আশিস গুপ্ত
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগ ড্রাগ ট্রাফিকিং ও ড্রাগ কার্টেলকে মদত দেওয়া। এ ধরনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। মিথ্যা অভিযোগে রাষ্ট্রপ্রধানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা পশ্চিমি পুঁজিবাদী দেশগুলির পুরানো কৌশল। প্রচারমাধ্যমের সাহায্য নিয়ে মিথ্যা অভিযোগে ইরাকে হামলা চালিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার শাগরেদ দেশগুলি। ইরাকের লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করে, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে খুন করা হয়েছিল রাষ্ট্রপ্রধান সাদ্দাম হুসেনকে। খুন করা হয়েছিল লিবিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান মুয়াম্মার গদ্দাফিকে। এসবই তো সংঘটিত হয়েছে মিথ্যা অভিযোগে, যার নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগের সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিপরীতমুখী রিপোর্টের বিষয়টি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর
৩৬ বছরের ব্যবধানে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঔপনিবেশিক ‘মনরো ডকট্রিন’। ২০৩ বছরের পুরনো ডকট্রিন বা তত্ত্ব অনুসরণ করেই, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক রাতের অন্ধকারে অপহরণ করে নিউইয়র্ক নিয়ে গেছে মার্কিন সেনা। অনেকটা সেই নেটফ্লিক্সে দেখা মেক্সিকো বা কলম্বিয়ার ড্রাগ কার্টেলের মধ্যেকার গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের মতো। তবে এক্ষেত্রে বিষয়টা একপক্ষীয়। কোনও প্রতিরোধ ছাড়াই মার্কিন সেনার বিশেষ বাহিনী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে অপহরণ করে নিয়ে গেল। কোনও আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে, রাষ্ট্রসংঘকে মেরুদণ্ডহীন চিহ্নিত করে ওয়াশিংটন এই অপহরণ সংঘটিত করল। ঠিক এরকমটাই ঘটেছিল ১৯৮৯ সালে পানামায়। তৎকালীন পানামার শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগা একসময় সিআইএ-র পেইড এজেন্ট ছিলেন। কিন্তু পরে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে আমেরিকা নিজেই তাঁকে উৎখাত করতে নামে। নরিয়েগা যখন আমেরিকার কথা শোনা বন্ধ করেন এবং ড্রাগ পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তখন আমেরিকা তাঁকে নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য ছিল পানামা খালের ওপর আমেরিকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর শুরু হয় ‘অপারেশন জাস্ট কজ’, প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ২৭,০০০ সৈন্য পাঠিয়ে পানামা আক্রমণ করেন। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর লাতিন আমেরিকায় আমেরিকার বৃহত্তম সামরিক অপারেশন। নরিয়েগাকে বন্দি করে আমেরিকায় নিয়ে আসা হয় এবং ড্রাগ ট্রাফিকিংয়ের দায়ে বিচার করা হয়। কিন্তু এই যুদ্ধে পানামার কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ নিহত হন এবং বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়। একইভাবে, নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধেও ড্রাগ ট্রাফিকিং-এর অভিযোগ এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যদিও এই অভিযোগ সম্পর্কে মার্কিন তদন্তকারী সংস্থাগুলি ভিন্নমত পোষণ করে। তবে সে আলোচনায় যাওয়ার আগে ঔপনিবেশিক ‘মনরো ডকট্রিন’ কী, সেটা একটু বুঝে নেওয়া যাক।
১৮২৩ সালে ঘোষিত মনরো ডকট্রিন ছিল পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রথম ও প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো এটি ঘোষণার মাধ্যমে ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন যে, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে তারা আর নতুন করে কোনও উপনিবেশ গড়ে তুলতে পারবে না। বিশেষ করে স্পেন ও পর্তুগালের উপনিবেশগুলো যখন একে একে স্বাধীনতা লাভ করছিল, তখন ফ্রান্স বা রাশিয়ার সম্ভাব্য দখলদারিত্ব রুখতে আমেরিকা এই কঠোর অবস্থান নেয়। এই ডকট্রিনের মূল শর্ত ছিল— ইউরোপ যদি আমেরিকা মহাদেশের কোনও দেশে নতুন করে হস্তক্ষেপ বা দখলদারিত্বের চেষ্টা করে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে সরাসরি নিজেদের বিরুদ্ধে একটি ‘শত্রুতামূলক আচরণ’ হিসেবে গণ্য করবে। ইউরোপীয় দেশগুলো পশ্চিম গোলার্ধে নতুন করে কোনও উপনিবেশ গড়ে তুলতে পারবে না। বিনিময়ে আমেরিকাও ইউরোপের অভ্যন্তরীণ কোনও দ্বন্দ্বে জড়াবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। মূলত ইউরোপীয়দের দূরে রাখার এই কৌশলের মাধ্যমেই আমেরিকা পুরো মহাদেশকে নিজের প্রভাব-বলয়ের (Sphere of Influence) অন্তর্ভুক্ত করে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট এই নীতিকে আরও আক্রমণাত্মক রূপ দেন, যা ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’ বা যুদ্ধজাহাজ কূটনীতি নামে পরিচিত। ১৯০৪ সালে রুজভেল্ট ঘোষণা করেন যে, লাতিন আমেরিকার কোনও দেশে অস্থিরতা দেখা দিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ‘আন্তর্জাতিক পুলিশ’ হিসেবে হস্তক্ষেপ করবে। তাঁর দর্শন ছিল— “Speak softly and carry a big stick” (মৃদুস্বরে কথা বলো কিন্তু হাতে একটি বড় লাঠি রাখো)। এই ‘বড় লাঠি’ বলতে তিনি মার্কিন নৌবাহিনীকে বুঝিয়েছেন, যা ব্যবহার করে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই সমুদ্রতীরে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে ছোট দেশগুলোকে মার্কিন ইচ্ছা মানতে বাধ্য করা হত। পানামা খাল নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে মধ্য আমেরিকার ‘বানানা রিপাবলিক’ দেশগুলোতে মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থরক্ষা— সবক্ষেত্রেই এই পেশিশক্তির কূটনীতি ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবেই মনরো ডকট্রিনের ঘোষণাকে কার্যকর করতে ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’ এক নগ্ন সামরিক আস্ফালন হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই দুটি নীতির মাধ্যমেই আমেরিকা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছিল এবং আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় (লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চল) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘আন্তর্জাতিক পুলিশ’ হওয়ার এই ভূমিকা প্রধানত ১৯০৪ সালের ‘রুজভেল্ট করোলোরি’ (Roosevelt Corollary) থেকে শুরু হয়। আমেরিকা নিজেকে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষার রক্ষক হিসেবে ঘোষণা করলেও, আদতে এটি ছিল তাদের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থরক্ষার একটি হাতিয়ার। সবচেয়ে বড় ‘পুলিশি’ হস্তক্ষেপের উদাহরণ হল পানামা। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করতে আমেরিকা পানামা খাল তৈরি করতে চেয়েছিল। তৎকালীন কলম্বিয়া সরকার (যাদের অধীনে পানামা ছিল) আমেরিকার শর্তে রাজি না হওয়ায় প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠান। আমেরিকার উস্কানিতে পানামায় বিদ্রোহ শুরু হয় এবং মার্কিন নৌবাহিনী কলম্বিয়ার সৈন্যদের বাধা দেয়। পানামা স্বাধীন হয় এবং বিনিময়ে আমেরিকাকে খালের নিয়ন্ত্রণ লিখে দেয়। একে বলা হয় বিশুদ্ধ ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’। মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে (যেমন হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা) মার্কিন ফল কোম্পানিগুলোর (যেমন United Fruit Company) বাণিজ্যিক স্বার্থরক্ষার জন্য বারবার মার্কিন মেরিন সেনাদলকে পাঠানো হয়েছিল। যদি কোনও দেশের সরকার এই কোম্পানিগুলোর ওপর কর বাড়াতে চাইত বা শ্রমিক অধিকার নিয়ে কথা বলত, আমেরিকা সেই সরকারকে হটিয়ে নিজেদের অনুগত কাউকে ক্ষমতায় বসাত। স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধের পর কিউবাকে স্বাধীনতা দেওয়া হলেও তাদের সংবিধানে ‘প্ল্যাট অ্যামেন্ডমেন্ট’ যুক্ত করতে বাধ্য করা হয়। এর মাধ্যমে আমেরিকাকে অধিকার দেওয়া হয় যে কিউবার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তারা যখন খুশি সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারবে। ১৯০৬ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে আমেরিকা তিনবার কিউবায় সেনা পাঠায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সরাসরি সেনা পাঠানোর চেয়ে ‘গোপন’ বা প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের দিকে ঝোঁকে আমেরিকা। সিআইএ (CIA) এই সময় ‘অদৃশ্য পুলিশের’ ভূমিকা পালন করে। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জ্যাকোবো আরবেনজ ভূমি সংস্কারের উদ্যোগ নিলে মার্কিন ফল কোম্পানির ব্যবসায় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। সিআইএ একটি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে আরবেনজকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ১৯৭৩ সালে চিলি-তে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক নেতা সালভাদর আলেন্দে-কে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সিআইএ সামরিক জান্তা অগাস্তো পিনোচে-কে মদত দেয়। কারণ, ১৯৭০ সালে সমাজতান্ত্রিক নেতা সালভাদর আলেন্দে গণতান্ত্রিকভাবে চিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তামা খনি-সহ বিভিন্ন বিদেশি (প্রধানত মার্কিন মালিকানাধীন) শিল্প জাতীয়করণের উদ্যোগ নেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং হেনরি কিসিঞ্জার সিআইএ-কে নির্দেশ দেন— “Make the economy scream.” অর্থাৎ, চিলির অর্থনীতিকে এমনভাবে পঙ্গু করে দাও যাতে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। সিআইএ-র ‘ফুবেল্ট’ সাঙ্কেতিক নামের অভিযান শুরু করে দেয়। সিআইএ গোপনে চিলির সামরিক কর্মকর্তাদের ঘুষ দেয় এবং সংবাদমাধ্যমে প্রোপাগান্ডা ছড়ায়। ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩-এ জেনারেল অগাস্তো পিনোচে-র নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস বিমান থেকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয় এবং আলেন্দে নিহত হন। পিনোচের ১৭ বছরের স্বৈরশাসনে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা ও নিখোঁজ করা হয়, যার পেছনে আমেরিকার সমর্থন ছিল। চিলির ঘটনাটি আমেরিকার গোপন পুলিশগিরির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। ১৯৮০-র দশকে নিকারাগুয়ার বামপন্থী সান্দিনিস্তা সরকারকে হঠানোর জন্য আমেরিকা ‘কন্ট্রা’ নামক বিদ্রোহী বাহিনীকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে। এটি আন্তর্জাতিক আদালতের আইন লঙ্ঘনের এক চরম উদাহরণ। ১৯৬৫ সালে ডোমিনিকান রিপাবলিকে গৃহযুদ্ধের সময় দেশটিতে সাম্যবাদ আসতে পারে এই ভয়ে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন ৪২,০০০ সৈন্য পাঠিয়েছিলেন। ১৯৮৩ সালে দ্বীপরাষ্ট্র গ্রেনাডায় একটি অভ্যুত্থানের পর কিউবা ও রাশিয়ার প্রভাব বাড়বে এই আশঙ্কায় আমেরিকা সরাসরি আক্রমণ করে সেখানকার সরকার বদলে দেয়।

কেন এই পুলিশগিরি? মূলত তিনটি কারণ।
১. পুঁজিবাদ রক্ষা: মার্কিন কোম্পানিগুলোর সস্তা শ্রম ও খনিজ সম্পদের জোগান নিশ্চিত করা।
২. সাম্যবাদ দমন: সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা যাতে এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
৩. একচ্ছত্র আধিপত্য: পশ্চিম গোলার্ধে অন্য কোনও শক্তির প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা।
আমেরিকা নিজেকে একটি গণতন্ত্রকামী শক্তি হিসেবে প্রচার করলেও, লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে তারা বহুবার গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে এমন স্বৈরাচারী একনায়কদের সমর্থন দিয়েছে, যারা মার্কিন স্বার্থরক্ষা করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘আন্তর্জাতিক পুলিশ’গিরির অধ্যায়টি আরও গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল সামরিক অভিযান ছিল না; এটি ছিল গোয়েন্দা তৎপরতা, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের এক জটিল জাল। ফিদেল কাস্ত্রো ক্ষমতায় আসার পর কিউবা যখন সোভিয়েত-সহ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির বন্ধু হয়ে ওঠে, তখন আমেরিকা তাঁকে সরানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। সিআইএ কিউবার নির্বাসিত নাগরিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কিউবা দখলের জন্য পাঠায়। কিন্তু এই অভিযান শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। ‘অপারেশন মঙ্গুজ’ সাঙ্কেতিক নামের আড়ালে সিআইএ কাস্ত্রোকে হত্যার জন্য অন্তত ৬৩৮ বার চেষ্টা চালায় বলে জানা যায়। বিষাক্ত চুরুট, বিস্ফোরণক্ষম শামুক থেকে শুরু করে বিষাক্ত পোশাক ব্যবহার করে কাস্ত্রোকে মারার চেষ্টা ছিল রূপকথার গল্পের মতো অবিশ্বাস্য কিন্তু বাস্তব। ১৯৬০ সাল থেকে কিউবার ওপর আমেরিকা যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, তা আজও চলছে। এটি হল ‘অর্থনৈতিক পুলিশগিরি’, যেখানে একটি দেশকে বিশ্ব-অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। ১৯৮০-র দশকে নিকারাগুয়ায় বামপন্থী ‘সান্দিনিস্তা’ সরকারকে হঠাতে আমেরিকা যে ‘কন্ট্রা’ বিদ্রোহীদের সাহায্য করত, মার্কিন কংগ্রেস তাতে অর্থায়ন নিষিদ্ধ করেছিল। কন্ট্রা[1] ছিল সাম্যবাদবিরোধী দক্ষিণপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী, যারা মার্কসবাদী সান্দিনিস্তা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট এবং জাতীয় পুনর্গঠন পরিষদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ করেছিল। ১৯৭৯ সালের নিকারাগুয়ান বিপ্লবের পর ক্ষমতায় এসেছিল ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট এবং জাতীয় পুনর্গঠন পরিষদ জোট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান প্রশাসন গোপনে এবং অবৈধভাবে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে নিকারাগুয়ার বিদ্রোহীদের (Contras) অস্ত্র সরবরাহ করত। এটি ছিল আমেরিকার অভ্যন্তরীণ আইন এবং আন্তর্জাতিক নীতির চরম লঙ্ঘন। লক্ষ্য ছিল যে-কোনও মূল্যে আমেরিকার ‘পেছনের আঙিনায়’ (Backyard) সমাজতন্ত্রের প্রবেশ রোধ করা। ১৯১৫ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত আমেরিকা হাইতি দখল করে রেখেছিল। এরপর ২০০৪ সালে হাইতির প্রেসিডেন্ট জিন-বার্ট্রান্ড অ্যারিস্টাইড যখন ক্ষমতাচ্যুত হন, তখন অভিযোগ ওঠে যে আমেরিকা তাঁকে জোর করে বিমানযোগে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে। আজও হাইতির নিরাপত্তা এবং রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের সবুজ সঙ্কেত ছাড়া কিছুই নড়ে না। আমেরিকার এই ‘আন্তর্জাতিক পুলিশগিরি’র প্রধান বৈশিষ্ট্য হল— তারা কোনও স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু রাখে না, কেবল ‘স্থায়ী স্বার্থ’ রক্ষা করে। যখনই কোনও দেশের নেতা মার্কিন কর্পোরেট স্বার্থ বা ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে গিয়েছেন, তখনই তাঁকে হয় ‘অগণতান্ত্রিক’ অথবা ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ তকমা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটেই দেখতে হবে নিকোলাস মাদুরোর অপহরণকে। বর্তমান সময়ে লাতিন আমেরিকায় চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। গত দুই দশকে চিন এই অঞ্চলে কেবল বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে নয়, বরং প্রধান বিনিয়োগকারী এবং ঋণদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চিন লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ ও বিনিয়োগ করেছে। এই বিনিয়োগ মূলত তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত—
খনিজ সম্পদ ও জ্বালানি: চিন তার নিজের শিল্পায়নের জন্য লাতিন আমেরিকার তামা (চিলি ও পেরু), লোহা (ব্রাজিল) এবং লিথিয়ামের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় লিথিয়াম ট্রায়াঙ্গেল (আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া ও চিলি)-এ চিন ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।
অবকাঠামো উন্নয়ন (Belt and Road Initiative): লাতিন আমেরিকার ২১টি দেশ চিনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগে যোগ দিয়েছে। এর অধীনে চিন বন্দর, রেললাইন, হাইওয়ে এবং বাঁধ নির্মাণ করছে। উদাহরণস্বরূপ, পেরুর চাঙ্কাই বন্দর (Chancay Port), যা দক্ষিণ আমেরিকার পণ্য সরাসরি এশিয়ায় পাঠানোর প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হবে।
বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি: ব্রাজিল এবং চিলির বিদ্যুৎ গ্রিড ও ট্রান্সমিশন লাইনের একটি বিশাল অংশ এখন চিনা কোম্পানিগুলোর (যেমন: State Grid Corporation of China) নিয়ন্ত্রণে।
এছাড়াও চিন নির্দিষ্ট কিছু দেশে কৌশলগতভাবে বিনিয়োগ করেছে—
ব্রাজিল: লাতিন আমেরিকায় চিনা বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় গন্তব্য। কৃষি (সয়াবিন), তেল এবং উৎপাদন শিল্পে চিন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
ভেনেজুয়েলা: চিন এই দেশটিকে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছিল, যার বিনিময়ে তারা দীর্ঘমেয়াদি তেলের জোগান নিশ্চিত করেছে। এটি আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার মুখে ভেনেজুয়েলার টিকে থাকার প্রধান মাধ্যম।
আর্জেন্টিনা ও ইকুয়েডর: এই দেশগুলোতে চিন পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছে।

চিনের এই অর্থনৈতিক আধিপত্য কেবল ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর রাজনৈতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। চিনের বিনিয়োগের আকর্ষণে গত কয়েক বছরে পানামা, এল সালভাদর এবং হন্ডুরাস তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। চিন এই দেশগুলোতে ৫জি নেটওয়ার্ক এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির জোগান দিচ্ছে, যা আমেরিকার মতে নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। ২০২০-র পর থেকে চিন বিশাল ঋণের বদলে এখন ‘ছোট কিন্তু সুন্দর’ প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। তারা এখন সরাসরি বাঁধ তৈরির চেয়ে হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং, ই-কমার্স এবং স্বাস্থ্যখাতে (যেমন: ভ্যাকসিন কূটনীতি) বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। লাতিন আমেরিকা এখন আর আমেরিকার একক খাসমহল নেই। চিন সেখানে যে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, তা ভাঙা ওয়াশিংটনের জন্য প্রায় অসম্ভব। সামরিক শক্তির চেয়ে অর্থনৈতিক শক্তি যে অনেক সময় বেশি কার্যকর, চিন লাতিন আমেরিকায় তা প্রমাণ করে দিচ্ছে। লাতিন আমেরিকায় চিনের প্রভাব বুঝতে হলে পেরুর চাঙ্কাই বন্দর এবং আর্জেন্টিনার লিথিয়াম খনি— এই দুটি প্রকল্পকে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে দেখা হয়। পেরুর চাঙ্কাই বন্দর (Chancay Port) আমেরিকার ‘দুঃস্বপ্ন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লিমা শহরের উত্তরে অবস্থিত এই বন্দরটি বর্তমানে দক্ষিণ আমেরিকায় চিনের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। চিনা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি Cosco Shipping প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এই গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণ করছে। এটি হবে দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম ‘স্মার্ট পোর্ট’। বর্তমানে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে এশিয়ায় পণ্য পাঠাতে হলে মেক্সিকো বা আমেরিকার বন্দর হয়ে যেতে হয়, যাতে ৩৫ থেকে ৪০ দিন সময় লাগে। চাঙ্কাই বন্দর চালু হলে সরাসরি রুটে মাত্র ২৩ দিনে পণ্য চিনে পৌঁছাবে। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক বন্দর নয়; আমেরিকার আশঙ্কা, ভবিষ্যতে চিন এখানে তাদের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে পারে। এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরে আমেরিকার একক নৌ-আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এই বন্দরটি ব্রাজিল, চিলি এবং কলম্বিয়ার পণ্যরপ্তানির প্রধান কেন্দ্র (Hub) হয়ে উঠবে, যার ফলে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি চিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। চিনের দ্বিতীয় উচ্চাভিলাষী প্রকল্প আর্জেন্টিনার লিথিয়াম খনির দখল। বিশ্ব যখন বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন লিথিয়াম হয়ে উঠেছে নতুন যুগের খনিজ তেল। আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া এবং চিলি— এই তিন দেশ মিলে বিশ্বের মোট লিথিয়ামের অর্ধেকের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। চিনের Ganfeng Lithium এবং Zijin Mining-এর মতো কোম্পানিগুলো আর্জেন্টিনার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল লিথিয়াম খনিগুলো কিনে নিয়েছে বা বড় অংশীদারিত্ব লাভ করেছে। ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি তৈরির ক্ষেত্রে চিন বিশ্বের এক নম্বর শক্তি। আর্জেন্টিনার লিথিয়াম সরাসরি চিনের কারখানায় চলে যাচ্ছে। এর ফলে আমেরিকা বা ইউরোপ নিজেদের ব্যাটারিশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব: চিন কেবল খনি খনন করছে না, তারা স্থানীয় সরকারগুলোকে বিশাল অঙ্কের রয়্যালটি এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এটি আর্জেন্টিনার মতো অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশের জন্য লাইফলাইনের মতো কাজ করছে। আমেরিকা সবসময় লাতিন আমেরিকাকে তাদের প্রভাববলয় মনে করত। এখন তাদের ঘরের পাশেই চিন বিশাল সব পরিকাঠামো গড়ে তুলছে, যা আমেরিকা রুখতে পারছে না। এই দেশগুলো এখন ডলারের চেয়ে চিনের ‘ইউয়ান’ বা সরাসরি বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। চাঙ্কাই বন্দরের মতো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পে চিনা সেন্সর এবং ডেটাসিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মার্কিন গোয়েন্দাদের মতে নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। চাঙ্কাই বন্দর দিয়ে চিন দক্ষিণ আমেরিকায় প্রবেশ করছে, আর লিথিয়াম খনি দিয়ে চিন এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ সম্পদ নিজের হাতের মুঠোয় নিচ্ছে। এই দ্বিমুখী কৌশলে আমেরিকা বর্তমানে অনেকটাই কোণঠাসা। আর ঠিক সে-কারণেই রাতের অন্ধকারে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক অপহরণ করে মার্কিন ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে সর্বোচ্চ স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে। এই অপহরণের পরেই ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও কিউবাকে।

বর্তমানে ভেনেজুয়েলার সংকট এবং সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর মনরো ডকট্রিন এবং বিংশ শতাব্দীর গোপন পুলিশগিরি আজও একবিংশ শতাব্দীতে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে আমেরিকার নীতি মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। তেল, সমাজতন্ত্র-বিরোধী আদর্শ এবং ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ।
১. অর্থনৈতিক ‘পুলিশগিরি‘: নিষেধাজ্ঞা বা স্যাংশন (Sanctions)। সরাসরি সামরিক আক্রমণের বদলে আমেরিকা প্রাথমিকপর্বে ‘অর্থনৈতিক অস্ত্র’ ব্যবহার করে। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেট্রোলিওস ডি ভেনেজুয়েলা, এসএ (PDVSA)-র ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে তাদের আয়ের উৎস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য, দেশটির অর্থনীতিতে ধস নামিয়ে সাধারণ মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলা, যাকে বলা হয় ‘Regime Change’ বা শাসন পরিবর্তন। এর ফলে ভেনেজুয়েলায় মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়েছে এবং কয়েক মিলিয়ন মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।
২. জুয়ান গুয়াইদো এবং সমান্তরাল সরকার (২০১৯): ২০১৯ সালে নিকোলাস মাদুরোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বৈধতা অস্বীকার করে আমেরিকা এক অভাবনীয় পদক্ষেপ নেয়। তারা তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা জুয়ান গুয়াইদো-কে ভেনেজুয়েলার ‘অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি ছিল মনরো ডকট্রিনের একটি আধুনিক বহিঃপ্রকাশ, যেখানে আমেরিকা ঠিক করে দেয় যে পাশের দেশের প্রেসিডেন্ট কে হবেন। বিশ্বের প্রায় ৫০টিরও বেশি দেশকে আমেরিকা রাজি করিয়েছিল গুয়াইদোকে স্বীকৃতি দিতে। যদিও শেষ পর্যন্ত মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হয়নি।
৩. রাশিয়া ও চিনের প্রভাব মোকাবিলা: কেন ভেনেজুয়েলা নিয়ে এত চিন্তিত ডোনাল্ড ট্রাম্প? ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মার্কিন স্লোগান একটি বহুব্যবহৃত মুখোশ। আসল কারণ, ভেনেজুয়েলা বর্তমানে লাতিন আমেরিকায় রাশিয়া ও চিনের সবচেয়ে বড় মিত্র। রাশিয়া সেখানে সামরিক সরঞ্জাম পাঠায় এবং চিন বিশাল অঙ্কের ঋণ দিয়েছে। ১৮২৩ সালের মনরো ডকট্রিনের মতোই, আমেরিকা আজও তার ‘পেছনের আঙিনায়’ (Backyard) রাশিয়া বা চিনের সামরিক বা কৌশলগত উপস্থিতি সহ্য করতে রাজি নয়। ভেনেজুয়েলা বর্তমানে এই শক্তির লড়াইয়ের প্রধান রণক্ষেত্র।
বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। আমেরিকার কাছে এটি একটি স্ট্র্যাটেজিক সম্পদ। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়, তখন দেখা যায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য— মাদুরোকে ‘স্বৈরাচারী’ তকমা দিয়েও বাইডেন প্রশাসন গোপনে তাঁর সরকারের সঙ্গে তেলের চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করে। এটি প্রমাণ করে যে, আমেরিকার কাছে আদর্শের চেয়ে স্বার্থ বড়। ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আমেরিকা একাধিকবার সাইবার আক্রমণ এবং প্রচারণামূলক যুদ্ধ চালানোর অভিযোগ রয়েছে। ২০২০ সালে ‘অপারেশন গিডিয়ন’ নামে একটি ব্যর্থ সশস্ত্র অনুপ্রবেশ ঘটেছিল, যেখানে কিছু প্রাক্তন মার্কিন গ্রিন বেরেট (Green Beret) সেনা মাদুরোকে বন্দি করার চেষ্টা করেছিল। যদিও মার্কিন সরকার সরাসরি এর দায় স্বীকার করেনি, তবে ইতিহাস বলে এ ধরনের অভিযানে সিআইএ-র পরোক্ষ মদত থাকা অস্বাভাবিক নয়। ২০১৩ সালে তত্কালীন মার্কিন বিদেশ সচিব জন কেরি ঘোষণা করেছিলেন যে “মনরো ডকট্রিনের যুগ শেষ”। কিন্তু ট্রাম্প এবং পরবর্তী প্রশাসনগুলোর কার্যকলাপে তার বিপরীত চিত্রই দেখা গেছে। আমেরিকা আজও মনে করে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলো তাদের নির্দেশ মেনে চলবে, নতুবা তাদের অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগ ড্রাগ ট্রাফিকিং ও ড্রাগ কার্টেলকে মদত দেওয়া। এ ধরনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। মিথ্যা অভিযোগে রাষ্ট্রপ্রধানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা পশ্চিমি পুঁজিবাদী দেশগুলির পুরানো কৌশল। প্রচারমাধ্যমের সাহায্য নিয়ে মিথ্যা অভিযোগে ইরাকে হামলা চালিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার শাগরেদ দেশগুলি। ইরাকের লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করে, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে খুন করা হয়েছিল রাষ্ট্রপ্রধান সাদ্দাম হুসেনকে। খুন করা হয়েছিল লিবিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান মুয়াম্মার গদ্দাফিকে। এসবই তো সংঘটিত হয়েছে মিথ্যা অভিযোগে, যার নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগের সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিপরীতমুখী রিপোর্টের বিষয়টি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডোনাল্ড ট্রাম্প মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে দুটি প্রধান অভিযোগ তুলেছেন:
১. মাদক পাচার: তিনি দাবি করেছেন যে মাদুরো সরাসরি আমেরিকায় মাদক চোরাচালান উৎসাহিত করছেন।
২. ট্রেন ডি আরাগুয়া (Tren de Aragua): ট্রাম্পের দাবি, ভেনেজুয়েলার এই কুখ্যাত গ্যাং বা অপরাধীচক্রের পেছনে মাদুরোর হাত রয়েছে। ওয়াশিংটন এই গ্যাংটিকে ইতিমধ্যে একটি ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে নিষিদ্ধ করেছে। ট্রাম্পের এই জোরালো দাবির বিপরীতে খোদ মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ তথ্যই ভিন্ন কথা বলছে।
মাদুরো ও অপরাধীচক্রের যোগসূত্র: মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (Intelligence Agencies) স্পষ্ট জানিয়েছে যে, মাদুরোর সঙ্গে ‘ট্রেন ডি আরাগুয়া’ গ্যাংটির কোনও সরাসরি যোগসূত্র বা সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে এই গ্যাংটি মাদুরো সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরেই কাজ করে। এটি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি সাম্প্রতিক ডিক্লাসিফাইড মেমো (Declassified Memo) বা রিপোর্টের মূল নির্যাস।
ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল (NIC) মেমো: ২০২৫ সালের মে মাসে একটি গোপন রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসে যা Freedom of Information Act-এর অধীনে পাওয়া গেছে। ১৮টি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত এই রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ভেনেজুয়েলার গ্যাং ‘ট্রেন ডি আরাগুয়া’ (Tren de Aragua) মাদুরো সরকারের নির্দেশে কাজ করছে— এমন কোনও প্রমাণ মেলেনি।
গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ: ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ (The New York Times) এবং ‘ফ্যাক্টচেক ডট ওআরজি’ (FactCheck.org) তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই উক্তিটির মতো করেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছে। তারা দেখিয়েছে যে, ট্রাম্প যেখানে এই গ্যাংকে মাদুরোর ‘পরোক্ষ সেনাবাহিনী’ (Proxy Force) হিসেবে দাবি করছেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে তারা আসলে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী।
মাদক চোরাচালানের উৎস: মার্কিন সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমেরিকায় প্রবেশ করা অবৈধ মাদকের প্রধান উৎস ভেনেজুয়েলা নয়। মেক্সিকো বা কলম্বিয়ার মতো দেশগুলোর তুলনায় ভেনেজুয়েলা থেকে আসা মাদকের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। আমেরিকা দীর্ঘকাল ধরে মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ আনলেও, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে “কার্টেল ডি লস সোলেস” কোনও পিরামিডসদৃশ বা শ্রেণিবদ্ধ সংগঠন নয়। বরং এটি মাদকব্যবসায় জড়িত দুর্নীতিবাজ সামরিক কর্মকর্তাদের বোঝাতে ব্যবহৃত একটি সাধারণ শব্দ। মাদুরো ব্যক্তিগতভাবে এই পুরো প্রচেষ্টাটি পরিচালনা করেন— এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই গোয়েন্দা তথ্যের উপস্থিতি একটি রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। গোয়েন্দা কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য-সহ সমালোচকরা এই বৈসাদৃশ্যটিকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে কঠোর নীতি ও সামরিক পদক্ষেপের ন্যায্যতা দিতে নিরপেক্ষ গোয়েন্দা তথ্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছিল। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের চাপ সত্ত্বেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নেই অটল থেকেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে (এবং এর আগে এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটন পোস্ট ও নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টে) মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এই মূল্যায়ন সামনে আসে।
এই বৈপরীত্যের কারণ কী? এক, আমেরিকার নির্বাচনে লাতিন আমেরিকান বংশোদ্ভূত ভোটারদের (বিশেষ করে ফ্লোরিডায় থাকা কিউবান ও ভেনেজুয়েলানদের) সমর্থন পেতে মাদুরোকে ‘ভয়ঙ্কর শত্রু’ হিসেবে উপস্থাপন করা ট্রাম্পের একটি কৌশল। দুই, হস্তক্ষেপের অজুহাত: মাদুরোকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারলে ভেনেজুয়েলায় সামরিক বা অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ করা আন্তর্জাতিক আইনের চোখে সহজ হয়। সহজ কথায়, ট্রাম্প যেখানে মাদুরোকে আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য এক নম্বর হুমকি হিসেবে তুলে ধরছেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বলছে সেই দাবির পেছনে শক্ত কোনও প্রমাণ নেই। এটি সেই ‘আন্তর্জাতিক পুলিশগিরি’র পুরনো কৌশলেরই অংশ— যেখানে আগে একটি ‘ভিলেন’ তৈরি করা হয় এবং পরে তাকে দমনের নামে হস্তক্ষেপ করা হয়।
লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক তরঙ্গ হল ‘পিঙ্ক টাইড’ (Pink Tide)। এটি মূলত এই অঞ্চলের দেশগুলোতে বামপন্থী বা সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলোর উত্থানকে বোঝায়, যারা ওয়াশিংটনের নির্দেশ মানতে অস্বীকার করে এবং নিজেদের খনিজ সম্পদ ও অর্থনীতির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। একে ‘রেড টাইড’ বা কট্টর সাম্যবাদ না বলে ‘পিঙ্ক’ বা গোলাপী বলা হয় কারণ এই সরকারগুলো পুরোপুরি সোভিয়েত ঘরানার সাম্যবাদী ছিল না; তারা ছিল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বামপন্থী সরকার। ১৯৯০-এর দশকের শেষে এবং ২০০০-এর দশকের শুরুতে ভেনেজুয়েলার উগো চাভেস, ব্রাজিলের লুলা দা সিলভা, এবং বলিভিয়ার ইভো মোরালেসের হাত ধরে এই তরঙ্গের সূচনা হয়। এই দেশগুলো আমেরিকার ‘আন্তর্জাতিক পুলিশ’গিরি এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়। বলিভিয়া তার গ্যাস এবং ভেনেজুয়েলা তার তেলসম্পদের ওপর মার্কিন কোম্পানিগুলোর আধিপত্য কমিয়ে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এটি আমেরিকার কর্পোরেট স্বার্থে বড় আঘাত ছিল। আমেরিকা এই অঞ্চলের জন্য FTAA (Free Trade Area of the Americas) নামক একটি বাণিজ্যিক চুক্তি করতে চেয়েছিল যা মূলত মার্কিন স্বার্থরক্ষা করত। এর প্রতিবাদে উগো চাভেস ALBA (Bolivarian Alliance for the Peoples of Our America) এবং পরবর্তীতে CELAC (Community of Latin American and Caribbean States) ও UNASUR (Union of South American Nations) গঠন করেন, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডাকে রাখা হয়নি। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে তারা নিজস্ব কারেন্সি বা বিনিময় ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করেছে, যাতে আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে বাঁচা যায়।

আমেরিকা এই বামপন্থী উত্থানকে সহজে মেনে নেয়নি। লাতিন আমেরিকার সাম্প্রতিক বহু রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনে মার্কিন মদতপুষ্ট ‘সফট ক্যু’ (Soft Coup) বা আইনি অভ্যুত্থানের অভিযোগ রয়েছে। ব্রাজিলে (২০১৬) প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফকে অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং লুলা দা সিলভাকে জেলে পাঠানোকে অনেকে মার্কিন বিচারবিভাগীয় ষড়যন্ত্রের অংশ মনে করেন। বলিভিয়াতে (২০১৯) ইভো মোরালেসকে একটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর সামরিক বাহিনীর চাপে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এই ঘটনায় ‘অর্গানাইজেশন অফ আমেরিকান স্টেটস’ (OAS)-এর ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ, যা মূলত আমেরিকার অর্থায়নে চলে। ইকুয়েডর ও পেরু-তে বামপন্থী নেতাদের আইনি মারপ্যাঁচে (Lawfare) ফেলে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও, ২০১৮ সালের পর থেকে লাতিন আমেরিকায় আবার বামপন্থীদের জয়জয়কার শুরু হয়েছে। বর্তমানে মেক্সিকো (লোপেজ ওব্রাডোর), আর্জেন্টিনা, চিলি (গ্যাব্রিয়েল বোরিক), কলম্বিয়া (গুস্তাভো পেত্রো) এবং পুনরায় ব্রাজিলে লুলা ক্ষমতায় এসেছেন। কলম্বিয়া ছিল ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ আমেরিকায় আমেরিকার প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক মিত্র। সেখানে প্রথমবারের মতো একজন বামপন্থী ও প্রাক্তন গেরিলা যোদ্ধা (পেত্রো) ক্ষমতায় আসায় ওয়াশিংটনের কপালে ভাঁজ পড়েছে। লাতিন আমেরিকা এখন আর আমেরিকার ‘পেছনের আঙিনা’ (Backyard) হয়ে থাকতে রাজি নয়। তারা নিজেদের ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর অংশ হিসেবে দেখছে। আমেরিকা যতই পুলিশগিরি করার চেষ্টা করছে, এই দেশগুলো ততই চিন ও রাশিয়ার মতো বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকছে। এই সংঘাতই আগামীদিনে বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ ঠিক করে দেবে।
[1] স্প্যানিশ: contrarrevolucionarios, আক্ষরিক অর্থে ‘প্রতিবিপ্লবী’।
*মতামত ব্যক্তিগত

