স্তব্ধ তোপধ্বনি— এক কবির অন্তিম যাত্রায়

অনিতা অগ্নিহোত্রী

 



কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক

 

 

 

 

পরিচিত এক তরুণ লেখক শঙ্খ ঘোষকে বলেছিলেন, আপনি আছেন বলে সুরক্ষিত বোধ করি। আজ বসে ভাবছি, এ কেমন সুরক্ষার বোধ, যা রুট মার্চ করতে থাকা, ভোট কেন্দ্রের গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে পড়া হাজার কম্পানি সশস্ত্র পুলিশও দিতে পারে না?

শঙ্খ ঘোষের প্রয়াণে আমাদের মনে যতখানি তীব্র হয়েছে তাঁকে হারাবার বেদনা, ততখানিই প্রবল হয়েছে এক নিঃস্বতার, অভিভাবকহীনতার অনুভূতি। এই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, গদ্যকার, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক তিনি। অথচ এই সব কিছুর সম্মিলিত শক্তির চেয়েও অনেক বেশি দীপ্যমান ছিল তাঁর উপস্থিতি, যা প্রায়শই শব্দহীন, নীরব। খ্যাতির শিখরে পৌঁছনোর পরও, সাহিত্য অনুষ্ঠানে দর্শক আসনে নিয়মিত এসে বসেছেন তিনি, ছোটখাটো অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানেও। মঞ্চে অভিভাষণ তিনি বহু কাল দেন না। নবনীতা দেবসেনের পরিহাসমাখা অভিযোগের উত্তরে নিজেকে ‘বোবা কবি’ অভিধা দিয়েছেন নিজেই।

এমন স্বল্পবাক একজন মানুষের চিন্তার নেতৃত্বে আমরা অভ্যস্ত বহুদিন। পশ্চিমবাংলায় নন্দীগ্রামে গুলিচালনার পর পরিবর্তনের জন্য বিরাট মিছিলের পুরোভাগে শঙ্খ ঘোষ ছিলেন। অথচ পরিবর্তিত সরকারের সৃষ্ট নানা পরিস্থিতি— যেখানে মেয়েদের স্বাধীনতা ও সমানাধিকার বিপন্ন, অথবা মানবাধিকার আক্রান্ত, বুদ্ধিজীবী-সমাজের পুরোভাগে থেকে নেতৃত্ব তিনিই দিয়েছেন। ক্ষমতার সান্নিধ্যে যাঁদের বাস, শঙ্খ ঘোষ তাঁদের প্রিয় ছিলেন না কোনওদিন। অথচ তাঁর মত এবং চিন্তাকে উপেক্ষা করবে এমন সাধ্য কোনও শাসকের ছিল না। তার কারণ কবিপ্রতিভা ও চিন্তার স্বাধীনতার যুগ্মশক্তি তাঁকে দিয়েছিল বাঙালির একমাত্র নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীর মর্যাদা। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতাবৃত্তের সম্পূর্ণ বাইরে বসবাস করেও তিনি ছিলেন নিজের স্বাধীনতার বলে বলীয়ান।

শঙ্খ ঘোষের জ্যোতির্বলয়ের কাছে আমি কোনও দিন যাইনি। তাঁর কাছে গেলে পাছে অন্যরা মনে করে নিজের জন্য কিছু চাওয়ার আছে। সঙ্কোচ ও আত্মসচেতনতার এক যুক্তিহীন ককটেল আমাকে তাঁর সান্নিধ্য থেকে দূরে রেখেছে। তবে সাহিত্য অনুষ্ঠানে দেখা হলে আশ মিটিয়ে প্রণাম করেছি, আশীর্বাদ নিয়েছি। এমন মানুষ, যাঁকে বার বার প্রণাম করতে ইচ্ছে করেছে, আমার জানায় আর বিশেষ কেউ নেই।

ব্যক্তিগত স্বভাবে তিনি শান্ত ও লাজুক, অথচ প্রবলভাবে স্নেহপ্রবণ। কবিজীবনের গোড়া থেকেই তরুণ কবিদের লেখা নিয়মিত পড়ে এসেছেন শঙ্খ ঘোষ, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে বোঝার চেষ্টা করা, তাদের ব্যক্তিগত সঙ্কটে পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনে দীর্ঘকাল, সবই তাঁর জীবনযাপনের অঙ্গ ছিল। এক তরুণ কবিবন্ধুকে বলেছিলেন, তোমাদের সব খবর আমি রাখি, কারণ তোমাদের হয়ে জবাবদিহি তো আমাকেই করতে হয়! তাঁর এই স্বভাব-ঔদার্যের কারণে উত্তর কলকাতায় তাঁর বাসভবন হয়ে উঠেছিল কবি, লেখক ও গুণগ্রাহী মানুষের আশ্রয়। মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকাই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম আনন্দ, বিশেষ করে শেষ দু-তিন বছর, যখন তিনি ইচ্ছেমত সর্বত্র যেতে পারতেন না। তাঁকে ঘিরে আড্ডার কোলাহলে আমরা খেয়াল করে দেখিনি তাঁর গহন নীরবতা, কোভিড সংক্রমণের কালেও মাস্কবিহীন সেলফির আবদার তিনি ফেরাননি। নিজের শর্তে জীবন কাটিয়ে অতিমারির পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন শঙ্খ ঘোষ।

অথচ আমরা আরও কত কিছু পেতে পারতাম তাঁর কাছ থেকে। শেষ জীবন পর্যন্ত নিবিড় পাঠের অভ্যাস ছিল শঙ্খ ঘোষের। সে বড় মুন্সিয়ানার পড়া, মার্জিনে নোট রেখে, বাক্যের নীচে লাইন দিয়ে। কত গবেষককে তাঁদের রবীন্দ্রচর্চা সম্বন্ধিত কাজে তিনি পথনির্দেশ ও পরামর্শ দিয়েছেন, অকৃপণভাবে নিজের সময় দিয়ে। প্রবীণ নাট্যবিশেষজ্ঞ থেকে তরুণ গবেষকের রবীন্দ্র-অনুসন্ধানে তাঁর উদার সহায়তা ছিল শর্তহীন। তাঁকে ভালোবাসা, সমাদর জানানোর পাশাপাশি আমরা, পরবর্তী প্রজন্ম, কি শঙ্খ ঘোষের সান্নিধ্য থেকে আরও কিছু আয়ত্ত করতে পারতাম? তরুণতর লেখক কবিদের জন্য নিজেদের দরজাও আরও একটু খুলে রাখতে পারতাম না, শঙ্খ ঘোষের কাছে যে চিন্তার আশ্রয় পেয়েছি, তার অনুরণনে?

মননের সঙ্গে মুক্তচিন্তার বিরোধ নেই, তা শঙ্খ ঘোষ নিজেই প্রমাণ করেছেন। কিন্তু তাঁর স্বাধীন চেতনা, নিরপেক্ষতা শেখার কৃচ্ছ্রসাধন আমরা করতে চাইনি। তাই রাজসভাসদের সুখের আসন আমাদের অনেকেরই বেশি কাম্য মনে হয়েছে।

নাহলে ‘বাবরের প্রার্থনা’ (১৯৭৭) থেকে ‘এই এক ব্যথা উপশম’ (২০১৭) পর্যন্ত অর্ধশতক ব্যাপী কবিতার ব্রহ্মপুত্রকে আমাদের ঘরের পাশে পেয়েও আমরা কেবল অঞ্জলি ভরে পানই করলাম, সাহিত্যিক ঐতিহ্যের পুনঃসৃজনের কঠিন পথে গেলাম না।

কবিতার মতই শঙ্খ ঘোষের গদ্যসংগ্রহ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। অগ্রজ কবিদের মূল্যায়ন থেকে সাম্প্রতিক কবিতার বিশ্লেষণের কাজ তাঁর কলমে ঘটেছে অতি সহজ অন্তরঙ্গ আলাপচারিতার মত। এগুলি সাহিত্যের পাঠক, শিক্ষার্থী সবার কাজে লাগবে। বাংলা ভাষাকে নিজের প্রতিভাবলে সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মান যিনি এনে দিয়েছেন, তাঁর নিজের পুরস্কারের গৌরব নিয়ে কোনও মোহ নেই। সরস্বতী সম্মান প্রদানকালে শঙ্খ ঘোষ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিতে অসম্মত হন, তিনি জানিয়ে দেন, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ঘটেছিল, তার থেকে তিনি তৎকালীন কেন্দ্র সরকারের ক্ষমতায় আসা এবং তার শীর্ষবর্তী প্রধানমন্ত্রীকে বিযুক্ত করতে পারেননি। কাজেই, কিছুই আশ্চর্য নয়, যে শঙ্খ ঘোষ একই সঙ্গে সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অতন্দ্র প্রহরী এবং রাষ্ট্রশক্তির নির্ভীক সমালোচক। তাঁর অভিভাবকত্ব যেমন আমাদের এ যাবৎ পথ দেখিয়েছে, পরিণত বয়সে তাঁর প্রয়াণ কি আমাদের প্রাপ্তমনস্কতা অর্জন করতে সাহায্য করবে না?

গত এক বছরেরও বেশি সময় অতিমারির পাশাপাশি সারা দেশে চলেছে অন্য এক দুঃসময়। সাধারণ মানুষের গৃহবন্দিত্বের, বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়ে একের পর এক সামাজিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী নীতির প্রণয়ন, জীবিকাহীন নিঃস্ব শ্রমজীবীদের জীবিকা নিয়ে বিকট তামাশা। এই দুঃসময়ের লেখালিখির মধ্যে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল শঙ্খ ঘোষের রচনার পাঠ। মনে যখন সন্দেহ জেগেছে, যাদের জন্য লিখছি, তাদের কাছে লেখা পৌঁছচ্ছে কি? তখন ফিরে গেছি তাঁর মৃদু উচ্চারণে নিহিত গভীর বিশ্বাসের কাছে।

এ চিঠি লিখবার কোনও মানে হয় না— তবু লিখে যাই
এও এক ব্যথা উপশম!
আর কিছু নয় শুধু একবার— একবার মাত্র
বলুন অসির চেয়ে আজও যে মসিই বড়
আপনিও তা অকাতরে বিশ্বাস করেন?
দূর এই প্রান্তিকের মৃত্যুস্বাদ পৌঁছে দিতে আপনিও কি কোনওদিন ধরেন কলম?

(নিরুত্তর চিঠি)

আর গণতন্ত্রের ধারকদের মনস্তত্ত্বের বিশ্লেষণে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে সেই দুই গুরু শিষ্যের কথোপকথন, চলমান দুজনেরই আঙুল ট্রিগারে—

একাকী যে তাকে নিয়ে নেই কোনও ভয়।
অনুবর্তী সবাইকে ভিতরে ভিতরে শুধু একা করে দাও
তার পরে চেয়ে দেখো কটা মাথা আছে কার ঘাড়ে!
পরস্পর হন্যমান প্রত্যেক—
আত্মগত সুখ আর অজানা আতঙ্কে তারা মেনে নেবে যে কোনও অন্যায়—

(গুরুশিষ্য সংবাদ)

দৃশ্যত একাকী, কিন্তু মননে নন। তাই কবির অভিপ্রায় নিয়ে কিছু শঙ্কা তো ছিলই ক্ষমতার পাল্কিবাহকদের। আজ এইমাত্র আগুনের ধারে শায়িত কবির ইচ্ছায় স্তব্ধ হল রাষ্ট্রের তোপধ্বনি। এই নীরবতা যে কবির প্রাপ্য মর্যাদা, তা বুঝতে হল রাষ্ট্রকেও। আমরা লেখক-কবিরাও সম্ভবত বুঝলাম আমাদের প্রাপ্তমনস্ক হয়ে ওঠার প্রহর সমাগত।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3316 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...