প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী
আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি, তা হল প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর আপেক্ষিক শক্তিতে ভূ-তাত্ত্বিক মাত্রার এক পরিবর্তন। এবং টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ায় যেমন ভূমিকম্প হয়, সাম্রাজ্যবাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের নড়াচড়া নানা ধরনের দ্বন্দ্বকে তীব্র করে তোলে ও সংকটের সৃষ্টি করে। যা থেকে বিস্ফোরণের আকারে ফেটে পড়ে যুদ্ধ
…যে রূপই সে পরিগ্রহ করুক না কেন, তা সে একদল সাম্রাজ্যবাদীর বিরুদ্ধে আরেক দলের জোট বা সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের সাধারণ মৈত্রী হোক না কেন— অনিবার্যভাবেই তা হবে, দুই যুদ্ধের মধ্যবর্তী এক ‘অবকাশ’। শান্তিপূর্ণ জোট যুদ্ধের প্রস্তুতি চালায় এবং তাদের উদ্ভবও যুদ্ধ থেকেই, একটা অন্যটার হেতু, এবং বিশ্ব-অর্থনীতির এবং বিশ্ব-রাজনীতির মধ্যস্থ সাম্রাজ্যবাদী যোগাযোগ ও পরস্পর সম্পর্কের সেই একই ভিত্তি থেকে সৃষ্টি হয় শান্তিপূর্ণ ও অশান্তিপূর্ণ সংগ্রাম-রূপের পালাবদল।[1]
সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে যে কোনও লেখার ক্ষেত্রে আজও লেনিনের উপরিউক্ত মৌলিক গ্রন্থটির শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায় দেখি না। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, উৎপাদনের ধরনে যতই পরিবর্তন আসুক, পণ্য রপ্তানি ও লগ্নি পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যতই গতি বাড়ুক— সমাজবিজ্ঞানের মূল নীতিগুলি তাতে পালটে যায় না।
বর্তমানে, দুনিয়ার প্রধান শক্তিগুলি (যেমন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, চিনের সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদ এবং রুশ সাম্রাজ্যবাদ) অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং প্রাকৃতিক সম্পদের প্রভাবের পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতায় জড়িত। এই প্রতিযোগিতা যুদ্ধ, ছদ্মযুদ্ধ, আঞ্চলিক জোট, গোয়েন্দা অভিযান, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্রাজ্যবাদীদের ধামাধরা রাষ্ট্রগুলিতে বসানো একনায়কতন্ত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়ে চলেছে। এর মধ্যে অনেক যুদ্ধ বা ছদ্মযুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদীরা করে, যেমন লেনিন বলেছেন, সরাসরি নিজের জন্য ততটা নয়, যতটা প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল ও তার আধিপত্যকে ক্ষুণ্ন করার জন্য। ইরান, ইউক্রেনের যুদ্ধ, চিন ও তাইওয়ানের মধ্যে উত্তেজনা, লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হানাদারি, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এবং আফ্রিকার প্রতিযোগিতা, গত কয়েক বছর ধরে দুনিয়া জুড়ে চলতে থাকা অসংখ্য ছোট-বড় সংঘর্ষকে এই আলোকেই দেখতে হবে। সবই বিশ্বকে পুনরায় বিভক্ত করার জন্য তীব্র সংগ্রামের লক্ষণ।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অত্যন্ত প্রভাবশালী সামরিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে রয়ে গেলেও নিজেদের ক্ষয়ের কারণে এটি গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। চিন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলির উদীয়মান ব্লকগুলির সঙ্গে তারা তীব্র প্রতিযোগিতায় জড়িত। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে নিজেদের এক নম্বর স্থান ধরে রাখতে তারা মরিয়া। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দুর্বলতা নিয়ে এই নিবন্ধে আলোচনা আমরা করব না, এখানে সংক্ষেপে চর্চা করা হবে চিন-রাশিয়ার উত্থান প্রসঙ্গে। তার আগে, যেহেতু যুদ্ধের মধ্যে এই নিবন্ধ লেখা হচ্ছে, তাই তা নিয়ে দু-এক কথা হয়ে যাক।
ডলার বাঁচাতে যুদ্ধ
ইরান যুদ্ধের কারণ নিয়ে তেল, ভূ-রাজনীতি ইত্যাদি নানা কথা বলা হলেও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আলোচনায় সেভাবে আসছে না। যদিও যুদ্ধচলাকালীন ইরানের একটি ঘোষণার দিকে নজর করলে সচেতন মানুষ তা বুঝতে পারবেন। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর ইরান জানিয়েছিল, যারা চিনা মুদ্রা ইউয়ান দিয়ে বাণিজ্য করবে, তাদের জাহাজ ছেড়ে দেওয়া হবে। অর্থাৎ ডি-ডলারাইজেশন। যা বর্তমান শতাব্দীতে দুনিয়ার নানা প্রান্তে মার্কিন বর্বরতার গভীরে রয়েছে।
১৯৭৪ সালে মার্কিন-সৌদি আরব চুক্তির মাধ্যমে দুনিয়া জুড়ে ডলারের জয়যাত্রা শুরু। সকল রকমের তেল ডলারের মাধ্যমে বিক্রি শুরু হওয়ার পর দুনিয়ার তামাম বাণিজ্যই ডলারের বিনিময়ে হতে থাকে। তখন থেকেই পেট্রো-ডলার কথাটির সূত্রপাত।
পরবর্তীকালে সাদ্দাম হুসেইন ডলারের পরিবর্তে ইউরোয় তেল বেচার কথা বলায় তাঁকে হত্যা করা হয়। একই পরিণতি হয় লিবিয়ার গদ্দাফির। তিনিও ডলারের পরিবর্তে ইউরোকে বেছে নিচ্ছিলেন। তাছাড়া ইউরোর অনুকরণে গোটা আফ্রিকার জন্য গোল্ড দিনার নামে এক নতুন মুদ্রার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিককালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো ডলারের পরিবর্তে ইউয়ানে তেল বেচছিলেন। তাই তাঁকে অপহরণ করা হল।
ব্রাজিল, চিন, রাশিয়া, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে ব্রিকস তৈরি হয় ২০১০ সালে।[2] বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা দশ, সহযোগী সদস্যসংখ্যাও দশ। এই সংগঠন বিশ্ববাণিজ্যের ষাট শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। খুব শিগগিরই ব্রিকস R5 নামে নতুন মুদ্রা চালু করতে চলেছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবে। মনে রাখা দরকার বর্তমানে সৌদি আরবও ব্রিকসের সদস্য। ফলে তারাও বিভিন্ন মুদ্রায় তেল বেচতে পারে। যদিও সৌদির মুদ্রা রিয়ালের সঙ্গে ডলারের বিনিময়মূল্য ১৯৮৬ থেকে একইরকম রয়েছে। অর্থাৎ সেই দেশ এখনই ডলারকে বাতিল করছে না।
এবার গত তিন দশকে, চিন ও রাশিয়া কীভাবে আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠল, তা বোঝা দরকার।
চিন
চিন কেবল পুঁজিবাদী দেশই নয়, সাম্রাজ্যবাদী হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেরিতে আসায় এটি আপাতত মূলত অর্থনৈতিক উপায়ে তার শক্তি তুলে ধরছে, পাশাপাশি বাড়াচ্ছে সামরিক শক্তিও। শিল্পের জন্য কাঁচামাল এবং শক্তির উৎস, মূলধনের জন্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র, আমদানি ও রপ্তানির জন্য বাণিজ্যপথ এবং তার পণ্যগুলির বাজার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করছে। এই পণ্যগুলির মধ্যে অস্ত্রও রয়েছে।
একটি প্রধান সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মর্যাদায় চিনের ত্রিশ বছরের উত্থান, উৎপাদনের মাধ্যমগুলিতে ব্যাপক বিনিয়োগ এবং বিশ্ববাজারের উপর নির্ভরতার ফল। প্রাথমিকভাবে তারা বিশ্ববাজারে বস্ত্র ও খেলনার মতো পণ্য রপ্তানির জন্য নিজেদের দেশের সস্তা শ্রমের বিশাল ভাণ্ডারের সুযোগ নিয়েছিল। এখন তারা একটি প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত পুঁজিবাদী অর্থনীতি যার আধুনিক উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেত্রগুলিতে (বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং ইভি ব্যাটারি, ফটোভোলটাইক কোষ ইত্যাদি) জোরালো অবস্থান রয়েছে। এখন তারা পুঁজি রপ্তানিতেও অনেকটা এগিয়ে গেছে।
যদিও এখন চিন তার ক্ষমতাকে ছাপিয়ে গেছে। পুঁজিবাদী অতিরিক্ত উৎপাদন এবং পুঁজির ক্রমবর্ধমান আঙ্গিক গঠনজনিত প্রভাবের ধ্রুপদী সংকটের মুখোমুখি তারা। পাশাপাশি চিনা রপ্তানি, অন্যান্য দেশের শুল্ক এবং সংরক্ষণবাদের বাধার সামনে পড়ছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববাণিজ্যের সম্প্রসারণ বন্ধ হয়ে গেছে। যে পরিমাণ বিনিয়োগে যতটা অর্থনৈতিক বৃদ্ধি আগে হত, এখন আর তা হয় না। চিন যা উৎপাদন করে তা এখন বিশ্ববাজারে বিক্রি করা আরও কঠিন।
অবশ্য চিনের অর্থনীতি এখনও বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে ধীর গতিতে। ১৯৯০ সাল থেকে, চিন প্রতি বছর বিপুল গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে— প্রতি বছর ৯ শতাংশের বেশি, যা বেড়ে ১৪ শতাংশ অবধি উঠেছিল।[3] ২০১২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে তা কমে ছয় থেকে সাত শতাংশের মধ্যে আসে। এবং এখন ৫ শতাংশে পৌঁছানোর জন্য সংগ্রাম করছে।[4]
ব্যাপক অর্থনৈতিক উদ্দীপনা প্যাকেজ— কেইনসিয়ান ব্যবস্থা— আরও বেশি পতন রোধ করেছে। কিন্তু বিনিয়োগ থেকে লাভ কমছে, বাড়ছে ঋণ।
২০০০ সালে চিনের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ২৩ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৮৮-১২৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।[5] সেটা এখনও বেশিরভাগ উন্নত পুঁজিবাদী অর্থনীতির তুলনায় কম, তবে তা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। কিছু হিসাব অনুযায়ী, মোট ঋণ— রাষ্ট্রীয় ঋণ, পরিবার, কর্পোরেশন এবং স্থানীয় সরকারের আর্থিক যানবাহন-সহ ঋণ— জিডিপির ৩০০ শতাংশের বেশি হবে,[6] যা স্পষ্টতই ভালো কিছু নয়। জাপানের উদাহরণ থেকে আমরা বলতে পারি, একটি পর্যায়ে পৌঁছনোর পর চিনা পুঁজিবাদের পক্ষে অতীতে দেখা বৃদ্ধির হার পুনরুদ্ধার করা খুব কঠিন হবে।
এদিকে, চিনে একটি বিশাল শ্রমিকশ্রেণি তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘ সময় ধরে তার জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত বৃদ্ধিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এটি একটি তরুণ, নতুন শ্রমিকশ্রেণি, তারা সংস্কারপন্থী সংগঠনগুলির প্রভাবাধীন নয়। তাদের রয়েছে মহান ইতিহাস। যখন এই শ্রেণি নড়াচড়া করতে শুরু করবে তখন বড় ধরনের বিস্ফোরণ দেখতে হবে দুনিয়াকে।
রাশিয়া
রাশিয়া অনেক দুর্বল সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। এটি চিনের তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে অনেক ছোট, তবে তারা একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষাশিল্প তৈরি করেছে এবং একটি পারমাণবিক অস্ত্রাগারের অধিকারী যা সে ইউএসএসআর থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং পরিকল্পিত অর্থনীতির পাইকারি লুটপাটের পর, রাশিয়ান শাসকশ্রেণি সমান মর্যাদায় আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের অংশ হওয়ার চেষ্টা করেছিল। এমনকি তারা ন্যাটোতে যোগদানের ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিল। কিন্তু প্রত্যাখ্যাত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের উপর সম্পূর্ণ ও অবাধ আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিল এবং তারা দুর্বল ও সংকটগ্রস্ত রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করার কোনও প্রয়োজন দেখেনি। ইয়েলৎসিন, একজন মাতাল এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পুতুল, সেই সময়ের একজন প্রতিনিধি ছিলেন।
জার্মানি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন রাশিয়ার প্রভাবক্ষেত্র হিসেবে স্বীকৃত যুগোস্লাভিয়া ভেঙে দেয় এবং ১৯৯৯ সালে সার্বিয়ার বোমা ফেলে, তখনই রাশিয়ার দুর্বলতা সামনে আসে।
রুশ পুঁজিবাদ শেষ অবধি অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরোতে পারে। তারা ন্যাটোর পূর্বদিকে এগোনোর বিরুদ্ধে চাপ দিতে শুরু করে। কারণ তা ছিল ১৯৮৯ সালে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বিরোধী। রুশ শাসকশ্রেণি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো আর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের অপমান মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না এবং শক্তি প্রদর্শন করতে শুরু করে। এই নতুন সময়কাল ভ্লাদিমির পুতিনকে উৎপন্ন করে। যে এক ধূর্ত একনায়ক। ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়ায় একটি সংক্ষিপ্ত এবং কার্যকর যুদ্ধ চালায়, ন্যাটো দ্বারা প্রশিক্ষিত এবং সজ্জিত সে-দেশের সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে। সেটা ছিল প্রথম সতর্কতা সঙ্কেত। সিরিয়া ছিল পরবর্তী। অন্যদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আপেক্ষিক দুর্বলতা প্রকাশ পায় আফগানিস্তান (আগস্ট ২০২১) থেকে তাদের অপমানজনক সেনা প্রত্যাহারের মধ্যে দিয়ে। এই ঘটনাতেও ভূমিকা পালন করেছিল রুশ শাসকশ্রেণি। ইউক্রেন যুদ্ধ আন্তর্জাতিক মঞ্চে রুশ সাম্রাজ্যবাদের শক্তিপ্রদর্শনের ক্ষেত্র এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের তৈরি অস্ত্রের প্রদর্শনী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ ছিল অনিবার্য। কারণ পশ্চিম দুনিয়া তাদের জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ মানতে অস্বীকার করেছিল। রাশিয়ার দাবি ছিল ইউক্রেনের নিরপেক্ষতা এবং ন্যাটোর পূর্বদিকে বিস্তার বন্ধ করা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ইউক্রেনে যুদ্ধ অপ্রয়োজনীয় ছিল। পাশ্চাত্যের দেশগুলি কখনওই ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যোগদান করানোর বিষয়টা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেনি কারণ তারা জানত যে সেটা রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে নিয়ে যাবে। কিন্তু তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এটা মানতে অস্বীকার করছিল, কারণ তা রাশিয়ার সামনে দুর্বলতার লক্ষণ হিসাবে দেখা হত। ২০২২ সালের এপ্রিলে, তুরস্কে ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মধ্যে আলোচনা বেশ এগিয়েছিল এবং রাশিয়ার কিছু দাবি মেনে নিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে পারত। কিন্তু অনেকেই সন্দেহ করেন, পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি কথাবার্তা মাঝপথে থামিয়ে দিতে বাধ্য করে, জেলেনস্কিকে চাপ দেয় যুদ্ধবিরতি বা ওই ধরনের কোনও চুক্তিতে স্বাক্ষর না করতে। তাঁকে বোঝানো হয়েছিল, ইউক্রেনকে বিপুল সমর্থন দিয়ে যুদ্ধে জেতানো হবে।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ভেবেছিল যে তারা রাশিয়াকে দুর্বল করতে এবং বিশ্বে তার ভূমিকাকে পঙ্গু করার অভিযানে ইউক্রেনকে রুশ কামানের গোলার খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। আমেরিকা বোঝাতে চেয়েছিল, তার কোনও মিত্রদেশকে তার কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী আক্রমণ করতে পারবে না। এর মধ্যে দিয়ে ওয়াশিংটন তাইওয়ান সম্পর্কেও চিনকে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠাতে চেয়েছিল। এক পর্যায়ে, বাইডেন, তাঁর নিজের অহঙ্কারে ফুঁসে উঠে, এমনকি মস্কোতে শাসন পরিবর্তনের ধারণাও উত্থাপন করেছিলেন![7] তারা ভেবেছিল যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক ক্লান্তি রাশিয়াকে পতনের পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
আজ ইউক্রেনে রাশিয়ার শক্তিশালী অবস্থান সকলের চোখের সামনে রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার কাঙ্ক্ষিত প্রভাব পড়েনি। রাশিয়া বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিবর্তে এখন চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। এমনকি মার্কিন প্রভাবের ক্ষেত্রের মধ্যে থাকা বেশ কয়েকটি দেশ তাকে নিষেধাজ্ঞাগুলি এড়াতে সাহায্য করেছে: ভারত, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং অন্যান্য।[8]
চিন এবং রাশিয়া এখন বিশ্বে মার্কিন আধিপত্যের বিরোধিতায় ঘনিষ্ঠ মিত্রশক্তি হয়ে উঠেছে এবং তাদের চারপাশে অন্যান্য দেশের একটি গোটা দল জড়ো করেছে। ইরানে মার্কিন পরাজয় স্পষ্ট হয়ে গেলে— যা ইতিমধ্যেই অনেকটা হয়ে গেছে— তা বিশ্ব-পরিস্থিতিতে বিশাল এবং দীর্ঘস্থায়ী পরিণতি বয়ে আনবে, যা সারা বিশ্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শক্তিকে আরও দুর্বল করে দেবে। তাইওয়ান সম্পর্কে চিন এ থেকে কী সিদ্ধান্তে আসবে তা স্পষ্ট। ভেনেজুয়েলা কিংবা ইরান কিংবা অন্য কোনও দেশে মার্কিন হামলা, দুনিয়াকে আবারও একমেরু করে তুলতে পারবে না।
চিন-রাশিয়া ঘনিষ্ঠতা
সাম্প্রতিক সময়ে চিন-রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতার যে দিকগুলি সামনে এসেছে, তা বিস্তারিত আলোচনার জন্য পৃথক নিবন্ধের প্রয়োজন। তার খুঁটিনাটি দিক নিয়ে চর্চা অনেক পাঠকের কাছে বাড়তি মনে হতে পারে। তাই দু-চার কথায় বলা দরকার, অন্যান্য ক্ষেত্র বাদে পারমাণবিক শক্তি, উত্তর মেরু অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং বড় আকারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিকাঠামোয় এই দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে। যার প্রযুক্তিগত ও দক্ষ শ্রমের দিকগুলি মূলত দেখছে রাশিয়া, চিন করছে অর্থায়ন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যবস্থা। তাছাড়া এই সব পণ্যই চিনের নিজেরও বহুল পরিমাণে প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে বেজিং বেশি বেশি করে ‘পোলার সিল্ক রোড’ ধারণার প্রচার করছে, যা তার বিস্তৃত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে উত্তর মেরু অঞ্চলের জাহাজ চলাচলের শিপিং রুটগুলিকে সংযুক্ত করবে।[9]
একই সময়, ইউরোপ নিজেই অভ্যন্তরীণ সংকটে প্রবেশ করেছে। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক উত্তেজনা ইউরোপের সংহতিকে করে তুলেছে দুর্বল।
রাশিয়ার প্রতি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইউরোপকে চাপে ফেলে দিয়েছে। সস্তা জ্বালানির অভাব সংকটে ফেলেছে তাদের শিল্পক্ষেত্রকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ একযোগে চিন-রাশিয়া সম্পর্কে কোনও একটি নির্দিষ্ট নীতি গ্রহণ করবে— তেমন পরিস্থিতি আর নেই।
এক কথায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের দ্বারা রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা তাদের প্রত্যাশিত ভূ-রাজনৈতিক ফলাফল তৈরি করেনি। পরিবর্তে, এটি রাশিয়া এবং চিনকে কেন্দ্র করে একটি ইউরেশীয় অর্থনৈতিক অক্ষের একীকরণকে ত্বরান্বিত করেছে।
কোনও সন্দেহ নেই, দুনিয়ার বাজার ধরার লড়াইয়ে চিন ক্রমেই আমেরিকাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। তবে তারা খুব শিগগির আমেরিকাকে ছাপিয়ে যাওয়ার অবস্থায় নেই। তাছাড়া, বিশ্ব-পুঁজিবাদ এখন সংকটের মধ্যে রয়েছে। চিন অনির্দিষ্টকালের জন্য সেই সংকট থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারবে না।
“অর্থনীতির ঘনীভূত রূপ হল রাজনীতি”
লেনিনের মতে, “পুঁজিবাদ যত বেশি বিকশিত হয়, কাঁচামালের ঘাটতি তত বেশি অনুভূত হয়, প্রতিযোগিতা তত বেশি তীব্র হয় এবং সারা বিশ্বে কাঁচামালের সন্ধান করা হয়।” আর যুদ্ধ হল রাজনীতির সশস্ত্র রূপ। কাঁচামালের প্রয়োজন যখন কেবল কূটনীতি, রাজনীতি ও শান্তিপূর্ণ বিনিময়ের মধ্য দিয়ে সাধিত হবে না, তখন কি চিন যুদ্ধ করবে না? এমনকি কোনও এক পর্যায়ে রুশ-চিন ব্লক কি আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে না? এই মুহূর্তে এ-প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া মুশকিল।
চিন দুনিয়া জুড়ে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে চায় এবং করে চলেছে। স্বাভাবিকভাবেই তার একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীও রয়েছে। দক্ষিণ চিন সাগরে চিনের দখলদারিত্ব নিয়ে আমেরিকানরা ক্ষুব্ধ এবং তারা এর নিন্দা করে। মার্কিন ও চিনা সামরিক জাহাজ ও বিমানের মধ্যে বেশ কয়েকটি ‘ঘনিষ্ঠ সংঘর্ষ’ হয়েছে।[10] এ কি শুধুই থিয়েটার?
২০০০ সালে সম্ভাব্য আক্রমণকারীদের প্রতিহত করতে চিনের ২৫ লক্ষ সৈন্য ছিল। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে চিন এখন শান্তিরক্ষী ও পর্যবেক্ষকদের বৃহত্তম অবদানকারী। তারা বহু দেশে সৈন্য পাঠিয়েছে।[11] এসব কি কোনও কিছুর প্রস্তুতি? চিন সম্প্রতি একটি আইন পাশ করেছে যাতে প্রথমবারের মতো তার সৈন্যদের অন্য দেশের ঘাঁটিতে মোতায়েনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তারা ঘাঁটি নির্মাণের জন্য নতুন দ্বীপও নির্মাণ করেছে।[12] শি জিনপিং চিনের ভূ-কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি সত্যিকারের সামুদ্রিক শক্তি হয়ে ওঠার জন্য সামুদ্রিক সক্ষমতা বিকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ১৭ বছর ধরে চিনে প্রতিরক্ষাব্যয় বার্ষিক প্রায় ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।[13]
আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি, তা হল প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর আপেক্ষিক শক্তিতে ভূ-তাত্ত্বিক মাত্রার এক পরিবর্তন। এবং টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ায় যেমন ভূমিকম্প হয়, সাম্রাজ্যবাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের নড়াচড়া নানা ধরনের দ্বন্দ্বকে তীব্র করে তোলে ও সংকটের সৃষ্টি করে। যা থেকে বিস্ফোরণের আকারে ফেটে পড়ে যুদ্ধ।
শেষের কথা
কানু বিনে গীত হয় না। ভারতের কথা বাদ দিয়ে ভারতীয় ভাষায় সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে লেখাও হয় না। গত কয়েক মাসে ভারতের বিদেশনীতিতে এক রোমহর্ষক ভারসাম্যের খেলা দেখতে পাচ্ছি। রাশিয়ার সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক কিছুটা দূরে ঠেলে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির পথে হেঁটেছে আমাদের দেশ। চুক্তি হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গেও। পাশাপাশি ছাড় দেওয়া হয়েছে চিনের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগেও। এই ছাড় আগামী দিনে কোনদিকে যাবে, তা নজর রাখতে হবে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, স্রেফ আমেরিকায় ভরসায় থাকাটা যে আজকের বিশ্ব-পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক, তা এ-দেশের শাসকশ্রেণি জানে। যদিও তা জেনেও তারা কতটা কী করতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
১৯২৩ সালের মার্চ মাসে লেখা লেনিনের শেষ চিঠি বেটার ফিউয়ার, বাট বেটার (সংখ্যা নয়, গুণ)-এ তিনি বলেছিলেন ভারত, চিন, রাশিয়া ইত্যাদি দেশের বিপুল জনগণের সংগ্রাম বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদের কবর রচনা করবে।[14] সময় পাল্টেছে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টায়নি। ব্রিকসের মতো গোষ্ঠীর মধ্যে দিয়ে এই তিন দেশের শাসকশ্রেণির ঐক্য যদি আগামী দিনে আমেরিকার প্রতিস্পর্ধী হয়েও ওঠে, তবুও তা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির দ্বন্দ্বের রূপ হয়েই থাকবে, জনগণের সংগ্রামী ঐক্যের বিকল্প হবে না।
[1] লেনিন। সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়। নবম অধ্যায়। প্রগতি প্রকাশন, মস্কো।
[2] Chen, James. Understanding BRICS: Brazil, Russia, India, China, South Africa & Beyond. Investopedia. Updated Oct 2, 2025.
[3] Chen, Yen-Hsiao et al. An empirical investigation on the temporal properties of China’s GDP. China Economic Review, Vol. 27. Dec 2013. p. 69-81.
[4] VIEW China sets 2026 growth target at 4.5%–5%, below last year’s pace. Reuters. Mar 5, 2026.
[5] China Government Debt to GDP. Trading Economics.
[6] China’s debt tops 300% of GDP, now 15% of global total: IIF. Investing.com.
[7] Renshaw, Jarrett & Badohal, Karol. Biden says Putin ‘cannot remain in power’ in fiery speech on Ukraine war. Reuters. Mar 27, 2022.
[8] Sullivan, Arthur. How has Russia’s economy dodged Western sanctions? DW. Feb 22, 2025.
[9] China unveils vision for ‘Polar Silk Road’ across Arctic. CNBC. Jan 26, 2018.
[10] US, China military planes come inadvertently close over South China Sea. CNBC. Feb 10, 2017.
[11] Graphics: China’s role in UN peacekeeping operations. CGTN. Sep 26, 2025.
[12] South China Sea: What’s China’s plan for its ‘Great Wall of Sand’? BBC. Jul 14, 2020.
[13] Military expenditure (% of GDP) – China. World Bank Group.
[14] Lenin, V. I. Better Fewer, But Better. Marxists.org.

