মেলার মাঠ

খালিদা হুসেন

 

ভাষান্তর: সোমরাজ ব্যানার্জী

খালিদা হুসেনের জন্ম ১৯৩৭ সালে, পাকিস্তানের লাহোরে। ১৯৫৬ সালে তিনি ছোট গল্প লেখা শুরু করেন। তাঁর গল্পগ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, পেহেঁচন, দরওয়াজা, মাসরুফ অওরাত, মে ইয়াহা হুঁ ইত্যাদি। লেখনীর মধ্যে দিয়ে তিনি সবসময়ই বাস্তব জীবনের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে মানুষের পরিচয়ের কথা, যেখানে আপন সত্তা ও অপরের মধ্যে টানাপোড়েন অব্যাহত। নিচের গল্পটি সামিনা রহমান সম্পাদিত পাকিস্তানের লেখিকাদের ছোটগল্প সংগ্রহ ইন হার ওন রাইট থেকে নেওয়া হয়েছে।

প্রথমে আমি একটা স্বপ্ন দেখি আর তারপর সেটা ভুলে যাই। নুসরাত যখন আমাকে একসঙ্গে মেলায় যাওয়ার জন্য বলেছিল, তখন আমার স্বপ্নটা মনে ছিল, আবছা আবছা। সেই সময় আমি মুন্নার বুশশার্টের গায়ে ফুলের নকশা আঁকছিলাম আর ও আরামকেদারায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিল।

আমার একান্তবাসী স্বভাবকে একটু খোঁচা মেরে নুসরাত বলল— কানিজ আর বিলকিসও যাচ্ছে। তোমার মাঝে মাঝে একটু বাড়ি থেকে বেরোনো উচিত।

আমি ওর এই কথায় স্বভাবতই খানিক অস্থির হয়ে পড়লাম। একটা চেনা ভয় আমাকে গ্রাস করে ফেলল: যেন একটা উত্তপ্ত গোলক আমার পেটের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছে।

–হ্যাঁ, তুমি যাবে না কেন? গেলে ক্ষতিটা কী? ও পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলে।
–কিন্তু মুন্না?
–হ্যাঁ তো সমস্যাটা কোথায়? তাকেও তোমার সঙ্গে নেবে। বাকি তিনজন বাড়িতেই থাকুক। ও চশমাটা টেবিলের উপর রেখে হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছতে লাগল। এমন সময় নতুনভাবে হুঁকো সাজিয়ে ঘরে ঢুকল তাইজি।

উঠে পড়ার আগে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ও বলল— আমানও তোমাকে সঙ্গ দিতে পারে।

এখন ওর টেনিস খেলার সময়। আমি সাদা প্যান্ট আর সাদা হাতাওয়ালা গেঞ্জি বার করে বিছানার উপর রেখে রান্নাঘরে চা বানাতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। নুসরাত বোরখাটা পরে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার আগে বলে গেল, ঠিক আছে। আমি তাহলে কাল সাড়ে পাঁচটায় কানিজ আর বিলকিসকে নিয়ে আসছি।

তাইজি হুঁকোর মাউথপিসটা মুখে নিয়ে প্যান থেকে ভাত পরিষ্কার করতে লাগল। চা বানাতে বানাতে একটা গভীর ভয় আমার ভেতর বাসা বাঁধছিল আর আমার মনে হতে লাগল তখনই দৌড়ে গিয়ে নুসরাতকে বলে আসি— আমি যাব না। কিন্তু ততক্ষণে ও প্রস্তুত হয়ে সিঁড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আমি চায়ের কাপটা ওর হাতে দিলাম। ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই চা শেষ করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে যাবে, এমন সময় আমি লক্ষ করলাম ওর সাদা জুতোর ফিতেটা খোলা। আমি নিচু হয়ে ফিতেটা বেঁধে দিতেই ও প্রতিবারের মতো আমাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর রাকেট হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। প্রতিদিনই আমি একইরকমভাবে তাকিয়ে থাকতাম ওর চওড়া কাঁধ, কঠিন ঘাড় আর ঘন চুলের দিকে। আজকে, ওকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে আমার স্বপ্নের কথাটা মনে পড়ে গেল।

স্বপ্নটা ছিল এরকম। আমি একটা গলি দিয়ে যাচ্ছি। গলিটা ফাঁকা ও শুনশান। এমনকি দূরেও কাউকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার ভয় লাগছে। ঠিক সেইসময় আমি দেখলাম, ওপাশ থেকে ও হেঁটে আসছে, পরনে সাদা পোশাক, হাতে র‍্যাকেট, শরীর ঘর্মসিক্ত। আমি ওকে দেখে নিশ্চিন্ত হলাম কিন্তু ও যেন আমার দিকে তাকিয়েও আমাকে দেখল না। আমি এতে অবাক হলাম আর বোরখাটা নামিয়ে দিলাম যাতে ও আমাকে চিনতে পারে। কিন্তু তাও ও আমাকে চিনতে না পেরে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আমি ওকে ডাকার চেষ্টা করলাম কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরোল না। তখন আমি ওর পেছনে দৌড়োতে লাগলাম। আমার পায়ের শব্দ পেয়ে ও পেছন ফিরে তাকাল। কিন্তু এ যেন অন্য কেউ, অচেনা— যার সঙ্গে ওর মুখের কোনও মিল নেই। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ভেতর ভেতর সন্দেহ দানা বাঁধতে লাগল যে তাহলে কি আমার মুখও বদলে গেছে! আমি আমার বাড়ি খোঁজার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু সেই রাস্তার সব বাড়িগুলো যেন একইরকম লাগছিল।

এই ঘটনা মনে করে আমার পেট ও বুকটা কেমন যেন খালি হয়ে গেল। কানে এক অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম। সিঁড়ির দরজা বন্ধ করে আমি তাইজির পাশে গিয়ে বসে মুন্নার বুশশার্ট সেলাই করতে লাগলাম। আমার সবসময়ই মনে হয় যে ও এই সিঁড়ির বা এই গলির বাইরে অন্য একজন মানুষ। মানুষ ওকে অন্যভাবে দেখে ও চেনে, যেভাবে আমি কখনওই ওকে দেখতে বা চিনতে পারব না। সেকারণেই, এমনকি ও যখন আমার সঙ্গে থাকে, তখনও ওকে দূরের মানুষ বলে মনে হয়, অথবা এই গলির বাইরের কোনও মানুষ যে মানুষকে আমি একেবারেই চিনি না। এই সবকিছুই ও জানে এবং ও চায় যেন সবকিছু এরকমই থাকে। আমার খালি মনে হয় যে ওর শরীরটা শুধুই একটা শরীর। এটা ভেবে আমার ভয় লাগে। কিন্তু এই বিষয়গুলো ওর অজানা নয় এবং তা সত্ত্বেও ও চায় এই বিষয়গুলো এরকমই থাকুক।

আমি দ্রুত লয়ে আমার সেলাইযন্ত্র চালাতে লাগলাম। কিন্তু হঠাৎ করে আমার পেটের ভেতর একটা কালো শূন্যতা পীড়া দিতে শুরু করল। সেই উষ্ণ ভয়ানুভূতি আমার অভ্যন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে তুলল। মুন্নার জন্মের পরে, যখন শুধু বসেই থাকতাম, তখন এই একইরকম শূন্যতা অনুভব করতাম। আমার মনে পড়ে মুন্নার জন্মের আগে আমি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হাঁটাচলা করে বেড়াতাম, এখন যেসব স্বপ্ন দেখি সেরকম কোনও স্বপ্নের আনাগোনা তখন ছিল না। এসব ঘটার আগেই গাট্টু, নাসিম আর রুহি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ওদের ব্যাপারে আমার কিছুই মনে নেই। বা হয়ত, মুন্না সবার শেষে হয়েছে বলে আমার সবকিছু মনে আছে। আগের তিনজনের ক্ষেত্রে আমি রাত্রে ঘুমোতে পারতাম বা অনেক সময় তাইজি এসে ওদের চুপ করিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে যেত। কিন্তু মুন্নার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। এমনকি যখন ও নাক ডাকে, আমি ওর কান্নার শব্দ শুনতে পাই। আমি ঘুম ভেঙে উঠে দেখি একজন মুন্না ঘুমিয়ে আছে এবং অন্যজন কোথাও একটা কাঁদছে। আমি মাথা খুঁড়ে মনে করার চেষ্টা করি আর কোনও মুন্না আছে কিনা কিন্তু আমার কিছুই মনে পড়ে না। যদি অন্য কোথাও মুন্না না কেঁদে থাকে, তাহলে আমি যে কান্নার শব্দটা শুনতে পাচ্ছি সেটা কী? আর যদি মুন্না আমার পাশে শুয়ে নাক ডাকে, তাহলে যে মুন্না কাঁদছে সে কে? আমি জেগে শুয়ে শুয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করি: আচ্ছা, এটা আমি আর এটা মুন্না যে আমার পাশে শুয়ে আছে। তাহলে এই বাড়িতে আর কোনও মুন্না নেই, আমার ভেতরেও নেই বাইরেও নেই। এসব ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আমার এটাও মনে আছে যে যখন মুন্না আমার পেটের ভেতরে ছিল তখন এই গলি নিয়ে আমার কোনও চিন্তা ছিল না বা এখন এই গলিটা যেভাবে আমাকে ভাবায়, সেসব কিছুই ছিল না। অনেক সময় যখন ও বাইরে যেত, আমি জানতাম যে এই গলির বাইরে ও একজন অন্য মানুষ এবং লোকেরা ওকে অন্যভাবে চেনে বা জানে এবং আমি কোনওদিনই ওকে সেভাবে চিনব বা জানব না, এসব জানা সত্ত্বেও আমি কখনওই এই গলি বা তার বাইরের জগৎকে এভাবে দেখিনি। এর কারণ হতে পারে যে সেইসময় আমি খুব ভারী ছিলাম। এই উঠোন, এই ঘর, এই পুরো বাড়িটা আমাকে নিয়েই ভরে থাকত। আমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে থাকতাম। মুন্নার জন্মের পরে যতদিন যেতে লাগল, আমি হালকা হতে লাগলাম। অবশ্য দেখতে সেরকম লাগে না। বাইরে থেকে দেখলে আমাকে আগের মতোই ভারী লাগত। আমি রোজ আয়নায় সেটা পরখ করতাম। আমি জানি না কেন ও কীভাবে আমার ভারটা হালকা হচ্ছে। কখনও কখনও আমার মনে হয় আমি যেন ভেসে যাচ্ছি এবং সেটা ভেবে আমার আনন্দ হয়। কালকেই রুহি বলছিল, আম্মান, তোমার কোমরটা কিন্তু বেড়ে যাচ্ছে। আর একদিন ও বলেছিল, যখন বসন্তে চারিদিক ভরে উঠবে, আমরা ভোরবেলায় হাঁটতে বেরোব। এতে শরীর শক্ত হয়।

মুন্না চুপিচুপি এসে ওর ক্ষুদে হাত দিয়ে আমার ঘাড় জড়িয়ে ধরে “আম্মান আম্মান” বলে ডাক দিল। যন্ত্রের উপর আমার হাত থেমে গেল। তুই এতক্ষণ কোথায় ছিলিস? আমার ঘাড় ক্রমশ ওর ক্ষুদে হাতের ক্লেদাক্ত উষ্ণতা শুষে নিল।

ক্যান্ডি ক্যান্ডি— মুন্না আমাকে ছেড়ে তাইজির ঘাড় জড়িয়ে ধরল। মুন্না এদিকে আয়। এটা পরে দেখ তো— আমি এই কথা ভেবে অবাক হয়ে গেলাম যে কয়েক বছর আগে ও আমার ভেতরে ছিল। নুড়ির মতো। ওর মুখের দিকে মনোযোগ দিতেই এই অনুভূতি বদলে গেল। তাই আমি চট করে থেমে গেলাম।

রাত্রে ও যখন বাড়ি এল, আমি ওকে খাবার বেড়ে দিতে দিতে বললাম— আমি জানি না কেন আমি নুসরাতের কথায় রাজি হলাম। আমার একদম যেতে ইচ্ছে করছে না। ও মাঝপথে খাওয়া থামিয়ে ওর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে উদাসীন একটা হাসি হাসল, যে হাসিটা শুনলে আমার মনে হয় ওর আর আমার মধ্যে কোনও সম্পর্কই নেই কারণ আমার পাশে বসেও ও একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলে। আমি ভেবেছিলাম ও আমার যাওয়া বা না যাওয়া নিয়ে কিছু বলবে। কিন্তু ও শুধুই হাসল আর তারপর চুপ করে গেল। তাই আমিই বিষয়টাকে টেনে নিয়ে গেলাম, আমি জানি না কেন আমার এই অভ্যেসটা এত বাজে। বাইরে যাওয়ার কথা চিন্তা করলেই আমার ভয় লাগে।

মানসিক রোগের কোনও চিকিৎসা নেই— তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে ও বলল। তারপর নব ঘুরিয়ে রেডিওটা চালিয়ে টেবিল থেকে একটা বই তুলে নিল। নাসিম আর গাট্টু উঠোনে কিছু একটা নিয়ে ঝগড়া করছিল।

গম্ভীর গলায় উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে ও বলল— ওদের ব্যাপারটা কী? নাসিম! উঠোন জুড়ে নেমে এল নিস্তব্ধতা। শুধু তাইজির হুঁকোর গড়গড় থামাল না। সিগারেট ধরিয়ে টান দিতে দিতে ও বই পড়তে লাগল। আমি ওর মুখ থেকে ভয়ে চোখ সরিয়ে নিলাম। খুব মন দিয়ে ওর মুখের দিকে তাকানোয় এই আলাদা ভাবটা ফুটে উঠেছিল।

পরের দিন নুসরাত বিলকিস আর কানিজকে নিয়ে এল। আমি তাইজি আর মুন্নাকে নিয়ে গলির মধ্যে গেলাম। অনিচ্ছাকৃতভাবে আমি একবার পেছনে ফিরে আমাদের বাড়িটাকে দেখলাম। বাড়ির জানলা, দরজা, বারান্দা সবকিছুই কেমন যেন অচেনা ঠেকল আমার কাছে। আমি মুন্নার আঙুল শক্ত করে ধরলাম। আমরা পাঁচজন, অর্থাৎ, নুসরাত, কানিজ, বিলকিস, তাইজি এবং আমি গলির শেষ মাথা অবধি হেঁটে গেলাম। রাস্তায় সদ্য জল ছিটানো হয়েছিল, তাই এর একটা ধূসর-কালো অংশ ভিজে ছিল আর অন্য অংশটা শুকনো। সামনের নালাটা একটা নোংরা ট্র্যাকের মধ্যে দিয়ে গিয়ে শেষের বাড়িগুলো অবধি ছড়িয়ে ছিল। দিত্তার সেলুনের পাশে চায়ের দোকানটা খোলা। একদিকে নানান অলঙ্কারে ভূষিত একজন অভিনেত্রীর রঙিন পোস্টার, তার ঠিক পাশে রংবেরঙের অক্ষরে লেখা আয়না-খচিত কলিমা শরীফ, আর অন্য দেওয়ালে সোনার ফ্রেমে বাঁধানো একটা আয়না রাখা ছিল। বেশ জোরে রেডিও বাজছিল। আমি এই সবকিছু খুঁটিনাটি দেখতে পারছিলাম কারণ নুসরাত আমাদের টোঙ্গা আসার জন্য ওখানে অপেক্ষা করতে বলেছিল। আমি মুন্নার আঙুলটা শক্ত করে ধরে ছিলাম। ওর হাতের ঘাম আমার হাতের সঙ্গে মিশে একটা যেন একটা প্রবাহ তৈরি করেছিল। আমি টোঙ্গার উদ্দেশে ডানদিকে তাকাতেই দেখলাম সামনে দিয়ে একটা শবযাত্রা আসছে। কালো কাপড়ের উপর জুঁই ও গোলাপের চাদর ছড়িয়ে আছে আর অধৌত কাপড়ের সতেজ সাদাটে ভাব খাটের রেলিং-এর উপর বিছানো। সঙ্গে সঙ্গে তাইজি জোর গলায় কলিমা উচ্চারণ করতে লাগল। যারা শবদেহ বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল, তাদের সরিয়ে অন্য দুজন এবার কাঁধ দিল। মুন্না আরও শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরল।

–কে মারা গেছে আম্মান? ও রোরখার আড়াল থেকে আমার চোখদুটো খুঁজতে খুঁজতে বলল।

কেউ না— আমি খুব দ্রুততার সঙ্গে কলিমা আওড়াতে আওড়াতে বললাম। কিছুক্ষণের জন্য চায়ের দোকানের আয়নায় কালো কাপড়ের উপর ছড়িয়ে থাকা জুঁই ও গোলাপের লাল-কালো প্রতিবিম্ব নজরে পড়ল, তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল। এখন শুধু জুঁই আর গোলাপের গন্ধে জায়গাটা ভরে আছে। ও আমাকে যে মাঝে মাঝে যে ফ্লোরাল ব্রেসলেট এনে দিত, তার থেকে এই গন্ধটা অনেকটাই আলাদা।

–এই, যাবে? নুসরাত একজন টোঙ্গাওয়ালাকে থামিয়ে প্রশ্ন করল।
–হ্যাঁ বোন, যাব। কিন্তু তোমরা তো পাঁচজন। ঠিক আছে, ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

নুসরাত আর বিলকিস সামনের সিটে বসল। আমি তাইজি, কানিজ আর মুন্নাকে নিয়ে পেছনে। সিটটা স্লিপারি থাকায় মুন্না খালি পিছলে যাচ্ছিল, তাই কিছুক্ষণ পর আমি ওকে আমার কোলে নিয়ে বসালাম আর আমার দুটো হাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে রাখলাম।

মেলার রাস্তায় পৌঁছে আমরা দেখতে পেলাম অজস্র টোঙ্গা আর গাড়ি রাস্তায় ভিড় করে রয়েছে। অগুনতি মহিলা, পুরুষ ও শিশুর ঢল ফুটপাত জুড়ে স্রোতের মতো এগিয়ে চলেছে। যতদূর দৃষ্টি যায়, শুধু জনপ্লাবন চোখে পড়ে।

–ঈশ্বর আমাদের ক্ষমা করুন। দেখো, এই হেঁটে যাওয়া মানুষগুলোকে কীরকম পিঁপড়ের মতো লাগছে। তাইজি হাসল।
–তা নয়তো কী। এমন দিন তো আর সচরাচর আসে না। কানিজ এপাশ ওপাশ করতে করতে আনন্দের সঙ্গে বলল। ও স্থিরভাবে বসে থাকতে পারছিল না, খালি ছটফট করে একবার এদিকে ঘুরছিল, একবার ওদিকে। আমি বারবার ওর কনুইয়ের খোঁচা খাচ্ছিলাম।

রশিদা দেখো। ঠিক যেন পিঁপড়ের মতো— তাইজি আমায় আলতো ঠেলা মেরে বলল। আমি দেখলাম মানুষজন সত্যিই পিঁপড়ের সারির মতো এগিয়ে চলেছে। পিঁপড়ের তো কোনও স্বতন্ত্র পরিচয় থাকে না। একটা পিঁপড়ের থেকে অন্যটাকে আলাদাভাবে চেনা যায় কীভাবে? হয়ত পিঁপড়েরা নিজেরাও এই তফাত করতে পারে না। আর আমরা এখানে পিঁপড়ের মতো চলাফেরা করছি। এটা ভেবে আমি হেসে উঠলাম আর লক্ষ করলাম যে কালো বোরখার নিচে কারও কোনও স্বতন্ত্র পরিচয় নেই। একজনের থেকে অন্যজনকে আলাদা করে চেনার উপায় নেই। হঠাৎ মনে হতে লাগল যেন আমার পিঠ বেয়ে পিঁপড়েরা চলাফেরা করছে আর সেই সঙ্গে আমার পেটের ভেতরে একটা অন্ধকার শূন্যতার অনুভূতি বেড়েই চলেছে। আমি আবার অসম্ভবরকম হালকা, প্রায় ভারহীন বোধ করতে শুরু করলাম। আর মুন্নাকে কাছে টেনে নিলাম।

এখন আমরা মেলার কাছাকাছি চলে এসেছি এবং দেখতে পাচ্ছি আমাদের চারপাশের শহরটা নানান রংবেরঙের আলোয় সেজে উঠেছে। এক এক জায়গায় এই আলোর মালা অনেকটা সাত-তারের নেকলেসের মতো দোল খাচ্ছে, আবার কোথাও সেগুলো রঙিন ছাতার মতো পাক খেয়ে বা ঝর্ণার মতো প্রপাতে ছড়িয়ে পড়ছে। টোঙ্গাটা গতি কমিয়ে একটা জায়গায় এসে থামলে আমরা নেমে পড়লাম। নুসরাত তাড়াতাড়ি টিকিট কাউন্টারের দিকে গেল আর আমরা প্রবেশদ্বার দিয়ে মেলার ভেতরে ঢুকলাম। সেখানে এক বিপুল জনস্রোত আছড়ে পড়েছে।

–দেখো— বিলকিস আনন্দের সঙ্গে বলল— কত লোক এখানে।
–হ্যাঁ। হ্যাঁ। কত লোক! তাইজির কন্ঠস্বরে আনন্দের সঙ্গে একটা ভয় মিশে ছিল।
–ঠিক আছে। আমরা ডানদিক থেকে শুরু করব। নুসরাতের ইতিমধ্যেই একবার মেলাটা ঘোরা হয়ে গেছে। আমরা আয়নার দোকানে যখন গিয়ে পৌঁছলাম, তখনই ঘোষণাটা শোনা গেল।
–মৃত্যুকূপ! মৃত্যুকূপ! জনগণ, আর মিনিট দশেকের মধ্যেই সবচেয়ে অভূতপূর্ব ও ভয়ঙ্কর খেলাটি শুরু হতে চলেছে।
–আম্মান, আম্মান— মুন্না আমার বোরখায় টান দিল— চলো না, আমরা খেলাটা দেখতে যাই।
–ঠিক আছে ঠিক আছে। তুমি কিন্তু আমার আঙুল ছাড়বে না। আমি ওর হাতটা শক্ত করে ধরলাম। আশপাশে মানুষজন কাঁধে কাঁধে গুঁতাগুঁতি করে এগিয়ে যাচ্ছিল। মুন্না ঘ্যানঘ্যান শুরু করল।
–ঠিক আছে। ঠিক আছে।

তাহলে মুন্নাকেই আগে খুশি করা যাক— নুসরাত কাঠের সিঁড়ি বেয়ে একটা গোলাকার কাঠের কেসিং-এর দিকে যেতে লাগল। উপরের ফাঁকা জায়গার চারপাশে ক্রমশ লোকজন জড়ো হচ্ছে। সামনেই একটা কাঠের সিঁড়িতে গাঢ় লিপস্টিক ও সুরমা পরিহিত একজন মহিলা টুল পেতে বসে আছে, যার পরনে আঁটোসাঁটো কালো ট্রাউজার, লাল জাম্পার, গলায় জড়ানো একটা সাদা স্কার্ফ এবং চুলটা অনেকটা পাখির বাসার মতো ফোলানো। ও এই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে হাসছে আর সিগারেটে টান দিয়ে একের পর এক রিং-এর আকারে আকাশের দিকে ধোঁয়া ছাড়ছে। ওর পাশে একজন বামন, হাতের আঙুলে ঘন্টা বাঁধা, একটা বড় মাপের সালোয়ার আর হলুদ জামা পরে সিনেমার গানের তালে তালে নাচছে। ওর লম্বা শক্ত মুখখানা কোমর অবধি ঝুলে রয়েছে আর পেছন দিকে ঘুরলে কুঁজটা অনেকটা টিলার মতো দেখতে লাগছে। ছোট ও মোটা হাতদুটো দেখে মনে হয় কেউ যেন আঙুলগুলো কেটে নিয়েছে কারণ ও বারবার ওই হাতে বাঁধা ঘন্টাগুলো নাড়িয়ে চলেছে। কালো চোখের উপর লাগানো সুরমা ওর দুই গালে, নাকের ছিদ্রে এবং লম্বা ঘন গোঁফের উপর ছড়িয়ে পড়েছে। নাচার সময় মাঝে মাঝে ও ঘুরে সোনালি চুলের মহিলাটির দিকে তাকিয়ে হাসছে এবং হাসার সময় ওর লম্বা, বড় দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ছে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর স্বতন্ত্রতা লক্ষ করছিলাম। ও কখনওই এই মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাবে না।

আমরা কূপ অবধি পৌঁছানোর আগেই বিলকিস লেকের কাছটায় দাঁড়াল যেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হয়েছিল।

এটা কী? বিলকিস উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করল। লেকের কাছে দাঁড়ানো সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। আমরাও চোখ উপরের দিকে করলাম। একটা লোহার মইয়ের একদম মাথায়, যে উচ্চতায় আলোও ক্রমশ ফিকে হয়ে আসে, সেখানে একজন মোটা কাপড় পরা মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে দেখার জন্য আমাদের ঘাড় এতটাই বাঁকাতে হচ্ছিল যে আমি গহ্বরে সেই হুল ফোটার মতো বোধ করতে লাগলাম।

এটা কী? মুন্না আমার বোরখায় টান মেরে বলল। আমি ওকে কোলে তুলে নিয়ে বললাম— দেখ। ওই লোকটা এবার নিজের গায়ে আগুন দিয়ে উপর থেকে ঝাঁপ দেবে।

মইয়ের উপরে লোকটা বোতল থেকে নিজের গায়ে কিছুটা তেল ঢালল। তারপর সে মাথা নিচু করে চারপাশের সবাইকে সেলাম করল। আমার পাশের মেয়েটি তার মোটা চশমার ফ্রেমটাকে নাকের উপর ঠিকঠাক করে নিল। তার সঙ্গে দাঁড়ানো বাচ্চাটি বলে উঠল— এখন কী ঘটতে চলেছে? ও এখন কী করছে?

মোটা ফ্রেমের চশমা পরা মেয়েটি তার মাথা নামিয়ে বলল— আমি বুঝতেই পারছি না কী হচ্ছে! তারপর আবার তার ক্লান্ত মাথা তুলে দেখতে লাগল। চশমার নিচে তার চোখটা যেন নিভু-নিভু। মইয়ের উপর দাঁড়ানো লোকটা একটা জ্বলন্ত দেশলাইকাঠি নিজের গায়ে ঠেকাল এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুনের বলে পরিণত হল। বলটা তারপর তার জায়গা থেকে ছিটকে এসে নিচের লেকের জলে এসে পড়ল। তেলের টুকরোগুলো কিছুক্ষণের জন্য নোংরা জলের উপর নাচতে লাগল। পাড়ে দাঁড়ানো কয়েকজন মানুষ এবার লোকটাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে গেল। লোকটা ইতিমধ্যেই জলের মধ্যে উঠে দাঁড়িয়েছে। দর্শকরা যে যার দিকে চলে যেতে লাগল।

আম্মান, এটাই ব্যাপার? বাঃ, বাঃ!— মুন্না আমার বোরখায় টান দিল। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না আমার কী করা উচিত। ওই বামনটা, ওই নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে লেকে ঝাঁপিয়ে পড়া লোকটা আর ওই কাঠের ব্যালকনিতে বসে নিজের ভেতরে এক ব্যাগ ম্যাজিক ট্রিক লুকিয়ে রাখা মহিলাটি ছাড়া আর কারও কোনও পরিচয় ছিল না। সেই চেনা জ্বলন্ত ভয়টা আমাকে আবার গ্রাস করতে লাগল। হয়ত আমার ক্ষিদে পেয়েছিল। আমরা মৃত্যুকূপের দিকে হাঁটা লাগালাম। কিন্তু ততক্ষণে একটা শো শেষ হয়ে গেছে। দর্শকেরা আবার নতুন শো দেখার জন্য ভিড় জমিয়েছে। বামনটা আবার নাচতে শুরু করেছে। কিন্তু সেই সোনালি চুলের মেয়েটি আর ওখানে নেই। সামনের একটা তাঁবুর দরজার উপরে সাদা পর্দায় গায়ে লাল কালিতে লেখা আছে, ‘রিয়েল গার্লস সার্কাস’ আর সেই সঙ্গে রয়েছে নিকার পরিহিত মেয়েদের ছবি। কানিজ তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। নুসরাত জিজ্ঞেস করল, দেখতে চাস? কানিজের উত্তর দেওয়ার আগেই একজন খাকি ট্রাউজার আর বুশশার্ট পরা ভদ্রলোক তার দিয়ে এগিয়ে এসে বলল— স্বাগতম স্বাগতম। ভারী অক্ষিপল্লবের নিচে তার চোখ আমাদের মুখের দিকে এক বোরখা থেকে অন্য বোরখায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল।

–এক্ষুনি শুরু হবে। মাত্র আট আনা, মাত্র আট আনা।

কিছু লোক ইতিমধ্যেই পর্দার মধ্যে দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছিল। পর্দাটা একটু উপরে উঠতে চোখে পড়ল সার দেওয়া চেয়ারের ওপারে মাঝের ফাঁকা জায়গায় কয়েকটি মেয়ে লাল নিকার ও খুদে নীল জাম্পার পরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ছড়ানো চোখ, চাপা গায়ের রং, হাত ও পায়ের মাঝের হাড়-পাঁজরগুলো নিশ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ওঠানামা করছে। একটি মেয়ে তার হাত ও পায়ের উপর ধনুকের মতো বেঁকে দাঁড়িয়ে ছিল আর অন্য একজন সেই ধনুকাকার খাঁচার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হল যেন এই ধাক্কাটা আমার আর মুন্নার পাঁজরে এসে লেগেছে। আমি মুন্নার পাঁজরে হাত দিয়ে দেখলাম আর দ্রুত দরজার সামনে থেকে সরে গেলাম।

–আম্মান, কী হল? মুন্না আমার বোরখায় টান দিল।
–সব ঠিক আছে।

মৃত্যুকূপের খেলা শুরু হতে তখনও কিছুটা সময় ছিল। কাছে লোকজন ফেরিস হুইলে রাইড করছিল।

–চলো, ফেরিস হুইলে চরা যাক। নুসরাত আমাকে গাড়িগুলোর দিকে টেনে নিয়ে চলল।
–না, মুন্না ভয় পাবে। আমি বললাম।
–ওকে আমার কাছে রেখে যাও। কাঠের চেয়ারে বসে তাইজি বলল।

আমি তখনও বুঝতে পারছিলাম না আমার যাওয়া উচিত কিনা। শেষ জখন আমি ফেরিস হুইলে চরেছিলাম, তখনও আমার বিয়ে হয়নি, আমি নামার সময় খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু এর মধ্যে নুসরাত টিকিট নিয়ে চলে এসেছে। আমরা চারজন গাড়িতে উঠে বসলাম। দুটো গাড়ি তখনও খালি ছিল। লোক তোলার জন্য যখন সেগুলো নিচে নামল, আমরা সোজা উপরে উঠে গেলাম। এখন সব আলো আমাদের নিচে ছড়িয়ে আছে। তার বাইরে এই শহর অন্ধকারে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে। মেলার মাঠটাকে দেখতে খেলনার মতো লাগছে আর মানুষগুলো যেন উরোগামী ছটফটে পোকা। উচ্চতায় পৌঁছে আমি ভারহীনতার ভয় অনুভব করতে লাগলাম। আমি ভিড়ের মধ্যে মুন্নাকে খোঁজার চেষ্টা করলাম কিন্তু ততক্ষণে আমি খেই হারিয়ে ফেলেছি যে কোনদিকে ওদেরকে ছেড়ে এসেছিলাম। তখনই আমার চোখে পড়ল সেই মৃত্যুকূপ। আমি বুঝতে পারলাম মাঠের নকশাটা। অবশেষে আমার দৃষ্টি গেল একটা সাদা বোরখার দিকে যেটা তাইজি পরেছিল আর তার সঙ্গে নীল নিকার আর বুশশার্টে দাঁড়িয়ে ছিল মুন্না। আমি ভাবলাম মুন্না নিশ্চয় আমার দিকে তাকাবে। কিন্তু ও উপরে দেখল না। হয়ত ও বেলুনের দিকে চেয়েছিল। আমি চেঁচিয়ে ডাকলাম— মুন্নায়, মুন্নায়। কিন্তু আমার গলা অত অবধি পৌঁছাল না। উল্টে, আমি কোথা থেকে যেন বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। কোথাও যেন কোনও এক মুন্না অঝোরে কাঁদছে। আমার মনে হল, এই ভিড়ের মধ্যেই কোথাও, আমার নিজের মুন্না কাঁদছে। কিন্তু তখনই খেয়াল হল আমার তো আর কোনও মুন্না নেই। আমার ভেতরেও নেই, বাইরেও নেই। আমার নিজের মুন্না তো ওখানে দাঁড়িয়ে বেলুন নিয়ে খেলছে। তাহলে যে মুন্না কাঁদছে, সে কে?

এখন ফেরিস হুইল ঘুরতে শুরু করেছে। উপর-নিচ। উপর-নিচ। এই পৃথিবীও যেন একসঙ্গে ঘুরছে এবং প্রতিবারই একটা জ্বলন্ত ভয় আমার অন্ত্রকে পিষে দিয়ে যাচ্ছে। আমি বারবার পেটের ভেতর সেই শূন্যতা অনুভব করছি। গাড়িগুলো যখন নিচে নামছে, তখন সব প্যাসেঞ্জার প্রথমে ভয়ে চিৎকার করছে আর তারপর আনন্দে হাসছে। নুসরাত, কানিজ আর বিলকিসও সীমাহীন উচ্ছ্বাসে হেসে উঠছে। কিন্তু আমি সেই ঘূর্ণায়মান ফেরিস হুইলে বসে মুন্নাকে খুঁজে চলেছি আর ভাবছি ও আমার দিকে দেখবে কিনা। কিন্তু ও একবারের জন্যও চোখ তুলে তাকাল না।

ফেরিস হুইল থামার পরে যখন আমরা নেমে এলাম, আমি দেখলাম মুন্না তাইজির কোলে বসে লজেন্স খাচ্ছে। আমি যেখানে ওকে দেখেছি ভেবেছিলাম, এটা তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা জায়গা। আমি অবাক হয়ে চারপাশে তাকালাম আর ভাবতে লাগলাম এতক্ষণ তাহলে আমি কাকে দেখেছি। এমনকি পরেও আমার চোখ ওদের খুঁজতে লাগল কিন্তু আমি আর ওই মহিলা এবং বাচ্চাটিকে দেখতে পেলাম না।

মৃত্যুকূপের খেলা এবার শুরু হওয়ার মুখে। কাঠের ব্যালকনিতে বসে লাল জাম্পার পরা সেই সোনালি চুলের মহিলা সিগারেটে টান দিচ্ছে আর হাসছে। আর ওই কোমর অবধি মুখঝোলা বামনটা, তার ডগাবিহীন আঙুলে কুঁজটাকে পাহাড়ের মতো পিঠে বহন করে নেচে চলেছে।

এসো, এসো— বিলকিস কাঠের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। মুন্নার হাত ধরে আমি ওর পেছন পেছন উঠলাম। আমরা সবাই ওই কাঠের আবরণটাকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। নিচের গর্ভে দুটো মোটরসাইকেল রাখা ছিল— একটা সবুজ, অন্যটা লাল।

–এটাই কি সেই কুয়ো? মুন্না জিজ্ঞেস করল।
–হ্যাঁ।

কাঠের আবরণের মধ্যে থেকে একটা ছোট দরজা খুলে গেল। কালো ট্রাউজার ও ছোট হাতাওয়ালা সাদা গেঞ্জি পরে দুজন লোক প্রবেশ করল। তারপর সেই চড়া মেকআপ, লাল জাম্পার ও কালো ট্রাউজার পরিহিত সোনালি চুলের মহিলা এসে ওই দুজনের সঙ্গে হেসে হেসে গল্প করতে শুরু করল। লোকদুটো মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিতেই তার উচ্চ শব্দে দর্শকদের কোলাহল ও মেলার পুরো মাঠের যাবতীয় আওয়াজ চাপা পড়ে গেল। কিছুক্ষণের জন্য দুটো গাড়িই মাটিতে চক্কর কাটতে লাগল। সেই সোনালি চুলের মেয়েটি গিয়ে সবুজ মোটরসাইকেলের পেছনের সিটে বসতেই দুটো গাড়ি প্রথমে দ্রুত ঘুরপাক খেতে শুরু করল আর তারপর চক্কর কাটতে কাটতে কাঠের কুয়ো বেয়ে উঠতে লাগল। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল মোটরসাইকেল দুটো ছিটকে কাঠের কেসিং-এর বাইরে গিয়ে পড়বে। তাই যখনই তারা কুয়োর মুখের কাছটায় আসছিল, দর্শকরা সবাই পিছিয়ে যাচ্ছিল। তারপর হঠাৎই সেই সোনালি চুলের মহিলা তার সামনের লোকটির কোমর থেকে হাত সরিয়ে নিল। বাতাসে দুই বাহু প্রসারিত করে, ঘাড়টা পেছনদিকে এলিয়ে সে হাসতে লাগল। তার ঘাড়ের শিরা ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠল আর হলদে-বাদামি দাঁতগুলো ইলেকট্রিক আলোয় জ্বলজ্বল করতে লাগল। এভাবেই কুয়োর ভেতরে ঘুরতে থাকল সে।

ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন— চারিদিক থেকে এই শব্দ ভেসে আসতে লাগল। আমার দুপাশে কালো বোরখার ভিড় এত কাছে চলে এসেছিল যে আমি ভুলতে বসেছিলাম আমি নিজে কোনও বোরখার ভেতরে আছি। এই মোটরসাইকেলের ঝাঁঝালো শব্দ আমার মগজকে কাগজের মতো হালকা করে তুলেছিল। শো শুরু হওয়ায় সময় সেখানে ব্যাপক ভিড় ছিল। আমি এই অগুনতি মানুষের ভার অনুভব করলাম, সবাই যেন একইভাবে শ্বাস নিচ্ছে, তাই অন্য কারও নিঃশ্বাস বা প্রশ্বাসের সঙ্গে নিজেরটা আর আলাদাভাবে বোঝা যাচ্ছে না।

এবার মোটরসাইকেল দুটো থামল এবং তিনজনে মাথা নত করে ছোট্ট কাঠের দরজা দিয়ে বিদায় নিল। আমরা পুরো ভিড়টাকে আমাদের আগে নেমে যেতে দিলাম। তারপর আস্তে আস্তে ভিড় পাতলা হলে আমরা নুসরাতকে অনুসরণ করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলাম। প্রথম ধাপে নেমেই আমি মুন্নার হাত ধরে ওকে পথ দেখানোর চেষ্টা করলাম।

কিন্তু কোথায় মুন্না? মুন্না? আমি চারিদিকে তাকালাম। মুন্না কোথাও নেই। মুন্না কোথায়?— আমি নিজেকে এবং বাকি সবাইকে এই প্রশ্নটা করলাম।

–সেকি। মুন্নায়? তাইজি চিন্তিত মুখে আশপাশ দেখল। তারপর আমরা সবাই মিলে সেই কুয়োর চারপাশে খুঁজলাম। একবার নয়, বারবার। কিন্তু মুন্না কোথাও নেই।

তারপর আমরা প্রত্যেকটা স্টলে মুন্নাকে খুঁজলাম।

–ও নীল জামা আর লাল জুতো পরে ছিল, না? বিলকিস জিজ্ঞেস করল।

আমি বললাম— হ্যাঁ, হ্যাঁ।

ঈশ্বর ওকে রক্ষা করুন। ঈশ্বর ওকে রক্ষা করুন— তাইজি আমাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। সবকটা স্টলেই আমি নীল জামা আর লাল জুতো দেখতে পেলাম। কিন্তু মুন্না কোথাও ছিল না। ভিড়ের মধ্যে ওকে খুঁজে বেড়াতে বেড়াতে আমার নিজের উপর সন্দেহ হতে লাগল। মুন্না কি আদৌ কোথাও আছে? সত্যিই আছে? সত্যিই কি মুন্না বলে কেউ ছিল যে হারিয়ে গেছে? নাকি, সেরকম কেউ ছিলই না কিন্তু হারিয়ে গেছে? হাঁটতে হাঁটতে আমি হঠাৎই খুব ভার অনুভব করতে লাগলাম যেন পুরো মেলা জুড়ে আমার উপস্থিতি ছড়িয়ে পড়েছে। আমার পেটের ভেতরের সেই অসার শূন্যতাটা উধাও হয়ে গিয়েছিল। আমি ভাবলাম তাহলে কি আমার থেকে আলাদা কোনও মুন্না ছিল, নাকি আমার কোনও অস্তিত্ব ছিল না, শুধু মুন্নাই ছিল? আর যদি আমদের দুজনের অস্তিত্ব আলাদা হয়ে থাকে, তাহলে আমরা হারিয়েই বা গেলাম কী করে?

নুসরাত বলল— রাশিদা, চলো অর্গানাইজারের অফিসে যাওয়া যাক। আমরা ওদের ঘোষণা করতে বলব। বাচ্চারা হারিয়ে গেলে ওখানে ওদের পাওয়া যায়।

আমরা বাহিরদরজার কাছে একটি ছোট্ট ঘরে প্রবেশ করলাম। একটা লাল কাপড়ে ঢাকা টেবিলের চারপাশে চারজন লোক চেয়ার পেতে বসেছিল।

আমরা গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়ালাম।

–আমরা আপনাদের জন্য কী করতে পারি? চশমা পরা একজন লোক বলল।
–আমাদের বাচ্চা হারিয়ে গেছে। নুসরাত বলল।
–দুঃখিত। বসুন। ও ড্রয়ার থেকে একটা খাতা আর পেন্সিল বার করে টেবিলের উপর রাখল।
–বাচ্চাটির বয়স কত, কী রকম দেখতে, পরনে কী ছিল, কোনও বিশেষ চিহ্ন আছে কিনা বলুন।
–নাম? ও কি নিজের নাম বলতে পারে?

আমি সবকিছু মনে করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুই মনে পড়ল না। বরং তাইজি ওদের অনেক দরকারি তথ্য দিল। তারপর সেই চশমা পরা লোকটা অনেকক্ষণ ধরে ঘোষণা করলেন। সারা মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল তার কণ্ঠস্বর। উনি আমাদের অপেক্ষা করতে বললেন। আমরা বসে রইলাম। তাইজি প্রার্থনা করতে লাগল। বিলকিস, কানিজ আর নুসরাত আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। অফিসের লোকটা আমাকে চা অফার করল। সেই উষ্ণ পানীয়ের এক চুমুক পিত্তের মতো আমার গলায় আটকে গেল। আমি জানলা দিয়ে বাইরের ভিড়ের দিকে তাকালাম। একমাত্র ওই বামনটাই হারিয়ে যেতে পারবে না। আর ওই গায়ে আগুন দিয়ে লেকের জলে ঝাঁপিয়ে পড়া লোকটা, মৃত্যুকূপের রাইডারেরা, রিয়েল গার্লস সার্কাস-এর মেয়েরা— এদের বাদ দিয়ে আর কাউকেই আলাদা করে চেনার উপায় নেই। আমার সেই স্বপ্নের কথাটা মনে পড়তে লাগল যেখানে আমি দেখেছিলাম যে ওই রাস্তায় সবকটা বাড়িই একইরকম দেখতে। এক পলকে আমি দেখলাম মুন্না দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কথা বলার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

–ঈশ্বরকে অশেষ ধন্যবাদ— বলে তাইজি লাফিয়ে উঠল।
–কোথায় চলে গেছিলি, মুন্নায়? হ্যাঁ? কে তোকে এখানে দিয়ে গেল? কানিজ মুন্নার হাত চেপে ধরল।
–কী? ওই তো। মুন্না ওর মুক্ত আঙুল দিয়ে দরজার দিকে দেখাল। তারপর পকেট থেকে কয়েকটা লজেন্স বার করে গুনতে লাগল।

আমি মুন্নার হাত ধরলাম। আমরা মেলা থেকে বেরিয়ে এলাম।

–কোথায় গেছিলি? তাইজি জোর গলায় জিজ্ঞেস করল। মুন্না তখন আমার কোলে। ও জবাব দিল—
–কই? কোথাও না তো। আমি তো আম্মানের হাত ধরে হাঁটছিলাম। একটু এগিয়ে যখন আমি আম্মানের দিকে তাকাই, দেখি সে আম্মান নয়, অন্য একজন।
–ও কে ছিল? আমি মুন্নাকে জিজ্ঞেস করলাম।
–প্রথমে আম্মানই ছিল। কিন্তু কিছুটা এগিয়ে দেখলাম সে আম্মান নয়।
–বেচারা। ও নিশ্চয়ই বোরখা ছিল বলে বুঝতে পারেনি। বিলকিস বলে।

কুয়াশায় মোড়া রাস্তার মধ্যে দিয়ে আমি যখন হাঁটছিলাম, মেলার মাঠ থেকে আমার কানে ভেসে আসছিল মুন্নার কান্নার শব্দ। এদিকে মুন্না তখন আমার কোলে, লজেন্স খাচ্ছে।

ও কে ছিল?— আমি জিজ্ঞেস করলাম। আমার গলিতে তখনও কালো চাদরের উপর ছড়িয়ে থাকা জুঁই ও গোলাপের সুগন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিল। চায়ের দোকানে অলঙ্কারে ভূষিত সেই অভিনেত্রী তখনও হাসছিলেন। আর সেই অনন্য গলিপথে একইরকম দেখতে সবকটা বাড়িতে একই রঙের আলো জ্বলছিল। বাড়িতে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় বা রাতের অন্ধকারের যখন মুন্না আর আমি একা, আমি সেই একই প্ৰশ্ন করতে লাগলাম— ও কে ছিল?

–প্রথমে আম্মান, তারপর অন্য কেউ।

এরপর থেকে অনেক যুগ ধরে মুন্না ওই একই উত্তর দিতে থাকবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4726 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...