Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ইরান-মার্কিন সংঘাত: বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের নতুন ভাষা

দেবাশিস মিথিয়া

 


প্রতিবাদের স্লোগানগুলিতে মানুষের পরিবর্তিত সচেতনতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। গাজা যুদ্ধের স্লোগান ছিল মূলত মানবিক— যেমন ‘সিজফায়ার নাউ’। কিন্তু ২০২৬ সালে মার্কিন বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছেন— ‘স্টপ ট্রাম্প’স ইম্পেরিয়ালিজম’ এবং ইতালীয় শ্রমিকরা বলছেন— ‘পোর্টস আর ফর সোয়েট, নট ব্লাড’। এই পরিবর্তন নির্দেশ করে, সাধারণ মানুষ এখন যুদ্ধের মানবিক ক্ষতির পাশাপাশি এর পেছনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণগুলো সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন

 

​২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬; আমেরিকা ও ইজরায়েলের এক নজিরবিহীন যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হন। এই ঘটনা যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘ চার দশকের ‘ছায়াযুদ্ধ’-কে পেছনে ফেলে ইজরায়েল ও আমেরিকা এখন ইরানের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে অবতীর্ণ, যা ইতিহাসের পাতায় এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই আক্রমণকে “অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই” বলে দাবি করেছেন। এর জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড (IRGC) ইজরায়েলের প্রধান শহরগুলো লক্ষ করে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে পাল্টা আঘাত হেনেছে। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।

মূলত ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের এই নজিরবিহীন যৌথ অভিযান। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) কর্মকর্তা ব্র্যাড কুপার-এর ঘোষণা অনুযায়ী, এই অভিযানের লক্ষ্য, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, নৌবাহিনী এবং পারমাণবিক পরিকাঠামো ধ্বংস করা। আক্রমণের শুরুতে মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে ইরানের ৯০০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আমেরিকা আঘাত হানে৷ এই অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ড্রোন এবং ‘লুকাস’ প্রোগ্রামের আওতাধীন স্বল্পমূল্যের ড্রোন ব্যবহার করা হয়। তবে এই আঘাতের মানবিক বিপর্যয়ও অনেকখানি৷ মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইরানের মিনাব এলাকার একটি বালিকা বিদ্যালয় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে৷ এই মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী ও কর্মী। যুদ্ধের প্রথম সাত দিনেই ইরানে নিহতের সংখ্যা ১,৩৩২ ছাড়িয়ে গেছে— এই সব মৃত্যু ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে।

 

ইরান ও আমেরিকার এই পারস্পরিক আক্রমণের প্রথম ১০০ ঘণ্টার আনুমানিক খরচ ছিল প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার। উন্নয়নের চাকা স্তব্ধ করে দিয়ে এই বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে কেবল ধ্বংসলীলায়। সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়েছে, ইরানের উপর আমেরিকা আঘাত হানার পর ইরান তাদের হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও তেহেরান জানিয়েছে যে ভারত, রাশিয়া ও চিনের পতাকাবাহী জাহাজগুলো এই পথে চলতে পারবে, তবে পশ্চিমি দেশগুলোর জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ এখন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০-৩০ শতাংশ পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক লাফে ব্যারেল প্রতি ২০০ থেকে ২৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। জ্বালানির এই তীব্র সংকট আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন ও নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থাকে প্রায় অচল করে দিয়েছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে। এর ফলশ্রুতিতে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি, যা উন্নয়নশীল দেশগুলির খাদ্যনিরাপত্তা ও শিল্প উৎপাদনকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি অর্থনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী; জ্বালানি ও সারের আকাশছোঁয়া দাম ক্ষুদ্র চাষিদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।

​২০২৬ সালের এই সংঘাত এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে যখন বিশ্ব-অর্থনীতি আগের যুদ্ধগুলোর ধাক্কা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সাধারণ মানুষ আজ উপলব্ধি করছেন যে, এই যুদ্ধের চূড়ান্ত খেসারত শেষ পর্যন্ত তাঁদেরই দিতে হবে— কখনও আকাশছোঁয়া দামে জ্বালানি কিনে, আবার কখনও উন্নয়নের বাজেট সামরিক খাতে চলে যাওয়ার ফলে মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে। জনগণের প্রাপ্য সুবিধা কেড়ে নিয়ে যুদ্ধের পেছনে বিপুল টাকা খরচ করায় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ। এই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের প্রতিবাদী মিছিলে।

 

বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ

​আয়াতোল্লা খামেনেইকে হত্যার জন্য আমেরিকা ‘ডিক্যাপিটেশন’ (শীর্ষ নেতৃত্ব নির্মূল) নীতি গ্রহণ করেছে। এই নীতির বিরুদ্ধে খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরেই নজিরবিহীন গণবিদ্রোহ শুরু হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ওয়াশিংটন ডিসি-তে হোয়াইট হাউসের সামনে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে স্লোগান দিচ্ছেন— ‘হ্যান্ডস অফ ইরান’ (Hands Off Iran)। নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ার হয়ে উঠেছে যুদ্ধবিরোধী জোট ও বামপন্থীদের প্রধান দুর্গ। লস অ্যাঞ্জেলস, শিকাগো, আটলান্টা, বাল্টিমোর এবং বোস্টনের মতো বড় শহরগুলোর রাজপথ এখন বিক্ষোভকারীদের দখলে। এই প্রতিবাদগুলোর একটি বিশেষ দিক হল ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি চরম অনাস্থা। কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভে অনুযায়ী, হামলার ঠিক আগে ৭০ শতাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল। সাধারণ মানুষের মনে ইরাক যুদ্ধের তিক্ত স্মৃতি এখনও সতেজ; তারা ভয় পাচ্ছেন এটিও একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অর্থহীন সংঘাতে পরিণত না হয়। এমনকি মার্কিন সেনেটর মার্ক ওয়ার্নার এবং টিম কেইন সরাসরি এই অভিযানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কেন যুদ্ধ শুরু হল, তার নিয়ে সরব হয়েছেন।

 

​ইউরোপে এই প্রতিবাদের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, প্রতিবাদ অনেক বেশি সুসংগঠিত। লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের সামনে হাজার হাজার মানুষ পদযাত্রা করে চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছেন— ‘স্টপ ট্রাম্পস ওয়ারস’ (Stop Trump’s Wars)। গ্রিসের অ্যাথেন্সে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বিশাল বিক্ষোভ থেকে ‘সৌদা সামরিক ঘাঁটি’ বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। মহাদেশটির প্রতিটি বড় শহরে যুদ্ধের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের অবস্থান রাজনৈতিক নেতাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে।

 

​দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় এই সংঘাতের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ছিল ধর্মীয় সংহতি ও রাজনৈতিক ক্ষোভের এক সংমিশ্রণ। ভারতের উত্তরপ্রদেশ, জম্মু-কাশ্মির, দিল্লি এবং বিহারের শিয়া মুসলিমরা কালো পতাকা নিয়ে শোক ও প্রতিবাদের মিছিল বের করেছেন। বাংলাদেশে ১ মার্চ জামায়াতে ইসলামি এবং ৬ মার্চ গণসংহতি আন্দোলন পৃথকভাবে ঢাকায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করে অবিলম্বে যুদ্ধের অবসান দাবি করেছে। ইরাকের বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভকারীরা মারমুখী হয়ে উঠলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। নাইজেরিয়ার কানো শহরে শিয়া ধর্মাবলম্বীরা ইরান ও প্যালেস্তাইনের পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ দেখান এবং মার্কিন ও ইজরায়েলি পতাকায় অগ্নিসংযোগ করেন। এই অঞ্চলের প্রতিবাদগুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে স্রেফ একটি ‘দখলদার শক্তি’ এবং ‘সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

 

আলোচনা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার— এই প্রতিবাদগুলির মূলে রয়েছে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অর্থনৈতিক হাহাকার আর মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ক্ষোভ। প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষ যে আস্থা হারিয়েছে, এগুলি তারই এক বহিঃপ্রকাশ। সব মিলিয়ে এই সংঘাত বিশ্ব-রাজনীতিকে এক ভয়ঙ্কর ও অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

 

ছাত্র ও শ্রমিকশ্রেণির প্রতিরোধ

​২০২৬-এর এই যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল বিশ্বজুড়ে ছাত্রসমাজের অংশগ্রহণ৷ তাদের আন্দোলনের ধরন বৈচিত্র্যময়; তারা কেবল যুদ্ধের প্রতিবাদই করছে না, বরং যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও নৈতিক ভিত্তিকেও চ্যালেঞ্জ করছে। মার্চের শুরুতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। ৪ মার্চ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সানরাইজ মুভমেন্ট’-এর উদ্যোগে ‘হ্যান্ডস অফ ইরান’ শিরোনামে এক বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। ছাত্রদের মূল অভিযোগ ছিল— মার্কিন সরকার দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান না করে বিদেশে সাম্রাজ্যবাদী হিংসা ছড়াতে ব্যস্ত। কলম্বিয়াতে পুলিশ ১২ জন ছাত্র ও শিক্ষককে গ্রেপ্তার করলে আন্দোলন আরও জোরদার হয়।

 

​একই সময়ে ইরানের ছাত্ররা এক দ্বিমুখী সংকটের মুখোমুখি হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলা অর্থনৈতিক আন্দোলনে তারা আগে থেকেই সক্রিয় ছিল। ২০২৬-এর শুরুতে যখন মার্কিন হামলা শুরু হয়, তখন ইরানি ছাত্ররা একদিকে বিদেশি আক্রমণের বিরোধিতা করছিল, অন্যদিকে দেশের ভেতরে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান চাইছিল। এই বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী চরম নিষ্ঠুরতার পথ বেছে নেয়; এর ফলে নিহতের সংখ্যা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

​এই যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল আন্তর্জাতিক ডক শ্রমিকদের ধর্মঘট। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ২০টিরও বেশি বন্দরের শ্রমিকরা সামরিক সরঞ্জামবাহী জাহাজে কাজ করতে অস্বীকার করে। ইতালির শ্রমিক সংগঠন ইউএসবি ঘোষণা করে— “বন্দর ঘামের জায়গা, রক্তের নয়”। এই শ্রমিকরা কেবল মিছিল করেই ক্ষান্ত হননি; তাঁরা অস্ত্রবাহী কন্টেনার খালাস করতে অস্বীকার করেন৷ এমনকি ক্রেন চালানো বন্ধ করে দিয়ে তাঁরা মার্কিন-ইজরায়েলি সামরিক রসদ সরবরাহের পথ পুরোপুরি অচল করে দেন। এই সক্রিয় প্রতিরোধ, বিশ্বজুড়ে শ্রমিকশ্রেণির এক নতুন রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় দিচ্ছে। অন্যদিকে, নার্স ও অন্যান্য পরিষেবা খাতের কর্মীদের সংগঠনগুলিও (এনএনইউ এবং এসইআইইউ) যুদ্ধের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের সাফ কথা— যুদ্ধের পেছনে এই বিপুল অর্থ অপচয় না করে আমেরিকার স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ করা উচিত। তবে অবাক করার বিষয় হল, এই সংকটেও আমেরিকার প্রভাবশালী শ্রমিক সংগঠন AFL-CIO এবং UAW-র অপ্রত্যাশিত নীরবতা।

 

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা

এই সংঘাতের সময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত ছিল৷ কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের কার্যক্রম প্রশ্নের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদ কেন এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থামাতে ব্যর্থ? উত্তর খুঁজলে দেখা যাবে এর পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক এক মারপ্যাঁচ। ২০২৬ সালে জাতিসংঘ তার ইতিহাসের ভয়াবহতম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘকে প্রদেয় তাদের নিয়মিত অবদানের প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার বাকি রেখেছে। ফলে সংস্থাটির আর্থিক সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। ​এর ফলে জাতিসংঘের বার্ষিক বাজেট এক ধাক্কায় ১৫.১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং বাধ্য হয়ে তাদের প্রায় ২,৯০০ কর্মীকে ছাঁটাই করতে হয়েছে। এই চরম আর্থিক সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বিশ্বশান্তিতে৷ মালি, সুদান ও ইরাক থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলো তড়িঘড়ি করে প্রত্যাহার করে নিতে হয়েছে। সেই একই কারণে এই জটিল পরিস্থিতিতেও জাতিসংঘ চুপ করে আছে। বাস্তবতা হল, এই সংকট মেটাতে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনও কার্যকর শক্তি এখন আর জাতিসংঘের হাতে নেই।

​নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের (পি৫) মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন সংস্থাটিকে প্রায় অকার্যকর করে দিয়েছে। চিন ও রাশিয়া মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানালেও সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ‘ভেটো যুদ্ধে’র কারণে কোনও কার্যকর প্রস্তাব (Resolution) পাশ করা সম্ভব হয়নি। এই অচলবস্থার সুযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘আর্টিকেল ৫১’ বা আত্মরক্ষার অধিকারের যুক্তি দেখিয়ে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ কার্যকর করে— যদিও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই অভিযানের পেছনে কোনও ‘আসন্ন হুমকি’ (Imminent threat)-র প্রমাণ পাননি৷

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি বিতর্কিত আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে তোলেন। ট্রাম্প নিজেই এর ‘আজীবন চেয়ারম্যান’ এবং এই বোর্ড মূলত মার্কিন অর্থায়নে পরিচালিত ২০টি মিত্রদেশের একটি জোট। ট্রাম্পের ভাষায়, এই বোর্ড জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপনের ক্ষমতা রাখে। মূলত এটি একটি ‘মিনি-ল্যাটারাল’ ব্যবস্থা, যা আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই সমান্তরাল ব্যবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে শান্তিপ্রচেষ্টায় এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠিত বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর আবেদন ম্লান হয়ে গেছে।

 

প্রতিবাদের ধরনে বদল

​২০২৬ সালের মার্চ মাসের প্রতিবাদগুলি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এটি ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বা ২০২৩ সালের ইজরায়েল-গাজা যুদ্ধের চেয়ে বেশ কিছু দিক থেকে আলাদা। ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের সময় বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ ছিল অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত এবং একমুখী; তখন পশ্চিমি দেশগুলোর সরকার ও সাধারণ জনগণ একই লাইনে দাঁড়িয়ে রুশ আগ্রাসনের নিন্দা করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে ইরানের ক্ষেত্রে দেখা গেল, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাই তাদের সরকারের সামরিক পদক্ষেপের ঘোর বিরোধী।

​এই প্রতিবাদে সংশয়বাদ-এর ভূমিকাও অনেকখানি। ইরাক যুদ্ধের সময়কার সেই ‘মিথ্যা গোয়েন্দা তথ্য’ আজও আমেরিকানদের মনে এক গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়ে রেখেছে। ফলে ২০২৬ সালে ইরানের ‘পারমাণবিক হুমকি’র যে অজুহাত দেওয়া হচ্ছে, তাকে সাধারণ মানুষ এবার স্রেফ রাজনৈতিক অপকৌশল হিসেবে দেখছেন। এছাড়া, এই সংঘাত পশ্চিমি বিশ্বের ‘দ্বিমুখী নীতি’কে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যে আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দিয়ে রাশিয়াকে একঘরে করা হয়েছিল, খোদ আমেরিকা যখন সেই একই আইন লঙ্ঘন করে ইরানে হামলা চালায়, তখন বিশ্বজুড়ে পশ্চিমি আদর্শ ও নিরপেক্ষতা নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। এই নৈতিক সংকটের কারণেই সাধারণ মানুষ আজ রাজপথের প্রতিবাদকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

​তবে গাজা যুদ্ধের সময় যে-ধরনের আবেগপ্রবণ গণসংহতি দেখা গিয়েছিল, ইরানের ক্ষেত্রে তার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। জেপিপিআই-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, গাজার রাফাহ হামলার বিরুদ্ধে আয়োজিত প্রতিবাদের হার ছিল ইরানে চলা বিক্ষোভের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি। এর প্রধান কারণ ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির জটিলতা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইরান সরকার তাদের নিজস্ব বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোয় আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ তেহরানের বর্তমান সরকারের প্রতি পুরোপুরি সহানুভূতিশীল ছিল না। গাজা যুদ্ধকে যেখানে ‘নিপীড়িত বনাম নিপীড়ক’-এর লড়াই হিসেবে দেখা হয়েছিল, ইরানের উপর আক্রমণকে দেখা হচ্ছে ‘দুইটি আঞ্চলিক শক্তির ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ হিসেবে।

প্রতিবাদের এই স্লোগানগুলিতে মানুষের পরিবর্তিত সচেতনতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। গাজা যুদ্ধের স্লোগান ছিল মূলত মানবিক— যেমন ‘সিজফায়ার নাউ’। কিন্তু ২০২৬ সালে মার্কিন বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছেন— ‘স্টপ ট্রাম্প’স ইম্পেরিয়ালিজম’ এবং ইতালীয় শ্রমিকরা বলছেন— ‘পোর্টস আর ফর সোয়েট, নট ব্লাড’। এই পরিবর্তনটি নির্দেশ করে, সাধারণ মানুষ এখন যুদ্ধের মানবিক ক্ষতির পাশাপাশি এর পেছনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণগুলো সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন।

২০২৬-এর এই যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা দিয়ে এখন আর বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব নয়। তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগে রাজপথের প্রতিবাদীরা আজ নিজেরাই সত্যের পাহারাদার, যাঁরা যুদ্ধের কৃত্রিম বৈধতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার স্পর্ধা রাখেন।

 

অনিশ্চিত মেরুকরণের দোরগোড়ায় পৃথিবী

​এই ইরান-মার্কিন সংঘাতকে শুধু  দুইটি আঞ্চলিক শক্তির ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে চলবে না, একে সমকালীন বিশ্ব-রাজনীতির এক অমোঘ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিচার করা উচিত। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ কেবল ইরানের নেতৃত্বকে আঘাত করেনি, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে। জাতিসংঘের চরম আর্থিক ও রাজনৈতিক পঙ্গুত্ব, ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর মতো সমান্তরাল ক্ষমতার উত্থান এবং বিশ্বজুড়ে ছাত্র-শ্রমিকদের অভূতপূর্ব প্রতিবাদ— এই সব কিছু মিলে পৃথিবী এখন এক আমূল পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।

​এই সংঘাতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে বিস্তার আমরা দেখলাম, তা জানান দেয়— বর্তমানের জনমত অনেক বেশি বিশ্লেষণী। তাই তারা আজ রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিসন্ধিগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তবে আন্তর্জাতিক শান্তি সংস্থাগুলোর এই নজিরবিহীন অসহায়তা ভবিষ্যৎবিশ্বের নিরাপত্তার জন্য এক চরম অশনিসঙ্কেত। যদি বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক কাঠামোকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করা না যায়, তবে ২০২৬ সালের এই ক্ষত কেবল একটি যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি নতুন কোনও বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করবে।