শামীম হক মন্ডল
আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের অভিবাসী ভাইরা যখন আক্রান্ত, সেটা আর কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নেই। ভূলে গেলে চলবে না, লেখচিত্রে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা বিচ্ছিন্ন বিন্দুগুলো যুক্ত করলেই সমস্যার প্রকৃতি স্পষ্ট হয়, আর চোখ-কান খোলা রাখলে তা নজরে পড়ে। আজকের পরিস্থিতি বাঙালিদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, সে আর প্রথম শ্রেণির নাগরিক নয়। ‘হিন্দি-হিন্দু -হিন্দুস্তানে’র জিকিরে ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’ দিনে দিনে ম্লান হতে শুরু করেছে। ভয় দেখানো ও ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়ানো যদি রোজকারের রুটিন হয়ে দাঁড়ায় বাংলাবিদ্বেষীদের, তবে আমাদেরও অধিকার রয়েছে পারস্পরিক ঐক্য ও সংবিধান বুকে ধারণ করে রুখে দাঁড়ানোর
সাতসকালে খবরের কাগজ খুলতেই চোখে পড়ল— অমুক রাজ্যে আবারও আক্রান্ত বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক। শিরোনাম পড়েই মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে উত্তরপ্রদেশ বা হরিয়ানার নাম; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় অধিকাংশ ঘটনাই ঘটছে আমাদের পড়শি রাজ্য, ওড়িশায়। ঢিলছোড়া দূরত্বে অবস্থিত এই রাজ্যের সঙ্গে আমাদের অনেক কিছুরই মিল রয়েছে— পুরীতে গেলে তো মনে হয় ওড়িয়াভাষী মানুষের চেয়ে বাঙালির সংখ্যাই বেশি। সেই ওড়িশার জয়পুর, বামনিগাঁও, সম্বলপুর থেকে বাংলার অভিবাসী শ্রমিকদের জোরপূর্বক খেদিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ট্রেনের কামরায় ঢুকে টিপে টিপে মাছ বাছার মতো করে চিহ্নিত করা হচ্ছে বাংলাভাষা-ভাষীদের, দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশি বলে। আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, নিজের সচিত্র পরিচয়পত্র খুলে দেখালেও অত্যাচার বন্ধ হচ্ছে না। এই তো কদিন আগেই, জুয়েল রানা নামের ২২ বছরের এক তরুণ অভিবাসী শ্রমিককে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে। প্রশাসন তাকে বাঁচাতে পারেনি, এমনকি খুনের পরে তাঁর সহকর্মীদেরও নিরাপত্তা দিতে চায়নি; উপরন্তু বলেছে— “বাঁচতে চাস তো পালিয়ে যা।” এটা কোনও সুষ্ঠ প্রশাসনের ভাষা হতে পারে!
গত কয়েক বছর ধরে মহারাষ্ট্র, গুজরাত, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ— এক কথায় দিল্লি-পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী, বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে কেবলমাত্র সন্দেহের বশে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে হেনস্থা করা হচ্ছে; বলা হচ্ছে বাংলাদেশ চলে যাও। শুধু বলাই হচ্ছে তাই নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে পাঠানোর বন্দোবস্ত করা হচ্ছে— গর্ভবতী সোনালি খাতুনের কথা তো আমরা সকলেই জানি। ভুক্তভোগী মানুষজনের মধ্যে অধিকাংশই রাজমিস্ত্রি, দিনমজুর বা অভিবাসী শ্রমিক, যাঁরা কেবল বাংলাভাষাতেই কথা বলতে পারেন মাত্র। এই একমুখিতাই তাঁদের জীবনকে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিল। এই তো দুদিন আগেই, বাংলা বলার কারণে উত্তরপ্রদেশে খুন হন সিঙ্গুরের এক যুবক। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক সপ্তাহে সারা দেশে ১২ জন বাঙালি অভিবাসী শ্রমিক খুন হয়েছেন, যার মধ্যে ৯ জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এবং তিনজন তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষ। হেনস্থার এই সিলসিলা যেন আর বন্ধ হওয়ার নয়!
গত কয়েক বছর ধরে তুষের আগুনের মতো বাড়তে থাকা এই বাঙালি বিদ্বেষের কারণ কি?
অনুসন্ধানের আগে একটা কাঁচা প্রশ্ন করে বসি— আমাদের রাজ্যে যে এত ওড়িয়া বা বিহারি শ্রমিক কাজ করেন, কাউকে কখনও গণপিটুনির শিকার হতে দেখেছেন, কেউ ভাষা বা জাতিবিদ্বেষের জন্য গলাধাক্কা খেয়েছেন কোথাও?
মনে করতে থাকুন, আমি বরং আগের প্রশ্নটা নিয়ে এগিয়ে চলি। গত এক দশক ধরে দেশজুড়ে একটা সুশৃঙ্খল ন্যারেটিভ প্রচার করা হচ্ছে— বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশি, আর বাংলাদেশি মানেই বেআইনি অনুপ্রবেশকারী। অতএব তাকে তাড়াও, প্রয়োজনে মেরে ফেলো। অবশ্য এই জাতীয় ন্যারেটিভের আরও কিছু স্লোগান খুব স্পষ্ট— ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললে সে শত্রু, আর প্রশ্ন করলেই দেশদ্রোহী। এই বিশ্বাস আজ সিস্টেমের কোণে কোণে ঢুকে গেছে। এর বিপরীত ন্যারেটিভের লোকজন যখন সংবিধানের রেফারেন্স দিয়ে সমান অধিকার, মৌলিক অধিকারের কথা বলার চেষ্টা করছে, তখনই তাঁদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হচ্ছে, দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিপজ্জনক বলে। এই অ্যালগরিদম সমানতালে চলছে, আরও বলা ভালো চালানো হচ্ছে। কারা চালাচ্ছে? সোজা কথায় রাষ্ট্রযন্ত্র। কীভাবে?
না, এসব ব্যাপারে সে যথেষ্টই শান্ত; নৈরাজ্য বন্ধ করার জন্য সে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে নীরব সম্মতিকে। আর এই রহস্যময় মৌনতার ভেতর লুকিয়ে আছে কলুষিত এক রাজনৈতিক প্রাঙ্গণ, যেখানে জাতীয়তাবাদের আড়ালে ঘৃণার চাষ হচ্ছে প্রতিনিয়ত; কোনও ভিন্ন মতের আগরের দেখা মিললেই পোঁতা হচ্ছে দেশদ্রোহিতার হাঁড়িকাঠ।
আসলে, এই মেকি দেশপ্রেমের আড়ালে উঁকি দিচ্ছে পুঁজিবাদী রাক্ষসের সিং। আমরা দেখেছি যাঁদেরকে হেনস্থা করা হচ্ছে, তাঁরা আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষজন; নিজের পৈতৃক ভিটেমাটিতে জীবন চালানোর মতো রোজগার নেই, ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ভিনরাজ্যে পা বাড়াচ্ছেন তাঁরা। যে-কোনও কাজের বাজারে শ্রমিকের যদি এত আধিক্য থাকে, তবে তাঁদের সঙ্গে ইচ্ছামতো ব্যবহার করতেই পারেন ঠিকাদারেরা। আর ধর্মের ভিত্তিতে, ভাষার নিরিখে যদি তাঁদের মধ্যে একবার বিভাজন তৈরি করে দেওয়া যায়, তাহলে তো কেল্লা ফতে— কম পয়সায় শ্রমিক মিলবে। হচ্ছেও তাই। বেশ কয়েকজন অভিবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল— সাধারণত তাঁরা পনেরো দিন বা মাসে টাকা পান ঠিকাদারদের কাছ থেকে, কিন্তু মাসখানেকের বকেয়া চাইতে গেলেই কয়েকজন ঠিকাদার বেঁকে বসে। বচসা শুরু হতেই দাগিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশি বলে। এবার প্রাণ হাতে নিয়ে পালাও; বেঁচে ফিরলে তো টাকা! দৈনন্দিন খবরের কাগজে আমরা যে পরিসংখ্যান দেখতে পাচ্ছি, তা হিমশৈলর চূড়া মাত্র। যাঁরা খুন হয়ে গেছেন বা শারীরিকভাবে হেনস্থার সম্মুখীন হচ্ছেন, তাঁদের খবর মিডিয়ায় আসছে; আর দলবেঁধে যাঁরা পয়সা না নিয়ে জীবন হাতে করে কোনওমতে পালিয়ে আসছেন, সে হিসেব আর কজন রাখে!
আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের অভিবাসী ভাইরা যখন আক্রান্ত, সেটা আর কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নেই। ভূলে গেলে চলবে না, লেখচিত্রে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা বিচ্ছিন্ন বিন্দুগুলো যুক্ত করলেই সমস্যার প্রকৃতি স্পষ্ট হয়, আর চোখ-কান খোলা রাখলে তা নজরে পড়ে। আজকের পরিস্থিতি বাঙালিদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, সে আর প্রথম শ্রেণির নাগরিক নয়। ‘হিন্দি-হিন্দু -হিন্দুস্তানে’র জিকিরে ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’ দিনে দিনে ম্লান হতে শুরু করেছে। ভয় দেখানো ও ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়ানো যদি রোজকারের রুটিন হয়ে দাঁড়ায় বাংলাবিদ্বেষীদের, তবে আমাদেরও অধিকার রয়েছে পারস্পরিক ঐক্য ও সংবিধান বুকে ধারণ করে রুখে দাঁড়ানোর।
বাংলায় বসে বিরোধী দলনেতারা বিভিন্ন ইস্যুতে সোচ্চার হন, তাঁদেরও কিন্তু একবার অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কথা বলা উচিত। আজ যখন বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস হুমকির মুখে, তখন প্রতিবাদ করাটা আর আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটা এখন সময়ের দাবি। আমাদের মনে রাখা দরকার, একটা সুস্থ সমাজকে টিকে থাকতে গেলে বিরুদ্ধ মতপ্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। আর বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য এ-দেশের ঐতিহ্য, পরম্পরা। বিরুদ্ধ মতকে মানতে না পারলে আপত্তি নেই, কিন্তু প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। মনে রাখা দরকার বিরোধীরাই গণতন্ত্রের দর্পণ। কেবলমাত্র আমার চিন্তা-চেতনা, সংস্কৃতিই থাকবে, আর তোমাদের সবাইকে সেটাই মানতে হবে— এই চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতি একটা সুস্থ সমাজের জন্য কাম্য নয়। এই আস্ফালনের বিরুদ্ধে, এখনই রুখে দাঁড়াতে না পারলে গণপিটুনির এই ধারা চলতেই থাকবে।
*মতামত ব্যক্তিগত

