সুশোভন ধর
ইউরোপের বাস্তবতা কেবল শাসকমহলের নীতি দিয়ে নির্ধারিত হবে না। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি দেখাচ্ছে যে ইউরোপের ভেতরেই শক্তিশালী রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। ইরানের উপর আক্রমণের প্রশ্নে স্পেনের সরকার প্রকাশ্যে ইজরায়েলের সমালোচনা করেছে। ইতালির কিছু বন্দর শহরে ডকশ্রমিকরা ইজরায়েলমুখী অস্ত্রবাহী জাহাজ খালাস করতে অস্বীকার করেছেন। ইউরোপের বিভিন্ন শহরে লক্ষ লক্ষ মানুষের অংশগ্রহণে যুদ্ধবিরোধী এবং প্যালেস্তাইনপন্থী বিক্ষোভ হয়েছে। এই ঘটনাগুলি দেখিয়ে দেয় যে ইউরোপের রাজনৈতিক বাস্তবতা একরৈখিক নয়। একদিকে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের স্তরে সামরিকীকরণ এবং নিরাপত্তা রাজনীতি জোরদার হচ্ছে, অন্যদিকে সমাজের ভেতরে যুদ্ধবিরোধী এবং মানবাধিকারপন্থী শক্তিও সক্রিয় রয়েছে
মার্কিন দেশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় ইনিংস ইউরোপের রাজনীতিতে এক নতুন অস্থিরতার মুহূর্ত তৈরি করেছে। অবশ্য এই অস্থিরতার উৎস শুধু ট্রাম্প নন। বরং ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন ইউরোপের দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংকটকে আরও স্পষ্ট করে সামনে এনে দিয়েছে। গত তিন দশক ধরে ইউরোপীয় রাজনীতি যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল প্রধান সামরিক শক্তি এবং ইউরোপ ছিল তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর এই ব্যবস্থাকে অনেকেই “উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা” বলে অভিহিত করেছিলেন।
এই ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার সম্প্রসারণ ঘটায়। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি একের পর এক ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়। ইউরোপীয় শাসক মহল মনে করেছিল যে বাজার অর্থনীতি, মুক্তবাণিজ্য এবং রাজনৈতিক সংহতির ভিত্তিতে ইউরোপ একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে। কিন্তু ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট, তার পরবর্তী ব্যয়-সঙ্কোচন নীতি এবং সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন এই প্রকল্পের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর ইউরোপীয় রাজনীতিতে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যেই আজকের চরম দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান ঘটেছে।
ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ট্রাম্পের রাজনীতি শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রশ্ন নয়; তা এখন ইউরোপীয় তথা বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। বাণিজ্যনীতি থেকে শুরু করে সামরিক কৌশল, এমনকি ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি প্রভাব ফেলতে চাইছে।
একদিকে ট্রাম্প ন্যাটো জোটকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন এবং ইউরোপীয় দেশগুলিকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্য চাপ দিয়েছেন। অন্যদিকে ইউরোপের চরম দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলির প্রতি তাঁর প্রশাসনের সহানুভূতি ইউরোপীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের শাসকমহল এক ধরনের দ্বৈত সংকটে পড়েছে। একদিকে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, কারণ সামরিকভাবে ইউরোপ এখনও অনেকাংশে ন্যাটোর ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে তারা বুঝতে পারছে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভারসাম্য দ্রুত বদলাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের মধ্যে ইউরোপীয় রাজনীতিতে তিনটি বড় প্রবণতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথমত, ইউরোপের সামরিকীকরণ দ্রুত বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, চরম দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিচ্ছে। তৃতীয়ত, ইউরোপীয় বামপন্থা এখনও এই নতুন বাস্তবতার মোকাবিলায় একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশল গড়ে তুলতে পারেনি।
মিউনিখ সম্মেলন: ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের নতুন ভাষা
এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় সাম্প্রতিক মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে। সেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বক্তব্য[1] শুধু একটি কূটনৈতিক বিবৃতি ছিল না; বরং তা ট্রাম্প প্রশাসনের ইউরোপ সম্পর্কে নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্ট করে দেয়।
রুবিও তাঁর বক্তব্যে বারবার “পশ্চিমি সভ্যতা”, “সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস” এবং অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। এই ভাষা কেবল নিরাপত্তা নীতির ভাষা নয়; এটি সেই মতাদর্শিক কাঠামোর অংশ, যা ট্রাম্পপন্থী রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে মূলত একটি সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত সংঘাতের আকারে দেখে। যেখানে অভিবাসন, বহুসংস্কৃতিবাদ এবং উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়।
এই বক্তব্য ইউরোপীয় রাজনীতিতে ইতিমধ্যেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক ভাষ্যর সঙ্গে সহজেই মিলে যায়। ইউরোপের বহু চরম দক্ষিণপন্থী দল দীর্ঘদিন ধরেই “ইউরোপীয় সভ্যতা রক্ষা” এবং অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিকে তাদের প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ট্রাম্পের রাজনীতি তাদের আন্তর্জাতিক বৈধতা তৈরি করতে সাহায্য করে।
কিন্তু রুবিওর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ক্ষমতার প্রশ্ন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এখন একটি নতুন পর্যায় শুরু হয়েছে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে এবং ইউরোপের কাছ থেকেও একই ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিশ্রুতি প্রত্যাশা করবে।
এই বক্তব্য ইউরোপীয় নেতৃত্বের কাছে একটি দ্বৈত সঙ্কেত পাঠায়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইউরোপের প্রধান সামরিক মিত্র; অন্যদিকে সেই সম্পর্কের ভেতরেই এখন নতুন ধরনের চাপ ও প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।
অতএব মিউনিখ সম্মেলন কেবল একটি কূটনৈতিক ঘটনা নয়। তা ইঙ্গিত করে “পশ্চিমি ঐক্য”-র ধারণা এখনও উচ্চারিত হলেও তার ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন ধরনের দ্বন্দ্ব ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ট্রাম্প–ইউরোপ সম্পর্কের ভূরাজনীতি: চাপ, প্রতিযোগিতা ও বিভাজন
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইউরোপনীতি বোঝার জন্য তাকে কেবল একজন অস্বাভাবিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং তার নীতিকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। গত কয়েক দশক ধরে ইউরোপ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে স্থিতিশীল মিত্র। ন্যাটো জোট, সামরিক ঘাঁটি এবং রাজনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই সম্পর্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই সম্পর্কের চরিত্র বদলাতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছে যে ইউরোপীয় দেশগুলি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে নিজেদের নিরাপত্তা-ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম রেখেছে। ট্রাম্প এই যুক্তিকেই রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেন। তিনি বারবার বলেছেন যে ন্যাটোর ভেতরে যুক্তরাষ্ট্র “অন্যদের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত মূল্য দিচ্ছে” এবং ইউরোপীয় দেশগুলিকে নিজেদের প্রতিরক্ষা-ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।
এই চাপের পেছনে কেবল অর্থনৈতিক যুক্তি নয়, কৌশলগত কারণও রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ক্রমশ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে ও চিনের উত্থানকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর আরও বেশি দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া মার্কিন কৌশলের অংশ।
এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব পড়ছে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি ক্রমশ নিরাপত্তা ও শক্তির প্রশ্নে নির্ধারিত হয়, তখন জাতীয়তাবাদী এবং কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক ভাষা সহজেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইউরোপের বহু দক্ষিণপন্থী দল ইতিমধ্যেই এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাচ্ছে। তারা নিরাপত্তা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নকে সামনে এনে রাজনৈতিক সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ট্রাম্প ও আন্তর্জাতিক দক্ষিণপন্থার জোট
ট্রাম্পের রাজনীতিকে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বিশেষ পর্ব হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়ে না। গত এক দশকে ট্রাম্প নিজেকে ধীরে ধীরে এমন একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবাহের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা শুধু আমেরিকাতেই নয়, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশে চরম দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে উৎসাহ দিয়েছে। এই প্রবাহের মূল সুর হল জাতীয়তাবাদ, অভিবাসনবিরোধিতা, বহুসাংস্কৃতিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং তথাকথিত “পশ্চিমি সভ্যতা” রক্ষার রাজনীতি।
ইউরোপে এই ভাষা নতুন নয়। কিন্তু ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থান এই প্রবণতাকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান, ইতালির জর্জিয়া মেলোনি, ফ্রান্সের মারিন লে পেন, জার্মানির AfD কিংবা স্পেনের ভক্স— যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন প্রকাশ্যে ইউরোপীয় দক্ষিণপন্থী দলগুলির প্রতি সহানুভূতি দেখায় বা তাদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেয়, তখন তা ইউরোপীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠায়। এতে এই দলগুলির রাজনৈতিক বৈধতা বাড়ে এবং মূলধারার রাজনীতির ওপর চাপ তৈরি হয়।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ট্রাম্পের রাজনীতি ইউরোপীয় দক্ষিণপন্থাকে শুধু মতাদর্শগত সমর্থনই দেয় না; তা ইউরোপের ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজনও বাড়ায়। যখন ইউরোপীয় রাজনীতিতে এই ধরনের শক্তি ক্রমশ শক্তিশালী হয়, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের নতুন অবকাঠামো। গত কয়েক বছরে দেখা গেছে যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন, রাজনৈতিক মঞ্চ এবং মিডিয়া নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইউরোপ, আমেরিকা এবং লাতিন আমেরিকার দক্ষিণপন্থী নেতারা ক্রমশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। এই মঞ্চগুলিতে রাজনৈতিক কৌশল, প্রচারপদ্ধতি এবং সংগঠনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া হচ্ছে।[2]
ইউরোপের সামরিকীকরণ: ন্যাটো, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং প্রতিরক্ষাশিল্প
বর্তমান ইউরোপীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল দ্রুত বাড়তে থাকা সামরিকীকরণ। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইউরোপের বহু দেশ তাদের প্রতিরক্ষা-ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। কিন্তু এই প্রবণতাকে কেবল ইউক্রেন যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ন্যাটো জোটের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্যের পুনর্গঠন।
ট্রাম্পের রাজনীতির একটি বড় প্রভাব পড়েছে এই ক্ষেত্রেই। এই সামরিক পুনর্গঠনের পেছনে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের পরিবর্তনও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপ ইউরোপীয় দেশগুলিকে প্রতিরক্ষাব্যয় বাড়াতে বাধ্য করছে। ট্রাম্পের এই চাপ ইউরোপীয় শাসকমহলের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। একদিকে তারা মার্কিন নিরাপত্তা-ছাতার ওপর নির্ভরতা বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে এটাও তারা বোঝে যে মার্কিন নীতির পরিবর্তনের ফলে ইউরোপকে নিজের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতেই হবে।
এই প্রেক্ষাপটে জার্মানির ঘোষিত Zeitenwende[3]— অর্থাৎ নিরাপত্তানীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন— বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘদিন ধরে জার্মানি সামরিক প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর বার্লিন প্রতিরক্ষা-ব্যয়ে বড়সড় বৃদ্ধি ঘোষণা করে এবং সামরিক আধুনিকীকরণের দিকে দ্রুত এগোতে শুরু করে। এই সিদ্ধান্ত শুধু জার্মানির জন্য নয়, পুরো ইউরোপীয় রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিরক্ষাশিল্পকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা তহবিল, যৌথ অস্ত্র উৎপাদন প্রকল্প এবং সামরিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ— এই সব উদ্যোগের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ইউরোপীয় প্রতিরক্ষাশিল্প গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।[4] বহু ইউরোপীয় নীতিনির্ধারক মনে করেন যে ভবিষ্যতে ইউরোপকে একটি “কৌশলগত শক্তি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে এই ধরনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অপরিহার্য।
অবশ্য ইউরোপীয় নেতারা প্রায়ই “কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন”-এর কথা বললেও বাস্তবে ইউরোপের সামরিক সম্প্রসারণ এখনও অনেকাংশে মার্কিন অস্ত্রশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপের বহু দেশ আধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তি মার্কিন কোম্পানির কাছ থেকেই কিনছে।[5] ফলে ইউরোপের সামরিকীকরণ একদিকে স্বনির্ভরতার কথা বললেও অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষাশিল্পের ওপর নির্ভরতাকেই আরও দৃঢ় করছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ এই দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলি ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সহায়তা দিয়েছে এবং একই সঙ্গে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছে। এতে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষাশিল্প নতুন বাজার এবং নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এখন শুধু নিরাপত্তানীতির প্রশ্ন নয়; এটি ইউরোপীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও পরিণত হচ্ছে।
কিন্তু এই সামরিকীকরণের রাজনৈতিক প্রভাবও কম নয়। প্রতিরক্ষাব্যয় বৃদ্ধির অর্থ প্রায়শই সামাজিক খাতে ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হওয়া। আবার নিরাপত্তার প্রশ্নকে রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসা মানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ানো এবং নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নকে তুলনামূলকভাবে পিছনে ঠেলে দেওয়া।
এই কারণেই ইউরোপের ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণকে শুধু আন্তর্জাতিক নিরাপত্তানীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি ইউরোপীয় রাজনীতির ভেতরে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ— যেখানে অর্থনীতি, ভূরাজনীতি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো নতুনভাবে পুনর্গঠিত হচ্ছে।
ইউরোপীয় প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা: বাজার, ব্যয়সঙ্কোচ নীতি এবং সীমান্ত রাজনীতি
ইউরোপের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটকে বোঝার জন্য কেবল সাম্প্রতিক ঘটনাবলির দিকে তাকালেই চলবে না; তাকাতে হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাঠামোর দিকে। ইউরোপীয় সংহতির প্রকল্প শুরু থেকেই মূলত অর্থনৈতিক সংহতির প্রকল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি একটি অভিন্ন বাজার গড়ে তোলার পথে হাঁটে— যেখানে পুঁজি, পণ্য এবং পরিষেবার অবাধ চলাচলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
এই অর্থনৈতিক সংহতি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপ নিলেও এর কেন্দ্রে ছিল বাজারভিত্তিক অর্থনীতি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন চুক্তি— বিশেষত মাস্ট্রিখ্ট চুক্তি— রাষ্ট্রগুলির বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ঋণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।[6] এর ফলে সদস্য দেশগুলির অর্থনৈতিক নীতির পরিসর অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইউরোজোনের দেশগুলির ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা আরও বেশি। কারণ তারা নিজস্ব মুদ্রানীতি ব্যবহার করার সুযোগও হারিয়েছে।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এই কাঠামোর দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দেয়। সংকটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে নীতি গ্রহণ করে তা মূলত ব্যয়সঙ্কোচ নীতি বা austerity— অর্থাৎ সরকারি ব্যয় কমানো, সামাজিক পরিষেবায় কাটছাঁট এবং শ্রমবাজারকে আরও নমনীয় করা। গ্রিস, স্পেন, পর্তুগাল কিংবা ইতালির মতো দেশগুলিতে এই নীতির প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। বেকারত্ব বেড়েছে, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে এবং বহু মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। বহু নাগরিকের কাছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্রমশ এমন একটি কাঠামো হিসেবে দেখা দিতে শুরু করে, যা অর্থনৈতিক সংকটের সময় সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিবর্তে আর্থিক বাজার ও বড় কর্পোরেশনের স্বার্থ রক্ষা করে। এই উপলব্ধি ইউরোপীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয় এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি অসন্তোষ বাড়ায়।
রাত-দিন চব্বিশ ঘন্টা বিরামহীন চলে আদমজি, সাইরেনের শব্দে শিফট ধরে হাজার হাজার শ্রমিক সচল রাখে মিলের চাকা। সেই চাকা যে কোনও মূল্যে সচল রাখতে চায় এরশাদের সামরিক সরকার। দেখাতে চায়, স্বাভাবিকভাবে চলছে দেশ। আর শ্রমিকদের লক্ষ্য সেই চাকা থামিয়ে দেওয়া। আদমজির শ্রমিকেরা পারবে কিনা পার্টির একজন নেতা জানতে চেয়েছিলেন। তাজুল নিঃসন্দেহ ছিলেন। বলেছিলেন, হবে, তাঁর জীবনের বিনিময়ে হলেও।
ইউরোপের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট কেবল সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাতের ফল নয়। বরং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই এমন কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষকে বাড়িয়ে তুলেছে। এই সীমাবদ্ধতাগুলি মোকাবিলা না করলে ইউরোপীয় রাজনীতির সংকট আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
অভিবাসন, সীমান্ত এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা রাষ্ট্রের উত্থান
ইউরোপের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে— অভিবাসন। গত এক দশকে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন সংঘাত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ ইউরোপে আশ্রয়ের সন্ধানে এসেছে। কিন্তু এই মানবিক সংকটকে ইউরোপীয় রাজনীতিতে ক্রমশ নিরাপত্তা এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে রূপান্তরিত হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক ভাষ্যে অভিবাসনকে প্রায়শই “ব্যবস্থাপনার সমস্যা” হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এই নীতির কেন্দ্রে রয়েছে সীমান্ত কঠোর করা এবং অভিবাসন প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান হল Frontex— ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা— যার ক্ষমতা এবং বাজেট গত দশকে দ্রুত বেড়েছে।[7]
ফ্রন্টেক্স-এর বিস্তার ইউরোপীয় রাষ্ট্রকাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ আনে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এখন আর কেবল পৃথক জাতীয় রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি ক্রমশ একটি অতিরাষ্ট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে। ভূমধ্যসাগরে নজরদারি, সীমান্তে যৌথ অভিযান এবং প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে অভিবাসনপ্রবাহকে ইউরোপের বাইরে আটকে রাখার চেষ্টা— এই সবকিছু মিলিয়ে ইউরোপীয় সীমান্তনীতি একটি বিস্তৃত নিরাপত্তাব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
অভিবাসন প্রশ্নকে নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করার ফলে ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক ধরনের স্থায়ী সংকটের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলি এই পরিস্থিতিকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছে। তারা অভিবাসনকে কেবল অর্থনৈতিক বা মানবিক প্রশ্ন হিসেবে নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত হুমকি হিসেবে তুলে ধরছে।
এই ভাষা ইউরোপীয় রাজনীতিতে দ্রুত প্রভাব ফেলেছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে মূলধারার দক্ষিণপন্থী এবং এমনকি কিছু মধ্যপন্থী দলও অভিবাসন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে শুরু করেছে। ফলে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ক্রমশ সীমান্ত, নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নে স্থানান্তরিত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে এই প্রশ্নটির মোকাবিলা কীভাবে করা হয় তার ওপর। কারণ অভিবাসন প্রশ্নটি কেবল সীমান্তের নয়; এটি অর্থনীতি, যুদ্ধ, বৈশ্বিক বৈষম্য এবং মানবিক দায়িত্ব— এই সবকিছুর সঙ্গেই গভীরভাবে যুক্ত।
ইউরোপীয় রাজনীতিতে এই নতুন ভাষার একটি গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। “সভ্যতা রক্ষা” বা “ইউরোপীয় পরিচয়” রক্ষার যে বক্তব্য আজ আবার শোনা যাচ্ছে, তা ফিরিয়ে আনছে উনিশ শতকীয় ইউরো-শ্রেষ্ঠত্বের কান্টীয় দর্শনের প্রত্যক্ষ স্মৃতি— ইউরোপ মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। অথচ বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের শ্রমিক আন্দোলন, সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি এবং রুশ বিপ্লবের প্রভাব ইউরোপীয় সমাজে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাজনৈতিক কল্পনা তৈরি করেছিল— যেখানে সমতা, আন্তর্জাতিক সংহতি এবং ঔপনিবেশিকতার বিরোধিতা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মূল্যবোধ হয়ে উঠেছিল। আজকের দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক ভাষা সেই ঐতিহাসিক অর্জনকে অস্বীকার করছে এবং ইউরোপীয় রাজনীতিকে আবার একটি সঙ্কীর্ণ সভ্যতাগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বামপন্থার সংকট: সামাজিক গণতন্ত্র থেকে নতুন বাম রাজনীতির সীমাবদ্ধতা
ইউরোপের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটকে বোঝার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বামপন্থার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা। চরম দক্ষিণপন্থার উত্থানকে কেবল তাদের নিজস্ব শক্তির ফল হিসেবে দেখা ভুল হবে। বরং বহু ক্ষেত্রে এটি বামপন্থার রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফলেও সম্ভব হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সামাজিক গণতন্ত্র একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারা হিসেবে গড়ে ওঠে। শ্রমিক আন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়ন এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভিত্তিতে এই ধারাটি কল্যাণরাষ্ট্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বহু দেশে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং শ্রমিক অধিকারকে কেন্দ্র করে যে সামাজিক সমঝোতা তৈরি হয়েছিল, তা কয়েক দশক ধরে ইউরোপীয় সমাজের স্থিতিশীলতার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে এই ধারার মধ্যেই একটি মৌলিক পরিবর্তন শুরু হয়। বিশ্বায়নের চাপ, আর্থিক পুঁজির উত্থান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার মধ্যে সামাজিক গণতান্ত্রিক দলগুলির বড় অংশ ক্রমশ বাজারমুখী নীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। ব্রিটেনে টনি ব্লেয়ারের New Labour, জার্মানিতে গেরহার্ড শ্রোডারের Agenda 2010, কিংবা ফ্রান্স ও ইতালির বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ— সব ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে সামাজিক গণতন্ত্র ধীরে ধীরে উদার অর্থনৈতিক নীতিকে গ্রহণ করছে।
এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ফাঁক তৈরি হয়। ঐতিহাসিকভাবে যে দলগুলি শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করত, তারা ক্রমশ সেই সামাজিক ভিত্তি থেকে দূরে সরে যায়। অর্থনৈতিক উদারীকরণ, শ্রমবাজারের নমনীয়তা এবং মিতব্যয়ী নীতির সমর্থন তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
২০০৮ সালের আর্থিক সংকট এই সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে। যখন অর্থনৈতিক সংকটের সময় ইউরোপের বহু সামাজিক গণতান্ত্রিক সরকারই ব্যয়সঙ্কোচ নীতি বাস্তবায়ন করে, তখন বহু মানুষের কাছে বাম ও দক্ষিণপন্থার মধ্যে পার্থক্য ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি চরম দক্ষিণপন্থী দলগুলির জন্য রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করে। তারা অর্থনৈতিক অসন্তোষকে জাতীয়তাবাদী এবং অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে নতুন সমর্থন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
এই প্রেক্ষাপটে গত এক দশকে ইউরোপে নতুন কিছু বামপন্থী রাজনৈতিক উদ্যোগ দেখা যায়। গ্রিসে সিরিজা, স্পেনে পোদেমোস, ফ্রান্সে লা ফ্রঁস অ্যাঁসুমিজ কিংবা জার্মানিতে ডি লিঙ্কে— এই সব উদ্যোগ মূলত ২০০৮ সালের সংকটের পর জন্ম নেওয়া সামাজিক আন্দোলন এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক সক্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তারা ব্যয়সঙ্কোচ নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে আনে।
কিন্তু এই উদ্যোগগুলিও নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। গ্রিসে সিরিজার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ইউরোপীয় ঋণসংকটের সময় সিরিজা ক্ষমতায় এসে ব্যয়সঙ্কোচ নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেও শেষ পর্যন্ত সেই নীতির বড় অংশই মেনে নেয়।
আরেকটি বড় সমস্যা হল ইউরোপীয় স্তরে সমন্বয়ের অভাব। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলি মূলত বহুজাতিক স্তরে নেওয়া হয়। কিন্তু বামপন্থী রাজনীতি এখনও প্রধানত জাতীয় স্তরেই সীমাবদ্ধ। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতির বিরুদ্ধে একটি সুসংগঠিত বিকল্প গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় বামপন্থা এক ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। একদিকে তাদের সামাজিক ভিত্তির একটি অংশ চরম দক্ষিণপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান কাঠামোর মধ্যে থেকে একটি বাস্তব বিকল্প কৌশল তৈরি করাও সহজ নয়।
তবুও এই সংকটের মধ্যেই নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার প্রশ্ন উঠে আসে। কারণ ইউরোপের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ক্রমশ সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করছে। এই অসন্তোষ কোন দিকে প্রবাহিত হবে— চরম জাতীয়তাবাদের দিকে, নাকি নতুন ধরনের গণতান্ত্রিক ও সামাজিক রাজনীতির দিকে— তা অনেকটাই নির্ভর করবে ইউরোপীয় বামপন্থা ভবিষ্যতে কী ধরনের রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করে তার ওপর।
ইউরোপ কোন পথে?
আজকের ইউরোপ একটি গভীর রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভারসাম্য বদলাচ্ছে— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন এবং অন্যান্য শক্তির মধ্যে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের শাসকমহল যে পথ বেছে নিচ্ছে তা হল সামরিকীকরণ এবং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাজনীতি। প্রতিরক্ষাব্যয় বৃদ্ধি, অস্ত্রশিল্পে বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতে সক্রিয় ভূমিকা— এই সবকিছু মিলিয়ে ইউরোপীয় রাজনীতিতে একটি নতুন সামরিক মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই পথ ইউরোপের মৌলিক রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান দেয় না; বরং সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
তবে ইউরোপের বাস্তবতা কেবল শাসকমহলের নীতি দিয়ে নির্ধারিত হবে না। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি দেখাচ্ছে যে ইউরোপের ভেতরেই শক্তিশালী রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। ইরানের উপর আক্রমণের প্রশ্নে স্পেনের সরকার প্রকাশ্যে ইজরায়েলের সমালোচনা করেছে, যা ইউরোপীয় কূটনীতির ভেতরে একটি স্পষ্ট বিভাজন তৈরি করেছে। ইতালির কিছু বন্দর শহরে ডকশ্রমিকরা ইজরায়েলমুখী অস্ত্রবাহী জাহাজ খালাস করতে অস্বীকার করেছেন। ইউরোপের বিভিন্ন শহরে লক্ষ লক্ষ মানুষের অংশগ্রহণে যুদ্ধবিরোধী এবং প্যালেস্তাইনপন্থী বিক্ষোভ হয়েছে।
এই ঘটনাগুলি দেখিয়ে দেয় যে ইউরোপের রাজনৈতিক বাস্তবতা একরৈখিক নয়। একদিকে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের স্তরে সামরিকীকরণ এবং নিরাপত্তা রাজনীতি জোরদার হচ্ছে, অন্যদিকে সমাজের ভেতরে যুদ্ধবিরোধী এবং মানবাধিকারপন্থী শক্তিও সক্রিয় রয়েছে।
চরম দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলি সংকটকে কাজে লাগিয়ে জাতীয়তাবাদী এবং অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করলেও ইউরোপের বহু দেশে সামাজিক আন্দোলন, শ্রমিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ আন্তর্জাতিক সংহতি ও শান্তির পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।
এই দ্বন্দ্বের নিরসনই ইউরোপের রাজনৈতিক ভাগ্য ঠিক করবে।
[1] Rubio, Marco. The U.S. in the World. MSC. Feb 14, 2026.
[2] The radical right’s international networks. FES.
[3] Zeitenwende speech. Wikipedia.
[4] EDF | Developing tomorrow’s defence capabilities. European Commission.
[5] Soler, Paula. Europe remains ‘highly vulnerable’ and dependent on US defence production – report. Euro News. Jun 20, 2025.
[6] Five things you need to know about the Maastricht Treaty. ECB.
[7] Strengthening Frontex’s mandate in border and migration management. Thinktank, European Parliament. Mar 9, 2026.

