সাম্রাজ্যবাদী দ্বিচারিতা এবং ইউক্রেন আক্রমণ

সুশোভন ধর

 



সমাজকর্মী, রাজনৈতিক কর্মী

 

 

 

তেইশে ফেব্রুয়ারি রাতে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি পুতিন জানান যে তাঁরা ইউক্রেনে ‘সামরিক অভিযান’ শুরু করছেন। পুতিনের বক্তব্য যে তাঁর পড়শি দেশে এই হানার উদ্দেশ্য হল “সমরাস্ত্র ও নাৎসি-মুক্ত ইউক্রেন”। পরের দিন সকালে ইউক্রেনের তিনটি সীমান্ত এলাকায় অবস্থানরত রুশ সেনাবাহিনি এই অভিযান শুরু করে। ইউক্রেনের আকাশ বারুদের গন্ধে ভরে যায়। ঠান্ডা যুদ্ধের প্রায় ৪০ বছর পর ইউরোপ আবার উত্তপ্ত এবং দুভাগে বিভক্ত বিশ্ব। ইউক্রেনের পাশে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়াকে সমর্থন করছে চিন। অনেকে এই পরিস্থিতিকে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’-এর আগের মুহূর্ত বলে ব্যাখ্যা করছেন। এতটা এগিয়ে ভাবা কতটা সমীচীন হবে তা নিয়ে মতান্তর থাকলেও একথা ঠিক যে এই আগ্রাসন ঠান্ডা যুদ্ধের ভয়াবহ সঙ্কটের দিনগুলির কথা মনে করাচ্ছে। কোরিয়ার যুদ্ধ (১৯৫০-৫৩), কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস (১৯৬২) বা আশির দশকের মার্কিন ও সোভিয়েত মিসাইল হুমকির কথা স্মরণ করছেন অনেকেই। এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে থামবে তা সত্যিই আমরা জানি না। রাশিয়া কি ইউক্রেনের পুবদিকের রুশভাষী দুই অঞ্চল— দনেৎস্ক আর লুগানস্ক— দখল করেই ক্ষান্ত হবে নাকি গোটা দেশ দখল করে আপাতভাবে শান্ত হবে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি শুধুমাত্র নানারকমের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমিত থাকবে নাকি ইউক্রেনের তাবেদার সরকারকে বাঁচাতে তারা সামরিক পদক্ষেপ নেবে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতেই হবে। কিন্তু একথা পরিষ্কার যে এই অভিযানের মাধ্যমে পুতিন পুরনো রুশ সাম্রাজ্যের হারানো দম্ভ, যার অবসান ঘটেছিল নভেম্বর বিপ্লবের মাধ্যমে, তা ফিরিয়ে আনতে চাইছেন। তিনি মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটোকে পুবদিকে আর কোনও জমি ছাড়তে চান না তা সে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের মতামত যাই হোক না কেন।

 

পূর্বের কথা

পারস্পরিক দোষারোপ, হুমকি ও পাল্টা হুমকির জেরে বেশ কয়েকদিন ধরেই পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। উস্কানি এবং আগ বাড়িয়ে খেলার প্রচেষ্টার কোনও অভাব ছিল না। এর আগে লুগানস্ক এবং দনেৎস্ক-এর (দনবাসের এক তৃতীয়াংশ) রুশ সরকার স্বীকৃত স্বাধীন অঞ্চলগুলিতে একটি “শান্তি বাহিনি” পাঠানো হয়েছিল যার মাধ্যমে ইউক্রেনীয় জনগণকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় যে পুতিন তাঁদের মতামত ধর্তব্যের মধ্যে আনতে একেবারেই উৎসাহী নন। গত সপ্তাহে শুরু হয় রাজধানী কিয়েভ, ওডেসা, খারকিভ এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চল সহ বেশ কয়েকটি ইউক্রেনীয় শহরে বোমা হামলা। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে এবং এখনও পর্যন্ত মোট হতাহতের ঠিকঠাক সংখ্যা অনুমান করা অসম্ভব হলেও আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি যে বরাবরের মতো, যুদ্ধের মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।

এই বছরের শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন আমাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। রাশিয়া কী করতে চাইছে? তারা কেন ইউক্রেন সীমান্তে হাজার হাজার সৈন্য সমাবেশ করছে? ইউক্রেনের ওপর আক্রমণ হলে ইউরোপীয় মহাদেশ ও বাকি বিশ্বের ওপর তার কী কী প্রভাব পড়বে? এই সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য একটু অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে। ইউক্রেন এবং রাশিয়ার সরকারের মধ্যে উত্তেজনা কোনও নতুন খবর নয় এবং দুই দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য আমাদের শীতল যুদ্ধের শেষের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং ভাঙনের মধ্যে দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে যে রাজনৈতিক পরাজয় ঘটেছিল তা রাশিয়া এখনও হজম করতে পারেনি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঠান্ডা যুদ্ধের অবসান অবশ্যই দুটি শক্তির মধ্যে একটি সমঝোতার জন্ম দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানি তদানীন্তন সোভিয়েত কর্তা মিখাইল গর্বাচেভকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে ন্যাটো রাশিয়ার সীমান্তের দিকে প্রসারিত হবে না।

 

রুশ সাম্রাজ্যবাদের পুনর্জাগরণ

অতঃপর হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড এবং চেক প্রজাতন্ত্র সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার ফলে এই প্রতিশ্রুতি এক দশকও টেঁকেনি। পরবর্তীকালে, পূর্ব ইউরোপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র-বিরোধী ঢাল (anti-missile shield) বসানোর প্রচেষ্টা এবং প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলির পটপরিবর্তনে, যেমন ২০০৩ সালে জর্জিয়াতে গোলাপ বিপ্লবে এবং সর্বোপরি, তার পরের বছর ইউক্রেনের অরেঞ্জ বিপ্লবে, পশ্চিমি শক্তিগুলির মদতদান ভ্লাদিমির পুতিনের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং নিঃসন্দেহে, প্রতিবেশীদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার নানা অজুহাত তার হাতে তুলে দিয়েছিল। এই হস্তক্ষেপের ক্লাইম্যাক্স ছিল ২০০৮ সালে জর্জিয়ার দুটি বিচ্ছিন্নতাকামী অঞ্চলের স্বীকৃতি। এবং অবশ্যই, ২০১৪ সালে, ক্রিমিয়া দখল। ইউক্রেনের দক্ষিণে অবস্থিত এই উপদ্বীপ কৃষ্ণ সাগরের প্রবেশদ্বার ছাড়াও রাশিয়ার জন্য কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া রাশিয়া দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত অঞ্চল দনবাসের বিচ্ছিন্নতাকামী শক্তিগুলিকে সমর্থন জানায়। বর্তমান সামরিক আগ্রাসন অবশ্যই এই প্রহসনের সর্বশেষ অঙ্ক যার মূলে আছে প্রায় ত্রিশ বছর ধরে চলে আসা রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজ নিজ প্রভাবের ক্ষেত্র প্রসারিত করার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রচেষ্টা।

২০১৪ সালে ইউক্রেনীয় সৈন্য ও রুশ বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াইয়ের ফলে বহু রুশ ভাষাভাষী মানুষ (আনুমানিক ৯ লক্ষ) পূর্ব ইউক্রেন ছেড়ে রাশিয়ায় পলায়ন করতে বাধ্য হন। সাধারণ মানুষের এই মর্মান্তিক পরিণতি পুতিন ও তার মতাবলম্ববীদের কাছে এক বড় রাজনৈতিক পুঁজি। তার যুদ্ধবাজ সরকারি নীতির নৈতিক অজুহাত। বহু বামপন্থী এই ঘটনাগুলিকে দেখিয়ে পুতিনের পক্ষে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন যা শুধুমাত্র ভ্রান্ত নয়, বিপজ্জনকও বটে।

 

সঙ্কটের প্রধান কারিগর

বর্তমান সঙ্কটের তিন প্রধান পাণ্ডা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেন। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো ব্লক, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ১৯৪৫ সালের পর পৃথিবীতে প্রায় সমস্ত আগ্রাসন, যুদ্ধ এবং যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী। ন্যাটো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সবচেয়ে আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী ব্লক যা গত বিশ বছর বা তারও বেশি সময়ে সরাসরি তিনটি বড় ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরু করেছিল আফগানিস্তান (২০০১), ইরাক (২০০৩) ও লিবিয়ায় (২০১১)। এই সামরিক জোট এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রুশ এবং চিনা সাম্রাজ্যবাদের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হিসাবে নিজেকে যতই তুলে ধরার চেষ্টা করুক আমরা বার বার তাদের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ইতিহাসের সাক্ষী। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও অন্যান্য বহু জায়গায়। তারা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব নিয়ে নীতিকথা শোনাতে ব্যস্ত কিন্তু পাকিস্তানে হাজার হাজার নাগরিককে হত্যা করার জন্য ড্রোন ব্যবহার করতে দ্বিধাবোধ করেনি। তুরস্কের এরদোগানের সরকার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে উত্তর সিরিয়া আক্রমণ করে সমস্ত অঞ্চল দখল করলে ন্যাটো তার সেই কাজে মদত দেয় কারণ তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং পশ্চিমি ব্লকের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তারা মনে করে যে বিশ্বের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা রক্ষার্থে অন্য দেশ দখল করা তাদেরই পবিত্র কর্তব্য। ইসলামি থিওক্রেসি ও অগণতান্ত্রিকতার পীঠস্থান সৌদি আরব ন্যাটোর ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র। তাই সৌদি রাজপরিবার ইয়েমেনের ওপর নৃশংস আক্রমণ চালিয়ে পার পেয়ে গেছিল। এক্ষেত্রে গণতন্ত্র বা সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের কোনও মাথাব্যথা নজরে পড়েনি।

ন্যাটো পুতিনের সম্প্রসারণবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে থামানোর জন্য এই মুহূর্তে উদগ্রীব কিন্তু নিজেরা ১৯৯১-এর পরবর্তী সময়ে পূর্ব ইউরোপকে গিলে খেয়েছে এবং ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের একটি ঘাঁটিতে পরিণত করতে চেষ্টার কোন কসুর করে নি।  ইউক্রেন সরকারকে উসকানি দিয়ে ন্যাটো ব্লক ইচ্ছাকৃতভাবে রাশিয়ার সঙ্গে বিরোধকে কয়েক বছর ধরে ইন্ধন দিয়েছে যাতে তাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে পুতিন একতরফাভাবে ইউক্রেন আক্রমণ করে পূর্ব ইউরোপে নিজের অবস্থান দুর্বল করে।

এই সংঘাতের অন্যপক্ষ, রাশিয়ার পুতিন-রাজ আসলে একটি বোনাপার্টিস্ট গোষ্ঠী (অলিগার্কি) শাসন। মাফিয়ার মতো কিছু গোষ্ঠী আজ রাশিয়াকে চালায় যারা ১৯৯১ পরবর্তী সময়ে গ্যাংস্টারদের কায়দায় পরিকল্পিত সোভিয়েত অর্থনীতির ধ্বংসসাধন ও লুঠপাট চালিয়ে নিজেদের পকেট ভরেছে। এদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাশিয়ার জনগণের জীবনযাত্রার মান এমন এক তলানিতে ঠেকেছে যা তিন দশক আগে রুশদেশে দুঃস্বপ্নেও ভাবা যেত না। কতিপয় বিলিয়নেয়ারের মৃগয়াভুমি আজকের রাশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে অসম সমাজ, যেখানে বড়লোক আর গরিবের মধ্যে আয় এবং সম্পদের বৈষম্য চরমতম। এছাড়া রাশিয়ায় কারাবাসের হার, আত্মহত্যার হার এবং খুনের হার রেকর্ডছোঁয়া। একদিকে যখন কয়েক লক্ষ শিশু রাস্তায় রাস্তায় গৃহহীন জীবনযাপন করে, তখন পৃথিবীর অন্যতম ধনী ব্যক্তি, পুতিন, একটি এক বিলিয়ন ইউরোরও বেশি দামী মার্বেল এবং সোনার মোড়ানো নতুন প্রাসাদে বাস করেন। এই বিলিয়নেয়ার একনায়কতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় আদর্শ হল উগ্র-জাতীয়তাবাদ, অর্থোডক্স চার্চের প্রতি ধর্মীয় সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধা, এবং নারী ও সমকামীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা সহ প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ-আধুনিকতা বিরোধিতার মিশ্রণ। পুতিন বলশেভিকদের শয়তান বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং শেষ জারের প্রতি সম্মান জানিয়ে গির্জায় হাঁটু গেড়ে প্রার্থনায় বসেছিলেন। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে, পুতিন পিনোচেতের শাসনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন এবং ঘোষণা করেছিলেন যে পুঁজিবাদ চাপিয়ে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক হিংসা ভালো এবং সঠিক, ও পুঁজিবাদকে ধ্বংস করার জন্য যে কোনও রাজনৈতিক উদ্যোগ খারাপ এবং পাপমূলক।

যেহেতু পরম শক্তিশালী এবং সামগ্রিকভাবে বহুগুণ আক্রমণাত্মক ন্যাটোর তুলনায় রাশিয়া অনেক দুর্বল পক্ষ সেহেতু এই সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতায় তারা বেশ পিছিয়ে পড়েছে যার পরিণতিতে রুশ প্রভাবাধীন ক্ষেত্রগুলি ১৯৯১ থেকে থেকে ক্রমাগত সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে। পুরনো সম্মান পুনরুদ্ধার করতে তার প্রয়োজন কিছু সীমিত ও ছোট সাফল্য— যেমন চেচনিয়া দখল, ন্যাটো ব্লকে যোগদানকারী জর্জিয়ার কিছু মাথাকে ধরে রাখা, ন্যাটোর দিকে ঝুঁকে থাকা দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ইউক্রেনে নিজের প্রভাব বিস্তার এবং আসাদকে সমর্থনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত একটি আউটপোস্ট ধরে রাখা ইত্যাদি। এই সঙ্কটে, পুতিন সম্ভবত যুদ্ধের হুমকি দিয়ে ন্যাটো ব্লকের সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্ক শিথিল করতে চেয়েছিলেন। যখন তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয় এবং মার্কিনিরা স্পষ্টতই রাশিয়াকে সামান্যতম প্রতীকী ছাড়গুলিও দিতে অস্বীকার করে, তখন পুতিন বেপরোয়া হয়ে ইউক্রেন দখল করতে নগ্ন সামরিক শক্তি ব্যবহার করার পথ বেছে নেন। এই উগ্র-জাতীয়তাবাদী আগ্রাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য স্বদেশে তার বোনাপার্টিস্ট শাসনের জনপ্রিয়তা এবং স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করা।

এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে চলছে। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ব্যারেল প্রতি ১০৬ ডলার যা একবছর আগেও ছিল এর অর্ধেক। ২০১৪ সালের পূর্বতন সঙ্কটের পরে তেলের দাম এই পরিমাণ বাড়েনি। যুদ্ধ আরও কিছুদিন চললে এই মূল্য ১৫০ ডলারও পার করে যেতে পারে। এছাড়া গোটা ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এই মুহূর্তে গ্যাসের দাম মেগাওয়াট আওয়ার প্রতি ১৪২ ইউরো ছুঁয়েছে, যা একবছর আগে ছিল ১৬ ইউরো। ঠিক এই মূল্যবৃদ্ধির ওপর পুতিন বাজি ধরেছেন। তিনি জানেন যে যুদ্ধ এবং রাশিয়ার ওপর নানারকমের নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। এর ফলে একধরনের জ্বালানি সঙ্কট ঘনীভূত হবে যা মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির কারণ হবে। মাথায় রাখা ভালো যে বর্তমানে বিশ্ব-অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির হার এমনিতেই একটু বেশি। পুতিন জানেন যে তাঁর কৃতকর্ম বিশ্ব-অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারলে পশ্চিমি কেষ্টবিষ্টুরা তাঁর বিরুদ্ধে কোনও বড়সড় পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বেশ কয়েকবার ভাববেন।

এই নাটকের রঙ্গমঞ্চ ইউক্রেন ২০১৪ সাল থেকে ন্যাটো ব্লকের করদ রাজ্য হয়ে উঠেছে এবং পশ্চিমি সমর্থনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক উস্কানি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই নতুন ইউক্রেনে নয়া-নাৎসিদের গভীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে যেখানে সেনাবাহিনির ফ্যাসিবাদী ব্যাটালিয়নগুলি প্রকাশ্যে স্বস্তিকা পতাকা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। নাৎসিদের সহযোগী স্তেপান বান্দেরা, যার কমিউনিস্ট-বিরোধী মিলিশিয়ারা হলোকাস্টে জড়িত ছিল, কার্যত কিয়েভের একজন রাষ্ট্রীয় সন্ত। ইউক্রেন সরকার তুলনামূলকভাবে কমজোরি এবং ব্যর্থ রুশ সাম্রাজ্যবাদী লুঠেরাদের প্রভাবে ফিরে আসার পরিবর্তে শক্তিশালী ও সফল সাম্রাজ্যবাদী ডাকাতদের তল্পিবাহক হওয়ার জন্য ন্যাটো ব্লকের পূর্ণ সদস্যপদ পেতে ওয়াশিংটন এবং ব্রাসেলস-এর পায়ে পড়ে আছে। ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর সঙ্গে রাশিয়ার বেশ মিল আছে। দেশটি কয়েক ডজন গোষ্ঠীর (oligarch clan) ক্রীড়ানক যারা পরিকল্পিত সোভিয়েত অর্থনীতির লুণ্ঠনের মাধ্যমে ফুলেফেঁপে উঠেছে। একদা সমৃদ্ধিশালী এই অঞ্চলের মাথাপিছু জিডিপি আফ্রিকার অ্যাঙ্গোলার সমান। পশ্চিমি এবং রাশিয়ান উভয় মিডিয়াই ইউক্রেনের শাসক গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলিকে পশ্চিমপন্থী বনাম রুশপন্থী লেবেল দিয়ে থাকেন। বস্তুত এই দ্বন্দ্বগুলি হল সেদেশের বিলিয়নেয়ারদের মধ্যে বিরোধ যার একদল বিশ্বাস করে যে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রাশিয়ার পদলেহনে সুনিশ্চিত হবে এবং আরেকদল একই কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রসাদ পেতে আগ্রহী।

 

নতুন ঠান্ডা যুদ্ধ?

এই সমস্ত ঘটনাগুলি কি আমাদের আবার ঠান্ডা যুদ্ধের যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে? প্রথমেই মাথায় রাখতে হবে যে ঠান্ডা যুদ্ধের কূটনৈতিক ও সামরিক ছলাকলার সঙ্গে বহু মিল থাকলেও ঠান্ডা যুদ্ধের অন্যতম মৌলিক উপাদান— মতাদর্শ পার্থক্য— আজ আর বিদ্যমান নয়। আরও খারাপ বিষয় হল, আজকের রাশিয়া পরমাগ্রহে বিশ্বায়িত এই নিয়ন্ত্রণমুক্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অঙ্গ। এর ফলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বগুলি রাশিয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তার জাতীয় সীমানার বাইরে নতুন নতুন বাজার এবং কাঁচামালের সোর্স প্রয়োজন। এই সম্প্রসারণ ঘটাতে গেলে তার সঙ্গে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সংঘাত অবশ্যম্ভাবী। আমরা জানি যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে ভৌগোলিক অঞ্চলে উদ্বৃত্ত পুঁজি জন্ম নেবে এবং স্বাভাবিকভাবে সেই পুঁজির বিনিয়োগের জন্য নয়া অঞ্চলের সন্ধান করা হবে। এর ফলে অনিবার্যভাবে অন্যান্য অঞ্চলের ওপর প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজনৈতিক সংঘাতের সৃষ্টি হবে। এই মুহূর্তে আমরা দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সংঘাতে রাশিয়ার সেই ভূমিকাই দেখছি যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চালিয়ে এসেছে— সরাসরি অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ। ইউক্রেন এবং জর্জিয়া ছাড়াও, সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের পক্ষে রাশিয়ার সমর্থন স্বাভাবিকভাবে গত কয়েক দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদতপুষ্ট ও সৃষ্ট বিভিন্ন স্বৈরাচারী শক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়— ইরান, চিলি, ব্রাজিল, নিকারাগুয়া, হাইতি, কঙ্গো, ইরাক, ইত্যাদি।

 

একটি বর্বোরচিত আক্রমণ

ইউক্রেনে ভ্লাদিমির পুতিনের আক্রমণ একটি বর্বরোচিত অপরাধ যা শুধুমাত্র ইউক্রেন এবং রাশিয়ার জনগণের জন্য নয়, সমগ্র ইউরোপের শ্রমিকশ্রেণি এবং বামপন্থীদের জন্যেও মারাত্মক নেতিবাচক। হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ এই যুদ্ধে হতাহত হবেন। পুতিনের পূর্বসূরি বরিস ইয়েলতসিনের নির্দেশে ১৯৯৪-৯৫ সালে রাশিয়ার হাতে চেচনিয়ার গ্রোজনি শহর ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে রাশিয়ান সামরিক-পুঁজিবাদী এলিটদের মানবতাবিরোধী চরিত্র প্রদর্শিত হয়েছিল। এই নৃশংসতা পুতিনের হাতে কতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে তা আমরা সিরিয়ার ওপর ২০১৫-১৭ সালে রুশ বিমান হানায় টের পেয়েছি। দেড় হাজারের মতো অসামরিক নিরপরাধ মানুষ সেই আক্রমণে মারা গেছিলেন।

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ ইউরোপে এবং তার বাইরেও সামরিকবাদ এবং প্রতিক্রিয়ার শক্তিকে ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করবে। এমনকি সমস্ত পশ্চিমি শক্তিগুলি তাদের স্ব স্ব অস্ত্রবাজেট বৃদ্ধি করবে। রাশিয়ার শ্রমিকরা পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার ফলে কঠোরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। রাশিয়া থেকে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার ফলে ইউরোপ এবং অন্যত্র সাধারণ মানুষ জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

অন্যদিকে আমারা দেখেছি যে ন্যাটোর পূবদিকে সম্প্রসারণ এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাগুলি ততটাই অকার্যকর এবং বিপজ্জনক। ইউক্রেন নিয়ে সংঘাতে কোনও সামরিক সমাধান নেই বরং তার ফলে এই অঞ্চল দাউদাউ করে জ্বলতে পারে যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমরা আর দেখতে পাইনি। কোনওরকম পারমাণবিক সংঘাতের কথাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না যার প্রভাব ও ফলফল হবে সুদূরপ্রসারী। এই নির্মম ও নির্দয় যুদ্ধের একমাত্র ভুক্তভোগী কেবলমাত্র ইউক্রেন, রাশিয়া বা ইউরোপের মানুষ নয়, সমগ্র মানবতা।

অতএব পুতিনের রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যে সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে তার নিন্দা করতেই হবে। এই লড়াইয়ে কোনও এক পক্ষ নেওয়া অযৌক্তিক এবং বিপজ্জনক। একইসঙ্গে ন্যাটো বজায় রাখার এবং তা প্রসারিত করার নীতির বিরুদ্ধেও আওয়াজ তুলতে হবে। রাশিয়ান হৃত সাম্রাজ্য উদ্ধারের কুযুক্তির মতোই, ন্যাটোর অস্তিত্ব মানবতার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচায়ক।

কমেডিয়ান থেকে রাষ্ট্রপতি বনে যাওয়া ভ্লদিমির জেলেন্সকি ইউক্রেনে অতি-দক্ষিণপন্থার প্রতীক ও অন্যতম বড় মাথা। ক্ষমতায় আসার পর অন্যান্য দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক অপরাধ ছাড়াও তার উদ্দেশ্য ছিল সরকারি সম্পত্তি জলের দরে ইউক্রেনীয় অলিগার্কির হাতে তুলে দেওয়া। তার জনবিরোধী শাসনের বিরুদ্ধে সেদেশের বামপন্থী ও সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভ ছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে পুতিনের এই অনৈতিক আক্রমণ তাঁকে দেশবাসী ও পশ্চিমি দুনিয়ার জনগণের কাছে অতি দ্রুত হিরো বানিয়ে তুলল। অতএব ইউক্রেনীয় সোশ্যালিস্টের মতো সেই সমস্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলিকে আমাদের সমর্থন করা প্রয়োজন যারা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য পুতিনের বিরুদ্ধে, তাঁদের নিজের দেশের অগণতান্ত্রিক সরকার এবং লুঠেরা মাফিয়া অলিগার্কির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা অবজ্ঞা করে এবং গ্রেপ্তারির ভয় সত্ত্বেও রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে হাজারে হাজারে মানুষ এই যুদ্ধের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন। বৃহস্পতিবার রাতে সেন্ট পিটার্সবুর্গে শত শত মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন, জনতা স্লোগান দেয় ‘যুদ্ধ নয়!’। অনেক রাশিয়ানের সঙ্গেই ইউক্রেনীয়দের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে যেমন আছে সীমান্তের ওপারে পরিবারিক সম্পর্ক। বিক্ষোভের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং কঠোর শাস্তির হুমকি সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত ৪৪টি শহরে বিক্ষোভ দেখা গেছে। মস্কোয় বহু মানুষ বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে পুলিশের হাতে মার খেয়েছেন ও গ্রেফতার হয়েছেন। বিক্ষোভ চলাকালীন এখনও পর্যন্ত ১৭০০ জনেরও বেশি লোককে আটক করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করতে অতিমারিকে ঢাল করেছে কিন্তু মানুষকে আটকানো যায়নি। ২০১৪ সালের মতো রাশিয়ায় এই মুহূর্তে দেশভক্তির খুব একটা হাওয়া নেই। সমাজের একাংশ স্পষ্টতই ইউক্রেনের সঙ্গে এই যুদ্ধের সম্পূর্ণ বিরোধী এবং এক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিশ্বাস করেন যে যুদ্ধ অচিরে শেষ হবে এবং শান্তি পুনরধিষ্ঠিত হবে। রাস্তায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভরত মানুষগুলিই আমাদের সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করছেন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির তীব্র নিন্দা, ইউক্রেন আক্রমণের বিরোধিতা করার সঙ্গে সঙ্গে এই মানুষগুলির প্রতি সহমর্মিতা আজ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4007 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...