প্রবুদ্ধ বাগচী
দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, সরিষার তেল, দুটি পাকা বেল। বালকটিকে তার মা বাজার থেকে আনতে পাঠিয়েছিলেন এই চারটে নিতান্ত প্রয়োজনের জিনিস। দোকানে গিয়ে সেই বালক কী বলল অনেকেরই মনে আছে কথাগুলো। দাদখালি ডাল, মুসুরির চাল, সরিষার বেল, দুটি পাকা তেল! মজা। নিছক ভুলে যাওয়ার মজা নিয়ে লেখা হয়েছিল এই শিশুপাঠ্য ছড়া। অনেক ছোটবেলায় পড়েছি, মনে আছে আজও। একইভাবে ভুলিনি ক্লাস নাইনের ইংরেজি পাঠ্যপুস্তকে পড়া আঙ্কল পোজারের কথা। তিনি নিজে এক ভুলোমনা চরিত্র। অফিসে যাওয়ার পথে ছাতা নিতে ভুলে যান, ভুলে যান ডাকবাক্সে চিঠি ফেলতে। অনেকটা পরে পড়েছি অক্সফোর্ডের নামজাদা অধ্যাপক স্পুনারের কথা যার উচ্চারণের ভুল ভাষাতত্ত্বে নতুন একটা বিষয়ের জন্ম দেয়— স্পুনারিজম। বাংলা ভাষায় এই স্পুনারিজমের উদাহরণ হল ‘এক কাপ চা’-কে ‘একচাপ কা’ বলে ফেলা। আবার মনখারাপের ঝড়-বাদলে মেজাজ যখন বিগড়ে থাকে তখন হেড অফিসের বড়বাবুর গোঁফচুরির বৃত্তান্তটা মনে করে নিজের মনেই হেসে উঠি। সব গল্পগুলোই মজাদার মশলায় টইটম্বুর। কী আশ্চর্য, বাড়তি ওষুধ-বিষুধ না-খেয়েও দিব্যি মনে থেকে গেছে এইসব কত কিছু। তাহলে কি মনে রাখবার একটা কিছু রসায়ন আছে? সেই অধরা রহস্যের কথা ভাবতে গিয়ে মনে পড়ে বুদ্ধদেব বসুর একটা লেখার কথা— “যাদের আঙুলে লেখার সুড়সুড়ানি তাঁদের পক্ষে নিছক বাঁচা যথেষ্ট হয় না, তাঁদের পক্ষে অভিজ্ঞতা বলতে জীবনের ঘটনাই শুধু বোঝায় না… ঘটনামাত্রই অভিজ্ঞতা নয় তাঁদের কাছে। আছে কোনো কো্নো নিবিড় সংবেদনের মুহূর্ত অবশ্যত তা বৃহৎ ঘটনাপ্রসূত, তেমন নয়।” কথাগুলো শুনতে আপাতভাবে ভারি হলেও এর মধ্যে একটা গভীর সত্যের ইশারা আছে। এমনকি ‘লেখালেখির সুড়সুড়ানি’ যাদের তেমন নেই তাঁদের কাছেও এই নিবিড় সংবেদনের মুহূর্তটুকু থাকা সম্ভব। আর সেই সংবেদন তৈরি হতে পারে একদমই আপাতত গুরুত্বহীন কোনও ঘটনার ভিতর দিয়ে। হয়তো কোনও এক বর্ষভেজা বিকেলে একফালি অস্তসূর্যের আলো এসে পড়েছিল ঘরে, হয়তো এক শীতসকালে চলন্ত ট্রেনের জানলা দিয়ে হাত নাড়াতে দেখেছিলাম এক সবুজ কিশোরীকে। মনে আছে, কোনও এক নিঝুম তারাভরা রাতে শুনেছিলাম অচেনা বাঁশির সুর, মনে আছে, চেনা প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে জানু পেতে স্তব্ধ দুপুরে নামাজে বসেছিলেন এক অচেনা বৃদ্ধ! মনে আছে অভিমান। মনে আছে কোনও প্রত্যাখ্যান। মনে আছে কোনও নিবেদন। মনে আছে, কেননা এর প্রতিটির সঙ্গেই জুড়ে গেছে আমাদের বেঁচে থাকবার কয়েকটি সত্তা-অস্তিত্বের টুকরো। প্রতিটি যেভাবে বটের ঝুড়ি জুড়ে থাকে তার কাণ্ডের সঙ্গে। বাইরে বা ভিতরে।
দুই.
এতক্ষণ যা বলেছি তা আসলে নৈর্ব্যক্তিক। এবার দু-চারটে নিজের কথা। মনে রাখবার রসায়ন যাই হোক মনে থেকে যাওয়ার কাহি্নি খুব বিচিত্র। কবি মণীন্দ্র গুপ্ত তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন তিনি নাকি তাঁর একেবারে শিশুকালের কথাও মনে করতে পারেন। কবীর সুমন একটা সময় একটানা তিনঘণ্টা স্মৃতি থেকে গান গেয়ে যেতেন। গান মনে রাখায় সুরের অবলম্বন কিছুটা সাহায্য করে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তো তাঁর গানের সুরও ভুলে যেতেন। এই সুর হারানোর আশঙ্কা থেকেই কখনও ঝড়বাদলের দুর্যোগে, কখনও মধ্যরাতে বা ভোরবেলা তিনি দৌড়ে যেতেন বা ডেকে পাঠাতেন দিনু ঠাকুর বা শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে। তবু তাঁর লেখা প্রায় দুশো গানের সুর হারিয়ে গেছে। এই মনে থেকে যাওয়ায় একদিকে যদি যুক্ত থাকে ব্যক্তিবিশেষের শারীরিক সক্ষমতা তাহলে পরেরটায় থাকবে কোনও বাড়তি কিছু যা ঘটনাকে গেঁথে দেয় মগজের কোষে কোষে। বুদ্ধদেব বসুর বয়ানে যা সংবেদনের নিবিড়তার ফসল। শৈশবে এক মাস্টারমশাই শিখিয়েছিলেন সাইকোলজি আর ম্যাথমেটিক্স বানান। বানানগুলো জানতাম না তা নয়, তবুও সেই ক্লাসটা ভারিক্কি পড়াশোনার বদলে খানিকটা অন্য মেজাজেই পড়াচ্ছিলেন সেই স্যার। দুই মাদুর (Mat)-এর মাঝে বসে পড়েছেন সে (He), এখন তাকে তো ওঠানো যাচ্ছে না কিছুতেই— তখন ডাকা হল আইসিএস (ICS) অফিসারকে। ব্যস হয়ে গেল MAT HE MAT ICS। একইভাবে Psychology আসলে পিসাই (psy) চলো (cholo) যাই (gy)! প্রামাণ্য বিষয়কে পরিবেশনের গুণে এইভাবেও স্থায়ী করে দেওয়া যায়!
স্কুলের দিনগুলোর কথা ভাবতে বসলে মনে পড়ে আরও দুটো একেবারে বিপরীত ধরনের ঘটনা। ক্লাস ইলেভেনের বায়োলজি স্যার ল্যাবরেটরি ঘরে যে অমনভাবে হিংস্র হয়ে মারতে আরম্ভ করবেন আমাদের এক বন্ধুকে, ঘটনাটা ঘটবার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা তা বুঝতে পারিনি। স্যারের কোনও একটা কথায় সে একটু হেসেছিল, এটা ঠিক। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ায় দুর্বল রুগ্নস্বাস্থ্য সেই ছেলেটির উপর স্যার যে এইভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বেন আমরা বুঝিনি। মারটা চলল কিস্তিতে কিস্তিতে। স্যার এসে চেপে ধরলেন তার চুলের মুঠি, বন্ধুর চোখ থেকে ছিটকে পড়ল পুরু মাইনাস পাওয়ারের চশমা, বাকরুদ্ধ আমরা। ল্যাবরেটরির চওড়া টেবিলে তখন লজ্জিত মাইক্রোস্কোপ, সন্ত্রস্ত গ্লাস স্লাইড আর স্পিরিটের বোতল। মনে আছে, এই ঘটনার পর আমাদের ওই সহপাঠী আর কোনওদিন ওই বায়োলজি স্যারের ক্লাস করেনি। এই ঘটনার অন্তত আরও এক দশক আগে প্রাইমারি সেকশনে পড়ার সময় আমি ক্লাসে ছোটখাটো দুষ্টুমি করেছিলাম, ক্লাসের এক যুবতী দিদিমণি আমায় কাছে ডেকে বলেছিলেন, আর কখনও এরকম কোরো না। তারপর আমার দু-গাল টিপে আদর করেছিলেন— এত বছর পরে রুক্ষ গাল আর পাকা দাড়ির আস্তরণ পেরিয়েও সেই স্পর্শ আমি অনুভব করি। শিক্ষকের এমন উদ্দীপক স্পর্শকে মনে না রেখে উপায় কি!
তিন.
ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় স্কুলজীবনের এইসব টুকরো টুকরো মনে থাকা-গুলো পেরিয়ে মনে থাকার একটা ভিত্তি তৈরি হয় আরও খানিকটা পড়ে। শৈশব আর কৈশোর ছাড়িয়ে যখন ব্যক্তিত্ব তৈরি হতে থাকে তখন পাল্টে যেতে থাকে সংবেদনের চেহারাগুলো। ছেলেবেলায় বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে বকুনি খেলে বা স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের কাছে ধমক-ধামক খেলে ঠিক সেইভাবে আত্মসম্মানে ঘা লেগেছে বলে কোনওদিন মনে হয়নি। বরং মনে থেকে গেছে তুলনায় বড় বয়সের অপমানবোধের কথা।
একুশ বছর বয়সে বাবা গত হওয়ার পর আমি প্রথমত শোকের পোশাক পড়িনি। নিজের কাছে যার সঙ্গত কারণ খুব স্পষ্ট ছিল। শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে এক প্রতিবেশীকে আমন্ত্রণ জানাতে গেলে তিনি আমায় প্রশ্ন করলেন, তোকে দেখে তো মনে হচ্ছে না তোর বাবা গত হয়েছে, কাছা পরিসনি কেন? তাঁর মুখের ওপর বলেছিলাম, শোকের কোনও পোশাক হয় বলে বিশ্বাস করি না, তাই। এসব আমন্ত্রণে অভ্যাগতদের কাছে বিনীত থাকতে হয় শুনেছি, কারণ পিতৃদায় বলে নাকি একটা ব্যাপার আছে। সেই প্রার্থিত বিনতি আমার গলায় তেমনভাবে বাজেনি। ফলে সেই প্রতিবেশী আমায় মুখের উপর বলে দিয়েছিলেন, সেই অনুষ্ঠানে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি আসেননি। সদ্য পিতৃহারা একুশের এক তরুণের কাছে আজ সাড়ে তিন দশক পেরিয়েও সেই অপমান সমান জ্বলন্ত।
ক্ষমতার ভাষার মধ্যেও যে একরকম অপমানের অভিমুখ থাকে সেটা জেনেছি অনেক পরে সরকারি প্রশাসনে এসে। এলাকার দাপুটে নেতা, যার ক্ষমতা দেশের প্রধানমন্ত্রীর থেকেও নাকি বেশি, তাঁর অনুগত ক্লাবের ছেলেদের সরকারি প্রকল্পের শিশু-খাদ্য নিয়ে চড়ুইভাতি করতে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন। সেই মহাপ্রবলবলীই এক সভায় আমার নামে প্রকাশ্যে অভিযোগ করলেন আমার প্রশাসনিক ‘অপদার্থতার’ জন্যেই নাকি সরকারি খাবার চুরি হয়ে যাচ্ছে। একঘর লোকের মধ্যে অপমানে স্তব্ধ আমি, বাড়তি কোনও কথা বলার প্রবৃত্তি হল না তাঁর সঙ্গে। কিন্তু এই অপমান আমায় ক্ষমতাকে অবিশ্বাস করতে শিখিয়ে দিয়ে গেছে, সমস্তরকম ক্ষমতাকে আমি আজও সন্দেহ করি। তবে ক্ষমতার চেহারা একরকম নয়। কলকাতার এক নামী পত্রিকা তাদের কোনও একটি সংখ্যায় লিখবার জন্য আমার কাছে আমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলেন। যথাসময়ে সেই লেখা পৌঁছেছিল তাদের কাছে। আশ্চর্য এই যে লেখাটি তারা প্রকাশ করেননি। এই অপমান আমার মনে আজও জাগরুক। সেটা এই কারণে নয় যে আমার লেখাটি খুব উঁচুমানের ছিল, আমার ক্ষোভের উৎস লেখকদের বিষয়ে ওই পত্রিকার দৃষ্টিভঙ্গি ও সৌজন্য-বিরোধী আচরণ। লেখকের শুদ্ধ আবেগটুকু আহত হওয়াও একটা বড় ক্ষত, অনেকদিন পর্যন্ত তা মনে থেকে যায়। এক জীবনের সব মনে রাখার ভালো-মন্দ কি আর হাট করে খুলে বলা সম্ভব? অনেকের জীবনে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা বা চাকরি পাওয়ার ঘটনা মনে দাগ কেটে থাকে। যদিও প্রায় সাড়ে তিন দশক চাকরি করে ফেলার পরও চাকরি ব্যাপারটাকে আমি আজও মন থেকে মেনে নিতে পারি না। আর ভালো রেজাল্ট বিষয়টা এত আপেক্ষিক যে তেমনভাবে মনে রাখতে চাই না। যতদিন যাচ্ছে তত অনুভব করছি এখনও বহু কিছু বিষয় আমার জানার বাইরে থেকে গেল— হয়তো সেই সব আর জানাই হবে না এই জীবনে! এমন আশ্চর্য বেদনাবোধের পাশে পরীক্ষার বিগত ফলাফল কেমন যেন ম্লান হয়ে যায়।
চার.
নিজের জীবনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে শুধু সেই ব্যক্তিটি থাকে এমন নয়, প্রতিটি মানুষ খানিকটা হলেও সামাজিক। সামাজিক পরিসর জুড়ে ব্যক্তির যে চলাচল তার মধ্যেও থাকে অনেকরকম ঘটনা-সংঘাত-দ্বন্দ্বের বিস্তার, যা কখনও ঢুকে পড়ে ব্যক্তিগত জীবনের নিভৃত সম্পর্কগুলোতে, যেগুলো ঠিক তত্ত্বের কাঠামো সাজিয়ে নেওয়া যায় না। এক বস্তিবাসী ক্ষুধার্ত কিশোর যখন মাকে চিৎকার করে বলে ওঠে ‘ভাত দে হারামজাদি’ তখন আসলে একটা স্লোগানের জন্ম হয়। স্লোগানের জন্মটা আসলে হয় তাঁর মধ্যে যিনি ওই উচ্চারণটা শুনলেন— ওই বিশেষ কালখণ্ডে ওইটা তার আত্মজীবনীর অংশ হয়ে গেল। অভিজাত শপিং মলের রঙিন ফোয়ারার পাশে নামি মানুষের দামি গাড়ির জটলা, আর এক মলিন কিশোর রংচটা কাপড়ের ব্যাগ কাঁধে ফেরি করছে দশ টাকায় দুটো ধূপের প্যাকেট। এই দেখাটা ব্যক্তিমনের সংবেদনে একটা ধাক্কা দিতে পারে আর তারপর সেই মুহূর্তটুকু জায়গা করে নিতে পারে তার সারা জীবনের আকাশে। চল্লিশ পেরোনো এক মহিলার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, তিনি নিজে দেখেশুনে বিয়ে করেছিলেন এক এনজিও-কর্তাকে। অল্প পরেই বুঝতে পারেন আসলে তার কর্তাটির রোজগার বলতে কিছুই নেই। তিনি মাঝারি স্তরের একটা সরকারি চাকরি করতেন। শুরু হয়ে গেল টাকার জন্য চাপ দেওয়া, শারীরিক নিগ্রহ। ইতিমধ্যে দুটি ছেলেমেয়েও হয়েছে তাঁদের। অবশেষে একদিন ঘুমন্ত স্ত্রীর বিছানায় আগুন লাগিয়ে দিলেন তার স্বামী। দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে একবস্ত্রে মহিলা এসে উঠলেন বাপের বাড়ি। এর কিছু পরে তিনি বিবাহবিচ্ছেদের নোটিস পাঠালেন তার প্রাক্তন স্বামীর কাছে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে এক সন্ধেবেলা ট্যাক্সি এসে থামল তার বাড়ির সামনে— তাঁর প্রাক্তন স্বামী ও জনাচারেক বাহুবলী হাজির। দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভাঙার চেষ্টা, সঙ্গে অকথ্য গালিগালাজ ও তাঁর কিশোরী মেয়েকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া ও প্রাণে মারার হুমকি। সবই আমি পরে শুনেছিলাম তাঁর কাছে।
সীমান্তবর্তী এলাকার এক গ্রামে গিয়ে একটি পরিবারের মুখোমুখি হয়েছিলাম সম্পূর্ণ একটা অন্য প্রেক্ষিতে। অভাবের ছোঁয়াচলাগা সেই পরিবারের তরুণী মেয়েটিকে তাঁরা সদ্য বিয়ে দিয়েছেন। বিয়ে দিয়েছেন বলা ঠিক হল না— দিল্লিবাসী সেই পাত্র জনাকয়েক বন্ধুবান্ধব নিয়ে উঠেছিল গ্রামেরই এক বাড়িতে। মাত্র দিন কয়েক দেখেই মেয়েটিকে বিয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করে। দরিদ্র পরিবারটির জন্য নগদ পঁচিশ হাজার টাকার অর্থসাহায্যের প্রতিশ্রুতি এসে পৌঁছায়। পূর্বাপর বিবেচনা না করেই মেয়েটিকে সেই ছেলেটির হাতে তুলে দেয় পরিবার। ছেলেটিরই আর্থিক সহায়তায় সামান্য কিছু শাড়ি-গয়না কিনে লোকচক্ষু এড়িয়ে বাড়িতে পুরোহিত থেকে অনাড়ম্বর বিয়েটা হয়ে যায়। গ্রামের প্রতিবেশীদের বলা হয় মাসখানিক বাদেই নবদম্পতি আবার আসবে গ্রামে, তখন হইহই করে সবাইকে ভোজ দেওয়া হবে। পরের দিন মেয়েটি-সমেত সকলে রওনা হয়ে যায় দিল্লির উদ্দেশে— বাবা-মায়ের জন্য পড়ে থাকে একটা মোবাইল নাম্বার, যেখানে ফোন করলেই নাকি টাটকা খবর মিলবে তাঁদের মেয়ের। বলা বাহুল্য, সেই ফোন আর কোনওদিনই বাজেনি, পরিবার বোঝেন কোন অতল সর্বনাশের কিনারে তাঁরা ঠেলে দিয়েছেন তাঁদের মেয়েকে। এই ঘটনার পরে সেই বাড়িতে বাবা-মায়ের চোখে যে শূন্য দৃষ্টি দেখেছিলাম তা ভুলতে পারব না কোনওদিন। এগুলো আমার ব্যক্তিগত জীবনের নয়, কিন্তু ব্যক্তিজীবনের তো বটেই!
পাঁচ বছরের মেয়ের হাত ধরে এক যুবতী এসেছিলেন আমার কাছে। জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনায় তিনি একরকম বিনা নোটিসে হারিয়েছেন তাঁর স্বামীকে। কিন্তু তার চেয়েও বড় ঘটনা, দু-মাস পেরিয়ে গেলেও তখনও তাঁর স্বামীর মৃতদেহ শনাক্ত হয়নি, ফলে কোনওরকম সরকারি ক্ষতিপূরণ তাঁর কাছে এসে পৌঁছায়নি। আমার কাছে তাঁর সামান্য প্রয়োজনটুকু মিটিয়ে সে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল সামনে আর আমি ভাবছিলাম কোনও কোনও সময় তাহলে মানুষের মৃত্যুর পরেও ‘সরকারি মৃত্যু’ বলে একটা কিছু থাকে! স্বামীহারা এই যুবতী আসলে খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেই সরকারি মৃত্যুর স্বীকৃতিটুকু! সত্যি জীবন কী বিচিত্র!
এরকমই এক স্থায়ী স্মৃতি গুজরাতে প্রশাসনিক গণহত্যার পর সংবাদমাধ্যমে আসা হাতজোড়-করা এক বিপন্ন যুবকের ছবি, যখন ত্রিশূল দিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের গর্ভবতী মহিলাদের পেট চিরে বার করে আনা হচ্ছিল ভ্রূণ। মনে পড়ে, লকডাউনে ট্রেনে কাটাপড়া শ্রমিকের ছিন্ন দেহের পাশে উলটে থাকা টিফিনকৌটো। পহেলগাঁও-এ সন্ত্রাসীদের হাতে পর্যটকদের হত্যাদৃশ্য। টিভির পর্দায় না ফুটে উঠলেও বোঝা যায় কোন গভীর আর্তি নিয়ে তিলোত্তমার মা-বাবা পথে পথে ঘুরে বেড়ান মেয়ের হত্যার বিচার চেয়ে! এইসব দেখা না-দেখা মিশে যায় স্মৃতিতে, জীবনের সঞ্চারপথে।
পাঁচ.
যে ঘটনার সঙ্গে কোনও শারীরিক যোগ নেই তেমন কিছুও সংবেদনের জোরে জুড়ে যায় ব্যক্তিজীবনের স্মৃতিকোষে। মামার বাড়ির দাদুর মুখে শুনেছিলাম রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিনের স্মৃতি। দাদু তখন শ্যামবাজার এলাকায় মেসে থাকেন, চাকরি লালবাজার এলাকায়। শ্রাবণদিনের কলকাতায় লাখো মানুষের ভিড়ের সেই শোকার্ত ছবি মনে পড়লে অভিজ্ঞতাটা কীভাবে যেন ঢুকে পড়ে নিজের জীবনে। মানুষটি রবীন্দ্রনাথ বলেই যেন সেই ঘটনার ঔজ্জ্বল্য এত প্রখর। দিদার মুখে শুনেছি, তাঁদের পুববাংলার গ্রামে মুকুন্দদাসের গান গাইবার স্মৃতি। চারণকবি দৃপ্ত গানে মাতিয়ে দিচ্ছেন আর আবালবৃদ্ধবণিতা মেতে উঠছেন তাঁর আহ্বানে। এই ঘটনার সামনে একজন হয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে আমিও। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে যুক্ত এক জ্যাঠামশাই শুনিয়েছিলেন কীভাবে তিনি টোকা মাথায় খালি-গায়ে কাঁধে একটা গামছা নিয়ে আর হাঁটুর উপর ধুতি তুলে সাধারণ চাষির ছদ্মবেশে পুলিশের সামনে দিয়ে তাদের বোকা বানিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ঠিক যেমন বাবার কাছে শোনা, উনিশশো ঊনষাটের খাদ্য আন্দোলনের কাহিনি। একত্রিশ আগস্টের সেই গণজমায়েতে হাজির ছিলেন বাবা। সেদিন কীভাবে লাঠি-গ্যাস-গুলি চালিয়ে সমবেত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করেছিল স্বাধীন দেশের পুলিশ, সেই আখ্যান শুনে ফেলেছিলাম অনেক বছর আগেই। পুলিশের লাঠি এসে পড়েছে বাবার কব্জিতে, যন্ত্রণায় ডুবে যাওয়া হাত রুমালে জড়িয়ে বাবা ছুটছে ডেকার্স লেন ধরে, অন্যদিকে কাঁদানে গ্যাসের জ্বালায় এলোপাথারি মানুষের ছোটাছুটিতে রাজপথ তখন রণক্ষেত্র। ওই এলাকা দিয়ে একলা যেতে যেতে কতবার আমার মনে পড়ে গেছে ওই ঘটনা— পুলিশের লাঠি যেন এসে পড়েছে আমারই শরীরে, যেন টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটল আমারই সামনে। নিজের জীবন মিশে যাচ্ছে বীজের জীবনে। একটা সংবেদন এসে এইভাবেই হাত ধরে ফেলছে আর একটা সংবেদনের।
আসলে মনে থাকার এই খণ্ডমুহূর্তগুলো যেন-বা আমাদের জীবনের শকুন্তলার আংটি। পথের পাঁচালী-র দুর্গার মৃত্যুদৃশ্য যেমন আমরা ভুলতে পারি না, ভুলতে পারি না কোমল গান্ধার-এ সীতার ছুটে চলার দৃশ্য অথবা পারমিতার একদিন-এ মাকে হারানো মনোবিকলিত যুবতীর হাহাতপ্ত চেয়ে থাকা! অথবা এরকম আরও কত দৃশ্য, কত সংলাপ, কত নীরবতা। বহুদূর আলোকবর্ষ থেকে যে তারার আলো আজ এইমাত্র এসে পড়ল আমার চোখে, যে উল্কাপিণ্ডকে আমি এইমাত্র ঝরে পড়তে দেখলাম অন্ধকার আকাশে— এর সবটাই অন্তর্গত হয়ে গেল আমার আত্মজীবনীর! সামনের এই মুহূর্তগুলোর দিকে না তাকালে বোঝা যায় না আমি বেঁচে আছি কি না। সত্যি তারা হারাবে না, তারা পুরনো হবে না। এই তো কয়েকটি মুহূর্ত কবে ছাড়িয়ে এসেছি, তবুও এখনও তাদের দেখতে পাচ্ছি। যেন সাদা পাখির ঝাঁক সমুদ্রের দিগন্তে— একদিন হয়তো তারা দিগন্ত ছাড়িয়ে উড়ে যাবে। এইখানে রইল তাঁদের পাখার শব্দ, তাঁদের উড়ে চলার হাওয়া….

