কঙ্কালের জন্মতিথি

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

 


চলচ্চিত্রবেত্তা, শিক্ষক, গদ্যকার, সাংস্কৃতিক ভাষ্যকার

 

 

 

সম্পাদক আমাকে অনুরোধ করেছেন স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পেরিয়ে এসে আমরা অর্থাৎ দেশের সাধারণ মানুষেরা কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি তা নিয়ে কিছু লিখতে।

আমি ভাবি, লিখব?

“ভূতি দিশেহারা হয়ে ভাবে, যাব? ছেলে মা’কে ন্যাংটো দেখলে কী আসে যায়? মা কালীও তো ন্যাংটো। ও মা কালী, তুইই বল মা, তোর হিদয় থেকে একটা কিছু বল!”

আজ দেবব্রত বিশ্বাসের গলায় ‘কেন চেয়ে আছ গো মা’ শুনে আর কোনও পরিত্রাণ নেই। ১৫ আগস্ট-এর পরে ২২ আগস্ট, দেবব্রত বিশ্বাস-শম্ভু মিত্রের জন্মদিন, সেদিন শুনলেও গতি হবে না। কেন না আজ ভূতি আর বলছে না যে তার মা বিবসনা। হয় সে অসাড়, নয়তো ভয়ে কুঁকড়ে আছে। আজকাল যখন কোনও মরদেহ দেখি, আমাদের আর মাথায় হাত ওঠে না। ছেলেবেলায় উঠত। স্বাধীনতার তখন কম বয়স। তখন আমরা মৃত্যুর স্তব্ধতা জানতাম৷ আজ আর কারও দু দণ্ড দাঁড়ানোর অবকাশ নেই। আজ নির্বিকার RIP জ্বলছে পথসংকেত হয়ে। ডিজিটাল মজুরদের আর পার্টটাইম বিনোদনকর্মীদের এতটুকু অবসর নেই যে অন্তত ছেদচিহ্নের সামনে এসে আমরা ক্ষণিকের জন্য শব্দহীন হব। যেমন এই সেদিন চলে গেলেন স্ট্যান স্বামী। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র তাঁকে শীতলতার সঙ্গে হত্যা করল। আমরা হিমঘরে অনলাইন ফুলের স্তবক রেখে এলাম। কর্পোরেটরা যেভাবে আমাদের করজোড়, করতালি, আঙুল উত্তোলন অথবা অবনমন করতে বলে, আমরা তা পরম আনুগত্যে পালন করি৷ আমাদের তাড়া আছে। আমাদের শান্তিকামনাও তাই এমন সংক্ষেপিত আকারেই হয়। সুন্দরবন বা দীঘার সমুদ্র উপকূল ভেসে গেলে আমরা ত্রাণ ট্যুরিজমে যাই। সেটা খুব সহজ, কারণ আমাদের আর বারমুডা বদলে ট্রাউজার পরতে হয় না। আমাদের অলজ্জ হওয়ার অধিকার এসে গেছে।

 

আমরা এমন একটা দেশে জন্মেছি যা নিজেকে মানবশক্তিতে তৃতীয় বলে দাবি করে, যেখানে অনেক ফ্লাইওভার, অনেক এস্কালেটর… বাংলা সিনেমা দেখলে তা বোঝা যায়… আমাদের এখন অনেক শপিং মল, সেখানে অনেক কিন্নর-কিন্নরী অশরীরীর মতো ঘোরাফেরা করে। কিন্তু এসব দেখে আমার কেবলই মনে হয় মৃতদের, জড়দের দেশে কবন্ধেরা কোলাহল করে৷

আজ যখন আমি এই পঁচাত্তর বছর বয়স্ক স্বাধীন দেশটার  সংস্কৃতির দিকে তাকাই, দেখি, এই যে কোভিড যুগের মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি, এই সময়ে দাঁড়িয়ে দেশের গরিব মানুষেরা কীরকম ইরেজার দিয়ে পেনসিলের দাগ মুছে ফেলার মতো উধাও হয়ে গেল। তারা কোথাও নেই। যতদূর মোবাইলের টাওয়ার আছে, শুধুমাত্র ততদূর পর্যন্ত-ই সভ্যতা। আমরা এই নতুন সভ্যতার দিকে তাকিয়ে কিছু কথা বলি, কিছু লড়াই করি, বলা ভালো লড়াইয়ের ভাণ করি এবং ছদ্মসৈনিক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি।

আমাদের প্রতিটি প্রতিবাদ আজ অগভীর, দেখনদারিতে পর্যবসিত। যেমন, এই মুহূর্তে আমার দুটি সাম্প্রতিক গানের কথা মনে পড়ছে, যা আমি গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে শুনলাম। দুটি গানই যারা গেয়েছেন, তারা ব্যক্তিগতভাবে আমার খুবই কাছের মানুষ, তাদের দিকেই আমার সমর্থন। সেই গান দুটির মধ্যে একটি হল টুম্পার গান। শুনলাম। শুনে ভাবলাম, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, বিনয় রায়, সলিল চৌধুরী— এঁদের কি তাহলে আমরা সত্যিই পুরোপুরি বাদ দিয়ে দিলাম? আর কোনওদিন আমাদের গ্রামের চাষিভাই বলবে না, হেই সামালো ধান হো? এরপর আরেকটি গান শুনলাম, সেও আমাদের স্বজনদেরই গাওয়া, তৈরি করা। এখানে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে জরুরি কিছু কথা বলা আছে, কিন্তু আমি দেখলাম খুব সুন্দর সুন্দর পোশাকে যুবকেরা উঠে আসছেন ভিক্টোরিয়ার ঝোপ থেকে, খাজুরাহোর বই হাতে নিয়ে। এরা কারা? এ মানুষ কোন মানুষ? আম্বেদকর পড়ছেন তারা ইংরেজিতে। তা পড়ুন। কিন্তু ভারতে, আমাদের রাজ্যে কী আর ভাষা নেই? গানটা তো বাংলায়। গানটাতে তো গরিবের কথাও থাকতে পারত। ফ্যাসিবাদ তো শুধু বড়লোকদের আক্রমণ করে না। আসলে আমাদের উচ্চারণ আজ আর কোথায় পৌঁছয় না। আজ যারা রেললাইনের পাশে পড়ে আছে, বা ছিল বা থাকবে, তাদের কথা আর বাংলায় বলা যায় না, উর্দুতে বলা যায় না, শুধুমাত্র ইংরেজিতেই বলা যায়।

আমরা যে ছোট্ট ডিজিটাল কমিউনিটি, আমরা ধরেই নিয়েছি, আমরাই আদি, আমরাই অন্তিম। যা কিছু কথাবার্তা তা আমাদের নিজেদের মধ্যেই হবে এবং তা-ই দেশের আপামর মানুষের কাছে শিরোধার্য। আমি অবাক হয়ে ভাবি, এ তো আরেক ধরনের দলবদ্ধ ফ্যাসিবাদ। যে ফ্যাসিবাদ আমার কণ্ঠরোধ করতে চায়, সেই একইধরনের ফ্যাসিবাদ এসে মানচিত্র থেকে দেশের গরিব মানুষদেরকে মুছে দিতে চায়। যারা নিরক্ষর, যারা নির্বাক, তাদের কী হবে? তারা কোথায় বস্ত্র উন্মোচন করবে? তারা তো দ্রৌপদীর মতো আড়ালও খুঁজে পাবে না। তাদের তো কোনও শ্রীকৃষ্ণ নেই। পাড়ায় পাড়ায় বিউটি পার্লার ছিল, এখন আছে অক্সিপার্লার। সকলেই অক্সিমিটার কিনতে ব্যস্ত। কিন্তু যে মানুষের অক্সিজেন নেই, যে মানুষের শৌচাগার নেই, যারা একটা ছোট ঘরে গাদাগাদি করে পনেরোজন থাকে, তাদের কী হবে? আমাদের টিভি খুললে, আমাদের ডিজিটাল মানচিত্র খুললে কোথাও তার সদুত্তর পাই না। কেউ জিজ্ঞেস করে না স্বাধীনতা অর্জনের পঁচাত্তর বছর পরে কোথাও একটু সুবাতাস, সিন্ধুতীর, একটু জল বা তেল পাওয়ার অধিকার এদের জন্য রয়ে গেছে কিনা। সে অধিকার মুছে গেছে। সে অধিকার শুধু মেট্রোপলিটন মধ্যবিত্তের জন্য। সে অধিকার শুধুমাত্র কবিতায় আছে। সে অধিকার ফেসবুকে প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা শ্যামাপোকার মতো ওড়ে এবং পরেরদিন মৃত স্তূপ হয়ে পড়ে থাকে। এবং তারপর সকলকেই সকলে জানায়, ‘ঋদ্ধ হয়েছি’। কে ঋদ্ধ হয়, কার এই ঋদ্ধি— আমি কিছুই বুঝি না।

আমাদের ভাষাও যেন ক্রমশ কেমন নিঃসাড় হয়ে পড়ছে। আমাদের সংস্কৃতির দুই শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি— শঙ্খ ঘোষ এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় চলে গেলেন। তারপর আমরা কী কথা বললাম! যা বললাম, তার অধিকাংশই তো আমাদের সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে। কে কবে কবির বাড়ি গিয়ে পায়েস খেয়েছেন, কে কবে শুটিং-এ শিল্পীকে সাবলীল দেখেছেন, তার উদগার— অর্থাৎ এ তো মৃতকে সাক্ষী রেখে আমাদের জীবিত অভিনয়! এই অভিনয় দেখার জন্য, হা ঈশ্বর, আমাদের পঁচাত্তর বছর অপেক্ষা করতে হল? এই অভিনয় দেখব বলে আন্দামান-কালাপানি-সেলুলার জেল তৈরি হয়েছিল? মায়েদের কোল খালি হয়েছিল? আমি থতমত খেয়ে থাকি।

আমাদের আজ শুধু তথ্য আছে, হৃদয় নেই। আমরা তথ্য-পরিসংখ্যান দিতে পারি, তথ্যের স্থাপত্য নির্মাণ করতে পারি। আমাদের মগজ আছে, মন নেই। আমাদের লিপ্সা আছে, লিপ্তি নেই। আমরা যে কথা বলছি তাতে হয় উন্নয়ন রুদ্ধগতি, নয়তো উন্নয়ন জারি আছে। এর মধ্যে কোনটা যে ফ্যাসিবাদী উন্নয়ন আর কোনটা যে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী উন্নয়ন— আমি তারও মানে বুঝি না। আমি শুধু দেখি শব্দরা জড়বৎ, মৃতবৎ ঝরে পড়ে। এই যে তেরঙ্গা ঝাণ্ডা, আমরা আজন্ম শৃঙ্খলিত করজোড় নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছি। আমরা দেখলাম না যে আমাদের পরাধীনতাটা আসলে আরও ভেতরে। কখন যে আমরা পরাধীন হয়ে গেছি, কোথায় যে আমরা পুতুলের মতো নেচে চলেছি— আজকে তা আর বুঝতে পারি না। আমাদের শব্দ আজ নিয়ন্ত্রিত, আমরা প্রেডিকটিভ রাইটিং দেখে লেখা লিখি। আমাদের আত্মজীবনী কেউ আগেই লিখে গেছে। আমরা ভাবি আমরা স্বাধীন পতঙ্গের মতো নড়াচড়া করছি, আসলে এই নড়াচড়া বেলজারের ভেতরে রাখা ইঁদুরের মতো। এই স্বাধীনতা দেখে আমার মাঝে মাঝে মানিকবাবুর ‘স্বাধীনতার স্বাদ’ মনে হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্বাধীনতার পরে মাত্র ন বছর বেঁচেছিলেন। তিনি সৌভাগ্যবান। জীবনানন্দ দাশও সৌভাগ্যবান, কারণ তিনি সাত বছর বেঁচেছিলেন। ঋত্বিক ঘটক তুলনামূলক বিচারে দুর্ভাগ্যবান, কারণ তিনি স্বাধীনতার পরে আরও কুড়ি বছর বেঁচেছিলেন। আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর দেখছি, আমাদের মধ্যে অনেকেই স্বাধীনতার শতবর্ষও দেখবেন। কিন্তু এই যে সর্বব্যাপী পরাধীনতা, এই যে রক্তকরবী-র রাজার অধীনে থেকে দিনের পর দিন ক্ষেতে প্রান্তরে বৈঠকখানায় বা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা, কবে এ থেকে আমাদের মুক্তি হবে? এই পরাধীনতার লজ্জা লুকোব কোথায়? আমি তাও জানি না। আমরা সকালে উঠে হোয়াটস্যাপে একে অপরকে সুপ্রভাত-বার্তা পাঠাই। অবশ্যই ইংরেজিতে। কিন্তু এই প্রভাতকে আমার কখনই সুসকাল বলে মনে হয় না। আমার শুধু মনে হয় এ আসলে একটি সমাধিভূমি থেকে আরেকটি সমাধিভূমির দিকে যাত্রা। এই যাত্রাই আমাদের অনন্ত যাত্রা হয়ে গেল। এ যাত্রা যেন মোজেসের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও যাত্রা। পঁচাত্তর বছর পেরিয়ে গেল, কিন্তু আমরা জানি না কবে সমুদ্র দুভাগ হবে! সমুদ্র কতদূর!

প্ল্যাটিনাম জয়ন্তীতে অরিজিৎ সিং, শ্রেয়া ঘোষাল। চলে এসো ঘরে পরবাসী৷ অথচ প্রবাস আজ আর বিরহী যক্ষের হৃদয়ে নয়, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের আনাচেকানাচে। কত ম্যাজিনো লাইন আর সাদা সিঁথির মতো ফাঁকা হয়ে থাকল আমাদের বিবাহবার্ষিকী বা স্বাধীনতার মধুযামিনী। রক্তহীন কত স্বপ্নপাত! আমাদের কৃপণ করতলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নিয়তির বলিরেখা। ঘরের অভ্যন্তরে আমাদের প্রবাস। আমরা নিয়ম মেনে জিমে যাই। অনিয়মেও বই পড়ি না। পঁচাত্তর বছর কেটে গেল। দেখা হল না ঢালাইঘরে হাসিম শেখের ঘামের দানা গড়িয়ে পড়ছে গীতবিতানের শব্দ হয়ে। কালনার রেললাইনে রামা কৈবর্ত্যের ওয়েল্ডিং কোনও নক্ষত্রখচিত রাত্রি তৈরি করতে পারল না। বড়লোক হতে হতে কখন যে রূপসীর অন্তর্বাস মুখোশে পরিণত হয়েছে, তা জানতে বেলা গেল। দেখা হল না, ধান রুইবার সময় ছোটলোকের বউয়ের অন্তরে কোনও জামা থাকে না। অথচ কথা তো ছিল, ভরন্ত ক্ষেত বাসমতির গন্ধে ম ম করবে৷

এই পঁচাত্তর বছরে আমরা সবাই পণ্য পেতে পারি। পুণ্য পাইনি।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

  1. অসাধারণ অসাধারণ।সঞ্জয় বাবুকে নিয়ে কিছু বলার নেই।সমাজের সঙ্গে আত্মার গভীর সংযোগ না থাকলে এই কথা বলা যায় না।
    অনেক অনেক ধন্যবাদ, আমাদের অনেকটা চেতনা দেয়ার জন্য।

  2. সঞ্জয় বাবু,
    অনবদ্য লেখা লিখেছেন l
    এই ধরণের ভাষা, শব্দ চয়ন আর মণনশীলতার প্রতি আগ্রহই বাংলা ভাষাকে মরতে দেয় না l

  3. এত ভাল লাগল,কী বলব! বহুদিন পর চমৎকার একটি লেখা পড়লাম।ধন্যবাদ, চারনম্বর প্ল্যাটফর্ম, ধন্যবাদ, সঞ্জয় মুখোপাধ্য

আপনার মতামত...