Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

মহাকালের ক্যানভাসে এক খামখেয়ালি তুলি: অনীক দত্তের প্রস্থান ও আমাদের অস্তিত্বের সংকট

অয়ন মুখোপাধ্যায়

 


অনীক দত্ত তাঁর খামখেয়ালি তুলি দিয়ে বাংলা সংস্কৃতির ক্যানভাসে যে আঁচড় কেটে গেছেন, তা মোছার ক্ষমতা মহাকালেরও নেই। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা রেখে হাসতে হয়, কীভাবে ক্ষমতার চোখের দিকে তাকিয়ে সত্যিটা বলতে হয়। তাঁর শারীরিক অবসান ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া শ্লেষ, তাঁর ‘অপরাজিত’ জেদ এবং তাঁর সৃষ্টির দর্শন আগামী বহু প্রজন্মকে পথ দেখাবে। তিনি হয়তো কোনও এক সমান্তরাল মহাবিশ্বে বসে তাঁর চিরপরিচিত চুরুটটা ধরিয়ে আমাদের এই শোকাকুল পৃথিবীকে দেখে মৃদু হাসছেন, আর বলছেন— "নাটক তো কেবল শুরু হল!"

 

মৃত্যু চিরকালই এক পরম ধাঁধা। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু যখন আমাদের পরিচিত পরিমণ্ডল থেকে হঠাৎ কাউকে ছিনিয়ে নেয়, তখন তা কেবল এক ফোঁটা চোখের জল বা একটা শূন্যতার সৃষ্টি করে না; বরং তা আমাদের মতো বেঁচে থাকা লোকজনদের দাঁড় করিয়ে দেয় এক নির্মম আয়নার সামনে। পরিচালক অনীক দত্তের আকস্মিক প্রস্থান বাংলা চলচ্চিত্রজগতের জন্য তো বটেই, সামগ্রিক বাঙালি মননের জন্যও এক গভীর দার্শনিক ধাক্কা। তাঁর চলে যাওয়া কেবল একজন প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকারের অবসান নয়, বরং আমাদের অস্তিত্ব, শিল্প, সময় এবং ‘বাঙালি আধুনিকতা’র এক মহাজাগতিক পরিহাস।

 

শূন্যতার জ্যামিতি: যখন একটি স্বর স্তব্ধ হয়ে যায়

অনেকেই মনে করেন মানুষ হল এমন এক সত্তা যা “মৃত্যুর অভিমুখী”। আমরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুর দিকে হেঁটে চলেছি, কিন্তু সেই হাঁটার পথে আমরা যা কিছু তৈরি করি— আমাদের শিল্প, আমাদের জেদ, আমাদের তীব্র শ্লেষ— তা দিয়ে আমরা মৃত্যুকে একপ্রকার অস্বীকার করতে চাই। অনীক দত্ত ছিলেন সেই ঘরানার মানুষ, যিনি তাঁর সিনেমা এবং ব্যক্তিজীবন দিয়ে এই অস্বীকৃতির খেলাটি খেলতেন এক অদ্ভুত আভিজাত্যের সঙ্গে। তাঁর অন্যতম সফল ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ থেকে শুরু করে ‘অপরাজিত’ পর্যন্ত, তিনি যে সমাজদর্শন উপহার দিয়েছেন, তার মধ্যে কোনও সস্তা চটক ছিল না। বরং তার মধ্যে ছিল এক ক্ষুরধার বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। যখন এমন একজন সমাজ-সমালোচক আকস্মিকভাবে স্তব্ধ হয়ে যান, তখন সেই শূন্যতা কোনও জ্যামিতিক মাপকাঠিতে মাপা যায় না। এ যেন আমাদের ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্রের ‘নসিয়া’ (Nausea) বা অস্তিত্ববাদের সংকট যা আমাদের গ্রাস করে। আমরা হঠাৎ বুঝতে পারি, আমাদের চারপাশের চেনা জগৎটা কতটা ভঙ্গুর। অনীক দত্তের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শিল্পের জগৎ যত বড়ই হোক না কেন, প্রকৃতির নির্মম নিয়মের কাছে তা এক তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার মতো বিষয় মাত্র।

 

শ্লেষ, ব্যঙ্গ এবং অস্তিত্বের অ্যাবসার্ডিটি

অনীক দত্তের সিনেমার মূল হাতিয়ার ছিল ‘স্যাটায়ার’ বা ব্যঙ্গ। আলবেয়ার কামুর ‘অ্যাবসার্ডিটি’ বা অসঙ্গতির তত্ত্বের সঙ্গে তাঁর কাজের এক গভীর সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায়। কামু বিশ্বাস করতেন, এই মহাবিশ্ব অর্থহীন এবং উদাসীন; মানুষ যখন এই অর্থহীনতার মধ্যে নিজের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজতে যায়, তখনই ‘অ্যাবসার্ড’ পরিস্থিতির জন্ম হয়।

অনীক দত্ত তাঁর চলচ্চিত্রে এই অসঙ্গতিকেই উদযাপন করেছিলেন। ভূতের ভবিষ্যৎ ছবিতে তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে কর্পোরেট লোভের গ্রাসে মৃতদের আশ্রয়ও বিপন্ন হয়। এটি কেবল হাসির সিনেমা ছিল না, এটি ছিল পুঁজিবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক চরম দার্শনিক চপেটাঘাত। তাঁর মৃত্যু যেন সেই অ্যাবসার্ডিটিরই এক চূড়ান্ত রূপ। যে মানুষটি সারা জীবন সমাজের ভণ্ডামি এবং ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষদেরকে ব্যঙ্গ করে গেলেন, প্রকৃতির এক আকস্মিক নিয়তি তাঁকে নিঃশব্দে সরিয়ে দিল মঞ্চ থেকে। জীবন আসলে এক অতি-প্রাকৃতিক কমেডি, যেখানে কান্নার দৃশ্যগুলিও অন্তরালে হাসির খোরাক জোগায়— অনীক দত্তের চলচ্চিত্রভাবনা যেন এই দর্শনেই জারিত ছিল।

 

অপরাজিত এবং অপূর্ণতার অমরত্ব

অনীক দত্তের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হল অপরাজিত সিনেমা নির্মাণ। সত্যজিৎ রায়ের শতবর্ষে পথের পাঁচালী তৈরির পেছনের গল্প নিয়ে তৈরি এই ছবি কেবল একটি শ্রদ্ধার্ঘ্য ছিল না, তা ছিল একজন স্রষ্টার অন্য একজন মহান স্রষ্টাকে চেনার আকুল প্রয়াস।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, অপরাজিত ছবিটি এক প্রকারের মেটা-ফিজিক্যাল জার্নি বা আধিবিদ্যক যাত্রা। সত্যজিৎ রায় নিজেই ছিলেন বাংলার আধুনিকতার এক আলোকবর্তিকা। অনীক দত্ত যখন জিতু কামালের মাধ্যমে পর্দায় সেই ‘অপরাজিত রায়’কে ফিরিয়ে অনলেন, তখন তিনি আসলে সময়ের বৃত্তকে সম্পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে, স্রষ্টা মরে যায়, কিন্তু সৃষ্টি অমর।

 

কিন্তু আজ যখন অনীক দত্ত নিজেই চলে গেলেন, তখন অপরাজিত নামটি এক নতুন দার্শনিক মাত্রা পেল। তিনি কি নিজে অপরাজিত থেকে গেলেন? নাকি মৃত্যুর কাছে পরাজিত হলেন? একদিক থেকে দেখলে, মৃত্যুর শারীরিক জয় হয়েছে। কিন্তু অন্যদিক থেকে দেখলে, যে মানুষটি সত্যজিতের সৃষ্টির লড়াইকে পুনরুজ্জীবিত করতে পেরে ছিলেন, তিনি কালজয়ী। কারণ, দর্শনে মৃত্যুই শেষ কথা নয়; মৃত্যুর পর মানুষের রেখে যাওয়া চিন্তার যে কম্পন সমাজে থেকে যায়, সেটাই তাঁর প্রকৃত অস্তিত্ব।

 

বাঙালি মধ্যবিত্তের মনন এবং অনীক দত্তের উত্তরাধিকার

অনীক দত্ত কেবল ছবি বানাতেন না, তিনি ছিলেন কলকাতার, তথা ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সংস্কৃতির এক নির্দিষ্ট ঘরানার প্রতিনিধি। তিনি ছিলেন স্পষ্টবক্তা, খানিকটা খামখেয়ালি এবং আপসহীন। আজকের এই উত্তর-সত্যের যুগে, যেখানে চাটুকারিতা এবং আপস করাই বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে অনীক দত্তের মতো একজন মানুষের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত জরুরি।

অনেকেই মনে করেন আধুনিক পুঁজিবাদ সংস্কৃতিকে এক ধরনের পণ্য বানিয়ে ফেলে, যা মানুষের চিন্তাশক্তিকে অবশ করে দেয়। অনীক দত্ত এই ‘অবশ’ করে দেওয়ার রাজনীতির বিরুদ্ধে একজন সজাগ প্রহরী ছিলেন। তাঁর সিনেমা দর্শককে কেবল বিনোদন দেয়নি, বরং বাধ্য করেছে ভাবতে, হাসতে হাসতে নিজের গালে চড় মারতে। তাঁর চলে যাওয়া তাই বাঙালি বুদ্ধিজীবী মহলের এক বড়সড় পশ্চাদপসরণ। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে ধারালো সমালোচনা করার মানুষের বড্ড অভাব। অনীক দত্তের মৃত্যু এই শূন্যস্থানটিকে আরও চওড়া করে দিল।

 

সময়, স্মৃতি এবং নস্টালজিয়া: এক দার্শনিক অন্তিম যাত্রা

অনীক দত্তের চলচ্চিত্রে এক ধরনের ‘নস্টালজিয়া’ বা অতীত-আতিশয্য ছিল, যা ক্ষতিকর নয়, বরং এক ধরনের আশ্রয়। অনীক দত্ত দেখিয়েছেন বর্তমান সমাজ সবসময় অতীতের কিছু ভূত বা ছায়া দ্বারা চালিত হয়। তাই অনীক দত্তের ভূতেরা আসলে আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ, আমাদের ঐতিহ্য এবং আমাদের সততারই রূপক।

তিনি যখন চলে যান, তখন মনে হয় সেই ছায়াগুলিও যেন আরও একটু আবছা হয়ে গেল। উত্তর কলকাতার রোয়াক, কফি হাউসের ধোঁয়াটে বিতর্ক, কিংবা সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল সেনের সেই সোনালী যুগের যে রেশ অনীক দত্ত তাঁর অবয়বে বহন করতেন, তা আজ ধূলিসাৎ। চারপাশের এই অবক্ষয় আর অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে তাই আজ বড্ড মনে পড়ে সেই চেনা সুর—

এই যে দেখছি আবছায়াটাই লাগছে ভালো
ঘরের কোনে একটি মাত্র মোমের আলো
কার তাতে কী?
আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি
আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি
কার তাতে কী?

অনীক দত্ত আসলে আমাদের এই আকাল বা সংকটের সময়েও স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন। এক অদ্ভুত আবছায়া চাদরে মোড়া রূপকের আড়ালে তিনি বর্তমানের কঠিন বাস্তবকে দেখাতেন। ক্ষমতার দাপট আর চাটুকারিতার ভিড়ে যখন চারপাশ অন্ধকার, তখন তাঁর সিনেমাগুলি ছিল ঘরের কোণে জ্বলে ওঠা সেই একটি মাত্র মোমের আলো, যা আমাদের বিবেককে জাগিয়ে রাখত।

 

উপসংহার: প্রস্থান নাকি রূপান্তর?

মৃত্যু কোনও সমাপ্তি নয়, মৃত্যু আসলে এক ধরনের রূপান্তর। অনীক দত্তের এই চলে যাওয়া আমাদের এক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়— আমরা কেউই চিরকাল থাকার জন্য আসিনি। কিন্তু প্রশ্ন হল, আমরা যখন থাকব না, তখন আমাদের নামটা কীভাবে উচ্চারিত হবে?

অনীক দত্ত তাঁর খামখেয়ালি তুলি দিয়ে বাংলা সংস্কৃতির ক্যানভাসে যে আঁচড় কেটে গেছেন, তা মোছার ক্ষমতা মহাকালেরও নেই। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা রেখে হাসতে হয়, কীভাবে ক্ষমতার চোখের দিকে তাকিয়ে সত্যিটা বলতে হয়।

গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসকে যখন বিষপানে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তিনি ভয় পাননি। কারণ তিনি জানতেন, শরীর নশ্বর, কিন্তু সত্য অবিনশ্বর। অনীক দত্তের শারীরিক অবসান ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া শ্লেষ, তাঁর ‘অপরাজিত’ জেদ এবং তাঁর সৃষ্টির দর্শন আগামী বহু প্রজন্মকে পথ দেখাবে। তিনি হয়তো কোনও এক সমান্তরাল মহাবিশ্বে বসে তাঁর চিরপরিচিত চুরুটটা ধরিয়ে আমাদের এই শোকাকুল পৃথিবীকে দেখে মৃদু হাসছেন, আর বলছেন— “নাটক তো কেবল শুরু হল!”

তাঁর এই প্রস্থানকে শোকের ঊর্ধ্বে উঠে এক মহান স্রষ্টার মহাজাগতিক মুক্তি হিসেবে দেখাই বোধহয় তাঁর প্রতি প্রকৃত দার্শনিক শ্রদ্ধা।

 

 

Exit mobile version