প্রতীক
ছাদটা যে এত বড় হয়ে গেছে সেটা সন্দীপ আগে খেয়াল করেনি। ফ্ল্যাটটা যখন কেনা হল, ঘরগুলো ছোট হয়ে গেল বলে মন খুঁতখুঁত করছিল তার। কী করা যাবে! সাধকে তো সাধ্যের অধীন হতেই হয়। ঘর নিয়ে বাবার কোনও বক্তব্য ছিল না, কিন্তু প্রথমবার ছাদে এসে ব্যাজার মুখ করে বলেছিল, আরেকটু বড় হলে একটু বাগান করতাম। সবুজগ্রামের ভাড়াবাড়ির চেয়ে, তার উঠোনের বাগানটার জন্যেই শোক বেশি ছিল বাবার। বাড়িওলা মনোতোষ ঘোষ রেলে ঘুষ খেয়ে লাল হয়ে গেছেন সবাই জানে। তবু বাবার চোখে উনি ভালো মানুষ, কারণ বাবাকে উঠোনে বাগান করতে দিয়েছিলেন। ছাদের সীমাবদ্ধতা অবশ্য বাবাকে থামাতে পারেনি, ঠিক বাগান করে ফেলেছিল। এরকম বর্ষায় ছাদে এলে মনে হত এটা কলকাতা শহর নয়, কোনও বনবীথি। অবশ্য আলিপুরের হর্টিকালচারও হতে পারে। অন্তত যেদিন রিয়া এসে মুখে এক অলৌকিক স্মিত হাসি নিয়ে কী একটা সুর ভাঁজতে ভাঁজতে ভিজেছিল এই ছাদে, সেদিন তা-ই মনে হয়েছিল সন্দীপের। যেন শঙ্খবেলা-র সেই দৃশ্য— মাধবী গাইছেন আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে, আর উত্তমকুমার উপভোগ করছেন। তবে সেদিন সন্দীপের যতই ইচ্ছে থাক রিয়ার সঙ্গে হৃদয় চিরঋণে জড়াতে, রিয়ার আছে কিনা সে ব্যাপারে ভরসা করে উঠতে পারেনি। মেয়েদের ব্যাপারে সন্দীপের সেই চিরকালীন ক্যাবলামি। আর কোনও ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসের অভাব হয় না, কিন্তু মেয়েদের ব্যাপারে নিজেকে অভাজন ভাবার স্বভাবটা…। বাবার কিন্তু কোনও সংশয় ছিল না। রিয়াকে মোড় থেকে টোটোয় তুলে দিয়ে ফিরে আসতেই বাবা ফিক করে হেসে মাকে বলেছিল, মেয়েটা ভালো। শেষমেশ তোমার ছেলের একটা হিল্লে হল তাহলে, নিরু? নিজের দ্বিধায় সন্দীপ বলেছিল, না না, রিয়া খুব ভালো বন্ধু। আর কিছু না। বাবা একটা ছদ্ম-দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুনুকে জিজ্ঞেস করেছিল, হ্যাঁ রে মান্তু, আজকাল কি মেয়েরা যার-তার বাড়ি গিয়ে আহ্লাদে বৃষ্টিতে ভেজে নাকি? এখন কি এটাই ট্রেন্ডিং? বুড়ো হয়ে গেছি তো, তোদের জেনারেশনের ব্যাপারস্যাপার ঠিক ধরতে পারি না। সন্দীপের মনে হয়েছিল বাবার যুক্তিটা দুর্বল। কারণ ছাদের ওই পশ্চিম কোণটা বাবার হাতের গুণে জুঁই, বেল, টগর, রঙ্গনে এমন হয়ে আছে যে একটা কলকাতার মেয়ে বৃষ্টির দিনে ওখানে এসে পড়লে আনন্দে পাগল হয়ে যাওয়ারই কথা। ওর সঙ্গে সন্দীপের প্রতি তার মনোভাবের কোনও সম্পর্ক নেই। ব্যাপারটা সে ভুলেও গিয়েছিল। মাসখানেক পরে যেদিন রিয়া মায়ের শাড়িটা ফেরত দিতে এল, এসে ছাদে সন্দীপকে কাছে টেনে নিয়ে চুমু খেল, বাবা কে জানে কী করে, না বলতেই সব বুঝে ফেলেছিল। রাতে খেতে বসে বলেছিল, দেখেছিস, বাপের চোখ কাকে বলে? তোকে সেদিনই বলেছিলাম কিনা?
বাবার বাগান সরে যাওয়ায় ছাদটা যে এত শূন্য হয়ে গেছে, সন্দীপের আগে খেয়াল হয়নি। অবশ্য হয়তো একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। স্বাতীর মাস নয়েকের মেয়েটা ছাদের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত টলমল করে হেঁটে বেড়াতে পারছে। গাছগুলো থাকলে পারত না। এইটুকু ফ্ল্যাটের এইটুকু ছাদ, তার মধ্যেও যদি একটা দিক ফুলগাছে ভরে যায়— অন্য ফ্ল্যাটমালিকরা আপত্তি করতে পারে ভেবে সন্দীপ বাবাকে বারণ করেছিল। কিন্তু বাবা সারাজীবন যা করেছে, এক্ষেত্রেও তাই করল। কারও সঙ্গে কোনও বিবাদে জড়াতে চিরকালই ভয় পায়, কিন্তু চুপিচুপি যা করার ইচ্ছে তা করে যায়। একটা-দুটো করে ফুলের টব বসাতে বসাতে কবে যে ছাদের একটা দিক রীতিমতো বাগান হয়ে গেল— সন্দীপও খেয়াল করেনি। যেদিন করল, সেদিনই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। বাবাকে বলতে বাবা অবশ্য পরম নিশ্চিন্তে বলল, তিনতলার চৌধুরীরা কোনওদিন ছাদে ওঠে না। দোতলার গাঙ্গুলির ছেলেটা ওঠে মাঝেমধ্যে, তাও অন্ধকার হলে লুকিয়ে সিগারেট খেতে। আর স্বাতী তো দেখেছে। ও গাছপালা পছন্দ করে। আমাকে তো জিগেস করল, কোত্থেকে চারা কিনলাম, কী কী সার দিই— এইসব। ওর বরটাও ভালো ছেলে। তাহলে আর সমস্যা কী?
আঃ! সন্দীপের জগৎটাও যদি বাবার জগতের মতো এত সহজ হয়ে যেত! সরকার না চাইতেই ডিএ দিয়ে দিত; সহকর্মীদের মধ্যে রেষারেষি থাকত না; টিচার-ইন-চার্জকে তেল না মারতেই এরিয়ারের কাগজপত্র ক্লিয়ার হয়ে যেত; সন্তান চাওয়া নিয়ে রিয়ার সঙ্গে কোনও টানাপোড়েন থাকত না; রাস্তায় গাড়ি আগে সাইড দেবে না অটো, তা নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি থাকত না; বাজারে ১০, ২০ টাকার নোটগুলো চলবে কি চলবে না তা নিয়ে বাকবিতণ্ডা হত না… নাঃ! বাবার জীবনটাকে বেশি সরল করে ভাবা হয়ে যাচ্ছে। নিভে যাওয়া সিগারেটটা আবার ধরাবে বলে পকেট হাতড়াতে গিয়ে সন্দীপের খেয়াল হয়।
—কাকু কেমন আছে গো, স্যান্ডিদা?
দুধের শিশুটাকে কোলে নিয়ে স্বাতী সামনে এসে দাঁড়াল বলে সন্দীপ আর লাইটারটা বার করল না।
—আর তো ভালো হবে না। জানিসই তো।
স্বাতী যে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, সন্দীপ সেটা দেখতে পেল। কিন্তু এসব ব্যাপারে বানিয়ে বলা ওর আসে না।
—না, কিন্তু ইনফেকশনটা সারল বলেই তো ডাক্তাররা বাড়ি আসতে দিল। তাই না?
সন্দীপ হাসল।
—হাসপাতাল থেকে দুটো কারণে ছেড়ে দেয়। এক, রোগ সেরে গেছে। দুই, আর কিছু করার নেই। ডাক্তার তো আর ভগবান নয় যে মৃত্যুকে ফেরত পাঠিয়ে দেবে।
স্বাতীর মলিন মুখটা দেখে নিজের বুকটা আরও ভারি হয়ে যায়। ঠিক তখুনি স্বাতী-অরূপের মেয়ে অকারণে সন্দীপের দিকে তাকিয়ে গোটা দুয়েক খুদে দাঁত বের করে হাসে। সন্দীপ ঝটপট প্রায় অর্ধেক বাকি থাকা সিগারেটটা ছাদ থেকে নিচে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তার দিকে হাত বাড়ায়, সে-ও ঝাঁপিয়ে চলে আসে।
—তোর মেয়েটা… ওই যে আমার মা কী যেন বলে… খুব আদর কাড়তে জানে।
—ডাক্তাররা কি একদমই হাল ছেড়ে দিল? স্বাতী কিছুতেই সন্দীপকে বাবার অবস্থা ভুলতে দেবে না।
মেয়েটাকে দুটো চুমু খেয়ে তার মায়ের কোলে ফেরত দিয়ে সন্দীপ বলল, হাল তো সাত বছর আগেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ রোগ তো ক্রমশ খারাপের দিকেই যায়। ফাইনাল কাউন্টডাউন শুরু হল… এই আর কী। তারপর সিঁড়ির দিকে হাঁটা দেয়।
দুই.
—ক্যান? যামু ক্যান?
…
—আমি যামু না। তোমাদের যাইতে হয় যাও গিয়া।
…
—অ্যাঃ! মাইরা ফ্যালাব। অত সোজা না। আমারও গায়ে কষ কম নাই।
পাশের ঘর থেকে বাবার উত্তেজিত কথাবার্তা অনেকক্ষণ থেকেই শোনা যাচ্ছিল। বাঙাল ভাষা শুনে সন্দীপ ভেবেছিল ফোনে জেঠুমণি, ছোটকা বা পিসির সঙ্গে কথা বলছে। যদিও অত উত্তেজিত হয়ে কোথায় যাওয়ার কথা বলছে, মারামারির কথাই বা উঠছে কেন— এসব নিয়ে একটু উদ্বেগ হচ্ছিল। কিন্তু যে লেখাটা লিখতে সন্দীপ ব্যস্ত ছিল, সেটা জটিল। ফলে ভেবেছিল ফোনটা ছাড়লে পরে জিজ্ঞেস করবে কার ফোন ছিল। ইতিমধ্যে কতটা সময় কেটেছে খেয়াল নেই, লেখাটার জন্যেই পাশের ঘর থেকে উৎপল দত্তের নাটকসমগ্রের ৩ নম্বরটা আনতে গিয়ে দেখে— বাবা পিঠ সোজা করে চেয়ারে বসে দরজার দিকে তাকিয়ে একা একাই বলে যাচ্ছে, বাবায় কইছে, আফসারকাকা লোক ভালো আছিল। তিনি না থাকলে আমাগো জ্যান্ত আসা হইত না। চোখ খোলা থাকলেও সন্দীপকে দেখতে পেয়েছে বলে মনে হল না। সন্দীপ জিজ্ঞেস করল, কী গো! আপন মনে কীসব বলছ? বাবা! তাতেও কিন্তু কথাগুলো থামল না, চলতেই লাগল। বিড়বিড় করে নয়, প্রায় চেঁচিয়ে। সন্দীপ হঠাৎ একেবারে ছোটবেলার মতো ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সেই বাবা যখন যাত্রার পার্ট মুখস্থ করত ঘরে বসে, চরিত্রের আক্রোশ চোখেমুখে ফুটে উঠত, ছোট্ট সন্দীপ দৌড়ে রান্নাঘরে মায়ের কাছে চলে যেত। বাবা হা হা করে হেসে উঠে ডাকত, আরে ভোম্বল, এদিকে আয়। ভয় পেয়ে গেলি কেন? ভীম সাজছি তো, রাগ দেখাতে হবে না? শোন দুঃশাসন, যতদিন না তোর বুক চিরে রক্তপান করছি, ততদিন আমি এক পেয়ালা সুরাও মুখে তুলব না। এইসব চোখ-টোখ লাল করে না বললে কি চলবে? সন্দীপ কিছুতেই মাকে ছেড়ে নড়তে চাইত না, তখন বাবা উঠে গিয়ে চ্যাংদোলা করে নিয়ে এসে খাটের উপর ছুড়ে ফেলত। জামাটা তুলে পেটের মধ্যে ভুড়ড়ড় ভুড়ড়ড় করত, প্রবল সুড়সুড়ি লেগে হাসি পেয়ে যেত, ভয় কাটত। পরে বাবা আর সন্দীপ মিলে বুনুর ছোটবেলাতেও এই কায়দাটা করে প্রচুর হাসিয়েছে।
বড় হয়ে গেলে আর ওভাবে কাউকে হাসানো যায় না। অগত্যা সন্দীপ বাবাকে জোরে জোরে ঝাঁকিয়ে বলেছিল, বাবা, বাবা! কী হল? কী বলছ? ও বাবা! গভীর ঘুম ভাঙিয়ে দিলে মানুষ যেমন প্রথম কিছুক্ষণ কিছুই বুঝে উঠতে পারে না, সেইভাবে ফ্যালফ্যাল করে বাবা তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, কটা বাজে?
মাস্টারি, নাটক, সভাসমিতি করে বাড়িতে বেশিক্ষণ থাকাই হত না। রিয়াই বা কতক্ষণ থাকত? মা আর বোনকে জিজ্ঞেস করে সন্দীপ জানতে পারল— বাবা নাকি প্রায়ই অদ্ভুত অদ্ভুত আচরণ করছে। সন্ধেবেলায় মুড়ি খেতে খেতে হঠাৎ উঠে বারান্দায় চলে যায়, তারপর বিশাল পুকুরটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে— ওই স্টিমার আইতাছে। ভোম্বল, মান্তু, বাস্কোগুলান তোল। বেনারসিখান পরছ তো, নিরু? শ্বশুরের ভিটায় অ্যাদ্দিন পরে যাইতাছ, বিয়ার শাড়িডাই পরা ভালো। স্নান করতে ঢুকেও সময় বেশি লাগে, কারণ শোনা যায়, তারস্বরে কাদের সঙ্গে যেন ঝগড়া করে। মাঝেমাঝেই বাইরে থেকে সন্দীপের মাকে ধমকাতে হয়— কী পাগলামি করছ? বেলা হয়ে গেল। আমরা স্নান করব কখন আর খাব কখন? বেরোও তাড়াতাড়ি। ডাক্তার বন্ধু অরিজিৎকে বলা হয়েছিল। ব্যাপারটা বেশ কিছুদিন ধরে হচ্ছে শুনে ও খুব বকাবকি করল। বলেছিল, এই ধরনের অসুখে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হওয়া খুব খারাপ। অবশ্য অসুখটা ঠিক কী, তা ধরা পড়ার পরে বলেছিল— এ-অসুখ হওয়া আটকানোর কোনও রাস্তা নেই, হলে সারানোরও কোনও উপায় নেই। শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডির মতো অনিবার্য।
তিন.
সন্দীপের যখন গোঁফদাড়ি গজাচ্ছে, তখন থেকেই বাবা বারবার বলত, চাকরিবাকরি পেয়ে আগে একটা নিজের বাড়ি করবি, ভোম্বল। নিজের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই। ওর চে বড় জিনিস নেই দুনিয়ায়। আমার তো জীবনটা পথে পথেই কেটে গেল…
—এমন করে বলো না, যেন সারাজীবন ফুটপাথে থেকেছ, মা বলত। এরকম করে কি কেউ থাকে না নাকি? আমাদেরই তো ছোটবেলা এ-জায়গা সে-জায়গায় কেটেছে। বাবার বদলির চাকরি ছিল, আমরা সাত ভাইবোন সাত জায়গায় হয়েছি। তাতে ক্ষতিটা কী?
বাবা ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারত না ক্ষতিটা কোথায়। মিইয়ে গিয়ে বলত, শিকড় গজায় না তো কোথাও… আমাদের তো শিকড় ছিল, উপড়ে ফেলে দিল। ঢাকা থেকে কলকাতায়। এই আত্মীয়ের বাড়ি, সেই আত্মীয়ের বাড়ি আশ্রিত হয়েই কেটে গেল স্কুল, কলেজ। তারপর যদ্দিনে দাদা সবুজগ্রামের বাড়িটা করল তদ্দিনে বাবা নেই, মা-ও বেশিদিন ভোগ করতে পারল না, আর দাদা মানুষটাও তো বদলে গেল… আবার আমার উদ্বাস্তু জীবন…
—সে তোমার দাদা লোক ভালো নয় তো কী করা যাবে? নইলে সবুজগ্রামের বাড়িটায় তো জায়গার অভাব ছিল না, আর আমারও মানিয়ে গুছিয়ে চলতে আপত্তি ছিল না। দাদা-বউদি মিলে ওরম দুর্ব্যবহার শুরু না করলে…
—ছাড়ান দাও। ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যে। জায়গার অভাব তো দুদিন বাদেই হত। দাদার দুটো ছেলেমেয়ে, এদিকে ভোম্বল আর মান্তু। বড় হলে এদের নিজেদের ঘরদোর লাগে না? লেখাপড়া আছে, বন্ধুবান্ধব আছে… তাছাড়া মনোতোষদার বাড়িতে ছাদটা সুন্দর ছিল, বাড়ির সামনে বাগান করতে দিয়েছিল। কোন বাড়িওলা দেয়?
এই ফ্ল্যাটের খোঁজটা সন্দীপের এমএ ক্লাসের জুনিয়র স্বাতীই দিয়েছিল। আসলে অরূপ শিডিউলড কাস্ট হওয়ায় স্বাতীর বাড়িতে এ বিয়ে মেনে নেবে না জানাই ছিল, তাই ওরা দুজনে আগে ফ্ল্যাট খুঁজে তারপর বাড়িতে বলবে ঠিক করেছিল। সন্দীপ তখন চাকরিটা পেয়েছে বছরখানেক, ফলে হাউজ বিল্ডিং লোনের ঝুঁকিটা অত তাড়াতাড়ি নেবে কিনা ঠিক করতে পারছিল না। স্বাতীর বর অরূপই জোর করল, আরে নিয়ে নাও, দাদা। বাইপাসের ধারে ওই এরিয়ায় পরে যা দাম হয়ে যাবে, আর কিনতে পারবে? তারপর যোগ করল, আর তোমরা কিনলে আমিও একটু নিশ্চিন্ত হই।
—কেন বলো তো?
—বাড়ির অমতে আমায় বিয়ে করছে। তোমরা চোখের সামনে থাকলে ওর অতটা একা একা লাগবে না। বাপের বাড়ির লোক না হোক, পুরনো বন্ধু তো।
যতই নিজের বাড়ির গুরুত্ব বোঝাক, টানা পনেরো-বিশ বছর যে বাড়িতে ভাড়া ছিল সে বাড়ি ছেড়ে, প্রথম যৌবন থেকে যেখানে বাস সেই সবুজগ্রাম ছেড়ে, যেতে হবে ভেবে বাবার যে মনটা খারাপ হয়েছিল সেটা চোখেই দেখা যাচ্ছিল। সন্দীপ তাই একবার ভেবেছিল, থাকগে। বুকিং করব না। কিন্তু বাবাকে বলতেই হাঁই হাঁই করে উঠেছিল— খেপেছিস? এ সুযোগ কেউ ছাড়ে? তোর স্কুল কলকাতায়, নাটক কলকাতায়, মান্তুর কলেজ কলকাতায়। এরপর ওরও চাকরিবাকরি, বিয়েসাদি হয়তো ওদিকেই হবে। সবুজগ্রামে পড়ে থাকলে চলবে? চান্স পাওয়া গেছে যখন, কেটে পড়াই ভালো। তবে ফ্ল্যাট তৈরি হওয়ার সময়ে বাবা, মা, বুনুকে দেখাতে নিয়ে আসতে চেয়েছিল সন্দীপ; বাবা আসেনি। বলেছিল, নিরু, মান্তুকে দেখিয়ে আনিস মাঝেমাঝে। টাইলস, দেয়ালের রং, পর্দা— ওদের পছন্দমতোই করিস পারলে। আমার আর কী? আমার ছেলে নিজের রোজগারে ঘর তুলছে। সে খড়ের চাল হলেও ওখানে গিয়ে মরব, আর প্যালেস হলেও ওখানেই মরব।
ছাদ থেকে নেমে বাবার ঘরে ঢুকে হাজারো নলে ঢাকা ঘুমন্ত শরীরটা দেখে সন্দীপ ভাবে— ভাগ্যিস বাবা অন্তত বছর দেড়েক টের পেয়েছিল যে তার নিজের একখানা বাড়ি হয়েছে! সন্দীপের বিয়েটা তো বুঝতেই পারল না। ফ্ল্যাটে আসার পরপরই যখন দু-চারজন বন্ধুকে ডেকে রেজিস্ট্রি করে স্বাতী-অরূপের বিয়ে হল, তখন কিন্তু সুস্থ ছিল। স্বাতীর প্রথম বাচ্চাটা যখন নষ্ট হয়ে গেল, খবর পেয়ে ওর শ্বশুর-শাশুড়ি এলেও বাবা-মা আসেননি। তখনও ওকে মেয়ের মতো আগলে রেখেছিল সন্দীপের মা আর বাবাই। মনে আছে, স্বাতী একদিন কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, বাবা-মায়ের আশীর্বাদ নিইনি তো, মা বলেছিল— আমাদের দুঃখ দিয়ে কোনওদিন সুখী হবি না। সেই অভিশাপেই এরম হল। বাবা বলল, এ রাম! তুই তো আচ্ছা হাঁদা মেয়ে! বাপ-মায়ের অভিশাপ ছেলেমেয়ের গায়ে লাগে না জানিস না? এই যে ভোম্বল। যা দুষ্টামি করত, আমি তো শাসন করতে পারি না, নিরুই বেদম পেটাত আর বলত— মর, মর। তোর মরণ হয় না কেন? তাইতে কি ও মরে গেছে? বাপ-মা অভিশাপ দিলে উলটা হয়, বুঝলি? মরতে বললে আয়ু বাড়ে আর সুখী হবি না বললে সুখ উপচে পড়ে।
—কী যে বলো, কাকু! এর নাম সুখ?
—জীবন অনেক বড় রে মা। এখন কী এমন বয়স তোর? দেখবি একখান ফুটফুটে মেয়ে হবে। খবর বাপ-মায়ের কানে গেলেই রাগ গলে জল হয়ে যাবে।
খাটের পাশের চেয়ারে বসে পড়ে সন্দীপ হাসে। সেদিন মনে হয়েছিল, ওই সময়ে মেয়েটাকে ওসব মিথ্যে আশা বাবা না দেখালেই পারত। কিন্তু আশ্চর্য! ভবিষ্যদ্বাণীগুলো এত বছর পরে ফলে গেল। গতবছর স্বাতীর মেয়ে হয়েছে খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন ওর বাবা-মা। তারপর থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আজকাল তো নাতনির দেখাশোনা করতে ঠাকুমা, দিদিমা পালা করে এসে থাকেন। যত্ন দেখে সন্দীপের মা বলে, মেয়েটা কপাল করে জন্মেছিল। সন্দীপের নেই, কিন্তু কপাল কথাটায় বাবার খুব বিশ্বাস ছিল। কপাল কি একেই বলে? স্বাতীর কপালে কষ্টের পর সুখ লেখা ছিল, আর বাবার কপালে কেবল কষ্ট? তাই কি এমন একটা অসুখ হল যে সারাজীবন শারীরিক কষ্ট, কাছের লোকেদের দেওয়া মানসিক আঘাত ভোগ করল, অথচ বুড়ো বয়সের সুখস্বাচ্ছন্দ্য টেরই পেল না?
চার.
মেয়েকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাপের বাড়িতেই গিয়েছিল স্বাতী, সব মেয়ে যেমন যায়। কয়েক মাস পরে বউ, মেয়ে এলে তাদের যা যা লাগবে সেসব সেইসময় ক্রমশ সাজিয়ে তুলছিল অরূপ। যে জিনিসটা হয়তো বছরখানেক পরে লাগবে, সেটাও। সন্দীপ খেয়াল করেছে। প্রায়দিনই স্কুলফেরত মেট্রোয় দেখা হয়ে যেত ওর সঙ্গে। সন্দীপ জানতে চাইত স্বাতী আর স্বাতীর ছানা কেমন আছে। অরূপ অনেক কিছু বলত, যার অনেকটাই সন্দীপ কানে ঢোকাত না, কারণ ওসব বেশি শুনতে ভালো লাগত না। মনে পড়ে যেত, এই দিনগুলো নিজের জীবনে কখনও আসবে না। হয়তো নিজের দোষেই আসবে না, হয়তো সন্দীপ যে অরূপের মতো যত্নশীল স্বামী হতে পারে তা রিয়ার বিশ্বাস হয় না— এসব কথা মনে আসত। তবে সেই ভাবান্তর অরূপ টের পেত না। এত বছর থিয়েটার করার সুফল মঞ্চের বাইরেও পাওয়া যায়। তারপর বাড়ি পৌঁছে সন্দীপ বেল বাজালে মা দরজা খুলেই অরূপকে বলত, তোমার ডেলিভারিটা নিয়ে যাও বাবা। অতঃপর বেরিয়ে আসত নানা মাপের বাক্স বা প্যাকেট। থ্যাঙ্ক ইউ, কাকিমা— বলে অরূপ সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা দিতেই সন্দীপ জানতে চাইত, এবারে কী আনালে মেয়ের জন্যে? লাজুক হেসে কখনও জবাব দিত, বেবি কট; কখনও, মেরি গো রাউন্ড; কখনও, ওই যে বাচ্চাকে বুকে বেঁধে নিয়ে ঘোরে…।
স্বাতী যেদিন সন্ধেবেলা মেয়েকে নিয়ে ফ্ল্যাটে এল শেষমেশ, সেদিন উপরে না উঠেই সন্দীপের বাবা-মাকে প্রণাম করতে ঢুকেছিল। ততদিনে বাবা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। চিনতে পারে শুধু নিজের বউ, ছেলে আর মেয়েকে। স্বাতী বলল, কাকু, দ্যাখো তোমার আশীর্বাদে সত্যি সত্যি আমার মেয়ে হয়েছে। নাম রেখেছি শিঞ্জিনী। বাবা একগাল হেসেছিল। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে মান্তু… মান্তু। বুনু লজ্জা পেয়ে বলেছিল, ধ্যাত, এটা স্বাতীদির মেয়ে তো। স্বাতীদিকে চিনতে পারছ না? দোতলায় থাকে। দাদার বন্ধু। বাবা আঙুল দিয়ে দেওয়ালে লাগানো একখানা ছবি দেখাল। সন্দীপের মনে হল, বাবা স্বাতীর মেয়েকে মান্তুর মেয়ে ভাবছে না, মান্তুই ভাবছে। কারণ ছবিটায় আছে হাফপ্যান্ট পরা সন্দীপ আর তার কোলে কাঁথায় মোড়া মান্তু। অত ছোট বুনুকে কোলে নিয়ে তার বালক দাদা যে মোটেই স্বস্তিতে নেই সেটা বেশ পরিষ্কার।
ততদিনে রিয়া চলে গেছে। সন্দীপের অনেকসময় মনে হত, স্মৃতি মুছে যাওয়া ব্যাপারটা নেহাত মন্দ নয়। এই যে বাবার মুখে সবসময় একটা হালকা হাসি লেগেই থাকে, কোনও কোনও মুহূর্তে একটা চওড়া হাসি বেরোয়— তার মানে নিশ্চয়ই বাবার তেতো স্মৃতিগুলো সব মুছে গেছে। শুধু সুখস্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা! আহা! শুধু রিয়ার সঙ্গে আলাপ, পূর্বরাগ, প্রেম, বিয়ে— এসবই যদি থেকে যায় স্মৃতিতে? যদি মুছে যায় পরের বছরগুলো? খারাপ কী? বাবার মাথার ভিতরে উঁকি দিতে পারলে হয়তো দেখা যেত জেঠুমণি, ছোটকা আর পিসির সঙ্গে ছোটবেলায় একটা ডিম চারভাগ করে খাওয়ার স্মৃতি রয়েছে; রাত এগারোটার সময়ে স্ত্রী, পুত্র, কন্যার হাত ধরে অপমানিত হয়ে এক কাপড়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার স্মৃতি নেই। ঢাকা বিক্রমপুরের মাছ ধরা আর গুলতি দিয়ে আম পাড়ার বন্ধু পিন্টু, তার বাবা আফসারকাকার স্মৃতি আছে; দেশভাগের স্মৃতি নেই। সবুজগ্রামের গলাগলি বন্ধু মোহিনীমোহন রায়ের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করার স্মৃতিটা আছে, সে যে টাকাপয়সা মেরে দিয়ে ব্যবসাটা লাটে তুলে দিল— সেই স্মৃতি মুছে গেছে। এইসব সন্দীপ ভাবত আর এ-ডাক্তার সে-ডাক্তারের কাছে ঘুরে বেড়াত। যদি একটু উন্নতি হয়। সব ডাক্তারের কাছ থেকে একই উত্তর আসত।
প্রবল ব্যস্ততায় ছাদে যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এক রবিবার বিকেলে একটু সময় পেয়ে গিয়ে দেখা গেল, বাবার গাছগুলোর অবস্থা কাহিল। বেশিরভাগ ফুল মরে কাগজ হয়ে গেছে, যে কটা গাছের এখনও প্রাণ আছে সেগুলোও ভেন্টিলেশনে। তাদের বাঁচানোর জন্যে যে যত্ন দরকার টানা কয়েকদিন, তা করার সময় না সন্দীপের আছে, না মান্তুর। মায়ের চাপ আর বাড়ানো চলে না। এদিক-ওদিক ঘাড় ঘোরাতে শিখে যাওয়া শিঞ্জিনী না থাকলে হয়ত স্বাতীকে অনুরোধ করা যেত, বাবা তো বলেছিল ওর গাছপালায় আগ্রহ আছে। সবদিক বিবেচনা করে সেদিনই সন্দীপ নিজে হাতে টবগুলোকে বিদেয় করেছিল।
পাঁচ.
সন্দীপ কলেজ থেকে ফিরলে মালতীদি বাবাকে এনে বসিয়ে দিত বৈঠকখানায়। মা মেগাসিরিয়াল দেখত মিউট করে আর বাবা শুনুক-না-শুনুক, বুঝুক-না-বুঝুক; সন্দীপ, তার মা আর বুনু কথা বলে যেত। কোনও কোনওদিন একটু রাতের দিকে অফিস থেকে ফিরে শিঞ্জিনীকে কোলে নিয়ে এসে পড়ত স্বাতী। সন্দীপের চোখের সামনে বাবা যত স্থবির হল, তত সচল হল শিঞ্জিনী। বাবার কথা অস্পষ্ট থেকে অস্ফূট হল, শিঞ্জিনী কতরকম আওয়াজ করতে যে শিখে গেল। কোনটা পছন্দ, কোনটা অপছন্দ; একতলার ফ্ল্যাটের কার কোলে তার কখন চড়তে ইচ্ছে করে— সবই সে গোটাকতক অর্থহীন শব্দ আর হাত-পায়ের ব্যবহারেই বোঝাতে শিখে গেল। তবে সকলকে মাতিয়ে রাখার কাজে হঠাৎ বিরতি নিয়ে মাঝেমাঝে সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকত এই ফ্ল্যাটের সবচেয়ে নীরব লোকটার দিকে। ওইটুকু মেয়ে ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবে আর স্বগতোক্তির মতো কীসব বলে। তারপর একসময় অবধারিত হাসে— শব্দহীন অথচ ভুবনমোহিনী হাসি। সন্দীপ আশ্চর্য হয়ে দেখত, শিঞ্জিনী হাসলেই বাবাও হাসে। যতক্ষণ না হাসে, ততক্ষণ শিঞ্জিনী হাসি ধরে রাখত। বাবা হাসলেই যেন তার কাজ শেষ। আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ত এদিক-ওদিক প্রবল বেগে হামা দিয়ে হানা দিতে। এই নীরব সংলাপের অর্থ বুঝতে ভীষণ ইচ্ছে হত সন্দীপের। আঃ! যদি ফিরে যাওয়া যেত শিঞ্জিনীর বয়সে! আর কারও ভাষা বোঝার দরকার নেই। চারিদিকে এত মানুষ এত কথা বলছে সারাক্ষণ, সেসব বুঝে কী-ই বা লাভ হচ্ছে? সব কথা যে ঠিকঠাক বোঝা যাচ্ছে তাও তো নয়। পণ্ডিতরা তো কবেই ফাঁকিটা ধরে ফেলেছেন। বলেছেন মানুষ কথা বলে নিজের ভাবনা লুকিয়ে ফেলার জন্যে। বরং শিঞ্জিনীর মতো হওয়া গেলে অর্থহীন, মিথ্যে কথায় মগজ ভরাট না করে বাবার মতো একটা ফুরিয়ে আসা মানুষের সারাজীবনের নির্যাস যে কথাগুলো, সেগুলো বুঝে ফেলা যেত।
এবার প্রচণ্ড গরম পড়েছিল ফেব্রুয়ারির শেষ থেকেই। তখন থেকে বাবার বাইরের ঘরে এসে বসাও বন্ধ হয়ে গেল। শিঞ্জিনীকেই কয়েক মিনিটের জন্যে নিয়ে যাওয়া হত বাবার কাছে। ডাক্তার মিত্র বললেন, মন প্রস্তুত করুন। সেই থেকে সন্দীপ তৈরি ছিল। রিয়া এসেছিল মাঝে একদিন। মা-ই একরকম জোর করে দুজনকে ছাদে পাঠিয়ে দিল। সেদিন গরমটা একটু কম। কারণ বিকেলে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, মেঘে মেঘে সন্ধে নেমেছে তাড়াতাড়ি, ভিজে হাওয়া আসছে পুকুরের ওপার থেকে। বোধহয় অন্য কোথাও তখনও বৃষ্টি হচ্ছে। এখন এখানে নামলে আজ আর রিয়ার ভিজতে ইচ্ছে করবে না— এ-কথা যখন ভাবছে সন্দীপ, তখন নীরবতা ভেঙে রিয়া বলল, কাকু আর বেশিদিন নেই, না? পরে সন্দীপ ভেবে অবাক হয়েছে, কেন বহুদিন পরে ঠিক ওই মুহূর্তে তার গান গাওয়ার শখ হয়েছিল। কিন্তু সে গেয়েছিল। যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে/রইব কত আর।
শেষবার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কদিন আগেই মালতীদি বলেছিল, দাদা, মেসোমশায়ের হাত-পা কেমন শক্ত হয়ে যাচ্ছে। এপাশ-ওপাশ কত্তে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে একবারে। ডিসচার্জ করার সময়ে ডাক্তার মিত্রও বললেন, সন্দীপ, বাড়িতে যদি এই হসপিটালের মতো একটা বেডের ব্যবস্থা করতে পারেন… আসলে উনি একদম ইমমোবাইল হয়ে গেছেন তো, নাড়ানো-চাড়ানো পাশ ফেরানো দরকার। বাবাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সেই বেডের সন্ধানে গিয়েছিল সন্দীপ। যখন ফিরল, দরজায় দাঁড়িয়ে ডেলিভারি বয়ের হাত থেকে কী একটা নিচ্ছিল অরূপ। তাকিয়ে হাসল বলে আর কোনও কথা খুঁজে না পেয়ে সন্দীপ জিজ্ঞেস করল, আবার কী কিনলে? মেয়ে তো বড়ই হয়ে গেল প্রায়।
—সেইজন্যেই তো দাদা। একটা ওয়াকার কিনলাম। দাঁড়াতে শিখে গেছে, এটায় বসিয়ে দিলে যদি হাঁটতে শিখে যায় ঝটপট…
বেডটা অবশ্য এক রাতের বেশি কাজে লাগল না। তারপর বাড়িভর্তি লোক, গুচ্ছ গুচ্ছ মিথ্যে কথা, যারা বাবাকে কোনওদিন দেখতে পারত না তাদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন— যেমন হয়।
সৎকার সমিতির গাড়িটা যাবে সামনে; পিছনে নিজের গাড়িতে সন্দীপ, রিয়া আর মান্তু। সন্দীপ নিজেই চালাতে চেয়েছিল, কিন্তু অরূপ বারণ করল। আজকের দিনটা চালিও না দাদা। আমি চালাচ্ছি।
গাড়িটা যখন স্টার্ট নিচ্ছে, দিনের মধ্যে প্রথমবার সন্দীপ শিঞ্জিনীকে দেখতে পেল। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে গেটের মুখে সন্দীপের মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে স্বাতী, স্বাতীর কোলে শিঞ্জিনী। অনাবিল আনন্দে সে হাত নাড়ছে তার চোখে চোখে কথার বন্ধুর গাড়ির দিকে।
তখনই সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলল সন্দীপ। ছাদ খালি রাখা যাবে না। নিজে হাতে টব কিনে এনে আবার সাজাবে সে, যতই পরিশ্রম হোক। সার, জল দিয়ে গাছগুলোকে মানুষ করার জন্যে শিঞ্জিনী তো এসে গেছে।

