শঙ্খ-বেলায়

প্রবুদ্ধ বাগচী

 



গদ্যকার, সমাজভাবুক

 

 

 

 

 

দিন যদি তোর চোখ শুষে নেয়

প্রায় পঁয়তিরিশ বছর আগের এক ক্লিন্ন মফস্বল। জোয়ার-ভাঁটাহীন স্থবির। এ-পাড়ায় ও-পাড়ায় মোড়ে-মোড়ে রোয়াকে-রোয়াকে তাস পেটানোর আসর। একমাত্র যাত্রাদল পৌরাণিক পালার জন্য তাঁবু ফেলে স্কুল-সংলগ্ন বারোয়ারি মাঠে। দুর্গাপুজো নয়, সেই জনপদে সারা বছরের প্রতীক্ষা এক জমকালো শ্যামাপুজোর যার উদ্যোক্তা এমন এক মানিকজোড় যারা প্রথম যৌবনে ‘চিনের চেয়ারম্যান’কে নিজেদের চেয়ারম্যান বলে স্বীকার করে নিয়েছিল। পরে মত ও পথ বদলে ‘এশিয়ার মুক্তিসূর্য’-এর আলোকেই মুক্তির দিশারী বলে মেনে নেয়। সেই মফস্বলের নরম ভোরের সঙ্গে জেগে ওঠে পাড়া— রাত থাকতে থাকতে ‘কৃষ্ণনাম’ আওড়াতে আওড়াতে ডিউটিতে চলে যায় ট্রামকোম্পানির কন্ডাক্টর, অনেক ঘন রাতে কলকাতা থেকে মস্ত এক পাউরুটি-বোঝাই ব্যাগ নিয়ে ঘরে ফেরে হা-ক্লান্ত হকার। মাঝে মাঝে নিকষ কালো লোডশেডিঙের ভিতর দিয়ে উড়ে যায় লক্ষ্মীপেঁচা। টুপ করে শিউলি ঝরে পড়ে পথের পাশে, কখনও হাসনুহানা বা ছাতিমের গন্ধে মাতাল হয় বাতাস।

এরই এক স্যাঁতসেঁতে আবছা অন্ধকার ঘরে আমাদের জড়ো হওয়া। উচ্চমাধ্যমিকের সিলেবাসে তখন সব থেকে আধুনিক কবি বুদ্ধদেব বসু আর জীবনানন্দ দাশ। যদিও আমাদের পরীক্ষার বছরে সিলেবাসে ঠাঁই হয়নি ওই দুজনেরই। ‘শীতের প্রার্থনা: বসন্তের উত্তর’ বা ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ না পড়লেও চলে যায়, মাস্টারমশাইরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। কী যে সব ছাইপাঁশ লেখা হয় ‘আধুনিক’ কবিতার নামে! আর সেইখানেই এক গ্রীষ্ম বিকেলে এক সিনিয়র দাদা আমাদের প্রথম শোনান তাঁকে:

ফুল বেলপাতা ড্যাডাং ড্যাং
ঘন কাসুন্দি ড্যাডাং ড্যাং
দিন যদি তোর চোখ শুষে নেয়
রাত্রিবেলার মাথায় ব্যাং

এ কবিতা কেমন? এ কবিতা কার? এইসব আকুল করা প্রশ্নের জবাবে সেই এগিয়ে থাকা দাদা বলেন, কেন তোমরা পড়োনি এই লেখা?

আমরা কী করে পড়ব? আমরা বারো ক্লাসের পরীক্ষা দিয়ে লায়েক হওয়ার পরে জেনেছি বাংলা কবিতা থেমে আছে সত্যেন্দ্রনাথে—

পিঙ্গল বিহ্বল ব্যথিত নভোতল
কই গো কই গো মেঘ উদয় হও

কিন্তু এই এক শ্রবণ, যার মধ্যবর্তিতায় সিলেবাসের কাঁটাতার পেরিয়ে কবিতার বড় আকাশের নীচে হুড়মুড়িয়ে এসে পড়ি আমরা, আমাদের মতো কেউ কেউ। আর সেই কেন্দ্রাতিগ টানের সামনে থেকে যায় তাঁরই নাম। এটা কোনও অতিকথন নয়। সত্যিই তো সাড়ে তিনদশক আগের প্রাক-বিশ্বায়ন কলকাতার কানঘেঁষা মফস্বল এমনই কূপমণ্ডূক হত, আর সেই এঁদো জলাশয়ের মধ্যেই একটা-আধটা এমন মানুষ মিলত যারা একটু মাথা তুলে বাইরে তাকাতেন। শুধু কবিতা নয়, সর্বত্রই।

ভিতরে ভিতরে এত বাঁধা আছে হৃদয়ের মানে

দোল-লাগানো ছন্দ আর বিদ্রুপের আলপনাবোনা ‘ফুল বেলপাতা..’-র পরে তাঁর আরও অজস্র কবিতা তখন কেবল শুনেই চলেছি আমরা। বিভিন্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে-থাকা বিকেলে, অবিন্যস্ত সন্ধ্যায়, প্ল্যাটফর্মের ঢালু-হয়ে-নেমে-আসা কংক্রিটে বসে। কারণ তখনও তাঁর ছাইরঙা-রেক্সিনে বাঁধানো ‘কবিতা সংগ্রহ’ আমাদের অনায়ত্ত। যদিও এখন উলটে দেখছি সেই বইয়ের দাম ছিল মাত্রই কুড়ি টাকা। পাতাগুলি মলিন এবং লেটার প্রেসের আবছায়া অক্ষর। আবছা কিন্তু বাঙ্ময়। অবশ্য খেয়াল রাখা দরকার এটা সেই সময়ের কথা যখন কলকাতায় ন্যূনতম বাসভাড়া ছিল পঁয়তাল্লিশ পয়সা, একটা আধুলি দিলে পাঁচ পয়সা ফেরত পাওয়া যেত। আর সেইসব ফাঁকি-দেওয়া বাসভাড়া আর টিফিনের পয়সা জমিয়ে জমিয়ে একদিন কেনা হয়ে ওঠে সেই বই। কিন্তু তার আগে এক অনাবিল ও ধারাবাহিক শ্রুতি। হয়তো-বা কবিতাকে চিনতে গেলে বুঝতে গেলে এবং জড়িয়ে ধরতে গেলে শ্রবণ একটি মস্ত বাধা— কিন্তু একজন কবিকে প্রাথমিক সম্মোহে খুঁজে পেতে গেলে খানিকটা ভুলভাবেই তা অব্যর্থ হয়ে ওঠে। অনৃতভাষণে রুচি নেই, তাঁর ক্ষেত্রে শুনেছি আগে, পড়েছি পরে— পড়া মানে তাঁর প্রাথমিক পাঠ। তার মধ্যে যেমন ছিল ‘দিনগুলি রাতগুলি’, তেমনই ‘জাবাল সত্যকাম’, ‘আরুণি উদ্দালক’, ভূমধ্যসাগর’, ‘সঙ্গিনী’, ‘বাবুমশাই’ ইত্যাদি ইত্যাদি। যে বাঙালি যুবক ‘সঙ্গিনী’ পড়েননি তাঁর মানবজন্ম বৃথা।

অন্যদিকে, আমার কাছে এই দেখা-না-দেখায় আবছা হয়ে থাকা তিনি প্রকাশ্য হলেন যাদবপুরের আর্টস ফ্যাকাল্টির আড়াআড়ি সেই কাঠের সেতুর ওপর। কোনও এক আশ্চর্য বিকেলে। সেই সেতু, যার নীচে থমকে-থাকা পানাভরা জল, সেই সেতু যা শুধু বিজ্ঞান অথবা কলা বিভাগকে জুড়ে দেয় না প্রযুক্তির সঙ্গে একই সঙ্গে জুড়ে দেয় নানা ভাবনার খণ্ড খণ্ড আকাশকে, শিক্ষার সঙ্গে বৃহত্তর সমাজকে, নিবিড় রাজনীতির মোহিনী পাঠ-কেও যা আনুগত্যের বদলে প্রশ্ন তুলতে শেখায়, প্রশ্ন করতেও। এই যে এক সৃজনমায়ায় ছেয়ে থাকা জীবন ও প্রস্তুতি সেখানে যেন বড় অনিবার্যভাবে এসে পড়েন তিনি। তাঁকে ছাড়া যাদবপুর ক্যাম্পাস ঠিক যেন মানায় না।

ঠিক এই সময়েই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ‘কবিতার মুহূর্ত’— হাতে হাতে ঘুরছে সেই বই। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘কাল রাতের বেলা গান এল মোর মনে’। কিন্তু একজন কবি ঠিক কেমনভাবে তাঁর কোনও খণ্ড মুহূর্তের উদ্দীপনকে রূপান্তরিত করেন কবিতায় এই রসায়ন হয়তো অজ্ঞাত, কেননা সে শুধু সৃজন নয় তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্নায়ু-উদ্দীপকের কিছু সাম্য অসাম্যেরও প্রতিফলন। কিন্তু রাসায়নিক সমীকরণ পেরিয়ে টেস্টটিউবের ভিতর যা পড়ে থাকে তা-ই তো কবিতা। কিন্তু তার যে এমন সুচারু ময়নাতদন্ত (বা অলোকরঞ্জনের ভাষায় চন্দনাতদন্ত) করে দেখানো যায় তার আস্বাদ বাংলা কবিতা অন্তত এর আগে পায়নি। আর সে লেখাগুলি পড়তে পড়তে বোঝা যায় ব্যক্তি কবির সঙ্গে সামাজিক কবির এক যুগলসম্মিলন— যার হাতে-গরম দৃষ্টান্ত হতে পারে ‘বাবরের প্রার্থনা’ ও ‘রাধাচূড়া’। ভিন্ন উদাহরণ আছে ঢের।

তার মানে তো এই যে যাদবপুরের ক্যাম্পাসে পড়ে-আসা বিকেলের আলোয় শুভ্র বসনে যিনি হেঁটে আসেন বন্ধুজনের পায়ে পায়ে, খুব নীচু অথচ জলদস্বরে দু একটা কথা বলেন— সেই শুভ্রতা আসলে কোনও বানিয়ে তোলা শুদ্ধতা বা শুচিতার আড়াল নয়, যেমন ভড়ং দেখান সঙ্ঘের সাধুরা— এই শুভ্রতা আসলে একরকমের স্বচ্ছ, মাথা উঁচু রাখা প্রতিবাদ, এই শুভ্রতা আসলে অনুচ্চার স্থাপনায় নিভন্ত চুল্লিতে আগুনের প্রণোদন! আর এই ব্যক্তি-নৈর্ব্যক্তি, একক-সমষ্টি টানা-পোড়েনের ভিতর দিয়েই উঠে আসে বিনীত জিজ্ঞাসা: কী আমার পরিচয় মা?

এই পরিচয় খুঁজে ফেরার আরেকটা দিকই তো ছিল তাঁর সেই বিখ্যাত ভাষণে। ‘প্রতাপ অন্ধতা’ শিরোনামের সেই লেখা পড়া হয়েছিল কলকাতা তথ্যকেন্দ্রে। ১৯৯০ সেপ্টেম্বর। যখন সরকার সমর্থক সকলেই বলবেন, না কোথাও কোনও ভুল নেই। তিনি একক স্বরে বলবেন, চেতনার প্রসারের থেকে এখন অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে অন্ধ আনুগত্যের দলীয় প্রসারকে। তখনও তিনি যাদবপুরেই। লম্বা করিডরের শেষে নিজস্ব একটা ছোট ঘর। তাঁর মতোই স্বতন্ত্র। সেখানেই তিনি ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্মাণ করে দিচ্ছিলেন নিজের পরিচয় চিনে নেওয়ার একটা সোপান। যেখানে দাঁড়িয়ে অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখা যায়। প্রসারিত দিকচক্রবালের অভিমুখে স্থির হয়ে থাকে নির্মোহ পর্যবেক্ষণ। বুকের প্রপাত ঝরে যায়।

শব্দ আর সত্য

‘বিশেষণে সবিশেষ’ যখন পড়া হয়ে ওঠে তখন তা ছিল ‘কবিতার মুহূর্ত’–র সঙ্গেই সম্পৃক্ত। কিন্তু ততদিনে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসেছি তাঁর গদ্যের দিকে, সম্পূর্ণত কিছু নতুন আহরণের প্রত্যাশায়। কবিতার পাশেপাশে গদ্যের ভুবনে তাঁর যে ধারাবাহিক বিচরণ তাঁরই যেন সূত্রপাত ঘটে ওই ‘শব্দ আর সত্য’–র মধ্যবর্তিতায়। অস্ফুট এলোমেলো কবিতা বোনার অক্ষম প্রয়াসের গায়ে গায়ে তখন একটু-আধটু হাত মকশো করছি গদ্যেও আর তাঁর জন্য একটা তো সামনে রাখার মতো প্রতিমা চাই। তিনি, বলা ভালো, তাঁর গদ্যই হয়ে উঠতে থাকে সেই সাধনার গর্ভগৃহ। অবশ্য কেবল লিখবার ধরনই নয়, পাশাপাশি সেই সব লেখাজোখার বিষয়-বৈচিত্র্য ও সেগুলিকে নকশিকাঁথার সূচিশিল্পে পাঠকের সামনে ফুটিয়ে তোলার লাবণ্য। ‘শব্দ আর সত্য’-র পর ‘ছন্দের বারান্দা’, ‘নিঃশব্দের তর্জনী’, ‘ঊর্বশীর হাসি’— একটার পর একটা ঢেউ আছড়ে পড়ে অভিজ্ঞতার উপকূলে। আর প্রতিটি বন্যার সঙ্গেই অবশেষ থাকে কিছু উর্বর পলিমাটি, তা কেবল নিজের জন্য। সেই বানভাসি জমিতে নতুনভাবে ঘর গোছানোর জন্য সেই মাটিটুকুর বড় প্রয়োজন ছিল। আমি, আমার মতো আরও অনেকের।

কবিতা পড়া কেবল নয়, কবিতার অন্তর্গত ভুবনে যদি জড়িয়ে নিতে হয়, বুঝতে হয় তাকে ভিতর থেকে তাহলে তারও একটা প্রস্তুতি লাগে, আবছাভাবে হলেও লাগে একটা পাঠ্যক্রম যা হয়তো সেইভাবে ছাপা হয় না কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে। বস্তুতপক্ষে এমন কোনও কেতাবি পাঠ্যক্রমের কথা তিনি নিজে ভাবেন না কখনও। অথচ নিজের যাবতীয় ভাবনার সারাৎসার, দেশবিদেশের ভাবুকদের সমূহ দর্শনের সান্নিধ্য ছুঁয়ে ছুঁয়ে তিনি একান্তভাবে নির্মাণ করেন একেবারেই নিজস্ব একটা ধাঁচ। সেই কারণেই ‘ছন্দোহীন সাম্প্রতিক’-এর মতো লেখা ছড়িয়ে যায় অনেকটা বিস্তার নিয়ে, ‘ছন্দের বারান্দা’ নিজেই সেই বারান্দার সীমারেখাকে ভেঙে ঘটিয়ে দেয় এক জাদু— সেই জাদুর আলোয় একবার সামনে আসে বারান্দা নয় প্রকাণ্ড এক কাব্যময় সাতমহলা বাড়ি, মুহূর্তে তা বদলে যায় মস্ত আকাশের ক্যানভাসে। আসলে এর সবটাই তো কবিতার ভুবন।

এই ভুবন হয়তো একান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সকলেরই বুকের ভিতর, অন্তত যাঁরা কিছু বা সংবেদনশীল, যাঁরা কান পেতে শুনতে চান জীবনের স্পন্দন। কিন্তু সেই অদীন ভুবনকে তুলে ধরতে গেলে ছিঁড়তে হয় বুকের বসন— নির্মোহভাবে দেখাতে হয় তার প্রতিটি ক্ষরণ ও নির্মাণ, যা থেকে আগামীর পাঠকও যেন কিছু দু-আঁজলা ভরে পেতে পারেন। এই পাঠক কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা সাহিত্যের পাঠক নন, আবহমানের এক শিল্পভাবুক। রবীন্দ্রনাথের ‘পূজা’র গানের মতোই যারা গভীর নাস্তিক্যের ভিতর দিয়েও ছুঁতে পারে সেই গানের শরীর।

যুধিষ্ঠিরের রথচক্র

রবীন্দ্রনাথের যে গান আবহমান বাঙালির চিরকালের সম্পদ সেই গানের অতলস্পর্শী সাগরেও ডিঙা ভাসিয়েছেন তিনি। হতে পারে এই বিষয়ে তাঁর অগ্রজরা কিছু দিকচিহ্ন রেখে গেছেন আগেই— বিশেষ করে বুদ্ধদেব বসু ও আবু সইয়দ আয়ুব— কিন্তু তিনি সেই পথের অনুবর্তী হলেও স্বতন্ত্র এক পথরেখা নির্মিত হয়েছে তাঁরই অক্ষরের আলোয়। গান নিয়ে বাঙালির তথা সারা মানবজাতির এই এক পরমাশ্চর্য সঞ্চয় যখন কেবল গাওয়ার বা শোনার বিষয় বলে সুচিহ্নিত করে দিয়েছি সবাই, সেখানে তাঁর গভীর ভাবনাগুলি আমাদের সামনে প্রক্ষেপণ করে এক মস্ত প্রান্তর। আসলে তিনি বলতে চান রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়ার, শোনার ও ভাবারও এক বর্ণময় বিষয়। সেইসব গান স্বতন্ত্র কবিতার মতো পড়া যায় এবং কবিতার মূল্যেই তাকে নিজের মধ্যে আত্মীকৃত করা যায়, তাঁর ভাবনার সূত্রগুলি কেবলই আমাদের চালিত করে এই সিদ্ধান্তের কিনারে।

তাই রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া মানে ভাবনার অন্তর্বস্তুকে স্মরণে রেখে গাওয়া, সেই গান শোনা মানে প্রতিটি শব্দের ও সুরের নিজস্ব আলোয় মেলে ধরা শ্রবণ। আসলে সুর কেবলই আড়াল করে দিতে চায় বাণীর দ্যুতি ও বিভা, সেই চলাচলের মধ্যে দিয়েই প্রতিটি গান শোনাই যেন এক নতুন আবিষ্কার। বস্তুতপক্ষে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘শুনিবার প্রতিভা থাকা’র কথা। কিন্তু কেমন হতে পারে সেই প্রতিভার বিচ্ছুরণ ও প্রস্তুতি তারই যেন এক আদল ধরা থাকে তাঁর রবীন্দ্রগান বিষয়ক লেখায়।

সেই লেখাগুলির মধ্যে থেকে গেছে তাঁর কিছু স্বতন্ত্র বীক্ষণ। সারাজীবনের গানের ভিতর যে কেবলই এক তরীর চলাচল আছে, এই খবর তিনিই খুঁজে বার করে তিনি দেখিয়েছেন আমাদের। বলেছেন, বিশু পাগলের গান আর দামিনীর গান আলাদা আলাদা মানে তৈরি করে দেয় পাঠকের কাছে। দূর প্রবাসে বসে গান তৈরি করার মধ্যে দিয়ে কীভাবে স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ছুঁতে চান ও শমিত করতে চান নিজের আত্ম-অন্বেষণের প্রান্তকে, এই বার্তা বহন করে তাঁর নিবন্ধগুলি। তিনি এই গানের শ্রবণ অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চান যুধিষ্ঠিরের রথচক্রকে— যে গানের অবলম্বনে দিনানুদিনের ক্লিন্ন জীবন থেকে আমরা উঠে আসি ভূমিতলের কিছু বা উপরে— আমাদের প্রতিদিনের গতানুগত জীবন ও মরণ যেন বা এক ভিন্ন অর্থ বহন করে আনে তখন। চোখের জলের জোয়ারে ভেসে যেতে যেতে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভোরের আলোর কানাকানি। আমাদের সমস্ত ব্যথার আড়াল থেকে কেঁদে ওঠে এক আঁধার রাতের একলা পাগল: বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে!

আর এই বোঝাবুঝির অভিপ্রায়ে আমাদের কেবলই এসে হাত পাততে হয় তাঁর ভাবনার সামনে। রবীন্দ্রনাথের গানই কেবল নয়, কবিজীবনের নানা ওঠাপড়া, তাঁর পরিক্রমার আনাচ কানাচ সবই হয়ে ওঠে তাঁর গভীর অভিনিবেশের বিষয়। ‘এ আমির আবরণ’ এর মতো বইয়ের পাশাপাশি ‘দামিনীর গান’ যেমন আমরা পেয়ে যাই, ঠিক তেমনই পাই ‘উর্বশীর হাসি’, ‘কবির অভিপ্রায়’ ‘নির্মাণ ও সৃষ্টি’ ইত্যাদি— যার প্রতিটিই একেকটি হীরকখণ্ড, যেগুলি আমাদের ফিরে ফিরে পড়তে হয় বারবার, শুধুমাত্র সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবপুত্রকে জানা ও বোঝার অভিপ্রায়ে। এই কাজ তেমন সহজ নয় কারণ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কিছু বলতে বা লিখতে গেলে প্রথমেই প্রতিপক্ষ হিসেবে সামনে আসে তাঁকে কেন্দ্র করে জড়ো হওয়া বিপুল অক্ষরবিশ্ব— এই প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে নতুন কিছু কথা বলতে যা লাগে সেটা আজ অনেকের রক্তেই অনুপস্থিত।

তাছাড়া এটাও সম্ভবত খেয়াল করা দরকার, রবীন্দ্রনাথের নাটক বিষয়েও রয়ে গেছে তাঁর স্বতন্ত্র উচ্চারণ যার উল্লেখ্য স্মারক ‘কালের মাত্রা ও রবীন্দ্রনাটক’। যার মধ্যে ধরা আছে এমন সব উচ্চারণ যা আরেক দিক থেকে আলো ফেলে রবীন্দ্রনাথের ওপর। বস্তুত রক্তকরবী নাটকটি সরাসরি এক বিদেশি নাটকের ছায়ায় রচিত, এমন এক অভিযোগ করেছিলেন কেউ কেউ। সেই অভিযোগের বিপরীতে তিনি তুলে এনেছিলেন এমন সব প্রসঙ্গ যে আর কোনও পালটা কথার কোনও সুযোগ পাননি সেই অভিযোগকারীরা। এখানে তিনি নিজেই এক অথরিটি যাকে ঘিরে কোনও বিতর্ক ছিল না কোথাও। তাঁর এক প্রাক্তন ছাত্র বলেছিলেন, ক্লাসঘরে তাঁর কাছে রক্তকরবীর পাঠ নেওয়ার অবিস্মরণীয় এক অভিজ্ঞতার কথা। পৃথক কোনও ভাবনার স্ফূরণ না থাকলে ক্লাসঘরে রবীন্দ্রনাথকে মানিয়ে নেওয়া খুব কঠিন। শুধু রবীন্দ্রনাথই বা কেন, সাধারণভাবে বাংলা নাট্যজগতের সঙ্গে তাঁর যোগের কথা আমাদের অজানা ছিল না। কিংবদন্তী শম্ভু মিত্রের কাছে বারবার ছুটে গেছেন তিনি, তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বই হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাটক প্রযোজনার ক্ষেত্রে তো বটেই, অন্য নানা সিরিয়াস নাটকের ক্ষেত্রে অনেক নাট্যদল আছেন যারা নতুন নাটকের ভাবনার প্রাথমিক অভিভাবক হিসেবে তাঁকে মানতেন, তাঁর সম্মতি ও প্রতিক্রিয়া পেলে বুকে ভরসা পেতেন। এ এক মস্ত অর্জন। কবিতা সাহিত্য-নিবন্ধের বাইরে এমন অনেক নাট্য প্রযোজনা পেয়ে চলেছিল তাঁর সস্নেহ প্রশ্রয়। মনে পড়ে, ‘রুদ্ধসঙ্গীত’ নাট্যের প্রথম অভিনয়ের পর ধীরে ধীরে গিরিশ মঞ্চের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছেন তিনি আর প্রযোজকরা ঘিরে ধরছেন তাঁকে। আবার তাঁরই অনূদিত গিরিশ কারনাডের ‘রক্তকল্যাণ’ যখন প্রথম মঞ্চস্থ হয় অ্যাকাডেমি প্রেক্ষাগৃহে, অশক্ত শরীরেও সামনের সারিতে বসে থাকেন তিনি। এই বৈচিত্র্যময় জীবনের মধ্যে তাঁর পদচারণা আমাদের অহঙ্কার ছিল এতদিন।

বহুল দেবতা বহু স্বর

অনুবাদের কথা যখন এসেই পড়ল তখন বলতেই হয় বাংলা কবিতার অনেক সামর্থ্যবান কবিই সার্থক অনুবাদক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন। বুদ্ধদেব বসুর হাত ধরে যার সূত্রপাত। সেইদিক দিয়ে তিনি এর যোগ্য উত্তরসূরি। বন্ধু অলোকরঞ্জনের সঙ্গে যৌথ প্রচেষ্টায় ‘সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত’ সম্পাদনার সময় যার সূত্রপাত, পরে তিনি হাত দিয়েছেন নানান অনুবাদের কাজে যেগুলি গুণমানে কোনওটিই কম যায় না। তাঁর মধ্যে যেমন বিদেশি সাহিত্যের মণি-মাণিক্য, পাশাপাশি থেকে গেছে দেশীয় নানা কবি-সাহিত্যিকদের লেখা। অনেকেই অনুবাদকর্মকে ঠিক ততটা মৌলিক সৃষ্টির মর্যাদা দিতে কুণ্ঠিত কিন্তু আদপে অনুবাদের কাজ মোটেও কোনও অনায়াস কাজ নয়। বিশেষত অনুবাদক নিজে যদি একজন প্রথম শ্রেণির স্রষ্টা হন তবে নিজের সৃজনসত্তাকে সংবৃত করে অনুবাদ করে চলা খুব শ্রম ও মেধাসাধ্য কাজ— হয়তো যার স্বীকৃতি তেমন প্রত্যক্ষ হয়ে উঠতে পারে না।

কিন্তু শিল্পকে যিনি দেখতে চান এক সমগ্রতায় তাকে তো নিজেরই জন্য খুঁজে পেতে দেখতে হয় দেশ-বিদেশের সৃজনভাবনার খোদিত মুহূর্তগুলি, আর সেই কাজের অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠতে পারে অনুবাদের অন্তর্তাগিদ। ‘সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত’ পর্যায়ের একটু একটু করে হয়ে-ওঠা অনুবাদগুলির পেছনে ছিল এক মরমী আবেগ, এই কথা নিজেই জানিয়েছিলেন তিনি এক আত্মজৈবনিক রচনায়। অন্যপক্ষে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সেই ঐতিহাসিক ডায়েরি হাতে পেয়ে তিনি তো নিজেরই উদ্বোধনে অনুভব করেছেন ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’কে প্রকাশ্যে আনার। সেই খননের মধ্যে ছিল কবিকেও নতুন চোখে দেখবার ও দেখাবার এক প্রণোদন। অন্যদিকে নিকোলাস গ্যিয়েনের কবিতা তর্জমায় তিনি দেখালেন একেবারে অন্য গোলার্ধের এক কবির অন্তর্জগৎ। আবার গিরিশ কারনাডের নাটককে বাঙালি নাট্যমোদীর কাছে উঠিয়ে আনার দায়েও তিনি সযত্ন প্রয়াসী। একইভাবে চেরাবান্ডা রাজুর কবিতার ভুবন তিনি ধরতে চান অনুবাদে, নির্মিত হয় ‘ঢেউয়ে ঢেউয়ে তলোয়ার’— এইভাবেই একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে তাঁর অনায়াস গতায়াত। কেউ তাঁকে বাধ্যতায় যুক্ত করেননি তবু তিনি হেঁটে গেছেন সমান্তরাল অনুবাদের কাজে। অনূদিত হয়েছেন ইকবাল। ভারতের নানা প্রদেশের কবিতা জড়ো করে গড়ে উঠছে ‘বহুল দেবতা বহুস্বর’।

এই বহুস্বরকে তিনি মিশিয়ে নিতে পারেন নিজের স্পষ্ট জীবনদর্শনে— অনুবাদের আলোয় যে বহুল বিশ্বের ছবি ধরা পড়ে তাঁর ভাবনার ক্যানভাসে তাই কি ঋদ্ধ করে তাঁকে? আমাদের সেকথা না জানলেও চলে। ‘আমরা তারেই জানি, তারেই জানি পথের সাথী…’

আধখানা মুখ বাইরে রাখো

সুভাষ মুখোপাধ্যায় তখন সক্রিয় রাজনীতির পদাতিক। নিজেদেরই কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার অনুরোধে ডেকেছিলেন অনুজ কবিকে। অনুষ্ঠান শেষে একটু একান্ত নিভৃতি, মুখোমুখি দুই প্রজন্মের কবি। অনুজের আশঙ্কা, এইবার হয়তো প্রিয় অগ্রজ কবি তাঁকে সরাসরি রাজনীতিতে নেমে পড়ার ডাক দেবেন। সেই আহ্বান তিনি গ্রহণ করবেন কী করে? আর ফেরাবেনই বা কী করে? মনে মনে আড়ষ্ট হতে থাকেন অনুজ, বহন করতে থাকেন অসোয়াস্তি আর চোরা অশান্তির আলোড়ন। কিন্তু তাঁকে সম্পূর্ণ অবাক করে সুভাষ মুখোপাধ্যায় সেইদিন পরামর্শ দিয়েছিলেন, সরাসরি দলে নাম লেখানো থেকে দূরে থাকার। অনুজের কাছে সে ছিল এক অনুমানের অতীত এক ব্যতিক্রম। কিন্তু আসলে কি এর ভিতরে বার্তা ছিল না কোনও?

আজ বোঝা যায়, ছিল। চালের দাবিতে উদ্ভুত গণসংগ্রামে পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে-পড়া কিশোরীকে নিয়ে যিনি ‘যমুনাবতী’ লিখে আমাদের চমকে দিয়েছিলেন সেই তিনিই একের পর এক কবিতায় বিদ্রুপ ছুঁড়ছিলেন জরুরি অবস্থার কণ্ঠরোধের বিপরীতে, বারবার তাঁর লেখা রাইটার্স বিল্ডিঙের মহাপুরুষদের সেন্সর কাঁচিতে খণ্ডিত হয়ে ফিরে আসছিল আর তিনি ভিতরে ভিতরে প্রস্তুত হচ্ছিলেন বিবেকের কাছে হার না-মানার। রাষ্ট্র-প্রযোজিত হননে বহরমপুর জেলে নিজের প্রিয় ছাত্র তিমির-এর নিভে যাওয়া দেখে বিষাদে গ্রস্ত হয়ে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন: দেবতাদের অভিমান এইরকম! এর পরেও তিনি মুখ ফেরাননি বাইরের অলিন্দ থেকে।

তাঁর ‘জার্নাল’ যারা পড়েছি, তারা জানি, যারা তাঁর নানা বিষয়ের লেখালিখির খবর রেখেছি, তারা জানি, অগ্রজ কবির সেই অমোঘ পরামর্শ মেনেছেন বলেই তিনি নিজের পরিধি বাড়িয়ে নিতে পেরেছেন দলবিশেষের বাইরে। নইলে কণ্ঠরোধী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বুকে ধরে যখন তিনি দেখেন ‘বুড়িরা জটলা করে আগুনের পাড়ায়’ অথবা হাসপাতালে বেজে ওঠে ‘বলির বাজনা’ তাঁর অল্প পরেই মরিচঝাঁপির অন্ধকার তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় ‘উল্টোরথ’-এর মতো কবিতা। আশির দশকে বিহারে কৃষকদের গণহত্যা নিয়ে আরোয়াল কান্সারা যখন শিরোনামে তিনি কলম গুটিয়ে রাখেননি। দলনির্দিষ্ট এক শাসনের নাগপাশে যখন এই রাজ্যে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল আমাদের জীবনযাপন, মানুষের বদলে যখন একমাত্র বিবেচিত হচ্ছিল তার দলতিলক ঠিক তখনই তিনি লিখতে পেরেছিলেন: তুমি কোন দলে? পুলিশি দমনপীড়নকে যখন বেপরোয়া স্পর্ধায় অনুমোদন দিচ্ছিলেন প্রশাসন— তিনিই অকপটে লিখতে পেরেছিলেন সুতীক্ষ্ণ বিদ্রুপে: আমার পুলিশ কোনও অন্যায় করে না/ যতক্ষণ তারা আমার পুলিশ। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা বিষয়ে একদিন তিনি যে কথা লিখেছিলেন, সেই ‘স্লোগানকে কবিতা করে তোলার’ মায়াবী জাদু তিনি নিজেই তুলে নিয়েছিলেন হাতে।

এইসবের আরও অনেক পরে যখন সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন ঘিরে সারা রাজ্য উত্তাল আর ক্ষমতার মোহে অন্ধ শাসক আন্দোলনকে স্বীকৃতি না দিয়ে কুৎসায় একরোখা, নিজের শীলিত সীমানায় দাঁড়িয়ে তখন তিনি লেখেন আরেক বিদ্রুপগাথা:

আমি তো আমার শপথ রেখেছি অক্ষরে অক্ষরে
প্রতিবাদীদের জীবন দিয়েছি শুধুই নরক করে

সেই কবিতা পঙক্তি দাবানলের মতো ছড়িয়ে গিয়েছে সর্বত্র। আমরা টিভির পর্দায় তাঁকে দেখেছি লালবাজারের গেটে দাঁড়িয়ে থাকতে। উদ্বিগ্ন। ভিতরে তখন গ্রেফতার হয়ে বন্দি রয়েছেন প্রতিবাদীরাই। কবিতা, শব্দ, অক্ষর, ছন্দ সব নিয়ে তখন রাস্তাই একমাত্র রাস্তা।

সেই একই রাস্তায় তাঁকে দেখেছি আবার গ্রীষ্মদুপুরের কলেজ স্ট্রিটে। কামদুনির গণধর্ষণ নিয়ে তখন রাজ্যজোড়া উত্তেজনা, পাশাপাশি শাসকের সেই একইরকম কুৎসা আর মিথ্যাচার আসলে যা পাপীদের আগলে রাখার গোপন অ্যাজেন্ডা। একরকম তিনি আর অশোক মিত্রের আহ্বানেই সেদিন জনসমাবেশ উথলে উঠেছিল কলেজ স্ট্রিটে, নীরব প্রতিবাদের সুবিন্যস্ত মিছিল এগিয়ে গিয়েছিল ধর্মতলার দিকে। সামনে তো সেদিন তিনিই ছিলেন সারা বাংলার জাগ্রত বিবেক হিসেবে। সেই তিনি, যিনি লিখেছেন, জেগে থাকাও একটা কাজ।

আর সেই কাজ এখনও অসমাপ্ত। দিন তারপর আরও বিষাক্ত হয়েছে নিয়ত। রাজ্য ও দেশজুড়ে একদিকে সাম্প্রদায়িক আড়াআড়ির ধারালো হিংসার প্ররোচনা, অন্যদিকে এক মননহীন স্তাবকতার দিশাহীন সাম্রাজ্য— যেখানে বহুস্বর বা বহুল দেবতাকে এড়িয়ে একেশ্বরের আকাট মহোৎসব। সমস্ত দেশই আজ জাউঘর। আমরা ভালো নেই। দূর দেশ থেকে আমাদের চেতনা দখলের মরিয়া আয়োজনে আজ আর কোনও আড়াল পর্যন্ত চোখে পড়ে না। কুপিত দেবীর গ্রাস থেকে মৃত লখিন্দরকে বাঁচাতে ঠিক যেমন একদিন বেহুলা সব আবরণ সরিয়ে ফেলে মুখোমুখি হয়েছিলেন দেবতাদের সভায়। ঠিক তেমনই সব আজ নিলাজ। তবে তাতে কোনও জীবনের আর্তি নেই, যা আছে তা শুধু ধূর্ত ফন্দি আর বিভাজনের বিষাক্ত ফলা।

আর আমরা ভালো নেই বলেই এত দিন জেগে ছিলেন তিনি। আমাদের আগলে ছিলেন। মৌলবাদী হিংসার বিরুদ্ধে গলা তুলেছেন। স্পর্ধিত দেশনায়কের কলঙ্কিত হাত থেকে পুরস্কার নিতে অস্বীকৃত হয়েছেন। পুরস্কারের অর্থ দান করেছেন সমাজকল্যাণে। অপমানিত হয়েছেন মূর্খ ফেরেব্বাজদের হাতে, তাদের অপভাষায়। ধিক্কার দিয়েছেন গণতন্ত্র-বিরোধী আগ্রাসনকে আর কোন বীরভূমি মাফিয়ার গলায় বেজে উঠছে নির্দয় অশিক্ষার ভাষণ: এ কোন কবি? ঠিকই তো, তার মুখচেনা কবিরা ক্ষমতার সিংহাসন পরিষ্কার করে দেন, রাজানুগ্রহে কৃতার্থ হয়ে বন্দনাগান লেখেন, অনুগৃহীত হয়ে কমিটির পদে উপগ্রহের মতো স্থবির বসে থাকেন। না ইনি তো সত্যিই সেই কবি নন। আর এই মাত্র তিন সপ্তাহ আগেই তো রাজ্যের তথাকথিত প্রগতিশিবির থেকে তার উদ্দেশে কেউ কেউ ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন ভণ্ডামির কুৎসিত অভিযোগ। তিনি তখন অসুস্থ ও প্রায় নীরব। আর নীরবতাই ছিল তার শস্ত্র। রাষ্ট্র তাঁকে সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে ঠিক, কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহিতার ভুয়ো অভিযোগে আটক চিকিৎসক ও মানবাধিকার কর্মী বিনায়ক সেন যেদিন মুক্তি পেয়ে কলকাতায় এলেন, নাগরিক সমাজের পক্ষে তিনিই তো তাঁকে পরিয়ে দিয়েছিলেন সম্বর্ধনার উত্তরীয়। সদ্য কারামুক্ত আরেক বিবেকী কবি ভারভারা রাও-এর কবিতা একসময় অনুবাদ হয়েছিল তাঁরই হাতে। এক কবির বন্দিত্ব নিয়ে আরেক কবি বিচলিত হয়েছেন এই সেদিনও। নিজের অশীতিপর বয়স, অশক্ত শরীর— তবু তিনি বাঁধ দিয়ে চলেছিলেন প্রতিরোধের, নতুন ভাষার, নতুন কবিতা আর মুক্ত চেতনার। আরুণি উদ্দালক।

বাঁধ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা সব সময় মুক্তির নয়, কখনও তা বিপন্নতার।

বাজনা রয়েছে পড়ে, ফিরে গেছে বাজাবার হাত।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...