দীপ শেখর চক্রবর্তী

হেমন্তদুপুরে ছেলের প্রেমিকা যদি আসে

 

১.

প্রেশারের ওষুধ প্রায়ই খেতে ভুলে যায় মা। তবুও ভোলে না— কতটা ডালেতে নুন, কতটা কীভাবে বঁটিতে চাপ দিলে গোল গোল আলু কাটা হয়। বড় গ্যাসে কড়াই ফুটে যায়, ছোট গ্যাস সহজে জ্বলে না। দোতলায় ছেলে আর ছেলের প্রেমিকা (বেশিদিন নয়), ছিটকিনি দিয়েছে যেভাবে বুকের ভেতরে এক দীঘি জল টলটল করে ওঠে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠে মা, ছাদে কাপড় মেলার বালতিটি দুলে দুলে প্রতিটি সিঁড়িতে জল রেখে যায়। এখানেই সেই অদ্ভুত দৃশ্য— ঝুঁকে পড়ে আঁচলে মুছে নেয় জল প্রতিটি সিঁড়ি থেকে। এই দৃশ্যের ওপর এসে পড়েছে হেমন্তদুপুরখানি। অল্প অল্প ধূপের গুঁড়ো, এক অপরাধী নীরবতা— এসবও পড়েছে। ছাদে মেলে দিতে গিয়ে দেখে সমস্ত কাপড়ের জল কোনও এক অদৃশ্য পথে এসে জমেছে শরীরে। নীচে তাকালে জমির এক ধার ঘেঁষে অল্প বাগান, একখানি রক্তজবা নীরবে ফুটে আছে (রক্তজবা থেকে রক্তের কয়েক ফোঁটা এদিক-ওদিক)। মা জানে— কতটা চাপ দেওয়া হলে হাত কাটে, কতটা চাপ দিলে বঁটিতে কেটে যায় দুপুরের সায়ার দড়িখানি। অথচ সেটিই এখন ছাদের এককোণে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ছায়ার ভেতরে মায়ের শরীরটুকু বুকে নিয়ে।

 

২.

দুপুরে স্নানের পর মা শঙ্খ বাজালে
আমাদের রমণদৃশ্য
পবিত্র হয়ে ওঠে।

 

৩.

প্রেমিকার খোলা যোনির সম্মুখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকা, চাদরের ফুলগুলো গোনা (স্নান করিয়া প্রবেশ করিতে সাধ হয়)। দরজায় কড়া নাড়া, মা উঠে এসেছে। তাড়াতাড়ি সামলাতে হয় সব। জামাখানি, খুলে রাখা সাদা ব্রেসিয়ার, দাঁড়ানো লিঙ্গটি কিছুতেই নামানো গেল না। প্রেমিকার খুলে রাখা সায়া হেমন্তের অযথা কান্নার মতো মনে হয়। মা প্রবেশ করেছে, হাতে ধূপ, সন্দেশ বাটিতে। পুজোর প্রসাদ নামে দুজনের তালুর ভেতর। মাথায় ঠেকাইনি, ওভাবেই মুখে ভরে দেওয়া। নীচে নেমে আসি, মায়ের শাড়ির নীচে ভিজে থাকা গামছাটি নিয়ে তাড়াতাড়ি স্নানঘরে ঢুকি। তবুও তো হয় না স্নান, মিছিমিছি গা মুছে ভাবি এসকল নিয়মনিয়তি। টেবিলে চারজন, দুপুরে মাংস হয়েছে। মা ন্যাতা দিয়ে মোছে টেবিলের জল, মেঝেতেও। এ জল বাবার পায়েরও পিছু-পিছু যায় জানি, এ জল মায়ের দু-চোখের বিষ।

যেমন, এই টেবিলে প্রেমিকা বারবার সামলায় এলোমেলো চুল তার। সকলেই সবকিছু বোঝে।

এখনও দুপুর বাকি আছে ঘন্টা দেড়েক। মা শুয়ে পড়েছে নীরবে। শুধু কালার টিভিটি আর তার তরুণ সাংবাদিক, জেগে জেগে পাহারা দেবে এখন। চুপি চুপি দেখে এসেছি মাঝখানে, খবর চালিয়ে বাবা হাঁ করে ঘুমিয়ে পড়েছে।

 

৪.

বাবা লজ্জা পায়, বান্ধবীর সাথে কথাও এগোয় না।
খবরের কাগজ একদিকে ওড়ে
পা তুলে বসে না বান্ধবী
সে দেখে প্রেমিকের পিতা
প্রেমিকের পিতা আর আমার বাবার মাঝামাঝি
নীরবে একখানি টিভির রিমোট পড়ে থাকে।

 

৫.

জানালাগুলোকে নিজের হাতেই রং করে বাবা। খোলা শরীরের ওপরে বিন্দু বিন্দু ঘাম সেদিকে আশ্চর্য চোখ করে তাকিয়ে রয়েছে পোষা বেড়ালটি। আমার চুলের ভেতর থেকে আঙুল ঢুকিয়ে প্রেমিকা খুঁজে নিয়ে আসে— শামুকের খোল, আশ্চর্য তারামাছ আর শত শত মৃত বন্ধু-বান্ধবী। হেমন্তের এই দুপুরে আত্মহননপ্রবণ দুজনেই ঝাঁপ দিয়ে বহুক্ষণ সাঁতার কেটেছি। স্তনের ভেতর জমেছে অল্প অল্প সমুদ্রলবণ, যে কোনও সাঁতারই আমাকে মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যায়। এখন বিকেল পাঁচটায় অন্ধকার। মা, রান্নাঘরে চায়ের আয়োজন করে।

এরপর ধীরে ধীরে ওপরের সিঁড়ি। দরজার সামনে রেখে নীরবে নেমে যাওয়া। জানালায় নিজের হাতেই এক অদ্ভুত শোক লিখে রাখে বাবা। আমি প্রেমিকার স্তনের ওপরে শুয়ে শৈশবে ফিরে যাই। সন্ধের ভেতর পাওয়া এই শৈশব যেন সমুদ্রনুন, প্রেমিকার স্তন, মাতৃগর্ভ থেকে চিৎকারহীন নীচে নেমে আসে।

 

৬.

খুব সাবধানে পোশাক খুলে রাখি
মনে হয় যেন শব্দ হবে
আর জেগে যাবে এই রাক্ষস দুপুরখানি।
কাজের মেয়েটিও ধীরে ধীরে
বাসন মেজে রেখে দিয়ে গেছে কলপাড়ে,
কোনও শব্দই করেনি।

 

৭.

গোটা বারান্দাটাই যেন বাবার দাঁড়ি কাঁটার বাক্সটা। ঢ্যামনা সাপটা বহুদিন আগে এই বারান্দায় উঠেছিল। এখানেই সমস্ত সাইকেলে তেল দেয় বাবা খালি গায়ে, স্নানের ঠিক আগে বাবার পছন্দ হয় না প্রেমিকা এলে ছেলের বন্ধ দরজাটি। যেন এক অদৃশ্য লিপি আগুন মাখানো শিকে শরীরের ভেতর লেখা হয়ে চলেছে। রাতে, মায়ের স্তনের ভেতর মাথা চেপে শুয়ে থাকে বাবার আশ্চর্য প্রেত। পুরনো গালের ওপরে নতুন ব্লেডের ধার, অনায়াসে গাল কেটে যায়। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে ওরা। এলোমেলো চুল, ওড়নাও ঠিকঠাক থাকে না। একটি নতুন ব্লেড কোথায় যে পড়ে থাকে ঘাসের ভেতরে।

পাশে তার ফুলগাছ
পাশে তার
আজ আর দুপুরে খাব না।

 

৮.

মায়ের স্যানিটারি ন্যাপকিন
কাগজ মুড়োনো
নীরবে চেয়ে থাকে
বড় হতে বলে।

 

৯.

রাতেরবেলা কোলবালিশের একখানি ধার যতটুকু শিশ্নের আশ্রয় হয়ে ওঠে ততটুকু এই হেমন্তদুপুরের আয়ু। এ ঘর মুছো না আজ ওগো ঘরমুছনেওয়ালি…

তোমার ঐ মধুর হাত, তোমার ঐ যমুনার জল, থাক আজ (ঘরে আজ প্রেমিকা আসিয়াছেন)। জানালায় পর্দা টানটান, পাশের বাড়ি থেকে মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে দেখে। দরজায় নীরবে ছিটকিনি তুলে দিয়েছি মা এখন রান্না চাপায় না। বাবা আলমারি খুলে দুটো হাত বের করে নিয়ে আসে ছেলে বড় হয়ে যায় দ্রুত। প্রেমিকার বুকে তিল, মর্দন চলিতেছে বড় গ্যাস নিভে যায় মাঝে মাঝে। ছোট গ্যাসে দুধ উথলে ওঠার আগেই গ্যাস কমিয়ে দিয়েছে মা। আমরাও ওথলাতে দেইনি সেভাবে।

নিভিয়ে নিয়েছি। শুয়ে আছি পাশাপাশি। আমাদের মাঝখানে শুয়ে থাকে বাবার হাতদুটি, মায়ের দেবতা, জল, পিঁপড়েতে খাওয়া নকুলদানাটি পড়ে আছে।

 

১০.

পাড়াপড়শিও জানতে চায়— কে গো মেয়েটা? ঘরের ভেতরে একটা ছোট ছুঁচ হারিয়েছে কোথাও। সাথে সাথে মার চশমাও গেছে। বাবার নতুন ব্লেড ছেলের ঘরেতে। তবে প্রবেশ নিষেধ এখন— অলিখিত এই কথাখানি শিখে নিতে হয়। হেমন্তলক্ষ্মী ওগো, তোমার অপরূপ লিপিখানি তুলে ধরো। বলো— যা কিছু নির্মম, সকলই অলিখিত কেন? মায়ের হাত থেকে ছাদে পড়ে যায় ছেলের ভেজা জামা, ভিজে গেছে কিছুটা নিজেরও। চশমা নেই দু-চোখে, তবুও স্পষ্টত নীল। সাধের শিশুটি হেঁটে চলে যায়, মা মা ধ্বনি সমস্ত পৃথিবী জুড়ে। একফোঁটা জল অদ্ভুত ছাদের ভেতর চুইয়ে নেমেছে বিছানায় প্রেমিকার চোখের ওপরে। আমি সেই চোখের ওপরে আমার জীবনটি রাখি। রাখি এই হাত, এই কবিতাজীবন। আমি সে জল ঠোঁটে নিয়ে বলি— তুমি মোর দ্বিতীয় বেদনা।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...