Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বাদল সরকারের জন্মশতবর্ষে প্রাপ্তি

শুভেন্দু সরকার

 

অন্য কোনও সৃষ্টিশীল মানুষের শতবর্ষ উদ্‌যাপনে যা সচরাচর ঘটে না, তা চোখে পড়ল বাদল সরকারের বেলায়। সুযোগ পেয়ে বই-পত্রিকা-আলোচনায় কয়েকজন লেখক/বক্তা বিষয়ভিত্তিক আলোচনার পরিবর্তে স্মৃতিচারণার নামে নিজেকেই জাহির করলেন। শুধু তা-ই নয়, উৎসাহ নিয়ে কেউ দেখালেন বাদল সরকারের থিয়েটারের সীমাবদ্ধতা, কেউ ছড়ালেন ব্যক্তিগত কুৎসা, কেউ আবার বোঝাতে চাইলেন বাদল সরকারের যাবতীয় কৃতিত্বর আসল দাবিদার তিনিই। শিল্পের বাণিজ্যিক দুনিয়াকে যে বাদল সরকার বুড়ো আঙুল দেখিয়েছিলেন, এই ফাঁকে তাঁকে নিয়ে খানিক বেওসা করা হল। তবু তারই মাঝে অল্প কিছু সিরিয়াস কাজ নজরে এল— যেখানে বিষয়নিষ্ঠ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সাহায্যে বাদল সরকারের থিয়েটারকে সামগ্রিকভাবে বোঝার চেষ্টা চলল। রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের থিয়েটার ছাড়িয়ে: বাদল সরকার (বহুস্বর, ২০২৬) তেমনই একটি নমুনা। রামকৃষ্ণবাবুর অগ্রন্থিত আঠেরোটি নিবন্ধের মরণোত্তর সঙ্কলন এই বই। বাদল সরকারের মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিবন্ধগুলি বেরোয়। বলা যায়, বাদল সরকারের নাটক পড়া/দেখার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর সেসব নিয়ে নিজের অভিমত জানিয়েছেন রামকৃষ্ণবাবু। বেশ কিছু তুলনায় কম আলোচিত দিকের পাশাপাশি এখানে হদিশ দেওয়া হয়েছে কীভাবে বাদল সরকারের কাজ থিয়েটার পেরিয়ে সাধারণভাবে পাঠক/দর্শকের জীবনে প্রেরণা জোগায়।

তৃতীয় থিয়েটারের পেছনে যে দার্শনিক ভাবনা কাজ করে— টাকা-পয়সার বেড়া ভেঙে খেটে-খাওয়া মানুষের কাছে দিনবদলের স্বপ্ন চারিয়ে দেওয়া— তা-ই হল বাদল সরকারের স্থায়ী অবদান। ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েও ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে প্রসিনিয়াম ছেড়ে অঙ্গন ও মুক্তমঞ্চকে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। কার্জন পার্ককে (সুরেন্দ্রনাথ উদ্যান) কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক বিকল্প নাট্য আন্দোলন। সেখানে যোগও দেয় অন্যান্য দল। ধীরে ধীরে অবশ্য সেই উদ্দীপনায় ছেদ পড়ল। রামকৃষ্ণবাবু লিখেছেন,

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিল ভাঁটার টান। হাতে হাতে ফল না পেয়ে কিছু নাট্যদল ফিরে গেল প্রসেনিয়াম মঞ্চর চেনা আশ্রয়ে, কেউ দু নৌকোয় পা রাখল।

শতাব্দী কিন্তু কোনো আপসে গেল না; গেল না আরও কয়েকটি দল। গ্রামে গিয়ে নাটক করা ছাড়াও কলকাতা ও শহরতলিতে তাদের কাজ চলল। কোনো লোভের কাছে মাথা না নুইয়ে অনমনীয় রইলেন বাদল সরকার। (পৃ. ১৫)

এমনভাবেই বাদল সরকারের মূল্যায়ন করেছেন রামকৃষ্ণবাবু। তাঁর কাছে বাদল সরকার ছিলেন এক ম্যারাথন দৌড়বাজ। স্রেফ অনুকূল সময়ে নয়, চূড়ান্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও এমন লক্ষ্যমুখী শিল্পী একক ও নিরলসভাবে নিজের কাজ করে চলেন। বাদল সরকারের কাজের তাৎপর্যকে এভাবেই দেখেছেন রামকৃষ্ণবাবু। তাই তিনি বলেন,

অঙ্গনমঞ্চর সঙ্গে যাঁদের যোগ শুধু দর্শক হিসেবে, নিজের কাজের ক্ষেত্র আলাদা, তাঁদের কাছে এই অনমনীয়তাই বাদল সরকারের প্রধান উত্তরাধিকার। (পৃ. ১৫)

বলতে বাধা নেই, থিয়েটারের দুনিয়া পেরিয়ে বাদল সরকারের অবদান নিয়ে এমন মন্তব্য খুবই জরুরি।

এ-ও মনে রাখা দরকার, তৃতীয় থিয়েটারের দর্শনের পাশাপাশি তার শিল্পগত দিক নিয়েও রামকৃষ্ণবাবু ছিলেন সমান উৎসাহী। দেশ-বিদেশের চিরায়ত সাহিত্যকর্ম কোনও জাঁকজমক ছাড়াই অঙ্গন/মুক্তমঞ্চে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এসব নাটকের ধরন যেমন আলাদা, তেমনি এখানে অভিনেতারা প্রস্তুত হন নাট্যশিক্ষাশিবিরের মাধ্যমে। সবমিলিয়ে তৃতীয় থিয়েটারের ঘরানা কোনওভাবে প্রসিনিয়ামের সঙ্গে মেলে না। তাই পাঠককে রামকৃষ্ণবাবু স্মরণ করিয়ে দেন যে,

তৃতীয় থিয়েটরকে যাঁরা মাদারি কা খেল বলে ব্যঙ্গ করেন, ‘অ্যামেচারিশ’ ধরে নিয়ে নাক সিঁটকোন, আর এই থিয়েটর-এর প্রজোযনা না-দেখেই যাঁরা এসব কথায় সায় দেন, থিয়েটারের ভাষা তাঁদের চোখ খুলে দেবে। সময়ের দাবি মেনে বাদল সরকার এখানে এক নতুন নন্দনতত্ত্ব হাজির করেছেন। সে-নন্দনতত্ত্ব পেছন ফিরে তাকায় না, চোখ রাখে সামনের দিকে। নাটকের সঙ্গে যুক্ত না-থাকলেও সমাজ-সচেতন সকলেরই বইটি পড়া উচিত। (পৃ. ২৩)

বাদল সরকারের নাট্যতত্ত্ব ও প্রয়োগের অভিঘাত থিয়েটারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর কাজের দার্শনিক ভিত্তি অন্যদেরও পথ দেখায়। দেশ-কাল-পরিস্থিতি অনুসারে নিজস্ব থিয়েটারের খোঁজ করেন বাদল সরকার। এমনকি, সময় ও অভিজ্ঞতার নিরিখে তিনি নাট্যশৈলীর অদলবদলও ঘটান। তাঁর নাট্যশৈলী একান্তই গতিশীল— নাটকের বিষয়বস্তু, অভিনয়ের রীতিনীতি, দর্শকের সঙ্গে অবাধ যোগাযোগের ভিত্তিতে তাতে নানারকম পরিবর্তন করা হয়। এমন কথা অবশ্য নাট্য আন্দোলন নয়, বহাল ব্যবস্থা পাল্টানোর জন্যে যে-কোনও আন্দোলনের বেলায়ই খাটে। কোনও আন্দোলনকে বিছিন্ন না রেখে বরং একটি সামগ্রিক জীবনদর্শনের সূত্রে অন্য প্রগতিশীল ধারার সঙ্গে মেলানো বেশি জরুরি। আলাদা-আলাদা কাজের ক্ষেত্র হলেও লক্ষ্য এক রাখাই হল সমাজবদলের পূর্বশর্ত। আবার এও সত্যি যে, নিজের কাজের এলাকা যা-ই হোক, গতিময়তা ও নমনীয়তাকে মান্যতা দেওয়া নিতান্ত প্রয়োজন। তাই বাদল সরকারের শিক্ষা নিয়ে রামকৃষ্ণবাবুর মত হল,

সব মিলিয়ে ব্যাপারটি দাঁড়ায় এই লক্ষ্য-র ব্যাপারে কোনো আপস করা হবে না; আগে থাকতে ঠিক করা কোনো মত নিয়ে চলা হবে না; বরং আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকেই ক্রমাগত আত্মসমীক্ষা করে এগিয়ে চলতে হবে। নাটক ছাড়া যাঁদের কর্মক্ষেত্র অন্য কিছু, হতে পারে তা ব্যাপক অর্থে সমাজ-সংসারকে বদলে দেওয়ার জন্যে লড়াই, হতে পারে আরও সীমিত লক্ষ্যে অধিকার রক্ষা বা নতুন অধিকার অর্জন— বাদল সরকার-এর থিয়েটারের ভাষা তাঁদেরও দিকনির্দেশের কাজ করবে। (পৃ. ২৫)

এভাবেই ব্যাপক অর্থে বাদল সরকারের অবদানের মূল্যায়ন করেছেন রামকৃষ্ণবাবু।

 

তৃতীয় থিয়েটারের তত্ত্ব ছাড়া এই বইয়ে এসেছে বাদল সরকারের কয়েকটি মঞ্চনাটকের প্রসঙ্গ। সেখানে অবশ্য বিষয়বস্তু নয়, নাটকের রচনাশৈলীই রামকৃষ্ণবাবুর আলোচনার আধার। তিনি মূলত বেছে নিয়েছেন বল্লভপুরের রূপকথা, কবি কাহিনী আর রাম শ্যাম যদু-র মতো কমেডি। বল্লভপুরের রূপকথা-র মূল আখ্যানের শুরু ও শেষের আগে-পরে দর্শকের উদ্দেশে কিছু তথ্য জানানোর জন্যে চরিত্রকে হাজির করার কৌশল গল্প-উপন্যাসেও দেখা যায়। কিন্তু পার্থ্যক্য এক জায়গায়। গল্প-উপন্যাসে সংলাপ ছাড়াও আসে বিবরণ; নাটকের বেলায় ভরসা স্রেফ সংলাপ। কথাসাহিত্যর সঙ্গে নাটকের ফারাক ঠিক কোথায়— তা বোঝাই ছিল রামকৃষ্ণবাবুর আসল উদ্দেশ্য। তার খেই ধরে উদাহরণ হিসেবে বাদল সরকারের নাটকগুলি আসে। রামকৃষ্ণবাবু সিদ্ধান্ত করলেন,

তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াল এই রকম — গল্প আর নাটকের মূল তফাত এইখানেই। গল্পর নাট্যরূপ দিতে হলে বিবরণকে ভাঙতে হয় সংলাপে। অন্তত দুজনের মুখে সেই বিবরণকে আলাদা-আলাদা করে বসাতে হয়। তেমনি নাটকের গল্পরূপ দিতে হলে বাদ দিতে হয় অনেক সংলাপ, আর একাধিক চরিত্রর সংলাপকে একজনের মুখ দিয়ে বলাতে হয়। (পৃ. ৪১)

নাটক আর কথাসাহিত্যের ফারাক-প্রসঙ্গেই এল নাটকের মঞ্চনির্দেশের কথা। সেখানে পরিচালক/অভিনেতাকে কিছু নির্দেশ দেন নাট্যকার। কিন্তু কখনও-কখনও তা গল্প-উপন্যাসের বিবরণের সমান হয়ে ওঠে। গল্পকার/ঔপন্যাসিকের ঢঙে বার্নার্ড শ-র মতো বাদল সরকারও মঞ্চনির্দেশে চরিত্র ও পরিস্থিতি নিয়ে নানা চমকপ্রদ মন্তব্য করে চলেন। দর্শক নন, সেগুলির মজা অবশ্য পাঠকই পান। এই সূত্রে কমেডির পাশাপাশি এসেছে সারারাত্তির-এর প্রসঙ্গ। তবে রামকৃষ্ণবাবু আঁর আলোচনায় কবি কাহিনী-র নানা দিক একাধিকবার হাজির করেন— সে নাটকটির সামাজিক বার্তাই জন্যেই হোক বা সংলাপের ধরন-ধারণ।

এই বইয়ের বাড়তি পাওনা হল, বাদল সরকারের অনুসারী দল ‘পথসেনা’-র দুটি প্রযোজনা— মহাজ্ঞানী আর কিসসা ধনুয়া কা— নিয়ে লেখা। তৃতীয় থিয়েটার যে বাদল সরকারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, অন্যরাও যে মনে-রাখার মতো কাজ করেছেন— তা-ই জানিয়েছেন রামকৃষ্ণবাবু। পথসেনার সুমিত বিশ্বাস ও দুলাল করের গল্পর নাট্যরূপ দেওয়ার কৌশল প্রশংসার দাবি রাখে। বিশদে তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে এখানে। এছাড়া এসেছে বার্নার্ড শ আর দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মঞ্চনির্দেশ আর হেনরিক ইবসেন-এর আ ডলস হাউস-এর দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদ নিয়ে মতামত।

তৃতীয় থিয়েটার যে আদতে একটি গণআন্দোলন— এ-কথা অনেকেই খেয়াল রাখেন না। অনেক আলোচনা তাই স্রেফ থিয়েটার-কেন্দ্রিক থেকে যায়। আবার থিয়েটার নিয়ে আলোচনায় আঙ্গিকের দিকটি হামেশা হয়ে পড়ে গৌণ। বিশেষ করে মঞ্চনির্দেশ নিয়ে কথা কেউই বলেন না প্রায়। এসব ফাঁক ভরানোই ছিল রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যর প্রধান উদ্দেশ্য। সেইজন্যে সাহিত্য সমালোচক থেকে সমাজকর্মী— সকলের কাছেই থিয়েটার ছাড়িয়ে: বাদল সরকার গুরুত্বপূর্ণ।