লকডাউনের বর্ষপূর্তি: চতুর্থ বর্ষ, দ্বাদশতম যাত্রা

স্টেশন মাস্টার

 

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের এপ্রিল সংখ্যাটি যখন আপনাদের হাতে পঁহুছিবে, তখন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ভরা জোয়ার— প্রথম দুইটি দফার ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হইয়াছে, এবং পরবর্তী ছয় দফার প্রস্তুতিতে যুযুধান রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্বাচকমণ্ডলীর সমর্থন স্বীয় পক্ষে আনয়নার্থ আপনাপন তূণীর হইতে বাছাবাছা বাক্যবাণ নিত্যদিন বাহির করিয়া জনসাধারণকে যৎপরোনাস্তি তাক লাগাইয়া দিতেছেন। প্রতিপক্ষের উদ্দেশে গরলোদ্‌গারের এই প্রতিযোগিতায় প্রধান দুই পক্ষ তৃণমূল কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টি কেহ অপরের তুলনায় এক পা-ও পিছাইয়া থাকিতে চাহেন না— ফলত বিষবাক্যের ক্রমমন্থন বিরামহীন চলিয়াছে। এ হেন পরিস্থিতিতে পত্রিকার শিরোনামে বিধানসভা নির্বাচন ব্যতীত অন্য কোনও বিষয় স্থান পাওয়ারই কথা নহে। কিন্তু, যে কোনও ডামাডোলই যেমন, এই নির্বাচনও তেমনই চারিপার্শ্বস্থ বাকি সকল বিষয় হইতে যাবতীয় আলো শুষিয়া নিজের উপরে আনিয়া ফেলিয়াছে— এই মুহূর্তে পৃথিবীতে ভোটব্যতীত আর কিছু যে আছে, সহসা ঠাহর হয় না। ভক্তির নেশায় আচ্ছন্ন জনসাধারণকে লইয়া কাজ করিবার এক মস্ত সুবিধা এই যে, তাহাদিগকে যাহা খাওয়ানো হয়, সুবোধ বালকটির ন্যায় সোনামুখ করিয়া সে সচরাচর তাহাই খাইয়া থাকে। অতএব, পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচ রাজ্যের মাসাধিককালব্যাপী ভোটযুদ্ধ ও তৎপূর্বের আরও মাস-দুয়েক সংবাদমাধ্যমে নির্বাচন ভিন্ন অপর কোনও কথা নাই, যদিচ সে কথার অধিকাংশই খেউড় ও ভুষিমালে পরিপূর্ণ— বস্তুত ভারতের গণতন্ত্রে কী পরিমাণ পচন ধরিয়াছে, পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন যেন তাহার একক বৃহত্তম সূচক হিসেবে আপনাকে প্রকাশ করিতেছে।

অথচ, ইহারই মধ্যে, লোকচেতনার প্রায় অজ্ঞাতে আর একটি ২৪ মার্চ নীরবে পার হইয়া গিয়াছে। পাঠকের স্মরণে থাকিবে, গত বৎসরের এই দিনটিতে কোভিড-প্রতিরোধার্থ দেশব্যাপী লকডাউনের নির্দেশ জারি হইয়াছিল। তাহার পরে দীর্ঘ এক বৎসর অতিমারির সঙ্গে ভারতবাসীর লড়াই চলিয়াছে; পূর্ব হইতেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত অর্থনীতি লকডাউনের বাড়তি বোঝা সামলাইতে না-পারিয়া শয্যা লইয়াছে; অসংখ্য ছোট ও মাঝারি শিল্প বন্ধ হইয়া বিপুল সংখ্যক কর্মী কাজ হারাইয়াছেন; সরকারের তুঘলকি সিদ্ধান্তের শিকার হইয়া অসংগঠিত ক্ষেত্রের লক্ষ-লক্ষ অভিবাসী শ্রমিক পদব্রজে বাড়ি ফিরিতে পথে নামিয়াছেন; জনস্বাস্থ্য পরিষেবা আপনার নগ্ন চেহারাটি প্রকাশ্যে আনিয়াছে; সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ঢাল-তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দারের ন্যায় জনসাধারণের শুভেচ্ছা ও পুষ্পবৃষ্টি সম্বল করিয়া রোগের চিকিৎসায় অগ্রসর হইয়াছেন। ইহারই মধ্যে, গোটা দেশকে গৃহবন্দি রাখিয়া সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে একের পর এক জনবিরোধী আইন পাশ করাইয়া লইয়াছে— শিক্ষা-স্বাস্থ্য-জীবিকা-স্বল্পসঞ্চয়-কৃষি-শ্রমের মতো সামাজিক ক্ষেত্রগুলিকে কার্যত বিনা প্রশ্নে কর্পোরেটের হস্তে তুলিয়া দেওয়ার বন্দোবস্ত পাকা করিয়াছে; লাভজনক শিল্পগুলিকে যথেচ্ছ বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্তে শিলমোহর লাগাইয়াছে; অতিমারির ভ্যাক্সিন লইয়া সস্তার রাজনীতি করিয়াছে; এবং এই সমস্ত জনবিরোধী চক্রান্তকে আড়াল করিয়া, দেশবাসীর করের টাকায়, প্রধান সেবক জনমানসে আপনার শ্মশ্রুগুম্ফশোভিত ক্ষমাসুন্দর মূরতিটির ব্র্যান্ডিং করিয়া গিয়াছেন। একদিক হইতে দেখিলে, বৎসরব্যাপী এই অতিমারিকাল দেশের মানুষের সম্মুখে এক মস্ত পোস্ট মর্টেম টেবিলের ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করিয়াছে— ভারতীয় সমাজ ও শাসনকাঠানোর যে আদ্যন্ত লোভী ও শঠ চরিত্রটি এতকাল লোকদৃষ্টির অন্তরালে ছিল, তাহাকে তাহার যাবতীয় ক্লেদপঙ্কিলতা-সমেত একেবারে সমূলে টানিয়া বাহির করিয়া প্রকাশ্য আলোকে আনিয়া ফেলিয়াছে— আমাদিগের অন্তর্নিহিত ব্যাধিগুলিকে চক্ষের সম্মুখে নির্লজ্জ মেলিয়া ধরিয়াছে।

নিয়তির এমনই পরিহাস যে, লকডাউনের বর্ষপূর্তির মুহূর্তেই অতিমারির দ্বিতীয় ঢেউ অধিকতর শক্তিতে প্রত্যাঘাত হানিয়াছে, এবং রাজ্যে রাজ্যে করোনা-আক্রান্তের সংখ্যা পুনরায় মাথাচাড়া দিতেছে। এমন যে হইবেই তাহা প্রত্যাশিত ছিল, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞরা ক্রমাগত সতর্ক করিতেছিলেন, কিন্তু আমরা তাহাতে কান দিবার প্রয়োজন মনে করি নাই। নভেম্বরের পর হইতে অতিমারির প্রকোপ যখন কমিতেছিল, আমরা ধরিয়া লইলাম যে, তাহাকে বুঝি বা আমরা সমূলে উৎপাটন করিয়া ফেলিয়াছি। ইতোমধ্যে ভ্যাক্সিন বাজারে আসিয়াছে, অতএব, মাস্ক ব্যবহার বন্ধ করিয়া, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি চুলায় দিয়া, গোটা দেশ মহোৎসাহে পথে নামিয়া পড়িল। ভারতের ন্যায় জনবহুল দেশে অতিমারি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক লকডাউন কোনও সমাধান নহে, সে কথা ঠিক, কিন্তু তাই বলিয়া স্বাস্থ্যবিধি জলাঞ্জলি দিবার স্বপক্ষে আত্মধ্বংসী মূঢ়তা ব্যতীত অন্য কোনও কারণ নাই। অথচ, যখন এই সম্পাদকীয় প্রস্তুত করিতেছি, তখনও রাজ্য জুড়িয়া বাম-দক্ষিণ-অতিদক্ষিণাদি দলের নেতৃবর্গ হাজার-হাজার মানুষকে সঙ্গে লইয়া দৃপ্ত ভঙ্গিতে মিটিং-মিছিল-রোড শো করিয়া চলিতেছেন। অতিমারির মধ্যে দিল্লিতে তবলিঘির সভায় জমায়েত হইবার কারণে মুসলমানদিগকে হেনস্থা করিয়াছিলেন যাঁহারা, তাঁহারাও এখন নীরব— কারণ ভোট বড় বালাই। এই মূঢ়তা, কতদূর ক্ষমণীয় তাহা আমরা জানি না, কিন্তু আমাদিগের মনে হইয়াছে লকডাউনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সেই পুরাতন কথাগুলিই আমাদের সীমিত ক্ষমতার মধ্যে থাকিয়াই আরও একবার স্মরণ করা প্রয়োজন। সেই প্রয়োজনবোধ হইতেই এই সংখ্যার বিষয়গত অভিমুখ হিসাবে লকডাউনের বর্ষপূর্তি উদ্‌যাপন, এবং সেই উপলক্ষ্যে একটি আদ্যন্ত ফ্যাসিস্ত মনোভাবাপন্ন সরকারের স্বরূপটি গত এক বৎসরে যেই রূপে স্পষ্ট হইয়া উঠিল, তাহার পুনরাবলোকনের পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা। এই বিষয়ে স্থবির দাশগুপ্ত, শান্ত মিত্র, নীলাঞ্জন দত্ত, অম্লান বিষ্ণু, বিষাণ বসু, অর্ক দেব ও অয়নেশ দাসের একগুচ্ছ নিবন্ধ আমরা প্রকাশ করিলাম। আশা করি, পাঠক ইহার মধ্যে ভাবনার খোরাক পাইবেন।

অন্য বিভাগাদির কথা বলিতে গেলে এই সংখ্যায় জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে স্মরণ করা হইল দুই বাঙালি মনীষাকে— শেখ মুজিবুর রহমান এবং সোমনাথ হোর। তৎসহিত সদ্যোপ্রয়াত অসমের বরাক উপত্যকার সঙ্গীতসাধিকা আনন্দময়ী ভট্টাচার্য এবং মিত্র ও ঘোষ প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার ইন্দ্রাণী রায় মিত্রকেও স্মরণ করা হইল। ইহার সহিত আমাদের নিয়মিত বিভাগগুলি, যথা— কবিতা, গল্প, অণুগল্প, অন্যগদ্য, প্রবন্ধ, বিশেষ নিবন্ধ, ফোটোফিচার, অনুবাদ সাহিত্য, ধারাবাহিক উপন্যাস ও রচনা এবং মেল ট্রেনের বিশেষ বিভাগগুলি, যথা— স্টিম ইঞ্জিন, সবুজ স্লিপার, হুইলার্স স্টল, ডিসট্যান্ট সিগনাল এবং ভালো খবর-ও রহিল যথাবিহিত।

পড়িবেন, ভালো থাকিবেন, আমরা আপনাদের মতামতের প্রত্যাশী…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...