মোদি জমানা, অতিমারি ও মানুষের কথা বলার অধিকার

শান্ত মিত্র

 

প্রাবন্ধিক, সমাজভাবুক; পেশায় করণিক

শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদের অধিকার গণতান্ত্রিক চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ— মায়নমারে সামরিক শাসনের বিরোধিতায় ভারত সরকারের বক্তব্য, ২৯তম হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল-এ জেনেভা সম্মেলনে।

দিল্লির তখ্‌ত-এ মোদির আরোহনের পর কম-বেশি সাত বছর ঘুরতে চলল। এর মধ্যে গত এক বছর সারা বিশ্বের পাশাপাশি আমাদের দেশেও চলেছে এবং এখনও চলছে অতিমারি-কাল। এই সময়ে আমাদের দেশের মানুষের নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমরা দেখতে চেষ্টা করব এই অতিমারি কালে মানুষের সরকারের কাজের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশের অধিকার কী অবস্থায় রয়েছে।

আজকে যা দেখছি, তার সলতে পাকানোর শুরু হয়েছে মোদি জমানা শুরুর একেবারে গোড়ার দিকে। ২০১৫ সালের শেষ এবং ২০১৬ সালের শুরু। সরকারের প্রচারমন্ত্রক খুব ঘটা করে সরকারের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ভারতের প্রায় সব প্রতিষ্ঠিত দৈনিক সংবাদপত্রের মালিকদের ডেকে ‘মোলায়েম ভাষায় সতর্ক’ করে বলেন যে জাতির এই নির্মাণ উৎসবে যেসব বেয়াড়া সাংবাদিককূল বাগড়া দেওয়ার জন্য ক্রমাগত সরকার-বিরোধী খবর ছাপছে, সংবাদপত্রের মালিকরা যেন সেই সব বেয়াড়া সাংবাদিকদের নাম, ঠিকানা ইত্যাদি সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তরে জমা করেন। বাকি “কাজের দায়িত্ব” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের।

দিনে দিনে সামাজিক এবং বৈদ্যুতিন মাধ্যম, মুদ্রণ-মাধ্যমের প্রতিযোগী হয়ে ওঠার পর সরকারের এই দুই মাধ্যমের ওপরও নজর পড়ে। মোদি সরকার এখানেই থেমে থাকেনি। সরকারি মদতে ভুয়ো খবর দেওয়া, সৎ সাংবাদিকদের ফাঁসি দেওয়ার দাবি ও ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য বিপুল আকারের প্রচারাভিযান শুরু হয়ে যায়। ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১। ইউটিউব-এ একটি ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যেখানে সরকারের কাজের সমালোচনামূলক একটি দৈনিককে নির্দিষ্ট করে বলা হয় যে, সেই কাগজের সাংবাদিকরা ‘দেশবিরোধী শক্তি’-র কাজ থেকে অর্থ সাহায্য নিয়ে ‘দেশপ্রেমিক’ সরকারকে উচ্ছেদের ‘বিশ্বব্যাপী চক্রান্তের অংশ’ হিসেবে কাজ করছেন। এই ভিডিওতে বেশ কিছু সাংবাদিক, টেলিভিশনের সঞ্চালক, ইউটিউব-এ যাঁরা জনশিক্ষামূলক ভিডিও জমা দেন, এমন কয়েকজনকে কোতল করার, নিদেনপক্ষে ফাঁসির দাবি তোলা হয়। এই তালিকায় কে নেই? সাংবাদিক রানা আইয়ুব, ‘অল্ট নিউজ’ নামক সংবাদ সংস্থার কর্ণধার মহম্মদ জুবেইর, স্বাধীন সাংবাদিক ফায়ে ডিসুজা, বরখা দত্ত, ইউটিউব-এ সক্রিয় ধ্রব রাঠোর সহ আরও অনেকেই ছিলেন। বলাই বাহুল্য, সামান্য তদন্তেই প্রমাণিত হয় যে ঐ ভিডিওটি আদ্যন্ত জাল একটি ভিডিও। এই ভিডিওটি যাঁরা তৈরি করেছেন এবং যাঁরা ইউটিউব মারফত সেটিকে প্রচারের আলোতে এনেছেন, তাদের কোনও শাস্তি হয়নি। সারা পৃথিবীর গণতান্ত্রিক চেতনার বহু মানুষ ইউটিউব মারফত এই ভিডিওটিকে প্রচার করার বিরুদ্ধে সরব হওয়ার পর ইউটিউব কর্তৃপক্ষ বলে যে এই ভিডিওটি তাদের নীতির বিরোধী, ভুয়ো খবর, ভ্রান্তি ছড়ানো এবং সর্বোপরি ঘৃণা ও হত্যার হুমকি দেওয়া ইউটিউবের নীতির বিরোধী এবং এই ধরনের কোনও ভিডিও-র স্থান ইউটিউব নয়; কর্তৃপক্ষ সেই দিন বিকেলেই ভিডিওটি ইউটিউব থেকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ভিডিওটি, সামাজিক মাধ্যমের ভাষায়, ‘ভাইরাল’ হয়ে যায়! আর হবে না-ই বা কেন! যে সমস্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এই ভিডিওটি বার বার একজন থেকে আর একজনকে পাঠিয়ে ভিডিওটিকে বাঁচিয়ে রাখে, ‘হোয়াটস অ্যাপ’ বা ‘টুইটার’-এর মাধ্যমে, তাদের মধ্যে যারা মুখ্য স্থপতি, তাদেরকে ‘ফেসবুক’, ‘টুইটার’ বা এই জাতীয় সামাজিক মাধ্যমে চিহ্নিত করা গেছে এইসব নামে— ‘স্বয়ংসেবক’, ‘প্রাউড হিন্দু’, ‘বিজেপি-র জনৈক মুখপাত্র’ ইত্যাদি। সামাজিক মাধ্যমে এদের ‘ফলোয়ার’ বা যাঁরা এদের পাঠানো বস্তু নিয়মিত দেখেন এবং মন্তব্য করেন, তাঁদের সংখ্যা জনপ্রতি ১০ হাজারের ওপর! পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর অনেক সামাজিক মাধ্যম বিশ্লেষণের বিশেষজ্ঞবৃন্দ দেখান যে, যে সংস্থাটি ইউটিউব-এ ঐ ভুয়ো ভিডিওটি ছেড়েছিল, তারা নিজেরাই একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী চক্রের সঙ্গে যুক্ত, যার সঙ্গে ভারতের সমমনোভাবাপন্ন সন্ত্রাসী সংস্থার যোগাযোগ স্পষ্ট। কিন্তু ভারতে সেইসব সংস্থার কর্ণধারদের বিরুদ্ধে ভারত সরকার কোনও আইনি পদক্ষেপ করেনি।

এটা তো গেল সেই অতি প্রচলিত কথা, ‘মুদ্রার একটি পিঠ’। মুদ্রার অন্য পিঠটা আসলে রাষ্ট্রের পিটুনির দিক। এর পরপরই শুরু হয়ে যায় সাংবাদিকদের ওপর হুমকি প্রদর্শন, তাদের কাজে বাধা দেওয়া, তাদের গ্রেপ্তার করা, যা আমরা ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় দেখেছি। সাংবাদিকদের ওপর এই দমন-পীড়নের চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখেছি গৌরী লঙ্কেশ-এর হত্যার মধ্য দিয়ে। মোদি রাজত্বের শুরুর দিকে সংবাদপত্রের মালিকদের ডেকে যে “সবক শেখানো” হয়েছিল, মালিকরা তা অক্ষরে অক্ষরে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সাংবাদিকদের খবর ‘চেপে’ যেতে বলে, খবরে এমন সব ‘চাটনি’ মেশানোর প্রস্তাব দেয়, যা সাংবাদিকতার পেশার পক্ষে অবমানকর। এই সব কারণে অনেক পত্রিকা সম্পাদক, সাংবাদিক পদত্যাগ করেন, অনেককে সংবাদপত্রের মালিকরা নানান কল্পিত অভিযোগ তুলে ছাড়িয়ে দেয়।

কাশ্মিরের জন্য ৩৭০ ধারা বিলোপের পর সেখানে সাংবাদিক সহ সাধারণ মানুষের দুর্গতির খবর জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রায় অনুপস্থিত হয়ে পড়েছে। কাশ্মিরে সৎ সাংবাদিকদের কপালে জুটছে ‘দেশদ্রোহিতা’ এবং খারাপ ধরনের জামিন-অযোগ্য ‘ফৌজদারি’ মামলা।

অবস্থাটা যা দাঁড়িয়েছে, তা ১৯০ বছরের প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ শাসনকেও লজ্জায় ফেলে দেবে। বাজপেয়ি এবং মোদি জমানা মিলিয়ে এইসব ভুয়ো মামলায় ২০২০ পর্যন্ত মোট ১৫৪ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার মধ্যে ২০২০ সালেই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৬২ জনে।

ভারতের ‘এডিটার্স গিল্ড’ ফেব্রুয়ারি ৩-এ এক বিবৃতিতে বলেছে ২০২১ সাল সাংবাদিকতা জগতের জন্য এক বিপদের পদধ্বনি বহনকারী। বাস্তবিকই, ২০২১ সাল মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে কালা বছর হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। নিউজক্লিক নামক খবরের ওয়েবসাইটের মুখ্য সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থ-র বাড়ি দিল্লি পুলিশ ‘তল্লাশি’-র জন্য হানা দেয়, পুলিশের কাছে কোনও পরওয়ানা ছিল না, ছিল না কোনও এফআইআর-এর কপিও। এই হানাদারি চলে ১১৪ ঘন্টা, যার অবসান হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি। নিউজক্লিক-এর দপ্তরে ৩৬ ঘন্টা হানাদারি চলে। সেখান থেকে নানান যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত করা হয়। নিউজক্লিক সংস্থার উকিল সংস্থা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে দেওয়া বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে তাঁরাও এই ‘অনুসন্ধানের বিষয়ে’ অন্ধকারে রয়েছেন, তাঁরাও জানেন না পুলিশ ঠিক কী কারণে এই ‘অনুসন্ধান চালিয়েছে’।

দিল্লির সীমান্তে চলমান কৃষক আন্দোলনের খবর প্রচারের জন্য মোদি সরকার ৬ জন খুবই বরিষ্ঠ এবং মান্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহিতা’-র অভিযোগ আনে, এই ৬ জনের মধ্যে ইন্ডিয়া টুডে-র ‘কন্সাল্টিং এডিটর’ রাজদীপ সারদেশাই, ক্যারাভেন-এর কার্যকরী সম্পাদক বিনোদ জোশে, বরিষ্ঠ সাংবাদিক মৃণাল পাণ্ডে অন্যতম। মোট পাঁচটি থানার অধীনে নানা ধরনের মামলায় এঁদেরকে জড়িয়ে ফেলা হয়।

মনদীপ পুনিয়া একজন স্বাধীন সাংবাদিক। পুনিয়া এবং ধারমেন্দার সিং, ইনিও একজন স্বাধীন সাংবাদিক, যখন ৩০ জানুয়ারি, দিল্লির সীমান্তে আন্দোলনকারী কৃষকদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন তখন পুলিশ তাদের সেই পেশাগত কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তাঁরা স্বাধীন সাংবাদিকতার স্বার্থে তাঁদের কাজ চালিয়ে যান। ৩১ জানুয়ারি পুলিশ তাঁদের আচমকা ঘিরে ফেলে তাঁদের পেশাগত কাজে বাধা সৃষ্টি করে, টানতে টানতে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগ এইরকম: ভারতীয় ফৌজদারি ধারার ১৮৬ (সরকারি চাকুরেকে সরকারি কাজে বাধাদান), ৩৩২ (সরকারি চাকুরেকে তার সরকারি কাজে বাধাদানের উদ্দেশ্যে আঘাত করা), ৩৫৩ (সরকারি চাকুরেকে তার কাজে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসী শক্তি প্রয়োগ)! ধরমেন্দ্রর সিং-কে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। দি ওয়্যার পত্রিকার সম্পাদক বরদারাজন এবং সেই পত্রিকার সাংবাদিক ইসমত আরা-কে একটি এফআইআর-এ যুক্ত করা হয়; কারণ হল তাঁরা এক মৃত আন্দোলনকারী ব্যক্তির যিনি শব ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন, সেই ব্যাক্তির জবানবন্দিতে জানিয়েছিলেন যে তাঁর দেহে পুলিশের ব্যবহৃত বুলেটের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

২০২১ সাল সত্যিই ঘটনার ঘনঘটায় পূর্ণ। বরিষ্ঠ সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা ২০১৭ সালে মোদি সরকারের ‘রকফেলার’ শ্রী গৌতম আদানি-র নানা বেআইনি ও অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির কথা সরকারি নথিপত্র ও তথ্য ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস করেন। ২০২১-এর জানুয়ারি মাসে গুজরাট আদালতে আদানি গোষ্ঠী গুহঠাকুরতার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা ঠুকে দেয়। প্রায় একই সময়ে উত্তরপ্রদেশের পুলিশ সেই রাজ্যের তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সরকার-বিরোধী খবর প্রকাশের দায়ে মামলা করে, যে ‘মারাত্মক সরকার-বিরোধী’ অভিযোগ এই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ছিল, সেটি হল এই সাংবাদিকরা ছবি সহ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিলেন যে দুর্দান্ত শীতে শিশু-কিশোরদের খালি গায়ে, খোলা মাঠে ‘যোগাভ্যাস’ করানো হচ্ছে!

ফেব্রুয়ারি ১, ভারতের বৈদ্যুতিন ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক টুইটার-কে হুমকি দিয়ে ভারতের ১০০টি টুইটার অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য করে; এই অ্যাকাউন্টগুলি ভারতের চলমান কৃষক বিদ্রোহের খবর প্রচার করছিল। দিল্লির উত্তর সীমান্ত দিয়ে দিল্লির দিক থেকে সিংঘু সীমান্তে কৃষক জমায়েতের স্থানের দিকে সাংবাদিকদের গাড়ি পুলিশ আটকে দেয় এবং তাদের ফিরে যেতে বাধ্য করে।

অতিমারির কালে কাশীর অধিবাসীরা কেমন আছেন (এই অঞ্চলটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লোকসভা নির্বাচন ক্ষেত্র),’লকডাউন’ তাঁদের জীবনে কেমন প্রভাব ফেলেছে, সেই সব নিয়ে সাংবাদিক সুপ্রিয়া শর্মা এক তথ্যবহুল প্রতিবেদন পেশ করেন। জুন, ২০২০। উত্তরপ্রদেশ পুলিশ শ্রীমতি শর্মার বিরুদ্ধে গোটা কয়েক মামলা রুজু করে। পরে অবশ্য এলাহাবাদ হাইকোর্ট শ্রীমতি শর্মাকে চটজলদি গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে!

‘প্রেস ফ্রিডম’ সহগ মতে ভারতের সংবাদ-স্বাধীনতার অবস্থা খুবই শোচনীয়। ২০১৪ সালে ১৮০ দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ছিল ১৪০ (তখনও দেশে মোদি সরকারের আবাহন ঘটেনি), ২০২০ সালে স্থান মিলেছে ১৪২তম স্থানে, আফাগানিস্তান বা উত্তর সুদান-এর মতো দেশেরও তলায়!

আমাদের দেশের বড় বড় সংবাদ ব্যবসায়ী সংস্থার কর্ণধারবৃন্দ তাঁদের সংবাদপত্রকে আমজনতার কাছে বিক্রয়যোগ্য সুস্বাদু পণ্য করে তোলার অভিপ্রায়ে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের দিয়ে নিয়মিত কলাম লেখানোর রীতি প্রচলন করেন। বিখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তি, রামচন্দ্র গুহ, হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকায় এইরকম একটি পাক্ষিক কলাম নিয়মিত চালাতেন। কিন্তু তাঁর মত এবং পত্রিকাগোষ্ঠীর মালিকের মতের মধ্যে বিরোধিতা প্রকট হয়ে ওঠায় এক সময়ে রামচন্দ্র গুহ ঘোষণা করে হিন্দুস্থান টাইমস-এ তাঁর নিয়মিত কলাম পত্রস্থ করা বন্ধ করে দেন।

কাশ্মিরের কথা আবার না বললে অতিমারিকালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দুর্গতি বোঝানো যাবে না। ফরহাদ শাহ ‘দি কাশ্মিরওয়ালা’ নামে একটি স্বাধীন ওয়েব-সাইট চালিয়ে আসছেন বহু বছর। এই অতিমারিকালে তাঁর বিরুদ্ধে ‘সরকার-বিরোধী’ খবর প্রকাশের দায়ে দুটি এফআইআর ঝুলে আছে, তাঁকে থানায় বা সৈন্যবাহিনীর ক্যাম্প-এ ডেকে নিয়ে গিয়ে “জিজ্ঞাসাবাদ” করার সংখ্যা কয়েক ডজন বার ছাড়িয়েছে। অতিমারির তৃতীয় মাসেই তাঁকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পাঁচ ঘন্টা ‘জেরা’ করা হয়। অতিমারির প্রথম মাসেই কাশ্মিরের চিত্র সাংবাদিক মাসরাট জারারা-কে তাঁর নিজস্ব ‘ফেসবুক অ্যাকাউন্ট’-এ কাশ্মিরের কয়েকটি ছবি দেওয়ার ‘অপরাধে’ ইউএপিএ আইনে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সরকারের আর একটি ভয়ানক হাতিয়ার হল যত্রতত্র ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া। প্রায় সমগ্র কাশ্মির জুড়ে গত কয়েক বছর কেবল টু-জি পরিষেবার বেশি কোনও কিছুই লভ্য নয়, ফলে সেখানে ‘অন-লাইন’ মাধ্যমে শিক্ষার শ্রাদ্ধ সম্পূর্ণ হয়েছে। ভারতের অন্যন্য অংশে অবস্থা এমন কিছু আহামরি নয়। অতিমারিকালে নানা আছিলায় সরকারি স্বেচ্ছাচারিতার খবর যাতে বাইরে না যায়, সেই জন্য সিংঘু, গাজিপুর, টিকরি, নাংগলোই প্রভৃতি বর্হিদিল্লির নানান স্থানে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল, এখনও মাঝে-মধ্যে সেই ঘটনা ঘটে।

হাথরাস-এর ঘটনা এখনও অনেকের মনে মারাত্মক ক্ষতচিহ্নের মতো জেগে রয়েছে। অতিমারির সময়ে, অক্টোবর ২০২০-তে মালায়লাম সাংবাদিক, সিদ্দিক কাপ্পান উত্তরপ্রদেশের হাথরাসের ঘটনা সরেজমিনে দেখে ফেরার পথে পুলিশ তাঁকে ইউএপিএ আইনে “গ্রেপ্তার” করে। পুলিশের অভিযোগ, তিনি নাকি “সন্ত্রাসীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ” করছিলেন। পুলিশ আরও বলে, তিনি নাকি ‘ইসলামীয় মৌলবাদী সংস্থা’, পপুলার ফ্রন্ট অফ ইন্ডিয়ার একজন সক্রিয় সদস্য। কেরালা ইউনিয়ন অফ ওয়ার্কিং জার্নালিস্ট নামক সংস্থা কাপ্পান-এর বিরুদ্ধে এই দুই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, আজ যাদের ‘গোদি মিডিয়া’ বলা হচ্ছে, ঘৃণা ছড়ানোর খবর করে বা সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তি আক্রমণ করে, সেই বর্গের ‘সাংবাদিক’-রা দিব্য শাস্তি এড়িয়ে যাচ্ছেন, যেমন জি-নিউজ-এর সঞ্চালক আমন চোপরা, যিনি টুইট করে বলেছেন যে জনৈক হাস্যকৌতুক অভিনেতাকে দেখে তাঁর ‘রক্ত ফুটছে’, অভিনেতার হাস্যমুখকে স্তব্ধ করা দরকার।

বেঙ্গালুরু-র পরিবেশকর্মী, ২১ বর্ষীয়া দিশা রবি। তাঁর অপরাধ তিনি সুইডেনের কিশোরী ছাত্রী, গ্রেটা থুনবার্গ-এর ডাকে সাড়া দিয়ে অতীতে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্র যথেষ্ট সক্রিয় হচ্ছে না বলে বিশ্বব্যাপী অন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সেই গ্রেটা থুনবার্গ ভারতের চলমান কৃষক আন্দোলনের সমর্থনে একটি বড় লেখা সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সম্পাদনা-যোগ্য একটি দলিল আকারে সেটি প্রকাশ করে। দিশা রবি সেই দলিলের কিছু সম্পাদনা করে সেইটি প্রচার করেন। পুলিশ সেই দলিলটির নামকরণ করে ‘টুলকিট’, বলে এটি খালিস্তানিদের দলিল এবং দিশাকে গ্রেপ্তার করার সময় বলে যে দিশা একটি ‘আন্তর্জাতিক চক্রান্ত চক্রের একজন মুখ্য চক্রান্তকারী’। এই গ্রেপ্তার ছিল সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক; সংবিধানে শান্তিপূর্ণ পথে মতপার্থক্য জ্ঞাপনের অধিকার স্বীকৃত। সরকার ভীমা-কোরেগাঁও মামলার আদলে এই মামলাটিতেও আইনিজীবীদের পেশাগত কাজকে ‘দেশদ্রোহিতা’ বলে ব্যাখ্যা করে আইনজীবীদের জেলে পোরার মত ব্যাপার ঘটিয়েছে। দিশা রবি-র পর আইনজীবী নিকিতা জেকব এবং শান্তনুকে পুলিশ সেই ‘কুখ্যাত টুলকিট’ দলিলটি লেখার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। শোনা যায়, দিল্লি পুলিশ হন্যে হয়ে গ্রেটা থুনবার্গ-কে গ্রেপ্তারের জন্য খুঁজছিল, কিন্তু তার সন্ধান দিল্লি বা বেঙ্গালুরু-তে পায়নি। এই নিয়ে হইচই শুরু হওয়াতে দিল্লি পুলিশ পরে বিবৃতি দেয় যে তারা গ্রেটা-র ‘বিরুদ্ধে এফআইআর করার কথা ভাবছে না’!

সরকার যে সর্বদাই নির্দলীয় সক্রিয় কর্মীদের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত, এমনটা নয়; সময়ে সময়ে সরকার সাংবিধানিক পথে নির্বাচিত বিরোধী দলের মানুষদের বিরোধিতার অধিকার অস্বীকার করতে পিছপা নয়। অতিমারির সময়ে মোদি সরকার পিএম কেয়ার বলে একটি সন্দেহজনক বেসরকারি কোষ স্থাপনা করে যাবতীয় সরকারি সংস্থাগুলিকে এই কোষে বিপুল পরিমাণ অর্থ অনুদান দিতে কার্যত বাধ্য করে। সংসদে কংগ্রেস পার্টির নেতা শ্রীঅধীর রঞ্জন চৌধুরী যখন সরকার দ্বারা নিয়োজিত পাব্লিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ঐ কমিটিতে এই পিএম কেয়ার ফান্ড-এর বিষয়টির হিসাব পরীক্ষার বিষয়টি উত্থাপন করেন, তখন ঐ কমিটির বিজেপি সদস্যরা একযোগে সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আলোচনা ভন্ডুল করে দেন।

ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় আমরা দেখেছি, সরকার দ্বারা গঠিত ন্যাশানাল ইনভেস্টিগেতিং এজেন্সি বা এনআইএ-র হাতে সরকার সংবিধানবহির্ভূত ক্ষমতা তুলে দিয়েছে। কারাগার থেকে সম্প্রতি মুক্ত জঙ্গলমহলের এক সময়ের অন্দোলনের নেতা, অধুনা পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল, তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, শ্রীছত্রধর মাহাতো-কে এনআইএ মার্চ মাসের গোড়ায় সমন পাঠায়। সেই সমনে ২০০৯ সালে একজন সিপিআই(এম) কর্মী হত্যার ও অন্যান্য অভিযোগের উল্লেখ ছিল। ছত্রধর সেই সমনের কোনও উত্তর দেননি। গত ২৯ মার্চ গভীর রাত্রে ছত্রধর মাহাতোকে এনআইএ-র আধিকারিকরা গ্রেপ্তার করে এবং মার্চ ৩০-এ তাঁকে কলকাতার আদালতে তুলে ৩০ মার্চ পর্যন্ত এনআইএ-র হেফাজতে রাখার ব্যবস্থা করে। এনআইএ-র সূত্র মতে ৪০ জনের একটি দল মাহাতোকে গ্রেপ্তারের জন্য মাঝরাতে তাঁর বাড়ি উপস্থিত হয় এবং তাঁর পরিবারের লোকেদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়।

সেপ্টেম্বর ২০২০। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল “দিল্লি দাঙ্গা” মামলায় জেএনইউ-এর প্রাক্তর ছাত্রনেতা উমর খলিদ-কে ৬ ঘন্টার ওপর জেরা করে এই ‘দাঙ্গা বাধানোর একজন মুখ্য চক্রান্তকারী’ বলে গ্রেপ্তার করে।

বছরের শুরুতে এসে সাংবাদিকরা শিহরিত হয়ে দেখেন যে বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশে ১১ জন সাংবাদিক, কাশ্মিরে ৬ জন এবং হিমাচল প্রদেশে ৫ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন।

আমরা ঘরের কাছের ঘটনা দেখি। আরামবাগ টিভি-র সাংবাদিকরা এই অতিমারি কালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার দ্বারা স্থানীয় ক্লাবগুলিকে আর্থিক অনুদান সংক্রান্ত এক দুর্নীতির কাহিনী ফাঁস করে দেন। এদের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ খুব হেনস্থা করে। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের উদ্দেশে আপত্তিকর মন্তব্য করেন, যার বিরুদ্ধে প্রেস ক্লাব এক কড়া বিবৃতি দেয়।

সরকার-বিরোধী, নির্বাচন কমিশন দ্বারা স্বীকৃত সংসদীয় বিরোধী দলের নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে আইনজীবী, সাংবাদিক, পরিবেশকর্মী, সমাজ পরিবর্তনকারী শক্তির প্রতিনিধি থেকে হিমাংশু কুমারের মতো নিপাট গান্ধিবাদী, ছাত্র থেকে শিক্ষক, গবেষক থেকে কৃষক, নারী-অধিকার নিয়ে, তৃতীয় লিঙ্গের জন্য লিঙ্গসাম্যের দাবিতে সোচ্চার কর্মী থেকে শ্রম আইনের বিরুদ্ধাচারণকারী শ্রমিক, সবাই আজকে তাঁদের মনের ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার; এ যেন সমগ্র সমাজ আজ শাসকের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3384 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. লকডাউনের বর্ষপূর্তি: চতুর্থ বর্ষ, দ্বাদশতম যাত্রা – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...