সিলিকোসিস রোগে মৃত্যুর ঢল— ‘শ্রমিকশ্রেণির দুর্গ’ থেকে মিনাখাঁ

শমিত কুমার কর

 


অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অফ ঝাড়খন্ড (ওসাজ)-এর সাধারণ সম্পাদক

 

 

 

ভারত একটি কৃষিপ্রধান দেশ হলেও মূলত বিদেশি ও কর্পোরেট পুঁজির আধিপত্যের কারণে এদেশের কৃষি ও কৃষক সমুচিত বিকাশ লাভ করেনি। কারণ ষাটের দশকের পর থেকে কৃষি এক অলাভজনক পেশায় পরিণত হয়। কৃষিকাজে সরকারি উদাসীনতা ও স্থানীয় মহাজন ও বদবাবুদের জোট কৃষিজীবী মানুষের জমি অকৃষিকাজে ব‍্যবহার করতে বাধ‍্য করে চলছে। পারম্পরিক কৃষিব‍্যবস্থা আজ এক চরম সঙ্কটের মধ‍্যে রয়েছে। যার ফলে গ্ৰামীণ কৃষকেরা অভিবাসী শ্রমিক হয়ে স্বরাজ‍্যের অন্য জেলায় কিংবা অন্য প্রদেশে বিভিন্ন পেশার কাজে যুক্ত হচ্ছেন। যেসব প্রদেশের কৃষি একফসলি, সেসব রাজ‍্যের শ্রমজীবী মানুষের একাংশ যেমন কৃষক তেমনি শ্রমিকও বটে।

কৃষক থেকে কারখানা শ্রমিকে রূপান্তরণের পটভূমি

কৃষিকাজ থেকে পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় পরিবার চালানোর খরচের সঙ্কুলান হয় না। ফলে ২০০১-২০০২ সালে কয়েকজন শ্রমিক রুজিরুটির সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র যাওয়া শুরু করেন। এই ধারা অব্যাহত রেখে ২০০৩-২০০৪ সালে ধুতুরদহ গ্রাম পঞ্চায়েতের কয়েকটি গ্রাম যেমন ধুতুরদহ, গোয়ালদহ, দেবীতলা, খড়িবেড়িয়া ও জয়গ্রাম থেকে গরিব চাষি এবং দারিদ্রসীমা রেখার নীচে বসবাসকারী কয়েকজন কৃষক বারাসাতের একটি রেমিং মাস (Ramming Mass) উৎপাদনকারী কারখানায় কাজ করতে যান। দত্তপুকুরের একটি রেমিং মাস উৎপাদনকারী কারখানায় বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শ্রমিকেরা কাজ করছিল। সে সময় মজুরির হার ছিল দৈনিক ১৫০ থেকে ২০০ টাকা ও অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যাধিক্য হওয়ায় ২-৩ বছর কাজ করার পর তারা বেশি টাকা রোজগারের আশায় আসানসোল রানিগঞ্জ ও কুলটির রেমিং মাস এবং ফায়ার ব্রিকস তৈরির কারখানায় চাকুরির উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। শ্রমিকের দল সর্বশ্রী বালাকৃষ্ণণ মিনারেলস প্রাইভেট লিমিটেড, সর্বশ্রী তারামা মিনারেলস এবং সর্বশ্রী লক্ষ্মী স্টোন ফ্যাক্টরিতে কাজে যোগদান করেন। এই তথ্যগুলি সিলিকোসিস আক্রান্ত প্রায় দুইশো পঞ্চাশের অধিক শ্রমিকদের দেওয়া পেশাগত এবং ক্লিনিকাল ও শারীরিক কষ্টের ইতিহাস সম্পর্কিত তথ্যপঞ্জি থেকে জানা যায়।

২০০৯এর আইলা ঝড়ে সমগ্র সুন্দরবন অঞ্চলের কৃষিব্যবস্থা চরম সঙ্কটে পড়ে। তাই টিঁকে থাকার মতো জীবন-জীবিকা ও পুনর্বাসনের অপ্রতুল ব্যবস্থা সেখানকার কিশোর, যুবক ও চাষিদের দলে দলে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র যেতে এবং সুরক্ষাহীন কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে বাধ্য করে। এছাড়া সেই মুহূর্তে রোজগারের কোনও বিকল্প পথের সন্ধান ছিল না। এই ধরনের কারখানার ক্ষতিকর দিকগুলির ব্যাপারও তাদের অজানা ছিল। তাদের একটাই চিন্তা মাথায় কাজ করত নিজের খিদে মেটানো; আর বাড়িতে রেখে আসা ছোট ভাই, বোন, মা, বাবা আর স্ত্রীর মুখে আহার জোগানো।

চাকুরি করে পারিবারিক দায়িত্ব পালন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারখানা মালিকেরা যখন বুঝতে পারে যে শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়েছে তখন তারাই তাদের কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেয়। মালিকেরা দালাল মারফত নতুন কিশোর ও তরুণ শ্রমিকদের নিয়োগ করে। এমন অবস্থায় শ্রমিকেরা সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১০ থেকে ২০১১-এর মধ্যে একে একে প্রায় সবাই চাকুরি ছেড়ে নিজের গ্রামে ফিরে আসা শুরু করে।

ভারতের প্রায় সব রাজ্যের রেমিং মাস উৎপাদনকারী কারখানার বেআইনি ও বিপজ্জনক উৎপাদন প্রক্রিয়া একইরকম। মানুষমারা কারখানার নামকরণও হয়ে থাকে হিন্দু দেবদেবীর নামে। পশ্চিমবাংলাতেও তার কোনও ব্যতিক্রম হয়নি।

অধাতব খনিজ কোয়ার্টজ পাথর পদার্থের বিপজ্জনক প্রক্রিয়াকরণ

সর্বশ্রী বালাকৃষ্ণণ মিনারেলস, সর্বশ্রী তারামা মিনারেলস ও সর্বশ্রী লক্ষ্মী স্টোন ফ্যাক্টরি মূলত কোয়ার্টজ মিহি পাউডার ও গুঁড়ো উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং ফায়ার ব্রিকস কাচ ইনসুলেটর উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলিতে সরবরাহ করত। মিনাখাঁ, সন্দেশখালি, বাসন্তী এবং ক্যানিং সহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে কৃষক থেকে শ্রমিকে রূপান্তরিত হওয়া শ্রমিকেরা বিভিন্ন সময়ে ১ থেকে ৭ বছর অবধি ওই কারখানাগুলিতে কাজ করেছিল। সেখানে তাদের কাজের মজুরি ছিল ১৩-১৪ ঘন্টা কাজের পরিবর্তে ২০০-২৫০ টাকা। শ্রমিকরা দৈনিক মজুরিতে কাজ করলেও অধিক রোজগারের আশায় ফুরনেও অত্যধিক পরিশ্রম করত। যারা ফুরনে কাজ করতেন তারা টন প্রতি ২০০ টাকা করে পেতেন। শ্রমিকরা গড়ে দেড় টন রেমিং মাস উৎপাদন করতেন। তাঁদের একদিনের গড় আয় ৩০০ টাকা হত। রাত্রিকালীন ডিউটিতে ফুরনেই কাজ করানো হত। ভিন রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকেদের প্রলোভন দেখিয়ে এই কারখানাগুলিতে কাজের জন্য আনা হত। ফলে কারখানা থেকে তৈরি ধুলোর সংস্পর্শে ১২/১৩ ঘন্টা থাকা এবং খাওয়া, শোয়া, আরাম করা এমনকি ঘুমোনোর সময় পর্যন্ত তারা শ্বাস নেওয়ার সময়েও বায়ুর সঙ্গে ভাসমান মিহি সিলিকা পাউডার নাক দিয়ে টেনে নিতে বাধ্য হত। কারণ কারখানা মালিক কারখানার ভিতরেই ঘর বানিয়ে শ্রমিকদের রাখার ব্যবস্থা করেছিল।

এখানে রেমিং মাস বস্তুটি বলে দেওয়া যাক। কোয়ার্টজ পাথরের মিহি পাউডার ও গুঁড়োকেই রেমিং মাস বলা হয়ে থাকে। এই লেখায় কোথাও কোথাও সিলিকা ধূলিকণা, সিলিকা পাউডার, সাদা ধূলিকণা কিংবা মিহি ধূলিকণা ইত্যাদি শব্দগুলি ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু বস্তুটি একই জিনিস। রেমিং মাস উৎপাদনের সঙ্গে বিভিন্ন মাপের ছোট ছোট পাথর কুচিও উৎপাদন করা হত। কোয়ার্টজ পাথর ক্র্যাশ করে উৎপাদন প্রণালী শেষ হয় না। রেমিং মাস উৎপাদনকারী কারখানাগুলিতে ক্র্যাশিং, ডিসইন্টেগ্রেটিং, মিলিং, সিভিং, মিক্সিং (কোয়ার্টজ পাউডার ও কোয়ার্টজ স্টোন চিপস), এবং প্যাকিং-এর মধ্য দিয়ে উৎপাদন প্রক্রিয়া শেষ হয়। পাথরের টুকরোগুলিকে বল মিল বা রোলার মিল দিয়ে পেষাই করে  গুঁড়ো মিহি ও ৫ মাইক্রনের থেকেও মিহিপাউডার তৈরি করা হয়। যা সাধারণ মাস্ক ব্যবহার করে আটকানো যায় না। কোয়ার্টজ পাথরের গুঁড়ো ও মিহি পাউডার অর্থাৎ সিলিকন ডাইঅক্সাইডের ব্যবহার বিভিন্ন শিল্পে হয়ে থাকে। যেমন, ফায়ার ব্রিকস ও রিফ্র্যাক্টরিস আইটেম, ইনস্যুলেটর, লোহা এবং কাচ তৈরিতে ব্যবহার হওয়া ইনগট উৎপাদন প্রভৃতি। ব্লাস্ট ফার্নেসে ফায়ার ব্রিকস রিলাইনিঙের কাজেও ব্যবহার হয়। বিভিন্ন সরবরাহকারী মারফত ওই কারখানাগুলিতে বিহারের মুঙ্গের, পশ্চিমবাংলার বাঁকুড়া ও ঝাড়খণ্ড থেকে কোয়ার্টজ পাথরের সরবরাহ করা হত।

বিপজ্জনক উৎপাদন প্রক্রিয়াতে শিশু ও কিশোর শ্রমিক নিয়োগ

কারখানার শ্রমিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদের মুসলমান পরিবার থেকে ১৪-১৭ বছর বয়সী ছেলেদেরও দালাল মারফত বাবা-মায়েদের কাছ থেকে এক বছরের (যেখানে ১২ মাসে নয়, ১৩ মাসে বছরের হিসেবে হয়) চুক্তিতে নিয়ে আসত। এক ধরনের ক্রীতদাস বানিয়ে ক্রন্দনরত শিশু ও কিশোর শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হত।

কার্যক্ষেত্রে পেশাগত সুরক্ষা: স্বাস্থ্য ও সিলিকোসিস

কারখানাগুলিতে সিলিকা পাউডার অর্থাৎ র‍্যমিং মাস (Ramming Mass)  উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ধূলা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কোনও সুরক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা ও তার ব্যবহার না থাকায় মিহি সিলিকা পাউডার (সিলিকন ডাইঅক্সাইড) প্রচুর মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ত। ফলে পাশাপাশি কাজ করা শ্রমিকেরা একে অপরকে দেখে চিনতে পারত না। শরীরের উন্মুক্ত জায়গায়, চোখের ভুরু, নাকের ও কানের ভেতর এবং জামাকাপড়ে সর্বত্রই সাদা মিহি পাউডারের এক আস্তরণ জামা হয়ে যেত। মিহি পাউডার যা সাধারণভাবে ব্যবহৃত মাস্ক দিয়ে রোধ করা সম্ভব হত না। তাই শ্রমিকেরা গামছা ও কাপড় বেঁধে কাজ করত।

শ্রমিকদের শ্বাস টেনে নেওয়ার সময় বায়ুর সঙ্গে সিলিকা ধূলিকণা ফুসফুসের অভ্যন্তরে বায়ুকোষীয় থলের মধ্যে গিয়ে জমা হত। এই ধূলিকণা বায়ুকোষীয় থলিতে আঁকড়ে থাকে। এগুলি ফুসফুস থেকে নির্গত দূষিত বায়ুর সঙ্গে বেরিয়ে আসতে পারে না। ফুসফুস ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠতে থাকে। ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দেয়, ওজন কমতে থাকে, গায়ের রং কালচে হতে থাকে। বুকে যন্ত্রণা, শ্বাসকষ্ট, ও শারীরিক দুর্বলতা ক্রমাগত বাড়তে থাকে।

শারীরিক দুর্বলতাজনিত কারণে জল ভরা বালতি টেনে ওঠাতে বা কুয়ো থেকে জল তুলতে না পারা, টিউবওয়েল পাম্প করতে না পারা, একটানা এক বা দুই কিলোমিটার হাঁটতে না পারা, টিবি রোগের সংক্রমণের শিকার হওয়া এবং চিকিৎসায় টিবি রোগের নিরাময় হলেও শ্বাসকষ্ট ও বুকে যন্ত্রণা ক্রমাগত বাড়তে থাকা ও অন্যান্য উপসর্গগুলিও আগের তুলনায় খারাপ হওয়া দিয়েই বোঝা যায় যে রোগী ক্রমাগত বাড়তে থাকা পেশাগত ও দুরারোগ্য সিলিকোসিস ব্যাধিতে আক্রান্ত।

পেশাগত রোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ কুণাল কুমার দত্ত আরেক পেশাগত রোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ জন হান্টারকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে, সিলিকোসিস ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের টিবি রোগে সংক্রামিত হওয়ার বিপদ ১৫ গুণ বেশি থাকে। রোগীর এই নির্দিষ্ট অবস্থাটিকে বলা হয় সিলিকো-টিউবারকিউলোসিস বা সিলিকোটিক টিবি।

ক্রমাগত বাড়তে থাকা সিলিকোসিস আক্রান্ত রোগীদের ফুসফুস শক্ত হওয়ার ফলে শ্বাসকষ্ট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। যখন রোগী আর অক্সিজেন সিলিন্ডার থেকেও অক্সিজেন টেনে নিতে পারে না, সেই মুহূর্তে অক্সিজেনের অপ্রতুলতায় হৃদগতি স্তব্ধ হয়ে রোগী মারা যায়। এইভাবে মিনাখাঁ-সন্দেশখালি ব্লকের বিভিন্ন গ্রামের ৩৪ জন শ্রমিক অসময়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।

সিলিকা ধূলা প্রভাবিত শ্রমিক কতদিন বেঁচে থাকবে তা অনেকাংশেই নির্ভর করে কতদিন ধরে কী পরিমাণ মিহি সিলিকা ধূলার সংস্পর্শে থাকা, ধূমপান করা বা না করা, আহারের গুণমান এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং অক্সিজেন থেরাপি নেওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলির ওপর।

তখনকার সব থেকে বড় বামদলের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘শ্রমিক‌শ্রেণির দুর্গ’ আসানসোল-রানিগঞ্জ পরিণত হল মৃত্যুর আগের এক বধ্যভূমিতে। যেখানে অনিয়ন্ত্রিত মিহি ধুলিকনায় শ্রমিকেরা সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হল। আর শ্রমিকদের নিজ নিজ গ্রাম হয়ে উঠল আরেক বধ্যভূমি। সেখানে নামল মৃত্যুর ঢল। এর শেষ হবে কয়েকশো শ্রমিকের মৃত্যু আর পরিজনের করুণ কান্না ও বুকফাটা আর্তনাদে।

দেশের নিপীড়িত অংশের শ্রমিক সিলিকোসিস আক্রান্ত হওয়ার সময়ও যারা স্লোগান দিয়েছিলেন দুনিয়ার শ্রমিক এক হও, কিন্তু ধূলা দূষিত কার্যক্ষেত্র সুরক্ষিত করতে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। অপরিণত বয়েসে শ্রমিকেরা মারা গেলেও তারাই সেই একই স্লোগান দিচ্ছেন দুনিয়ার শ্রমিক এক হও। কিন্তু সিলিকোসিস চিহ্নিতকরণের মতন গুরুত্বপূর্ণ কাজটি এখনও করছেন না।

পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্পর্কিত নিয়মাবলি

কারখানার পরিভাষা অনুযায়ী সিলিকা পাউডার উৎপাদনকারী শিল্প-কারখানাগুলি সংগঠিত শিল্পের আওতাভুক্ত। এক্ষেত্রে কারখানা সম্পর্কিত সমস্ত শ্রম আইন ও নিয়মাবলি, যেমন ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্ট ১৯৪৮, ইএসআই অ্যাক্ট ১৯৪৮, ওয়ার্কমেন (এমপ্লয়িজ) কম্পেনসেশন অ্যাক্ট ১৯২৩ প্রযোজ্য। এই ধরনের বিপজ্জনক উৎপাদন প্রক্রিয়াধীন কারখানাগুলিকে অতিসরলীকৃতভাবে খনি খাদান, পাথর ভাঙা কল, বা অসংগঠিত শিল্প বলে উল্লেখ করা শুধুমাত্র একটি ভুল নয়, চূড়ান্ত ভাঁওতাবাজি এবং আইন লঙ্ঘন। এটা এক চূড়ান্ত অজ্ঞতা সহ চিন্তার দীনতারও পরিচয় দেয়, যা শ্রমিকস্বার্থের পরিপন্থী। জেনে রাখা ভালো, অসংগঠিত শিল্পের জন্য কোনও শ্রম আইন ও তার নিয়মাবলি নেই। কারখানা শ্রমিকের সমস্যাকে খনি খাদানের সমস্যা দেখিয়ে সমস্যার সমাধানের সঠিক রাস্তা থেকে সরে গিয়ে গুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন খনি খাদানেও শ্রমিকেরা সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়। কিন্তু মিনাখাঁ ও সন্দেশখালি সহ উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে যাওয়া শ্রমিকেরা যারা সিলিকোসিস রোগে মৃত কিংবা আক্রান্ত, কেউই খনি খাদানে কাজ করেননি। খনি খাদানের জন্য মাইনিং অ্যাক্ট ১৯৫২ এবং ওয়ার্কমেন (এমপ্লয়িজ) কম্পেনসেশন অ্যাক্ট ১৯২৩ প্রযোজ্য। কিন্তু খনি খাদানে ইএসআই অ্যাক্ট ১৯৪৮ প্রযোজ্য নয়।

ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্ট ১৯৪৮ অনুযায়ী সিলিকোসিস একটি Notifiable Disease। অর্থাৎ কোনও চিকিৎসক যদি কোনও সিলিকোসিস আক্রান্ত রোগীকে চিহ্নিত করেন তাহলে তাকে মুখ্য কারখানা নিরীক্ষক/পরিদর্শক (চিফ ইন্সপেক্টর অফ ফ্যাক্টরিজ)-কে জানাতে হবে। এই অ্যাক্টের তৃতীয় কর্মসূচি (Third Schedule) সিলিকোসিস সহ অন্যান্য পেশাগত রোগের উল্লেখ আছে। সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে আঘাতপ্রাপ্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। এমপ্লয়িজ কম্পেনসেশান অ্যাক্ট ১৯২৩ এবং ইএসআই অ্যাক্ট ১৯৪৮ অনুযায়ী ফুসফুসের কার্য্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার অনুপাতে কারখানার মালিক বা পরিচালকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিয়ম আছে।

সামাজিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে অকিউপেশনাল সেফটি এন্ড হেলথ এসোসিয়েশন অফ ঝাড়খন্ড (ওসাজ)-এর হস্তক্ষেপের ফলে মিনাখাঁর যে তেরো জন এবং বীরভূমের যে দুই জন চার লাখ টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন সেটা ওয়ার্কমেন (এমপ্লয়িজ) কম্পেনসেশন অ্যাক্ট ১৯২৩ কিংবা ইএসআই অ্যাক্ট ১৯৪৮ অনুযায়ী নয়। কারণ নিয়োগকর্তার পক্ষ থেকে শ্রমিকদের নিয়োগপত্র বা গেটপাস ও প্রমাণ পত্র কিছুই দেওয়া হয়নি এবং তৎকালীন বামফ্রন্ট পরিচালিত রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কারখানায় শ্রমিকদের পেশাগত সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যরক্ষা, সিলিকোসিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের ও নিয়োগ কর্তাদের চিহ্নিত করা এবং ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়নি। সেই কারণে জাতীয় মানব অধিকার কমিশন শ্রমিকদের বেঁচে থাকার অধিকার সুনিশ্চিত করতে না পারায় রাজ্য সরকারকে মানব অধিকার রক্ষা আইন ১৯৯৩-এর ধারা ১৮(এ) (আই) অনুযায়ী আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা করেন। কোনও ট্রেড ইউনিয়ন, কোনও সংস্থা ও সংগঠন এবং শ্রমিকেরা যদি ওয়ার্কমেন (এমপ্লয়িজ) কম্পেনসেশন অ্যাক্ট ১৯২৩ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ আদায় করিয়ে দিতে পারেন সেটা হবে জাতীয় মানব অধিকার কমিশনের নির্দেশে পাওয়া ক্ষতিপূরণের অতিরিক্ত।

সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও জেলা প্রশাসন সহ বিভাগগুলির ভূমিকা

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার কর্তৃক জাতীয় মানব অধিকার কমিশনে পাঠানো রিপোর্ট অনুযায়ী সর্বশ্রী তারামা মিনারেলস এবং সর্বশ্রী লক্ষ্মী স্টোন ফ্যাক্টরি নামক দুটি কারখানার কোনও অস্তিত্বই নাকি খুঁজে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ কারখানা দুটি ডায়রেক্টরেট অফ ফ্যাক্টরিসে নথিভুক্ত ছিল না। অথচ শ্রমিকের দেওয়া তথ্যপঞ্জি থেকে কারখানাগুলোর নাম উঠে আসছে। সর্বশ্রী বালাকৃষ্ণন মিনারেলস প্রাইভেট লিমিটেড ডায়রেক্টরেট অফ ফ্যাক্টরিস এবং ইএসআইসিতে নথিভুক্ত থাকলেও মিনাখাঁ, সন্দেশখালি, বাসন্তী এবং ক্যানিং থেকে যাওয়া শ্রমিকদের নাম ইএসআইসিতে নথিভুক্ত ছিল না। অর্থাৎ শুরু থেকেই দুটি কারখানা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এবং আরেকটি অর্ধেক বেআইনিভাবে উৎপাদান করত। যে কারখানাগুলি নথিভুক্তই ছিল না এবং ইএসআইসিতে যাদের নাম নথিভুক্ত ছিল না তাদের নিয়োগপত্র ও গেটপাস পাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। তাই সিলিকোসিসে মৃত ও আক্রান্ত শ্রমিকদের কারও কাছেই ওই কারখানাগুলিতে কাজ করার কোনও প্রমাণ নেই।

আগে বলা শ্রম আইন ও তার নিয়মাবলি বিধিবদ্ধকরণের মূল দায়িত্ব থাকে সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার। কারখানা পরিদর্শকমণ্ডলী, রাজ্য প্রদূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এবং জেলা প্রশাসনের বিশেষ করে জেলার ডি.এম যিনি ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্ট ১৯৪৮ অনুযায়ী কারখানা পরিদর্শকের দায়িত্ব ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত। ‌‘শ্রমিকশ্রেণির দুর্গে’ ওই নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও জেলা প্রশাসনকে হয় নিয়ম মতন কাজ করতে দেওয়া হয়নি, নতুবা ওই বিভাগগুলির আধিকারিকরা নিয়মমতন কাজ করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। ফলে শ্রম আইন অনুযায়ী যে সব অধিকার, বিশেষ করে পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যের এবং সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে গেলে সামাজিক সুরক্ষার অধিকার শ্রমিক ও মৃতের পরিবার পেতে পারতেন তা থেকে তারা বঞ্চিত রয়ে গেলেন।

সুতরাং শ্রম আইন অনুযায়ী সিলিকোসিস রোগে মৃত ও আক্রান্তদের সঠিক দাবি দাওয়া নিয়ে কোনও রকম শ্রমিক আন্দোলন গড়ে উঠল না। আশ্চর্যজনক ভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের পরিচালিত ট্রেড ইউনিয়নগুলি আজ মৌনব্রত অবলম্বন করে আছে। এমনকী ‌‘শ্রমিক শ্রেণির দুর্গের’ রাজ্যে আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাওয়ার লক্ষ্যে শ্রম আদালতে কোনও মামলা দায়ের করা হল না।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হস্তক্ষেপ ও পরিণাম

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ১৮ ডিসেম্বর ২০০৮-এ দেশের সর্বোচ্চ আদালতে সিলিকোসিস নিয়ে চলা একটি বিচাররাধীন মামলায় (রিট পিটিশন সংখ্যা ১১০/২০০৬) একটি হস্তক্ষেপ আবেদন দায়ের করে। এর সঙ্গে ঝাড়খণ্ড, গুজরাত, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ থেকে কমিশনে দাখিল করা মামলা সংক্রান্ত তথ্যগুলিকে এফিডেভিট হিসেবে দাখিল করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ০৫/০৩/২০০৯-এ অন্তর্বর্তীকালীন রায়ে জাতীয় মানব অধিকার কমিশনকে সিলিকোসিস রোগে মৃত শ্রমিকদের আশ্রিতদের ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়ার ও সিলিকোসিস আক্রান্তদের সরকারি খরচে চিকিৎসা করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই আদেশের ওপর ভিত্তি করে আয়োগ বিভিন্ন রাজ্য সরকারগুলিকে বিভিন্ন সুপারিশ করে থাকে।

অকুপেশনাল সেফটি এন্ড হেলথ এসোসিয়েশন অফ ঝাড়খণ্ড (ওসাজ) ২০১২ থেকে মিনাখাঁ অঞ্চলে সিলিকোসিস নিয়ে কাজ শুরু করে। পঞ্চায়েতে সদস্য, স্থানীয় সামাজিক কর্মীদের সহযোগিতায় তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করে। পশ্চিমবাংলার দুটি সংস্থাকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু পশ্চিমবাংলার ওই দুটি সংস্থা আবেদন করতে রাজি হয়নি। তাই ওসাজ ২৩ জুলাই ২০১৪-তে সিলিকোসিস রোগে মৃতের আশ্রিতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আবেদন জানিয়ে একটি আবেদন জমা দেয়। আবেদনের ফাইল/মামলা ন. ১২০৯/২৫/১৫/২০১৪। ফলস্বরূপ মানবাধিকার কমিশন ওসাজের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য সরকারকে কারণ দেখানোর নোটিস জারি করে। এরপর ওই দুটি সংস্থার একটি প্রায় ১৩ মাস পর আগস্ট ২০১৫-তে এবং আরেকটি সংস্থা ডিসেম্বর ২০১৫-তে কমিশনে আবেদন জমা করে। একই ধরনের আবেদন হওয়ায় কমিশন এই প্রতিবেদকের দায়ের করা মামলার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। এদের মধ্যেকার আবার একটি সংস্থা রাজ্যের উচ্চ আদালতেও একটি মামলা দায়ের করেছিল।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানো সুপারিশগুলি নিম্নরূপ:

০৯/০৫/২০১৭ তারিখে পাঠানো সুপারিশগুলি:

১. নয় জন মৃতের আশ্রিতকে চার লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন দেওয়া।

২. সিলিকা ধুলো প্রভাবিত ও সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা।

২৭/০২/২০১৮ তারিখে পাঠানো অন্যান্য সুপারিশগুলি:

১. মিনাখাঁ গ্রামীণ হাসপাতালে ৩০০ মিলি এম্পিয়ারের এক্সরে মেশিন সহ অন্যান্য উপকরণ লাগিয়ে হাসপাতালের গুনগত মান উন্নয়ন করা।

২. হরিয়ানার সিলিকোসস রিলিফ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন প্ল্যান অনুয়ায়ী পশ্চিমবাংলা সরকারকে সেই ধরনের পরিকল্পনা তৈরি করা।

৩. বাইশ জন সিলিকোসিস আক্রান্ত ব্যক্তির এক্স-রে প্লেটের আইএলও রেটিং ডাক্তার কুনাল কুমার দত্ত এবং ডাক্তার তপন কুমার মোহান্তি দ্বারা ২১/০৫/২০১৭ করা হয়। যার মধ্যে ১৩ জন সিলিকোসিস রোগে মারা যায় যাদের মধ্যে পাঁচ জন আর্থিক ক্ষতিপূরণ পেয়ে গেছে। অবশিষ্ট আট জনের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেওয়া উচিত ছিল বলে কমিশন মন্তব্য করেন।বিশেষ দ্রষ্টব্য: বাইশ জনের মধ্যে যারা জীবিত সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী জীবিত ব্যক্তিদের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়নি। তখনকার জীবিতদের মধ্যেকার হাসানুর মোল্লা ১৭ জুন ২০১৯ ভোরবেলা মারা যায়। প্রত্যেকের বুকের এক্সরে প্লেটের ডিজিটাল কপি সরকারি আধিকারিকের কাছে ইমেল করে পাঠান হয়েছে। এদের সকলেই আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবে। সরকারি আধিকারিকরা সেসময় বলেছিলেন যে পেশাগত ইতিহাসের তথ্য প্রমাণ না থাকায় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কাজ বিলম্বিত  হচ্ছে। শ্রমিকদের কাছে এমন কোনও প্রমাণাদি নেই যা দিয়ে তারা প্রমাণ করতে পারে যে তাদের নিয়োগ কর্তা কে ছিলেন এবং কোথায় তারা কার্যরত ছিলেন। এর জন্য প্রাকৃত দায়ী সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

৪. রাজ্য সরকারকে এমন একটি স্বতঃসহায়ক (self sustaining) প্রক্রিয়া বিকশিত করতে হবে যেখানে কোনও আক্রান্ত ব্যক্তি বা তাদের হয়ে যেন কোনও এনজিও-কে কমিশন অর্থাৎ আয়োগের কাছে যেতে না হয়।

৫. ২০১৩-এর অক্টোবর এবং ডিসেম্বরে মিনাখাঁ ব্লকে সরকারি চিকিৎসকদের করা এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে, ১৫৬ জনের বুকের এক্স-রে এবং ক্লিনিকাল তথ্য বিশ্লেষণে একশো তেইশ জন অর্থাৎ ৭৮.৮৫ শতাংশ সিলিকোসিস রোগে ভুগছিলেন। এরকম একটা ভয়াবহ ব্যাপারের পরেও রাজ্য সরকার কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

৬. উপরে বর্ণিত নয়জনের মধ্যে পাঁচজনকে আগের (০৯/০৫/২০১৭) করা সুপারিশ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় আর ২৭/০২/২০১৯ এর সুপারিশে তিনজনকে এবং সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে এক জনকে ক্ষতিপুরণ দেয়া হয়। এর পর আরও চারজন কে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার নিমিত্ত চিহ্নিত করা হয়। যাদের মধ্যে চারজন ইতিমধ্যে চার লাখ করে টাকা পেয়ে গেছে কিন্তু বাকি নয়জনের আশ্রিত এখনো টাকা পায়নি।

৭. রাজ্য সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত ২৪/০৪/২০১৮-এর বৈঠকে ওসাজ-এর পক্ষ থেকে ৩০০ মিলি এম্পিয়ারের এক্স-রে মেশিন দিয়ে এক্স-রে করানোর প্রস্তাব করানো হয়। মিনাখাঁ হাসপাতালে ৩০০ মিলি এম্পিয়ারের এক্স-রে মেশিন না থাকায় রাজ্য সরকারের তরফে ঘটকপুকুরের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এক্স-রে করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সিলিকোসিস নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে করণীয় কাজগুলি নিয়ে এক সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়। ২৫ এপ্রিল থেকে আগস্ট ২০১৮ অবধি একশো তেত্রিশ জনের এক্স-রে করানো সম্ভব হয়। বিদ্রঃ, সর্বাধিক উদ্বেগের বিষয় হল যে ১৩৩ জনের এক্স-রে প্লেট পরীক্ষা করতে চার মাস থেকে আট মাস লেগে গেল। ০৫/১২/২০১৮তে তিন ডাক্তারের প্যানেল ৩৫ জন সিলিকোসিস আক্রান্ত রোগীকে চিহ্নিত করেন। ইতিমধ্যে দুইজন সিলিকোসিস আক্রান্ত রোগী মারা গেছেন ও তাদের আশ্রিতরা আর্থিক ক্ষতিপূরণও পেয়ে গেছেন। ২৮ জুলাই ২০২০তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত ওয়েবিনারে শুনানির সময় হরিয়ানা ধাঁচে রিলিফ ও পুনর্বাসন যোজনা তৈরি ও লাগু করার কথা উল্লেখ করা হয়। ৭ আগস্ট সরকারি অফিসারদের সঙ্গে দূরভাসে আলোচনার সময় জানা যায় যে তারা ২০১৮র সেপ্টেম্বর মাসেই হরিয়ানা ধাঁচে রিলিফ ও পুনর্বাসন যোজনা সম্বলিত রিপোর্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক কর্তৃক উচ্চ আধিকারিকের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয় এবং তারা হুবহু হরিয়ানা ধাঁচের না হলেও সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের জন্য একটি পুনর্বাসন প্যাকেজ তারা স্থির করেছেন যা ৫ লাখের পরিবর্তে ২ লাখ হতে পারে।

বি.দ্রঃ এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ থাকলেও সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের রুজিরোজগারের কাজে ব্যস্ত থাকা, পূজাপার্বণ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং পঞ্চায়েত নির্বাচন এই সকল কারণে সেসময় এক্স-রে করতে এত দীর্ঘ সময় লেগে যায় আর সবার এক্স-রে করাও হয়নি। স্বাস্থ্যপরীক্ষার নামে মিনাখাঁ ও সন্দেশখালি গ্রামীণ হাসপাতালগুলিতে লোকদেখানো প্রহসন ছাড়া কিছুই হয়নি। সিলিকোসিস আক্রান্ত বা সিলিকা ধূলা প্রভাবিত শ্রমিকদের নিয়মিত অর্থাৎ প্রতি ছয় মাস অন্তর এক্স-রে না করে স্বাস্থ্যপরীক্ষা অর্থহীন ও শ্রমিকদের বোকা বানানোর এক প্রচেষ্টা মাত্র। হয় চিকিৎসকরা এটা জানেন না বা বোঝেন না যে সিলিকোসিস ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকা একটি দুরারোগ্য ব্যাধি। তাই নিয়মিত বুকের এক্স-রে করা ছাড়া সিলিকোসিস আক্রান্ত রোগীদের চিহ্নিত করা সম্বব নয়। সেই ২০১৮র পর দু বছর হতে চলল নতুন করে আর সরকারের উদ্যোগে এক্স-রে করানো হয়নি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ২৮ জুলাই ২০২০তে ওয়েবিনার আয়োজন করার পর এক্স-রে করার একটা সরকারি উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। কিছু শ্রমিকের যাদের আগে কখনও এক্স-রে হয়নি, তাদের করানো হয়েছে। কিন্তু আমাদের দাবী যারা সিলিকোসিস আক্রান্ত রোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে তাদের বাদ নিয়ে সবাইকে এক্স-রে করতে হবে। এই স্বাস্থ্যপরীক্ষার প্রক্রিয়ায় রেমিং মাস সহ ঘড়ভাঙ্গা, স্টোন ক্র্যাশার এবং সমস্ত সিলিকা ধূলা উত্সর্জনকারী কারখানা ও খনিশ্রমিকদের সামিল করতে হবে। আমাদের সংস্থা শুধুমাত্র র‍্যমিং মাস শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করে চলেছে। তাই যেসব গ্রুপ স্টোন ক্র্যাশার বা খনিশ্রমিকদের নিয়েও কাজ করে চলেছে তাদের সাহায্য নেওয়া দরকার যাতে শ্রমিকদের তালিকা সরকার পেতে পারেন।

৮. রাজ্য সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত ১১.৯.২০১৮-এর বৈঠকে ওসাজ-এর পক্ষ থেকে রিলিফ এবং পুনর্বাসন সম্পর্কিত কয়েকটি প্রস্তাব রাখা হয়। রাজ্য সরকারের তরফে বাইশজনকে আবাসনের সুবিধা ও জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পনেরোটি ছাগল পুনর্বাসনস্বরূপ দেওয়া হয়েছে। (তথসূত্র: সিলিকোসিস আক্রান্ত পরিবারগুলি থেকে প্রাপ্ত সূচনা)।

বিঃ দ্রঃ তথ্যসূত্র সঠিক হলে, সরকারি তরফে পুনর্বাসন দেওয়া অপ্রতুল হলেও এই উদ্যোগ স্বাগত। তবে দেখতে হবে সিলিকোসিস রোগে মৃতের পরিবারগুলিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পুনর্বাসন দেওয়াটাই হবে সরকারি প্রাথমিকতা। এবং সিলিকোসিস আক্রান্তরা যাতে সবাই পুনর্বাসন পান সেই লক্ষে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

সিলিকোসিস চিহ্নিতকরণ, নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মূলীকরণের অভিযান ও বর্তমান অবস্থা

আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন (আইএলও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যৌথভাবে ১৯৯৫ থেকে বিশ্ব জুড়ে সিলিকোসিস চিহ্নিতকরণ ও নির্মূলীকরণের লক্ষ্যে ৩০ বছরের এক বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম শুরু করে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ এই কার্যক্রমের কথা হয়তো জানেনও না। ভারত সরকারের পক্ষে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য সংগঠন (National Institute of Occupational Health) দ্বারা আয়োজিত কয়েকটি সভা সেমিনারের মধ্যেই ওই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। সিলিকোসিস চিহ্নিতকরণ ও নির্মূলীকরণের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলি কোনওপ্রকার আপৎকালীন বা দীর্ঘকালীন কার্যক্রম গ্রহণ করেনি ও সেকারণেই সরকারের কাছে কোনও সঠিক তথ্যপঞ্জিও নেই।

২০০৭-এ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও)-এর প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী ভারতে খনন, নির্মাণকার্য এবং বিভিন্ন কলকারখানায় নিযুক্ত প্রায় এক কোটি মানুষ উন্মুক্ত সিলিকা ধূলার সংস্পর্শে কাজ করে[1]

ডিজিএমএস (Directoret General of Mines Safety) প্রদত্ত এক দশকের পুরনো তথ্যসূত্র অনুযায়ী বিভিন্ন শিল্পে, যেমন স্লেট পেন্সিল ৫৪.৭ শতাংশ, সিরামিক ১৫.১ শতাংশ, আগেট গ্রাইন্ডিং ২৯.১ শতাংশ, স্টোন কাটিং ১৯.১ শতাংশ এবং কোয়ার্টজ গ্রাইন্ডিং-এ ৪১.৭ শতাংশ সিলিকোসিস আক্রান্ত ব্যক্তি দেখা যায়[2]। পাথর ভাঙা ও স্টোন ক্রাশার শ্রমিকদের মধ্যে সিলিকোসিস পাওয়া গেছে ৫৫ শতাংশ। ওসাজ-এর তথ্য (অসম্পূর্ণ অধ্যায়ন) অনুযায়ী ঝাড়খণ্ডে কোয়ার্টজ গ্রাইন্ডিং (রেমিং মাস) শিল্পে সিলিকোসিস আক্রান্ত ও মৃত ব্যক্তির সংখ্যা ৮০ শতাংশরে চেয়ে বেশি এবং শ্রমিকদের গড় আয়ুসীমা ৩৩ বছর।

বর্ণিত তথ্যসূত্রগুলি প্রায় এক থেকে দুই দশক পুরনো। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির কাছে কোনও নির্ভরযোগ্য সিলিকোসিস সংক্রান্ত তথ্য নেই। আইএলও-র সূত্র থেকে সিলিকোসিস রোগের যেসব তথ্য বেরিয়ে আসে তা সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। তার কারণ ভারত সহ বিশ্বের উন্নয়নশীল ও অবিকশিত দেশগুলি থেকে সিলিকোসিস সংক্রান্ত তথ্যাদি আইএলও-কে দেওয়া হয় না। আর যদি বা দেওয়া হয়, প্রকৃত তথ্য দেওয়া হয় না। কারণ আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা দিয়ে বলা যায় যে, পেশাগত রোগের কোনও প্রকৃত তথ্যসূত্র ভারত সরকারের কাছে নেই। তথ্যসূত্র তৈরির জন্য সিলিকোসিস সহ অন্য পেশাগত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতেই প্রবল অনীহা রয়েছে। যতটুকু তথ্য পাওয়া যায় তা যে সব এনজিও-রা এই বিষয় নিয়ে কাজ করে তাদের কাছ থেকেই পাওয়া সম্ভব। আর সমগ্র দেশে এই বিষয়ে কাজ করা এনজিও-র সংখ্যা সাত কিংবা আটের বেশি নয়।

বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি আধিকারিকরা সভা-সেমিনারে বক্তব্য রাখার সময় সিলিকোসিস কী ভাবে হয়, কেন হয়, কীভাবে নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল করতে হয় সবই ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু প্রশ্ন করা হলে জানান তাঁদের রাজ্যে সিলিকোসিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দুটি কিংবা তিনটি। এই বলে বসে পড়েন। অলিখিত নির্দেশের কারণে মিনাখাঁ গ্রামীণ হাসপাতালে ও কলকাতার সরকারি হাসপাতালেও চিকিৎসকরা মেডিক্যাল রিপোর্টে সিলিকোসিস লিখতে অনীহা প্রকাশ করেন। যাই হোক প্রতিবেদক দ্বারা বীরভূমের সিলিকোসিস কেস ফাইল হওয়ার পর মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১২তে সিলিকোসিস কন্ট্রোল প্রোগ্রাম তৈরি করে।

২০১৩-২০১৪ সালে সরকারি উদ্যোগে মিনাখাঁ ব্লকে একশ ছাপ্পান্নর মধ্যে একশো তেইশ জন সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিক চিহ্নিতকরণের পর বিশেষ কোনও প্রয়াস লক্ষ করা যায়নি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য দফতরের উদ্যোগে মাঝেমধ্যে স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো হয়ে থাকে। ২৫ এপ্রিল ২০১৮ থেকে আগস্ট ২০১৮ অবধি ১৩৩ জনের বুকের এক্স-রে করানো হয়। ০৫/১২/২০১৮তে তিন ডাক্তারের প্যানেল ৩৫ জন সিলিকোসিস আক্রান্ত রোগীকে চিহ্নিত করেন। কিন্তু এক্স-রে রিপোর্ট সিলিকোসিস আক্রান্ত রোগীদের এখনও দেওয়া হয়নি।

বিঃ দ্রঃ সরকারি আমন্ত্রণে শ্রম দফতরে ২৪/০৪/২০১৮তে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত বর্তমান প্রতিবেদকের প্রস্তাবমতো ৩০০ মিলি এম্পিয়ার এক্সরে মেশিন থাকার কারণে হেলথ গার্ড ডায়গনস্টিক সেন্টার, বামনপুকুর থেকে বুকের এক্সরে করানো শুরু হয় ২৫/০৪/২০১৮ থেকে।

OSHAJ-এর উদ্যোগে পঁচাত্তর জন শ্রমিকের বুকের এক্স-রে করানো হয়। ২০১৭-তে বাইশ জন এবং ২০১৯-এর মার্চ অবধি এক্স-রে প্লেটের আইএলও রেটিং দ্বারা তিপান্ন জন সিলিকোসিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয় এবং আইএলও মাপদণ্ড অনুযায়ী যাদের এই মুহূর্তে সিলিকোসিস আক্রান্ত বলা যাচ্ছে না তাদের পুনর্বার এক্স-রে করানোর প্রস্তাব করা হয়। ডঃ কুণাল কুমার দত্ত সিলিকা ধূলিকণা প্রভাবিত ও সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের প্রতি ছয় মাস অন্তর এক্স-রে করানোর প্রস্তাব দেন।

মিনাখাঁ, সন্দেশখালি এবং ক্যানিং থেকে যাওয়া শ্রমিকেরা কোয়ার্টজ গ্রাইন্ডিং (রেমিং মাস) কারখানায় কাজ করত। সুতরাং সহজেই অনুমান করা যেতে পারে, মিনাখাঁ, সন্দেশখালি, বাসন্তী এবং ক্যানিং অঞ্চলের যে সব শ্রমিকেরা রেমিং মাস শিল্পে কার্যরত তাদের অসুস্থতা, শারীরিক যন্ত্রণা ও মৃত্যু এক ভয়াবহ আকার নেবে। এইরকম এক পরিস্থিতিতে সিলিকোসিস অভিযানের সফলতা নির্ভর করবে সিলিকোসিস চিহ্নিতকরণ ও নির্মূলীকরণের মধ্যে।

সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের সিলিকোসিস সম্পর্কিত দুটি রায়ের পাৰ্থক্য ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়গুলি

পশ্চিম মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রাম মহাকুমা অন্তর্গত চিচুনগেড়িয়ার একটি কারখানার আশির দশকের শেষে ১৬ জন সাঁওতাল সম্প্রদায়ভুক্ত আদিবাসী শ্রমিক সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ও আরও ১২ জন সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়।

ঝাড়গ্রাম শহরের বাসিন্দা বিজন সারেঙ্গী একটি স্কুলে শিক্ষকতার সঙ্গে সঙ্গে ও পরিবেশ ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছিলেন। বিজনবাবুর উদ্যোগে ওই শহরের বেশ কিছু মানুষকে নিয়ে চিচুনগেড়িয়ার একটি কোয়ার্টজ পাউডার তৈরির কারখানার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের দাবি সহ ন্যায্য দাবি-দাওয়া সামনে রেখে আন্দোলন শুরু করেন। তিনি বিষয়টি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গোচরে আনেন। আন্দোলন চলাকালীন ষোল জন মারা যান ও বারো জন আক্রান্ত জীবিত অবস্থায় থেকে যায়। বিজনবাবু কোয়ার্ক সাইন্স সেন্টার নামে পরিবেশ সংক্রান্ত একটি পত্রিকা প্রকাশনার সঙ্গে সঙ্গে সিলিকোসিস আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতেন। এই আন্দোলনে সাংসদ শ্রীমতি গীতা মুখার্জী সহ কয়েকটি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ ও এলাকার বহু মানুষ সামিল হন। CITU এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। পরে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি (INTUC, AITUC, HMS, UTUC (L-S), UTUC, AICCTU সম্মিলিতভাবে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন এমসি মেহতা বনাম ভারতীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্যদের মামলায় (রিট পিটিশন সংখ্যা 3727/1965) হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নেয়। নাগরিক মঞ্চের পক্ষ থেকে শ্রী নব দত্ত মহাশয় ওই ট্রেড ইউনিয়নগুলির পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে হস্তক্ষেপের পিটিশন দায়ের করেন।

বিজন সারেঙ্গী

জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও শ্রম কমিশনার শুরু থেকেই প্রমাণ করতে সচেষ্ট ছিলেন যে সব শ্রমিকেরা মারা যাচ্ছে তারা সবাই অসংগঠিত শ্রমিক। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে জেলাশাসক জানায় যে সুরেন্দ্র খনিজ নামক কোম্পানিতে কোয়ার্টজ পাথরের পাউডার উৎপাদনের কাজে শ্রমিকেরা নিয়োজিত ছিল। কিন্তু শ্রমিকদের গেটপাস, পরিচয়পত্র কিছুই ছিল না। এই সময় কোম্পানির পক্ষে এগিয়ে আসে শ্রম কমিশনার। কমিশনার জানান, ওই কোম্পানি ডাইরেক্টর অফ ফ্যাক্টরিসের অধীন নিবন্ধিত ছিল না। সেহেতু ওই শ্রমিকেরা অসংগঠিত শ্রমিক বলে পরিগণিত হবে। অসংগঠিত শ্রমিক বলতে মূলত অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক বোঝায় যাদের জন্য কোনও শ্রম আইন বা নিয়মাবলি নেই। সুতরাং এই ক্ষেত্রে ওয়ার্কম্যান  (এমপ্লয়িজ) কম্পেনসেশন অ্যাক্ট ১৯২৩ প্রযোজ্য নয়। কিন্তু আদালত ২৬ নভেম্বর ১৯৯৬-তে এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ রায় প্রদান করতে গিয়ে বলেন যে, কারখানা যদি ডাইরেক্টর অফ ফ্যাক্টরিজের অধীন নিবন্ধিত নাও হয়ে থাকে, এর জন্য দোষী এবং দায়ী সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি যেমন ইন্সপেক্টরেট অফ ফ্যাক্টরিজ, রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যাদের অনুমতি ব্যতিরেকে কারখানা শুরু করা এবং উৎপাদন পরিচালনা সম্ভব নয়। সুতরাং সুরেন্দ্র খনিজকে একটি ফ্যাক্টরি হিসেবে গণ্য করে এবং শ্রমিকদের ওয়ার্কম্যান (এমপ্লয়িজ) কম্পেনসেশন অ্যাক্ট ১৯২৩ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা করে।

এর প্রায় ১৩ বছর পর পিপলস রাইটস এন্ড সোসাল রিসোর্স সেন্টার বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া মামলায় (রিট পিটিশন সংখ্যা ১১০/২০০৬) মাননীয় সর্বোচ্চ আদালত স্বীকার করে নেয় যে বেশ কয়েকটি রাজ্যে সিলিকোসিস রোগের ব্যাপকতার আনুপাতিক হার অনেক বেশি। এই মামলায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সিলিকোসিস নিয়ে কার্যরত এনজিও-দের পক্ষ থেকে ১৮/১২/২০০৮ ওই মামলায় হস্তক্ষেপের পিটিশন দায়ের করেন। মহামান্য আদালত, অন্তর্বর্তীকালীন একটি রায়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর সিলিকোসিস রোগে মৃত ও আক্রান্ত প্রমাণিত রোগীদের জন্য যথাক্রমে ক্ষতিপূরণ এবং চিকিৎসা পরিষেবা পাইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দেয়।

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দুটি রায়ে বেআইনিভাবে চলা দুটি কারখানার মৃত শ্রমিকদের নিকট আত্মীয়দের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়। প্রথম রায়টিতে মৃতের আশ্রিতকে এবং জীবিত সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে কারখানা মালিককে বাধ্য করা হয়। দ্বিতীয় অন্তর্বর্তীকালীন রায়টিতে শুধুমাত্র মৃতের আশ্রিতকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের এবং বিনা খরচে চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তুলনামূলক বিশ্লেষণে এবং বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের ২৬ নভেম্বর ১৯৯৬-এর রায় ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ।

পেশাগত সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের ২০১২-২০১৭ অবধি দ্বাদশতম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা

ভারত সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১২তে শ্রমিকের সুরক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সুস্থ পরিবেশকে শ্রমিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এক জাতীয় নীতি ঘোষণা করে। যদিও এই ঘোষণায় পেশাগত কথাটির উল্লেখ ছিল না।

ভারত সরকারের পেশাগত নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের ২০১২-২০১৭ অবধি দ্বাদশতম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রতিবেদনের ১১২ নং পাতায় বলা হচ্ছে যে, স্লেট পেন্সিল কাটিং, স্টোন কাটিং এবং এগাট (Agat) শিল্পের সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে এই তিন ধরনের অসংগঠিত শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরাই সর্বাধিক বেশি সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। বেশিরভাগ অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য কোনও আইন নেই। সুতরাং অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কোনও বিকল্প ব্যবস্থা নেই। ঐ প্রতিবেদনের ৮৫ নং পাতায় ছোট ও মাঝারি শিল্পের উল্লেখ করে সেই একই অসংগঠিত শিল্পের ও সেই একই বক্তব্য তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সিলিকোসিস রোগে মৃত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়ার নির্দেশও উল্লেখ করা হয়। এর অর্থ সংগঠিত ক্ষেত্রে সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম এবং বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে যে সিলিকোসিস রোগের প্রকোপ শুধুমাত্র ছোট মাঝারি অসংগঠিত ক্ষেত্রে শিল্পগুলিতেই দেখা যায়। ছোট শিল্প যদি ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্ট অনুযায়ী কারখানার সংজ্ঞার আওতাভুক্ত না হয় তাহলে সেগুলিকে অসংগঠিত শিল্প হলেও হতে পারে। কিন্তু মাঝারি শিল্পকে অসংগঠিত বলাটা কিন্তু বিপথগামী করার প্রচেষ্টা মাত্র। এগাট (Agat) শিল্পে পাথর ঘষে গয়না ও আভূষণ তৈরির কর্মক্ষেত্রগুলি যদিও শ্রমিকদের নিজ নিজ বাসাবাড়িতেই হয়ে থাকে। যেখানে শিল্পপতির হয়ে ফুরনে কাজ হয়ে থাকে সেটাকে অসংগঠিত কর্মক্ষেত্র বলা যায় কিনা সেটা ভেবে দেখার বিষয়।

স্লেট পেনসিল তৈরির কর্মক্ষেত্র যেখানে বিদ্যুতের ব্যবহার না হলেও শ্রমিকেরা কোনও না কোনও মালিকের অধীনে দৈনিক মজুরিতে হোক বা ফুরনে কাজ করে। এসব ক্ষেত্রে শ্রমিকের সংখ্যা খাতায়কলমে ২০-র কম দেখালেও সেটা অসংগঠিত ক্ষেত্র হয়ে যায় না। হ্যাঁ পারিবারিক ও পারম্পরিক এগেট ঘষে পালিশ করে আভূষণ ও গয়না তৈরির পেশার সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের নিঃসন্দেহে অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিক বলা যায়। যে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক মালিক সম্পর্ক স্থাপন হয় না সেটা অসংগঠিত ক্ষেত্র। এরকম কয়েকটি অসংগঠিত কর্মক্ষেত্রের আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

মিনাখাঁ ও সন্দেশখালি ব্লক থেকে শ্রমিকেরা যে রেমিংমাস উৎপাদনকারি কারখানায় কাজ করেছিল সেগুলি প্রত্যেকটি মাঝারি শিল্পের আওতাভুক্ত যেখানে শুধুমাত্র কোয়ার্টজ পাথর ক্র্যাশিং করেই উৎপাদন প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায় না যা আগেই লেখা হয়েছে। প্রথমে হাতুড়ি দিয়ে কোয়ার্টজ পাথরের বড় বড় চাঙ্গড়কে ছোট ছোট টুকরো করে ক্র্যাশার মেশিনে দেওয়া হয়। ক্র্যাশিংয়ের পর কনভেয়ার দিয়ে পাথরকুচিগুলিকে বল বা রোলার মিলে পাঠানো হয়। সেখানে পাথরকুচিগুলিকে পেশাই করে বিভিন্ন (৩০ নং ও ৪০ নং ইত্যাদি) মেসের সিলিকা গুঁড়ো ও ৫০০ মেসের মিহি পাউডার তৈরি করা হয়, তারপর অর্ডার অনুযায়ী রাসায়নিক দ্রব্যাদি মেশানো হয় ও সবশেষে ব্যাগে ভরা হয়। রেমিং মাস (কোয়ার্টজ পেশাই পাউডার কারখানাগুলি সর্বাধিক বিপজ্জনক উৎপাদন প্রণালী দ্বারা সঞ্চালিত হয় ফলে খুব কম সময় কাজ করে শ্রমিকেরা সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়। প্রচার এমনভাবে করা হয়েছিল যে রাস্তার ধারে ধুলো ওড়া স্টোন ক্র্যাশার দেখলেই বেশিরভাগ মানুষ এটাই ধরে নেয় যে পাথর খাদান ও ক্র্যাশারের মতো বিপজ্জনক কর্মক্ষেত্র আর নেই। পাথর খাদান ও ক্র্যাশারেও সিলিকোসিস হয় তবে সেখানে আক্রান্ত হতে র‍্যমিং মাসের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগে। কারণ র‍্যমিং মাস শত প্রতিশত সিলিকন ডাইঅক্সাইড যা শ্রমিকের ফুসফুসে জমে গিয়ে সিলিকোসিস রোগটি বাধায়। তাহলে ছোট বা মাঝারি যাই হোক না কেন সেগুলি অসংগঠিত ক্ষেত্রের আওতাভুক্ত হয় কী করে? যে গোটা উৎপাদন প্রণালীতে ক্র্যাশিং কয়েকটি প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি প্রক্রিয়া তাহলে র‍্যমিং মাস ফ্যাক্টরিকে পাথর ফ্যাক্টরি বা ক্র্যাশার বলা যায় কি? যে উৎপাদন প্রণালীটি কয়েকটি উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় ও যে কার্যক্ষেত্রে শ্রমিক মালিক সম্পর্ক থাকে সেটাকে অসংগঠিত ক্ষেত্র বলা যায় কি? কিন্তু আমরা দেখেছি বেশকিছু ট্রেড ইউনয়ন নেতা, সামাজিক কর্মী ও সাংবাদিকরাও ভুল সংজ্ঞা দিয়ে আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। পরান যাহা চায় গোছের ধ্যানধারণা দিয়ে তো কার্যক্ষেত্রের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা যায় না। যারা এই ভুলগুলি জ্ঞানত করেছেন ও এখনও করে চলেছেন তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই কাজটি করে চলেছেন।

ভারতে বেশিরভাগ শ্রমিক সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয় সংগঠিত ক্ষেত্রে। বেশিরভাগ খনি ও ধাতব-অধাতব খনিজ পদার্থের উৎপাদন সংগঠিত ক্ষেত্রের আওতাভুক্ত। এগুলি বিদ্যুৎচালিত কারখানায় হয়, যেখানে দেশের বেশি শ্রমিক নিযুক্ত থাকে।

পেশাগত সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের বর্ণিত প্রতিবেদনের যে অংশের উল্লেখ উপরে করা হয়েছে সেটা যখন প্রস্তুত করা হয় তখন সে সভায় CITU, INTUC এবং SEWA প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকলেন, অথচ তাঁরা ওই ধরনের একটি বিভ্রান্তকারী প্রতিবেদনের বিরোধিতা না করে স্বাক্ষর করে দিলেন। এটা একটি চরম আশ্চর্যের বিষয় নয় কি?

আইনবহির্ভূত দমনপীড়ন এবং অর্থনীতির সঙ্কট ও বিশ্বায়ন

‘উন্নয়ন’ চাপিয়ে দেওয়া বিশ্বায়নের ও শ্রম আইন শিথিল করার লক্ষে উদারীকরণের অনিবার্য পরিণাম শুধুমাত্র শ্রমিকের মজুরির ওপরই পড়েনি। বরং বিগত দশকগুলিতে বহু নতুন নতুন খনিজ পদার্থ খননের কাজ শুরু হয়। এই সমস্ত খনিজ প্রক্রিয়াকরণের লক্ষ্যে শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয়। কিন্তু কাজের জায়গায় পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসংস্কৃতি বিকাশ করার কোনও প্রচেষ্টাই সরকার, শিল্পপতি বা ট্রেড ইউনিয়নের তরফ থেকে করা হয়নি। পেশাজনিত সুরক্ষা ও সে সম্পর্কিত স্বাস্থ্যবিষয়ক সুযোগ-সুবিধার ক্রমাগত উপেক্ষা এবং সঙ্কোচন বহুদিন ধরে হয়ে আসছে যার ফলশ্রুতিতে সিলিকোসিস রোগে মৃত্যুর ঢল নেমেছে। কয়লা, লোহাচূর্ণ এবং অ্যাসবেস্টস ও ফাইবার উত্পাদনকারী শিল্পগুলির অবস্থাও একইরকম।

শ্রম সম্পর্কিত আইন ও নিয়মাবলি পরিবর্তনের জন্য সংসদে প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কারখানা ও খনির শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসম্পর্কিত আইনগুলি যেমন, ১৯৪৮ সালের ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্ট, ১৯৫২ সালের মাইনিং অ্যাক্ট, ১৯২৩ সালের ওয়ার্কমেন (এমপ্লয়িজ) কমপেনসেশন অ্যাক্ট সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শ্রম আইনগুলি সংশোধন করার প্রস্তাব এনেছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। প্রকৃতপক্ষে এটা হবে দীর্ঘ লড়াইয়ে ও দীর্ঘদিন ধরে অর্জিত শ্রমিকের অধিকারের পরিবর্তন। এর স্বরূপ কী হবে সেসব বিস্তৃতভাবে জানতে প্রস্তাবিত বিলটি বিশেষভাবে অধ্যয়নের প্রয়োজন রয়েছে। বিভিন্ন শ্রম আইন, তার অজস্র ধারা উপধারা, সংশোধন আইন ও নিয়মাবলি জানা ও বোঝাকে জটিল করেছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু শিল্পপতিদের যে সব প্রস্তাব সরকারের কাছে প্রস্তাবিত সেসব গুরুত্ব পেলে এটা সহজেই অনুমেয় যে প্রস্তাবিত সংশোধনগুলি শ্রমিক স্বার্থে হবে না। শুধুমাত্র কারখানা মালিক ও পরিচালকরাই লাভবান হবেন। তাই অপেক্ষা করা ও বিষয়গুলির পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুধাবন করা প্রয়োজন।

শ্রমিক অতিরিক্ত সময়ের জন্য শ্রমশক্তি বিক্রি করে। এর ফলেই মুনাফা তৈরি হয়। বিষয়টি প্রায় সকালের জানা। সেটাও পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতে আইন দিয়ে নির্ধারিত হয়। কিন্তু জাত-বর্ণ-শ্রেণিবিভক্ত সমাজে কতগুলি ঘটনা প্রকট হয়ে উঠেছে যা ভীষণভাবে চিন্তনীয়। পুরোহিত ব্রাহ্মণ ও পয়প্রণালী পরিষ্কার করার কাজে জাতি-বর্ণভিত্তিক স্থায়ী সংরক্ষণ মেনে নেওয়া, রোটি-বেটির সম্পর্ক স্থাপিত না হওয়া, মন্দিরে দলিত-“ছোট জাতের” প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়া, কুয়া-পুকুরের জল স্পর্শের অধিকার না পাওয়া, অযৌক্তিকভাবে চিহ্নিত হাওয়া “ছোট জাতের” বিদ্বান ও শিক্ষিত পুরুষ ও নারীদের আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার ঘটনা প্রায় রোজ শোনা যায়। নানা অজুহাতে দলবদ্ধভাবে হিংসার ঘটনা যা নিত্য খবরের কাগজে বেরুচ্ছে। যার একমাত্র উদ্দেশ্যই হচ্ছে সমাজের দুর্বল ও অবহেলিত অংশকে অবদমিত করে রাখা ও এদের দ্বারা পরিচালিত উৎপাদন ও ব্যবসায় অন্যায়ভাবে লাভের অংশে ভাগ বসানো এবং কর্মক্ষেত্রগুলিতে অমানবিক পরিস্থিতিতে কাজ করতে বাধ্য করা।

কিন্তু দেশের প্রায় অধিকাংশ লোক এখনও জানেন না যে র‍্যমিং মাস, ইনসুলেটর, কাচ, টাইলস এবং রিফ্র্যাক্টরিজ- ফায়ার ব্রিক্স উৎপাদন ও ফার্নেস রিলাইনিং-এর মতন কাজ, স্টোন ক্র্যাশার এবং পাথরের খনিও সংগঠিত ক্ষেত্রের আওতাভুক্ত। ঠিকায় ঘরভাঙা ও নির্মাণ কাজ, আগেট ঘষে আভূষণ ও গয়না তৈরি, শিলনোড়া তৈরি, গম পেষাইয়ের পাথরের চাকা খোদাই ইত্যাদি অসংগঠিত ক্ষেত্রের আওতাভুক্ত।

সংগঠিত বা অসংগঠিত ক্ষেত্রগুলিতে কাজ করে সিলিকোসিস রোগে মৃত ও আক্রান্ত ৯৫ শতাংশের বেশি শ্রমিক সমাজের আদিবাসী, দলিত, ওবিসি এবং মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত— যাঁরা অর্থনীতিবহির্ভূত দমনপীড়নের মধ্যে থেকে, কম মজুরির বিনিময়ে, স্বাস্থ্য ও জীবনের সুরক্ষার কথা না ভেবেই অতি মুনাফা সৃষ্টি করতে বাধ্য থাকেন।

ধর্ম ও জাতের নামে দাঙ্গা, হিংসা ও উচ্চবর্ণের সামাজিক আধিপত্য চাপিয়ে দিয়ে আরেক সামাজিক শক্তিকে আইনবহির্ভূত উপায়ে অর্থাৎ প্রচলিত আইন শিকেয় তুলে অতি মুনাফার স্বার্থে বিপজ্জনক কর্মক্ষেত্রে শ্রমশক্তি বিক্রিতে বাধ্য করা হয়। সেই একই দলভুক্ত শ্রমিক যাদের সমাজে ছোট জাতের বলে চিহ্নিত করে রাখা হয়। জাতি-বর্ণ ব্যবস্থা দেশের বেশিরভাগ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে রেখেছে। অর্থনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টির কয়েকটি কারণের এটি একটি। আবার সেই সঙ্কট থেকে ত্রাণ পেতে অতি মুনাফার স্বার্থে অর্থনীতি ও আইনবহির্ভূত শোষণ ও উৎপীড়ন চলতে থাকে। রেমিং মাস, ইনসুলেটর, কাঁচ, রিফ্র্যাক্টরিজ-ফায়ার ব্রিক্স উৎপাদন, টাইলস এবং স্টোন চিপস উৎপাদনকারী শিল্পগুলি মাঝারি বা ছোট শিল্পের আওতাভুক্ত। এদের বড় কোম্পানির জোগানদার হয়ে কাজ করতে যে প্রতিযোগিতার ওপর টিকে থাকতে হয় সেটা মূলত নির্ভর করে অর্থনীতি ও আইনবহির্ভূত ব্যবস্থা দিয়ে। ঠিক সেই কারণে শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে যে পুঁজি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, তা শিল্পপতিরা করতে চান না। কারণ একজন আদিবাসী, দলিত, ওবিসি কিংবা মুসলমানের জীবনের মূল্য কার্যক্ষেত্রে শ্রমিকের পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সুনিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ও ব্যবহার্য ধুলা দূষণ নিয়ন্ত্রণকারী উপকরণের মূল্যের থেকে তুলনামূলকভাবে নেহাতই অনেক কম। ডা. ভীম রাও আম্বেদকর বলেছিলেন যে “জাত-বর্ণের বিভাজন কেবল শ্রমবিভাজন নয় বরং সেটা অসাম্যের ওপর ভিত্তি করে ক্রমানুসারে করা শ্রমের বিভাজন” (The caste is not merely the ‘division of labour’ but ‘division of labourers’ based upon the graded inequality— Dr. B.R. Ambedkar)। বর্তমানে যে অবস্থা আজ বিরাজ করছে তার সঠিক বিশ্লেষণ না করে কোনও শ্রমিক আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এ সম্পর্কে এক সুস্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে এবং সামাজিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চ গড়ে কর্মক্ষেত্রে পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য এবং শ্রম অধিকার সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।

এটা বোঝা দরকার যে পেশাজনিত অসুখ বা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর কারণে মোট বিশ্বের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৪ শতাংশ[3] ক্ষতি হয়। এই তথ্য ২০১২ সনের। আজকের হিসেবে ৪ শতাংশ থেকে অনেক বেড়ে গিয়ে থাকবে এবং গোটা পৃথিবীর তথ্য সামনে থাকলে সেটা বেড়ে গিয়ে এর দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। খারাপ পেশাগত সুরক্ষা ও খারাপ পেশাগত স্বাস্থ্যের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মোট উৎপাদনের ২-১৪ শতাংশ[4] ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের (আইএলও) এবং সরকারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যহানির কারণে যে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির কথা বলা হচ্ছে, তা মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলির এবং দেশের ও বিদেশের মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প ও স্থায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যগুলিতে আইন ও অর্থনীতিবহির্ভূত শোষণ ও উৎপীড়ন নির্ভর শিল্পগুলির ও শ্রমিকদের পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যের কারণে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির কোনও তথ্যপঞ্জি থাকার কোনও সম্ভাবনা নেই। কারণ যে সব শ্রমিক মারা যায় তারা সামাজিক এবং শিক্ষাগতভাবে সমাজের পশ্চাদপদ অংশের মানুষ, আর যারা তথ্যপঞ্জি তৈরি করে তারা সামাজিক এবং শিক্ষাগতভাবে সমাজের এগিয়ে থাকা অংশের মানুষ।

কারখানা মালিক ও পরিচালকবর্গ কর্তৃক উৎপাদন বৃদ্ধি ও উন্নয়নের দাবির আসল রূপ বিকশিত পুঁজিবাদী দেশ ও তুলনামূলকভাবে কম বিকশিত পুঁজিবাদী দেশগুলির বিভিন্ন ঘটনা থেকে প্রকাশ হয়ে পড়ে। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার যুগে এরকম লোকসানের বোঝা শ্রমিকদের অধিকার হরণ করে তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। এটা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা যায় না।

সিলিকোসিস অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি

সিলিকোসিস চিহ্নিতকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা ছাড়া সিলিকোসিস রোগে মৃত বা আক্রান্ত শ্রমিকদের স্বার্থে কোনও আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, সেটা তো রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং সে সম্পর্কিত শ্রম ও মানবাধিকার রক্ষা আইনগুলি বলবত আছে। আমাদের দেশে যে সমস্ত আইন ও তার নিয়মাবলি আছে সেগুলি যদি ঠিকভাবে লাগু হয় তাহলে ট্রেড ইউনিয়ন বা এনজিও-র কোনও প্রয়োজনই থাকত না।

এদেশে সিলিকোসিস অভিযান এখনও অবধি প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল। অতি সহজেই সিলিকোসিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা যেতে পারে। তাদের পেশাগত ও ক্লিনিকাল ইতিহাসের তথ্য, বুকের এক্স-রে দিয়ে ফুসফুসে সিলিকা ধূলিকণার উপস্থিতি ও ছড়িয়ে যাওয়া— এই দিয়েই প্রমাণ হয় যে রোগী সিলিকোসিস আক্রান্ত। আইএলও নির্ধারিত রেফারেন্স এক্স-রে প্লেট ব্যবহার করে রোগীর এক্স-রে প্লেট দিয়ে দেখানো যায় যে রোগীর ফুসফুসে সিলিকা ধূলিকণার উপস্থিতিতে যে নডিউল তৈরি হয় ও ফুসফুসের ছড়িয়ে পড়ার বিভিন্ন স্তর মাপা হয়ে থাকে যেটাকে আইএলও রেটিং বা ক্লাসিফিকেশন বলা হয়।

বুকের এক্স-রে দিয়ে শুধুমাত্র ধুলোয় উন্মুক্ত থাকার বিষয়টি নির্ধারিত হয়। পেশাগত ও ক্লিনিকাল ইতিহাস দিয়ে শেষত সিলিকোসিস বা সিলিকোটিউবারকিউলোসিস আক্রান্ত রোগীকে চিহ্নিত করা হয়। ফুসফুসের কার্যক্ষমতা মাপার যন্ত্র দিয়ে কার্যক্ষমতা কতটা হ্রাস পেয়েছে তা মাপা যায়। সিলিকোসিস বা টিবি রোগীর ফুসফুসের কার্যক্ষমতা উভয় ক্ষেত্রে সাধারণ অবস্থার চেয়ে কমে যায়।

চিকিৎসায় সিলিকো-টিউবারকিলিওসিস রোগীর টিবি রোগের উপশম হলেও সিলিকোসিস এক দুরারোগ্য ব্যাধি বলে রোগী কখনওই সুস্থ হয় না। চিকিৎসার পর সিলিকোসিস বা সিলিকো-টিউবারকিলিওসিস আক্রান্ত রোগীর ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ছয় মাসের ব্যবধানে মাপার পর যদি দেখা যায় অবস্থার অর্থাৎ ফুসফুসের কার্যক্ষমতার কোনও উন্নতি হয়নি, তাহলে আবার সিলিকোসিস আক্রান্ত হয়ে ওঠার সন্দেহ ব্যক্ত করা যেতে পারে। এটাও দেখা হয় যে, বেশ কিছু ক্ষেত্রে এক্স-রে দিয়েও সিলিকোসিস চিহ্নিতকরণ সম্ভব হয় না। তখন ছয় মাস অন্তর এক্স-রে করে চিহ্নিতকরণ সম্ভব হয়।

চিকিৎসকদের কাছে অলিখিত নির্দেশ থাকে তারা যেন সিলিকোসিস চিহ্নিত না করেন। সংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সিলিকোসিস হওয়ার অর্থ শ্রম, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও স্বাস্থ্য বিভাগের আধিকারিকদের উদাসীনতা বা নিষ্ক্রিয়তা। ফলে দোষী সাবাস্ত হওয়ার থেকে বাঁচতে সিলিকোসিস চিহ্নিত না করার পথ অবলম্বন করা হয়।

এইরকম এক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যারা সিলিকোসিস নিয়ে অভিযান চালানোর কথা ভাবছেন তাদের সিলিকোসিস চিহ্নিতকরণের মতন গুরুত্ত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হবে। নতুবা অভিযানের কথা, বাক্যে মারিতং জগৎ সমতুল্য হবে। দুঃখের কথা মিনাখাঁ অঞ্চলে যারা সিলিকোসিস নিয়ে কিছু করছেন, তাদের মধ্যে ওসাজ ব্যতীত কোনও সংগঠন সিলিকোসিস চিহ্নিতকরণের কাজটিকেই গুরুত্বই দিচ্ছে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কর্মক্ষেত্র সুরক্ষিত রাখা। অর্থাৎ পেশাগত রোগে আক্রান্ত হয়ে বা দুর্ঘটনায় পড়ে মারা যাওয়া রুখতে হলে, তার উৎসস্থল থেকেই সেটা শুরু করতে হবে। এ সংক্রান্ত যথেষ্ট নিয়মকানুন আমাদের দেশে আছে। কিন্তু কিছুই লাগু হয় না। সমস্যার মূল দিক উৎপাদনকেন্দ্রিক মানসিকতা। যেভাবেই হোক উৎপাদন করে যেতে হবে, প্রতিস্পর্ধায় টিকে থাকতে হবে, সেখানে মানব অধিকারের চিন্তাভাবনা শুধু গৌণই নয় অপ্রাসঙ্গিক মনে করা হয়, যেখানে স্বাস্থ্য ও জীবনের অধিকার স্বীকৃতি ও মযার্দাহীন। এই চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটাতে না পারলে কোনওভাবেই কর্মক্ষেত্র সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য-অধিকারের বিষয়টি ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সূচিতে সামিল করা। ওসাজ তার জন্মলগ্ন ২৪ নভেম্বর ২০০৩ থেকেই ধারাবাহিকভাবে এই প্রচার চালিয়ে আসছে।

সিলিকোসিস অভিযানে জটিলতার ও সমস্যার দিকগুলি

চিচুনগেড়িয়ার সিলিকোসিস সম্পর্কিত সুপ্রিম কোর্টের রায় ঐতিহাসিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ হলেও ট্রেড ইউনিয়নগুলি ও মামলা দায়েরকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা এই রায়টি সামনে রেখে সিলিকোসিস রোগে মৃত বা আক্রান্ত শ্রমিকের ন্যায্য দাবি ওয়ার্কম্যান (এমপ্লয়িজ) কম্পেন্সেশন ১৯২৩ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেন না। আদালতের যে রায়টি দিয়ে পায়ে ভর করে চলা যায়, সেই রায় নিয়ে তারা মাথার ওপর ভর করে চলার পথেই হাঁটলেন— মিনাখাঁর কারখানা শ্রমিকদের চিহ্নিত করলেন খনি খাদানের অসংগঠিত শ্রমিক হিসেবে। তারা এখানেই থেমে থাকলেন না। বিভিন্ন সংবাদপত্রে ভুল বিবৃতি দিয়ে অযৌক্তিক ভুল দাবির ভিত্তিতে মিছিল মিটিং করে ও সক্রিয়তা দেখিয়ে গোটা আন্দোলনকে দাঁড় করিয়ে দিতে চাইলেন লক্ষ্যহীন, নীতিহীন, কৌশলহীন সক্রিয়তার মধ্যে। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ, মিনাখাঁ অঞ্চলে সক্রিয় সংগঠনগুলি নিজেদের সীমিত রাখলেন শুধুমাত্র রিলিফ বণ্টন, ভিডিও ক্লিপ করে প্রচারের মধ্যে। আর অন্যের কাজের সাফল্যকে নিজেদের কাজের সফলতা ঘোষণার মধ্যে দিয়ে।

কয়েকটি সংগঠন রাজ্যের উচ্চ আদালতে পিটিশন দিয়ে আবেদন করে যে মিনাখাঁ ও সন্দেশখালি এলাকার গ্রামে গ্রামে মেডিকেল ভ্যান পাঠিয়ে এক্স-রে করানোর জন্য রাজ্য সরকারকে যেন এই মর্মে নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতও সেইরকম নির্দেশ দিলেন। কিন্তু যারা সিলিকোসিস নিয়ে কাজ করছেন বলে দাবি করছেন তাঁরা জানেনই না যে পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন ৫০/৬০ মিলি এম্পিয়ারের বেশি হয় না। আইএলও-র গাইডলাইন অনুযায়ী ৩০০ মিলি এম্পিয়ারের এক্স-রে মেশিন দিয়ে বুকের এক্স-রে করাতে হয়। বুকের এক্স-রে প্লেটের গুণমান যাতে ভালো হয় এবং ফুসফুসের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সহজে বুঝতে চিকিৎসকদের সুবিধা হয়। এসব দেখে সরকারি আধিকারিকরা মুচকি হাসলেন। আমরা ফোন করে জানালাম যে পোর্টেবল মেশিন দিয়ে এক্স রে করলে সিলিকোসিস আক্রান্ত রোগীরা চিহ্নিত হবে না, ফলে তাদের ক্ষতি হবে। এর পরেও লজ্জাহীন বাম ধ্বজাধারীরা বলতে লাগলেন তাদের জন্যই নাকি স্বাস্থ্যপরীক্ষা সম্ভব হয়েছে।

তারা এখানেই থেমে থাকলেন না। ২০১৮র আগস্ট মাসে রাজ্যের উচ্চ আদালতে রাজ্য সরকারকে এই মর্মে আদেশ দেওয়ার আবেদন করলেন যে রাজ্য সরকার যেন হরিয়ানা সরকারের সমতুল্য ‘সিলিকোসিস রিলিফ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন’ প্রকল্প গ্রহণ করেন। ২০১৮র ৩ অক্টোবর আদালত এই মর্মে সেইরকম নির্দেশ দিলেন। আদালতে এই আবেদনের কোনও প্রয়োজন ছিল না কারণ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ২৭.০২.২০১৮তে এই মর্মে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠায়। রাজ্য সরকারের তরফে এক আধিকারিক বিভিন্ন প্রদেশ ঘুরে এসে সেরকম একটি প্রকল্প তৈরি করে সম্বন্ধিত বিভাগে জমা দেন, যা সরকারের কাছে বিচারাধীন। এই রায় দেখিয়ে তারা প্রচার শুরু করলেন ও কৃতিত্ব দাবি করতে লাগলেন। অথচ আদালতের রায় ছিল হরিয়ানা সরকারের প্রকল্প অনুরূপ রাজ্য সরকার দ্বারা রিলিফ ও পুনর্বাসন প্রকল্প তৈরি করা।

অজ্ঞানতা, ভুল তথ্য পরিবেশন ও নিজেদের ভুল কৃতকর্ম ঢেকে রাখতে মরিয়া কিছু সংগঠন যে সব কাজ করে চলেছেন তা সিলিকোসিস আন্দোলনের জন্য অশুভ হলেও মানুষ ভুল আর ঠিকের মধ্যে পার্থক্য করতে পারছেন ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সিলিকোসিস আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

বীরভূম জেলায় সিলিকোসিস অভিযান সম্পর্কিত কয়েকটি কথা

এই লেখাটির লেখক মার্চ ২০০৯ সনে বীরভূম পাথর খাদান এবং ক্র্যাশারে (Stone Quarry & Crasher) কর্মরত শ্রমিকদের জীবনাবস্থা নিয়ে একটি অনুসন্ধান ও অধ্যয়ন করেছিল। সেসময় তাকে বেশ কয়েকটি এক্স-রে প্লেট দেখানো হয় যার মধ্যে সে মিছু মুর্মুর একটি ও দেবু রাউতের দুইটি প্লেট বেছে নেয়। তারপর সে খুঁজতে থাকে ওই অঞ্চলে কারা সিলিকোসিস নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছুক। ২০১০এর শেষ নাগাদ কলকাতার একটি এনজিওর সঙ্গে যোগাযোগ হয় যারা বীরভূম জেলায় পাথর খাদান অঞ্চলে কাজ করেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে চিঠি লিখে ১ মার্চ ২০১১তে মানবাধিকার কমিশন দ্বারা সিলিকোসিসের ওপর আয়োজিত রাষ্ট্রীয় সম্মেলনে উক্ত এনজিওটিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে অংশগ্রহণ করা সুনিশ্চিত করা হয়। কিন্তু তারা এক বছরে একটিও সিলিকোসিস কেস চিহ্নিত করে মানবাধিকার কমিশনে একটি মামলাও দায়ের করলেন না।

এরপর স্থানীয় একটি সংগঠনকে মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে সম্পর্ক করিয়ে দিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১২তে আয়োজিত রিজিওনাল রিভিউ মিটিং-এ আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেদিনই উক্ত সংগঠনের প্রতিনিধি কমিশনে একটি মামলা দায়ের করেন। পেশাগত রোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে তাদের আলাপ করিয়ে দেওয়া হয় যাতে তারা সিলিকোসিস চিহ্নিত শ্রমিকদের হয়ে কাজ করতে পারেন। কিন্তু কার্যত দেখা গেল তারা পিছু হটলেন। তাদের দেওয়া ৯টি এক্স-রে প্লেটের মধ্যে চার জনেরই সিলিকোসিস পাওয়া যায়। কিন্তু তারা সেসব কমিশনকে জানালেন না। বেশ কয়েকবার চিঠি দিয়ে বছর তিনেক পরে কমিশন মামলাটি বন্ধ করে দেয়। সংস্থা ও সংগঠনগুলির গতিবিধির ওপর ভরসা না করতে পারায় ওসাজ সংস্থার পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মিছু মুর্মু এবং দেবু রাউতের পরিবার ২০১৮তে চার লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ পান। অন্যান্য শ্রমিকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এখনও কমিশনে বিচারাধীন।

সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিক অধিকার রক্ষা কমিটির গঠন

মিনাখাঁ ও সন্দেশখালি ব্লকের শ্রমিকেরা দেরিতে হলেও বুঝলেন যে সিলিকোসিস চিহ্নিতকরণ না হলে শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। ইতিমধ্যে তারা সংবাদপাত্র মারফত জেনে গিয়েছেন, যে ৯ জন ক্ষতিপূরণ পেয়েছে এবং রাজ্য সরকারের কাছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পাঠানো প্রস্তাবগুলি, যা আগেই লেখা হয়েছে, যার সবকিছুই সম্ভব হয়েছে ঝাড়খণ্ডের ওসাজ সংস্থার প্রস্তাবমতো এবং ওসাজ-এর প্রচেষ্টায়।

মিনাখাঁ ব্লকের প্রায় ২০০ জন এবং সন্দেশখালি ব্লকের ৫২ জন শ্রমিক সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকেরা মিলে ‘সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিক অধিকার রক্ষা কমিটি’ গড়ে তোলেন। এছাড়াও আরও জনা দশ-বারো ওই কমিটিতে যোগদান করেন। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন গ্রাম থেকে সিলিকা ধূলা প্রভাবিত ও সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকেরা ওই কমিটিতে যোগদান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ‘সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিক অধিকার রক্ষা কমিটি’ সাত দফা দাবির ভিত্তিতে জেলায় জেলায় সিলিকোসিস নির্মূলীকরণের লক্ষ্যে অভিযান চালিয়ে যাবেন বলে মনস্থির করেছেন।

উপসংহার এবং সুপারিশসমূহ

সিলিকোসিস চিহ্নিতকরণ ও নির্মূলীকরণের, সিলিকোসিস রোগে মৃত ও আক্রান্ত শ্রমিক পরিবারগুলির সামাজিক সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্য এবং কর্মক্ষেত্রে ধূলা নিঃসরণ বন্ধ করে সিলিকোসিস নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া সিলিকোসিস অভিযানের আর কোনও লক্ষ্য থাকতে পারে না।

অতএব প্রাসঙ্গিক দাবিগুলি এইরকম:

  • পেশাগত ও ক্লিনিকাল ইতিহাস এবং বুকের এক্স-রের ভিত্তিতে সিলিকোসিস চিহ্নিতকরণের কাজকে সহজ করা।
  • ভারতে তথা পশ্চিমবঙ্গে ILO এবং WHO দ্বারা পরিচালিত সিলিকোসিস চিহ্নিতকরণ ও নির্মূলীকরণের লক্ষ্যে কার্যক্রম তৈরি করা ও রাজ্য সরকারকে প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্য দেওয়া।
  • কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী সিলিকোসিস সহ অন্য ফুসফুসের পেশাগত রোগ নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম তৈরি করা।
  • রাজ্যের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে পেশাগত রোগের আলাদা বিভাগ খোলা।
  • সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের দ্বারা চিহ্নিতকরণের ভিত্তিতে ২৬ নভেম্বর ১৯৯৬-এর সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে ওয়ার্কমেন (এমপ্লয়িজ) কম্পেনসেশন অ্যাক্ট ১৯২৩ অনুযায়ী শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়া সুনিশ্চিত করা।
  • এই মুহূর্তে সিলিকোসিস রোগে মৃত ও আক্রান্তদের ও ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশমতো, হারিয়ানা সরকারের প্রকল্পের অনুরূপ সিলিকোসিস আক্রান্তদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দেওয়া।
  • কারখানা পরিসরে শ্রমিকদের রাখার ব্যবস্থা বেআইনি ঘোষণা করা।
  • সিলিকা ধূলা দূষণকারী কারখানাগুলিকে বিপজ্জনক প্রক্রিয়াকরণের সংজ্ঞা দেওয়ার জন্য রাজ্যের শ্রম আইন সংশোধন করা।
  • র‍্যমিং মাস উৎপাদনকারী সহ সমস্ত সিলিকা ধূলা নিঃসরণকারী কারখানগুলিকে ইঞ্জিনিয়ারিং উপকরণ দিয়ে সম্পূর্ণ আধুনিকীকরণ করা এবং কার্যক্ষেত্রে শ্রমিকের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে বিশেষ মাস্ক বা রেসপিরেটার, জুতো, হেলমেট, গগলস দেওয়া।
  • কার্যক্ষেত্রে পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সুনিশ্চিত করতে সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে আরও সক্রিয়তা ও পারদর্শিতা দেখানোর স্বার্থে, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলির আধিকারিকদের সরকারি বা বেসরকারি চাপমুক্ত রাখা।
  • রাজ্যের ইঞ্জিনিয়ার ও উদীয়মান উদ্যমীদের কম দামি ধূলা নিয়ন্ত্রণ উপকরণ যন্ত্রপাতি তৈরি করার লক্ষ্যে অধ্যয়ন, রিসার্চ ও উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্য করা। যার সফল পরিণতিতে কার্যক্ষেত্রে পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সুনিশ্চিত করার সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে সহায়ক হবে, সিলিকা সহ অনান্য ধূলা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে, অসময় শ্রমিক মৃত্যুর হার কামানো যাবে ও বেকার যুবকরা উৎপাদন ও মেনটেনান্সের কাজে চাকুরি লাভ করবে।
  • কর্মক্ষেত্রে পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সংস্কৃতি বিকাশ করতে সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের সংযুক্ত প্রচেষ্টা চালানো। কারখানা স্তরে OSH কমিটি গড়ে তোলা।
  • সিলিকোসিস নির্মূলীকরণের উদ্দেশ্যে কর্মক্ষেত্রে ধূলা নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা। তার জন্য পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সংস্কার বিকশিত করা। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের মানবাধিকার সুরক্ষিত করার প্রধান দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে উৎপাদন প্রণালীকে লাভজনক করে টিকিয়ে রাখা। অতি মুনাফার স্বার্থে অর্থনীতি এবং আইনবহির্ভূতভাবে জাত-বর্ণ-ধর্ম ও লিঙ্গবৈষম্যভিত্তিক শোষণ-উত্পীড়নের রূপগুলিকে চিহ্নিত ও প্রতিহত করা ও ব্যাপক মেহনতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে সমস্ত কর্মক্ষেত্রে পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সুনিশ্চিত করা।
  • পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য অধিকারের বিষয়টি ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সূচিতে সামিল করা।
  • অর্জিত অধিকার শ্রম আইন সহ নিয়মাবলিগুলি টিকিয়ে রাখতে শ্রমিকদের সচেতনতা বাড়ানো ও কোনওরকম অধিকারহীন করার প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করা।
  • আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ১৫০ নং, ১৯৮১ সালের ১৫৫ নং, ১৯৮৫ সালের ১৬১ নং কনভেনশনের প্রস্তাবসমূহের অনুমোদন ভারত সরকারকে অবিলম্বে করতে হবে।

নিবন্ধটি যাঁদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হল:

  • বিহারঝাড়খণ্ডের শ্রমিকনেতা এবং পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য আন্দোলনের অগ্রণী সাথী পূর্ণেন্দু মজুমদার
  • মহারাষ্ট্রের শ্রমিকনেতা এবং পেশাগত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য আন্দোলনের অগ্রণী সাথী বিজয় খানাড়ে
  • পশ্চিমবাংলার সিলিকোসিস সহ পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ আন্দোলনের অগ্রণী সাথী বিজন সারেঙ্গী
  • অগণিত শ্রমিক যাঁরা কর্মক্ষেত্রে পেশাগত রোগ সিলিকোসিস, অ্যাসবেস্টাসিস, কোল ওয়ার্কার নিউমোকোনিওসিস, সিডেরোসিস্, বিসিনোসিস সহ বিভিন্ন পেশাগত রোগে, দুর্ঘটনায় এবং অমানবিক, অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক কার্যপ্রণালী বিশেষ করে ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিং-এর কাজে অসময়ে প্রাণ হারিয়েছেন
  • যাঁরা উপার্জনহীন হয়ে সিলিকোসিস সহ বিভিন্ন পেশাগত রোগে আক্রান্ত এবং অসহনীয় জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন


  1. The Prevention of Occupational Diseases – International Labour www.ilo.org/wcmsp5/groups/public/—ed…/wcms_208226.pdf‎
  2. NPES India – International Labour Organization www.ilo.org/wcmsp5/groups/public/– ed…/wcms_110487.‎)
  3. www.ilo.org globalstandards subjects-covered-by-international-labour-standards occupational-safety-and-health
  4. National Programme For Control & Treatment of Occupational Diseases www.nihfw.org/NationalHealthProgramme/NATIONALPROGRAMMEFORCONTRO…
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...