চলে গেলেন আনন্দময়ী ভট্টাচার্য

আনন্দময়ী ভট্টাচার্য | সঙ্গীতসাধিকা

শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার

 


গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী

 

 

 

বরাক উপত্যকার সঙ্গীতচর্চার এক প্রধানা ব্যক্তিত্ব আনন্দময়ী ভট্টাচার্য চলে গেলেন। ৯১ বছরের জীবন কাটিয়ে পরিণত বয়সে চলে গেলেও বরাক উপত্যকার সঙ্গীত মহলে এক শূন্যতার বোধ তৈরি হয়েছে। আনন্দময়ী বরাক কিংবা অসম রাজ্যের বাইরে তাঁর যোগ্যতার নিরিখে ততটা পরিচিত নাম না হলেও তাঁর দীর্ঘ জীবন ইতিহাসের এমন একটি অধ্যায়ের জন্ম দেয় যার তাৎপর্য বরাকের সঙ্কীর্ণ ভূগোল ছাড়িয়ে বাঙালির সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর যে পরিচয়টি দিলেই বহির্বরাকের মানুষ তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে চিনে নেবেন সেটাও তাঁর প্রধান পরিচয় নয়। সেটি আনুষঙ্গিক সত্য মাত্র। তিনি ছিলেন সীমান্তহীন বাঙালির সাম্প্রতিক সময়ের উজ্জ্বলতম সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি অকালপ্রয়াত কালিকাপ্রসাদের পিসি। অবশ্য এই পরিচয়েও শুধু পিসি বললেও খুব কমই বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন কালিকাপ্রসাদের প্রায় মা-ই। একদম শিশু বয়স থেকেই কালিকাপ্রসাদকে মানুষ করার দৈনন্দিন দায়িত্ব কর্তব্য প্রধানত নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছিলেন আনন্দময়ী। কালিকাপ্রসাদের হয়ে ওঠার মধ্যে আনন্দময়ীর প্রধানতম ভূমিকা রয়েছে। কালিকাপ্রসাদ কিংবা তাঁর পিসি আনন্দময়ীর কথা বলতে গেলে অপরিহার্যভাবে আরও দুটি বিষয়ের উল্লেখ করতে হয়। একটি হচ্ছে আনন্দময়ী-কালিকাপ্রসাদদের পরিবার এবং তাঁদের হাতে তৈরি হওয়া প্রায় শতাব্দী প্রাচীন একটি সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ওই পরিবারের প্রতিটি ব্যক্তির জীবনই শুধুমাত্র এক একজন ব্যক্তির জীবন নয়, ওই পরিবার ও সেই সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামূহিকতার মধ্যেই প্রত্যেকটি ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের নির্মাণ হয়েছে। ওই পরিবার ও তাঁদের সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে আবার বরাক উপত্যকার, বিশেষ করে শহর শিলচরের সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। পরিণত বয়সে একজন মানুষের জীবনাবসানের পরও যে গভীর শূন্যতার বোধ তৈরি হয় বরাক উপত্যকায় তার প্রধান কারণটি এটিই যে এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বলতম অধ্যায়ের অবসানকে দেখতে পায় সেখানকার মানুষ।

আনন্দময়ী ভট্টাচার্যদের পরিবারকে সকলে চেনে ন্যায়পঞ্চানন পরিবার হিসেবে বরাক উপত্যকায়। এই পরিবার ও তাঁদের সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে চিনতে হলে বরাক উপত্যকার শহর শিলচরের গড়ে ওঠার ইতিহাসের দিকেও একটুখানি চোখ ফেলতে হবে। শহর শিলচর তৈরি হয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের দ্বারাই। তৎকালীন কাছাড় জেলার চা শিল্পের প্রয়োজনেই তৈরি হয় এই শহর। চা শিল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে নিয়ে আসা হয়েছিল যেমন পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া পুরুলিয়া বর্ধমান সহ ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে শ্রমিকদের, তেমনি এসেছিলেন উত্তর ভারতের আরও নানা অঞ্চলের মানুষ। চা বাগান বা ব্রিটিশ প্রশাসনের নানা স্তরের চাকরি বা নতুন শহরে ব্যবসাবাণিজ্যের কাজে ভাগ্যের সন্ধানে এসেছিলেন তৎকালীন সিলেট সহ পূর্ববঙ্গের নানা জেলার মানুষেরা। আনন্দময়ী ভট্টাচার্যদের বাবা কালীজয় ভট্টাচার্য ন্যায়পঞ্চানন ছিলেন একজন বিশিষ্ট কবিরাজ। শিলচর শহরের একজন বিশিষ্ট মানুষ চিকিৎসার প্রয়োজনে কালীজয় ন্যায়পঞ্চাননকে সিলেট থেকে আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন। দীর্ঘদিন থেকে তিনি সেই রোগীর রোগ নিরাময়ের পর সেই বিশিষ্ট ব্যক্তির পরিবার ও আরও অনেকে কালীজয় ভট্টাচার্য ন্যায়পঞ্চাননকে শিলচরে থেকে যেতে অনুরোধ করেন। শহরের প্রাণকেন্দ্রে তাঁকে জমি দেওয়া হয়। সেই থেকেই এই পরিবারের শিলচরে স্থায়ী বসত। সদ্য তৈরি হওয়া শহরে তখন নানা পরিবারে সঙ্গীতচর্চার একটি অনুকূল পরিবেশ ছিল। আবার সারা বাংলায় ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লববাদী কর্মতৎপরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার ঢেউ এসে লাগল শহর শিলচরেও। কালীজয় ন্যায়পঞ্চাননের পুত্র ও ভ্রাতুষ্পুত্ররা এই বিপ্লববাদী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন। বিপ্লবী সূর্য সেনও এই কর্মকাণ্ডের তদারকি করতে গোপনে শিলচর শহরে এসেছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই ব্রিটিশ শাসকদের সন্দেহের চোখে চলে এলেন এই বিপ্লববাদী সংগঠনের তরুণরা। তখন শাসকের চোখে ধুলো দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিপ্লববাদী কর্মকাণ্ডের একটি প্রকাশ্য আড়াল তৈরি করার জন্যে ‘সারস্বত সমাজ’ নামে একটি সঙ্গীত চক্রের জন্ম দিলেন তাঁরা। এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িতে প্রত্যেকেই একই সঙ্গে সঙ্গীতচর্চা ও বিপ্লববাদী কর্মতৎপরতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কালীজয় পঞ্চাননের ভ্রাতুষ্পুত্র কামাখ্যাপদ ভট্টাচার্য ছিলেন সঙ্গীতশিক্ষা প্রদানের প্রধান হোতা। ব্রিটিশ শাসকদের ভ্রূকুটিতে ‘সারস্বত সমাজ’-এর কাজকর্মে বাধা পড়ল। তখন কামাখ্যাপদ গড়ে তুললেন শিলচর সঙ্গীত বিদ্যালয় নামের সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যা অসম রাজ্যের প্রাচীনতম সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম। কামাখ্যাপদের অকালমৃত্যুর পর যখন সঙ্গীত বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে সঙ্কট দেখা দিল, তখন তাঁর কনিষ্ঠ ভাই শ্যামাপদ ও জ্যাঠতুতো বোন মাতঙ্গিনী আনন্দময়ীকে সঙ্গে নিয়ে সঙ্গীত বিদ্যালয় তার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়। ক্রমে ক্রমে পরিবারের অন্য ভাইবোনরাও এই সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নানা দায়িত্ব নিয়ে যুক্ত হয়ে পড়েন। কেউ সঙ্গীতে, কেউ নৃত্যে, কেউ যন্ত্রসঙ্গীতে, কেউ সার্বিক সাংগঠনিক দায়িত্ব নিয়ে। এই ধারা আনন্দময়ীদের প্রজন্ম পেরিয়ে পরবর্তী প্রজন্মকেও একইভাবে জড়িয়ে রেখেছে। আনন্দময়ীর এক বড় ভাই মুকুন্দদাস ভট্টাচার্য লক্ষ্ণৌ ভাতখণ্ডে সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ে লোকনৃত্য বিভাগের প্রতিষ্ঠা করে সারাদেশের লোকনৃত্যের পঠনপাঠনের প্রণালীবদ্ধ পাঠক্রমের সূচনা করেন। লোকনৃত্য, রবীন্দ্রনৃত্যের দিকপাল রূপকার মুকুন্দদাস গণনাট্য আন্দোলনেরও এক প্রধান সংগঠক ছিলেন অসমে। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি সারা রাজ্য জুড়ে গণনাট্যের সংগঠন বিস্তারে সক্রিয় ছিলেন। আনন্দময়ীর কনিষ্ঠ ভ্রাতা অনন্তকুমার বরাক উপত্যকার গ্রামগঞ্জের আখড়া মোকামে ঘুরে ঘুরে লোকসঙ্গীত সংগ্রহ করে হয়ে উঠেছিলেন বরাক উপত্যকার লোকসঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ ভাণ্ডারী। এই অনন্তকুমার এক বহুগুণের অধিকারী বর্ণময় মানুষ ছিলেন। তালবাদ্যের একজন বিখ্যাত শিল্পী হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন তিনি একজন বিখ্যাত আলোকচিত্রী। একটা সময়ে ফিল্মস ডিভিশনের একজন খ্যাতিমান ক্যামেরাম্যান ছিলেন। অত্যন্ত শৌখিন মানুষ ছিলেন। একদিন তুরফান আলি নামের এক রিক্সাচালক লোকশিল্পীর সঙ্গে পরিচিত হয়ে সমস্ত শৌখিনতা জলাঞ্জলি দিয়ে সাদা কুর্তা পাজামা পরে তুরফানকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন গ্রামগঞ্জের আখড়া মোকাম। নিজে গড়ে তুললেন লোকবিচিত্র নামের লোকগানের একটি দল যা আকাশবাণী অনুমোদিত ভারতের প্রথম এ-গ্রেড প্রাপ্ত লোকগানের দলের স্বীকৃতি পায়। একদিকে ভারতের বিপ্লববাদী আন্দোলন, অন্যদিকে গণনাট্য এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রথাগত পাঠদান, একই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ বাড়ি হিসেবে পরম্পরাগত লোকায়ত ও ভক্তিসঙ্গীতের চর্চার এক বিচিত্রমুখী ধারার পরিবেশ ছিল আনন্দময়ীদের বাড়িতে। এই বাড়িতেই এসেছেন আলাউদ্দীন খাঁ থেকে শুরু করে শান্তিদেব ঘোষ, হেমাঙ্গ বিশ্বাস থেকে বরাকের গাঁ গেরামের লোকশিল্পীরা। বাড়িতে প্রতি বছর যে দুর্গাপূজার আয়োজন হত তার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল সঙ্গীত। মূলত দাদা শ্যামাপদ ভট্টাচার্যের রচিত শাক্তসঙ্গীতগুলিই গাওয়া হয়ে আসছে পূজার বোধন থেকে বিসর্জন অবধি নানা অনুষ্ঠানে। শ্যামাপদ ভট্টাচার্য রেডিও সম্প্রচারের সেই প্রথম যুগেই ঢাকা রেডিও স্টেশনের একজন অনুমোদিত শিল্পী। তাঁর আরেকটি বড় পরিচয় বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের শহীদ স্মরণে রচিত প্রথম গান ‘শোনো ডাকে ওই একাদশ শহীদেরা ভাই’ তাঁরই লেখা ও সুর করা। প্রতি বছর শহীদ দিবস এলে বরাকের আপামর মানুষের মুখে মুখে ফেরে এই গান। এই গানটি এই শহর প্রথম শুনেছিল আনন্দময়ীর কণ্ঠেই। ১৯৬১ সালের ১৯ মে-র গুলিচালনার পর শহীদ স্মরণে শহর প্রদক্ষিণের সময় আনন্দময়ী এই গানটি প্রথম গেয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে আনন্দময়ীদের একান্নবর্তী পরিবারের গোটাটাই এতটাই বর্ণময় যে এত কথা বলার পরও তার সামান্যতম অংশেরই মাত্র উল্লেখ হল।

ব্যক্তি আনন্দময়ী ভট্টাচার্যের কথা বলতে গিয়ে তাঁর পরিবারের কথা সবিস্তারে বলার কারণটা কী? প্রথমেই বলেছি এই পরিবার ও এই পরিবারের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা শিলচর সঙ্গীত বিদ্যালয়ের কথা না বললে শুধু আনন্দময়ী নয়, এই পরিবারের কারও কথাই বলা যাবে না। শিলচর সঙ্গীত বিদ্যালয়ও নানাদিক দিয়ে অনন্য। শাস্ত্রীয় কণ্ঠসঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত, তালবাদ্য, রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি কত্থক, মণিপুরি ও লোকনৃত্যের পঠনপাঠনও এখানে হয়ে আসছে প্রায় আট দশকেরও বেশি সময় ধরে। শুধু পাঠদান নয়, শিলচর সঙ্গীত বিদ্যালয়ের তরফ থেকে দেশের নানা স্থানে নৃত্য ও সঙ্গীতের অসংখ্য অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানের শিল্পীদল। এই প্রতিষ্ঠানটি এই গোটা অঞ্চলের সংস্কৃতিচর্চা ও প্রদর্শনকলার ক্ষেত্রে এমনই এক পথিকৃতের ভূমিকা নিয়েছিল যে এই অঞ্চলের সামূহিক সাংস্কৃতিক গঠনে এই প্রতিষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এই অঞ্চলের সংস্কৃতির ইতিহাস ও এই প্রতিষ্ঠানের পথচলার ইতিহাস পরস্পর হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে বিগত আট দশক ধরে।

এই বৃহৎ সাংস্কৃতিক পরিবারের সন্তান আনন্দময়ী ভট্টাচার্য এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই কাটিয়েছেন সারাটা জীবন। এই প্রতিষ্ঠানেই নিজের দাদাদের কাছে এবং এই প্রতিষ্ঠানের অন্য গুরুদের কাছে সঙ্গীতের পাঠ নিয়েছেন। পরবর্তী জীবনে এই প্রতিষ্ঠানেই সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। নিজের জীবনের সবটাই উজাড় করে দিয়েছেন এই সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখতে, এর প্রসার ঘটাতে। কয়েক বছর আগে অবধি তিনিই ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষা। আনন্দময়ীরা আজকের চোখে দেখতে গেলে ভীষণই ব্যতিক্রমী। ভাইবোনেদের প্রায় কেউই শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা চাননি কখনও। সারাজীবনের সাধনা ছিল শিল্পের পাঠদানের। কেউ লোকনৃত্য সংগ্রহ করেছেন, পাঠদান করেছেন, ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে অনুষ্ঠান করেছেন। কেউ লোকসঙ্গীত সংগ্রহ করেছেন, গ্রামের দুঃখী অসহায় গুণী লোকশিল্পীদের বিপদের বন্ধু হয়েছেন, তাঁদেরকে তুলে এনেছেন পাদপ্রদীপের আলোয়। নিজে গাওয়ার চেয়ে ছাত্রছাত্রীদের সামনে ঠেলে দিয়েছেন। সংগৃহীত লোকসঙ্গীত অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন আগ্রহী শিল্পীদের কাছে। খুব কম লোকই জানেন, কলকাতার অসংখ্য প্রতিষ্ঠিত লোকসঙ্গীত শিল্পীদের একাধিক বাজারহিট লোকসঙ্গীতগুলির অনেকগুলিই অনন্তকুমারের কাছ থেকে তাঁরা পেয়েছিলেন। আনন্দময়ীর শিক্ষা ছিল নানা ধরনের গানের। কিন্তু কখনওই নিজেকে মঞ্চের শিল্পী হিসেবে পরিচিত করতে চাননি। সারা জীবন ধরে নিজের শেখা সমস্ত গান শিখিয়ে গেছেন ছাত্রছাত্রীদের। পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের জন্যে আনন্দময়ী বা তাঁর দিদিদের আত্মত্যাগও অনন্য। একান্নবর্তী পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে এবং শিলচর সঙ্গীত বিদ্যালয়ের পরিচালনার স্বার্থে চার বোনই সংসার করেননি। বাড়িতে ভাইপো ভাইঝিদের মানুষ করা, জীবনের পথ দেখানো, অন্যদিকে কঠিন সময়ের মধ্যেও শিলচর সঙ্গীত বিদ্যালয়কে সচল রাখাকে সারাজীবনের সাধনা হিসেবে নিয়েছিলেন। এই দুই মিলেই তৈরি হয়েছে তাঁদের বৃহত্তর পরিবার। প্রকৃতির নিয়মে মাথার ওপর থেকে ধীরে ধীরে সরে গেছে জ্যেষ্ঠদের স্নেহচ্ছায়া। প্রকৃতির নিষ্ঠুর খেয়ালে হারিয়েছেন প্রাণাধিক প্রিয় কালিকাপ্রসাদকে। এর কয়েক বছর আগে হারিয়েছিলেন দাদা শ্যামাপদর পুত্র কৃতি সঙ্গীতশিল্পী শিবদাস ভট্টাচার্যকে। সম্প্রতি সময়ে তাঁদের একান্নবর্তী পরিবারের হাল কাঁধে তুলে নিয়েছিল যে ভাইপো সেই কালিকানন্দও চলে গেছেন। পরিবার ও সঙ্গীত বিদ্যালয়ের কাজে হরিহর আত্মা হয়ে কাজ করেছিলেন যে দিদির সঙ্গে সেই মৃণালিনীও চলে যান কালিকাপ্রসাদের আকস্মিক মৃত্যুর কয়েকদিনের মধ্যেই। সবকিছু মিলিয়ে এক নিদারুণ বিষাদ ও একাকিত্বের দ্বীপে যেন অন্তরীণ হয়ে পড়েন আনন্দময়ী। মৃত্যু হয়ত তাঁকে এই গভীর বিষাদ ও একাকিত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে, কিন্তু শহর শিলচরের সংস্কৃতি মহলে নেমে এসেছে এক শূনতার পরিবেশ।

এই শহরের সাংস্কৃতিক সামাজিক অভিভাবকেরা যাঁরা গড়ে তুলেছিলেন শহরের মন ও মননের ভিত, তাঁরা এক একে সকলেই চলে গেছেন। এই শূন্যতাকে পূরণ করার মত উপযুক্ত উত্তরাধিকার এখনও স্পষ্টত দৃশ্যমান নয়। হয়ত প্রকৃতির নিয়মে যথাসময়ে আত্মপ্রকাশ করবে উত্তরাধিকারীরা। কিন্তু আপাতত শহরকে গ্রাস করে রেখেছে এক বিষাদের ছায়া।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. লকডাউনের বর্ষপূর্তি: চতুর্থ বর্ষ, দ্বাদশতম যাত্রা – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...