সুদেষ্ণা ঘোষ

তিনটি কবিতা -- সুদেষ্ণা ঘোষ

তিনটি কবিতা

 

অন্ধকার, ভাল তো?

এই হেমন্তের রাত ফুঁড়ে এত রকেট কোথায় যায় বলো তো?
আমাদের পাড়ায় রাত বাড়লে একটা করুণ বেহালা ছাড়া কিচ্ছু থাকে না।
একটা আলোর পিছনে বোকার মতো দৌড়ে বেড়ায় আর-একটা বেহায়া আলো।
জেগে থাকা ছাড়া সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।
নীল লেন্সপরা ফ্লেক্সের মেয়েরা সব দেখে।
আর নিশ্চয়ই সেই পুরনো শিরীষ গাছ। অন্ধ আর ঘুমহীন।

রাস্তায়-রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানো রাগকে ধরে আনার কথা বলত।
কখনও বলত, প্যান্ডেলের পিছনে ঠায় লুকিয়ে থাকার কষ্ট।
মর্জি হলে অন্ধকার আগে এসব বলত কখনও-কখনও।
কখনও উদাসীনভাবে জানতে চাইত, আগুন কেমন আছে? কার সঙ্গে বাড়ি ফেরে আজকাল?
আমরা বিশ্বাস করতাম, শিরীষ গাছেরা অন্ধই।
আমাদের সমস্ত জামার গোটানো আস্তিনে কুয়াশার কথা টের পায়নি কেউ কস্মিনকালে।

এক অভিমানী গলা যা কিনা যখন-তখন ডুকরে উঠতে পারে।
একদিন কী ঝোঁকের মাথায় বলে ফেলেছিল,
এতদিন শুধু একটা দপদপে উষ্ণ তারাই আমার সম্বল ছিল।
এতদিন একটা উত্তাল সমুদ্র, উষ্ণতার জন্য যার কোনও কষ্টই হত না কখনও।
তারপর আচমকা অন্ধকার বাসে উঠে গেল।
রেড রোডের উপর ঝুপ করে নেমে আসতে চাইছিল ছাই রঙের আকাশ।

তোমার মনে পড়েছিল চিড়িয়াখানায় এক কালো
চিতা অকারণ অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল।
কতগুলো সংকেত হারিয়ে যাওয়াই যাদের গন্তব্য এর-ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসত।
খোলার অনেক চেষ্টার পর একটা ছোট্ট ফিতে-বাঁধা উপহার টান মেরে পাঠিয়ে দিয়েছিলে জাহান্নমে।
অন্ধকার আর স্বপ্নের তুমুল অশান্তি শুনতে শুনতে কতদিন একা-একাই সিঁটিয়ে যেতে তুমি।

শেষের দিকে অন্ধকার খালি আচমকা চলে যাওয়া রকেটের কথাই জিজ্ঞেস করত
জলে ডোবা মানুষের মতো শোনাত ওর গলা।
বিশ্বাস করো সেসব রাতে বেহালার আওয়াজ বাড়ত
বুড়ো শিরীষ গাছ কী অহেতুক দাবিতে প্রায় মাটি
পর্যন্ত ঝুঁকে পড়ত।
আগুনের আঁচ মৃত্যু অবধি বাড়িয়ে তোলা ছাড়া আমাদের কিচ্ছু করার থাকত না।

 

স্বপ্নের ধূসর চোখ

আমি দেখতাম তোমার মুখ দেখা যাচ্ছে না।
আস্তে-আস্তে শহর থেকে উবে যাচ্ছিল পাঁচ হাজার জলাশয়।
শান্ত পায়রা মুখে করে নিয়ে যাচ্ছিল ছেলেবেলার হারানো রাংতা।
কথায়-কথায় হেসে ওঠা দেওয়ালের সামনে পড়ে পালিয়ে যেত সিঁড়ি।
ভালবাসার কথায় মুখ না তুলে ঠোঁট সেলাই করে দিতে তুমি।

অনেকদিন রং না করা ভাঙা কতগুলো জানলা একা-একা টনটন করে উঠত।

আমি বাজার তোলপাড় করে খুঁজে আনছিলাম একটা হাসিমুখ পুতুল।
আমি দেখছিলাম সিলিং বেয়ে ছড়িয়ে পড়ছে উইয়ের আক্রোশ।
ফাঁকা গ্যালারি থেকে ভীষণ বৃষ্টির দিনগুলোয় ভেসে আসত হাততালি।
তুমি চিৎকার হয়ে বলতে, পুতুলের চোখ পালটে যাচ্ছে অন্ধকার হলেই।
তুমি অন্ধকারের ভাষায় বলতে, হাওয়ায় লাফিয়ে ওঠা মাংসের দিকে আরও তীব্র লাফ দিচ্ছে কাক।

আমি দেখলাম বেওয়ারিশ বিষণ্ণতার নীচে কারও মুখ দেখা যায় না।

 

কুয়াশা ও কুয়াশার বাস্তবতা — একটি দ্বিমাত্রিক অনুলিখন

তারপর কী হল?
কেউ একটা নাম ধরে ডাকতে-ডাকতে মিলিয়ে গেল।
তারপর কী হল?
চোখের সতেজ পাতাগুলো পুড়ে গেল।
তারপর?
আয়নায় একটা কোণাকুণি চিড় ধরল।
তারপর?
নিয়ন আলোরা দপ করে জ্বলে উঠল হৃদপিণ্ড তাক করে।
হুম, তারপর?
একটা পারদওঠা রাত ম্যাজিশিয়ানের মতো চোখের সামনে আঙুল নাড়াল।
অতএব?
একটা রফার প্রস্তাব।
অর্থাৎ?
কুয়াশা নেমে এল। আমাদের বাড়ি হারিয়ে গেল।
এর পর নিশ্চিত কিছু নেই?
একটা ভাঙা দোলনার সঙ্গে কাঠফাটা দুপুরের যেটুকু লুকনো গল্প থাকে।
কিংবা?
প্রেম আর অশ্লীলতার…

কুয়াশার ওপারের দৃশ্য

একটা রক্তহীন দিন স্রেফ একা-একা বড় হয়ে উঠছিল।
আমরা শুধু দেখেছিলাম, ট্রাফিক সার্জেন্ট হাত তুলল
আর সারা শহর পাথর হয়ে গেল।
আমরা শুনেছিলাম, ভরদুপুরকে চুরমার করে একজন বলে উঠল করুণাময়ী, করুণাময়ী!
মনে আছে, দেওয়ালের সমস্ত ফাটল ঢেকে ফেলছিল ক্রসওয়ার্ডের কাগজ।
আর কেউ অন্ধকার, অন্ধকার বলে ছুটতে গিয়ে সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলছে ভবিষ্যৎ।
একটা মুখঢাকা কুয়োর ভিতর ঝাঁপ দিচ্ছিল মৃত শিশুদের ডাকনাম।
আমরা কাউকে বলিনি দেখেছিলাম, রক্তের সরু রেখা চুঁইয়ে আসছে দরজার তলা দিয়ে।
কাউকে বলিনি শুনেছিলাম কেউ বলে উঠছে, আমার তো কোনও বর্ম নেই অরণি।
অথচ এত ক্ষুধার্তদের ভিড়…

সমস্ত অসুখ কীভাবে মুখ বুজে চেপে রাখলে তুমি।
মুনিয়ার খাঁচা খুলে দাঁড়িয়ে থাকলে শীতভর।
সারাজীবন বিষাদের জন্য হন্যে হয়ে কী পেলে কী, অরণি?

কুয়াশার এপারের স্বপ্ন

একটা লাইটপোস্টের আলো কেঁপে যাচ্ছিল কবে থেকে।
কেউ গা করত না।
আমি জানতাম, এইসব একা অলিগলিদের একটাই চোরা স্বপ্ন, সেলিব্রেশন।
আমি জানতাম, সুস্বাস্থ্যের বিজ্ঞাপন দেখে রাতের গা ঘেঁষে শুচ্ছে সোহাগী দিন।
আমি নাছোড় বিশ্বাস করতাম, রক্ত মানে যা চিরকাল চামড়ার আড়ালেই থাকে।
কিন্তু একদিন একটা ভাঙা বাড়ির বাগান থেকে একটা পাথরের পরি কথা বলে উঠল।
আর তুমি বিন্দুমাত্র না ভেবেই মেডুসার গল্প ছুঁড়ে দিয়েছিলে শহরের দিকে।
একদিন থেকে আকাশ ভেঙেচুরে যাচ্ছে অকাট্য নির্জনতায়।
সেদিন থেকে ডাকবাক্স উপচে যাচ্ছে বেপরোয়া চিঠিতে।
সেদিন থেকে একটা বিপদসীমায় দাঁড়ানো লাইটপোস্ট কেঁপে যাচ্ছে রাতভর।

সেদিন থেকে আমি তো থাকার জন্য একটা গল্পই খুঁজছি অরণি।
স্রেফ একটা হারিয়ে যাওয়া গল্প।
যার মুখ কুয়াশার কোনও অবস্থান থেকে ধরা যাচ্ছে না।

কিন্তু গ্যালারি থেকে কার ডাক মিলিয়ে যাচ্ছে, অরণি?
আর আমার চোখের পাতা…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...