Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বিরসা মুন্ডা এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিভ্রান্তি নিরসন

জোসেফ বরা

 


ঔপনিবেশিক এবং মিশনারিদের বিরসাকে সমালোচনা করার কারণ সহজবোধ্য। তিনি তাঁদের পথে এক প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এমনকি তাঁকে হিন্দু হিসেবে চিত্রিত করাও অনুমেয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে সস্তা জাতীয়তাবাদ আদিবাসীদের "পিছিয়ে পড়া হিন্দু" হিসেবে দেখাতে শুরু করে। আশ্চর্যের বিষয় হল, বিরসা সম্পর্কে এই ভুল ধারণাগুলো বর্তমান উন্নত অ্যাকাডেমিক জ্ঞানেও প্রবেশ করেছে। এর কারণ হল বিদ্যমান স্কলারশিপ আদিবাসীদের "আদিম" হিসেবে রোমান্টিক করে দেখার মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে পারছে না। এই ধরনের মনোভাবের কারণ, পণ্ডিতরা বিকল্প উৎস খুঁজে দেখার চাইতে “ঔপনিবেশিক আর্কাইভগুলির পুনর্পাঠেই” বেশি আগ্রহী

 

বিরসা মুন্ডা (১৮৭৫-১৯০০) একজন প্রখ্যাত আদিবাসী স্বাধীনতা সংগ্রামী, যিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের বহুমুখী জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে তৃণমূল পর্যায়ের নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ঝাড়খণ্ডের খুঁটি জেলা ছিল তাঁর ‘উলগুলান’ (সর্বাত্মক বিদ্রোহ)-এর কেন্দ্রবিন্দু, যেখান থেকে ১৮৯৫ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। সেখানে আজও মুন্ডারি লোকসঙ্গীত এবং লোকগাথায় তাঁকে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

১৯২০-র দশক পর্যন্ত বিরসা এবং তাঁর উলগুলানের খুব একটা ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় না— ব্রিটিশ কর্মকর্তা বা খ্রিস্টান মিশনারিদের থেকে তো নয়ই, ভারতীয় শিক্ষাবিদদের দ্বারাও নয়। কেবল বিরসার কয়েকজন শিষ্য তাঁদের স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে নীরবে কিছু নথিপত্র তৈরি করেছিলেন। এর মধ্যে ভরমি মুন্ডার একটি বিবরণ উল্লেখযোগ্য (১৯২০ সাল নাগাদ)। তবে এগুলি পাণ্ডুলিপি আকারে ছিল এবং ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে পারেনি।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন যখন তুঙ্গে ওঠে, বিরসা মুন্ডার প্রথম জীবনীগুলি ছাপা হতে শুরু করে। তখনই স্বাধীনতা সংগ্রামে আদিবাসীদের ভূমিকা স্বীকৃত হতে শুরু করে এবং নতুন দেশে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। মুচিরাই তিরু (১৯৪৯) এবং পিজি পুর্তি (১৯৫১) নামে দুই আদিবাসী লেখকের এই প্রকাশনাগুলি তাঁদের স্মৃতি এবং বিরসার অনুগামীদের দ্বারা সযত্নে সংরক্ষিত কিছু পাণ্ডুলিপির ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছিল। স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত হলেও এই বইগুলি বিরসাকে বিস্মৃতি থেকে উদ্ধার করে এবং তাঁর জীবন ও কাজকে জাতির সামনে তুলে ধরে। আদিবাসীদের সমস্যাগুলি নিয়ে গড়ে ওঠা ঝাড়খণ্ড আন্দোলন এবং আদিবাসী কল্যাণ নিয়ে জাতীয় স্তরে কাজ করা সামাজিক সংগঠন ‘আদিম জাতি সেবা মন্ডল’ বিরসা সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য তিরুর বইটি প্রকাশ করেছিল। তাঁর সম্পর্কে বিশদ বিবরণ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিরসার প্রতি শ্রদ্ধা বাড়তে থাকে, যার ফলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিরসার ব্যক্তিত্ব এবং উত্তরাধিকারের ব্যবহার শুরু হয়। এভাবেই বীরসা সারা দেশে আদিবাসীদের আকাঙ্ক্ষা, আত্মপ্রকাশ এবং মুক্তির প্রতীকে পরিণত হন। বর্তমানেও আদিবাসী, দলিত এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলির সামাজিক ন্যায়বিচার পাওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলন ও হেতুগুলিকেও তিনি অনুপ্রাণিত করে চলেছেন।

 

বিস্মৃতি থেকে খ্যাতি

বিরসা মুন্ডার ওপর প্রাথমিক প্রকাশনাগুলি পণ্ডিতদের তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে বিস্তারিত কাজ করতে উৎসাহিত করে। আদিবাসী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জীবন ও রাজনৈতিক আন্দোলন সাধারণত শিক্ষাবিদ এবং লেখকদের দ্বারা অবহেলিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কন্ধ বিদ্রোহের চক্র বিসয়ী (১৮৫০), সাঁওতাল বিদ্রোহের সিধু ও কানহু (১৮৫৫-৫৬), রামপা বিদ্রোহের থাম্মানডোরা (১৮৭৯-৮০), বস্তার বিদ্রোহ বা ভূমকাল-এর বান্টু পারজা ও শ্যামনাথ ধকড়, তানা ভগত আন্দোলনের যাত্রা ওঁরাও (১৯১৪-২১), এবং নাগা বিদ্রোহের রানি গুইডিনলিউ (১৯৩২)-এর মতো ব্যক্তিত্বরা শিক্ষাবিদদের কাছে গুরুত্ব পায়নি।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে লেখাপত্র কিন্তু কম নেই। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টরিক্যাল রিসার্চ-এর বিপুল কলেবরের টুওয়ার্ডস ফ্রিডম (১৯৩৭-৪৭)-ও রয়েছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও, আদিবাসী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা উদাসীনই থেকে গেছেন। এমন পরিস্থিতিতেও, বিরসা আদিবাসী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে অন্যতম ভাগ্যবান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। স্বাধীনতার পর বিহার সরকার হিস্ট্রি অফ দ্য ফ্রিডম মুভমেন্ট ইন বিহার (১৯৫৭) নামে একটি বই প্রকাশ করে এবং এতে ইতিহাসবিদ কালিকিঙ্কর দত্তের লেখা বিরসার ওপর একটি অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করে। কালিকিঙ্করবাবু এর আগে সাঁওতাল বিদ্রোহ নিয়েও একটি বই লিখেছিলেন (১৯৪০)। বিহার সরকারের বইয়ের ওই অধ্যায়টিই সম্ভবত বিরসা মুন্ডার ওপর প্রথম অ্যাকাডেমিক লেখা।

যদিও দত্ত ৬৪০ পৃষ্ঠার একটি বিশাল বইতে বিরসার জন্য মাত্র ১০ পৃষ্ঠা বরাদ্দ করেছিলেন, তবুও এটি এই বিষয়ে গবেষণার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে। এরপর বিহার ট্রাইবাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট বিরসার জীবনের ওপর একটি প্রকল্প গ্রহণ করে যার ফলে এসপি সিনহার লেখা লাইফ অ্যান্ড টাইমস অফ বিরসা ভগওয়ান (১৯৬৪) প্রকাশিত হয়। এর পরেই, এক তরুণ সরকারি আমলা কে সুরেশ সিং তাঁর ডক্টরাল গবেষণার অংশ হিসেবে বিরসার জীবনী নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং ১৯৬৬ সালে তা প্রকাশ করেন; তারপর থেকে তাঁর জীবন ও সামাজিক আন্দোলন নিয়ে আগ্রহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি কোনও অতিরঞ্জন নয় যে, বিরসা এখন সমাজবিজ্ঞান জার্নাল এবং অন্যান্য ফোরামে একটি বহু আলোচিত বিষয়।

বিরসা সম্পর্কিত গবেষণার গতিপথ লক্ষ করার মতো। শুরুতে দত্ত এবং সিনহার মতো পণ্ডিতরা বিরসার ভূমিকাকে মূলধারার জাতীয়তাবাদী জাগরণের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, স্বাধীনতা সংগ্রামে আদিবাসীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে যে শূন্যতা ছিল তা পূরণ করা, যা তখনও পর্যন্ত উপেক্ষিত ছিল। পরিশিষ্টের বিষয় থেকে এটি এখন বিশ্ব ইতিহাসতত্ত্বের শীর্ষস্থানীয় তত্ত্বগুলোতে উপাদান জোগানোর মতো একটি শক্তিশালী বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্রখ্যাত পণ্ডিত মাইকেল আদাস (১৯৭৯) এবং রণজিৎ গুহ (১৯৯৯) যথাক্রমে ‘মিলেনারিয়ানবাদ’ এবং ‘সাবঅল্টার্ন’ বা নিম্নবর্গীয় তত্ত্ব নির্মাণের জন্য বিরসা মুন্ডার উদাহরণ উদ্ধৃত করেছেন।

অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে বিরসা মুন্ডার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব জনপ্রিয় সাহিত্য ও চলচ্চিত্রেও রসদ জুগিয়েছে। ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশনা বিভাগ থেকে বই প্রকাশের অনুপ্রেরণা দিয়েছে। ১৯৭৭ সালে বিরসা মুন্ডার জীবনের ওপর ভিত্তি করে বিশিষ্ট লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারজয়ী উপন্যাস অরণ্যের অধিকার (বাংলায়, যা পরে হিন্দিতে জঙ্গল কে দাবেদার নামে অনূদিত হয়) রচনা করেন। উপন্যাসটি সুরেশ সিং-এর ঐতিহাসিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে লেখা। চলচ্চিত্রনির্মাতারাও পিছিয়ে থাকেননি। বিরসার জীবন এবং সামাজিক আন্দোলনকে চিত্রায়িত করে বেশ কিছু ভালো তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্র হল: ‘বিরসা মুন্ডা’ (উপজাতি বিষয়ক মন্ত্রক, ২০১৬), ‘বিরসা মুন্ডা: দ্য রিয়েল হিরো’ (দূরদর্শন, ২০১৮) এবং ‘বিরসা মুন্ডা’ (প্রসার ভারতী আর্কাইভস, ২০১৯)।

 

জনপ্রিয়তার বিড়ম্বনা

অ্যাকাডেমিক, সাহিত্যিক এবং শৈল্পিক কাজগুলো বিরসা মুন্ডাকে একজন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিরল সম্মানের চিহ্ন হিসেবে সংসদে বিরসার দুটি স্মারক রয়েছে: সংসদ চত্বরে একটি ১৪ ফুট উচ্চতার মূর্তি এবং সংসদ ভবনের ভেতরে একটি প্রতিকৃতি। আরেকটি উল্লেখযোগ্য শ্রদ্ধাঞ্জলি হল ভারত সরকার কর্তৃক ২০০০ সালের ১৫ নভেম্বরকে (তাঁর জন্মবার্ষিকী) ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠনের দিন হিসেবে বেছে নেওয়া। এর উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসীদের সুরক্ষায় বিরসার চেতনাকে সমুন্নত রাখা এবং সে-বিষয়ে সরকারের সঙ্কল্প প্রকাশ করা। এছাড়া বিরসার জন্মস্থান উলিহাতু গ্রামে স্মারকস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে। এর পরে আরও অনেক স্মারকস্তম্ভ এবং বিরসাকে স্মরণ করার জন্য আরও অনেক কাজ শুরু হয়। রাঁচির পুরনো বিরসা মুন্ডা জেলে, যেখানে তিনি মারা গিয়েছিলেন, সেখানে তাঁর একটি বিশাল মূর্তি স্থাপনের পরিকল্পনাও নিয়েছে ঝাড়খণ্ড সরকার।

হাস্যকরভাবে, বিরসা মুন্ডার খ্যাতি বাড়লেও জনপ্রিয় এবং অ্যাকাডেমিক সাহিত্য তাঁর সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা লালন করেছে। এর ফলে বিরসাকে অর্ধেক বোঝা হয়েছে বা কখনও কখনও একদমই ভুল বোঝা হয়েছে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় বিরসাকে কেবল একজন তোলাবাজ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে যিনি আদিবাসী কৃষকদের অধিকার রক্ষার লড়াই করার ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন। সেখানে বলা হয়েছে, না তো বিরসা একজন উপনিবেশ-বিরোধী ছিলেন, না জাতীয়তাবাদী ছিলেন।[1] লন্ডন ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণাও একই প্রতিধ্বনি করে বলছে বিরসা “মোটেই আদিবাসী স্বাধীনতা সংগ্রামের কোনও উপনিবেশ-বিরোধী বিদ্রোহী ছিলেন না।”[2]

অন্য কিছু লেখায়, বিশেষ করে খ্রিস্টান মিশনারি এবং তাঁদের সহযোগীদের দ্বারা, বিরসাকে একজন অপরিণত “ধর্মান্ধ” এবং ভাসমান ধারণাসম্পন্ন দুঃসাহসী হিসেবে চিত্রিত করে। বলা হয় যে তাঁর নেতৃত্ব ছিল আদিবাসী সচেতনতার “অতিরঞ্জিত এবং বিকৃত বহিঃপ্রকাশ”।[3] শেষ পর্যন্ত, বিরসাকে বৈচিত্র্যপূর্ণ আদিবাসী জনসাধারণের নেতার পরিবর্তে একজন সংকীর্ণ হিন্দুপন্থী এবং খ্রিস্টান-বিরোধী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিরসা যে তাঁর অনুগামীদের অন্য ধর্মের প্রতি আনুগত্য ক্ষুণ্ণ না করেই সংহতির শক্তি হিসেবে নিজস্ব ধর্ম উদ্ভাবন করেছিলেন, সেটিও উপেক্ষা করা হয়েছে।[4]

ঔপনিবেশিক এবং মিশনারিদের বিরসাকে সমালোচনা করার কারণ সহজবোধ্য। তিনি তাঁদের পথে এক প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এমনকি তাঁকে হিন্দু হিসেবে চিত্রিত করাও অনুমেয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে সস্তা জাতীয়তাবাদ আদিবাসীদের “পিছিয়ে পড়া হিন্দু” হিসেবে দেখাতে শুরু করে।[5] আশ্চর্যের বিষয় হল, বিরসা সম্পর্কে এই ভুল ধারণাগুলো বর্তমান উন্নত অ্যাকাডেমিক জ্ঞানেও প্রবেশ করেছে। এর কারণ হল বিদ্যমান স্কলারশিপ আদিবাসীদের “আদিম” হিসেবে রোমান্টিক করে দেখার মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে পারছে না। এই প্রবণতা পণ্ডিতদের আদিবাসীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পেছনের স্থিতিস্থাপক মানসিকতা বুঝতে বাধা দেয়।[6] এই ধরনের মনোভাবের কারণ, পণ্ডিতরা বিকল্প উৎস খুঁজে দেখার চাইতে “ঔপনিবেশিক আর্কাইভগুলির পুনর্পাঠেই” বেশি আগ্রহী।[7]

বিদ্বজ্জনেদের আগেকার ধারণার থেকে বেরোতে না-চাওয়ার অনীহার ফলেই বিরসা সম্পর্কে পুরনো ধারণাগুলিই ক্রমশ ন্যারেটিভ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০০০ সালে ঝাড়খণ্ড রাজ্য জন্ম নেওয়ার পর থেকে, বিরসার নামের রাজনৈতিক ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিরসার প্রতি কিছু পূর্বোক্ত প্রশংসা এবং সমালোচনা সঙ্কীর্ণ দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, আদিবাসীদের জন্য বিরসার অবদানকে অস্বীকার করা, খ্রিস্টীয় পদাধিকারী এবং মিশনারিদের “গঠনমূলক” ভূমিকার কথা প্রচার করা, এবং চার্চ-কর্তৃক ওই অঞ্চলে বিরসার প্রতিদ্বন্দ্বী জেসুইট যাজক জেবি হফম্যানের মূর্তি প্রতিষ্ঠা বিরসার প্রতি “অসম্মান” হিসেবে চিত্রিত হয়েছে।[8] উন্মত্তভাবে কলঙ্কিত করা হচ্ছে বিরসার চরিত্র। তাঁর জীবনের ঐতিহাসিক তথ্য এবং তাঁর চিন্তাধারাগুলিকে ইচ্ছামতো বিকৃত করা হচ্ছে। এগুলির ফলে একজন আদিবাসী গণনেতা হিসেবে বিরসা মুন্ডার ভাবমূর্তি আজ কলঙ্কিত—তাঁর আত্মাটাকেই ছিঁড়েখুঁড়ে দেওয়া হয়েছে।

 

প্রকৃত বিরসা

বিরসা মুন্ডার প্রাথমিক জীবনে চমকপ্রদ কিছুই ছিল না— ছিল দারিদ্র্য এবং কষ্ট। তৎকালীন অধিকাংশ আদিবাসীর মতো তাঁর পরিবারও জমিদারদের হাতে উচ্ছেদ ও বঞ্চনার শিকার হয়েছিল। জীবিকার প্রয়োজনে বিরসা এক যাযাবরের জীবন গ্রহণে বাধ্য হন। কঠোর শৈশব থেকে তিনি একজন বুদ্ধিমান যুবক হিসেবে বেড়ে ওঠেন। তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁকে আদিবাসী সমাজের দুঃখ-কষ্টের প্রতি সংবেদনশীল করে তুলেছিল। তাঁর যৌবনোদ্দীপ্ত হাসির সঙ্গে একটা বিষণ্ণ চিন্তাশীল দৃষ্টিও মিশে থাকত।

সামাজিকভাবে বীরসা এক বিচিত্র পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। খ্রিস্টান মিশনারিরা তাঁর পরিবারকে খ্রিস্টধর্মে আকৃষ্ট করেছিল এবং বীরসা ‘দাউদ’ নামে দীক্ষিত হন। তিনি মিশন স্কুলে মধ্য-স্কুলস্তর পর্যন্ত পড়াশোনা করেন এবং ইংরেজি সম্পর্কেও সামান্য জ্ঞান লাভ করেন। খ্রিস্টীয় পরিমণ্ডলে তাঁর প্রথম সংসর্গ হয় জার্মান প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনের সঙ্গে, এবং পরে স্বল্পকালের জন্য রোমান ক্যাথলিক মিশনের সঙ্গে। পরে তিনি পুনরায় মুন্ডা সর্বপ্রাণবাদে ফিরে আসেন। তিনি এমনকি তাঁদের এলাকায় সেইসময়ে ব্যাপ্ত কবীর পন্থ-প্রচারিত হিন্দু দর্শনের দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিলেন। স্থানীয় নিম্নবর্গীয় গুরু আনন্দ পাঁড়েও তাঁকে প্রভাবিত করেছিলেন। এরপর তিনি ‘সর্দারি লড়াই’ আন্দোলনের (১৮৫৮-৯৫) সাক্ষী হন, যা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে আদিবাসীদের অধিকার পুনরুদ্ধারের কাজ করছিল। আদিবাসীদের সংকটগুলি তরুণ বিরসার মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। আদিবাসীদের অধিকার-আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে পরবর্তীতে তিনি যে পদ্ধতি নিয়েছিলেন, এই জীবন-অভিজ্ঞতাগুলো তাকে পুষ্ট করেছিল।

লোকগাথা অনুযায়ী, বিরসা একসময় বজ্রাহত হন এবং তাঁর মুখটা জ্বলে উঠে রক্তবর্ণ ধারণ করে। তাঁর অনুগামীদের কথায়, এটাই নাকি সেই মুহূর্ত যখন দেবতারা তাঁকে স্বর্গীয় ক্ষমতা এবং অতিলৌকিক কাজ করার ক্ষমতা প্রদান করে। জনগণ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে দেখে তিনি একজন ধর্মীয় গুরুর রূপ পরিগ্রহ করেন— “ভগবান” বা “ধরতি আবা” (পৃথিবীর পিতা)— এবং সংকটাপন্ন আদিবাসী সমাজের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি হিন্দুধর্ম, খ্রিস্টধর্ম এবং মুন্ডা বিশ্বাসের সমন্বয় ঘটিয়ে নিজস্ব ধর্মীয় নীতি ও প্রার্থনা পদ্ধতি তৈরি করেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের এই জনসমর্থনকে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রবাহিত করেন এবং কৃষিসংকটগুলি, যা সেই সময়ে মূর্ত হতে শুরু করেছিল, তার সমাধানে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সর্দারি লড়াইয়ের আন্দোলনকারীরা ততদিনে দীর্ঘসূত্রী প্রাতিষ্ঠানিক অহিংস পদ্ধতিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। বিরসা তাঁদের নতুন আশা জাগালেন। ছোটনাগপুরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সর্দারি লড়াই আন্দোলনের বহু কর্মী, প্রচুর খ্রিস্টান, ওঁরাও এবং খরিয়া-রা বিরসার সঙ্গে যোগ দিলেন। তাঁর “দৃঢ়” অনুগামীরা ভূমির অধিকারের প্রশ্নে অনমনীয় ছিলেন।[9] এইভাবেই বিরসাকে একজন গণনেতায় রূপান্তরিত হলেন।

 

শত্রু-চিহ্নিতকরণ

সর্দারি লড়াই আন্দোলনের সমর্থন থাকলেও বিরসা নিজস্ব স্বকীয়তায় আবির্ভূত হন। তিনি বিদ্যমান আন্দোলনটিকে তিনটি উপায়ে বৈপ্লবিক করে তোলেন:

এক. দিকু চিহ্নিতকরণ: বিরসা সরাসরি সমস্ত বহিরাগত— ঔপনিবেশিক, মিশনারি, জমিদার এবং অন্যান্য শোষকদের ‘দিকু’ বা আদিবাসীদের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করেন। সর্দারি লড়াই-এর নেতাদের থেকে এই পদক্ষেপ লক্ষণীয়ভাবেই পৃথক। সর্দারি লড়াই-এর নেতারা বরাবরই, প্রথমদিকে তো প্রকাশ্যেই, ছোটনাগপুরের রাজার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতেন। এই রাজাই ছিলেন জমিদারি ব্যবস্থার প্রতীকস্বরূপ। তাঁরা ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ এবং মিশনারিদের থেকেও দূরত্ব তৈরি করতে ততটা আগ্রহী ছিলেন না।

দুই. সশস্ত্র প্রতিরোধ: সর্দারি লড়াই-এর নেতারা বহু বছর ধরে প্রাতিষ্ঠানিক অহিংস বিক্ষোভ প্রদর্শনই চালিয়ে গেছেন। যদিও আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় তাঁদের এই আন্দোলনের ফলে আধাখেঁচড়া সরকারি প্রতিক্রিয়া এবং অফিসিয়ালদের পাথুরে উদাসীনতা ছাড়া আর কিছুই জোটেনি। বিরসা কিন্তু তাঁর অনুসারীদের সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্য সংগঠিত হওয়ার আদেশ দিলেন।

তিন. মুন্ডা দিশুম: সর্দারি লড়াই-এর নেতারা “মুন্ডা রাজ” নামে একটা ফাঁকা আওয়াজ দিলেও, বিরসা সে-জায়গায় ‘মুন্ডা দিশুম’ বা একটি স্বাধীন দেশের ধারণা আনলেন, যেখানে সমস্ত দিকু উপাদানকে, এবং তাদের সবার ধাত্রীস্বরূপ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে উৎখাত করা হবে।

এই দৃঢ় ধারণা মনে নিয়ে বিরসা আদিবাসীদের বন্ধু ও শত্রুদের চিহ্নিত করেছিলেন। শত্রুদের চিহ্নিত করা হয়েছিল একেবারে স্থানীয় ভাষায়— “রাজা, হাকিম, জমিদার, খ্রিস্টান এবং সমসার (অ-খ্রিস্টান)”। বিরসা তাঁর অনুগামীদের এদের ওপর আক্রমণ হানতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।[10] এটিকে যদিও জাতিগত বা ধর্মীয় নির্মূলীকরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু ঘটনা তা নয়। এই লক্ষ্য নির্ধারণের নীতিটা ছিল কে সরাসরি শোষক বা শোষণের উৎস। যেসব অ-আদিবাসী দরিদ্র মানুষ আদিবাসীদের মতোই দিন-আনি-দিন-খাই জীবন কাটাতেন তাঁদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে তাঁদের কোনও ক্ষতি হবে না। একইভাবে, খ্রিস্টান আদিবাসী, যাঁদের প্রথমে মিশনারিদের এজেন্ট ভেবে তাঁদের ওপরেও কিছু আক্রমণ চালানো হয়— তাঁদেরকেও পরে ভয় না করতে বলা হয়েছিল।[11]

জমিদাররা, যারা চিরাচরিত শোষক, তারা সবচেয়ে ঘৃণ্য শত্রু হিসেবে পরিগণিত হয়। ছোটনাগপুরের রাজা বিবেচিত হন গ্রামসমাজের প্রধান মানকি মুন্ডার ক্ষমতার অন্যায় দখলদার হিসেবে। রাজার এই ক্ষমতাভোগের প্রতিলিপিটি তাঁর দেবালয় চুতিয়া মন্দিরে রক্ষিত আছে এই বিশ্বাসে ১৮৯৭ সালে জেল থেকে বেরোনোর পর বিরসার নেতৃত্বে প্রথম আক্রমণটি হয় এই মন্দিরে এক মধ্যরাতে। বিরসা ব্রিটিশ শাসকদেরও আক্রমণ করেছিলেন। কারণ তারাই ছিল প্রধান শত্রু এবং জমিদার এবং অন্য দিকুদের পৃষ্ঠপোষক। খ্রিস্টান মিশনারিদেরও ঔপনিবেশিক শাসকদের সঙ্গে একই গোত্রে ফেলা হয়, স্লোগান দেওয়া হয় “টোপি টোপি এক টোপি”, অর্থাৎ টুপি পরা শ্বেতাঙ্গরা সব একজাতের।[12] বিরসা অনুভব করেছিলেন অফিসিয়ালদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সখ্যতা থাকলেও মিশনারিরা কখনও আদিবাসীরা যাতে ন্যায়বিচার পায় সে নিয়ে কোনও উদ্যোগ নেয়নি, বরং তারা গ্রামে বিরসার কাজকর্মের খবর দিত কর্তৃপক্ষকে।[13] ফলে, মিশনারি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে একযোগেই আক্রমণ করা হয়।

 

এক নতুন যুগের সূচনা

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের বিপরীতে আদিবাসীদের চিরাচরিত অস্ত্র কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারলেও উলগুলান সংগঠনে বিরসার মেজাজ এবং পদ্ধতি আদিবাসীদের পক্ষ থেকে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছিল, এবং তারা সেটার গুরুত্ব বুঝেওছিল। বিরসার শুরুর দিকের আক্রমণের পরই ব্রিটিশ সরকার ‘বেথবেগারি’ (বাধ্যতামূলক শ্রম) বন্ধের জন্য কম্যুটেশন অ্যাক্ট, ১৮৯৭ কার্যকর করে। এর পরবর্তী ধাপ ১৮৯৯ সালে বিরসার দ্বিতীয় দফার আক্রমণের পর। প্রথমে ছোটনাগপুরের সার্ভে এবং সেটলমেন্ট করা হয়, এবং তার পরে ১৯০৮ সালে ‘ছোটনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯০৮’ (CNT Act) প্রবর্তিত হয়, যা আদিবাসীদের সুরক্ষায় একটি ‘ম্যাগনা কার্টা’ হিসেবে পরিচিত।[14]

অদ্ভুতভাবে, ঔপনিবেশিক সরকার যখন কাজ করা শুরু করল সারওয়াড়াতে থাকা বিরসার একজন জাতশত্রু জেসুইট মিশনারি জেবি হফম্যান আসরে নেমে পড়লেন। মুন্ডা ভূমিব্যবস্থা এবং সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর এক দশকের বেশি অভিজ্ঞতা ছিল।[15] হফম্যানকেই সরকার বিশেষজ্ঞ পরামর্শদাতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁকে ওই এলাকায় কয়েক শতাব্দী ধরে প্রচলিত মুন্ডা ভূমিব্যবস্থা অনুসারে CNT Act, ১৯০৮-এর খসড়া তৈরি করারও দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বিরসার সংগ্রামের ফলে সৃষ্ট এই পরিবর্তন আদিবাসীদের মনে এই বিশ্বাস তৈরি করে যে জমির প্রশ্নটি এখন মীমাংসিত। উলগুলানের ফলে এই এলাকার প্রশাসনিক বিস্তারও ঘটানো হয়। এর ফলে শিক্ষার ভিত্তিতে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হয়, যা শিক্ষাগ্রহণের জন্য আদিবাসীদের উৎসাহিত করে। এর ফলে আদিবাসী উন্নয়নের এক নতুন যুগের সূচনা হয়। বিরসা মুন্ডা এবং তাঁর সময়কাল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আদিবাসী সক্রিয়তার এক অনন্য নজির। তখনও পর্যন্ত যে আঁধারে থাকা “আদিম” আদিবাসী মননের ধারণা প্রচলিত ছিল, এ তার চেয়ে স্পষ্টতই ভিন্ন। এই প্রাণশক্তি আদিবাসীদের শুধু প্রতিবাদের বিভিন্ন ধরন আয়ত্ত এবং সে-সব নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতেই উদ্বুদ্ধ করেনি, প্রচলিত প্রাধান্যকারী ধারণাগুলিকেও প্রভাবিত করেছিল। মূলগতভাবেই বিরসার বিদ্রোহ ছিল উপনিবেশ-বিরোধী এবং ঔপনিবেশিক শাসনে ধ্বংসপ্রাপ্ত আদিবাসী সমাজকে পুনর্গঠনের একটি প্রচেষ্টা।

 

তথ্যসূত্র:


[1] চন্দ্র, ২০১৬।
[2] শাহ, ২০১৪:৩।
[3] অনামী, ১৯১১: ৫৪৫; ও’কোনর ১৯০১।
[4] তিরু ১৯৪৯; হফম্যান এবং এমেলেন ২০১৫:৫৭০।
[5] ঘুরিয়ে, ১৯৪৩।
[6] বরা, ২০০৯।
[7] চন্দ্র, ২০১৬:২।
[8] দে, ২০১৯।
[9] হফম্যান এবং এমেলেন ২০১৫:৫৬৭।
[10] অনামী, ১৯১১: ৫৪৯।
[11] হফম্যান, ১৯০০।
[12] দ্রষ্টব্য, টীকা ৯।
[13] দ্রষ্টব্য, টীকা ১১।
[14] ফ্রেজার, ১৯০৮।
[15] এই বিষয়ে জেবি হফম্যানের গভীর আগ্রহের ফলে তিনি আর্থান ভ্যান এমেলেন-এর সঙ্গে যৌথভাবে ১৬টি ভল্যুমের এনসাইক্লোপিডিয়া মুন্ডারিকা প্রকাশ করেন। এতে মুন্ডা সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকের হদিশ পাওয়া যায়।


*নিবন্ধটি ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি (এনগেজ), ভলিউম ৫৫, সংখ্যা ৩০-এ গত ২৫ জুলাই, ২০২০-তে ইংরেজিতে প্রকাশিত।