Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আলোর বেণু

শ্যামলী আচার্য

 

ছোট্ট মন্দির। দালানে বড় গর্ত। ফুঁড়ে উঠেছে বট, অশ্বত্থ। কচি সবুজ ঝকঝকে পাতা। বর্ষার শেষে নীল গ্রিলের গেটে মরচের দাগ আরও স্পষ্ট। তুলসীমঞ্চের গোড়ায় ছোটখাটো আরও নানান আগাছার ভিড়। দড়িতে ঝোলানো তেলচিটে গামছা। ডানদিকে মন্দিরের চাতাল। নিত্যপূজা হয়। মায়ের মন্দির। প্রাচীনতার ছাপ সর্বাঙ্গে। ব্যস্ত বাসরাস্তার ধারে ভাঙা পাঁচিল। পানের দোকান ছাড়িয়ে ছোট্ট দরজা দিয়ে মন্দিরে ঢুকলেই খুব চমক লাগে। কাছেই তিন মাথার মোড়ে হইহই করে বাস-অটো। গাড়ির ভিড়। তার মাঝখানে কোথায় যেন থমকে আছে একমুঠো সময়।

ডানদিকে মন্দিরের মধ্যে বিগ্রহ। কালো গ্রিলের বেড়া। প্রণামীর লাল বাক্স। তালাটিতেও মরচের ছোপ। বৃদ্ধ পুরোহিত। বহুদিনের বাস এই অঞ্চলে। যতদূর মনে করতে পারেন তাঁর ঠাকুর্দার বাবার প্রতিষ্ঠিত এই বিগ্রহ ছিল ওপার বাংলার যশোরে। কোন কাঁটাতার কেন তাঁদের এই ভিনদেশে ছুঁড়ে ফেলল, এই ক্লিশে প্রশ্নের উত্তর নিয়ে এখন আর কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। শুধু পানের দোকানে দাঁড়িয়ে সিগারেট কিনতে কিনতে জয় জিগ্যেস করে জেনেছে এই প্রতিমা নাকি জাগ্রত। আর সে কারণেই বিশেষ বিশেষ দিনে এখানে এখনও পুজো দিতে আসেন মানুষজন। কিন্তু জাগ্রত প্রতিমার মাহাত্ম্য নিয়ে যতটা জাঁকজমক করা যেত, তার ছিটেফোঁটা লেশমাত্রও নেই এখানে। বরং বড় বেশি জীর্ণতা মন্দিরের সর্বত্র।

জয় এই অঞ্চলে প্রায়ই আসে। সেলসের কাজ। মূলত এই চত্বরে বেশ কিছু দোকানে সার্ভে করে। যতবারই যায়, অটোস্ট্যান্ডের খুব কাছে মন্দির-বাড়িটির সামনে একটিবার দাঁড়ায়। ভাঙাচোরা টিনের চাল ভেতরে। পুরোহিতের মাথা গোঁজার ঠাঁই। তিনি, তাঁর স্ত্রী, একটি ছেলে — প্রায়ই দেখা যায় তাদের। পিছনের কলতলায় বাসনপত্র মাজার শব্দ। একটু সকালের দিকে এলে ছোট্ট চাতাল ধোয়ার ছাপ। উঠোনের এবড়ো খেবড়ো সিমেন্টের ওপর জলের দাগ। কুচো ফুলের প্যাকেট। ছেঁড়াফাটা ছাপার শাড়িতে দারিদ্র্য লুকিয়ে রাখা। জয় সিগারেট ধরিয়ে দাঁড়িয়ে দেখে দু’চারজন ঢুকছে মন্দিরে। বিগ্রহের সামনে হাত জোড়। প্রণামীর বাক্সে টুং টাং খুচরোর মৃদু শব্দ।

মহালয়ার দিন এবার তর্পণ করতে গঙ্গায় যায়নি জয়। যেতে পারেনি। জ্বর হয়েছে। রোদে ঘুরে ঘুরে সেলসের কাজ। তার ওপর পুজোর আগে সেলস টার্গেট নিয়ে বেশ চাপ ছিল। ছুটোছুটি করে হাঁপিয়ে উঠেছে। মহালয়ার আগের রাতেই মাথা টিপ টিপ। গা ম্যাজম্যাজ। শেষ রাতে চাদর মুড়ি দিতে দিতেই জয় বুঝল, এবার আর তার তর্পণ করতে যাওয়া হবে না। ভারী মনখারাপ হল ওর। বছরের এই একটি দিন ভারী আলগোছে সরিয়ে রাখে ও। মনে হয় কোথায় যেন কোনও ছোট্ট চাতালে বসেছেন ওরা আড্ডায়। বাবা-মা-জেঠুমণি। জয়ের ভাসিয়ে দেওয়া তিল-তুলসী মেশানো জলটিতে একবার সবাই আঙুল ডোবান। একগাল হাসেন ওর দিকে চেয়ে। আবার ব্যস্ত নিজেদের পুরনো আড্ডায়। জয় আকণ্ঠ পান করে ঐ তৃপ্তিটুকু।

এবার আর সেই তৃপ্তি পেল না। মনটা হু হু করে।

মহালয়ার পরেরদিনই কয়েকটা সেলসে কলে যেতে হবে। যেতেই হবে। পেমেন্টের ব্যাপার। পুজোর আগে এই চাপটুকু নিতেই হয়। পা টলছে ওর। মাথা ভার। ওষুধ খেয়েই বেরোয়। ট্যাংরার মোড়ের সেই মন্দির। পাশে পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকান। জল চেয়ে খায়। একটা সিগারেট এখানে তার রেগুলার বরাদ্দ। হঠাৎ চোখে পড়ে মন্দিরের চত্বর। রাস্তার কলের লাইন যেখানে বাড়ির মধ্যে ঢুকেছে, সেখানে নীল রঙের বালতি পাতা একটা। তিরতির করে জল পড়ছে। ঘড়িতে প্রায় বারোটা। কর্পোরেশনের জলের মেয়াদ ফুরিয়ে যাবার সময়ে ঠিক এইরকম সরু একটা ধারা বেয়ে আসে কলের মধ্যে দিয়ে। জয় দেখে, ছোট্ট একটি মেয়ে স্নান করছে বসে। ছ’সাত বছর বয়স। চাতালের পাশেই এক ধাপ উঁচু পাথরের উঠোনে একটা স্টিলের ঘটি। তাতে সে হেলান দিয়ে রেখেছে একটা ছোট আয়না। সস্তা, লাল প্লাস্টিকে মোড়া বর্ডার। আদুল গায়ে অল্প অল্প জল ঢালে পুঁচকে মগ দিয়ে। মাথায় সাবান ঘষছে। আয়নাটির দিকে তাকানো। ছোট দুটি ফর্সা পা লম্বা করে তুলে দিয়েছে একধাপ উঁচু উঠোনে। গোড়ালিতে আলতার ছাপ। কুঁজো হয়ে থাকা বাঁকানো পিঠে ঝামরে পড়া চুল। কোঁকড়া কোঁকড়া গুচ্ছে সাবানের ফেনা মাখামাখি। দু’হাতে কেবল সে সাবান এলোমেলো করে ঘষে, ঘাড় বাঁকিয়ে কেবল এপাশ ওপাশ করে, মাথা হেলিয়ে দেখে আয়নায়। কখনও চুলগুলো চুড়ো করে তোলে মাথার ওপরে, কখনও এক ঝটকায় ফেলে দেয় পিঠে। জয় এক পাশে দাঁড়িয়ে একটু দূর থেকেই দেখতে থাকে ওকে। কচি মেয়েটা। রোগা রোগা কাঠি হাত-পা। ফ্যাকাশে। পাশ দিয়ে তার মুখখানি দেখা যায় না। শুধু সাবানের ফেনা নিয়ে খেলা করে সে। দেখেছ কাণ্ড! কাল অমাবস্যা গেছে যে! ঠান্ডা লেগে যাবে না! জয়ের মনে পড়ে ওর জ্যাঠতুতো দিদি, মান্তুও ছোটবেলা অমন জল নিয়ে খেলত। বড়মা বকত। কথা শুনত না। তখন পিঠের ওপর জোর থাপ্পড়। দিদিয়া খিলখিল করে হেসে উঠে পালাত তখন।

জয়ের খুব ইচ্ছে করে ওকে গিয়ে ডাকতে। উঠোনে আশ্বিনের রোদ পড়ছে ত্যারচা হয়ে। বিগ্রহের সামনে ধুনোর গন্ধ, ফুলের মালায় লেগে থাকা দু-এক কুচি দূর্বা। জয় গেটের বাইরে জুতো খোলে। পোড়া সিগারেটটা হাত থেকে ফেলে ঢুকে পড়ে মন্দিরে। বালতি থেকে অল্প অল্প জল তুলে মেয়েটি গায়ে ঢালে। আয়নার দিকেই তার চোখ। জয়কে দেখেইনি সে। জয় পিছনে গিয়ে একটু ঝুঁকে বলে, মা গো, তোর ঠান্ডা লাগবে যে! মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল। ঝর্ণার জল যেন গড়িয়ে পড়ল পাথরের নুড়িপথ বেয়ে। চুলগুলো লুটিয়ে আছে পিঠে বুকে। বালতির পাশে ভাঁজ করে রাখা লাল চেক গামছা টেনে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায় সে। ভেজা ইজেরের ওপর দিয়ে শাড়ির মতো করেই জড়িয়ে নিল। আঁচল টেনে গায়ে দিয়েই এক ঝটকায় পিছন ফিরে দাঁড়াল সে। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সে জয়ের দিকে। খিলখিল করে হাসছে আবার। আর তার লাল চৌখুপীকাটা ডুরে শাড়িতে আলপনার মতো রোদ্দুরের টুকরো। কালো কোঁকড়া ভেজা চুল থেকে টপটপ করে জল ঝরে পড়ে। সাবানের ফেনা ইতিউতি — সে যেন ছেঁড়া সাদা পুঞ্জমেঘ। তার কালো চুল থেকে জল গড়িয়ে যাচ্ছে উঠোন বেয়ে — জয়ের দিকে যে চেয়ে আছে তার চোখে শিউলিধোয়া আলো। কপালের ঠিক মাঝখানটিতে লম্বা কাটা দাগে জল চিকচিক করে। জয় ঝাপসা হয়ে যাওয়া চোখে শুধু শুনতে পায়, খিলখিল করে হেসে লুটিয়ে পড়তে পড়তে রিনরিনে গলায় কে যেন বলছে, ধুর বোকা। মায়েদের আবার ঠান্ডা লাগে নাকি?

জয়ের জ্ঞান ফিরে এল জলের ঝাপটায়। সিগারেটের দোকানের একটা প্যাকিং বাক্সে হেলান দিয়ে বসে সে। ফুটপাথে মাথা ঠুকে গেছে। কপালের পাশটা জ্বালা করছে। দোকানি ছেলেটি রাগী গলায় বলে, এই জ্বর নিয়ে কেউ বেরোয়? ভাগ্যিস আমি দেখলাম। বাড়ি যান এবার। ট্যাক্সি ডেকে দেব?

জয় মাথা নাড়ে। দরকার নেই। সে ঠিক আছে। একটু ঝিম ধরা অবস্থায় সে ভাবে, ছেলেটিকে একবার জিগ্যেস করবে মন্দিরের চাতালে কে স্নান করছিল বসে? কী ভেবে থেমে যায়।

উঠে দাঁড়াতেই মাথা টলমল। দোকানি ছেলেটি হাঁ হাঁ করে ওঠে।

দাদা, আবার ওদিকে যাচ্ছেন কোথায়?

মা’কে প্রণাম করে আসি একবার। পুজোর আগে আর তো এদিকে আসা হবে না।

সাবধানে দাদা, এত রোদ। আবার মাথা ঘুরে পড়ে না যান।

জয় ধীরে ধীরে এগোয়। ওর জুতোজোড়া সেই তখন থেকে গেটের বাইরেই। উঠোনে জলের ধারা। জয় চোখ তুলে দেখে মায়ের মূর্তিতে এক আশ্চর্য প্রশান্তি। ত্রিনয়নে ঝরে পড়ছে আলোর ফুলকি। কোঁকড়া চুলে শিউলির মতো ফুটে আছে জলের কণা।

হাত জোড় করে জয় বলে ওঠে, সাবধানে থাকিস মা।