এসআইআর ২০২৬: মহিলা বিএলও-দের অদৃশ্য হাহাকার

অঞ্জুশ্রী দে

 


২০২৬-এর এসআইআর-এর যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোর চরম অসংবেদনশীলতাকেই প্রকট করে তুলেছে। বিশেষত, মহিলা বিএলও-দের অমানবিক পরিশ্রম এবং পরিস্থিতির চাপে তৈরি হওয়া ‘ছায়া-কর্মী’-দের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বর্তমান পদ্ধতিটি কতটা অবাস্তব। নির্ভুল ভোটারতালিকার সাফল্যের ইমারত যদি কর্মীদের মৃতদেহের ওপর তৈরি হয়, তবে তা গণতন্ত্রের পক্ষে চরম লজ্জার

 

ভারতের নির্বাচন কমিশন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরালা, আসাম ও পুদুচেরির মতো রাজ্যগুলোতে এসআইআর (বিশেষ নিবিড় সংশোধন) কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এই বিশাল কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য হল ভোটারতালিকা থেকে মৃত, স্থানান্তরিত এবং ডুপ্লিকেট ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে একটি স্বচ্ছ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করা। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ ২৪ বছর পর এই নিবিড় সংশোধন হচ্ছে, যা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক কাঠামো ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বিচার করে এই সংশোধনের জন্য দীর্ঘ ১০৩ দিনের একটি নির্ঘণ্ট তৈরি করা হয়। তবে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে কমিশনকে কয়েক দফায় সময়সীমা পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে। গত ২৮ অক্টোবর ২০২৫, ফর্ম মুদ্রণ ও প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে এই কাজ শুরু হয়। এরপর ৪ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ৩১ দিন বিএলও-রা (বুথ লেভেল অফিসার) বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষ করেন এবং ১৬ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমানে ভুল সংশোধন ও নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য সশরীরে শুনানি (হিয়ারিং) চলছে, যা ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত চলবে। যাবতীয় প্রক্রিয়ার শেষে আগামী ৭ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত ও নির্ভুল ভোটারতালিকা প্রকাশ হওয়ার কথা।

এই বিশাল কাজের মূল দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল রাজ্যের ৮০,৬৮১ জন বিএলও-র ওপর। এদের মধ্যে মহিলা বিএলও-র সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি বিএলও-কে তাঁদের নির্দিষ্ট বুথ এলাকার অন্তত ১,০০০ থেকে ১,২০০ ভোটারের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনুমারেশন ফর্ম (ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের ফর্ম) পূরণ ও যাচাইকরণ করতে হয়েছে। কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রথমবার কাউকে না পাওয়া গেলে অন্তত তিনবার তাঁর বাড়িতে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। এই কঠিন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের, বিশেষ করে মহিলা কর্মীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

 

মহিলা বিএলও-দের পেশাগত ও জীবনের যন্ত্রণা

পশ্চিমবঙ্গে বিএলও হিসেবে নিযুক্ত মহিলাদের সিংহভাগই সমাজের কোনও না কোনও গুরুত্বপূর্ণ পেশার সঙ্গে যুক্ত— কেউ শিক্ষক, কেউ অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, আবার কেউবা গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মী। এই এসআইআর-এর কাজের চাপে তাঁদের নিজস্ব পেশাগত পরিচয় আজ প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে। তাঁদের মূল দায়িত্ব ও পরিচয়— উভয়ই আজ সংকটাপন্ন।

দ্বৈত কাজের বোঝা: শিক্ষকতাকে মহিলাদের জন্য একটি সম্মানজনক এবং পারিবারিক ভারসাম্য রক্ষার অনুকূল পেশা মনে করা হয়। বিএলও ডিউটি সেই ভাবনাকে আমূল বদলে দিয়েছে। মহিলা বিএলও-দের অভিজ্ঞতায় ধরা পড়েছে এক চরম বৈষম্য। অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব থেকে রেহাই দেয়নি। এর ফলে একজন শিক্ষিকাকে সকালে দীর্ঘ সময় স্কুলে শিক্ষকতা করতে হয়েছে এবং স্কুল ছুটির পর ক্লান্ত শরীরে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভোটারদের দোরগোড়ায় তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে। পেশাগত দায়িত্ব ও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ— এই দুই জাঁতাকলে পড়ে তাঁদের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে।

২৪ ঘণ্টার ফোন-দাসত্ব: বিএলও-দের প্রতি নির্বাচন কমিশনের অলিখিত নির্দেশ ছিল— ফোন ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখতে হবে, যাতে ভোটাররা যে-কোনও সময় যোগাযোগ করতে পারেন। এটি বিশেষ করে মহিলা কর্মীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভোটাররা সময়ের জ্ঞান বা সৌজন্যবোধের তোয়াক্কা করেননি। গভীর রাতে ফোনের ওপার থেকে আসা কোনও ভোটারের দাবি বা জিজ্ঞাসার উত্তর দিতেও তাঁরা বাধ্য হয়েছেন। মাথার ওপর কমিশনের শাস্তির খাড়া এবং ‘চাকরি বা পেনশনে বিপদ হতে পারে’— এই চিরন্তন ভীতি মহিলা কর্মীদের এতটাই তাড়িয়ে বেড়িয়েছে যে, অসুস্থ সন্তান বা পারিবারিক জরুরি মুহূর্তকেও তুচ্ছ করে তাঁরা মধ্যরাতে ফোন ধরতে বাধ্য হয়েছেন। এই ‘২৪ ঘণ্টার ডিউটি’ একজন নারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও বিশ্রামের অধিকারকে সম্পূর্ণ ধুলিসাৎ করে দিয়েছে।

শৌচাগারের তীব্র সংকট: মহিলা বিএলও-দের জন্য সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক ও অবমাননাকর অভিজ্ঞতা হল সারাদিন পথে পথে ঘোরার সময় ন্যূনতম শৌচাগারের অভাব। গ্রাম বা শহরের অলিগলিতে বাড়ি বাড়ি ঘোরার সময় শৌচকর্মের প্রয়োজনে তাঁদের চূড়ান্ত বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের বাড়ির বাথরুম ব্যবহার করতে গিয়ে তাঁদের মুখের ওপর রূঢ়ভাবে ‘না’ শুনতে হয়েছে। কমিশন বুথ-ভিত্তিক স্কুলের কথা বললেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন; রাজ্যে সব জায়গায় বুথ-ভিত্তিক স্কুল নেই, আর যেখানে আছে সেখানেও বিএলও-দের কাজের সময় ও স্কুল খোলার সময়ের মধ্যে কোনও মিল নেই। দীর্ঘ সময় শৌচাগার ব্যবহার না করতে পেরে এবং পর্যাপ্ত জল পান না করার ফলে বহু মহিলা কর্মী মূত্রনালীর সংক্রমণ (ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন)-সহ বিভিন্ন জটিল শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন। এটি কেবল কাজের চাপ নয়, বরং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

ডিজিটাল অভিশাপ: ২০২৬-এর সংশোধন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন প্রযুক্তির ওপর যে অতি-নির্ভরতা দেখিয়েছে, তা মহিলা বিএলও-দের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই ‘ডিজিটাল অভিশাপ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘বিএলও অ্যাপ’ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১৫০টি ফর্ম আপলোড করার এক অসম্ভব লক্ষ্যমাত্রা তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে প্রবীণ মহিলা কর্মী বা অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা, যাঁরা প্রযুক্তিতে ততটা সাবলীল নন, তাঁদের কাছে এই অ্যাপটি একটি আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। অ্যাপের যান্ত্রিক ত্রুটি— যেমন, ক্যামেরা অটো-ফোকাস না হওয়া, বারবার সার্ভার ক্র্যাশ করা— এবং ইন্টারনেটের গতি কম থাকার কারণে একটি ফর্ম আপলোড করতেই দীর্ঘ সময় চলে গেছে। এই কারিগরি ব্যর্থতার দায় কমিশন না নিয়ে উল্টে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা শোকজ-এর হুমকি দেওয়ায় বহু কর্মী রাতের পর রাত জেগে ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিনে লড়াই চালিয়ে গেছেন।

স্বাস্থ্যহানি ও মৃত্যুমিছিল: অমানবিক পরিশ্রম এবং উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের অবিরাম চাপের ফলে মহিলা বিএলও-দের স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে। সারাদিন প্রখর রোদে গ্রাম থেকে গ্রামে হেঁটে কিংবা হাইরাইজের একতলা থেকে অন্যতলায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহের পর রাতে ডেটা এন্ট্রি করতে গিয়ে বহু কর্মী গভীর অবসাদ ও শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়েছেন। উত্তর ২৪ পরগনা ও নদীয়া জেলায় একাধিক মহিলা বিএলও-র অস্বাভাবিক মৃত্যু ও আত্মহত্যার মর্মান্তিক ঘটনা এই অমানবিক চাপের বাস্তব প্রতিফলন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ার প্রবল চাপে গত ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় ৭৭ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং অসংখ্য মানুষ বর্তমানে চিকিৎসাধীন। এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল সংখ্যা নয়, বরং এক-একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের করুণ আখ্যান।

অমানবিক লক্ষ্যমাত্রা ও ‘অদৃশ্য কর্মী’: ২০২৬-এর ভোটারতালিকা সংশোধনে এক অদ্ভুত বাস্তবতা সামনে এসেছে। অনেক মহিলা বিএলও-র হয়ে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ‘ছায়া-কর্মী’ হিসেবে কাজ করছেন, যাঁরা এখন ‘হাফ-বিএলও’ নামে পরিচিত। এটি কোনও সরকারি পদ নয়, বরং কাজের অতিরিক্ত চাপে বাধ্য হয়ে পরিবারের সাহায্য নেওয়া। এই সদস্যরাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম বিলি করা, ছবি তোলা বা রাতে অ্যাপে তথ্য আপলোড করার মতো কঠিন কাজগুলো সামলেছেন। এই কাজ করতে গিয়ে যখন কোনও বিএলও-র স্বামী রসিকতা করে বলেন, “আমিই এখন হাফ-বিএলও”, তখন সেই রসিকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রশাসনিক ব্যর্থতার ছবিটি প্রকট হয়ে ওঠে।

রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী কাজ মানেই এক অজানা আশঙ্কার বাতাবরণ। বহু মহিলা বিএলও সংবেদনশীল এলাকা বা অপরিচিত পাড়ায় একা যেতে নিরাপত্তার অভাব বোধ করেছেন; এমতাবস্থায় পরিবারের পুরুষ সদস্যরা তাঁদের ছায়ার মতো আগলে রেখেছেন। পাশাপাশি, যখন সরকারিভাবে নিযুক্ত একজন মহিলা বিএলও ডিজিটাল প্রযুক্তির জটিলতা, ত্রুটিপূর্ণ বিএলও অ্যাপ কিংবা অমানুষিক শারীরিক পরিশ্রমে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন, তখনই তাঁর রক্ষাকর্তা হিসেবে পরিবারের কোনও সদস্য পাশে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন। মূলত প্রশাসনিক লাঞ্ছনা বা সাসপেনশন-এর হাত থেকে রেহাই পেতেই এই বিকল্প পথ বেছে নেওয়া।

প্রকৃতপক্ষে, একজন মহিলার ওপর যখন ঘর সামলানো, সন্তানপালন এবং মূল পেশাগত কর্তব্যের পর বিএলও-র এই গুরুভার চেপে বসে, তখন সময়ের অভাব তাঁকে পর্যুদস্ত করে তোলে। এই নিরাপত্তার অভাব, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন— এই ত্রিমুখী সংকট থেকে বাঁচতেই পরিবারের সদস্যরা এক একজন ‘অদৃশ্য কর্মী’ হিসেবে মহিলা বিএলও-দের সুরক্ষা দিয়েছেন।

যদিও এই ‘হাফ বিএলও’ সংস্কৃতি নির্বাচনের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দেয়, তবুও বাস্তব সত্য হল— ২০২৬-এর এসআইআর-এর চাকা সচল রাখার এটাই ছিল একমাত্র অলিখিত জ্বালানি। প্রশাসন এই ছায়া-কর্মকাণ্ডের কথা জেনেও সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চাপে মুখে কুলুপ এঁটেছে। এই পুরো ঘটনাটি এটাই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র যখন মানুষের ওপর অমানবিক কাজের বোঝা চাপিয়ে দেয়, তখন আপনজনদের রক্ষা করতে মানুষ নিজেই এক সমান্তরাল সহযোগিতা ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

 

প্রশাসনিক নিষ্ঠুরতা ও অকালমৃত্যুর মিছিল

নির্বাচনী সংস্কারের আড়ালে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর যে অমানুষিক মানসিক চাপ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার করুণ পরিণতিই হল একের পর এক প্রাণহানি। নদিয়া থেকে তামিলনাড়ু— ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও বিএলও এবং অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের যন্ত্রণার ছবিটা কিন্তু একই। যখন কাজের লক্ষ্যমাত্রা মানুষের প্রাণের চেয়েও দামি হয়ে ওঠে, তখনই নদিয়ার প্যারা-টিচার রিঙ্কু তরফদারের আত্মহত্যার মতো ট্র্যাজেডি আমাদের সামনে আসে। রিঙ্কু তাঁর সুইসাইড নোটে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের অসহনীয় চাপের কথা লিখে গিয়েছেন; যা প্রমাণ করে যে এটি কোনও নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনের চূড়ান্ত অমানবিকতার ফল।

একইভাবে, প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের কাজ সহজ করার কথা থাকলেও, শান্তিমণি এক্কার মতো মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাছে তা আজ এক মস্ত বড় আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। নদিয়ার সীমান্ত এলাকায় কাজ করতে গিয়ে শান্তিমণি মূলত তিনটি বড় বাধার মুখে পড়েছিলেন— ভাষাগত সমস্যা, ভোটারতালিকার জটিল আইনি নিয়ম এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতার অভাব। একজন সাধারণ অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীর পক্ষে সীমান্ত এলাকার নথিপত্রের এই পাহাড়প্রমাণ জটিলতা একা সামলানো অসম্ভব ছিল। কিন্তু প্রশাসনিক সহযোগিতার বদলে তাঁর জুটেছে কেবলই সাসপেনশন বা শাস্তির হুমকি। ওই কঠিন ডিজিটাল ফর্ম আর আইনি মারপ্যাঁচে দিশেহারা হয়ে শান্তিমণি শেষ পর্যন্ত চরম আতঙ্কে আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। তাঁর এই মৃত্যু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি না বুঝে স্রেফ ওপর থেকে নিয়ম চাপিয়ে দিলে তা কতটা অমানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হল, এই এসআইআর-এ গুরুতর অসুস্থতাকেও প্রশাসনিক জেদের কাছে তুচ্ছ করা হয়েছে। বাঁকুড়া বা উত্তর দিনাজপুরে দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাক বা মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও বিএলও-দের ছুটি দেওয়া হয়নি। উল্টে, ‘ডিজিটাল টার্গেট’ পূরণ না হলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা সাসপেনশনের মতো ভয়ঙ্কর হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা কোনও গণতান্ত্রিক দেশের প্রশাসনিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। এই ধরনের আচরণ কেবল শ্রম অধিকারের লঙ্ঘন নয়, বরং সাধারণ কর্মীদের ওপর একপ্রকার মানসিক নিগ্রহ, যা তাঁদের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ভোটারতালিকা শুদ্ধ করা বা ডিজিটাল ইন্ডিয়া গড়ার উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই মহৎ, কিন্তু সেই সাফল্যের ইমারত যদি সাধারণ মানুষের লাশের ওপর দাঁড়ায়, তবে তা গণতন্ত্রের পক্ষে চরম লজ্জার। নির্বাচন কমিশন ও সরকারের উচিত অবিলম্বে এই ‘ডেডলি ডেডলাইন’ বা প্রাণঘাতী সময়সীমার সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও মানবিক অধিকারের দিকে নজর দেওয়া।

 

কাগজে-কলমে নিরাপত্তা, বাস্তবে আতঙ্ক

ভোটারতালিকা সংশোধনের কাজে যুক্ত মহিলা বিএলও-দের ওপর রাজনৈতিক চাপও মারাত্মক ছিল। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাইয়ের সময় স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী ও ক্যাডারদের কড়া নজরদারি অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশ্য হুমকির পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে নির্জন এলাকা বা প্রত্যন্ত সীমান্তে মহিলা বিএলও-দের একা পেয়ে নাম তোলা বা বাদ দেওয়ার জন্য যে ধরনের অশালীন চাপ দেওয়া হয়েছে, তাতে বিঘ্নিত হয়েছে, তাঁদের ব্যক্তিগত সম্মান ও মানসিক নিরাপত্তা। নির্বাচন কমিশন কাগজে-কলমে পুলিশি নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও, বাস্তবে অসহায় মহিলারা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক দড়িটানাটানির শিকার হয়ে অনেকে আজ নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। একদিকে ডিজিটাল টার্গেটের পাহাড়প্রমাণ চাপ, আর অন্যদিকে রাজনৈতিক লাঞ্ছনা— এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে মহিলা বিএলও-দের জীবন এক দুঃসহ নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে।

 

পরিশেষে

২০২৬-এর এসআইআর-এর এই যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোর চরম অসংবেদনশীলতাকেই প্রকট করে তুলেছে। বিশেষত, মহিলা বিএলও-দের অমানবিক পরিশ্রম এবং পরিস্থিতির চাপে তৈরি হওয়া ‘ছায়া-কর্মী’-দের (পরিবারের সদস্যরা) উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বর্তমান পদ্ধতিটি কতটা অবাস্তব। নির্ভুল ভোটারতালিকার সাফল্যের ইমারত যদি কর্মীদের মৃতদেহের ওপর তৈরি হয়, তবে তা গণতন্ত্রের পক্ষে চরম লজ্জার। তাই ভবিষ্যতে শিক্ষক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর এই অমানুষিক বোঝা না চাপিয়ে প্রতিটি ব্লকে একটি স্থায়ী ‘নির্বাচনী কর্মী বাহিনী’ নিয়োগ করা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে, একজন মহিলার পারিবারিক ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে কর্মপরিবেশকে নারীবান্ধব করা, লক্ষ্যমাত্রা ৫০০ ভোটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং প্রযুক্তির ব্যবহারকে সহজতর করা একান্ত প্রয়োজন। প্রকৃত ‘শুদ্ধিকরণ’ কেবল ভোটারতালিকায় নয়, বরং প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিতেও আসা জরুরি। অদম্য প্রতিকূলতার মধ্যে লড়াই চালিয়ে যাওয়া এই মহিলাদের সংগ্রামকে যোগ্য মর্যাদা দিয়ে একটি নিরাপদ ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার।


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5271 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...