শতবর্ষে স্মরণ: অবিস্মরণীয় শিল্পী সোমনাথ হোর

সমীর ঘোষ

 



শিল্পী, গদ্যকার, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

 

 

 

“১৯২১ সালের ১৩ এপ্রিল তারিখে আমার জন্ম। চট্টগ্রাম জেলার বরমা গ্রামে। আমার প্রথম শিল্পকর্ম— একটি সী-প্লেন, বলা চলে জলভাসি বায়ুযানের মডেল তৈরি করা। … দেবেন্দ্র মজুমদার আমাদের ড্রইং এবং ড্রিল শেখাতেন। তাঁর ড্রয়িং ক্লাসে আমি খুব মন দিয়ে কাজ করতাম, কাজ মানে বাজারি কপিবুক থেকে চেয়ার, টেবিল, বাড়ির গেট, গোলাপফুল প্রভৃতি। এগুলি করতে গিয়ে সোজা করে লাইন টানা, বেঁকিয়ে টানা, গোল বৃত্ত আঁকা ইত্যাদিতে আমি মজা পেতাম। মাস্টারমশাই আমাকে আঁকায় খুব উৎসাহ দিতেন।”

১৯২১ সালে জন্ম আর আজ ২০২১ সাল— শতবর্ষের সন্ধিক্ষণে সোমনাথ হোর। মনে হয়, এই তো সেদিন, সোমনাথদার সান্নিধ্যে, আন্তরিক আবহে কত কথাই না বলে এলাম। প্রশ্নের পর প্রশ্ন— আর অকপট উত্তর। কোনও জড়তা নেই, নেই কোনও সংশয়। বয়সের বাধা কিংবা ব্যক্তিত্বের বাইরে এক আপনজন। শুধু আলাপচারিতায় নয়, যখনই কোনও কিছু জানার জন্য চিঠি দিয়েছি, বয়সের বাধা উপেক্ষা করে উত্তর দিয়েছেন। শেষ চিঠিতে তিনি নিজের হাতে লিখতে পারেননি। কিন্তু চিঠির শেষে স্বাক্ষর করেছিলেন কাঁপা হরফে।

লেখকের সঙ্গে। ছবি: সঞ্জীব দলুই

২০০৬ সালে সোমনাথ হোরের প্রস্থান। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি তাঁর সৃষ্টিতে, তাঁর বিশ্বাসে— যা আমাদের প্রত্যয় জোগায়। ‘আমার চিত্রভাবনা’ কিংবা আগেই প্রকাশিত আত্মস্মৃতি ‘মনে পড়ে মনে পড়ে না’ রচনা থেকে জানা যায় সোমনাথ হোরের শিল্পী হয়ে ওঠার রোমাঞ্চকর প্রেক্ষাপট। জীবনভাবনা এবং সৃজনপ্রেক্ষিত— দুয়ের সার্থক অন্বয় গড়ে ওঠার আখ্যান।

শৈশবের বিচিত্র ঘটনা পরম্পরায়, নানা অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ে গড়ে ওঠা বিশ্বাসের ভিতের ওপর তিনি স্থাপন করেছেন তাঁর সৃষ্টিকে, তাঁর অনন্য নির্মাণশৈলীকে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি একটু একটু করে ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর সৃষ্টিকে জীবন ও সমাজভাবনার বিস্তীর্ণ পটে। বিশ্বাসের কেন্দ্রে স্থির নিশ্চিত অবস্থানকে অবলম্বন করে সোমনাথ হোর আমৃত্যু ছিলেন অবিচল এবং সক্রিয়। আর সে কারণেই আপাত বৈচিত্রহীন, চমকপ্রদ দৃশ্যকল্পের পরিবর্তে, আমৃত্যু ক্ষতকে বহন করেছেন মননে, সৃজনে।

আড়ম্ভরহীন আয়োজনহীন জীবনচর্যার সারল্য সময়ের পক্ষে বেমানান। কিন্তু ঋজু-দৃঢ় মানুষটিকে তাঁর অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যের ছোঁয়ায় অনুভব করতে পারি— তাঁর এই স্বেচ্ছায় অর্জিত সারল্য কতটা অকৃত্রিম। সোমনাথদা, রেবাদি আর চন্দনা— এই তিনজনের শিল্পী পরিবারের ছবি আজও আমাকে অবাক করে।

নিজের কাজ নিয়ে। ছবি: সঞ্জীব দলুই

শৈশব-কৈশোরের স্বপ্ন-কল্পনার জগৎ, পরিণত বয়সে সামাজিক সঙ্কটে, শোষণ-নিপীড়নে ধ্বস্ত হলেও সম্পূর্ণ মুছে যায়নি। আর্ত, যন্ত্রণাকাতর মানুষের মধ্যেও তিনি খুঁজেছেন শাশ্বত জীবনকে— অমোঘ প্রত্যয়ে।

সোমনাথ হোর শুধুই যন্ত্রণা আর ক্ষতের শিল্পী নন— স্বপ্নের প্রত্যয়ী রূপকার। রেখাচিত্রে, ছাপের ছবিতে, তেলরঙের ছবিতে কিংবা পরবর্তী পর্বে ব্রোঞ্জের কাজে, ধারাবাহিক সৃজনকলায় তাঁর স্বপ্নময়তার ছাপ স্পষ্ট।

১৯৪০-৪১ সালে শিবু নামে এক সঙ্গীর প্রভাবে সোমনাথ হোর তৎকালীন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। পার্টি পত্রিকা জনযুদ্ধ-তে ছবি এঁকেছেন। পঞ্চাশের মন্বন্তরের মর্মন্তুদ দৃশ্যপট তুলে ধরেছেন রেখাচিত্রে। তেভাগা আন্দোলনের ছবিও তাঁর রাজনীতির প্রতি দায়বদ্ধতার নিদর্শন। আবার শান্তিনিকেতন পর্বে রামকিঙ্কর-বিনোদবিহারীর সান্নিধ্যে চিত্রকলার, শিল্পের তাৎপর্য অনুধাবনেও তিনি সমান সচেতন ও সক্রিয়। নিজেকে নিজের বিশ্বাসে চালিত করেছেন সোমনাথ হোর। আদর্শকে, প্রচার বা অর্থের কাছে বিক্রি করেননি।

 

আজ শতবর্ষের মুহূর্তে, স্মরণ সন্ধিক্ষণে সোমনাথ হোর নতুন করে আলোচিত হবেন। যথাযোগ্য মূল্যায়ন হবে। ভারতীয় শিল্পকলাচর্চায়, আধুনিক সৃজন আবহে সোমনাথ হোর সর্ব অর্থেই স্বতন্ত্র। শুধু শিল্পী হিসেবেই নয়, মানুষ হিসেবেও তিনি অনন্য— অতুলনীয়।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...