উন্নয়নের আয়নায়… তিন ভুক্তভোগীর জবানবন্দি

সোমনাথ মুখোপাধ্যায়

 


গদ্যকার, প্রাক্তন শিক্ষক

 

 

 

 

সুপ্রভাত বন্ধুরা! সকলে কেমন আছ? আবার নতুন করে এখানে এলুম কি না, তাই একটু খোঁজখবর নিচ্ছি তোমাদের। ফেলে আসা এই একটা বছর কিরকম কাটল পৃথিবীর? নিজেদের এভাবে ঘরবন্দি করে রাখাটা কতটা কঠিন যন্ত্রণার তা আমি বুঝি না ভেবেছ! কিন্তু কী করবে বলো? একটা ছোট্ট অণুজীব এসে তোমাদের সকলকে কেমন তুর্কি নাচন নাচিয়ে ছাড়ল! বিপদ তো এখনও কাটেনি বলেই শুনছি। নিজেদের একটু সামলে রাখতে হবে এই যা!

এই দেখো! কেমন আপন খেয়ালে বকবক করে চলেছি। আমার নাম, ধাম, বর্ণ, গোত্র কিছুই যে তোমাদের বলা হয়নি। এসব না বললে তোমরা আমাকে চিনবে কেমন করে? আর না চিনলে, না জানলে কি বন্ধুত্বের মৌতাত কখনও জমে? রোসো, রোসো! আগে একটু দম নিয়ে নিই। একটানা সাঁতরে আসতে আসতে গা-গতর কেমন ব্যথা হয়ে গেছে। সেই বালি দ্বীপ থেকে রওনা দিয়েছি, তোমাদের এই ‘টিয়ারঙা দ্বীপ’-এ আসব বলে। এই দেখো কাণ্ড! আবার চোখ কপালে তুলছ কেন? আমার কথা বুঝতে পারছ না বুঝি? কী বলছ? এই নামে কোনও দ্বীপের কথা তোমাদের জানা নেই? এই হল তোমাদের মহা দোষ! ওই কেতাবের কচকচানি ছাড়া আর কিছুই তোমরা বুঝতে চাও না, মানতে চাও না! না বাপু! এখনই আমি টিয়ারং দ্বীপের কথা কিছুটি বলছি না। একটু সবুর করো। বা! সবুর করতে বলেছি বলে আবার মুখ ভার করছ কেন? তোমরাই তো বলেছ, ‘সবুরে মেওয়া ফলে।’ মেওয়াকে ওয়াস্তে তুমহে জরা ইন্তেজার তো করনা হি পড়েগা!

এই রে! আমার নামটাই তো এখনও বলা হয়নি তোমাদের। জানি, আমার নাম শুনে আরেকপ্রস্থ হয়রান হবে। কিন্তু তাতে আর আমার দোষ কোথায় বলো! আমার নাম Dermochelys Coriace। হাহাহা… কেমন ঘোল খাওয়ালুম বলো! নাম শুনে বেকুব বনলে, তাই না? কী বলছ? অন্য নাম বলতে? আরে বাপু! আমার কি আর তোমাদের ওই বংশীবদন কালাচাঁদের মত অষ্টোত্তর শতনাম আছে? তবে হ্যাঁ, কূর্মকুলে আমাদের পরিচিতি লেদারব্যাক টার্টল নামে। বাংলাতেও আমার একটা নাম দেওয়া হয়েছে বটে, তবে সেই নাম আমার বিলকুল না-পসন্দ। সেই অপছন্দের বাঙালি নামটা হল ‘বড় চামট সাগর কাছিম’। এই নামটা আগে শোনোনি? এইজন্যই বলেছিলাম সবজান্তা ভাবটা ছাড়ো! আমি তোমাদের অতিথি।

না না, আমার এমন বিশাল বপু দেখে ভয় পেও না। আমার ওজন এখন মেরেকেটে ৩৫০ কেজি। এখনও আমি বাড়ছি। তবে যখন বাড়তে বাড়তে ‘বাবার মতো বড়’ হয়ে উঠব, তখন কিন্তু আমার ওজন বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৭০০ কেজি। এই বিশাল ওজনের কারণেই আমাকে কাছিমকুলের বড়দা বলে ডাকে সবাই। মান্যও করে। লম্বায় আমি প্রায় ২.২ মিটার। এমন একটা ভারিক্কি অবয়ব নিয়েও আমি ঘন্টা পিছু ৩৫ কিলোমিটার গতিতে সাঁতার কাটতে পারি। আর তাই সাঁতরেই আমি আর আমার বন্ধুবান্ধবরা আটলান্টিক মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর আর ভারত মহাসাগরের আনাচে-কানাচে টহল দিয়ে ফিরি। আমরা যখন দলে দলে পিঠের ওপর শক্ত চামড়ার বর্ম এঁটে এক মহাসাগর থেকে অন্য মহাসাগরে পাড়ি জমাই, তখন তা একটা দেখার মতো বিষয় হয়ে ওঠে।

কী বলছ? আমরা কী খাই? সমুদ্রের জলে আমাদের খাবার-দাবারের অভাব আছে নাকি! তবে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় খাবার হল জেলিফিশ। তোমরা যেমন বিরিয়ানি পেলে আর কিছু চাও না, আমরাও ঠিক তেমনটাই। থকথকে জেলিফিশ পেলে আমাদের নোলা একেবারে আহ্লাদে লকলক করে। জেলিফিশের বিষাক্ত রাসায়নিক থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে শিকারকে উদরস্থ করা কিন্তু মোটেও সহজ নয়। তবে এই জেলিফিশপ্রীতির কারণেই আমাদের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। আর তার জন্য তোমরা, মানে এই হোমো স্যাপিয়েন্সরাই দায়ী।

কী বলছ? মিথ্যা দোষারোপ করছি তোমাদের ওপর? মোটেই নয়। তোমাদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের প্যাকেটগুলো যখন ঢেউ আর স্রোতের টানে জলে ভেসে যায়, তখন দূর থেকে দেখলে ঠিক জেলিফিশের মতো মনে হয়। গপাস করে গিলে ফেলতেই বিপদের সূচনা। প্লাস্টিকের কারণে দম বন্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয় আমাদের। জেলেদের জালে ধরা পড়েও মারা যাই আমরা। এসব কারণেই আমাদের সংখ্যা কেবলই কমছে সারা দুনিয়া জুড়ে। এখন মাত্র ৪০,০০০-এর মতো লেদারব্যাক সদস্য বেঁচে আছি। আর কতদিন এই নীল গ্রহে আমরা টিকে থাকব জানি না।

অনেক আশা নিয়ে এসেছি এই টিয়ারঙা দ্বীপে। এখানকার নিরিবিলি সমুদ্রবেলায় নতুন আনন্দে সংসার পাতব আমরা। এই সুন্দর পৃথিবীতে আমাদেরও তো টিকে থাকার অধিকার রয়েছে। অথচ শুনছি এখান থেকেও নাকি আমাদের পাততাড়ি গোটানোর ফরমান জারি হতে চলেছে। কেন? কে দিল এমন ফরমান? আরেকটু অপেক্ষা করো। সব জানতে পারবে…

 

আমি হলাম টিয়ারঙা দ্বীপ। এ নামটা অবশ্য আমার বন্ধুদের দেওয়া। আমি দ্বীপ, আমার চারদিক সমুদ্রের নীল জল দিয়ে ঘেরা। তাই আমার এখানে পৌঁছাতে হলে তোমাদের মূল ভূখণ্ড থেকে সমুদ্রপথে অথবা আকাশপথে আসতে হবে। ভূতাত্ত্বিক গঠনের বিচারে আমার গঠন কিন্তু বেশ মজার। উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় দু হাজার কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে অনেকটা বৃত্তচাপের মতো আমাদের অবস্থান। ছোট-বড় নানান আকারের ৫৫০-র বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত হয়েছে আমাদের দ্বীপপুঞ্জমালা। ক্রান্তীয় চিরহরিৎ গাছের সবুজ চাদরে ঢাকা আমার সারা শরীর। আর তাই হয়তো আমাকে টিয়ারঙা দ্বীপ বলে ডাকে আমার অতিথি বন্ধুরা।

গত ২০০৪ সালে প্রবল ভূমিকম্পের আঘাতে ফুঁসে উঠেছিল সমুদ্রের জল। বড় বড় ঢেউয়ের তুফানে কেঁপে উঠেছিল আমার শরীর। দুটো বড় প্লেট বা পাতের সীমান্ত বরাবর থাকার ফলে মাঝেমাঝেই কেঁপে উঠি আমরা— দ্বীপেরা। তবে সেবার কম্পনের দাপট এতটাই তীব্র ছিল যে সমুদ্রে দামাল ঢেউ উঠল। আছড়ে পড়ল আমাদের শরীরে। সে এক ভয়ানক কাণ্ড! পরিভাষায় এমন ঘটনাকে বলে সু-নামি। কত মানুষের প্রাণ গেল, ভেঙেচুরে ছারখার হয়ে গেল কত জনপদ। বিজ্ঞানীরা বিস্তর হিসেব-নিকেশ করে জানাল আমার উত্তরাংশ বেশ খানিকটা উঠে গেলেও দক্ষিণের দ্বীপের অংশ নাকি বসে গিয়েছে প্রায় ১৫ ফিট। মনে ভয় হয়। কখন এমন পাত সংঘাতের ফলে লোপাট হয়ে যায় ধনুকের মতো বাঁকানো আমাদের অস্তিত্ব।

অন্যদিকে উষ্ণায়নের প্রভাবে বাড়ছে সমুদ্রের জল। তার ওপর আমাদের শান্ত জীবনকে ব্যস্ত করতে তোমরা তৈরি করছ নতুন নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনা। এখন তোমাদের উন্নয়নের কথা শুনলেই কেমন আশঙ্কার মেঘ ভিড় করে মনে। তোমাদের ভাষায় যা উন্নয়ন, আমাদের কাছে তা যে মৃত্যুপরোয়ানা। যে মানুষ বন্ধুরা আমাদের বন, প্রকৃতি, সম্পদকে অবলম্বন করে এতকাল ধরে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, সেইসব বন্ধুদের— জারোয়া, ওঙ্গি, সোমপেন, সেন্টিনালি, নিকোবরি— কী হবে বলো তো? বহু দূরের জলপথ পাড়ি দিয়ে আসে যে সমস্ত প্রাণীরা— লেদারব্যাক টার্টল, হকসবিল টার্টল বা অলিভ রিডলে— তাদের প্রজনন আবাসের কী হবে? কী হবে বিপুল বনজ সম্পদের ভবিষ্যৎ? আমরা ভাবছি। তোমরাও ভাবো একটু। আন্তরিকভাবে ভাবো। আমার কথা আপাতত শেষ। তোমরা এখন না হয় শতদলের মুখ থেকে ওর কথা শুনে নাও।

 

আমার নাম শতদল। আমি এই দ্বীপেরই অধিবাসী। এই দ্বীপে আমরা আছি আজ তিন পুরুষ ধরে। আমার ঠাকুরদা বিল্বদল ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। ইংরেজ সরকার তাঁকে কালাপানির সাজা দিয়েছিল। বন্দি ছিলেন এই দ্বীপের কুখ্যাত জেলখানায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আর মূল ভূখণ্ডে ফিরে যাননি। এখানেই থেকে যান। আমার বাবা সুশীতল ছিলেন এক শিক্ষক। এই দ্বীপের সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই। আমি গবেষণার কাজ করি, লেখালেখি করি, এই দ্বীপের প্রকৃতি পরিবেশ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করি। আমার অধ্যাপিকা স্ত্রী শুভাঙ্গী আর কন্যা শিঞ্জিনিও এই কাজের সহযোগী।

তোমরা এই আসরে প্রথমেই যার কথা শুনেছ সেই লেদারব্যাক কাছিমেরা আমাদের বন্ধু। তারা এই আশ্চর্য দ্বীপের অতিথি। বড়সড় চেহারার এই কাছিমেরা অসম্ভব নিরীহ প্রকৃতির। নিত্য পরিযানে অভ্যস্ত এই সরীসৃপ বর্গের প্রাণীরা আমাদের টিয়ারঙা দ্বীপে আসে তাদের প্রজননকালে। সে এক আশ্চর্য মিলনোৎসব। দুই মেরুসাগরের কিছু নির্বাচিত অংশ সহ পৃথিবীর বাকি তিন মহাসাগরে ওদেরই অবাধ সন্তরণ। আসলে সমুদ্রের এই প্রাণীকুলের কাছে রাজনৈতিক সীমারেখা কোনও আলাদা মান্যতা পায় না। আর তাই ওদের পাখনা বা ফ্লিপারকে দাঁড় আর বইঠা হিসাবে ব্যবহার করে ওরা এক মহাসাগর থেকে অন্য মহাসাগরে পাড়ি জমায় স্বচ্ছন্দে। কী আনন্দময় যাপন, তাই না!

তবে এসব নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার আগে টিয়ারঙা দ্বীপ ও তার অন্যতর কিছু বিশেষত্ব নিয়ে কয়েকটা কথা তোমাদের বলি। টিয়ারঙা দ্বীপের মুখেই হয়তো কিছু কথা শুনেছ, তবে মজা কী জানো? ওরা ওদের নিজেদের মনকথা কখনওই মানুষের মত গলা উঁচিয়ে কইতে পারে না। এতগুলো বছর এই দ্বীপে বসবাসের সূত্রে আমি বুঝেছি এই দ্বীপ ভূতাত্ত্বিক বা ভূগাঠনিকভাবে, বাস্তুতান্ত্রিক জীব-বৈচিত্রের বিচারে এবং সাংস্কৃতিক বৈভবের নিরিখে এক আশ্চর্য ত্রিবেণীসঙ্গমে অবস্থান করছে যা সব দিক থেকেই অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং সংবেদনশীল। কেন বলছি এ কথা?

প্রথমে ভূসংস্থানিক বৈশিষ্ট্যের কথাতেই আসি। টিয়ারঙা দ্বীপ নিজেই তোমাদের জানিয়েছে যে এই দ্বীপ অত্যন্ত ভূকম্পপ্রবণ। প্রতি সপ্তাহেই এখানে ভূমিকম্প হয়। তবে কম্পনমাত্রা কম থাকার কারণে সেই সব খবর কখনওই তোমাদের নজরে পড়ে না। ২০০৪ সালের ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা মনে আছে তো? ‘বান্দা আছা’র ওই ভূকম্প ছিল বিধ্বংসী— ৯.৩ রিখটার মাত্রার। তার ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি!

দ্বিতীয়ত, জীব বৈচিত্রের বিচারে কিছু বলতে গেলে বলতে হয় ‘এমন দ্বীপটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি!’ মোট ৫৬০টা দ্বীপ— কী বিপুল প্রাণবৈচিত্র্যের পসরা নিয়ে গোটা পৃথিবীর বিস্মিত আগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছে ভাবা যায় না! এসব না জেনেই তাদের বিদায় পরোয়ানা ঘোষণার আয়োজনকে কী বলতে পারি আমরা—নিছক মূর্খামি, না  অতি বড় শয়তানি!

আর তৃতীয়ত যে বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ— এই দ্বীপমালা হল এক নৃতাত্ত্বিক প্রত্নশালা। এখানকার ‘জীবাশ্ম সমাজে’র মানুষরা নৃতাত্ত্বিক বিবর্তনধারার অতুলনীয় সাক্ষী— প্রাক-প্রস্তরযুগীয় মানুষের জীবনযাত্রার এক আশ্চর্য জীবন্ত গ্যালারি! এইসব মানুষদের চিরায়ত টেকসই যাপন আনন্দ থেকে উৎখাত করব কোন অবৈজ্ঞানিক, ভ্রান্ত উন্নয়নের নামে?

বিষয়গতভাবে তিনটি স্বতন্ত্র দিকের কথা বলা হলেও আদতে এরা পরস্পর গভীর অন্তর্লীন সম্পর্কে সম্পর্কিত। আমার খুব বিনম্রতার সঙ্গে প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে যে, প্রশাসন যখন কোনও উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা ভাবে তখন কি এইসব উপাদানের গভীর সম্পর্কের কথা, তাদের স্থিতিগত সংবেদনের কথা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে? মোটেই না! একদম এসব বিষয় নিয়ে ভাবনাচিন্তা হয় না। ভাবা হলেও তথাকথিত বিকাশ-ভাবনার জয়ঢাক এত জোরে পেটানো হয় যে, পরিবেশের বিপন্ন আর্তনাদের কান্না আমাদের কানে ঢোকে না। আচ্ছা ভূমিকম্প বা সুনামি বিষয়ে আমরা কতটুকু ভেবেছি? কতটুকু ব্যবস্থা নিয়েছি?

প্রশ্নে প্রশ্নে বাতাস বোধহয় একটু ভারি হয়ে উঠল? একটা গল্প শোনাই বরং। না না, খোশগল্প নয়, হুরি, পরি মৎস্যকন্যার গপ্পোও নয়। এ একেবারে বাস্তব ঘটনার, বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা। গপ্পোর খোলসে মুড়ে হাজির না করলে তোমরা হয়তো পড়তে চাইবে না, তাই…

ঘটনাটা বছরখানেক আগের। প্রায় ৪০০ যাত্রী নিয়ে এক জাহাজ পোর্টব্লেয়ার ছেড়ে রওনা দিয়েছিল চেন্নাইয়ের উদ্দেশ্যে। খানিকটা যেতে না যেতেই ঘটল চরম বিপত্তি। ডুবো পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে জাহাজের তলায় ফুটো তৈরি হল। যাত্রীরা আতঙ্কগ্রস্ত। শেষে উপকূলরক্ষী বাহিনির লোকজন এসে সকলকে উদ্ধার করে। এমনই বিপদসঙ্কুল জলপথ সংযোগ ব্যবস্থা।

আজ যে তোমাদের সঙ্গে টিয়ারঙা দ্বীপকে নিয়ে এত কথা কইছি তার কারণ সম্প্রতি নীতি আয়োগ এই সুন্দর প্রাকৃতিক আবাসকে ঘিরে বেশ কিছু উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। আজকাল উন্নয়ন শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহারে শব্দটা সত্যিই খুব ক্লিশে হয়ে পড়েছে। নীতি আয়োগ জানিয়েছে এই দ্বীপকে মাথায় রেখে একটা অবকাশ অঞ্চল (Leisure Zone) গড়ে তোলা হবে। ‘অবকাশ অঞ্চল’— বেশ গালভরা শব্দবন্ধ। কী থাকবে এই অবকাশ অঞ্চলে? তারও সম্ভাব্য তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। থাকবে একটি অত্যাধুনিক ফিল্ম সিটি বা চলচ্চিত্র নগরী যার ব্যবস্থাপনা টলি-বলি-হলিকেও ছাপিয়ে যাবে; থাকবে একটি বিশেষ আবাসিক অঞ্চল যেখানে বহুমূল্য আবাস তৈরি হবে; তৈরি হবে একটি নতুন বন্দর যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন বৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক হবে; এই দ্বীপের বিকাশ হবে পর্যটনকে কেন্দ্র করে, আর তাই পর্যটন শিল্পের প্রসারে এখানে গড়ে তোলা হবে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা এসইজেড। ওয়েস্ট বে-র তটভূমিতেই গড়ে তোলা হবে এমন সব বিকাশমুখী উন্নয়ন প্রকল্প। এই অঞ্চলের জলের নিচে থাকা বিচিত্র সব প্রবালদের সাম্রাজ্যে তৈরি হবে ডুবন্ত জলাবাস। খাসা ব্যবস্থা! এই না হলে বিকাশ!

এই ওয়েস্ট বে-র ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ বালুকাময় বেলাভূমিই হল পৃথিবীর বৃহত্তম কাছিমদের প্রজনন লীলাক্ষেত্র। ২০০৪ সালে আন্দামান ও নিকোবর এনভায়রনমেন্ট টিম, দক্ষিণ ফাউন্ডেশন, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এবং এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বনবিভাগের সম্মিলিত উদ্যোগেই এখানে গড়ে উঠেছিল কাছিম গবেষণাকেন্দ্র। এই কয়েক বছরে উপগ্রহ চিত্র পর্যবেক্ষণ সূত্রে বৃহত্তম কূর্মদের পরিযান বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিপুল তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে যা আগামী দিনে বিলুপ্তপ্রায় এই সরীসৃপ বর্গের প্রাণীটিকে সংরক্ষণে সাহায্য করবে। এই গত পয়লা ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক ভারতে ভিনদেশি, আগন্তুক নানান প্রজাতির কাছিমদের সংরক্ষণের জন্য তাদের অঙ্গীকারের কথা নতুন করে ঘোষণা করেছেন। অথচ তথাকথিত এই উন্নয়ন পরিকল্পনা বিষয়ে তারা নির্বাক। এই দ্বীপমালাকে ঘিরে পর্যটনের ব্যাপক প্রসার ঘটানো হলে তা হবে অনিবার্যভাবে এক আত্মঘাতী প্রয়াস। এইসব উচ্চাকাঙ্ক্ষী, বিলাসী পরিকল্পনা মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষদের জীবন ও জীবিকাকে কখনওই স্পর্শ করে না। আজ টিয়ারঙা দ্বীপকে কেন্দ্র করে বিলাসী অবসর অঞ্চল তথা পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে বিনোদনপিয়াসী মানুষজনের ভিড় বাড়বে। বিত্তবান এইসব বহিরাগত মানুষদের ভিড় বাড়লে বিপন্নতার শিকার হবে এই দ্বীপমালার জীববৈচিত্র্য, ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিলুপ্তপ্রায় নিগ্রিটো প্রজাতির প্রাগৈতিহাসিক যুগের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত মানুষজন। এই সমস্ত বিপন্নতার কথা ভাবলে আন্দামানের আয়নায় তথাকথিত উন্নয়নের বিষয়টিকে এক বড় রকমের প্রহসন বলে মনে হয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় মেখলার ওপর অবস্থিত এই দ্বীপমালায়, যেখানে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, সুনামির মতো ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্বিপাক ঘটার ১০০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে উন্নয়ন পরিকল্পনা রূপায়ণের আগে আরও সচেতন হতে হবে সব মহলকেই।

 

আমাদের জবানবন্দি শেষ করলাম। অবশেষে খানিকটা স্বস্তি পেলাম এই ভেবে যে, যাক আমাদের আশঙ্কিত মনকথা তোমাদের খানিকটা শোনাতে পারলাম। মূল ভূখণ্ড থেকে আমাদের অবস্থান দূরে, অনেকটাই দূরে। তাই তোমাদের ব্যস্ত, হিসেবি দুনিয়ার মানুষজনের সঙ্গে আমাদের আত্মার কোনও সংযোগ গড়ে ওঠেনি। আমাদের ঘিরে থাকা সমুদ্রের জলে নিরন্তর ঢেউ ওঠে। সেই ঢেউয়ের ছলছলানিয়া গান আমাদের শরীরে আর মনে যে ঢেউ তোলে তাতেই দিব্যি দিন কেটে যায় সকলের। যে নিজেই এত সুন্দর, স্বতঃস্ফূর্ত তার বাইরে থেকে ধার করে আনা কৃত্রিম আভরণের কী প্রয়োজন? আমাদের কাছে যারা আসতে চায় তাদের আসতে হবে শ্রমণের বিনম্রতা নিয়ে, অনুসন্ধিৎসা নিয়ে, মেলবার ও মেলাবার সুতীব্র আকুতি নিয়ে। জানি, এই বৈশ্য সমাজে এমন সব আন্তরভাষণের কোনও মূল্যই হয়তো নেই। তবুও এমন কথা বলতে হবে… বারেবারে বলে যেতে হবে… নানান স্বরগ্রামে বলে যেতে হবে… আমরা কোনও বহিরাগত, আত্মম্ভরী আরোপিত উন্নয়ন চাই না যা আমাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে পারে যেকোনও মুহূর্তে… আমাদের আমাদের মতোই থাকতে দাও… সকলে ভালো থেকো!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3170 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

আপনার মতামত...