Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

পাঁচালি বেত্তান্ত

অনুরাধা কুণ্ডা

 

লক্ষ্মীপুজোই সম্ভবত একমাত্র পুজো যেখানে মূর্তি বিসর্জন নিষিদ্ধ। কারণ অবধারিত। শ্রী ও সম্পদকে জীবন থেকে বিসর্জন দিতে চায় কে? তাই প্রতি বৃহস্পতিবার, সন্ধ্যাবেলায় পাঁচজন অথবা তিনজন “এয়োস্ত্রী” মিলে এই পুজো করবার নিয়ম। তাহলে ধরে নিতে হবে কুমারী বা বিধবার লক্ষ্মীপুজোতে সামিল হবার অধিকার নেই। পাঁচালিকার সেখানে তিনি একটু নরম হয়ে বলেছেন যে এয়োস্ত্রীর অভাবে নিজে পূজা করা চলবে। তবে পূজাবিধি খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে যে তেল, আলতা, সিঁদুরের অনুষঙ্গে লক্ষ্মীপূজা সধবা নারীর এক্তিয়ার। অন্যে সেখানে প্রবেশাধিকার পেতে পারে, তবে, সীমাবদ্ধতা সহকারে। প্রথমেই এই বৈষম্যের সীমারেখা টেনে দেওয়া হচ্ছে বটে তবে আবার সেটা ভেঙেও দেওয়া হচ্ছে।

পূজাবিধি কিন্তু এ পূজাতে ঘণ্টাধ্বনিও নিষিদ্ধ করছে। সে বিষয়ে পরে আসি।

লক্ষ্মীপুজোই সেই পুজো যেখানে মেয়ে পুজো করার অধিকার পাচ্ছেন এবং এই যে প্রতি বৃহষ্পতিবার একত্রিত হওয়া, এটা প্রায় একধরনের গেট টুগেদার, যেখানে সংসারের কাজের ফাঁকে মহিলারা একত্রিত হয়ে গল্পগাছা করছেন, গল্প শুনছেন পাঁচালির মধ্যে দিয়ে এবং “স্বামী পুত্র কন্যা নিয়ে সুখে থাকার” প্রার্থনা করছেন। এই কৌম প্রথা মেয়েদের একত্রিত করার একটা সুযোগ দিচ্ছে বটে, কিন্তু তার উদ্দেশ্য পুরোপুরি পিতৃতান্ত্রিক একটা ছাঁচে নারীকে ঢালাই করা।

লজ্জা আদি গুণ যত রমণীর আছে
ক্ষণিক সুখের লাগি বর্জন করেছে।।
স্বামীরে না মানে তারা না শুনে বচন
ইচ্ছামত হেথা সেথা করিছে ভ্রমণ।।

সেকালে মেয়েরা আর কতই বা ইচ্ছামতো এদিক ওদিক যেতে পারতেন? হয়তো পাড়ার এবাড়ি ওবাড়িতে একটু “ওলো সই” করে মনের কথা প্রাণের ব্যথা বিনিময় করতে যেতেন। পাঁচালি কিন্তু এই পাড়াবেড়ানোকে ভালো চোখে দেখছে না, কারণ সেখানে হয়তো পতিনিন্দা ইত্যাদি চর্চা চলে। কাজেই মেয়ের ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়ানো বন্ধ করে তাকে লোকায়তে বেঁধে ফেলাই ভালো। পাঁচজন একসঙ্গে বসো, ব্রত করে স্বামী সংসারের মঙ্গল কামনা করো। হিসেবমতো দেখতে গেলে মেয়েদের একত্রিত হবার জায়গা ছিল হেঁশেল, যেখানে কাজের চাপে কথা বলার ফুরসত নেই। স্নানের ঘাট যেখানে স্নান, কাপড়কাচা ও বাসনমাজার পর্ব। সেখানে কিছু পারিবারিক কূটকচালি আলোচিত হবার সুযোগ ছিল বটে। তাই বৃহষ্পতিবার মেয়েদের একত্রিত করে “সুশীলা” নারী তৈরি করার একটা পরিকল্পিত ছক পাঁচালির মধ্যে পাওয়া যায়। যে ছক মেনে তৈরি হয়েছে লক্ষ্মীমন্ত নারীর মিথ। এই নারী সংসারের জন্য প্রাণপাত করে, স্বামী আজ্ঞা তার শিরোধার্য, কষ্টসহিষ্ণু, ধৈর্য্যশীলা, বাধ্য ও অনুগত। এর অন্যথাতে গৃহ হয়ে যাবে “পাপের আগার।” প্রতি বৃহষ্পতিবারের ব্রতকথা এরকম একটা “সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে” ধাঁচের বিধান দিয়ে রাখছে।

গ্রীষ্মকালের পালাগুলি স্বভাবতই দীর্ঘ। সময় পাওয়া যেত বেশি। বৈশাখ মাসের পালার নায়ক রতাকাঠুরে। বাদশার ভয়ে সে বনে পালালেও বিদ্যাধরীদের বস্ত্র অপহরণ করতে তার দ্বিধা নেই। কেষ্টঠাকুর কায়দাতে সে মেয়েদের স্নানের সময় কাপড় চুরি করছে, রীতিমতো ম্যানিপুলেট করে সমুদ্রে সোনার কলসিতে জল আনতে পাঠাচ্ছে “রতাদাসী” হিসেবে। এই ভয়্যুরিস্টিক, ম্যানিপুলেটিভ এবং মূলত কাপুরুষ রতা শেষপর্যন্ত লক্ষ্মীলাভ করছে। একটা পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো এইভাবেই কাজ করে।

জ্যৈষ্ঠ মাসের ব্রতটিও দীর্ঘ। এ পালাতে কনিষ্ঠ বধূ তিলোত্তমা ছাড়া বাকি বধূগুলি “অশান্ত”। তারা অনাচার করে। হয়তো তিনকন্যার মৃন্ময়ী ধাঁচের ছিল তারা! তারা আবার তিলোত্তমাকে বাড়িছাড়া করে দিল তার পপুলারিটির কারণে। কেন তিলোত্তমা সকলের প্রিয়? “তিলোত্তমা সবশেষে ভোজন করিল।” অবশ্য সে জায়েদেরও যত্ন করে খাওয়াচ্ছে। গর্ভবতী তিলোত্তমাকে তার স্বামী বনে ছেড়ে আসছে। তিলোত্তমা বেসিক কষ্ট করলেও এরপর জায়গা নিয়ে নিচ্ছে তার ছেলে গুণধর। শেষপর্যন্ত স্বামী ও শ্বশুরকুলকে ক্ষমা করে তিলোত্তমা স্থিতিশীল হচ্ছে। এরা কিন্তু গর্ভবতী দশায় তাকে বনে ছেড়ে আসে। ত্যাগ, তিতিক্ষা, কষ্টসহিষ্ণুতা আর ক্ষমাকে মেয়েদের প্রায়োরিটি বলে মেনে নিয়েছে ব্রতকথাগুলি।

আষাঢ়ে নায়ক বিনন্দ। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। তাই এখন পাঁচালি অপেক্ষাকৃত ছোট। সে এত দরিদ্র যে কৃষিকাজও করতে পারে না। তবু তার কপালে রাজকন্যা আছে লক্ষ্মীর আদেশে। আচ্ছা। রাজকন্যার মনের কথা কেউ ভাবে না কেন? দরিদ্র, সম্ভবত অশিক্ষিত, শ্বশুরনির্ভর বরকে মেনে নিতে কেমন লাগত এই রাজকন্যাদের, যাদের বাবারা ইচ্ছেমতো তাদের নিয়ে পুতুল খেলত? (গুপিবাঘার কপাল ভাবুন না। রাজকন্যেরা কি সত্যিই খুশি হল?)

শ্রাবণমাসের পালা মাঝারি মাপের। এখানে একটা মোচড় আছে। জগদত্ত বাণিজ্যে যাবে, যদি বউ সঙ্গে যায়। কিন্তু বউ কাস্টমাইজড।

অবাক হইয়া রম্ভা জগদত্তে কয়
নারী হয়ে কে বা কোথা বাণিজ্যেতে যায়।।

রম্ভা পুরোপুরি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রোডাক্ট। তৎসত্ত্বেও রম্ভার সতীত্ব পরীক্ষা হয়। এই প্যারাডক্স সত্ত্বেও দেবীর কৃপা হয়। দেবী মেয়েদের বিশেষ ছাড় দেন না। বিশেষ করে সতীত্ব বিষয়ে।

ভাদ্র মাস। এখানেও দেবীর প্রসাদে গরীব ব্রাহ্মণের সঙ্গে রাজকন্যের বিয়ে। শ্রেণিবৈষম্য যে তাতে খুব দূর হচ্ছে তা তো নয়। কিন্তু রাজকন্যার সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কী হত, এটা প্রশ্ন।

আশ্বিন মাসে জগৎ শেঠের কাহিনী। এখানেও কেন্দ্রে আছে পদ্মাবতীর ত্যাগ। প্রাণ দিয়ে সে ছেলের ঘরে লক্ষ্মী বেঁধে রাখছে। আইডিয়াল মা। মিথ তৈরি হচ্ছে নারীত্বের।

কার্তিক মাসের গল্পে কিং লিয়রের ছোঁয়া। পুষ্পবতী ঘোরতর সংসারী। সতীসাধ্বী। স্বামীকে সৎ পরামর্শ দেয়। লক্ষ্মীমন্ত।

অগ্রহায়ণে পালা ছোট হচ্ছে। শীত পড়ছে শেষবিকেলে। নায়ক দীননাথকে দয়া করছেন ক্ষেত্রলক্ষ্মী। ধানের সঙ্গে কোথায় যেন নিবিড় যোগ।

পৌষ মাসে দীর্ঘ পালা। উৎসবের জন্য হয়তো এসময় জমায়েত দীর্ঘতর হত। মেয়েতে মেয়েতে কোন্দল কাহিনী চিরকাল সমাজ উপভোগ করে। এই রাজনীতিও পিতৃতন্ত্রের অবদান। ডিভাইড অ্যান্ড রুল। তদুপরি পাঁচালিতে মেয়েদের ওপর একটা বিশাল চাপ। মৃত সাপকে তারা সোনা বানিয়ে দিচ্ছে। মেটাফরিক্যালি দেখলে, সামান্য জিনিসকেও তারা সমৃদ্ধিতে পরিণত করে দেন। এটা বেশ বাড়তি চাপ। পুরুষদের এই দায় নেই।

মাঘ মাসের পালার কেন্দ্রে দুষ্ট রাজা। শোধন হলেই তিনি দেবীর কৃপালব্ধ।

ফাল্গুন মাস থেকে পালা দীর্ঘ হচ্ছে। নায়ক হরিহর। দেবীর কৃপায় সে ধনী হয়।

চৈত্র মাসে আরও দীর্ঘ পাঁচালি। গঙ্গাধরের উপাখ্যান। সেও গরীব ব্রাহ্মণ। লক্ষ্মীকে বারো বছর সে নিজগৃহে রাঁধুনি  করে রাখে। কেন? না, লক্ষ্মী তার জমি থেকে তিলফুল তুলেছিলেন। যাইহোক, লক্ষ্মীযোগে তাঁর ধনলাভ হল,এটাই মোদ্দা কথা।

সমস্ত কটি আখ্যান পড়লে দেখা যাবে যে প্রধান পুরুষচরিত্রগুলি ব্রাহ্মণ এবং দুস্থ। নতুবা বণিক। রতা অবশ্য কাঠুরে। একটু ইতিহাস ঘাঁটলে ভেসে আসবে এক আশ্চর্য সময়। বক্তিয়ার খিলজি বাংলা আক্রমণ করে দখল করে নিচ্ছেন জায়গা। পুজোআচ্চার যে বিশাল পাবলিক ফোরাম, তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে পৌত্তলিকতার প্রবল বিরোধিতায়। মুসলমান আগ্রাসনের এই সময়ে যখন বাংলার মাটিতে একটি প্রবল কালচারাল শিফট ঘটছে, যাঁরা সমাজের মাথা ছিলেন, তাঁরা ব্রাত্য প্রতিপন্ন হচ্ছেন, পুজো সংকুচিত হয়ে ঢুকে পড়ছে ঘরের ভিতরে, তখন যে ব্রতকথাগুলির জন্ম, তাতে নারীর অবরোধ এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

একদিকে কৌলীন্য প্রথার উদ্ভব, অন্যদিকে মুসলমান আগ্রাসন। দুই প্রবল পিতৃতান্ত্রিক প্রথার মধ্যে, বাংলার মেয়েরা ব্রতকথার মধ্যে সাজালেন সংসারে সমৃদ্ধির উপাখ্যান। ব্রত মেয়েরাই করেন প্রধানত। উপোস বা আচরণবিধি মেনে চলার দায়িত্বও তাঁদেরই। পুজোর যোগান দিতেও মেয়েদের ডাক পড়ে। সমস্তটি গুছিয়ে কাছিয়ে দিয়ে তাঁরা পাশে থাকতেন ব্রতকথাগুলির মধ্যে। পাঁচালি সেই সময়ের এক দলিল, যখন মেয়েরা মেনেই নিয়েছিলেন সংসারের দায়টুকু তাঁদেরই। সর্পকে সোনা বানানোর অসম্ভব তাঁদেরই কোমল স্কন্ধে। অবাক কথা, সেই পাঁচালি আজও পড়া হয়ে চলেছে। একইভাবে। একই বিশ্বাসে? প্রশ্ন আসে এখানেই।

সবচেয়ে মজা লাগে দেবীর অষ্টোত্তর শতনাম পড়তে। তিনি সাবিত্রী। শ্রীদাত্রী। কুললক্ষ্মী। মোহিণী। ভোগবতী। ক্রোধহীনা। কুহু। (আমার শরদিন্দু মনে পড়ছে) সুমতি। কল্যাণী। এই তালিকা বুঝে নিতে হবে। এবং এটি পাঁচালি টু পাঁচালি আলাদা। কী সাংঘাতিক ইমেজ লক্ষ্মীর! সাধে কি চঞ্চলা! অত ভার বওয়া যায় নাকি? পাঁচালি মেয়েদের নত হতে শিখিয়েছে। শান্ত হতে বলেছে। বাধ্য হতে বলেছে। বাইরে যেন না যায় নারী। বর্গীদের হানা সম্ভবত এই বিধিনিষেধকে আরও শক্ত করেছিল। শিশু আর মেয়েদেরই তো তুলে নিত তারা।

সেই একই কারণে কি লক্ষ্মীপুজোতে ঘণ্টাবাদন নিষিদ্ধ! শাঁখ বাজে। উলুধ্বনি হয়। কিন্তু ঘণ্টা বাজবে না। শৈবশক্তি ও বৈষ্ণবশক্তির ঘনঘটা ও সংঘর্ষ যখন ঘণ্টাধ্বনিতে মুখর, তখন লক্ষ্মীপুজোতে ঘণ্টা বাজবে না। সে কি প্রতি বৃহষ্পতিবারের আয়োজনকে সীমিত রাখার জন্য! সরস্বতীর আরাধনা বছরে একবার। বিদ্যেবতীকে ব্যাভিচারিণী বলেও ট্যাগ করা হয়েছে। লক্ষ্মী মোহিণী। কিন্তু ব্যাভিচারিণী নন। ঘরের চার দেওয়াল আর পাঁচালিটুকু। তাই ঘণ্টার দরকার হয়নি।

খুঁজলে এমন আরও সাতসতেরো। নারীকে ঘরবন্দি করে সুশীলা বানানোর পাঁচালি বৃত্তান্ত। আকর্ষণী, মদোদ্ধতা, বশিনী, বিলাসী শিবের কাছে বিলাসিনী, পুষ্টিদাত্রী, মধুমতী লক্ষ্মীকে “যুবতী রূপে পতিপাশে” থাকতে হবে যে! কম কঠিন চাপ!