Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

শতবর্ষে রেবা হোর: ফিরে দেখা

বিষাণ বসু

 


যেখানে শিল্পীর জীবন ও যাপন এবং তাঁর শিল্পচর্চা মিলেমিশে একাকার— সেখানে সোমনাথ-রেবার যৌথ যাপন এবং এক ছাদের নিচে থেকেও তাঁদের ভিন্নধর্মী ও স্বতন্ত্র শিল্পচর্চার দিকে আমাদের বারবার ফিরে আসতে হবে। যেখানে রয়েছে শিল্পচর্চার প্রতি সাধকতুল্য নিষ্ঠা— যেখানে রয়েছে শিল্পের প্রতি নিরন্তর আনুগত্য— এবং এক আশ্চর্য শৃঙ্খলা। শেষের কথাটা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ— কেননা ইদানীং যখন উচ্ছৃঙ্খলতাকে শিল্পচর্চার অন্যতম প্রধান ধর্ম, এমনকি প্রাকশর্ত, হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, তখন সোমনাথ হোর-রেবা হোরদের জীবন ভিন্নতর সত্যের আভাস দেয়

 

মেয়েটা যাকে বলে বড়ঘরের মেয়ে। বাবা পরাধীন ভারতে কোর্টের জজ হলেও দেশপ্রেম প্রবল। পাছে ব্রিটিশরাজের রোষানলে পড়ে চাকরি চলে যায়, এবং তেমন ক্ষেত্রে তিনি যাতে ব্যারিস্টারি করে স্বাধীনভাবে উপার্জন করতে পারেন, তাই তিনি বিলেত গেলেন ব্যারিস্টার হতে। বিলেতে ব্যারিস্টারি পরীক্ষায় বাবা সেকেন্ড হলেন— পরীক্ষায় দ্বিতীয় হওয়া তাঁর ওই একবারই। কিন্তু আমাদের গল্প তো বাবাকে নিয়ে নয়— কথা হচ্ছে মেয়েকে নিয়ে।

এহেন বাবার মেয়ে ইশকুলে যায়নি। পড়েছে বাবা-মায়ের কাছেই। ব্যারিস্টারি পাঠরত বাবার সঙ্গে সে গিয়েছে বিলেতেও— ফিরেও এসেছে যথাসময়ে। বাড়িতে পড়াশোনা করেই মেধাবী মেয়েটি প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পাশ করল প্রথম বিভাগে। মেয়েদের মধ্যে প্রথম দিকেই ছিল তার স্থান। আইএ পাস করল প্রথম দশের মধ্যে থেকে। তারপর অর্থনীতি নিয়ে বিএ পাস করল ১৯৪৬ সালে।

কিন্তু মেয়েটির পড়াশোনা নিয়েও আমাদের গল্পটা নয়। গল্পটা ছবি নিয়ে। তো মেয়েটি ছবি আঁকা শিখত ছোট্টবেলা থেকেই। লেখাপড়ার মতোই, ছবি আঁকাতেও ছিল তার মন। পেনসিলে-প্যাস্টেলে রং-তুলিতে জীবন্ত করে তুলতে পারত মনের মধ্যে ফুটে ওঠা দৃশ্য। বাবার বদলির সুবাদে রাজশাহী থাকাকালীন দেখেছিল বিস্তীর্ণ পদ্মা, জেলেদের নৌকার সারি— গভীর নীল জল থেকে বাদামি গাত্রবর্ণের জেলেরা তুলে আনছে রূপালি ইলিশ। ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্স-ইতালি-সুইজারল্যান্ড— বিদেশের বিপুল শিল্প-ঐতিহ্য দেখে মুগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি মেয়েটার মনে ভেসে উঠত দেশের স্মৃতি।

১৯৪৪ সালে আইএ পাস, আর ১৯৪৬-এ বিএ— এরই মধ্যে বিয়াল্লিশে ঘটে গিয়েছে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন— মেয়েটা অংশ নিয়েছে তাতেও। তেতাল্লিশে ঘটে গেছে ভয়াবহ মন্বন্তর, আর ছেচল্লিশে দাঙ্গা। মেয়েটা লিখে রাখবে— “দুর্ভিক্ষের স্মৃতি ব্যথাভরা, তবু লেখা যায়, মনে করা যায়। কিন্তু ’৪৬-এর দাঙ্গা স্মরণেও অসহ্য। সে যে কী নারকীয় ঘটনা। কী বীভৎস অমানুষিক দৃশ্য!…”

মেয়েটা ভর্তি হয় গভর্নমেন্ট আর্টস্কুলে। বাবা চেয়েছিলেন, মেয়ে এমএ পড়ুক। দু-কূল রাখার জন্য মেয়েটা ভর্তি হয় এমএ ক্লাসে, সঙ্গে ‘ক্যাজুয়াল স্টুডেন্ট’ হিসেবে আর্টস্কুলেও। অধ্যক্ষ অতুল বসুর জহুরির চোখ— তিনি মেয়েটিকে ভর্তি করে নিলেন সরাসরি থার্ড ইয়ারে। দু-নৌকায় পা দিয়ে বেশিদিন চলল না। এমএ ছেড়ে মেয়েটার পড়া চলল আর্টস্কুলেই। পরবর্তী পথ চলা নির্ধারিত হয়ে গেল ওইখানেই।

সেখানেই পরিচয় হয় ছেলেটির সঙ্গে। পরের ক্লাসেই পড়ত সে। যার সম্পর্কে মেয়েটি লেখে— “(আঁকার) হাত খুব ভালো। নাম ছিল সকলের মধ্যে। তবে রাজনৈতিক দলের কর্মী বলে তার একটা আলাদা ব্যাপার ছিল।…” রাজনৈতিক দল বলতে কমিউনিস্ট পার্টি। ট্রাম-ধর্মঘটে ধর্মঘটী শ্রমিকদের হয়ে চাঁদা তুলতে ছাত্রছাত্রীদের কাছে আসত ছেলেটি— এসেছিল মেয়েটির কাছেও। সেখান থেকেই আলাপ, আলাপ থেকে বন্ধুত্ব ও প্রেম, বিয়ে ১৯৫৪ সালে।

গল্পের ছেলেটি দুর্ভিক্ষ কিংবা গণ-আন্দোলনকে ছবিতে অমর করে গিয়েছে তো বটেই— কিন্তু তার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্রিবিউশান, এদেশের ছাপাই ছবি কিংবা আধুনিক ভাস্কর্যের ইতিহাস লিখতে হলে তাঁর জন্যই বরাদ্দ করতে হবে আস্ত একটি অধ্যায়। ‘মহান শিল্পী’ শব্দবন্ধটি বহুব্যবহারে ক্লিন্ন হয়ে গিয়েছে— অথচ সোমনাথ হোর প্রসঙ্গে বলতে গেলে এই বিশেষণের ব্যবহার অনিবার্য। এবং এই ‘মহান’ বিশেষণ একইভাবে প্রযোজ্য মানুষ সোমনাথ হোর প্রসঙ্গেও।

আমাদের গল্পটা অবশ্য সোমনাথ হোর নিয়ে নয়— গল্পটা রেবা হোর-কে নিয়ে। আমাদের গল্পের মেয়েটি, বলাই বাহুল্য, রেবা হোর— যিনি জন্মেছিলেন ১৯২৬ সালে, অর্থাৎ এ-বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ। সোমনাথ হোরের পাহাড়প্রমাণ খ্যাতির পাশে রেবা হোরের চর্চা একান্তে— নিভৃতে। সোমনাথ হোরের মতো তিনিও কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন, সংগ্রামের জীবন নিজের করে নিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এলেও সারাজীবনের শিল্পচর্চায় নিজস্ব নিভৃতচারণায় তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন মানুষ— ফুল পাখি মোরগ হাঁস ছাগল নিয়ে সাধারণ মানুষের যে সাধারণ বেঁচে থাকা, রেবা হোর ফুটিয়ে তুলেছেন সেই জীবনকে।

১৯৫৮ সালে ললিতকলা অ্যাকাডেমির জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন রেবা— বাংলা থেকে কোনও শিল্পীর জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্তি সেই প্রথম। কিন্তু শুকনো তথ্য বাদে এই সংবাদের কোনওই তাৎপর্য নেই— কেননা পুরস্কার তো দূর, সারাজীবন শিল্পী হিসেবে কোনও খ্যাতির ব্যাপারে তিলমাত্র আগ্রহী ছিলেন না তিনি। প্রচারের আড়ালে, নিভৃতে, তিনি এক আশ্চর্য জীবন যাপন করে গেছেন— মায়ের সেবায় দায়বদ্ধ কন্যা, কন্যার চর্যায় দায়বদ্ধ মাতা, শিল্পী-স্বামীর জীবনসঙ্গিনী— এবং শিল্পচর্চায় একনিষ্ঠ ও স্বতন্ত্র। যিনি বলতে পারতেন— “গোটা মানুষের ধারণাটা মনে থেকে গেছে। শুধুই কি মানুষ? না, আমি একজন মেয়ে। তবে আগে কিন্তু আমি মানুষ। তারপর আমি নারী…।” হ্যাঁ, একটা গোটা মানুষ— পরিপূর্ণ মানুষ— এবং একইসঙ্গে একজন মহান শিল্পী।

“কবিরে পাবে না তাহার জীবনচরিতে”— কবিগুরুর এই বাণীর সুর ধরে আজকাল শিল্পীর জীবন ও শিল্পচর্চাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখারই ট্রেন্ড। অধিকাংশ শিল্পীর জীবন ও যাপন এমনই গোলমেলে যে তাঁদের শিল্পের গুণ অনুধাবন করতে গেলে এছাড়া হয়তো উপায়ও নেই— তদুপরি ইদানীং সফল ও খ্যাতিমান শিল্পী বলতে নিদেনপক্ষে কোটিপতি— দৈনন্দিন জীবনের ছবি তাঁদের শিল্পে কেমনভাবে প্রতিফলিত হবে, বা আদৌ হতে পারবে কিনা, এসব তর্ক এড়াতে গেলে শিল্পী ও শিল্পকে বিচ্ছিন্ন করে দেখাটাই সুবিধে।

কিন্তু এই চলতি ধারার বিপ্রতীপে আমরা যদি উদাহরণ খুঁজতে চাই— যেখানে শিল্পীর জীবন ও যাপন এবং তাঁর শিল্পচর্চা মিলেমিশে একাকার— সেখানে সোমনাথ-রেবার যৌথ যাপন এবং এক ছাদের নিচে থেকেও তাঁদের ভিন্নধর্মী ও স্বতন্ত্র শিল্পচর্চার দিকে আমাদের বারবার ফিরে আসতে হবে। যেখানে রয়েছে শিল্পচর্চার প্রতি সাধকতুল্য নিষ্ঠা— যেখানে রয়েছে শিল্পের প্রতি নিরন্তর আনুগত্য— এবং এক আশ্চর্য শৃঙ্খলা। শেষের কথাটা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ— কেননা ইদানীং যখন উচ্ছৃঙ্খলতাকে শিল্পচর্চার অন্যতম প্রধান ধর্ম, এমনকি প্রাকশর্ত, হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, তখন সোমনাথ হোর-রেবা হোরদের জীবন ভিন্নতর সত্যের আভাস দেয়।

 

প্রথম জীবনে গণ-আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, কমিউনিস্ট পার্টির দলীয় কার্যক্রম— সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলীয় রাজনীতি থেকে সরে এলেও রেবা হোর আদর্শচ্যুত হতে পারেননি কখনওই। যে আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছিল নিরাভরণ ও বিলাসহীন যাপনে— এবং তাঁর কথাতেও:

এখনও এত ভুলভ্রান্তি ও কমিউনিস্ট জগতে তোলপাড়ের পরও মনে করি কোনও এক ধরনের সাম্যবাদী ব্যবস্থা অপরিহার্য; কারণ কিছু লোক চরম বিলাসে কাটাবে, আর অনেক লোক দারুণ অভাবে ডুবে থাকবে, এ কিছুতেই চলতে পারে না… চলা উচিত নয়…

না, রেবা হোরের শিল্পচর্চা বিষয়ে কিছু লেখার যোগ্যতা আমার নেই। তাঁর ছবি দেখতে দেখতে যেটা বারবারই চোখে পড়ে, তা তাঁর ইউনিকনেস— তাঁর স্বাতন্ত্র্য— রেখার দাপট তো বটেই, সঙ্গে মাধ্যম নির্বাচনেও তাঁর নিজস্বতা। অয়েল প্যাস্টেলে এত কাজ আর কোনও মহান শিল্পী করে গেছেন কি? ক্যানভাসে অনুজ্জ্বল খরখরে তেলরঙে কিছু কাজও একইরকম ব্যতিক্রমী, এবং অপূর্ব তাঁর টেরাকোটা ভাস্কর্য, রঙের প্যালেট নির্বাচনেও তেমনই নিজস্বতা— আবার প্রচলিত মিডিয়াম ব্যবহারে সাধারণ বিষয় নিয়ে আঁকা ছবিতেও তাঁর ট্রিটমেন্ট একদম ভিন্নধর্মী ও স্বতন্ত্র। কিন্তু আবারও বলি, তাঁর শিল্পের উৎকর্ষ নিয়ে কিছু বলার যোগ্যতা আমার নেই— সুতরাং সে প্রয়াস থেকে বিরত রইলাম।

আমি বরং শেষ করি আগের কথাটুকু দিয়েই। যে শিল্পী বলেছিলেন… কিছু লোক চরম বিলাসে কাটাবে, আর অনেক লোক দারুণ অভাবে ডুবে থাকবে, এ কিছুতেই চলতে পারে না, চলা উচিত নয়…

দুর্ভিক্ষের স্মৃতি মনে করে যিনি বলেছিলেন: “দুঃস্বপ্নের সেই দিন যেন আর কখনও ফিরে না আসে;” আর দাঙ্গার স্মৃতি মনে করতে গিয়ে যিনি বলেছিলেন, মন্বন্তরের দুর্বিষহ স্মৃতির চাইতেও দাঙ্গার স্মৃতি দুঃসহ…

সেই শিল্পীর জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন ধনীদরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে দেশে… যখন ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে দেশে ও রাজ্যে… যখন হতদরিদ্র মানুষকে উচ্ছেদ করে ফেলা যাচ্ছে অনায়াসে এবং উচ্ছেদ দেখে উল্লাসে মাতছে তারই প্রতিবেশী মধ্যবিত্ত…

যখন আদর্শ জীবনবোধ নিষ্ঠা সততা দায়বদ্ধতা সহমর্মিতা শব্দগুলো ক্রমশ তামাদি হয়ে যাওয়ার পথে…

তখন, এই শতবর্ষের আলোকে, কোনটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ? রেবা হোরের আশ্চর্য জীবন, নাকি তাঁর অমর শিল্পকলা?

অবশ্য, আগেই তো বলেছি, এই দুইয়ের মধ্যে কোনও ফারাক তিনি করেননি— এই দুইকে তিনি মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে গিয়েছেন। মিশিয়ে গিয়েছেন অত্যন্ত সচেতনভাবেই। আত্মস্থ করতে পারি বা না পারি, আসুন, অন্তত একটু বিস্মিত তো হই!

 


তথ্যসূত্র: ভারতে আধুনিক শিল্পকলার নারীবিশ্ব: মৃণাল ঘোষ; ভিরাসত আর্ট পাব্লিকেশন; ২০২৩

 

Exit mobile version