপ্রক্রিয়াতে, শিক্ষার্থীরা হারাল এক স্বপ্নময় আনন্দযাপনের অবসর। এই শূন্যতা কীভাবে পরিপূরণ করা যাবে সেই বিষয়ে সর্বস্তরেই গভীর চিন্তাভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।

ছেঁড়া তার এবং কিছু সংলগ্ন ভাবনা

জল ছাড়া যেমন মাছ বাঁচে না, গাছ ছাড়া যেমন ফুলের সৌন্দর্য ম্লান, স্কুল ছাড়া তেমনই হাঁপিয়ে পড়ে শিশিক্ষু শৈশব, কৈশোর। আর হইচই, দুরন্তপনা, জটিল প্রশ্নের প্যাঁচপয়জার, একরাশ বিস্ময়, জিজ্ঞাসা, শাসন, অনুরাগ, উপদেশ, আদেশ— এসব ছাড়া ইট-বালি-সিমেন্টে গাঁথা স্কুলবাড়ির কোনও অর্থ আছে নাকি? ২৩ মার্চ ২০২০। লকডাউন নামক এক আশ্চর্য, অমোঘ শব্দবন্ধের সঙ্গে আমরা পরিচিত হলাম। মাঝে মাঝে একটু-আধটু নড়াচড়ার সুযোগ পেতেই দলে দলে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে মানুষ, আর তাতে করেই বেড়েছে সংক্রমণের প্রকোপ। আমাদের অত্যুৎসাহের ফোঁকর গলে আছড়ে পড়েছে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ। এরই মাঝে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত তাগিদে আমার কর্মস্থলে যেতে হয়েছে বেশ কয়েকবার, কিন্তু প্রত্যেকবারই সদর পেরিয়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঢুকে ধাক্কা খেতে হয়েছে। ফাঁকা স্কুলবাড়ি জুড়ে বিরাজমান অখণ্ড নীরবতা। যারা পঠনপাঠনের এই আশ্চর্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা আছেন তাঁদের কাছে এই নিস্তব্ধতা সত্যিই অসহনীয়। স্কুল বন্ধ, তাই পঠনপাঠনের চিরায়ত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাটি আজ গভীর নেতি-প্রভাবে প্রভাবিত। স্কুল ছাড়া শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে সমাজের প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা, যারা পঠনপাঠনের জন্য একান্তভাবেই স্কুলের ওপর নির্ভর করে থাকে, যাদের বাড়িতে সমান্তরাল পঠনপাঠনের সুযোগ নেই, তারা সত্যিই আজ এক অচলাবস্থার শিকার। চলতি কথায় বলে ‘অনভ্যাসে বিদ্যাহ্রাস’। স্বাভাবিক অবস্থাতেই যেখানে শিক্ষার্থীরা দু-তিনদিন বাদেই পুরনো পড়া বেমালুম ভুলে যায়, সেখানে এতদিন টানা স্কুলের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে শিক্ষার্থীদের কী হাল তা সহজেই অনুমেয়। এই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা যাচাই করার উদ্দেশ্যেই আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস জুড়ে দেশের পাঁচটি রাজ্যের— কর্নাটক, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও উত্তরাখণ্ড— ৪৪টি জেলার ১১৩৭টি সরকার পোষিত বিদ্যালয়ের ১৬০৬৭ জন শিক্ষার্থীর ওপর একটি সমীক্ষার কাজ করা হয়। অতিমারি পরিস্থিতির কারণে বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ভাষা ও গণিতের জ্ঞান নেতি-পরিস্থিতির কারণে কতটা প্রভাবিত হল তা যাচাই করাই ছিল লক্ষ্য। সংশ্লিষ্ট গবেষকরা পঠনপাঠনের সঙ্গে যুক্ত ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে শিক্ষার্থীদের বর্তমান সামর্থ্যের মূল্যায়ন করেছেন, অর্থাৎ, প্রাক-কোভিড কালে তাদের অর্জিত সামর্থ্য এবং লকডাউন-পরবর্তী সময়ে তাদের শিখন-সামর্থ্যের তুল্যমূল্য বিচার করার পরই শিক্ষামানের এই অধোগমনের চিত্রটি স্পষ্ট হয়েছে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার বিষয়টিকে সমীক্ষার ভিত্তিরেখা বা বেস-লাইন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

সমীক্ষার হালহকিকত…

রাজ্য বিদ্যালয়-সংখ্যা শিক্ষার্থীর সংখ্যা

বালক

শিক্ষার্থীর সংখ্যা

বালিকা

ছত্তিশগড় ২১৫ ১৬২৩ ১৩১৩
কর্নাটক ৩২৬ ২০৯৫ ১৭৩৬
মধ্যপ্রদেশ ১৬৯ ১০৩৩ ৭৩৪
রাজস্থান ১৯৮ ২০২৭ ১৮৯১
উত্তরাখণ্ড ২২৯ ১৯৯০ ১৬২৫
মোট ১১৩৭ ৮৭৬৮ ৭২৯৯

 

মূলত এনসিইআরটি নির্দেশিত নির্দেশিকা অনুসরণ করে শিক্ষার্থীদের শিখন সামর্থ্য পরিমাপনের প্রয়াস করেছেন সংশ্লিষ্ট সমীক্ষকরা। শিক্ষার্থীদের পূর্বার্জিত প্রাথমিক জ্ঞানের ভিত্তিতেই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে যাতে করে বর্তমান সামর্থ্যের ভিত্তিতে পরবর্তীকালে শিক্ষাসঞ্চালন তথা পাঠ-পরিকল্পনা করা যায়।

ভাষাশিক্ষার সামর্থ্য হ্রাস— এক নজরে
৯২ শতাংশ গড়পড়তা শিক্ষার্থী ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রে তাদের পূর্বার্জিত সামর্থ্য হারিয়েছে।

  • এই সামর্থ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল ছবি দেখে বলতে পারা বা তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারা; পরিচিত শব্দ পড়তে পারা; পঠন ও শ্রুতিবোধের প্রয়োগ; ছবি দেখে কয়েকটি সরল বাক্যে তা প্রকাশ করতে পারা।
  • দ্বিতীয় শ্রেণির ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী, তৃতীয় শ্রেণির ৮৯ শতাংশ শিক্ষার্থী, চতুর্থ শ্রেণির ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী, পঞ্চম শ্রেণির ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের পূর্বার্জিত জ্ঞান বা ধারণা সম্পূর্ণভাবে বিস্মৃত হয়েছে।

গাণিতিক বোধের ধারণা লোপ
৮২ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের পূর্বার্জিত বিদ্যা বিস্মৃত হয়েছে।

  • গাণিতিক সামর্থ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এক ও দুই অঙ্কের সংখ্যা চিনতে পারা; সহজ গাণিতিক সমস্যার সমাধান; সমস্যা সমাধানে গাণিতিক ধারণার প্রয়োগ; দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক আকৃতি সম্পর্কিত ধারণা; সাধারণ উপাত্ত থেকে গাণিতিক রাশি পাঠ ও চিত্রায়ন।
  • এক্ষেত্রে দ্বিতীয় শ্রেণির ৬৭ শতাংশ, তৃতীয় শ্রেণির ৮৯ শতাংশ, চতুর্থ শ্রেণির ৮৫ শতাংশ, পঞ্চম শ্রেণির ৮৯ শতাংশ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ৮৯ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের পূর্ববর্তী শ্রেণির গাণিতিক ধারণা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছে।

শিখন-সামর্থ্যের অবনমন যে কতটা গহীন তা বোঝার পক্ষে এই তথ্যগুলি যে যথেষ্ট তা সকলেই স্বীকার করে নেব। বিদ্যালয়-কেন্দ্রিক পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে প্রধান দুটি পক্ষ— শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। এই সুযোগে শিক্ষার্থী প্রসঙ্গে শিক্ষকদের অভিজ্ঞতার কথা একটু শোনা যাক।

গুরু কহেন…

একজন শিল্পী যে মমতায় একটি মূর্তি গড়েন, একজন নিষ্ঠ শিক্ষক বা শিক্ষিকার মনোলোকের অভীপ্সাও ঠিক তেমনই। জানি, পাঠকদের মধ্যে কেউ কেউ ঈষৎ তির্যক দৃষ্টি নিয়ে এই কথাগুলি পড়বেন— একবার, দুবার, আর তারপর নিজের অজান্তেই বুক খালি করা নিঃশ্বাস ছেড়ে জীবনানন্দকে ধার করে বলবেন— ধুস! জীবন গিয়েছে চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার। এই মন্তব্য নিয়ে নতুন করে টিপ্পনি করব না, তবে এই ক্রান্তিকালে শিক্ষক-শিক্ষিকারাও যে ভালো নেই, তাঁরাও যে সুতীব্র সংবেদনার অভিঘাতে জর্জরিত, তা তাদের মন্তব্য থেকেই বেশ টের পাওয়া যায়।

পূর্ববর্তী পর্যায়ের তুলনায় পঠন-সামর্থ্যের অবনমনের বিষয়টি গভীরতর হয়ে উঠেছে। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠ্যাংশ থেকে করা সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে বা খুব চেনা শব্দের অর্থ বলতে পারছে না, পাঠ্যাংশ-সম্পৃক্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের লিখন-সামর্থ্যের অবনমনের সমস্যাটি আরও ভয়াবহ। পরীক্ষিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৃতীয় শ্রেণির মাত্র একজন কোনওরকম ভুল না করে শুদ্ধ বাক্য লিখতে পেরেছে।

(মধ্যপ্রদেশের জনৈক শিক্ষক)

.

আমাদের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা আগে বই দেখে ভালোই পড়তে পারত, কিন্তু বর্তমানে তাদের অর্ধেকেরও বেশিসংখ্যক অক্ষর চিনতেই পারছে না এবং কিছু লিখতে পারার ক্ষমতা একেবারেই লোপ পেয়েছে। সাধারণ বাক্যও তারা গঠন করতে পারছে না।”

(রাজস্থানের জনৈক শিক্ষক)

.

…আগে আমি আমার ছাত্রদের খবরের কাগজ পড়তে উৎসাহিত করেছিলাম যাতে প্রত্যেকের মধ্যে নতুন কিছু পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। দিনের শুরুতেই জমায়েত হওয়ার আসরে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দিয়ে পড়ার কাজটা করা হত; কিন্তু এখন সেই প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে হয়, কেননা এতদিন তাদের সেই সুযোগ ছিল না। পাশে থেকে এ ব্যাপারে উৎসাহিত করার লোকজনও কেউ ছিল না। ফলে এক নিদারুণ শূন্যতা গ্রাস করেছে তাদের।

(রাজস্থানের জনৈক শিক্ষক)

শিক্ষার্থীদের এই রিক্ততা কোনওভাবেই আমাদের নির্লিপ্ত থাকতে দেয় না। বরং একটা দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ভিড় করে মনের আকাশে। এই বিস্মৃতি, এই পশ্চাদপসরণ কেবল গুটিকয় শিক্ষার্থীর সমস্যা নয়, এই সমস্যা আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থাপনাকেই এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই মুহূর্তে অতিমারিজনিত পরিস্থিতি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে এক বিচ্ছিন্নতার প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়েছে একথা মেনে নিতে বাধ্য হলেও বলি, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও এই সম্পর্কের আদান-প্রদানে বিস্তর ফাঁক থেকে যায়। পড়ানো ও শেখানো— এক কাজ নয়। আজ যে বিস্মৃতির জন্য হাহাকার ধ্বনি, গেল গেল রব তা কিন্তু বরাবরের জন্যই আমাদের দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে এঁটুলির মত এঁটে রয়েছে। অকল্পনীয় সংখ্যায় স্কুলছুটের সংখ্যা বৃদ্ধি এই অবস্থার বাস্তবতাকেই যেন স্বীকৃতি দেয়। করোনা অতিমারির এই তমসা একদিন কেটে যাবে, তবে যে আশঙ্কায় আশঙ্কিত হচ্ছেন এই সময় সংবেদনশীল শিক্ষকেরা তার গহীনতা কি আমরা আঁচ করতে পারছি?

আমার মনে হচ্ছে করোনা পরিস্থিতির কারণে বাচ্চারা আগামী দিনে ক্লাসরুমে এসে বসার অভ্যাসটাই ভুলে যাবে। প্রায় দেড় বছর নিয়মিত পঠন-পাঠনের সঙ্গে যুক্ত না থাকার ফলে, তাদের পক্ষে নতুন ক্লাসের পাঠ্যবিষয় গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। পূর্বপাঠের ভিতের ওপরে নতুন পাঠের নির্মাণ হয়। কিন্তু পূর্বপাঠের নড়বড়ে ভিতের ওপরে নতুন পাঠের ইমারত গড়ব কী করে?

(জনৈক শিক্ষক, ছত্তিশগড়)

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাজারো সমস্যা। পাঠবিস্মৃতির বিষয়টি আগামী দিনে দেশের আমশিক্ষার্থীদের শিক্ষাভাবনায় এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করল। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় ধরা পড়েছে যে দেশের অগণিত প্রান্তিক পরিবারের শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ কেবল পারিবারিক প্রয়োজনে স্কুলের আঙিনা ছেড়ে আবার শ্রম বিপণনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। করোনা সংক্রমনের দ্বিতীয় ঢেউ প্রবলভাবে আছড়ে পড়ার কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বহু মানুষের রুটি-রুজির সংস্থান, যে কারণে অনিবার্যভাবে বাড়ছে কর্মহীন শ্রমিকদের অভিবাসন। এইসব দেশান্তরী শ্রমিক পরিবারের শিশু-শিক্ষার্থীরা হয়ত পাকাপাকিভাবে সরস্বতীর আখড়া ছেড়ে কর্মজগতে প্রবেশ করল এই অবসরে। এমন সমস্যা যে কল্পনাপ্রসূত নয় তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে উত্তরাখণ্ডের জনৈক শিক্ষিকার বিস্মিত জবানবন্দিতে:

স্কুলে আসার পথে আমার সঙ্গে দেখা হল এক ছাত্রের। স্কুল বন্ধ, তাই সে কাজ নিয়েছে এক কাপড়ের দোকানে। সে আমাকে দেখে বেশ গদগদ হয়ে বলল— আমাদের দোকানে খুব ভালো ভালো সালোয়ার-কামিজের সেট এসেছে। আসুন, নিয়ে যান। ঠিক একইরকম আমন্ত্রণ জানাল আরেক ছাত্র। সে বলল— ম্যাডাম আমার দোকানে খুব নতুন ডিজাইনের স্যান্ডেল এসেছে, নিয়ে যান। বাকি রাস্তা চলতে চলতে আমি কেবলই একটা কথা ভাবছিলাম— কী আশ্চর্য! আমার কিশোর শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার কথা জিজ্ঞাসা না করে তাদের ব্যবসার কথা বলতেই অনেক বেশি আগ্রহী।

আরও গভীর অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে আমাদের রাজ্যের কিশোর-কিশোরী থেকে তরুণ-তরুণী শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের গৃহবন্দি দশার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সীমান্তের স্কুলপড়ুয়াদের চোরাচালানের কাজে লাগাচ্ছে পাচারকারীরা। উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলির ছেলেমেয়েরা জড়িয়ে পড়ছে এমনই সব অসামাজিক কাজকর্মে। এদের শিক্ষার মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা কি সম্ভব হবে ভবিষ্যতে?

সমস্যার বহুমাত্রিকতা প্রসঙ্গে…

সমীক্ষক দলের সমীক্ষাসূত্রে যে তথ্য উঠে এসেছে, সমস্যার বহুমাত্রিকতা বিষয়ে যে আভাস মিলেছে তাতে করে এমনটা মনে করার কোনও কারণ নেই যে আমাদের শিক্ষার্থীদের শিখন-সামর্থ্যের এহেন বিপ্রতীপ চলনের বিষয়টি কেবলমাত্র সমীক্ষিত পাঁচটি রাজ্যের মধ্যেই সীমায়িত আছে, বরং বলা যায় সমীক্ষার পরিধি আরও বাড়ালে আমাদের উদ্বেগ আরও বাড়বে সন্দেহ নেই। সংখ্যার বিচারে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বাধিক। আর এই ভূমিস্তরের শিক্ষার্থীরাই যদি অতিমারিজনিত পরিস্থিতির দরুণ শিখন-সামর্থ্য বিস্মৃত হয় তাহলে শিক্ষাকাঠামোর উচ্চতর অংশের হাল কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়। এমনই সব শিক্ষার্থীরা, যাদের একটা বড় অংশই প্রান্তিক অর্থনৈতিক পরিবারের প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া, পড়াশোনার সমস্ত রকমের প্রয়োজনে এরা একান্তভাবেই বিদ্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল। তাই আজ স্কুল বন্ধ থাকার অর্থ হল স্তব্ধ পঠন, স্তব্ধ শিখন, স্তব্ধ মনোবিকাশ, স্তব্ধ অগ্রগতি।

এমনই অচলাবস্থা কাটাতে অনলাইন পঠন-পাঠনকে একমাত্র উপায় হিসেবে মান্যতা দিয়েছে গোটা দেশ। কিছুদিন আগেও ছোটদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়ার বিষয়ে নানা নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলা হয়েছে, অথচ আজ! পরিস্থিতির চাপে তাকেই আজ শিক্ষা তথা পাঠসঞ্চালনের একমাত্র অবলম্বন বলে মনে করছি আমরা, অন্যতর বিকল্পের কথা না আলোচনা করেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছি ‘বিশ্বদর্শন যন্ত্র’। এই প্রসঙ্গে চমৎকার বলেছেন ম্যাসাচুসেটসের এডুকেশন সেক্রেটারি ও হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এডুকেশন রি-ডিজাইন ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর পল রেভিলে। তিনি বলেছেন, “It’s like a genie that is out of the bottle, and I don’t think you can get it back in.” বোতল থেকে জিন বেরিয়ে পড়েছে। তাকে আর বোতলবন্দি করা যায়?

আমাদের দেশের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের কাছে তথাকথিত অনলাইন শিক্ষা কখনওই গ্রহণীয়, ফলদায়ী নয়। “…কেননা গ্রামীণ ভারতের সাধারণ খেটেখাওয়া পরিবারগুলির আর্থসামাজিক অবস্থানের প্রেক্ষিতে এমন গালভরা ডিজিটাল শিক্ষাসঞ্চালন ব্যবস্থা কার্যকর হয়ে ওঠার সম্ভাবনা খুবই কম। অভিভাবকদের অধিকাংশই প্রথাগত কেতাবি শিক্ষায় শিক্ষিত নন। দুবেলা দুমুঠো অন্নের সংস্থান করতেই এরা জেরবার। আর তাই এই সমস্ত পরিবারের শিশুরা কখনও ক্ষেত-খামারের কাজে, চায়ের দোকানে, অথবা বাড়ির ছোটদের দেখভালের কাজে ব্যস্ত থাকে। মেয়েরা হেঁসেল সামলায় অথবা গৃহস্থালির কাজকর্মে সময় কাটাতে বাধ্য হয়।” এমন সব শিশুশিক্ষার্থীদের কাছে স্কুল হল একটা কার্যকর প্ল্যাটফর্ম যা তাদের জীবনের বৃহত্তর আকাশে, জীবনের উন্নততর ভাবনায় ভাবিত করে, স্বপ্নের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রাখে।

ডিজিটাল ডিসটেন্সিং…

অতিমারি সংক্রমণ রুখতে আমাদের তিনটি বিধিনিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা— হ্যান্ড স্যানিটাইজেশন, মাস্কিং আর ফিজিক্যাল (যেটাকে সোশাল বলেই প্রচলিত করে দেওয়া হল) ডিস্টেন্সিং। বলতে দ্বিধা নেই, অনলাইন শিক্ষাকে একমাত্র বিকল্প হিসেবে ভাবার ফলে বাড়বে ‘ডিজিটাল ডিসটেন্সিং’। আমাদের দেশে বহুস্তরীয় আর্থসামাজিক অবস্থানের কারণে পারস্পরিক যে দূরত্ব ইতোমধ্যেই বিরাজমান। আলোচ্য ব্যবস্থা হয়তো তাকে অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে। এসব কথা বুঝতে বা উপলব্ধি করতে খুব বড় মাপের সমীক্ষার প্রয়োজন হয় না। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা একান্ত সমাজে কান পাতলেই এই ডিজিটাল ডিস্টেন্সিং বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতার নানান কথা শুনতে পাব। একটা কথা বোধহয় মাথায় রাখতে হবে যে আমাদের দেশের সমস্যাটি একান্তভাবেই আমাদের। সুতরাং সমস্যা সমাধানের উপায়গুলিকে আমরা যত বেশি করে মাটির কাছাকাছির বাস্তবতাকে মাথায় রেখে তৈরি করতে পারব তত বেশি করে তা ফলপ্রসূ হয়ে উঠবে। পশ্চিমি বিধিনিয়ম আমাদের দেশে হয়তো সেভাবে কার্যকর হবে না। ডিজিটাল লার্নিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এই সত্য প্রযোজ্য। সমস্যাটা বৈশ্বিক, তবে তাকে সামলে নেওয়ার উপায়গুলিকে দৈশিক উপায়েই ভাবতে হবে।

চলো কিছু করে দেখাই…

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও আমাদের দেশের সরকার-পোষিত শিক্ষাপরিকাঠামোটি খুব শক্তপোক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এমনটা মোটেই নয়। দেশের সংখ্যাগুরু মানুষের দৈনন্দিন যাপনের মতো দেশের প্রাথমিক স্তরের সরকার-পোষিত শিক্ষাপরিকাঠামোটির হালও নুন আনতে পান্তা ফুরায় গোছের। এমনই নড়বড়ে কাঠামোর ওপর গালভরা ব্যবস্থাপনা কায়েম করতে গেলে তা বাস্তবোচিত হবে না। কোভিড সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের দাপট কিছুটা কমলেও তৃতীয় ঢেউ নাকি আছড়ে পড়ার অপেক্ষায় গ্রিনরুমে তাল ঠুকছে। বলাবাহুল্য যে এই অবস্থা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও জটিল করবে। প্রাথমিক স্তরের পঠন-পাঠন শুরুই করা যায়নি। পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির পঠনপাঠনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বন্ধ। অনলাইনে তাকে চালানোর চেষ্টা চলছে। বোর্ড পরীক্ষার কথা ভেবে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পাঠদান শুরু করা হয়েছিল বটে, তবে দ্বিতীয় ঢেউ মহাদাপটে আঘাত করার ফলে সেই পাট দ্রুত চুকিয়ে দিতে হয় সকলের নিরাপত্তার কথা ভেবে। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে এবং এক নতুন ফর্মুলা অনুসারে ফলাফল ঘোষণা হয়েছে। সারা ভারত জুড়েই এমন হিসেব-নিকেশের পর্ব চলছে।

আসলে আমরা বোধহয় একরকম ধরেই নিয়েছি যে কোনওভাবেই স্কুলগুলিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। এর ফলে আমরা এমন কিছু সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নিয়েছি যা গোটা পরিস্থিতিকেই বেশ ঘোরালো, জটিল করে তুলেছে। ভুললে চলবে না ভারতের সনাতনী শিক্ষা পরম্পরাটি একান্তভাবেই গুরুবাদী। গুরুর নিবিড় সান্নিধ্য শিখন ও শিক্ষণের পক্ষে আদর্শতম। বাৎসরিক পরীক্ষা না নিয়েই শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ বলে ঘোষণা করা হলে শিক্ষার্থীদের এক গভীর শূন্যতার বোঝা আজীবন বইতে হবে।

পরিশেষে বলব, এমন সঙ্কট অভাবিতপূর্ব। আমরা কেউই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু সঙ্কট যখন নেমে এসেছে তখন তাকে পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে যাওয়া মোটেই সঙ্গত নয়। বরং দৃঢ়তার সঙ্গে, সততার সঙ্গে বাস্তবের মুখোমুখি হতে হবে। মনে রাখতে হবে আমাদের প্রিয় সন্তানেরা এই পরিস্থিতির শিকার। তারাও কিন্তু সাধ্যমত যুঝছে। আমাদের শিক্ষার্থী সন্তানদের ভবিষ্যৎ আমাদেরই হাতে। সংবেদনশীল মানসিকতা নিয়ে আজ ওদের পাশে দাঁড়াতে হবে। না হলে আগামী ইতিহাস এক যুগান্তকারী ব্যর্থতার জন্য আমাদেরই কালের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। সেদিনের জন্য আমরা প্রস্তুত তো?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3501 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...