গৌরাঙ্গ ভজনের গ্রাম কেতুগ্রামের বিরাহিমপুর

সম্পর্ক মণ্ডল

 

রাঢ়বাংলায় আমরা যদি একবারে উত্তর প্রান্তে হাজির হই তাহলে দেখব একের পর এক বৈষ্ণবতীর্থ গ্রাম, যেখানকার ভূমি পবিত্র হয় বৈষ্ণবীয় ভাবরসে। বিরাহিমপুরও তেমন একটি গ্রাম, যেটা উত্তর রাঢ় তথা পূর্ব বর্ধমানের গঙ্গাটিকুরি আর ঝামটপুর-বহরানের মধ্যে অবস্থান করলেও তার কয়েক মিটার দূরেই অবস্থিত মুর্শিদাবাদের সীমানা। তবে মধ্যযুগ থেকে এর অবস্থান বিচার করলে এটি মনোহর শাহি পরগণার অন্তর্গত। সেই বৈষ্ণব ভাবে সিক্ত মনোহর শাহি পরগণা, যেখানে থেকে মনোহর শাহি কীর্তনের সূত্রপাত ঘটে। কাঁন্দরা, সোনারুন্দি, দক্ষিণখণ্ড বা এই বিরাহিমপুর গ্রামাঞ্চলে আজও মনোহর শাহি কীর্তনীয়ারা কেউ কেউ বাস করেন। এখানে উল্লেখ্য যে বিখ্যাত কীর্তনীয়া যদুনন্দন দাস এই বিরাহিমপুরেরই বাসিন্দা ছিলেন, আজও তাঁর বংশধরদের কেউ কেউ এই গ্রামে বাস করে। যাই হোক, মনোহর শাহি পরগণার পরিচয় বাদ দিলেও এর আর একটি পরিচয় হল এটি কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত একটি বৈষ্ণব গ্রাম, যেখানে সশিষ্য স্বয়ং নিত্যানন্দ মহাপ্রভু এসেছিলেন এবং বিনোদ দিঘির পারে বৃক্ষতলে বিশ্রাম করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন দীক্ষালাভের পর চৈতন্যদেব রাঢ়ভ্রমণে বেরিয়ে এখানে এসেছিলেন কিন্তু এই তথ্যের সপক্ষে কোনও যথাযুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অজয়-গঙ্গার সংযোগস্থলে কেশব ভারতীর কাছে দীক্ষা নিয়ে চৈতন্যদেব রাঢ়ভ্রমণ করেছিলেন তা সত্য কিন্তু তার যাত্রাপথে বিরাহিমপুর ছিল না, কারণ তিনি অজয় তীর ধরে ভ্রমণ করে রসুই গ্রামে জ্ঞান হারিয়েছিলেন, পরে সুস্বাদু আহার্যে তার দেহে বল আসলে তিনি স্থানটির নাম ‘রসবতী’ রেখেছিলেন, পরে তা রসুই গ্রাম নামে পরিচিত হয়, তারপরে তিনি কেতুগ্রাম হয়ে ঈশানী নদী ধরে নৌকাযোগে গঙ্গাটিকুরির পাশ দিয়ে গিয়ে উদ্ধারণপুরে ঘাটে পৌঁছেছিলেন এবং শান্তিপুর যাত্রা করেছিলেন উদ্ধারণপুর থেকে। তাই কোনওভাবেই তিনি বিরাহিমপুর যাননি, এটুকু নিশ্চিত।

অনেকে বিরাহিমপুরকে বিরুমপুর বলেও ডাকেন, এর পিছনে একটি ছোট্ট ইতিহাস আছে। সেনরাজা লক্ষ্মণ সেনের তাম্রশাসন অনুযায়ী, তাঁর মা তাঁদের পুরোহিতকে পাঁচটি গ্রাম দান করেছিলেন, যা বর্তমানে বালুটিয়া (বাল্পছিটা), খাঁড়ুলিয়া (সোমালিয়া), মুরুন্দি (মোড়লডিহি), জলসুতি (জলশৌখি) এবং কিয়তরাল (রাউন্দি) বলে পরিচিত, অর্থাৎ এই গ্রামগুলির সঙ্গে বিরুমপুরের অস্তিত্ব লক্ষ্মণ সেনের আমলে ছিল না। পরে মুসলিম আক্রমণ শুরু হলে এই অংশটির অবস্থান অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে হওয়ায় এখানে একদল মুসলিম বসবাস শুরু করে এবং আজকের বিরাহিমপুরের তৎকালীন নাম ছিল ‘ডাঙাপাড়া’, কেউ কেউ বলেন ইব্রাহিমের সেনানীর নাম থেকে বিরাহিমপুর শব্দটি এসেছে কিন্তু কাটোয়া মহকুমার মধ্যযুগের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় সম্পূর্ণ অন্য তথ্য— স্থানীয় গ্রাম দত্তবরুটিয়ার প্রভাবশালী কায়স্থ দত্ত খাঁ-রা (বর্তমানে দত্ত) অসংখ্য লাঠিয়াল সহ এই স্থানে আক্রমণ করে মুসলিমদের এখান থেকে লাঠি ঠেঙিয়ে বিতাড়িত করলে ডাঙাপাড়া ক্রমে ‘ঠেঙাপাড়া’ নামে পরিচিত হয়। পরে মুসলিমদের মুখে স্থানটির নাম প্রচার হয় বে-রেহম-পুর (বে-রেহমভাবে তাদের মেরে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল) ও ক্রমে বিরাহিমপুরে রূপে জনপ্রিয় হয়। অবস্থাপন্ন কায়স্থরা পরে বিরাহিমপুর নামকে পরিবর্তন করে একবার বিনোদপুর এবং অন্যবার রাধাকৃষ্ণপুর নাম রাখার চেষ্টা করেন। বিনোদপুর নাম রাখার প্রসঙ্গে তাদের যুক্তি ছিল কায়স্থ পূর্বপুরুষ গোপালচরণ দত্তের প্রতিষ্ঠা করা কুলদেবতা রাধা-বিনোদ বিগ্রহের নাম অনুযায়ী গ্রামের নাম পরিবর্তন, অন্যদিকে দত্ত বংশের জমিদারপুরুষ শ্রীরাধাকৃষ্ণ দত্ত নিজের নাম অনুযায়ী এই গ্রামের নাম পাল্টাতে চেয়েছিলেন কিন্তু কালের নিরিখে বিরাহিমপুর নামটিই আজও শোভা পাচ্ছে সবক্ষেত্রেই, বাকি দুটি নাম হারিয়ে গেছে। এখানে জেনে রাখা দরকার, এই দত্তবংশীয়দের পূর্ব পুরুষের হাত দিয়েই দিনাজপুরে একদিন হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রভাকর দত্ত। প্রভাকর দত্তের পিতা রবি দত্ত গৌড়েশ্বরের অধীনে সেনানায়ক হিসাবে কাজ করতেন।

বৈষ্ণবধর্মে ডুবে থাকা গ্রামটির অন্যতম একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল শ্রীগৌরাঙ্গের পৃথক ভজনব্যবস্থা, যেটা কাটোয়া মহকুমাতে বাকি স্থানগুলিতে তেমনভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই গ্রামে বিভিন্নরকম বৈষ্ণব বিগ্রহের পুজো হয়, যেমন সিংহ বংশীয়দের শালগ্রাম শিলা, মিত্র বংশীয়দের রাধাকান্ত জিউ বিগ্রহ, চট্টোপাধ্যায় বংশের রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ এবং দত্ত বংশীয়দের পৃথক নারায়ণ শিলা। এখানে কৃষ্ণ বিগ্রহের পাশে দুই রাধার প্রাধান্য দেখা যায়, যথা শ্রীরাধা ও শ্রীললিতা সখী হিসাবে পূজ্য। এই বিগ্রহটি রাধা-বিনোদ মন্দিরে বর্তমান।

বিরাহিমপুরের আর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এটি সুদৃশ্য টেরাকোটা মন্দিরের গ্রাম। রাধা-বিনোদ মন্দিরটি হল একটি সুদৃশ্য টেরাকোটা মন্দির। যেটা বঙ্গীয় রীতিকে অনুসরণ করে আটচালা বিশিষ্ট এবং সামনে অবস্থিত একটা টিনের ছাউনি দেওয়া আর একটি চালা। প্রবেশপথে চাঁদনি নকশা দেওয়া প্রবেশদ্বার। মনে করা হয় ১৭০০ সনের চারের দশকে এটি তৈরি করা হয়েছে, যদিও সময়কাল নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। কালের নিরিখে রাধা-বিনোদ মন্দিরের টেরাকোটার কাজগুলো ম্লান হলেও কিছুদিন আগেও আমরা মুগ্ধ হতাম সেই মন্দিরচাতালে বসে। অনেকবার মন্দিরটিকে সংস্কার করার দাবিও ওঠে।

বর্তমানে টেরাকোটার সুদৃশ্য কাজগুলো আজ অদৃশ্য! মূল্যবান টেরাকোটার কাজগুলির আজ সিমেন্টের ঢালাই করা হয়েছে। ভাবতেও অবাক লাগে বর্তমান প্রজন্মের উদাসীনতা নিয়ে, যে মন্দিরকে এককালে কাটোয়া মহকুমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ টেরাকোটা মন্দির বলে গণ্য করা হত, তার আজকের চেহারা দেখলে দুঃখ আসে। অনেককাল আগেই মাননীয় বৈষ্ণব গবেষক শ্রীবঙ্কিম চন্দ্র ঘোষ, তার ‘রাঢ়ের বৈষ্ণব তীর্থ পরিক্রমা’ বইয়ে বিরাহিমপুরের রাধা-বিনোদ মন্দির সম্পর্কে লিখেছিলেন— ”মন্দিরের গা ঘেঁষে গজিয়ে ওঠা আগাছাগুলি তুলে ফেলা লোকের অভাব। মন্দির প্রাঙ্গণে নিয়মিত ঝাড়ু পড়ে বলেও মনে হয় না।” এসব পড়তে স্থানীয় গ্রামবাসী হিসাবে আমাদেরও কষ্ট হয় খুব। যাই হোক, সারাবছরই বৈষ্ণব রীতি মেনে এখানে রাস, দোল, ঝুলনযাত্রার মতো অনুষ্ঠান খুব জাঁকজমক করেই পালন করা হয় এবং বংশপরম্পরায় প্রাপ্তবিগ্রহগুলিকে নিত্যসেবা দেওয়া হয়।

কালের হাওয়ার এসব ইতিহাস চাপা পড়ে গেলেও প্রবীণ ব্যক্তিরা আজও রোয়াকে বসে এই ইতিহাসকে রোমন্থন করে, সে রোমন্থনের কথা আমি নিজেও শুনেছি।

আমি আজও স্তব্ধ হয়ে ভাবি, চৈতন্যদেবকে স্বপ্ন পেয়ে একদিন এই গ্রামের উপর দিয়েই তো কিশোর কৃষ্ণদাস কবিরাজ ঝামটপুর থেকে বৃন্দাবনের পথে পাড়ি দিয়েছিলেন…


*সবকটি ছবির চিত্রগ্রাহক লেখক

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4506 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...