মৌমিতা আলম
বাপের নাম কী? ঠাকুর্দার নাম? অশ্লীল এইসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে দুয়ারে দাঁড়ায় মাস্টার। মুই বাপের নাম জানোং না— ফোঁস করে ওঠে বাউপাগলা। বাউপাগলা কয়েকদিন নানা গাঁয়ে ঘুরে সদর দুয়ারের পাশে জায়গা নিয়েছে গেল হাটবার। মাস্টার জোরে প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করাতে তার মনে হয় যে তাকেই উত্তর দিতে হবে। আশেপাশে যে কেউ কোনও কথা বললে বাউপাগলার মনে হয় তাকেই বলছে। তবে সব কথার উত্তর সে দেয় না। কোনটার উত্তর দেবে আর কোনটার দেবে না সেটা বাউপাগলা নিজেই ঠিক করে। বাউপাগলার বয়স বাড়ে না। কোন মাঘে, কার পেটে জন্ম, কেউ জানে না। সদর দরজা বলতে বাঁশের ঘেরা দেওয়া আঙিনার মাঝে একটা দরজা। দরজার পাশে দিনের বেলা গরু রাখার জায়গা। সেইখানে কয় মুঠি খড়ের উপর একটা চট বিছিয়ে শুয়ে বাউপাগলা। শীত এখনও আসেনি। আসবে আসবে করছে। এর মধ্যেই বাউপাগলার হাত আর পায়ের চামড়া যেন গামারিগাছের ছালের মতন কুঁচকে গিয়ে ঝুলে গেছে। একটু টান কিংবা একটু চুলকালে চামড়া উঠে রক্ত গড়াবে। সেই রক্ত শুকিয়ে সেখানেই দলা হয়ে আবার চুপসে পড়ে যাবে। বাউপাগলার জীবনের মতন তার প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গও যেন স্বতন্ত্র। তারা নিজেদের মতনই জ্বর-জরাতে ভোগে, নিজেদের মতনই সারে। না সারলেও কার বা কী যায় আসে!
বাউপাগলার কথাটা বাড়ির চব্বরে ঘুরতে ঘুরতে উবে যাওয়ার আগেই কথা শুরু করল বাটুয়া।
—বাউপাগলার নাহয় মাথা খারাপ— কুকুরক জোনাক খাবার দ্যায় আর আতিক দ্যায় বন পারুটি—
এক নিশ্বাসে বলে বাটুয়া। দুধ ছেকার জন্য পন্ডস ক্রিমের কৌটার মধ্যে সরষের তেল এক হাতে নিয়ে, অন্য হাতে কোঁচকানো দস্তার বালতিটা নিয়ে প্রথম কথার লেজ ধরে গলা চড়িয়ে গাল শুরু করে নিজের মনেই—
—মোখও ক্যান বাপের নাম মনে থুবার নাগিবে রে— ডাকুয়া মরা। কোন বাপ— মোর চুদমারানি বাপ নাকি মোর নাঙমারানি ভাতারের নাম? যে ভাদর মাসে মোর জন্ম তার আগের মাস শন মাসে মোর মাও তিনদিন টানা ভাত খায় নাই। মুই প্যাটের ভিতর নইড়তে নইড়তে মোর মায়ের প্যাটের ভিতর যা ছিল তায় খানু। মোর মায়ের গোস্ত! মোর মা দুর্বল হইল। তারপর ভাদর মাশত যেলা মুই উবজিনু, মোর মায়ের ছতিকা ধরলে। মোর মাও হাগে খালি হাগে। হাত শুকায় না। মোর মায়ের হাটি বেড়ানোরও শক্তি নাই। সেইবার মুই বাচিনু খইরালির দুধ খায়া। খইরালি সেইবার বাড়িত ছিল। অর ছয় নম্বর ছাওয়া উবজিছে বম্বে সার্কাস কোম্পানির দশ নম্বর খেলার সময় মন্ডলঘাটের চুরুলি বাড়ির ক্যাম্পত গেইল বছর পৌষ মাসত। খৈরালি আর অর ভাতার সেই যে বানার পরে পরে অর বড় ব্যাটা উবজিল আর ভাতের অভাবে এ ঘর ও ঘর করি বেড়াইল। স্কুলের নঙ্গরখানার খাবার খায়া তিনজনে বাঁচিল। কিন্ত ফির বছর অর চান্দের নাখিন সুন্দর বড় ব্যাটা পশ্চিম পাখের ঘরের পাছ পুখের ডোবাত কুন সময় সুরুৎ করি পড়ি যায় ঢেউড়ি উঠিল মরা মাছের মতন, সেই বছরত খৈরালি আর তার ভাতার, হাবুর ওই যে সার্কাস দলত ঢুকিল, সার্কাস এ হইল ওমার ঘর বাড়ি, বসত আর সন্তান। সগায় কত কইল, হাবুর বাড়ি ফিরি আয়, সার্কাস হারাম। তোর গাভুর বেটি ঘর পাবার নাহয়, হাবুর কান করে না। বছরের মাঝত একবার আইসে, দোয়া (আকাশ) শুকালে চলি যায়। যেবার মোর জন্ম আল্লাহ-পীরের দোয়ায় খৈরালি আর অর ভাতার বাড়ি আসিছিল। মোক গায়ের দুধ দিচ্ছিল খৈরালি। সেই থাকি খৈরালি মোর দুধ-মাও। আব্বা একবারও হামার খোঁজ নেয় নাই। গাভুর মরা, থাকিয়ার সময় থাকিছে, মোর মাক প্যাট করে থুইয়া পালাইছে। মুই ক্যানে ওই নাঙমারানির খবর থুম। আর তুই মোক বাপের নাম জিজ্ঞাসা করিবার তানে আইসছিস, মাস্টার!
এতগুলো কথা একবারে বলে একটু দম নিল বাটুয়া। মোক কুন ক্যাম্পত নিগায় নিগাউক, মুই ফরম নিম না, সাফ কথা বাটুয়ার।
মাস্টার পড়ল সেই ফ্যাসাদে। এক তো তিনদিনের মধ্যে সব ফর্ম বিলি শেষ করতে হবে। তারপর এক জায়গায় এতক্ষণ দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করাও যাবে না। বাটুয়ার জন্য একটু মায়াও হয় মাস্টারের। পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই বাটুয়া প্রায় যায় আঠুয়া বাসন ধুয়ে দিতে মাস্টারের বাড়ির। গরুর জন্য সবজির খোসা, পচা সবজি নিয়ে আসে। সে নিজে নাম খুঁজেছে কিন্তু বাটুয়া নামে কাউকে খুঁজে পায়নি। এই গ্রামের মানুষের তো দুইটা নাম থাকে প্রায়। সে শুনেছিল ছোটবেলায় পাঁচড়াঘায়ে ছেয়ে গেছিল মাথা, নাপিতও মাথা ধরছিল না। বাটুয়ার মা নিজে ব্লেড নিয়ে এসে গোল করে ছেঁটে দিয়েছিল মাথার চুল। মাথার চুলগুলো উল্টানো বাটুয়ার অর্থাৎ ছোট বাঁশের ডালির মতন দেখতে হয়েছিল। সেই থেকে নাম হয় বাটুয়া। আর গ্রামে নাম আর গুয়ের গন্ধ একবার হলে ছড়িয়ে যায় গোটা গ্রাম। গুয়ের গন্ধ চলে গেলেও পরেরবার আবার নাকে গন্ধ এলে যেমন পুরনো গুয়ের গন্ধের কথা মনে পড়ে, তেমন বাটুয়ার নাম বাটুয়া হওয়ার পর বাটুয়াকে দেখলেই সবার ওর নাম বাটুয়া মনে পড়ে। তারপর আস্তে আস্তে এই গ্রামের মেয়ে ঘর ছেড়ে পরের ঘর যায়, অন্য গ্রামের মেয়ে এই গ্রামে আসে, তলিয়ে যেতে থাকে বাটুয়ার মায়ের দেওয়া নাম। বাটুয়া হয়ে যায় শুধুই বাটুয়া।
—মুই সেলাও টেপ জামা পিন্ধং। মোর বুক দুটা জমপুরার বিচির থাকিও ছোট। মাও পুবপাড়ার ফুচলু পাইকারের সাথে পালে গেইল। মোক দিয়া গেইল বিচন দেউনিয়ার বাড়িত কাজত নাগেয়া। দেউনিয়ার বউয়ের আঠুয়া খায়া কত বছর যে কাটিল মুই কবার পরিবার নাহয়। দেউনিয়ার ডাঙ্গুয়া ব্যাটা যেদিন মোক পিছন থাকি আসিয়া মোর দুধ টিপি ধরিল, তার দুইদিন পর মুই কাম ছাড়ি দিনু। হয় গেনু বিদেশিয়া। কামার টোলার মর্জিনা খালা যেদিন ভুটান গেইল কাজ করিবার, মোক নিগাইল সাথত। সেলা মোর কুনো কাগজ নাই, একখান রেশন কার্ড আছিল। সেলা অত কাগজও নাগে নাই। বিশাল বিশাল বিল্ডিং। মুই আর মর্জিনা খালা কাম করি। ওই বিল্ডিংয়ের নিচের তলত কয় খান তক্তা দিয়া ঘেরি, মুই আর মর্জিনা খালা থাকিছিনু। মুই তাও পাইসা খরচ করো নাই। মেলা বৈর্ষা পালে, যে মুই গ্রামত ফিরিনু, মোর মায়ের নাঙ ফুচলু পাইকারের এই দশ কোট জমিখান মোর মাও কয়া বুলি অল্প পাইসাত দিল, দেউনিয়ার বউ দিল বাঁশ, খড়ি। এইলা দিয়া মুই ঘর বান্ধিনু রে মাস্টার। একটা ছোট বাচ্ছি গরু কিনেছিনু। তার পরোষে এতলা গরু। দুধ বেচে সংসার চলে। মোর একটা প্যাট আর এই গরু-বাছুরের দুইটা প্যাট। মাঝেমাঝে এর মাঝোত এই বাউপাগলা আইসে। মুই মোর লায় কাটি থুইয়া ওক দাও। একটা প্যাট বাড়িলে এই গরিবের কুয়ার পানি শুকায় না রে, মাস্টার।
অনেকক্ষণ থেকে অপেক্ষা করতে করতে মাস্টার এবার হাঁপিয়ে উঠেছিল। গলা চড়িয়ে বলল—
—দ্যাখ বাটুয়া, মোর অত টাইম নাই। দ্যাশের আইন আর ভাতারের ভাত দুইটারই নিয়ম আছে, না মানিলে বিপদ। তুর তোর মায়ের ভাতারের বেটি নাকি নাঙের বেটি, সরকার তা মানিবার নাহয়! তুই তোর কাগজ দে।
বাটুয়ার বাপের কথা বললে মাথায় আগুন ছলকে উঠে। বটুয়ার দুধ ছেক প্রায় হয়ে এসেছিল। মাস্টারের কথা শুনে বিরক্তিতে সে মাছি তাড়ানোর জন্য রাখা কাপড়টা দিয়ে জোরে গরুর পেছনের দুটো পায়ে দিল সপাটে একটা চড়। গরুটা লাফিয়ে ওঠার ফলে এক পা দুধের বালতিতে ঢুকে গেল। বালতির দুধ উল্টে গেল উঠোনে। আর গরুটা পালানোর জন্য জোর যে হ্যাঁচকা টান দিল সেই টানে দড়ি ছিঁড়ে পালাতে বাটুয়ার পায়ে দড়ি পেঁচিয়ে গেল। বাটুয়া সেই টান সামলাতে না পেরে গরুর দড়ির সঙ্গে এক পা আটকে গরুটার টানে উঠোন থেকে ছ্যাচড়ায় গেল কিছুটা। পড়ে যাওয়া দুধে লেপ্টে যা তা অবস্থা।
মাস্টার আর উপায় না দেখে বাটুয়াকে তুলল। কুয়ো থেকে জল তুলে হাতে, মুখে ঝাপটা দিল বাটুয়ার। বাটুয়া সেই অবস্থাতেও বকেই যাচ্ছে।
মাস্টার বুঝল আর কোনও কাজ হবে না।
সে উঠে বাইরে বেরিয়ে খোকশাগাছে হেলান দেওয়া সাইকেলের দিকে তাকাতেই রে রে করে উঠল।
দড়ি ছিঁড়ে বেরিয়ে যাওয়া গরুটা সাইকেলে ঝোলানো ব্যাগ টেনে নামিয়ে ভিতরের কাগজ আরাম করে চিবোচ্ছে। মাস্টারের রে রে শুনেও গরুটা সরল না। আনমনে চিবোতেই লাগল। তখনও অর্ধেক কাগজ পড়ে মাটিতে। গরুর এই এক বৈশিষ্ট্য— কোনও কিছুতেই তার বিশেষ কিছু যায় আসে না।
কী জানি কী ভেবে বাউপাগলা দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে হাততালি দিয়ে উঠে দাঁড়াতেই কোমর থেকে লুঙ্গিটা নেমে গেল। নিজের তালে চলা বাউপাগলার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সেই মুহূর্তে নিজের তালে চলে ভিজিয়ে দিল মাটিতে পড়ে থাকা বাকি এনুমারেশন ফর্ম।
বাউপাগলার পেচ্ছাপ তখনও শেষ হয়নি, বাটুয়া এই দৃশ্য দেখে হো হো করে হেসে লুটোপুটি খেয়ে আরেকবার বলে উঠল—
—বাপের নাম পুছিবার আইসছে গাভুর মরা! নে মুত খা!
মাস্টার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে মাটিতে।

