Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ট্রাম্প কেন গ্রিনল্যান্ড চান? এরকমভাবে একটা দেশ ‘কেনা’ কি স্বাভাবিক?

সেন ওয়াজ ও সারা সিওলিন

 


ডেনমার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি গ্রিনল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হলেও, ওপিনিয়ন পোলগুলি ইঙ্গিত দিয়েছে যে গ্রিনল্যান্ডবাসীদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর গ্রিনল্যান্ডের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা একজোট হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থানের বিরোধিতা করেন এবং তাঁর আচরণকে একেবারেই “গ্রহণযোগ্য নয়” বলে অভিহিত করেন। দ্বীপটির প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স–ফ্রেডেরিক নিলসেন স্পষ্ট করে বলেছেন, “গ্রিনল্যান্ড কোনও বাড়ি নয় যে কিনে নেওয়া যাবে,” এবং ট্রাম্পকে মোকাবিলার জন্য গ্রিনল্যান্ডবাসীদের আরও কঠোর হতে হবে

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে তিনি ডেনমার্কের স্বশাসিত ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে চান।[1] এখন তিনি ডেনিশ সরকারের কাছে দ্বীপটির ওপর মার্কিন দখলে সম্মতি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সতর্ক করছেন— তারা যদি এর বিরোধিতা করে, তাহলে নতুন করে কঠোর বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করা হবে।

৩ জানুয়ারি মার্কিন বিশেষ বাহিনীর হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করার ঘটনা ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে— অন্য একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে ট্রাম্প কতটা প্রস্তুত। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাঁর ক্রমশ সুর চড়া করা ওই ভূখণ্ডের রাজধানী নুক-এ গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, ডেনিশ ভূখণ্ডের কোনও অংশ দখল করে নেওয়ার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নেই। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক শুল্ক আরোপের হুমকির জবাবে জার্মানির অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিংবাইল সবচেয়ে কঠোর বাণিজ্যিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ইউরোপকে প্রস্তুত থাকতে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “আমাদের, ইউরোপীয়দের, স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে হবে— এটাই শেষ সীমা।”

 

ট্রাম্প কি সত্যিই গ্রিনল্যান্ড দখল করতে পারেন?

এক সময় ডেনমার্ক সরকার গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে নিছক আকাশকুসুম কল্পনা বলে মনে করত। কিন্তু তাঁর ক্রমবর্ধমান আক্রমণাত্মক বক্তব্য[2] ডেনিশদের বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। ডেনমার্কের কর্মকর্তারা বারবার যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আপত্তি জানিয়েছেন। গত ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো ডেনমার্কের একটি গোয়েন্দা সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করেছে।[3]

ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় তাদের হস্তক্ষেপকে উনিশ শতকের মনরো ডকট্রিনের আধুনিক পুনর্ব্যাখ্যা হিসেবে তুলে ধরেছে— যে নীতির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছিল, পশ্চিম গোলার্ধ অন্য কোনও দেশের উপনিবেশ স্থাপনের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা। এর অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত হল, সেই হিসাবে গ্রিনল্যান্ডও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু হতেই পারে।

গ্রিনল্যান্ডের অধিকাংশ অংশই আর্কটিক বৃত্তের মধ্যে অবস্থিত এবং বিশাল এক বরফস্তরে ঢাকা। এখানকার প্রায় ৫৭ হাজার বাসিন্দার বেশিরভাগই দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল বরাবর, ভূখণ্ডের রাজধানী নুকের আশপাশে বসবাস করেন। ট্রাম্প যদি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবে তিনি একতরফাভাবে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন— একটি সম্পাদিত ঘটনার (fait accompli) মতো। এতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হবে, কিন্তু ডেনমার্কের পক্ষে তা ঠেকানোর কোনও উপায় বাস্তবত নেই।

এরকম একটা পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের চেয়েও অনেক বেশি গুরুতর পরিণতি ডেকে আনবে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই কারাকাসের সরকারকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে এসেছে এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বৈধ নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার সরকার অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে এবং মাদক পাচারে সহায়তা করছে।

ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা (ন্যাটো)-র সদস্য। ডেনমার্ক বা গ্রিনল্যান্ড— কেউই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য কোনওরকম হুমকি নয়। গ্রিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করা হলে তা ন্যাটোর মিত্র দেশগুলোকেই একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে এবং এই সামরিক জোটের অস্তিত্বই সংকটে পড়বে।

 

ট্রাম্প যদি গ্রিনল্যান্ড দখল করতে সেনা পাঠান, তাহলে কী হবে?

গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ইতিমধ্যেই রয়েছে। সেখানে পিটুফিক স্পেস বেসে মার্কিন সেনারা মোতায়েন আছেন; এই ঘাঁটির রাডার স্টেশন ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি শনাক্ত করা এবং মহাকাশ পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। এক সময় দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ছিল আরও অনেক বেশি। ঠান্ডাযুদ্ধের সময়পর্বে সেখানে এক ডজনেরও বেশি সামরিক স্থাপনা পরিচালনা করত তারা, যদিও পরবর্তী কয়েক দশকে ধীরে ধীরে সেই উপস্থিতি কমিয়ে আনা হয়েছে।

ট্রাম্প চাইলে গ্রিনল্যান্ডে আরও সেনা পাঠাতে পারেন। ১৯৫১ সালের একটি বিদ্যমান চুক্তির বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক ওই ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষায় সহযোগিতা করে। ২০০৪ সালে হালনাগাদ করা এই চুক্তি অনুযায়ী, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড— উভয়পক্ষকে অবহিত করে ও পরামর্শের মাধ্যমে— যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে পারে, সেনা মোতায়েন করতে পারে এবং আর্কটিক দ্বীপটি জুড়ে অবাধ বিচরণ করতে পারে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেনও বলেছেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র এ-ধরনের পদক্ষেপ নিলে তিনি তা স্বাগত জানাবেন।

জাতীয় আইন অনুযায়ী, ডেনিশ সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নিজ ভূখণ্ডে যে-কোনও আক্রমণ প্রতিহত করার দায়ভার ন্যস্ত থাকলেও, গ্রিনল্যান্ডে তাদের উপস্থিতি খুবই সীমিত। সেখানে মাত্র ১৫০ জন সেনা কয়েকটি স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্বে রয়েছেন। জানুয়ারির মাঝামাঝি ইউরোপীয় দেশগুলো গ্রিনল্যান্ডে অল্পসংখ্যক সামরিক সদস্য পাঠিয়েছিল— ট্রাম্পকে দেখানোর জন্য যে তারা নিরাপত্তা বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছে। কিন্তু সেই সংখ্যাও ছিল নগণ্য, এবং ডেনমার্ক চাইলেও অনাহূত মার্কিন সেনার বড়সড় আগমন কীভাবে প্রতিরোধ করবে, তা স্পষ্ট নয়।

 

অন্য কীভাবে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন?

এই মুহূর্তে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়াই ট্রাম্পের সবচেয়ে পছন্দের পথ বলে মনে হচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন— ডেনমার্কের সঙ্গে একটি আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেই বিষয়টি মেটানোই ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য।

কিন্তু ট্রাম্পের পক্ষে তা সম্ভব নয়, বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ডের জনগণের সম্মতি ছাড়া একেবারেই সম্ভব নয়। গ্রিনল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডজাঙ্কট অধ্যাপক রাসমুস লিয়ান্ডার নিলসেন বলছেন, ডেনমার্ক দ্বীপটি বিক্রি করতে পারে না, কারণ ২০০৯ সালের স্বশাসন আইন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে “গ্রিনল্যান্ডবাসীরা তাদের নিজস্ব জনগণ।”

বিকল্প হিসেবে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডবাসীদের ডেনমার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দ্রুতগতিতে একটি স্বাধীনতা-সংক্রান্ত গণভোটের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দিতে আর্থিক প্রলোভন দিতে পারেন। তবে যে-কোনও চূড়ান্ত সমঝোতাই ডেনিশ পার্লামেন্টের অনুমোদনসাপেক্ষ, ফলে ডেনমার্ক চাইলে পুরো প্রক্রিয়াটিকে ধীর করে দিতে পারে।

যদি ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডবাসীদের প্রতিজনকে মিলিয়নিয়ার বানানোর প্রলোভনও দেন, তাঁর আক্রমণাত্মক ভাষ্য দ্বীপবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ— এমনকি ভয়ও— সৃষ্টি করেছে। তাঁরা ভাবছেন, ডেনমার্ক থেকে অতি দ্রুত বিচ্ছিন্ন হলে তাঁদের কী হতে পারে। এই উদ্বেগের কথা আরও প্রমাণ করেছে গত বছরের মার্চে নির্বাচনের ফলাফল, যেখানে চারজন গ্রিনল্যান্ডিক ভোটারের মধ্যে তিনজনই সেই রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেছেন, যারা স্বাধীনতার পথে ধীরে ধীরে এগোনোর পক্ষপাতী।[4]

এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গ্রিনল্যান্ড কেনার কোনও বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট ৭ জানুয়ারি বলেন, ট্রাম্পের দল “সম্ভাব্য একটি ক্রয় কীরকম হতে পারে, তা নিয়েই এখন আলোচনা করছে।”

 

যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হয়ে ওঠা নিয়ে গ্রিনল্যান্ডবাসীদের মনোভাব কেমন?

ডেনমার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি গ্রিনল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হলেও, ওপিনিয়ন পোলগুলি ইঙ্গিত দিয়েছে যে গ্রিনল্যান্ডবাসীদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে।[5]

২০২৫ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর গ্রিনল্যান্ডের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা একজোট হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থানের বিরোধিতা করেন এবং তাঁর আচরণকে একেবারেই “গ্রহণযোগ্য নয়” বলে অভিহিত করেন।[6] দ্বীপটির প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স–ফ্রেডেরিক নিলসেন স্পষ্ট করে বলেছেন, “গ্রিনল্যান্ড কোনও বাড়ি নয় যে কিনে নেওয়া যাবে,” এবং ট্রাম্পকে মোকাবিলার জন্য গ্রিনল্যান্ডবাসীদের আরও কঠোর হতে হবে। তবে এটাও বলেছেন যে, গ্রিনল্যান্ডের অধিকাংশ আইনপ্রণেতাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বেশি বাণিজ্যিক লেনদেনে আগ্রহী।

 

অন্যের দেশ কিনে নেওয়া কি স্বাভাবিক ব্যাপার?

এক শতাব্দী আগেও কোনও দেশের সরকারের নতুন কোনও ভূখণ্ড কিনে নেওয়া খুব অস্বাভাবিক ছিল না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ১৮০৩ সালে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিনিময়ে ফ্রান্সের কাছ থেকে লুইজিয়ানা কিনেছিল এবং ১৮৬৭ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কা অধিগ্রহণ করেছিল।

ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র জড়িত এমন একটি দৃষ্টান্তও রয়েছে। কোপেনহেগেনের সরকার ১৯১৭ সালে যে দ্বীপগুলো বিক্রি করেছিল, সেগুলিই আজ ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডস নামে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে আরও কিছু দ্বীপ বিক্রির প্রস্তাব উঠেছে বটে, তবে সেগুলো আকারে অনেক ছোট এবং উষ্ণ আবহাওয়ার অঞ্চলে অবস্থিত। ডিউক ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল–র জোসেফ ব্লোচার ২০১৪ সালে লিখেছিলেন যে, “সার্বভৌম ভূখণ্ডের বাজার যেন শুকিয়ে গেছে।”

 

ট্রাম্প কেন গ্রিনল্যান্ড চান?

ট্রাম্প নিশ্চয়ই জানেন যে, এ-ধরনের বৃহৎ উদ্যোগের জন্য অতীতের অন্যান্য মার্কিন নেতারা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন— যেমন অ্যান্ড্রু জনসন, যিনি আলাস্কা অধিগ্রহণের তত্ত্বাবধানকারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচিত।[7]

২০১৯ সালে ট্রাম্প যখন প্রথম গ্রিনল্যান্ড কেনার কথা তুলেছিলেন, তখন তিনি এটিকে “একটি বড় রিয়েল এস্টেট চুক্তি” হিসেবে হাজির করেছিলেন এবং বলেছিলেন, এতে ডেনমার্কের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির চাপ কমবে। এবার তাঁর যুক্তি হল— দ্বীপটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডকে সুরক্ষিত রাখতে যথেষ্ট ব্যয় করছে না। এর জবাবে কোপেনহেগেন ক্রমশ বেশি পরিমাণ অর্থ ওই ভূখণ্ডে বরাদ্দ করছে— প্রতিরক্ষা[8] ও অবকাঠামো[9] খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্র কেন গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা চায়— এই প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “কারণ আমার মনে হয় সাফল্য অর্জনের জন্য মানসিকভাবে এটা দরকার। আমার ধারণা, মালিকানা এমন কিছু দেয়, যা ইজারা বা চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া যায় না। মালিকানা এমন কিছু জিনিস ও উপাদান দেয়, যা শুধু কোনও নথিতে সই করলে পাওয়া সম্ভব নয়।”

 

গ্রিনল্যান্ড কেন গুরুত্বপূর্ণ?

দ্বীপটি দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।

আয়তনে মেক্সিকো ও সৌদি আরবের চেয়েও বড় গ্রিনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের সংযোগস্থলে এক অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থানে অবস্থিত।[10] এই অঞ্চলটিতে থাকা বিপুল পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও জীবাশ্ম জ্বালানির ভাণ্ডারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি তার সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বী চিন ও রাশিয়ারও আগ্রহ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রিনল্যান্ডের বরফস্তর দ্রুত গলতে থাকায় একদিকে এগুলি তোলা সহজতর হতে পারে, অন্যদিকে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের জন্য আরও সংক্ষিপ্ত নৌপথও উন্মুক্ত হয়ে উঠছে।

 

গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের দাবি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত?

গ্রিনল্যান্ড ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত টানা দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ডেনমার্কের উপনিবেশ ছিল। প্রকৃতপক্ষে দ্বীপটির বাসিন্দা ইনুইট জনগোষ্ঠীর মানুষ ও নর্সমানরা— যাদের সাধারণভাবে ভাইকিং নামে ডাকা হয়, এবং ইউরোপীয় তিমিশিকারিরা সেখানে যাতায়াত করত। ড্যানিশ–নরওয়েজীয় ধর্মযাজক হান্স এগেডে এই ভূখণ্ডে খ্রিস্টধর্মের প্রচলন ঘটান এবং গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন।

গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে স্বশাসন ভোগ করে— যেখানে পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা, মুদ্রানীতি এবং পুলিশিংয়ের মতো আর কয়েকটি ক্ষেত্র বাদে জীবনের প্রায় সব দিকই এর আওতায় পড়ে। ঐতিহাসিকভাবে গ্রিনল্যান্ডের সংসদে সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী দলগুলোর প্রাধান্য থাকলেও, বর্তমান ৩৪ বছর বয়সি প্রধানমন্ত্রী নিলসেন সামাজিকভাবে উদারপন্থী ডেমোক্রাতিত দলের নেতা। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের পার্লামেন্টে দুজন প্রতিনিধি পাঠায়।

অতীতে সংঘটিত নিপীড়ন ও অবিচারের স্মৃতি দ্বীপটি ও তার প্রাক্তন শাসকের মধ্যেকার সম্পর্ককে টানাপোড়েনপূর্ণ করে রেখেছে। বহু গ্রিনল্যান্ডবাসী নিজস্ব রাষ্ট্র চান এবং ডেনমার্কের শাসনের প্রতি ক্ষুব্ধ মনোভাব পোষণ করেন।

 


[1] Wass, Sanne. Trump Reiterates He Wants to Buy Greenland for US Security. Bloomberg. Dec 23, 2024.
[2] Landale, James & Hagan, Rachel. Trump says US ‘has to have’ Greenland after naming special envoy. BBC News. Dec 23, 2025.
[3] Tekeli, Maya and Gettleman, Jeffrey. Danish Intelligence Report Raises Concerns About U.S. NYT. Dec 10, 2025.
[4] Greenland picks party favouring slow independence in election surprise. Bloomberg. Mar 12, 2025.
[5] 85% of Greenlanders don’t want their island to become part of the U.S., poll finds. CBS News. Jan 29, 2025.
[6] Wienberg, Christian & Sjolin, Sara. Greenlandic Parties Join in Rejecting Latest Trump Advance. Bloomberg. Mar 15, 2025.
[7] Purchase of Alaska, 1867. Office of the Historian.
[8] Denmark to boost Arctic defence by $4.26 billion, buy 16 new F-35s. Reuters. Oct 10, 2025.
[9] AFP. Denmark to invest over $250 mn in Greenland infrastructure. The Peninsula. Sep 16, 2025
[10] Why the Arctic is being threatened by war and climate change. The Straits Times. Updated Jan 5, 2024.


*নিবন্ধটি দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় গত ২০ জানুয়ারি পুনঃপ্রকাশিত, প্রথম প্রকাশ ব্লুমবার্গ-এ।