শৌর্যদীপ্ত দেনগুপ্ত
যদি সত্যিই নারী অধিকার যদি চান তাহলে প্রধান কাজ হচ্ছে বিজেপিকে দিকে দিকে রুখতে হবে, এবং এই সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিল রুখতে হবে, কোনও মতেই ফ্যাসিস্ট বিজেপিকে গোটা দেশ দখল করতে দেওয়া যাবে না। আসামে এনআরসি প্রক্রিয়ার সময় দেখা গেছে প্রয়োজনীয় নথি না থাকায় লক্ষ লক্ষ মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যাঁদের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যাই বেশি ছিল কারণ তাঁদের নামে জমি বা জন্মসংক্রান্ত নথি কম থাকে। তাই যারা নারী অধিকার নিয়ে কুমিরের কান্না কাঁদছে তাদের আসল চেহারা উন্মোচন করে বর্জন করাটাই সময়ের দাবি
৩৩ শতাংশ নারী সংরক্ষণ বিলের বিরোধিতা করেছে বিজেপি-বিরোধী পার্টিগুলি, অভিযোগ বিজেপির। এই অভিযোগ কতটা সত্য সেই বিষয়ে জানতে খানিক সমাজমাধ্যম ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যায় যে, সেপ্টেম্বর ২০২৩-এ সংসদের বিশেষ অধিবেশনে লোকসভা এবং রাজ্যসভা উভয় কক্ষে এটি পাশ হয়েছিল। কিন্তু, নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম পাশ হলেও, এটি কার্যকর করার ক্ষেত্রে কিছু সাংবিধানিক শর্ত ছিল। ২০২৩ সালের মূল আইন অনুযায়ী, সংরক্ষণ কার্যকর করার আগে নতুন জনগণনা (Census) এবং তারপর সীমানা পুনর্নির্ধারণ (Delimitation) করা বাধ্যতামূলক ছিল। এর ফলে ২০২৯ বা ২০৩৪ সালের আগে এই সংরক্ষণ কার্যকর হওয়া অসম্ভব ছিল। কেন্দ্র সরকার নিজেরাই এই বিলটা বানিয়েছিল, এখন ২০২৪ সালে নির্বাচনে বড় ধাক্কার পর বিজেপি ও তার জোটসঙ্গীরা চাপে আছে ২০২৯ সাল নিয়ে। এবং, সেই কারণেই বর্তমানে (২০২৬) তাড়াহুড়ো করে সময়সাপেক্ষ পদ্ধতিগুলোকে এড়িয়ে ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতেই আসন পুনর্নির্ধারণ করে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকেই সংরক্ষণ চালু করার হুজুগ। নতুন বিলের মাধ্যমে লোকসভার মোট আসনসংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যাতে বর্তমান পুরুষ সদস্যদের আসন সংখ্যা না কমিয়েই মহিলাদের জন্য ২৭৩টি আসন সংরক্ষিত করা যায়। খুব ভালো কথা, নারীরা সংসদে নারী-সমস্যা বলবেন— খুব সুন্দর বিষয়, কিন্তু একটু ভালো করে দেখবেন কোন কোন রাজ্যে কত শতাংশ সংরক্ষণ বা সিট বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একটু লক্ষ করলেই বুঝবেন এটা নিজেদের গদি টিকিয়ে রাখার আইন ছাড়া কিছু নয়।
যদি এই ৯টা রাজ্য (৫টা বিজেপিশাসিত ও ৪টে অ-বিজেপিশাসিত) দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা হয়, তাহলে ব্যাপার এই দাঁড়ায়:
- উত্তরপ্রদেশ— ছিল ৮০, প্রস্তাব ১৪৩, বাড়ত ৬৩, ৭৮.৭৫ শতাংশ
- মধ্যপ্রদেশ— ছিল ২৯, প্রস্তাব ৫২, বাড়ত ২৩, ৭৯.৩১ শতাংশ
- বিহার— ছিল ৪০, প্রস্তাব ৭৯, বাড়ত ৩৯, ৯৭.৫ শতাংশ
- মহারাষ্ট্র— ছিল ৪৮, প্রস্তাব ৭৬, বাড়ত ২৮, ৫৬.২৫ শতাংশ
- রাজস্থান— ছিল ৭৫, প্রস্তাব ১৫০, বাড়ত ৭৫, ১০০ শতাংশ
- কর্নাটক— ছিল ২৮, প্রস্তাব ৪১, বাড়ত ১৩, ৪৬.৪২ শতাংশ
- তামিলনাড়ু— ছিল ৩৯, প্রস্তাব ৪৯, বাড়ত ১০, ২৫.৬৪ শতাংশ
- কেরালা— ছিল ২০, প্রস্তাব ২০, বাড়তো ০, ০ শতাংশ
- পশ্চিমবঙ্গ— ছিল ৪২, প্রস্তাব ৬০, বাড়ত ১৮, ৪২.৮৫ শতাংশ
মানে ৫টা বিজেপিশাসিত রাজ্যে সিট বাড়ত ১৭৮— ৫৮.৭৪ শতাংশ, আর ৪টে অ-বিজেপিশাসিত রাজ্যে বাড়তো ৪১— ৩১.৭৮ শতাংশ সিট। কেন ক্ষমতা ধরে রাখার খেলা বললাম বুঝলেন? যে রাজ্যগুলোতে বিজেপি-বলয় সেখানে ১৭৮টা সিট বাড়ানোর অর্থ হল ৮৪৬টা প্রস্তাবিত সিটের মধ্যে শুধু ৫টা রাজ্য থেকেই ৪০০ সিট নিশ্চিত করার মতো শক্তি তৈরি করা। সেটা পাশ করানোর জন্য নারী সংরক্ষণের ঢাল ধরতে হয়েছে, নারীজাতিকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করার তালে ছিল বিজেপি, সেটা পরিষ্কার।
বিজেপি যদি এতই নারী সংরক্ষণের কথা ভাবে, নারী অধিকারের কথা ভাবে তাহলে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, সবচেয়ে বেশি কেন? তাঁদের নিজেদের দলেই নারীদের সম্মান কোথায়? নারীভ্রূণ হত্যায় এগিয়ে থাকা কয়েকটি রাজ্যের আনুমানিক হার (২০২৪-এর রিপোর্ট অনুযায়ী) উদ্বেগজনক: উত্তরপ্রদেশ— ৩০.৫ শতাংশ, বিহার— ২৮.৫ শতাংশ, রাজস্থান— ২৫.৪ শতাংশ, এবং মধ্যপ্রদেশ— ২২.১ শতাংশ। রাজ্যগুলো বিগত কয়েক বছর ধরে বিজেপির নিয়ন্ত্রণে। এর মূল কারণ হচ্ছে: বংশরক্ষার জন্য পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষা; যৌতুকপ্রথা এবং কন্যাসন্তানকে “অর্থনৈতিক বোঝা” মনে করা; বেআইনিভাবে গর্ভস্থ শিশুর লিঙ্গনির্ধারণ।
এখানে আরও একটা বড় বিষয় আছে যেটা খেয়াল করা দরকার। ভারতের আসনবণ্টন ঐতিহাসিকভাবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে হয় এবং ১৯৭১ সালের পর থেকে দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের যেসব রাজ্য পরিবার নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে তাদের আসনসংখ্যা কার্যত স্থির ছিল, অন্যদিকে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোর জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। যদি ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে নতুন করে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই উত্তর ভারতের বড় রাজ্য যেমন বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ আরও বেশি আসন পাবে এবং তুলনামূলকভাবে তামিলনাড়ু, কেরল, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্বের অনুপাত কমে যাবে। এর ফলে নীতিনির্ধারণে ধীরে ধীরে উত্তর ভারতকেন্দ্রিক প্রভাব আরও বাড়বে এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা বা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল রাজ্যগুলোর কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে পড়বে। এই অসম ভারসাম্য তৈরি হলে বাস্তবে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ আধিপত্য গড়ে উঠবে, যেখানে কম জনসংখ্যা বৃদ্ধির রাজ্যগুলো নীতিনির্ধারণে পিছিয়ে পড়বে এবং বেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির রাজ্যগুলো কেন্দ্রীয় ক্ষমতার উপর বেশি প্রভাব ফেলবে, ফলে অনেকের কাছে এটা নিজের দেশের মধ্যেই অন্য অঞ্চলের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি বলে মনে হতে পারে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটাই ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ— এখানে একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য গোটা দেশের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আরএসএস এবং বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী কেন্দ্রীকরণ এবং ‘এক জাতি এক নীতি’ নির্ধারণের অবস্থানকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন নীতিতে যেমন ভাষা, শিক্ষা, নাগরিকত্ব বা প্রশাসনিক কাঠামোয় কেন্দ্রের ক্ষমতা বৃদ্ধির পাচ্ছে, যার ফলে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য ও ফেডারেল কাঠামোর উপর চাপ তৈরি হয়। এই ধারাবাহিকতার হিসেবেই সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিলটি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নের বাইরে নয়। যখন নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে সুবিধা হয়েছে তখন বহু বিরোধী দলই জনগণনা, সংরক্ষণ, শ্রম কোড, CAA, শিক্ষানীতি, পরিবেশনীতি বা কেন্দ্রীয় নীতিকে সমর্থন করেছে, আবার অন্য সময়ে তার বিরোধিতা করেছে। অনেক সময় মুখে বিরোধিতা করে নিজের রাজ্যে সেই আইন প্রয়োগ করেছে অন্যভাবে, কখনও ওয়াকআউট করে বিল ঘুরপথে পাশ হতে সাহায্য করেছে। অর্থাৎ নীতিগত অবস্থানের বদলে পরিস্থিতি অনুযায়ী অবস্থান বদলের প্রবণতা স্পষ্ট, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক আলোচনাকে দুর্বল করে।
কেন এটা ব্রাহ্মণ্য-হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প বলছি?
কারণ হচ্ছে সংঘ পরিবারের ঐতিহাসিক আদর্শ। যেই আদর্শ বহুত্ববাদের জায়গা নেই, উল্টে সাংস্কৃতিক একরূপতা এবং একটি প্রধান জাতীয় পরিচয় গঠনের উপর জোর দেওয়া হয়। বিজেপি এই আদর্শের রাজনৈতিক রূপ হিসেবে কাজ করে। শিক্ষানীতি, ভাষানীতি, নাগরিকত্ব আইন যেমন Citizenship Amendment Act এবং এক-দেশ-এক-নির্বাচন বা এক ভাষা প্রকল্প এই কেন্দ্রীয়করণ প্রবণতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায়। এগুলোর মাধ্যমে বহুত্ববাদী কাঠামোর বদলে একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
কেন উত্তরভারত-কেন্দ্রিক রাজনীতি চাপানোর কথা বলছি?
উত্তরভারত-কেন্দ্রিক রাজনীতির প্রশ্নটি আসে মূলত জনসংখ্যা এবং আসন বণ্টনের সম্পর্ক থেকে। ১৯৭১ সালের পর থেকে লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস স্থগিত ছিল যাতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কিন্তু যখন নতুন করে ডিলিমিটেশন করা হবে, তখন উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশের মতো উচ্চ জনসংখ্যা বৃদ্ধির রাজ্যগুলো স্বাভাবিকভাবেই বেশি আসন পাবে। এর ফলে সংসদে তাদের প্রভাব অনেক বেশি বাড়বে এবং নীতিনির্ধারণে উত্তরভারত-কেন্দ্রিক ভারসাম্য তৈরি হবে।
যদি সত্যিই নারী অধিকার যদি চান তাহলে প্রধান কাজ হচ্ছে বিজেপিকে ও তাঁদের বিভিন্ন রঙের দালাল পার্টিদের দিকে দিকে রুখতে হবে, এবং এই সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিল রুখতে হবে, কোনও মতেই ফ্যাসিস্ট বিজেপিকে গোটা দেশ দখল করতে দেওয়া যাবে না। জনগণনা নিয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হল নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর ব্যবহার। অতীতে আসামে এনআরসি প্রক্রিয়ার সময় দেখা গেছে প্রয়োজনীয় নথি না থাকায় লক্ষ লক্ষ মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যাঁদের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যাই বেশি ছিল কারণ তাঁদের নামে জমি বা জন্মসংক্রান্ত নথি কম থাকে। তাই আশঙ্কা আছে যে ভবিষ্যতে যদি নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য একই ধরনের প্রক্রিয়া বিস্তৃতভাবে চালু করা হয়, তাহলে দরিদ্র, প্রান্তিক ও নথিহীন মানুষ, বিশেষ করে নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন। এই কারণেই জনগণনা ও এনআরসি প্রক্রিয়ার যোগসূত্র যতদিন থাকবে ততদিন জনগণনা করা চলবে না। তাই যারা নারী অধিকার নিয়ে কুমিরের কান্না কাঁদছে তাদের আসল চেহারা উন্মোচন করে বর্জন করাটাই সময়ের দাবি।
*মতামত ব্যক্তিগত

