Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

স্বৈরতন্ত্র ও শিল্প। আলাপের তিন মিনিট

অনিতা অগ্নিহোত্রী

 


আমরা, এই সময়ের ভারতীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা, যে-কোনও সময় পেতে পারি শাসকের ফোন, বা নাও পেতে পারি। শাসক বসে আছে, আমাদের সামনে আয়না ধরবে, নৈতিকতা যাচাই করে মজা পাবে! না পেলেই যে সব নিশ্চিন্ত, শান্তিময়, তাও তো নয়। ক্ষমতার বাস্তুতন্ত্রের একটি কালচে ছায়া এখন ঝুলে আছে আমাদের কাজের টেবিলের উপর

 

তিন মিনিটের একটি ফোন। ১৯৩৪ সালের জুন। ফোনের দু-প্রান্তের কথাবিনিময়ের প্রসঙ্গ হয়ে উঠল একটি উপন‍্যাস, যাতে নথিভুক্ত তথ‍্যের সঙ্গে মিশে গেল কল্পনা আর স্মৃতিরঞ্জিত ইতিহাস। তিনটি মিনিটের পুনর্নির্মাণ হয়ে উঠল এক চিরকালীন আখ‍্যান। একটু আগেই গ্রেপ্তার হয়েছেন কবি ম‍্যান্ডেলস্ট‍্যাম। জোসেফ স্ট‍্যালিন ফোন করছেন অন‍্যতম রাশিয়ান লেখক ও গদ‍্যকার বরিস পাস্তরনাককে, এই বিষয়ে আপনার কি মত কমরেড পাস্তরনাক?

উপন‍্যাসের লেখক ইসমাইল কাদারে। চলে গেছেন ২০২৪-এর জুলাই মাসে। আলবেনিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত কবি ও ঔপন্যাসিক। পাহাড়ি শহর জিরোকাস্টারে জন্ম। পড়াশোনা করেছেন টিরানা ও মস্কোর গোর্কি ইনস্টিটিউটে। তাঁর উপন‍্যাসগুলি বহু ভাষায় অনূদিত হয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে পৌঁছে গেছে। একনায়কতন্ত্র, তার স্বভাব ও পরিণতির অনুসন্ধান তাঁর লেখার এক প্রবল সুর, যেমন যুদ্ধ আর তার পরিণতির কথাও। আশ্চর্য নয় যে কাদারেকে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে হয়েছিল ফ্রান্সে। দীর্ঘদিন টিরানা ও প‍্যারিস দুই ঠিকানাতেই ছিলেন তিনি। ইসমাইল কাদারের উপন্যাস আ ডিকটেটর কলস (একজন একনায়কের ফোন) তিন মিনিটের এক ফোনকলকে পরিণত করেছে স্বৈরতন্ত্র ও সৃজনশীলতার সম্পর্কের আখ‍্যানে।

 

বইটি আমার দিল্লির ঠিকানায় তাকে আছে বছর দুয়েক আগে থেকেই। বইমেলার কলতান থেকে দূরে বসে মনে হল, এখনই সময়, বইটি পড়ার। দূর থেকে চেনা পরিবেশের অনেক বুনট, নকশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বৈরতন্ত্র কেমন? আমাদের গণতান্ত্রিক অধ‍্যবসায়ে সে কি এমন গোপনে মিশে গেছে যেন ফুলের বাসরে কালসাপ, আমরা তাকে দেখেও ঠিক চিনতে পারছি না? আমরা গড়পড়তা বাঙালি বা ভারতীয় লেখক, আমরা কি তাহলে ততটা স্বাধীন নই, যতটা নিজেদের মনে করি?

দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ‍্যবর্তী সময়ে য়ুরোপ ও রাশিয়ায় অনেক ভাঙাগড়া চলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানিকে পরাজিত করে মিত্রশক্তির সম্মিলিত জোট। ১৯৪১-এ জার্মানির আক্রমণের পর সোভিয়েত রাশিয়াও মিত্রশক্তির অংশ হয়ে ওঠে। স্ট‍্যালিনের রাশিয়া বিপুল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ‍্যমে কৃষি ও শিল্পে উন্নয়ন এনেছিল। একই সঙ্গে স্ট‍্যালিনের গ্রেট পার্জ-এর কাল, গুলাগে নির্বাসন, নির্মাণ করেছিল স্বৈরাচারী শাসকের সমস্ত পদচিহ্ন, নিজের দেশের মানুষের জীবনের বিনিময়ে রাশিয়া হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী দেশ।

সে-সব কথা লেখা হয়েছে নানা বিশিষ্ট লেখকের কালজয়ী কলমে। লিখেছেন আলেকসান্দার সোলঝেনিৎসিন, মিখাইল বুলগাকভ, ভাসিনি গ্রসম‍্যান। স্ট‍্যালিনের রাশিয়া আজ ইতিহাসের অংশ।

আপাতদৃষ্টিতে সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে উন্নয়নশীল ভারতের সামাজিক গণতন্ত্রের কোনও মিল নেই। যদিও দারিদ্র্যের নানা স্তরে রয়ে যাওয়া এই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নয়নের মন্দির তৈরি করার কাজে সাধারণ মানুষের ত‍্যাগের কোনও ইতিহাস লেখা হয়নি। স্বাধীনতার আগে যেমন দীনবন্ধু মিত্রর নীলদর্পণ থেকে জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত‍্যায় রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদ চলেছে পতন অভ‍্যুদয় বন্ধুর পন্থা ধরে; স্বাধীন দেশেও ও বাকস্বাধীনতার উপর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নানাভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। জাতীয় এমার্জেন্সির সময় নির্ভীক সাংবাদিক কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। এছাড়া দেশের নানা প্রান্তে নানা আন্দোলন ও জীবিকার অধিকারের উপর আক্রমণের নানা ঘটনা আমাদের অজানা নয়।

কিন্তু গত একদশকের উপর সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার উপর পরিকল্পিত নানা আক্রমণের ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছে, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের তিরের জোর যেমনই হোক, বাক ও লেখনীর স্বাধীনতায় নিগড় পরানো এক শ্রেণির চিন্তকের অভিপ্রায়। এই চিন্তক সম্প্রদায় সর্বত্র আছেন, শাসনে ও সাধারণে। শাসকবর্গের আশীর্বাদের হাত তাঁদের মাথায়। ক্ষমতা, পেশা যেমন হোক, বুদ্ধির বহর যেমনই হোক, তাঁদের আকাঙ্ক্ষা একইরকম। একটি কেন্দ্রীভূত শাসনব‍্যবস্থার মাধ্যমে দেশকে এক ভাষা এক সংস্কৃতির ছাঁচে ফেলে তার যাবতীয় ভিন্ন স্বর, ভিন্ন অস্তিত্বের উপর দিয়ে বুলডোজার চালিয়ে সমান সপাট করে দেওয়া। একটু বড় করে দেখতে গেলে, রাষ্ট্র আর কর্পোরেট ছাড়া বাকি স্পেসটির অস্তিত্ব নানা বলে কৌশলে অবলুপ্ত করে দেওয়া এঁদের উদ্দেশ্য। তার জন‍্য নাট‍্যদল ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অনুদান বন্ধ করে দেওয়া থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাথায় কোলে কাঁখে এমন সব পরজীবীদের বসানো যাঁরা এঁদেরই মতের প্রতিধ্বনি করতে থাকবেন। স্বাধীন মতপ্রকাশের, চিন্তার বিকল্প অভিব্যক্তির কোনও ঘ্রাণ পেলে ছাত্রছাত্রী থেকে বুদ্ধিজীবীদের নিশানা করবেন, তাঁদের দেশদ্রোহের অভিযোগে বিদ্ধ করে নানা জামিন-অযোগ্য ধারার কেস দায়ের করাবেন। এঁদের ঐক্যবদ্ধ হিন্দু রাষ্ট্রের কল্পনার মধ‍্যে নারী, দলিত ও সংখ্যালঘুদের স্থান পদতলে, কাজেই আশ্চর্য নয় যে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধকারী, দলিতদের নিষ্পেষক ও সংখ্যালঘুদের গণ-লাঞ্ছিত করার অভিযুক্তরা জামিন পেয়ে গর্বে ঘুরে বেড়াবেন ও সাক্ষীদের ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখবেন। অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগে কারাগারে মৃত্যু হবে কেন্দ্রীয় সংস্থা দ্বারা গ্রেপ্তার স্ট‍্যান স্বামীর। দিল্লি রায়টে নানা ধারায় অভিযুক্ত সংখ‍্যালঘু ছাত্র পাঁচ বছরেও জামিন পাবেন না।

কিন্তু কেন্দ্রীয় শাসকের শাসন যেখানে বলবৎ নয়, ভারতের নানা প্রদেশেও ভিন্ন মতের প্রতি অসহিষ্ণুতাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলা কোনও ব‍্যতিক্রম নয়। আরও সংকট, এখানে সব কিছুই রাজনৈতিক। সে রাজনীতি কোনও বৃহত্তর দৃষ্টিকোণের নয়, কেবল নির্বাচনের প্রয়োজনে নিবেদিত। বিপুল ভোটে জিতে এসেও শাসক বিশ্বাস করেন না, নাগরিকবর্গের কোনও স্বতন্ত্র কণ্ঠ আছে। তাদের সঙ্গে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আলোচনা প্রয়োজন। বিপুল দুর্নীতি সত্ত্বেও ক্ষমতায় প্রত‍্যাবর্তন জন্ম দেয় এক অহমিকার। সেখান থেকে মাথা তোলে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা। প্রশাসনে, বিভাগের কাজে, টাকার বণ্টনের ক্ষেত্রে দুর্নীতি-প্রণোদিত স্বৈরাচার একরকমের। কিন্তু চিন্তা ও মননের ক্ষেত্রে তার অভিপ্রায় আশঙ্কাজনক। বাংলায় বসে স্পষ্ট অনুভব করা যায় সাংস্কৃতিক পরিসর চলে গেছে শাসকের দখলে। সেটা অবশ্য সর্বকালের বাস্তব, কিন্তু সাংস্কৃতিক নিয়ামকদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ এতটা দৃশ‍্যমান হয়ে পড়বে কয়েক বছর আগেও ভাবা যেত না। এখন বুদ্ধিজীবীরা সাধারণত নীরব। অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলে যান অবান্তর, হাস্যকর আলোচনায়। শাসকের হাত পিঠে থাকার স্বাচ্ছন্দ্য তাঁদের অভ‍্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। না, এখনও কোনও বড় ভয় নয়। সতর্ক থাকলেই, দুদিকে তাকিয়ে সাবধানে রাস্তা পার হলেই, গন্তব্যে পৌঁছনো যাবে। কিন্তু যদি ভয়ের কারণ ঘটে, ঠেকানো যাবে কি?

 

কথিত আছে স্ট‍্যালিন ফোনে বরিসকে বলেছিলেন, কমরেড ম‍্যান্ডেলস্টাম গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ-বিষয়ে আপনি কি ভাবছেন কমরেড পাস্তরনাক? বরিস পাস্তরনাক কী বলেছিলেন তা নিয়ে নানা ভাষ‍্য আছে। একটি ভাষ‍্য বলে, ভয়ে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন বরিস, বলেছিলেন, আমরা কখনও প্রকৃত বন্ধু ছিলাম না। আমাদের মত আলাদা। কিন্তু আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারা আমার স্বপ্ন। স্ট‍্যালিন নাকি বলেন, আমরা, পুরনো বলশেভিকরা কখনও বন্ধুদের থেকে এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিইনি। আমি অকারণে আপনার সঙ্গে কথা বলছি না। এর পর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নানা তথ‍্য, সাক্ষীদের কথা খুঁজে মিলিয়ে কাদারে পাচ্ছেন পাস্তরনাকের বন্ধু ও অপছন্দের লোকেদের মন্তব্য। কী বলতে চেয়েছিলেন স্ট‍্যালিন? পাস্তরনাক বিপদের ঘ্রাণ পেয়ে বন্ধু লেখককে ত‍্যাগ করতে প্রস্তুত? স্বৈরাচার হয়ে দাঁড়াচ্ছে শিল্পের নৈতিকতার অভিভাবক!

বরিস নাকি আবার ফোন করতে চান স্ট‍্যালিনের নাম্বারে, বলার জন‍্য যে ম‍্যান্ডেলস্টাম সত‍্যি তাঁর তেমন বন্ধু নন, কিন্তু ও-পাশ থেকে সাড়া আসেনি। পরবর্তীতে নির্বাসনে ম‍্যান্ডেলস্টামের মৃত‍্যু বরিসকে গভীরভাবে বিচলিত করেছিল। তাঁর মনে হয়েছিল, চাইলে হয়তো তিনি বন্ধুকে বাঁচাতে পারতেন। এরপরের বার আন্না আখতামোভা আর তাঁর পুত্র লিও গুমিলেভের জীবনরক্ষার জন‍্য স্ট‍্যালিনকে চিঠি লিখতে দ্বিধা করেননি তিনি।

টেলিফোন কথালাপটি ততটা স্ট‍্যালিনকে আতসকাঁচের নিচে আনেনি, যতটা বরিসের নিজস্ব, ভয়, দ্বিধা, শাসকের কাছে নিজেকে নিরপেক্ষ প্রমাণ করবার অসহায়তা ও পরে অনুতাপ। ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে লড়াই করার চেয়ে, নিজভূমিতে অর্জিত স্বাধীনতার পরিবেশে দাঁড়িয়ে নিজেকে স্বভাবে রাখার চেষ্টা অনেক কঠিন। আমরা পুরনো বলশেভিকরা বন্ধুদের ত‍্যাগ করি না, স্ট‍্যালিনের এই কল্পিত উক্তি যেন শাসকের তরফে শিরদাঁড়ার ঋজুতা যাচাইয়ের সাবেক পদ্ধতি। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় লেখকসমাজের ভয় হয়তো প্রকৃত নির্বাসনের নয়, ভুলবোঝাবুঝির ফলে প্রীতিবঞ্চিত হওয়ার, খেতাব, ভাতা, পুরস্কার হারানোর, সর্বোপরি নির্জন, একাকী অস্তিত্বের, চিহ্নিত হয়ে, বর্জিত হয়ে বেঁচে থাকার। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপর্যয় যে আমরা প্রাণ বাজি রেখে লিখতে পারি না। সমকালে দাঁড়িয়ে তার বুকের উপর পা তুলে ইসমাইল কাদারের মতো নিজের জীবন বিপন্ন হওয়া সময়ে পারি না এমন একটি উপন্যাস লিখে ফেলতে যা লেখকের নিজের জীবনের ব‍্যবচ্ছেদ। স্ট‍্যালিনের রাশিয়ায় সাইবেরিয়ায় নির্বাসন থেকে বাধ‍্যতামূলক শ্রম, শাসকীয় অপহরণ ও হত্যার মতো বহু নির্মম ঘটনা ঘটেছে। সেসবকে ঝাপসা চালচিত্রের মতো ব‍্যবহার করে কাদারের উপন‍্যাস তুলে এনেছে এক টেলিফোনকলের মতো আপাত সূক্ষ্ম ঘটনাকে। কারণ নানা তথ‍্য ও কল্পনায় জড়ানো কাহিনির চলনে মনে হয়েছে বরিস নয়, যেন কাদারেই পেরেছিলেন শাসকের সেই ফোন।

 

আমরা, এই সময়ের ভারতীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা, যে-কোনও সময় পেতে পারি শাসকের ফোন, বা নাও পেতে পারি। শাসক বসে আছে, আমাদের সামনে আয়না ধরবে, নৈতিকতা যাচাই করে মজা পাবে! না পেলেই যে সব নিশ্চিন্ত, শান্তিময়, তাও তো নয়। ক্ষমতার বাস্তুতন্ত্রের একটি কালচে ছায়া এখন ঝুলে আছে আমাদের কাজের টেবিলের উপর। ইসমাইল কাদারের বইটি পড়তে বসে আর একা মনে হবে না নিজেকে, স্পষ্ট হবে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের ভাষ‍্য। এ বই পড়তেই হবে, এখন, এইসময়।