Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আরেকরকম: ভিন্নচর্চার খোলা উঠোন

দেবব্রত শ্যামরায়

 

‘সার্বিক অধোগমনের প্রবণতাকে ললাটলিখন বলে মেনে নিয়ে হাত-পা গুটিয়ে মহাপ্রলয়ের বিশেষ মুহূর্তটির জন্য প্রতীক্ষায় থাকা মহাপাতকের সমার্থক, প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ার দায়িত্ব আমাদেরই বহন করতে হবে, যে যেখানে অবস্থান করছি, আমাদের প্রত্যেককে।’

মাঝে আর মাত্র ক’টা দিন। হিন্দু বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা আসন্ন। পথেঘাটে, বুকস্টলে, রেলস্টেশনে একটি দু’টি করে ফুলের মতো ফুটতে শুরু করেছে এবারের শারদসংখ্যাগুলি। আমরা, নিজের ‘হিন্দু’ পরিচয় নিয়ে যাদের বিশেষ একটা তাপ উত্তাপ নেই, বরং এই ‘অচ্ছে দিন’-এর উৎপাতে সে পরিচয় নিয়ে যারা কিছুটা কুণ্ঠিত-ই, ধর্মীয় উৎসবের দিনে শারদসাহিত্য তাদের কাছে একটা চমৎকার আশ্রয়। কারণ আচার-অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট ধর্মপরিচয় থাকতে পারে, কিন্তু মননের গায়ে ধর্মের দাগ লেগে নেই। কিন্তু চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর সম্পাদকীয় দপ্তর যখন জরুরি ভিত্তিতে এবারের একটি শারদ সংখ্যা নিয়ে পাঠপ্রতিক্রিয়া জানানোর ফরমান জারি করলেন, খানিক মুশকিলেই পড়লাম। এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও শারদপত্রিকা সংগ্রহ করিনি, পড়ে শেষ করা তো দূরস্থান৷ সৌভাগ্য, মাত্র দু’দিন আগে হাতে এসেছে এবারের ‘আরেকরকম’, কাজের ফাঁকে পাতা ওল্টাতে শুরুও করেছি। যদিও এই গুরুগম্ভীর কাগজের রিভিউ লেখা আমার পক্ষে অনধিকারচর্চার সামিল, তবু কিছু দোষ হলে সে দায় পত্রিকা সম্পাদকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যাবে, এই বিশ্বাসে দু’এক-কথা বলে ফেলার লোভ সামলানো গেল না।

অবশ্য এবারের সংখ্যা নিয়ে একটা অন্যরকম কৌতূহল কাজ করছিল। কয়েকমাস আগে চলে গেছেন অশোক মিত্র, আরেকরকম-এর প্রাণপুরুষ। গত বছর এইসময়ও তিনি ছিলেন। শেষের কয়েক বছর প্রায়ান্ধ অবস্থায় শুধুমাত্র অদম্য প্রাণশক্তি দিয়ে এই কাগজের সম্পাদনার দায়িত্ব সামলেছিলেন তিনি। তাঁর মতো একজন চিন্তক-অভিভাবকের অভাব পূরণ করা যেকোনও প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই অসাধ্য, যদিও আরেকরকম-এ ওঁর যোগ্য সহকর্মীরা এখন দায়িত্বে আছেন, কিন্তু অশোকবাবুর অনুপস্থিতি কি কোনওভাবে ছাপ ফেলেছে কাগজটির চাল ও চলনে? দেখাই যাক।

উত্তরের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। চমকে উঠলাম তিন নম্বর প্রবন্ধে এসে। সম্প্রতি কোনও এক নিবন্ধে এক স্বাদু প্রশ্ন তুলেছিলেন বিজ্ঞানী-ভাষাতাত্ত্বিক পলাশবরণ পাল। কৃষ্ণকলি কবিতায় ‘মুক্ত বেণী পিঠের পরে লোটে’ এই চরণটিতে ‘লোটে’ ক্রিয়াপদটির কোনও ধাতু খুঁজে পাননি তিনি। পলাশবাবুর এই প্রশ্ন উৎসাহিত করল দেবেশ রায়কে, এর উত্তর খোঁজার জন্য। ফলত, লাভবান হলাম আমরা। আলোচ্য নিবন্ধে দেবেশ রায় দেখাচ্ছেন কীভাবে শুধুমাত্র পাশ্চাত্য ভাষাতত্ত্বের প্রতি আনুগত্য, এবং সেই অনুসারে তৈরি মান্য অ্যাকাডেমিক প্রমিত রূপতত্ত্ব দিয়ে বেগবতী বাংলাভাষার আটপৌরে ভুবনকে পুরোপুরি বিচার করা যাচ্ছে না। রবীন্দ্রনাথের গানে ক্রিয়াপদের ব্যবহার নিয়ে যে আলোচনার শুরু, তারপর সংসার বা ক্ষেতখামারে কাজ করতে করতে তৈরি হওয়া মেয়েদের নিজস্ব ভাষাজগৎ (যেমন ছাদ পেটানোর গান), সবশেষে সুনীতিকুমারে বই ও গ্রিয়ারসন ছুঁয়ে এক গভীরতর মননে এসে লেখাটি শেষ হয়। প্রসঙ্গত, সম্প্রতি আলোচিত, কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী প্রস্তাবিত বাংলাভাষাচর্চার বিকল্প সংশ্লেষটিকে কীভাবে দেখেন দেবেশ, এই প্রবন্ধ তা জানার ইচ্ছে বাড়িয়ে দিল৷

দেবেশ রায় যেখানে শেষ করেছেন, ঠিক সেখান থেকে শুরু করেছেন আরেকজন অশীতিপর যুবা। ‘আত্মপরিচয় : সংঘাত, সন্ত্রাস, উত্তরণ’ প্রবন্ধে ‘আমি’ এই ধারণার নির্মাণ ও তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, ও সমষ্টিগত বিবর্তনের ধারাটি বিশ্লেষণ করেছেন পবিত্র সরকার। প্রবন্ধের শুরুতে পবিত্রবাবু এক জায়গায় লিখছেন — ‘ভাষাবিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন, অনেক সময় শিশু ‘আমি’ কথাটা আগে বলতে শেখে না। অন্যদের কাছে নিজের শোনা নাম আউড়ে বলে, ‘তিন্নি খানি’, ‘তিন্নি বেউ বেউ যাবে”। বর্তমান রিভিউ-লেখক নিজেও এক নব্য পিতা, তাই নিজের সন্তানের বেড়ে ওঠার সঙ্গে কথাটা মিলিয়ে নিতে পেরে মজা পেলাম। ‘আমিত্ব’-এর এই প্রথম নির্মাণ থেকে শুরু করে নানা আমি-র সংঘাত (হিন্দু আমি, মুসলিম আমি) ও এই আমি-সর্বস্বতার নানা রূপরেখা প্রবন্ধে নেড়েচেড়ে দেখেছেন লেখক। এই বয়সেও পবিত্র সরকারের মনন ও কলম ঈর্ষণীয় রকমের সক্রিয়, নানা জায়গায় তাঁর আয়াসহীন লেখা দেখি, কিন্তু স্যার যে তাঁর সেরা লেখাটি যোগ্য মঞ্চের জন্য বাঁচিয়ে রাখতে জানেন, এই প্রবন্ধটি তার প্রমাণ।

পরবর্তী প্রবন্ধ নবনীতা দেবসেন-এর। তিনি এক পৃষ্ঠার একটি ছোট স্মৃতিগদ্যে হাজিরা দিয়ে গেছেন মাত্র৷

অমিয় দেব তাঁর লেখায় অসমের নাগরিকপঞ্জি, রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ ও আন্তর্জাতিক অনুপ্রবেশ ‘সমস্যা’ নিয়ে কিছু প্রশ্ন তুললেও শেষমেশ পাঠকের সাধ মেটে না। সম্ভবত প্রবন্ধের ক্ষুদ্রায়তনের জন্যে লেখাটি অভীষ্ট গভীরতায় পৌঁছতে পারে না।

বরং তৃপ্তি আনে অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘সমাজমাধ্যম ও আলোচনার গণতন্ত্র’। সম্প্রতি সোশাল মিডিয়া বা সমাজমাধ্যম পারস্পরিক আদানপ্রদান ও ভাববিনিময়ের এক মুক্তাঞ্চল খুলে দিয়েছে, যা আমাদের এই গণতন্ত্রে মানুষের পক্ষে এক হাতিয়ার-স্বরূপ, লেখক নিজের লেখায় এই ধারণাটিকে বিচার করে দেখেছেন। প্রশ্ন তুলেছেন, জনপরিসরে গণতান্ত্রিক আলোচনা সার্থক হওয়ার জন্য যে ক’টি শর্তপূরণ জরুরি — আলোচনাকে হতে হবে ‘Open, Reasoned, and Reflexive’, সোশাল মিডিয়া কি নিজেকে আদৌ সেই স্তরে উন্নীত করতে পেরেছে? লেখক প্রবন্ধ শেষ করেছেন এই মতে পৌঁছে, ‘…সমাজমাধ্যম কখনওই রাজনীতির বিকল্প হতে পারে না। আলোচনার রাজনীতি, আলোচনানির্ভর রাজনীতি কখনওই আলোচনাসর্বস্ব রাজনীতি হতে পারে না।’ আমাদের এই প্রজন্ম, যারা প্রতিটি সামাজিক রাজনৈতিক ইস্যুতে ফেসবুক-টুইটারের চা-দোকানে ভারচুয়াল তুফান তোলেন, তাদের আয়নায় মুখ দেখাবে এই লেখা।

পত্রিকার এক অত্যন্ত জরুরি প্রবন্ধে (‘বিজ্ঞানের ইতিহাস কি নিষিদ্ধ হওয়া উচিত?’) আধুনিক বিজ্ঞানের পদ্ধতিতন্ত্রের এক কালো গর্তে আলো ফেলেছেন মানসপ্রতিম দাস৷ চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন ‘বিজ্ঞানের সরলরৈখিক অগ্রগতির ধারণা’কে। প্রবন্ধটি থেকে অংশবিশেষ তুলে দেওয়া যাক —

”সন্দেহ’ ব্যাপারটাকে বিজ্ঞানের কাঠামোর মূলগত একটা বিষয় বলে প্রচার করেন কাণ্ডারিরা। বলা হয়, এই সন্দেহ করার অভ্যাসই পারে চালু তত্ত্বের আধিপত্য মুছে দিয়ে একেবারে নতুন, কার্যকরী তত্ত্বকে নিয়ে আসতে। এভাবেই সফল হতে পারেন একজন বিজ্ঞানী। কিন্তু সত্যিই কি তাই? একটু অনুসন্ধানী চোখ নিয়ে চারিদিকে তাকালেই দেখা যাবে যে অধিকাংশ বিজ্ঞানী প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুন মেনে ধরাবাঁধা পথে গবেষণা করেন অধিকাংশ সময়। প্রথার বাইরে বেরোনোর জন্য বিজ্ঞানীর কাছে কোনও সাহস যেমন নেই তেমনি ইনসেন্টিভও নেই। বিজ্ঞানের ইতিহাসকার টমাস কুনের বক্তব্য হল, বিজ্ঞান শিক্ষার লক্ষ্য কখনওই সন্দিহান মন তৈরি করা নয়। ইংরেজিতে যাঁদের বলে ‘স্কেপটিকস’ সেইরকম মনোভাবের গবেষক তৈরি হওয়া যুগে যুগে চালু থাকা বিজ্ঞান শিক্ষার পদ্ধতিতে প্রায় অসম্ভব।’

কী মারাত্মক অভিযোগ, তাই না?

এমন আরও অনেক মনোজ্ঞ লেখার কথা বলা বাকি রয়ে গেল। অল্প কিছু প্রবন্ধ পড়া হয়নি এখনও। যা যা পড়েছি, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য — অমিয়কুমার বাগচী কৃত সামীর আমিন স্মরণ, মিলন দত্তের তথ্যসমৃদ্ধ লেখায় ইসলাম ধর্মে জেহাদের ব্যাখ্যা ও আজকের দিনে তার বাস্তবতার কথা। শতবর্ষের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে এক দীর্ঘ গদ্য লিখেছেন যশোধরা রায়চৌধুরী। শ্রীনিকেতন পল্লীর প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে লিখছেন একরাম আলি। বর্তমান ভারতীয় সিনেমায় সেন্সর বোর্ড-অতিরিক্ত অন্য নতুন পেয়াদার খবর জানাচ্ছেন সোমেশ্বর ভৌমিক। এক প্রবন্ধে গান্ধীজির নৈতিকতার শেকড় খুঁজতে চেষ্টা করেছেন সৌরিন ভট্টাচার্য। প্রকাশের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে ‘পেডাগজি অফ দ্য অপ্রেসড’ ক্লাসিকটিকে ফিরে পড়লেন শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।   শুভনীল চৌধুরী টাকার অবমূল্যায়ন ও ঊর্ধ্বমুখী তেলের দামের প্রেক্ষিতে যাচাই করেছেন মোদি সরকারের ভূমিকা। যদিও আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের খতিয়ান নিয়ে আরও কিছু নিবন্ধ থাকলে মন্দ হত না।

পত্রিকার সর্বশেষ লেখাটি কবি কালীকৃষ্ণ গুহ-র। ‘বিশুদ্ধ কবিতা’ ও ‘শ্রেণিসচেতন কবিতা’-র মধ্যে ভারসাম্যের যে দীর্ঘকালীন দ্বন্দ্ব, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সমর সেন-এর কবিতার প্রেক্ষিতে তাকে আবারও ফিরে দেখলেন কালীকৃষ্ণ। লিখলেন, ‘….কখনও তা (কবিতা) সংগ্রামের হাতিয়ার হবে, কখনও কখনও তা হবে মননের গভীরতা থেকে উৎসারিত ‘মন্ত্র’। এই দুই সীমার মাঝখান দিয়ে একজন কবির প্রসারিত যাত্রাপথ।’

শুধু কবিতা নয়, একই কথা প্রযোজ্য ‘আরেকরকম’-এর ক্ষেত্রেও, যা এই ঘোরতর ‘মগজে কারফিউ’ সময়েও চালু রাখে গভীর মনন ও শ্রেণিসচেতনতার জরুরি মিশেল। ‘অশোক মিত্র-র অনুপস্থিতি’ — এই ভুল শব্দবন্ধ থেকে এই লেখাটি শুরু করেছিলাম। ভুল এই কারণে, মানুষের মৃত্যু হলেও আইডিয়ার মৃত্যু হয় না। অশোক মিত্র সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও বর্তমান প্রবন্ধের শুরুতে যে উদ্ধৃতি, ‘আরেকরকম’-এর প্রথম সংখ্যায় এই ইস্তেহারপ্রতিম বাক্যগুলি তিনি স্বহস্তে লিখে গিয়েছিলেন। অনুসারী ‘আরেকরকম’ স্বধর্মেই স্থিত; আগের মতোই, আজও ভিন্নচর্চার খোলা উঠোন। এবং তাই, এই অ-স্বচ্ছ ভারতে দাঁড়িয়ে, অবশ্যপাঠ্য।