Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

পণবন্দি

আরণ্যক শইকীয়া

 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ: বাসুদেব দাস

আরণ্যক শইকীয়া ভারতীয় প্রশাসনিক সেবার অফিসার। তিনি বর্তমানে আসামের গোঁসাইগাঁওয়ের মহকুমাধিপতি হিসেবে কর্মরত। দিল্লির সেইন্ট স্টিফেন্স কলেজ এবং দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিক্স থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক এবং এম ফিল আরণ্যক Economic Times, Indian Express, The Print, The Assam Tribune, Economic and Political Weekly-র মতো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কাগজ এবং জার্নালে নিয়মিত প্রবন্ধ লিখে থাকেন। অসমিয়া সাহিত্যচর্চায় অনুরাগী এবং ইতিমধ্যে তাঁর বেশ কিছু ছোট গল্প প্রকাশ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত গল্প সঙ্কলন মৃত্যুর সাউদ আরু অন্যান্য গল্প

যেদিন গ্রামটিতে সরকারি জল জোগান পরিকল্পনা বিতরণের খবর এসে পৌছেছিল, সেদিন প্রত্যেকের মধ্যে এক ধরনের উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা গিয়েছিল। সন্ধ্যাবেলা গ্রামের পঞ্চায়েত মেম্বারের নেতৃ্ত্বে গ্রন্থাগারের প্রাঙ্গণে একটি জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল— পঞ্চায়েত মেম্বারের নাছোরবান্দা প্রচেষ্টায় পরিকল্পনাটা গ্রামে এসেছিল নাকি, অন্যেরা আবার বলেছিল প্রতিটি গ্রামে জল জোগানের সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তার মধ্যে পঞ্চা্যেত মেম্বারের কোনও অবদান নেই। যাই হোক না কেন, গ্রামের প্রত্যেকেই এই সিদ্ধান্তকে সাদরে বরণ করে নিল।

—আপনিই এক টুকরো মাটি খুঁজে দেবেন। সেই কাজটা আপনার ওপরেই ছেড়ে দিলাম।

কয়েকদিন পরে অভিযন্তা সমীরণ দত্তর আমাকে করে যাওয়া অনুরোধটা আজও মনে পড়ে। সরকারি গ্রামপ্রধান হিসেবে গ্রামটির সরকারি এবং মেয়াদি মাটির সম্পর্কে আমার জ্ঞান থাকাটা খুবই স্বাভাবিক— বিভাগের দিক থেকে এই পরিকল্পনা রূপায়ণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সমীরণ দত্তকে।

—সরকারি খালি একটুকরো মাটি পেলেই কাজটা আরম্ভ করে দিতে পারি। ডিপ টিউবওয়েল বসানো, ফিল্টার লাগানো, পাম্প আদি করার জন্য এক বিঘার মতো মাটির প্রয়োজন হয়—

দত্ত বলে গিয়েছিলেন। তাঁর কথার সুরে ফুটে উঠেছিল পরিকল্পনা তৎক্ষণাৎ কার্যকরী করে তোলার তাগিদের চাপ। প্রতিটি বাড়িতে টেপের জল জোগানোর সরকারের এই উদ্দেশ্যে তিনি চাইছিলেন না কোনওধরনের বাধার সৃষ্টি হোক—

—কিন্তু একটা ছোট সমস্যা আছে—

আমার এই উত্তরে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে পড়েছিল; তা স্বাভাবিক— কিন্তু সৌহার্দ্যাপূর্ণ আলোচনার মর্যাদা রেখে তিনি মাত্র একটি কথা বলেছিলেন— বলুন তো…

—সরকারি খাস মাটি গ্রামটির এক কোণে আছে। প্রায়টুকু খালি সরকারি মাটি ইতিমধ্যে মানুষের নামে বিতরণ করা হয়েছে, না হলে বেদখল হয়েছে। সরকারি মাটি যদি লাগে তাহলে গ্রামের একেবারে পশ্চিম সীমান্তে কয়েক বিঘা খালি পড়ে আছে, সেখানেই পরিকল্পনাটা আরম্ভ করা যেতে পারে।

সমীরণ দত্ত সেদিন দেখছি বলে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

—জলের জোগান পরিকল্পনাটা গ্রামের মাঝামাঝি জায়গায় হলে ভালো— জলের ট্যাঙ্ক থেকে ঘরের সঙ্গে সংযোজন করা পাইপগুলি তখন সহজে পেতে দেওয়া যাবে, গ্রামের একটি কোণে থাকলে অন্যপ্রান্তে থাকা ঘরগুলিতে পাইপে জলের প্রেশার পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকবে না।

দত্ত আমাকে কয়েকদিন পরে বলেছিলেন। তিনি সেবার এসেছিলেন একটি অন্য প্রস্তাব নিয়ে—

—এই মনে করুন, আপনার গ্রামে যদি কোনও ইচ্ছুক ব্যক্তি থাকে যিনি এই পরিকল্পনার জন্য এক বিঘা জমি দান করতে চান, আমরা তাঁদের সঙ্গে একটা এগ্রিমেন্ট করে নেব। শুধুমাত্র গ্রামের মধ্যে হলে ভালো।
—সরকারের দিক থেকে কত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে?

এই প্রশ্নের উত্তরে দত্তের কাছ থেকে বিশেষ প্রতিক্রিয়া পেলাম না যদিও, আমি দুদিনের ভেতরে কেউ মাটি দান করতে ইচ্ছুক আছে কিনা খবর করতে লাগলাম। যে পরিকল্পনায় ক্ষতিপূরণের কোনও অনুমোদন নেই তার প্রতি মানুষেরও কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। কয়েকজন লোকের কাছে গেলাম যদিও কোনও ইচ্ছুক দাতা খুঁজে পেলাম না। এরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক— প্রায়-মানুষেরই বর্তমান নিজের মাটিটুকুই একপ্রকারের একমাত্র সম্পদ। এক টাকাও না পেয়ে কে আর নিজের সম্পত্তি বিসর্জন দিতে এগিয়ে আসবে?

—তাড়াতাড়ি কিছু একটা করুন। ওপর থেকে এত প্রেশার আসছে… কাজটা দ্রুত শুরু করতে না পারলে প্রকল্পটা উঠে যাবে।

প্রায় একমাস পরে দত্ত আমার বাড়িতে এসেছিলেন। তাঁর কথা থেকে বুঝতে পেরেছিলাম কাজটা এক মাসের মধ্যে শুরু করতে না পারলে সরকার পরিকল্পনাটা বন্ধ করে দেবে।

কিন্তু এক টাকাও ক্ষতিপূরণ না দিলে কে আপনাকে মাটি দান করবে?

কথাটা মনের ভেতরে এক তির্যক রূপ ধারণ করেছিল বলে, কিছুই বললাম না। আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম যে মানুষ এমনিতেই মাটি দান করে না…

—সরকারি কাজের জন্য আরও করে না। একজন মানুষের জমি যাবে আর অন্য মানুষের বাড়িতে জলের ট্যাপ লাগবে— এ ধরনের প্রস্তাবে কেউ অনুমতি দেবে না। যে মাটি দান করবে সে টাকা-পয়সা না হলে অন্য কিছু একটা পেতে চাইবে।
—তার নামে লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে একটা মূর্তি বানিয়ে দেব।

দত্ত প্রায় উচ্চস্বরে বলেছিল যদিও সেই প্রস্তাবে জনগণ যে কোনও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানাবে তা আমার মনে হচ্ছিল না।

—মূর্তির বিনিময়ে আমার জমি দান করতে পারব না। আমার ছেলেমেয়েরা কী খাবে? চাষবাস করে বেঁচে আছি, তার মধ্যেই আবার সরকারের জমি চাই।

কয়েকদিন পরে আয়োজন করা গ্রামের সভায় আধবয়সী একজন এভাবেই ক্ষোভ উজার করে দিয়েছিল। আমার আশঙ্কার মতোই দত্তের প্রস্তাবের ওপরে হওয়া এই গ্রামসভা বিফল হয়েছিল। কারও মাটি দেওয়ার ইচ্ছা নেই— জলের পরিকল্পনা জাহান্নামে গেলে যাক— এতদিন ধরে চাপাকলের জল খেয়ে এসেছি— ট্যাপের জল জীবনে কোনও বিশেষ পরিবর্তন আনে না।

কিন্তু দত্তের প্রেশার ইতিমধ্যে আমার কাছে এসে পড়েছিল। টুকরো মাটি বের করে না দিলে এই পরিকল্পনার বিফলতার দোষ আমার কাঁধেই চাপবে।

—আনোয়ারের মাটিটা তো আছে— সেখানে পরিকল্পনামতো কাজটা করতে পারেন।

কয়েকদিন পরে এই পরামর্শটা এসেছিল গ্রামের এলপি স্কুলের প্রধানশিক্ষকের কাছ থেকে। আমি সেদিন অন্য একটি কাজের জন্য বিদ্যালয়ে ঢুকেছিলাম— কথায় কথায় জল জোগানের মাটির সমস্যার বিষয়টা উত্থাপন করায় আনোয়ারের মাটির কথাটা মনে করিয়ে দিলেন।

আনোয়ার হোসেন আমাদের গ্রামের মৌজাদার ছিল। তাঁর কয়েক বিঘা মাটি ছিল। মাটি থেকে হওয়া উৎপাদনে তাঁর ধনী পরিবার বিলাসী জীবন যাপন করছিল। এই বিলাসী জীবনই স্বাভাবিকভাবে কাল হল আনোয়ারের ছেলে আশরাফুলের। আনোয়ারের মৃত্যুর কয়েকবছরের ভেতরে পুত্রের অকর্মণ্যতায় প্রায় মাটিটুকুই অন্যের দখলে চলে গেল। মাত্র থেকে গেল ঘর-বাড়ির চার বিঘা মাটি। এর মধ্যে মাত্র দুই বিঘায় চাষ হয়। বাকিটুকু প্রায় খালিই পড়ে থাকে।

আশরাফুলকে মাটি দান করার জন্য রাজি করাতে খুব বেশি সময় লাগল না। প্রথমে কিছুটা আপত্তি করেছিল যদিও। লাইব্রেরিতে নিজের বড় মূর্তির স্বপ্ন দেখিয়ে কয়েকদিনের ভেতরে এক বিঘা মাটির হস্তান্তরের কাজটা হয়ে গেল।

—আপনাকে আমি কীভাবে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না। বেশ রক্ষা পেয়ে গেলাম। কোনওমতে কাজটা আরম্ভ করতে পারলেই হয়ে গেল।

সমীরণ দত্তের এই আশ্বাসভরা কথাটা এখন মনে করলে হাসি পায়। অবকাশ কয়েকদিন রইল মাত্র। দুই সপ্তাহের মধ্যে যে সমস্যা দেখা দিল তা থেকে আজ পর্যন্ত পরিত্রাণ পায়নি।

আশরাফুলের সঙ্গে হওয়া মৌখিক বোঝাবুঝির পরে দত্ত প্রকল্প রূপায়ণে লেগে গেল। কয়েকদিনের ভেতরে মণ্ডল এসে একবিঘা মাটির মাপ-জোক করে গেল; জাঁকজমকের সঙ্গে লাইব্রেরিতে আশরাফুলকে সংবর্ধনা জানানো হল এবং নিজের মূর্তির শিলান্যাস করা হল, কয়েকদিন পরে একটা বালিভর্তি ট্রাক এল। কাজ আরম্ভ হতে শুরু করায় গ্রামবাসীরাও আশায় পথ চেয়ে রইল।

আর ঠিক সেই সময় সরকার থেকে একটি বিশেষ ঘোষণা এল— জল জোগান পরিকল্পনার জন্য মাটি দান করা ব্যক্তির পরিবারের যে কোনও একজন সদস্যকে পাম্প অপারেটর হিসেবে নিযুক্ত করা হবে।

—তার মানে আশরাফুল চাকরি পাবে— গ্রামের এই ফিসফিসানি সমস্ত দিকে শুনতে পাওয়া গেল। কারও ঈর্ষা, কারও আক্ষেপ— তবে সবাই একবাক্যে বলল যে আশরাফুল বড় ভাগ্যবান মানুষ।

তার ফলেই হয়তো লোকে বলার মতো আশরাফুলের ভাগ্যে গ্রহণ লাগল।

দুই সপ্তাহ পরে আশরাফুলের মাটিটা সরকারি বিভাগে হস্তান্তর করার জন্য সমীরণ দত্ত এসে উপস্থিত হল। সরকারি মণ্ডল এবং দলিল কাগজের সঙ্গে মাটিটা মাপ যোগ করে চিঠা-জমাবন্দিতে মাটির হস্তান্তরের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দলিলে আশরাফুলের সই নিয়ে দত্ত সমস্ত কিছু বুঝে নেবেন। আর সেখানেই সৃষ্টি হল যত সমস্যার।

আশরাফুলের নাম চিঠা জবানবন্দিতে কোথাও পাওয়া গেল না— এটা খুব আশ্চর্যের কথা নয়, কেননা মাটিটা প্রকৃতপক্ষে তার পিতা আনোয়ার হোসেনের। কিন্তু যখন মণ্ডল দেখিয়ে দিল যে দুই নম্বর দাগের আনোয়ারের মাটি তাঁর মৃত্যুর পরে কোনও রহিমের নামে নামজারি হয়েছে, তখন আশরাফুলের জীবনে বিনা মেঘে বজ্রপাত হল। রহিম কে?

—আমাদের গ্রামের নয় বলে জোর গলায় বলতে পারি।

আমার কথার দৃঢ়তায় সবাই বুঝতে পেরেছিল যে রহিম সত্যিই আমাদের গ্রামের নয়। মণ্ডল পুনরায় খোঁজ করল যদিও আশরাফুলের নাম কোথাও খুঁজে পেল না। জন্ম থেকে বসবাস করেও এই মাটির উপরে আশরাফুলের কোনও মালিকানাস্বত্ব নেই। এই মাটির প্রতিটি ধূলিকণায় হয়তো আশরাফুলের শৈশবের খেলাধূলা এবং কৈশোরের কাজকর্মগুলি বিজড়িত হয়ে আছে। তুলনামূলকভাবে দুর্বল হলেও মাটি চাষ করে যা কিছু চাষবাস সে প্রতিবছর করে, পরিশ্রমের ঘাম স্পর্শ করে যাওয়া, এই মাটির উপরে থাকা তার অধিকার নিমেষের মধ্যে খর্ব হল মাত্র একটা কাগজে থাকা একটি অপরিচিত নামের জন্য।

আমার আজও সেই দৃশ্যটি মনে পড়ে। প্রকৃতি ইঙ্গিত দিয়েছিল নেমে আসা তুফানের, কালো মেঘ হঠাৎ নীল পরিষ্কার আকাশটাকে ঢেকে ফেলেছিল; একটা ঠান্ডা শিরশিরে বাতাস বইতে শুরু করেছিল এবং পাখ-পাখালি প্রকৃতির রুষ্ট রূপে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার শুরু করেছিল। দত্ত এবং আশরাফুল মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিল।

—এতদিনের কষ্ট এমনিতেই গেল। আগামীকাল থেকে কাজে লোক লাগাব ভেবেছিলাম। কাজ বন্ধ মানে আমার প্রমোশন বন্ধ।

দত্তের দীর্ঘশ্বাসে বেরিয়ে পড়েছিল তাঁর বিফল পরিকল্পনার কাঠামো। তিনি সম্পূর্ণটা বললেন না, যদিও আমি বুঝতে পেরেছিলাম তাঁর মনের ভেতরে তুফানের কথা। বিভাগীয় তাগিদা অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ের ভেতরে সম্পূর্ণ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সমীরণ দত্ত সেদিন বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি সেই কথা রাখতে পারবেন না। নিজের মুরুব্বিকে কী বলবেন তিনি?

—তাই ভেবে পাচ্ছি না। আগামীকাল থেকেই কাজটাকে স্থগিত রাখতে হলে মুরুব্বির কাছ থেকে ধমক খাওয়া ছাড়া আর কোনও গতি নেই।
—আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। দুই-একদিনের মধ্যে রহিমকে খুঁজে বের করব, তাঁর কাছ থেকে সই নিয়ে নেব। যে মাটিতে তাঁর কোনও দখল নেই, সেখানে তাঁর কোনও অধিকারও নেই। আশরাফুলের নামে নামজারি করিয়ে নেব।

মণ্ডল অভয় দিয়েছিল যদিও, কিন্তু পরের দিনই যখন রহিম এসে আমার বাড়িতে উপস্থিত হল তখনই আমরা প্রত্যেকেই বুঝতে পারলাম যে এবার একটি দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি চালাতে হবে।

আমরা প্রত্যেকেই জানতাম যে আনোয়ারের একমাত্র পুত্র হল আশরাফুল। তবে রহিম দাবি করল সেও নাকি আনোয়ারের পুত্র। আনোয়ারকে আমরা শৈশব থেকে দেখেছি, কেউ আশরাফুল ছাড়া আনোয়ারের অন্য কোনও পুত্রকে দেখেনি।

—তোর মায়ের নাম কী?
—রেশমিনা বেগম।

তখনই কথাটা সবাই বুঝতে পারলাম। আনোয়ারের অন্য একজন স্ত্রী ছিল। রেশমিনাকে প্রথম বিয়ে করেছিল। তার গর্ভেই রহিমের জন্ম হয়েছিল। কী পরিস্থিতিতে আনোয়ার রেশমিনাকে বিয়ে করেছিল কেউ সঠিকভাবে তা বলতে পারে না। কারও কারও মতে বহুবছর থেকে প্রেমে পড়ে হঠাৎ রেশমিনা গর্ভবতী হয়ে পড়ায় উপায়ান্তর হয়ে আনোয়ার তাকেই বিয়ে করল। অন্য অনেকের মতে আনোয়ার চায়নি, যদিও বাড়ি থেকে জোর-জবরদস্তি করায় রেশমিনাকে বিয়ে করল— কারণ যাই হোক না কেন, রহিমের জন্মের এক বছর পরে আনোয়ার এল আমাদের গ্রামে; কেউ বলতে পারে না প্রথম পত্নীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ হয়েছে কিনা। এখানে এসেই আনোয়ার দ্বিতীয়বার বিয়ে করল এবং এই স্ত্রীর গর্ভেই আশরাফুলের জন্ম।

আশরাফুলের সঙ্গে থেকে শেষে ইহলীলা সম্বরণ করা আনোয়ারের প্রথম বিয়ের কথা আমাদের গ্রামে অনেকেই জানত না, যারা জানত, তাদের হাড়ে দুব্বো গজিয়েছে। রহিমের অকস্মাৎ আবির্ভাব পরিস্থিতি জটিল করাই নয়, প্রত্যেকেরই মনে প্রশ্নেরও উদয় হল— এত বছর যার সঙ্গী ছিল, পরিবর্তে অন্য একজনের নামে মাটিটা কেন নামজারি হল?

স্বাভাবিকভাবে নানামুনির নানা মত। কেউ বলল যে আনোয়ার নিজের প্রথম পুত্র এবং প্রথমা পত্নীকে অথৈ সাগরে ফেলে দ্বিতীয় বিবাহে প্রবেশ করার জন্যই অনুতপ্ত হয়ে শেষে মাটিটা পুত্রের নামে নামজারি করে রেখে গেছে।

—হতেই পারে না। অন্য একজন দাবি করল রহিম পিতার ভালোবাসা থেকে উপেক্ষিত হতে পারে; কিন্তু সে এখন একজন নামকরা ব্যবসায়ী; কারও কারও পাওয়া খবর-মতে সে গ্রামপঞ্চায়েতের সভাপতিও একবার হয়েছিল।
—ওপরমহলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিশ্চয় জমাবন্দিতে নিজের নাম ঢুকিয়ে নিয়েছে।

মোটকথা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারল না রহিমের নাম আমাদের গ্রামের মাটির নথিপত্রে কীভাবে ঢুকল— মাত্র নানাপ্রকারের ষড়যন্ত্র এবং রহস্যের আলোচনা হল।

—বড় টেনশনে পড়েছি। এই প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমার প্রমোশন বন্ধ। কিছু একটা করুন।

দুদিন পরে চিন্তায় বিহ্বল হওয়া সমীরণ দত্তের কথাটা আজও মনে পড়ে। সেদিন তিনি আমার ঘরে এসেছিলেন; গত এক সপ্তাহের ঘটনাক্রম তার আয়ু কয়েক বছর কমিয়ে দিয়েছিল; গায়ে দেওয়া জামাটিতে কয়েক জায়গায় পড়েছিল নৈরাশ্যের ছাপ, তিনি চুল আঁচড়াতেও ভুলে গিয়েছিলেন এবং সচরাচর হাসিমুখের মানুষটা হারিয়ে ফেলেছিলেন চেহারার উজ্জ্বলতা।

এত বড় একজন ইঞ্জিনিয়ার আমার কাছে হাতজোড় করে কিছু একটা উপায় করার আশায় দাঁড়িয়ে থাকায় আমিও কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছিলাম। আমাদের গ্রামের একটি পারিবারিক সমস্যা সামাজিক রূপ নিয়ে ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোকের পদোন্নতির পথ বন্ধ করে দেওয়ায় আমার খারাপ লাগছিল; তার চেয়েও খারাপ লাগছিল এই জন্য যে আনোয়ারের মাটিটা আমিই দেখিয়ে দিয়েছিলাম।

এই দোষ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য আমার সবচেয়ে প্রিয় উপায়টিকে অবলম্বন করলাম—

—একটি গ্রামসভার আয়োজন করা যাক। জনগণ সিদ্ধান্ত নিক কে মাটি আর চাকরি পাবে।

গ্রামসভায় আমাদের গ্রামের জ্যেষ্ঠ ব্যক্তির সঙ্গে উপস্থিত ছিল আশরাফুল। সেদিক থেকে রহিম এসেছিল। উপস্থিত প্রায় প্রতিজন জনতাই আশরাফুলের পক্ষ নিল। এত বছর থেকেই যে মাটিতে সে কাজ করে বড় হয়েছে, আজ সেখান থেকেই বঞ্চিত হওয়াটা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে, রহিম মেনে নিতে প্রস্তুত নয়— তার যুক্তি এই যে যেহেতু বর্তমানে সমস্যা দুটি গ্রামের বাসিন্দার মধ্যে, সভাটিতে শুধু একটি গ্রামের মানুষকে ডাকলে তা একপক্ষীয় হবে। দ্বিতীয় গ্রামসভায় রহিমের গ্রামের মানুষকে ডাকা হল। তাদের যুক্তি এই যে আনোয়ার হোসেন নিশ্চয় কিছু ভেবেচিন্তে নিজের মাটি জ্যেষ্ঠপুত্রকে দিয়ে গেছেন; রহিমের মাটি এখন আশরাফুলকে দিলে আনোয়ারের শেষ ইচ্ছাকে অবমাননা করা হবে। সঙ্গে, আইনবিরুদ্ধও হবে— সরকারি নথিপত্রে যার নাম আছে, সে-ই মাটির স্বত্বাধিকারী; তার সঙ্গেই ইঞ্জিনিয়ারকে চুক্তিবদ্ধ হতে হবে।

সেদিনও দুইপক্ষের অটল অবস্থানে সভায় অচলাবস্থা হওয়ায় কোনও মীমাংসা হল না।

—আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি।

পরের দিন দত্তের এই দৃঢ় কথা আমাকে কিছু সময়ের জন্য আশ্চর্য করে দিয়েছিল। এবার বা তিনি কী করেন?

—আমি সইটা রহিমের থেকেই নিয়ে নেব।
—আপনি আশরাফুলের কথা ভাবেন নাই নাকি?
—ভাবিনি। আমার কাজ এই জল জোগান পরিকল্পনা সম্পূর্ণ করা। কাগজে রহিমের নাম আছে— তার সঙ্গে দলিলে সই করব। ওই চাকরি পাবে। আশরাফুল কিছু পাবে কিনা সেটা আমার দেখার নয়। এ-কথা বলে দত্ত বিদ্যুৎগতিতে আমার ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

পরের দিন আশরাফুলের দখলে থাকা চার বিঘা মাটির পশ্চিমদিকের এক বিঘায় সকালে দুটি ট্রাকে পাথর আর বালি ফেলে রেখে গেল, দুপুরের দিকে দুই-একজন শ্রমিক মাটি খুঁড়তে আরম্ভ করার খবর যাওয়ায় জায়গাটিতে একটা হুলুস্থুল পরিবেশের সৃষ্টি হল।

—ইঞ্জিনিয়ার আমাকে ঠকিয়েছে— রহিমের কাছ থেকে সই নিয়েছে।

মানুষের কোলাহলের মধ্যে এই কথা কাউকে বলতে শুনেছিলাম। ইতিমধ্যে কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানুষের রুদ্রমূর্তিতে শ্রমিকরা পালাল; কিছু মানুষ সেখানে পড়ে থাকা পাথর এবং ইট কুড়িয়ে বাড়িমুখো হল এবং আশরাফুল বুঝতে পারল যে তার পরিস্থিতির প্রতি আমাদের গ্রামের মানুষের সমবেদনা আছে।

—আপনি লোকেদের বোঝান যে সরকারি কাজে বাধা দেওয়াটা দণ্ডনীয়। এফআইআর দিতে হবে।

দত্ত সেদিন আমাকে ফোনে কথাটা বলেছিল। তিনি আসতে পারার মতো অবস্থায় ছিলেন না। এলে জনগণের রোষে পড়ে অপদস্থ হতে হবে বলে ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন।

এতদিন আমার নিজেকে দোষী দোষী মনে হয়েছিল, যদিও এবার কিন্তু তার এই অনুরোধ রক্ষা করতে অস্বীকার করায় আমার মোটেই খারাপ লাগল না। আশরাফুলকে বঞ্চিত করে একটি প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় আমি কখনও সহযোগ করতে পারব না। কয়েকদিন পরে পুনরায় কথাটা চাপা পড়ে গেল, যদিও কেউ আশরাফুলকে পরামর্শ দিল এই জায়গাটাতে দখল নেওয়ার জন্য। দুই-একদিনের মধ্যে দত্তর ইটপাথর ফেলা জায়গাতে আশরাফুল আরম্ভ করে দিল একটি দেওয়াল গাঁথার কাজ। তবে পরের দিন রহিম কয়েকজন মহিলাকে নিয়ে উপস্থিত হল। আশরাফুল এবং রহিমের বাকবিতণ্ডার মধ্যে আমাদের গ্রামের কয়েকজন মানুষ উপস্থিত হল। পুনরায় দুটি ফৈদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হল; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশকে ডাকতে হল। বিষয়টি জটিল হয়ে পড়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিবেদন করা হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপস্থিত দণ্ডাধীশ বললেন।

শুধুমাত্র দত্তের মুখে কোনও শান্তির ভাব দেখা গেল না। ওপরের অফিসারের কাছে গেল, মানে এর শেষ নেই। কোনও সিদ্ধান্ত এত দ্রুত হবে না। এই প্রজেক্টের জন্য আমার প্রমোশন বন্ধ হয়ে রয়েছে। ইতিমধ্যে আমার সহকর্মী কয়েকজনের প্রমোশন হয়ে গেছে। কিছু একটা করতে হবে। দত্ত পরের দিন বিড়বিড় করছিলেন। আর তিনি কিছু একটা করলেনও— বিভাগীয় মন্ত্রীকে খবরটা দিলেন। স্থানীয় জনগণের প্রতিবাদে কাজটা এগোতে পারছে না। যেহেতু এটি সরকারের একটি বিশেষ প্রকল্প, কাজটা অর্ধসমাপ্ত হয়ে থাকলে বিভাগের জন্য লজ্জাজনক হবে যে স্থানীয় জনগণ করতে দেয়নি। কাগজে শুধু বের হবে যে কোটি টাকার একটি প্রকল্প অর্ধসমাপ্ত হয়ে পড়ে রয়েছে।

—হয়তো। কাজটা আরম্ভ করতে দিন। মাটির বিবাদটা সামান্তরালভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে। এভাবে বলে মন্ত্রীমহোদয় বিভাগীয় সচিবকে আদেশ দিয়েছিলেন বলে পরে দত্ত  আমার সামনে অহঙ্কার করে বলেছিলেন।

মন্ত্রীর আদেশ প্রশাসন বিভাগে গেল। কাজ পুনরায় আরম্ভ হল; পরের দিন ট্রাক, বুলডোজার এবং লেবার এসে আশরাফুলের মাটিতে উপস্থিত হল। পূর্বের মতোই এবারও গ্রামের মানুষ বাধা দেওয়ার জন্য এগিয়ে এল। কিন্তু এইবার কাজ স্থগিত হল না। পুলিশ এবং দণ্ডাধীশের  উপস্থিতিতে কাজ এগিয়ে চলল।

প্রশাসন থেকে ন্যায় দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া সেই একই দণ্ডাধীশ এবার বলেছিলেন— যেহেতু প্রকল্পের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে এবং প্রকল্পে সময়ের সীমা রয়েছে, কাজটা চালিয়ে যেতেই হবে। মাটির মালিকানাস্বত্ব একটা আলাদা বিষয় এবং তার ওপরে সরকার বিবেচনা করছে।

কাজ এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমীরণ দত্তেরও আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল বলে মনে হল। তিনি প্রতিদিন কাজের তদারক করার জন্য আসেন যদিও আমার ঘরে প্রবেশ করেন না, মুখ  ফুটে বেরিয়ে পড়েছিল আসন্ন পদোন্নতির ফুর্তি এবং কথার সুরে ছিল একপ্রকারের দক্ষতার চিহ্ন।

এতদিন কিছু একটা ছোট সমস্যা হলেই আমাকে ফোন করা দত্ত এখন পুলিশ এবং প্রশাসনের সম্পূর্ণ সাহায্যে কাজটা করতে যাওয়ায় আমার দরকার অনুভব না করাটা খুবই স্বাভাবিক।

কিন্তু ভালো দিনগুলি কি বেশিদিন থাকে?

টিউবওয়েল, পাম্প হাউস, ফিল্টার, ট্যাঙ্কি ইত্যাদি নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দত্তের মাথায় পুনরায় চেপে বসল মাটির সমাস্যটি। এক মাসের ভেতরে প্রকল্পটা হয়ে উঠবে, যদিও মাটির মালিকের দলিলে সই এবং সরকারিভাবে সরকারের নামে হস্তান্তর না-হওয়া পর্যন্ত কাজটা নথিপত্রে সম্পূর্ণ হওয়া বলে ঘোষণা করা যাবে না। কয়েকদিনের ভেতরে বাড়িগুলিতে জলের ট্যাপ কানেকশন হয়ে গেলে প্রত্যেকেই পরিকল্পনাটা সম্পূর্ণ হওয়া বলে মনে করবে। মন্ত্রী, পুলিশ এবং প্রশাসনেরও ধীরে ধীরে প্রকল্পটির ওপরে থাকা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি উঠে যাবে। যেদিন মানুষ ঘরে ঘরে জল পাবে, সেদিন নিশ্চয় মন্ত্রী কাজটা সম্পূর্ণ হয়েছে বলে ঘোষণা করে দেবেন।

কিন্তু মাটি হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত কাগজেপত্রে কাজটা সম্পন্ন হবে কি? এই মাটির বিবাদ দত্তর গলার কাঁটা হয়ে থাকবে। তাই হল। কাজের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দত্তর মাথার কামড়ও সমান গতিতে ঊর্ধ্বগামী হতে লাগল। রহিমের ওখানে সই করানোর জন্য যাওয়ার খবর পাওয়ার দিনেই আমাদের সমষ্টির এমএলএর ফোন গেল দত্তর কাছে। কোনও কারণে যাতে আশরাফুল নিজের মাটি থেকে বঞ্চিত না হয়; চাকরিটা যেন সে-ই পায়।

—আজ এমএলএ স্যারের ফোন এসেছিল। আপনি রহিমকে একটু বোঝানোর চেষ্টা করুন। বড় হিসেবে আপনার কথা শুনবে।

এইবার দত্তর কাকুতি-মিনতি দেখে আমার আবার হাসি পাচ্ছিল। এক সপ্তাহ আগে পর্যন্ত নিজের অহঙ্কার নিয়ে ঘুরতে থাকা ইঞ্জিনিয়ার পরিস্থিতির মায়াজালে এবার আবার জড়িয়ে পড়ায় মশারির নিচের মশার মতো হয়ে পড়েছিলেন।

রহিমকে বোঝানোর জন্য একদিন বাড়িতে ডাকলাম, ওদিকে নাকি দত্তকে রহিমের গ্রামের সমষ্টির বিধায়ক ফোনে সাবধান করে দিল— যার নামে জমাবন্দি আছে সেই চাকরিটা পাবে।

শ্রমিক-মিস্ত্রির তদারক করার জন্য একটা সময় প্রতিদিন আসা সমীরণ দত্ত ধীরে ধীরে আসা বন্ধ করে দিলেন। তদারকের অভাবে কাজের গতি পিছিয়ে পড়াই নয়, মানদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিল। কেউ লক্ষ করল যে নিম্নমানের পাইপ লাগানো হয়েছে, অন্য কেউ পাথর-বালির মান নিয়ে অভিযোগ করল। দুই-একজন খবরের কাগজে এই বিষয়ে প্রতিবেদন লিখল। আমি দত্তকে কয়েকবার ফোন করলাম, যদিও তাঁর ফোন সুইচ অফ পেলাম।

এসবের মধ্যে একদিন হঠাৎ আশরাফুলের একটি দুর্ঘটনা ঘটল। বিকালের বাজার থেকে বাইক চালিয়ে আসার সময় হঠাৎ পেছন থেকে একটি ডাম্পার ধাক্কা দেওয়ায় আশরাফুল রাস্তায় ছিটকে পড়ল; রক্তে মাখামাখি হয়ে পড়ে থাকা মানুষটাকে কেউ দেখতে পেয়ে টাউনের অসামরিক হাসপাতালে নিয়ে গেল।

সাধারণত এই ধরনের দুর্ঘটনা হয়ে থাকে, যদিও এবার আশরাফুলের সঙ্গে হওয়ার জন্য প্রত্যেকেই ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেল। রহিম নিশ্চয় আশরাফুলকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, কেউ কেউ বলছিল এটা দত্ত রহিমের সঙ্গে মিলে করেছেন; উদ্দেশ্য একটাই— আশরাফুলকে শেষ করে মাটির ওপরে থাকা সমস্ত বিবাদের ইতি টেনে দেওয়া। এটা ছিল দুদিন আগের কথা।

আজ বিকেলে কোনও বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই হঠাৎ আমার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সমীরণ দত্ত। আমি সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে তাঁকে ঘরের ভেতরে নিমন্ত্রণ করে এনেছি এবং সোফায় বসতে দিয়েছি। বাইরে কালো মেঘ ঢেকে ফেলেছে সন্ধের আকাশ; বাতাসের গতি বৃদ্ধি পেয়েছে; বিদ্যুৎ বিভাগ তুফানের আশঙ্কায় বিদ্যুৎ কর্তন করার জন্য নিশ্চয়ই বেশি সময় বাকি নেই; আর ঠিক সেই সময় কারেন্ট চলে গেল।

কিছু মনে করবেন না। আপনি হঠাৎ তুফানের মতো আবির্ভাব হওয়ায় কারেন্ট বোধহয় চমকে গিয়ে পালিয়ে গেছে— এরকম কোনও মজার কথা দিয়ে দত্তর সঙ্গে কথোপকথন আরম্ভ করব বলে ভেবেছি, যদিও আমি বুঝতে পারছি যে এই কথাগুলোতে দত্ত খুব একটা রস পাবেন না— তাঁর চিন্তাক্লিষ্ট মুখে হাসির কোনও চিহ্ন নেই।

—বলুন তো কেন এসেছেন? নিশ্চয় কোনও দরকারি কথা হবে।
—হ্যাঁ… দত্ত পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখটা মুছে নিয়েছেন; পুনরায় বলে চলেছেন— আশরাফুল এবং রহিমের সমস্যাটার জন্যই আপনার কাছে এসেছি। গত একমাস ধরে এই সমস্যা আমাকে জীবন্ত মেরে চলেছে, ঘুম আসছে না, খেতে ইচ্ছা করছে না, বাড়িতে ঝগড়াঝাঁটি হচ্ছে— আমার প্রমোশন বন্ধ হয়ে গেছে। প্রমোশন হয়ে বদলি হলে ছেলেমেয়েদের একটি ভালো স্কুলে ভর্তি করে দেব ভেবেছিলাম। এখন যেন সমস্ত পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিল। এর থেকে বের হওয়ার জন্যই একটা উপায়…
—আমার কাছে কোনও উপায় নেই। আপনি আমার কথায় একপ্রকারের বিশ্বাসঘাতকতা…
—না না। আমি আপনার সঙ্গে কোনওরকম বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। আমি আপনার কাছ থেকে উপায়ও চাচ্ছি না। বরং আমি একটা উপায় বের করেছি। সেটাই বলতে এসেছি।

কথাটা বলে দত্ত আমাকে নিরীক্ষণ করছেন— তিনি বুঝতে পেরেছেন আমি এবার দত্তর কথায় মন দিচ্ছি। কী ধরনের উপায়, আশরাফুল এবং রহিমের মধ্যে হওয়া বিবাদের যে অন্ত হবে এরকম আমার মনে হয় না, যদিও দত্তর তথাকথিত সমাধানের বিষয়ে জানার জন্য উৎসুক বলে নিশ্চয় আমার মুখে একটা ভাব ফুটে উঠেছে।

পদোন্নতির আশায় পণবন্দি ইঞ্জিনিয়ার কী স্তরে যেতে ইচ্ছুক, তাও জানার জন্য কৌতূহল রয়েছে।

—আমি নিজেই রহিমের কাছ থেকে মাটিটা কিনে নিলাম।

আমি যে দত্তর কথা বুঝতে পারিনি, সেটা তিনি সহজে বুঝতে পেরেছেন। এইবার তাঁর মুখে একটা হাসি ফুটেছে— একজন যুদ্ধবিজয়ী যোদ্ধার মতো তিনি বলে গেছেন নিজে উদ্ভাবন করা কৌশলের বিষয়ে—

—এই ধরুন, রহিম নিজের নামে থাকা মাটিটা কী করত? কাউকে নিশ্চয় বিক্রি করে দিত। আমি যদি সেই মাটি কিনে নিই সমস্যা কোথায়? সেদিন শুনতে পেলাম যে এইবার পঞ্চায়েত নির্বাচনে সে পুনরায় খেলবে, তার নাকি টাকার প্রয়োজন। খবর পেয়ে আমিই তাকে প্রস্তাব দিলাম। প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করছিল, যদিও শেষে রাজি হল। পরের দিনই মাটিটা কিনে নিলাম। মাটিটা সে বিক্রি করলে এমনিতেও অন্য গ্রাহক পেত না। ইতিমধ্যে সেই মাটিতে জল জোগান পরিকল্পনা বসে গেছে, সেখানে অন্য কোনও কাজই করা যাবে না।
—তবে আপনি সরকারি অফিসার হয়ে এই মাটিটা নিজেই সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে চাইছেন?
—না না। কী কথা যে বলেন। আমি এত মূর্খ নই যে নিজের নামে থাকা মাটিটা সরকারি পরিকল্পনায় লাগাব। আমার তো চাকরি চলে যাবে।

আমি দত্তর ওপরে অভিযোগ করেছি বুঝতে পেরে তাঁর কথায় একটা ক্রোধের সুর লক্ষ্য করছি। তিনি বলে যাচ্ছেন কীভাবে আজ সকালে সার্কেল অফিসে গিয়ে সার্কেল অফিসারকে অফিসঘরে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে মাটিটা চিঠা এবং জমাবন্দিতে নিজের নামে নামজারি করিয়ে এনেছেন।

—আপনি জানেন এই সমস্ত কাজ একদিনে হয় না, কাজটা আদায় করতে বেশ কষ্ট হয়েছে।

দত্ত ক্ষণিকের জন্য থেমেছেন, কিছু একটা কথা মনে মনে ভেবেছেন, তারপরে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে আবার বলতে শুর করেছেন—

—এখন আসল কথায় আসছি। আপনার কাছ থেকে একটা সাহায্যের দরকার ছিল…
—বলুন তো…
—আশরাফুলের সঙ্গে আমি আজকেই মাটি কেনা-বেচার বোঝাবুঝিটা করে নিতে পারলে ভালো ছিল। আপনাকে তাকে মাটিটা আমার কাছ থেকে কিনে নেওয়ার জন্য রাজি করিয়ে দিতে হবে।
—সে নিজেরই মাটি কেন কিনবে?
—সেই মাটির এক ইঞ্চিও কাগজেপত্রে তার নামে নেই। তাকে আমার থেকেই মাটিটা কিনতে হবে। আচ্ছা ঠিক আছে, যে কোনও দামে দিলেই হবে, আমার লোকসান হলেও কথা নেই— প্রোমোশন হলে এই জায়গা থেকে বেরোতে পারলেই রক্ষা।
—এই ক্রয়ের বিনিময়ে সে কী পাবে?
—মাটিটা তার নামে আসবে, নিজের ঘর, মাটি সরকারি জমাবন্দিতে আশরাফুলের নামে আসবে। যে অংশে জল জোগানের পরিকল্পনা আছে, সেটুকু হস্তান্তর করার জন্য সই করলে একটা সরকারি চাকরিও পাবে। আমার কাছ থেকে মাটি কেনার খরচ তিন-চার বছরে নাই হয়ে যাবে। বাকি অংশ মাটি সে ইচ্ছা করলে বিক্রি করতেও পারে…
—এতই যদি ভালো প্রস্তাব অন্য গ্রাহকও কি এই মাটির টুকরো কেনার জন্য তাড়াহুড়ো করবে না? আপনি আশরাফুলের কথা এত চিন্তা করার চেয়ে অন্য গ্রাহক খুঁজে দেখুন। কে জানে, আপনি কেনা দামের চেয়ে অধিক দামেও বিক্রি করতে পারবেন।
—ইস আপনি বুঝতে পারছেন না। অন্য গ্রাহক কেন কিনবে? আশরাফুলের সঙ্গে ঝামেলায় জড়াতে কেউ চাইবে না; তার মধ্যে আপনারা রয়েছেন। পরের দিন গ্রামসভা পেতে সেই নতুন গ্রাহককে নাস্তানাবুদ করবেন। আমি ইতিমধ্যে দুই-একজনকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, সবাই অস্বীকার করেছে। যাই হোক না কেন, আপনি আশরাফুলকে ডেকে পাঠান। আপনার সামনে কথাটা তাকে বলতে চাইছি। আমার বিশ্বাস রয়েছে, আপনি তাকে বোঝাতে পারবেন।

কথাটা বলে উঠে দত্ত আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে। আমি ধরতে পারছি না কোথা থেকে আরম্ভ করব। আশরাফুলের কয়েকদিন আগে দুর্ঘটনা হয়েছে; নাকি সে যে বর্তমানে হাসপাতালে আছে; না এই সম্ভাবনার কথায় ব্যক্ত করি যে গত দুদিন থেকে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে এবং হয়তো সে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নাও পেতে পারে।

দত্তর নামে থাকা মাটিটা যে এখন তাঁর নামেই থেকে যেতে পারে, সেই সম্ভাবনার বিষয়ে দত্তর জীবনে হঠাৎ তুফান না আসা পর্যন্ত কীভাবে উপস্থাপন করি, তা ভেবেই আমি মৌন হয়ে বসে রয়েছি।