ফুটবল বিশ্বকাপ: ঘরে মান বাঁচবে তো?

সোমেন বসু

 


আমেরিকা এবং ইউরোপ জুড়ে সমর্থকদের বিশ্বকাপ বয়কটের ডাক রীতিমতো জোরালো হচ্ছে। সোশাল মিডিয়ায় আছড়ে পড়ছে একের পর এক পোস্ট, এবং তারা ভাইরালও হচ্ছে দ্রুতগতিতে। গত ৯ জানুয়ারি এক রাতে ১৬,৮০০ জন তাঁদের টিকিট ক্যান্সেল করেছেন যার ফলশ্রুতিতে ফিফাকে জরুরি বৈঠক পর্যন্ত ডাকতে হয়েছে। খোদ মার্কিন মুলুক থেকে আওয়াজ উঠছে— ট্রাম্প জমানা যদ্দিন চলবে বিশ্বকাপ দেখতে আসবেন না, অলিম্পিক দেখতে আসবেন না, আমেরিকায় বেড়াতে আসবেন না, মার্কিন কোম্পানিদের সঙ্গে ব্যবসা করবেন না

 

ভেনেজুয়েলা। এরপর নাকি পর্যায়ক্রমে গ্রিনল্যান্ড, কলম্বিয়া, ইরান, মেক্সিকো, কিউবা…। বিস্ময়ের কিছু নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবী এহেন মার্কিন দস্যুবৃত্তির সঙ্গে পরিচিত। এই ট্রাম্প জমানায় তার গতি বেড়েছে, এই যা। ট্রাম্পের চরিত্র অনেকটা আমাদের সেই গল্পকথার রঘুডাকাত বা বিশেডাকাতের মতো। চিঠি দিয়ে ডাকাতি করতে যান। কিন্তু এরকম হারেরেরে মনোভাব তো সবার সহ্য হওয়ার কথা নয়। রাশিয়া-চিনের মতো তাবড় সাম্রাজ্যবাদীরা তো বটেই, এমনকি আমেরিকার যাবতীয় কুকীর্তির সঙ্গে এতদিন তাল মিলিয়ে চলা ইউরোপও এবার আশঙ্কিত হতে শুরু করেছে। ট্রাম্পের এই বোলবোলা বেশিদিন চললে, বলা যায় না, আমরা হয়তো আবার একটা বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করতে চলেছি।

আর এসবের মধ্যেই এসে পড়েছে ফুটবল। বিশ্বের যে জনপ্রিয়তম খেলাটা বরাবরই স্রেফ খেলার চৌহদ্দি ছেড়ে হানা দিয়েছে জীবনের বৃহত্তর আঙিনায়। বরাবরই যার পরতে পরতে জড়িয়ে থেকেছে রাজনীতি। ছোটখাটো ময়দানি রাজনীতি থেকে শুরু করে বিশ্ব-রাজনীতি পর্যন্ত।

আর মাত্র মাস পাঁচেক পরেই সেই ফুটবলের মহোৎসব বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসতে চলেছে সেই ট্রাম্পের আমেরিকায়। সঙ্গে অবশ্য কানাডা এবং মেক্সিকোও রয়েছে। তা এবারই বা সেই অমোঘ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটবে কেন?

প্রথমত, ট্রাম্পের আমেরিকা ৪৩টি দেশের মানুষের ওপর তাদের দেশে ঢোকার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সব একরকম নয়, কিছুদিন আগে তারা লাল-কমলা-হলুদ মার্কা ত্রিস্তরীয় একটা তালিকা বানিয়েছিল, যার ছবি নিচে দেওয়া হল। লাল তালিকাভুক্ত দেশের মানুষদের ভিসা দেওয়াই হবে না; কমলাদের কড়া নজরে রেখে অনেকরকম ছানবিন করে কাউকে কাউকে ভিসা দেওয়া হবে; আর হলুদদের ৬০ দিন পর্যবেক্ষণে রেখে দেওয়া হতে পারে।[1] সেই খসড়াই চূড়ান্ত হয়েছে এবং দেখা যাচ্ছে ইরান, হাইতি, সেনেগাল এবং আইভরি কোস্টের মতো দেশের মানুষরা তাঁদের দেশের খেলা দেখতে আমেরিকায় ঢুকতে পারবেন না।[2]

 

রাশিয়ার উপর ফিফাই নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর জন্য। ২০২২-এও তারা বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পায়নি, এবারেও পাচ্ছে না। খুবই ভালো কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইউক্রেনে রাশিয়া যা করছে সেটা আগ্রাসন হলে ভেনেজুয়েলায় আমেরিকা যেটা করল সেটা কী? এই প্রশ্ন তুলে আসন্ন বিশ্বকাপ থেকে আমেরিকাকেই বহিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন খোদ আমেরিকারই ২৩ জন এমপি। তাঁদের একজন লেবার পার্টির এমপি ব্রায়ান লেইসম্যান ডেইলি মিররকে বলেছেন:

ধারাবাহিকতা থাকা উচিত। যেটা ঘটেছে সেটা হল একটা সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করে নিয়ে আসা। আমি পরিষ্কার করে দিতে চাই, মাদুরোর কাজকর্ম আমি বিন্দুমাত্র সমর্থন করছি না, কিন্তু তার জন্য আমরা যেটা দেখলাম সেটা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। রাশিয়ার প্রতি ফিফার পদক্ষেপ সম্পূর্ণ সঠিক। আমি শুধু চাই ফিফা তাদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখুক।[3]

যদি আপনারও মস্তিষ্কে এই সরল প্রশ্নটির উদয় হয়ে থাকে হে পাঠক, তবে একটা ছোট্ট তথ্যও এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি। গত বছর ডিসেম্বরে বিশ্বকাপের ড্র-এর সময় ফিফা তড়িঘড়ি একটা শান্তি পুরস্কার চালু করে। এবং ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, যিনি ট্রাম্পের তাঁবেদার হিসেবে সুবিদিত, সেই প্রথম ফিফা শান্তি পুরস্কারটি তুলে দেন যাঁর হাতে তাঁর নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প।

দ্বিতীয়ত, ইউরোপ জুড়ে আসন্ন বিশ্বকাপ বয়কটের আওয়াজ কিন্তু ক্রমশই উচ্চকিত হচ্ছে। ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে ইউরোপের বিরক্ত এবং আশঙ্কিত হওয়ার যে যথেষ্ট কারণ রয়েছে, আগেই বলেছি। এই মুহূর্তে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আস্ফালন ইউরোপের প্রধান শিরঃপীড়ার বিষয়। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীন। ডেনমার্ক শুধু উয়েফার বিশিষ্ট সদস্যই নয়, ন্যাটোরও সদস্য। নিজের শিবিরের লোকের প্রতিই মার্কিন প্রশাসনের এমন যুদ্ধং দেহি অবস্থান ফ্রান্স, জার্মানিদের মতো অন্যান্য ন্যাটোভুক্ত দেশগুলিকে স্বস্তিতে রাখতে পারে না। আর শুধু তো এরকম পরোক্ষ ভয়ই নয়, ট্রাম্প সরাসরি হুমকি দিয়ে রেখেছেন যে তাঁর গ্রিনল্যান্ড-লালসার বিপক্ষে যারাই দাঁড়াবে, তাদের ওপর আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তাঁর লক্ষ্য ইউরোপের আটটি দেশ। কারা? ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ড।[4] পরে সুর নরম করলেও, হয়তো এই বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখেই, তাতে উদ্বেগ এবং উত্তেজনা— কোনওটাই কমছে না। এমত অবস্থায় সেই মার্কিন মুলুকে গিয়ে আনন্দ করে ফুটবল খেলে আসা তাদের পক্ষে যথেষ্ট বিড়ম্বনারই বটে।

জার্মান ফুটবল অ্যাসোশিয়েশন (ডিএফবি)-র ভাইস প্রেসিডেন্ট ওক গটলিচ বলছেন,

আমাদের অবস্থান বোঝানোর জন্য সীমা নির্ধারণ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। কখন আমরা সেই সীমা পার করে যাব? যখন কেউ আমাদের হুমকি দেবে তার পর? কেউ আমাদের ওপর হামলা করে বসবে তার পর? যখন মানুষ মরবে, তার পর?… আমি জানতে চাই ট্রাম্প কখন তাঁর সীমায় পৌঁছবেন? এটা আমি বার্ন্ড ন্যুয়েনডর্ফ [ডিএফবি প্রেসিডেন্ট] আর জিয়ান্নি ইনফান্তিনো [ফিফা প্রেসিডেন্ট]-র থেকেও জানতে চাই।[5]

তিনি পরিষ্কার বলছেন—

আমরা আর কখন এই বিশ্বকাপ বয়কট নিয়ে সিরিয়াস ভাবনাচিন্তা এবং কথাবার্তা শুরু করব? আমার মনে হয়, সময় এসে গেছে।

আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের প্রেক্ষিতে মার্কিন-নেতৃত্বে ১৯৮০-র মস্কো অলিম্পিক বয়কটের কথাও তুলেছেন গটলিচ:

১৯৮০-র অলিম্পিক গেমস বয়কটের কী কারণ ছিল? আমার তো মনে হয় পরিস্থিতি তখনকার চেয়ে এখন অনেক বেশি গুরুতর। আমাদের অবশ্যই এ-নিয়ে আলোচনা করতে হবে।[6]

শুধু তিনিই নন, অনেক জার্মান রাজনীতিকও এই প্রসঙ্গে সোচ্চার হয়েছেন।

আর যারা প্রত্যক্ষ সংকটে— ডেনমার্ক— তারা এখনও ভাবছে ট্রাম্পের এসব হয়তো কথার কথা হয়েই থাকবে। কিন্তু সেসব ভেবেও ড্যানিশ সোশাল ডেমোক্রাটদের মুখপাত্র মগেনস জেনসেন জানিয়েছেন, ট্রাম্পের হুমকি যদি এরকম চলতেই থাকে তবে বয়কটের সিদ্ধান্ত খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।[7]

আর শেষত, এবং মূলত, সমর্থকদের, আমেরিকা এবং ইউরোপ জুড়ে, বিশ্বকাপ বয়কটের ডাক। রীতিমতো জোরালো হচ্ছে সেই আওয়াজ, সোশাল মিডিয়ায় আছড়ে পড়ছে একের পর এক পোস্ট, এবং তারা ভাইরালও হচ্ছে দ্রুতগতিতে। গত ৯ জানুয়ারি এক রাতে ১৬,৮০০ জন তাঁদের টিকিট ক্যান্সেল করেছেন যার ফলশ্রুতিতে ফিফাকে জরুরি বৈঠক পর্যন্ত ডাকতে হয়েছে। খোদ মার্কিন মুলুক থেকে আওয়াজ উঠছে— ট্রাম্প জমানা যদ্দিন চলবে বিশ্বকাপ দেখতে আসবেন না, অলিম্পিক দেখতে আসবেন না, আমেরিকায় বেড়াতে আসবেন না, মার্কিন কোম্পানিদের সঙ্গে ব্যবসা করবেন না।[8]

 

নেদারল্যান্ডসের টিউন ভ্যান ডি কিউকেন বিশ্বকাপ বয়কটের আহ্বান জানিয়ে নিজের দেশের মধ্যেই একটি অনলাইন পিটিশন করেছিলেন। সেই পিটিশনটিতে এই ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩৫,০০০ সই পড়েছে। ডি কিউকেন এখন এই পিটিশনটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। তাঁর কথায়:

স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনগুলো সবসময়েই বলে থাকে তারা খেলার সঙ্গে রাজনীতি মেশাতে চায় না। কিন্তু রাজনীতি রয়েছেই, এবং আমাদেরও অবশ্যই একটা পক্ষ নিতে হবে।[9]

অন্যদিকে কোলনের জার্মান স্পোর্টস ইউনিভার্সিটির ক্রীড়া রাজনীতির অধ্যাপক জুরগেন মিটাগের ধারণা এবারের বিশ্বকাপের টিভি-দর্শক অনেক কম হবে—

আমার মনে হয় ২০২৬-এর গ্রীষ্মে ব্রডকাস্টিং আর মিডিয়ার আচরণ থেকে এই জিনিসটি বোঝা যাবে যে, প্রচুর মানুষ বলবেন ‘আমি জানি বিশ্বকাপ হচ্ছে, কিন্তু আমি মোটেই দেখছি না। আমার আগের বছরগুলোর মতো উৎসাহ নেই, আর খুব ছোট করে হলেও, এইভাবে আমি আমার প্রতিবাদটা জানিয়ে দিতে চাই।’[10]

তো… যেটা দিয়ে শুরু করেছিলাম— গ্রিনল্যান্ড, কলম্বিয়া, ইরান, মেক্সিকো, কিউবা… পর্যায়ক্রমে। কিন্তু আপাতত সবার আগে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ। বাইরে বোম্বেটেগিরি করে বেড়ানোর আগে ট্রাম্পসাহেবের এখন ঘরে মান বাঁচানোর লড়াই।


[1] Savage, Charlie & Bensinger, Ken. Draft List for New Travel Ban Proposes Trump Target 43 Countries. NYT. Mar 14, 2025.
[2] Smart, Ryan. Donald Trump Has Banned Fans From Four Nations From Attending World Cup in US. SportBible. Jan 15, 2026.
[3] Griffiths, Ed. FIFA urged to remove US from own World Cup with 23 MPs signing anti-Donald Trump motion. GB News. Jan 16, 2026.
[4] Pearson, Matt. Trump’s Greenland tariffs: What you need to know. DW. Jan 18, 2026.
[5] German FA official wants World Cup boycott talks. BBC. Jan 24, 2026.
[6] পূর্বোক্ত।
[7] Pearson, Matt. Calls grow for European teams to boycott World Cup 2026. DW. Jan 26, 2026.
[8] Mumford, Robin. 17,000 Fans ‘Cancel World Cup Tickets Overnight’. Givemesport. Jan 13, 2026.
[9] Pearson, Matt. Calls grow for European teams to boycott World Cup 2026. Jan 26, 2026.
[10] Harding, Jonathan. Why Germany probably won’t get political at 2026 World Cup. DW. Jan 19, 2026.

 


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5271 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...